আমরাও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনে সক্ষম

June 5, 2017 11:17 amComments Off on আমরাও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনে সক্ষমViews: 3
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আমরাও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনে সক্ষমঃ
বাংলাদেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার শিল্পের ভবিষ্যত্, চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানের উপায় নিয়ে এর সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোল জিস (বিডি) লিমিটেডের বিক্রয় ও বিপণন মহাব্যবস্থাপক মুজাহিদ আল বেরুনী সুজন ঃ
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার শিল্পের ভবিষ্যত্? মুজাহিদ আল বেরুনী সুজন: বর্তমানে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত অত্যন্ত দ্রুতলয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার তার বিভিন্ন খাতের অবকাঠামোর ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিভিন্ন ধরনের বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং করে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রয়োজন হচ্ছে অসংখ্য টেকনোলজিক্যাল ডিভাইসের। সারাদেশের স্কুল-কলেজ পর্যায়ে অসংখ্য ল্যাব স্থাপিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কনজিউমার পর্যায়েও কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এরা সবাই কম্পিউটার নয়তো স্মার্টফোন কিংবা ট্যাবলেট ইউজার। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও অনেক বেশি বাড়বে। এই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অনেকেই কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তৈরি হচ্ছে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় লড়াই করে অনেকে টিকে থাকছেন, অনেকেই টিকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। গত কয়েক বছরে দেশের অনেক কম্পিউটার হার্ডওয়্যার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যা কম্পিউটার হার্ডওয়্যার খাতের সুন্দর ভবিষ্যেক প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এক কথায় বলতে গেলে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার খাত বড় হচ্ছে কিন্তু সুস্থভাবে বড় হচ্ছে না।  

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার শিল্পের চ্যালেঞ্জ? মুজাহিদ আল বেরুনী সুজন: আমাদের দেশে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার পণ্যগুলো পুরোপুরিই আমদানিনির্ভর। যেকোনো পণ্য আমদানি করতে হলে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করতে হয়। এই আনুষ্ঠানিকতায় জড়িত থাকে আমদানিকারক এবং রফতানিকারক দেশের ব্যাংক এবং সরকারের বেশ কয়েকটি বিভাগ। এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের মূল্য রফতানিকারক দেশের তুলনায় আমাদের একটু বেশি হয়ে যায়। এই কম-বেশির মাঝখানে ঢুকে পড়ে নন-চ্যানেল আমদানিকারক এবং লাগেজ পার্টির দৌরাত্ম্য। অনেক ক্ষেত্রেই এসব লাগেজ পার্টি অনুমোদিত আমদানিকারকের চেয়ে কম মূল্যে বাজারে পণ্য ছাড়েন। অনৈতিক উপায়ে বাজারে পণ্য ছাড়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেছে নেওয়া হয় পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোকেই। এই পণ্যগুলো একটা পর্যায়ে অরিজিনাল পণ্যের পাশে রেখে বিক্রি করেন দোকানিরা। কিন্তু যেহেতু সেসব পণ্য অননুমোদিত, সেহেতু সেসব পণ্যে ক্রেতা সাধারণ বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হন। তখন সেই ব্র্যান্ডের মূল আমদানিকারকের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এবং ক্রেতাসাধারণ বিভ্রান্ত হন।   আমাদের দেশের আইটি হার্ডওয়্যার শিল্পে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পণ্যের খুচরা মূল্য নির্ধারণ নিয়ে। আমাদের দেশে আর কোনো সেক্টরেই ব্র্যান্ডের পণ্য এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যে বিক্রি হয় না, যা হয়ে থাকে আইটি সেক্টরে। আপনি একটা মোবাইল মার্কেট থেকে মোবাইল কিনতে যাবেন, দেখবেন সেখানে সব দোকানেই একই মূল্য (যদি ওয়্যারেন্টি পণ্য হয়)। একটি নির্দিষ্ট খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে পণ্য বিক্রি করছে জামাকাপড়ের ব্র্যান্ড, জুতার ব্র্যান্ড এমনকি সেমাই, নুডুলসের ব্র্যান্ডগুলো। শুধু আমরাই পারছি না, একটি নির্দিষ্ট খুচরা মূল্যে একটি এইচপি ল্যাপটপ কিংবা একটি গিগাবাইট মাদারবোর্ড বিক্রি করতে। বিক্রি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে আমরা নিজের কান কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার মতোই কাজ করছি। এতে কমে যাচ্ছে মুনাফার অংশ। দুর্বল হয়ে পড়ছেন অনেক ভালো ব্যবসায়ী। একটা পর্যায়ে গিয়ে অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই এই ব্যবসার টাকা তুলে নিয়ে অন্য খাতে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিনিয়োগ করছেন। এই খাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমদানিকারকের কাছ থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা ধারে পণ্য ক্রয় করছেন। কিছু নির্বোধ ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর লাভের অংশটুকুকে নিজের না ভেবে পুরো বিক্রয়মূল্যকে নিজের ভেবে নিয়ে সেই টাকাকে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছেন। পরে আরেক আমদানিকারকের কাছ থেকে ধারে আরও কিছু পণ্য কিনছেন। সেই পণ্য বিক্রি করে আংশিকভাবে প্রথম আমদানিকারকের অর্থ পরিশোধ করছেন। তখন প্রথম এবং দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সব আমদানিকারকের টাকা রোলিং করে কোনোমতে ব্যবসায় পরিচালনা করছেন। এতে করে ওই খুচরা ব্যবসায়ীরা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি আমদানিকারকদের আর্থিক সঙ্কটে ফেলে দিচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বড় পরিবেশক তথা আমদানিকারকদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো করে ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। এতে করে পুরো মার্কেটেই একটা অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। সঠিক মানের বৈধ চ্যানেলের পণ্যগুলো ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব ব্যবসায়ীকে কাজ করা উচিত। পরিকল্পনামাফিক মুনাফার বিপরীতে খরচ হিসাব করে ব্যবসা পরিচালনার জন্য অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার শিল্পের সমাধানের উপায়? মুজাহিদ আল বেরুনী সুজন: আমাদের চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ করছে বিদেশি পণ্য। দোয়েল ল্যাপটপ ছাড়া দেশে এখনও কোনো ধরনের কম্পিউটার কিংবা কম্পিউটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের প্রোডাকশন প্ল্যান্ট তৈরি হয়নি। আমাদের দেশে আইটি খাতের কথা বললে কার্যত সফটওয়্যার শিল্পের কার্যক্রমগুলো সবার চোখে ভাসে। সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্ট, প্রণোদনা, উত্সাহ সবকিছুই মূলত সফটওয়্যার কেন্দ্রিক। হার্ডওয়্যার পণ্যের শুধু বাণিজ্যই হচ্ছে। এটা শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। যেকোনো দেশে নির্দিষ্ট কোনো খাতের পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে সেই দেশের স্থানীয় বাজার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এখন যেহেতু বাংলাদেশে কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, সেহেতু এখন হার্ডওয়্যার উত্পাদনের কথা ভাবা যেতেই পারে। সরকার সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশে যে ধরনের প্রণোদনা এবং উত্সাহ দিয়েছে, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনেও আগ্রহী উদ্যোক্তাদেরকে একইভাবে সহযোগিতা করলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি হতে পারে বাংলাদেশের পণ্য। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো দেশ পারলে আমরাও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনে সক্ষম। কারণ, বাংলাদেশে বর্তমানে অত্যন্ত চৌকস একটি তরুণ প্রজন্ম রয়েছে। এখানকার তরুণরা যদি গুগল, ইউটিউব, মাইক্রোসফট এবং ইন্টেলের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারে, তাহলে স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলেও তারা তা এগিয়ে নিতে পারবে।
সূত্রঃ সকালের খবর 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.