অস্থিরতার আশঙ্কায় ৫৫ কারখানা বন্ধ

December 20, 2016 6:36 pmComments Off on অস্থিরতার আশঙ্কায় ৫৫ কারখানা বন্ধViews: 5
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

তৈরি পোশাক শিল্প
অস্থিরতার আশঙ্কায় ৫৫ কারখানা বন্ধ
ডিসেম্বর ২১, ২০১৬

টানা এক সপ্তাহের বেশি শ্রমিক অসন্তোষের পর আশুলিয়ার ৫৫টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী গতকাল এসব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয়।

গতকাল বিকালেই সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোয় বন্ধের নোটিস টানিয়ে দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডেকো ডিজাইন, পারএক্সেল, এনভয় গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, ডংলিয়ান, ফ্যাশন এইড, ফারইয়ার, ফ্যাশন ক্রাফট, বার্ডস গ্রুপ, ফাউনটেন, নাভা নিট ওয়্যারের কারখানা।

কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার আগে গতকাল বিকালে বিজিএমইএ কার্যালয়ে আশুলিয়ার ২০-২৫ জন কারখানা মালিকের সঙ্গে বৈঠক করেন সংগঠনের নেতারা। বৈঠকের সিদ্ধান্ত পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়। বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নয়দিন ধরে আশুলিয়ায় শ্রম সমস্যা চলছে। একটি কারখানায় সমস্যা শুরু হলে পরে তা তিন-চারটি কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনদিন ধরে এ সমস্যা বাড়তে থাকে। শ্রমিকরা কারখানায় এসে কার্ড পাঞ্চ করে বেরিয়ে যেতে থাকেন। এ অবস্থায় যেসব কারখানার শ্রমিকরা কাজ করছেন না, শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী সেগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কোনো শ্রমিক কাজ না করলে আইন অনুযায়ী ওই সময়ের জন্য বেতন পাবেন না।

আশুলিয়া এলাকার ৫৫টি পোশাক কারখানায় এরই মধ্যে বন্ধের নোটিস টানিয়ে দেয়া হয়েছে জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, নতুন করে কোনো কারখানায় সমস্যা দেখা দিলেও একইভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন মালিকরা। তবে শ্রমিকরা যদি কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে ফিরতে চান ও কারখানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কারখানা খুলে দেয়া হবে।

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, কোনো কারণে ছাঁটাই হলে নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য পরিশোধ ও ছুটিকালীন বেতন বহাল রাখার দাবিতে ১২ ডিসেম্বর আন্দোলন শুরু করেন আশুলিয়া এলাকার পোশাক শ্রমিকরা। ১৪ ডিসেম্বর তা আরো কয়েকটি কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। আশুলিয়ার ডিজাইনার জিন্স, শেড গ্রুপ, সেতারা গ্রুপ, স্টার্লিং ক্রিয়েশন, উইন্ডি গ্রুপ, হলিউড গার্মেন্টস ও এএম ডিজাইনের শ্রমিকরা ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন। ওইদিনই হলিউড গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করলে প্রতিষ্ঠানটির সব শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। পরদিন ওই সাত কারখানার সঙ্গে আরো দুই কারখানা দ্য রোজ ড্রেসেস লিমিটেড ও নেক্সট কালেকশনের শ্রমিকরা একই দাবিতে কাজ বন্ধ রাখেন। ওইদিনই শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে বৈঠক করে কর্মবিরতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন আশুলিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা। কিন্তু তার পরও অচলাবস্থার নিরসন হয়নি।

গতকাল সকালেও শিল্পাঞ্চলের প্রায় ১৫টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কিছুক্ষণ পরই বের হয়ে আসেন। টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভও করতে থাকেন তারা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জসহ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় সড়কটিতে প্রায় ২০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেকো ডিজাইন, পারএক্সেল, এনভয় গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, ডংলিয়ান, ফ্যাশন এইড, ফারইয়ার, ফ্যাশন ক্রাফট, এনআরএল, বার্ডস গ্রুপ, ফাউনটেন, নাভা নিট ওয়্যারসহ প্রায় ১৫টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে বিকালে এসব কারখানাসহ আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের মোট ৫৫টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেয় বিজিএমইএ।

শ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানিতে প্ররোচিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পোশাক শিল্পে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাবেন না। দায়িত্বের সঙ্গে নিজ নিজ কাজ করুন। দেশের স্বার্থে আমাদের সাহায্য করুন। কর্মবিরতি পালন করলে মালিকরা আপনাদের বেতন দিতে পারবেন না। শিল্পটি আমাদের সবার।

সরকারের কাছেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চান বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি বলেন, পোশাক শিল্প নিয়ে যারা চক্রান্ত করছেন, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিন। যদি প্রয়োজন মনে করেন, সংসদে নতুন আইন প্রণয়ন করে অর্থনীতি ধ্বংসকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন, যাতে কেউ শিল্প নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। সে সঙ্গে কারখানা চালাতে নিরাপত্তা দিন। নিরাপত্তা না পেলে কারখানা খোলা রাখা সম্ভব হবে না।

অন্যদের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সাবেক তিন সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ও আতিকুল ইসলাম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ.কে. আজাদ, বিজিএমইএর সহসভাপতি ফারুক হাসান, মোহাম্মদ নাছির, মাহমুদ হাসান খান প্রমুখ। আশুলিয়া এলাকার পোশাক শিল্প মালিকদের সঙ্গে বিজিএমইএর বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

এদিকে এ ঘটনার মধ্যেই গতকাল দুপুরে আশুলিয়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আশুলিয়া গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের দ্রুত কাজে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়। শ্রমিকদের কাজে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে বিকাল থেকে এলাকায় মাইকিংও করা হয়

আশুলিয়া শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় গতকাল গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ থেকেও পৃথক বিবৃতি দেয়া হয়। পরিষদের আহ্বায়ক শাজাহান খান ও সদস্য সচিব বদরুদ্দোজা নিজাম স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের এ আন্দোলন শ্রম আইনসম্মত নয়, বরং শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে কেউ কেউ হঠকারিতার আশ্রয় নিয়েছে। শ্রমিকদের এ কর্মবিরতি সম্পূর্ণ বেআইনি।
জানতে চাইলে শিল্প পুলিশ-১-এর পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আন্দোলনের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বণিক বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.