আগ্রাসনের শিকার সুন্দরবন

January 20, 2015 2:35 pmComments Off on আগ্রাসনের শিকার সুন্দরবনViews: 7
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আগ্রাসনের শিকার সুন্দরবন

ঘষিয়াখালী রুট চালু করতে হবে

ম. ইনামুল হক

last 3প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪-এর ১৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে রক্ষা করার জন্য ঘষিয়াখালী নৌরুটের দুপাশে গড়ে ওঠা চিংড়ি ঘেরগুলিকে তুলে দিয়ে ড্রেজিং করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর এই আদেশ ৯ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর সবার কাছেই অনেক প্রতীক্ষীত ছিলো। উল্লেখ্য যে, তেলবাহী জাহাজ ‘সাউদার্ণ স্টার ৭’ অন্য একটি খালি জাহাজ ‘টোটাল’ এর ধাক্কায় ফুটো হয়ে শ্যালা নদীতে ডুবে গেলে ৩৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্ণেস অয়েল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে এক মহা দুর্যোগ সৃষ্টি করে। এই সুন্দরবন উত্তর থেকে আসা গঙ্গা ও তার শাখা প্রশাখার মিঠা পানি ও দক্ষিণ থেকে আসা সমুদ্রের লোনা পানির মিলনস্থল যা’ Pleistoceneযুগ (২০ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ বছর আগে) ও তৎপরবর্তী Holoceneযুগে (১ লক্ষ বছর থেকে অদ্যাবধি)উজান থেকে আসা পলির পতন এবং তার উপর মোহনার গাছপালার পরিবৃদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। এর ভূমির উচ্চতা গড় সমুদ্র তল থেকে ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার। অজস্র নদী নালায় পরিপূর্ণ এখানকার জলাভূমি, কাদার তাল, ভাটায় জেগে ওঠা সাগরের ভেতরের জমি ইত্যাদি এখানে জলজ ও ভূমিজ প্রাণীর এক বিচিত্র সমাহার সৃষ্টি করেছে।

সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং এর ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার জন্যে একে ১৮৭৫ সালে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গকিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৯ সালে একে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটস-এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে ২০০৯ সালে সুন্দরবন ও কক্সবাজারকে বিশ্বের সাতটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্র হিসেবে ভোট দেবার যজ্ঞ শুরু হলে একই সাথে এই যজ্ঞের উদ্যোক্তারা সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকাকে দখল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এরই এক পর্যায়ে ২০১১ সালে বিআইডাব্লি#উটিএ মংলা ঘষিয়াখালী নৌপথটি বন্ধ করে দিলে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল ও যশোর জেলার বিভিন্ন নদী বন্দরে যাতায়াতকারী মালবাহী কার্গো জাহাজগুলিও সুন্দরবনের ভেতরে দিয়ে শ্যালা নদীপথে যাতায়াত শুরু করে। পুশুর নদের তীরে মংলা সমুদ্রবন্দর অবস্থিত বিধায় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ আসা যাওয়া করে। এইসব জাহাজগুলি তাদের ব্যবহৃত কঠিন বর্জ্য এবং ব্যবহৃত জ্বালানী বর্জ্য ফেলে সুন্দরবনকে দূষিত করতে থাকে।

পরিবেশবাদীরা তাই সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য এর ভেতর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ বন্ধ করা এবং রামপাল এলাকায় দুটি কয়লাচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ করার দাবী জানিয়ে আসছে। কেবল রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে রক্ষা করতে বাগেরহাট-খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় যেসকল শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির এবং জাহাজ নিক্ষিপ্ত বর্জ্য দূষণ বন্ধের লক্ষ্যেও আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে সরকারের তরফ থেকে এব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প কলকারখানা বাড়ছে, শহরের জনবসতি বাড়ছে, বিদেশী শিল্প উদ্যোক্তারা আসতে চাইছে, ফলে মংলা সমুদ্র বন্দর ও সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলিতে জাহাজ চলাচল বাড়ছে। এইসব জাহাজ থেকে ফেলা বর্জ্য, বিশেষ করে ব্যবহৃত জ্বালানীর বর্জ্য এর অভ্যন্তরীণ নদীগুলিকে যে কি পরিমাণ দূষিত করছে তা’ কোন ব্যক্তি এলাকায় গেলেই তা’ দেখতে পাবেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৮০ সালের দশক থেকেই সুন্দরবন নগ্ন আগ্রাসনের শিকার হতে থাকে। বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী ভারত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তার সুন্দরবন এলাকায় আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুললে বাংলাদেশের সুন্দরবনেও পর্যটন শিল্প প্রসারের কথা ওঠে। কিন্তু সুন্দরবনের দায়িত্বে থাকা বন অধিদপ্তরের দুর্নীতি এবং বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যর্থতার সুযোগে এই শিল্পটি ক্রমশঃ ব্যক্তি উদ্যোগের বিষয় হয়ে যায়। ২০০০ সাল নাগাদ সুন্দরবনের চারপাশে অনেক এনজিও সুন্দরবনের মানুষ ও প্রাণী রক্ষার নামে ঘাঁটি গাড়তে থাকে। এরপর থেকেই শুরু হয় সুন্দরবন দখলের আগ্রাসী প্রচারণা। আমরা বিশ্বের সেরা প্রাকৃতিক সাইট হিসেবে সুন্দরবন এবং কক্সবাজারকে ভোট দেবার জন্যে দেশব্যাপী প্রচারণা দেখেছি। সারা দেশের মানুষ পাগলের মতো এই যজ্ঞে যোগ দিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলো। কিন্তু আসলে ঐ যজ্ঞটি ছিলো সুন্দরবন ও কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ভূমিকে দখল করার পাঁয়তারা এবং নামে বেনামে দখলীকৃত ভূমির দাম বৃদ্ধি করা। আমরা তখনই প্রতিবাদ করে বলেছিলাম,ঐ যজ্ঞ ঐ এলাকা দু’টির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমিকে ধ্বংস করে মনুষ্য পদচারণা ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে পূর্ণ দূষিত ভূমিতে পরিণত করবে।

সুন্দরবনের তেল বিপর্যয়ের পর সম্ভবত

নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের আপত্তির কারণেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া পেতে ৬ দিন দেরী হয়। এই বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় নৌমন্ত্রী বলেন, জংলার চেয়ে মংলা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। উলে#খ্য যে, চলতি গুগুল স্যাটেলাইট চিত্রে ঘষিয়াখালী নদীর দুটি রূপ পাশাপাশি পাওয়া যায়, এর একটি পূর্ব অংশের যা’ ২০১০ সালের ও অন্যটি ঘষিয়াখালী নদীর পশ্চিম অংশের। এতে দেখা ২০১০ সালে এই নদীর উপর দিয়ে কার্গোবাহী জাহাজ চলাচল করছে, আর ২০১৩ সালে নদীটি পলি পড়ে বুজে গেছে। স্পষ্টতঃই বোঝা যায়, সুন্দরবনকে ভোট দিয়ে জয় অর্জনের পরপরই এর উদ্যোক্তারা এলাকাটিকে দখল করার মহোৎসবে লেগে যায়। জানা যায়, রাজনৈতিক দলের অনেক বড় বড় নেতা এই এলাকায় জমিগুলির মালিক হয়েছেন, এবং বলাই বাহুল্য যে,রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও অনুগ্রহপ্রাপ্তরাই ঘষিয়াখালী ও অন্যান্য জলাভূমিগুলি দখল করেছেন। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান। দুর্বৃত্তদের দখল প্রক্রিয়ার চরম বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক ফল সুন্দরবেনের ভেতরে এই তেল দূর্ঘটনা। এর ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা তত সহজ নয় তবে পরিবেশ মাপকাঠি এবং এর দীর্ঘ সময়ের ক্ষতি হিসাব করলে তা’ ১ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা হবে।

 last-3-1

উল্লেখ্য যে, সুন্দরবনের উত্তর দিয়ে মংলা বন্দর থেকে ঘাসিয়াখালী হয়ে ২২ কিলোমিটারের ঐতিহ্যবাহী নৌ রুটটি যথাযথ সংরক্ষণের অভাবেই ভরাট হয়ে গেছে। এই কারণে অন্যান্য জাহাজের মতই এই জাহাজটিকেও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। মংলা ঘাসিয়াখালী রুট যাত্রাপথের মাধ্যমে ১৫০ কিলোমিটার পথ কম পাড়ি দিতে হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুট পুনরায় চালু করা তত সহজ ব্যাপার নয়। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে চালু করা এই রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এটি বন্ধ করায় যে ভরাট হয়েছে তা’ পুনঃখনন করতে ২০০ কোটি টাকার ড্রেজিং লাগবে। জানা যায় যে, বিগত জুন মাসে একটি চীনা কোম্পানীকে ৮৮ কোটি টাকা খরচে এই খাল পুনঃখননের আদেশ দেয়া হয়, এবং জুলাই মাসে তার কাজও শুরু হয়। আমরা বাংলাদেশে চীনা কোম্পানীগুলির প্রতারণা সম্পর্কে জানি, তাই প্রশ্ন আসে তারা কি নিয়ম পালন করে ঠিকমত কাজ করেছে? নাকি তারা কিছু কাজ করে বহু টাকার বিল তুলে নিয়ে সরে পড়েছে? বিআইডাব্লি#উটি-এর কাছে প্রশ্ন, ঘষিয়াখালী নৌ রুট ভরাট হওয়ার মুখে তা’ বন্ধ না করে ২০১১ সালে ড্রেজিং করা শুরু হয়নি কেন? কেন ঐসময় সমীক্ষার নামে সিইজিআইএস-কে কাজ দিয়ে ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হতে দেয়া হলো?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘষিয়াখালী নৌ রুট চালু করার জন্যে চিংড়ি ঘের তুলে দেবার আদেশ দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক পোল্ডারও এর জন্যে বাধা হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো পোল্ডারের বাঁধ কেটে দেয়ার প্রয়োজন হবে। তাই জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ মংলা ঘষিয়াখালী রুটটি চালু করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ প্রয়োজন।।

minamul@gmail.com

প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ:

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.