আওয়ামী ‘প্রগতিশীলতা’র নয়া তত্ত্ব

May 28, 2017 4:36 pmComments Off on আওয়ামী ‘প্রগতিশীলতা’র নয়া তত্ত্বViews: 12
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আওয়ামী ‘প্রগতিশীলতা’র নয়া তত্ত্ব

শাহাদত হোসেন বাচ্চুঃ 

রবার্ট লুই ষ্টিভেনসন’র লেখা ‘ড. জেকিল এন্ড মিষ্টার হাইড’ উপন্যাসটির কাহিনী সংক্ষেপ মোটামুটি এরকম- ড. জেকিল একজন সদাশয় মানুষ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও পরোপকারী। তিনি একটি ওষুধ আবিষ্কার করে বসেন; যেটি খেলে হেন মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ নাই যা করা যায় না। বিকল্প ওষুধটিও আবিষ্কার করেন, যা খেলে স্ব-রূপে ফিরতে পারেন।

ভাল মানুষ হেনরী জেকিল ওষুধটি খেয়ে মন্দ মানুষ এডোয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হচ্ছিলেন এবং সবরকম মন্দ ও অমঙ্গলের কাজ সংঘটন করছিলেন। আবার অন্য ওষুধটি খেয়ে জেকিলে ফেরত আসছিলেন। কিন্তু একসময় বাঁধে বিপত্তি। মন্দ মানুষ হাইডে রূপান্তরিত হতে হতে অন্য ওষুধটি কাজ করছিল না। তিনি ফেরত আসতে পারছিলেন না। ভালকে ছাড়িয়ে গিয়ে মন্দ-কুৎসিত প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চলেছিল।

১৮৩৬ সালে লেখা এই কালজয়ী উপন্যাসটি বাংলাদেশের রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও দলদাসদের ক্ষেত্রে চমৎকার রূপক হিসেবে প্রাসঙ্গিক। শাসক শ্রেনী সবকালে কথনে-চলনে-বলনে ড. জেকিলের ভান করেন, আর অন্তরে পুষে রাখেন মি. হাইডের সকল দুষ্কর্ম। তাদের অনেকেই এখন প্রায় হাইডে রূপান্তরিত হয়েছেন, জেকিলে আর ফিরতে পারছেন না।

এক. রাজনীতি এখন আওয়ামী লীগের ‘বাস্তবতা’ এবং ‘প্রগতিশীলতা’- এটি সবশেষ কথিত বয়ান ও তত্ত্ব। তাদের বক্তব্য সত্য হলে ধরে নিতে হবে, কিছুদিন আগেও রাজনীতি ছিল ‘অবাস্তব’ এবং ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। ক্ষমতাসীন দলটি এখনও পর্যন্ত খৈ ফোটার মত উচ্চারন করছে ‘স্বাধীনতার পক্ষশক্তি’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। সরকার বা দলের বিপক্ষে যে কোন বক্তব্য, প্রতিবাদ এবং লেখালেখির মধ্যে খুঁজে পায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির অপচ্ছায়া বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা। সুতরাং তাদের কথায় ধরে নেয়া যায়, সেগুলি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ এবং ‘অবাস্তব’।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও সাধারন সম্পাদকের কথিত ‘রিয়েলষ্টিক এপ্রোচ’- এর রাজনীতি অবশেষে খুঁজে নিয়েছে ধর্মাশ্রয়ী একটি সংগঠনকে। যারা কিছুদিন আগেও ক্ষমতাসীনদের ভাষায় ছিল- স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার-আলবদরদের উত্তরসূরী এবং পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর অর্থ সাহায্যপুষ্ট। এখন ‘বাস্তব’ রাজনীতির কল্যাণে সেই গোষ্ঠিটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির মিত্রে পরিনত হয়েছে। এর আগে ভোটের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতের সাথে বিএনপির জোটবদ্ধতা ও ক্ষমতা ভাগাভাগি তাহলে ‘বাস্তব’ ছিল?

প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মধ্য দিয়ে উনসত্তর বয়সী আওয়ামী লীগ কি তার মৌল চরিত্রের পরিবর্তণ ঘটালো? অথবা কথিত প্রগতি ঘেঁষা দল হিসেবে পুরোনো ধারাই তারা বদলে দিচ্ছেন কিনা? ইতিহাসের আলোচনায় না যেয়ে শেখ হাসিনার আমলে সীমাবদ্ধ থাকছি। আওয়ামী লীগ সবসময় দাবি করে, তারা ধার্মিক তবে ধর্মান্ধ নয়।

এটি বিশ্বাস করলেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ একসময় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী শীর্ষ দালাল গোলাম আযমকে পবিত্র কোরআন শরীফ উপহার দিয়ে দোয়া চেয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি করেছিল। যেমনটি এখন হেফাজতের দাবির কাছে সমর্পিত হয়ে তাদের পক্ষে সাফাই-প্রচারেরও দায়িত্বও নিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাগাভাগি করার কারণে বিএনপিকে আজ হোক কাল হোক, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তেমনি আওয়ামী লীগকে দাঁড়াতে হবে কথিত স্বৈরাচার ও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিচার না করে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার জন্য। হেফাজতের পৃৃষ্ঠপোষকতা প্রথমে বিএনপি করেছে। এখন আওয়ামী লীগ করছে। আবার সুযোগের অপেক্ষায় বিএনপি। হেফাজত এবং এরশাদের জন্য তারাও অপেক্ষা করে আছে।

দুই. এই আবর্তে ধর্মাশ্রিত ছোট-বড় সংগঠনগুলি আদৃত হয়ে উঠছে বড় দলগুলোর কাছে। কারণ একটাই, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার, বেশি বেশি ‘ইসলামী’ হয়ে ওঠা। বামদের সাথে আওয়ামী লীগের বন্ধন থাকলেও তাদের ক্ষীণকায় ভোটের ওপর আওয়ামী লীগের আদৌ ভরসা নেই। আপাতত: নাখোশ হলেও লোম-চর্মবিহীন বামদের কিছুই করার নেই। সেজন্যই হেফাজতসহ উগ্র  ডানপন্থীদের দিকে হাত বাড়িয়েছে ক্ষমতাসীনরা। এরশাদকে দিয়ে ধর্মাশ্রিত দলগুলি নিয়ে গঠন করাচ্ছে আরেকটি জোট।

অভ্যন্তরে অনুদার-অগণতান্ত্রিক চর্চা দলগুলিকে সামন্ত আদলের কাঠামোয় রেখে দিয়েছে। দলের প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট রাখাই মোক্ষ লাভ। আনুগত্য, অবশ্যই প্রশ্নহীন- এই রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। প্রধান ব্যক্তি যদি দেশ বা দলের মৌলিকত্ব বিরোধী কোন পদক্ষেপ নেন বা বক্তব্য দেন, তাহলে সেটি গোটা দলে অনুরণিত হতে থাকে। সকলে প্রধান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে দশ ধাপ এগিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। ভিন্নমত থাকলে এবং তা কষ্মিণকালেও প্রকাশ হয়ে পড়লে আর রক্ষা থাকে না।

এই সর্বময় ক্ষমতা ব্যক্তিকে সাধারন থেকে তো দুরে সরিয়ে দেয়, এমনকি দলের কর্মীদের থেকেও। তিনি ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ক্ষমতার সর্বোচ্চ মহিমায়। এজন্যই ভারত সফর থেকে ফিরে এসে চুক্তিসমূহ প্রকাশের প্রসঙ্গ উঠলে শেখ হাসিনা তার ওপরে ‘বিশ্বাস’ রাখতে বলেন। একই কথা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সময় তিনি বলেছেন এবং দাবি করেছেন তারচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। এই কথাগুলি অনেকটা নিয়তিবাদীদের মত, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মত নয়। আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা সবসময় একই ভাষায় এবং একই ধরনের কথা বলে থাকেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রাজনীতি বা দল এখানে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠেনি। শেখ মুজিব, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাই এদেশে এখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং সবশেষ ও একমাত্র কথা। আগামীতে তারেক বিএনপির এবং জয় হবেন আওয়ামী লীগ নেতা। ব্যক্তি, পরিবার, ডাইন্যাষ্টি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে উঠেছে। এর ওপর ভর করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা বা ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ কোথায়!

যে কোন উপায় অবলম্বনে নেতৃত্ব, ক্ষমতায় টিকে থাকার ইচ্ছা শাসকশ্রেনীকে সবসময় টাল-মাটাল করে দেয়। সেক্ষেত্রে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ-কারো মধ্যে বৈসাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে যে ন্যূনতম আদর্শ ও নৈতিকতার যে চর্চা বিদ্যমান ছিল- তা রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছে পুরোপুরিভাবে। এই বিদায় দিতে গিয়ে গনতন্ত্রের প্রথম ধাপ জনগনের ভোটকে প্রথমেই নির্বাসিত করা হয়েছে। আবার ঘোষণাও এসেছে ২০১৪ সালের মত নির্বাচন আর হবে না। সেজন্য আরেকটি নীতি বিগর্হিত কাজের সূচনা হয়েছে ধর্মাশ্রিত সংগঠনগুলিকে ক্ষমতার পালাবদলে রাজনীতির মেইনষ্ট্রিমে বা মূলধারায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে।

সূত্র: আমদের বুধবার 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.