আমার ২২ মাস কে ফিরিয়ে দেবে?

December 26, 2016 10:02 amComments Off on আমার ২২ মাস কে ফিরিয়ে দেবে?Views: 1
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আমার ২২ মাস কে ফিরিয়ে দেবে?

ফররুখ বাবু | ডিসেম্বর  ২৬,২০১৬

আমার ২২ মাস কে ফিরিয়ে দেবে?


গণতন্ত্র মানে নির্বাচন- এমন ধারণা এখনো ে বিরাজ করছে। আসলে গণতন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। নির্বাচন তো ক্ষমতার পালা বদল মাত্র। ের কারাগারে বিনাবিচারে ১২, ১৬ বছর ধরে মানুষ জেলখাটছে। তাদের প্রতি রাষ্ট্রের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?  

নাগরিক ঐক্যের আহ্ববায়ক সদ্য কারামুক্ত মান্নার সঙ্গে কথা হয় পরিবর্তন ডটকমের। তিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন।  

এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে গেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। 

কেমন আছেন- জিজ্ঞেস করতেই মাহমুদুর রহমান জানান, তার শরীরের একাধিক সমস্যার কথা। যে সমস্যা জেলে থাকাকালে তার শরীরে বাসা বাঁধে। জেলে থাকাকার সময়ে তিনি একাধিকবার চেষ্টা করেন চিকিৎসার পাওয়ার জন্য। কিন্তু সরকারের তরফ থেক বাধা দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে মান্না বলেন, ‘আমার হার্টে দু’টা ব্লক আছে। যে কোনো সময় অ্যাটাক হতে পারে। ভয় পেয়েছিলাম যখন জেলে ছিলাম। কারণ সেখানে কোনো চিকিৎসা পাওয়া যাবে না। এমনি সমস্যা খুব বেশি না। আমার শরীরে যে সমস্যা তা চিকিৎসা নিলে ঠিক হয়ে যেতো। কিন্তু জেলে থাকা অবস্থায় হাসপাতালে গিয়ে কোনো চিকিৎসা পাওয়া যেতো না। এ জন্য হার্ট ও কিডনি ড্যামেজ হয়ে গেছে। জেলে যাওয়ার আগে কিডনিতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না। এখন কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে।’  

পিজি হাসপাতালের প্রতি মান্নার একটা অভিযোগ আছে। সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলে থাকার সময় একবার চেষ্টা করলাম চিকিৎসার জন্য, ওরা এডমিট করল না। সে সময় দায়িত্বে থাকা পরিচালক আমার এডমিট প্রপোজাল বাতিল করে দেন। আমি তিনবার কার্ডিয়াক সিসিতে ভর্তি ছিলাম। এমন একজন রোগীকে তিনি ভর্তি হতে দেননি।’ 

স্বাধীন দেশে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষটা ভুলতে পারছেন না ডাকসুর সাবেক এই ভিপি। তিনি বলেন, ‘আমার চিকিৎসার জন্য জেলকে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে সরকারের তরফ থেকে এপিঠ-ওপিঠ করা হয়েছিল। কোর্ট তখন বলেছিলেন, একজনের চিকিৎসার জন্য নির্দেশ দিলে তার বিরুদ্ধে কখনো আপিল করতে দেখিনি। অবশ্য পরে সেটা কোর্ট খারিজ করে দিয়েছিলেন।’ 

‘সেই সময় আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীসের ভিত্তিতে আপনারা মামলা দিয়েছেন? তখন তারা বলেছিলেন, ে দু’টা কথোপকথনের সিডি রয়েছে। কিন্তু সেটার সাক্ষ্য আদলতে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আর সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য না থাকলে তো মামলা থাকবে না। এটাও আমি আইনগতভাবে ফেস করার চেষ্টা করবো’, বলেন মাহমুদুর রহমান মান্না।  

বর্তমানে মান্নার কিডনির সমস্যা রয়েছে। তবে কতোখানি সমস্যা সে বিষয়ে এখনো কিছু জানেন না তিনি। এছাড়া সারা শরীরে তার ব্যথা। আর এসিডিটির সমস্যাও আছে। 

কেন আপনাকে এই দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলো? জবাবে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ক্ষমতায় যখন কেউ থাকে সে সময় অনেক ধরনের লবিং কাজ করে। কে কখন কাকে বোঝায়। মূল ক্ষমতা যার কাছে তাকে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কতজন কত রকম কথা বলে। কী বোঝানো হয়েছে সেটা আমি জানি না।’

‘সেদিন ওবায়দুল কাদের আমাকে বলতে ছিলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন আমার মুক্তির জন্য আর যেন বাধা দেওয়া না হয়। তখন আমি জিজ্ঞেস করতে পারতাম কিন্তু করিনি যে, উনি কি বুঝে এটা বললেন। যেহেতু উনি সৌজন্য দেখা করতে এসেছেন তাই আমি তাকে বলতে যাইনি।’ 

‘আইনগত ভাবে বাধা দেওয়া যায় এমন কোনো বিষয় নেই যেখানে সরকারের তরফ থেকে বাধা দেওয়া হয়নি। জামিনে যেন না বের হতে পারি এর জন্য সব ধরনের চেষ্টা সরকারের তরফ থেকে করা হয়। তারপরও সরকারের তরফ থেকে এমন কথা কেন বলা হয়েছে আমি জানি না।’ 

‘সেনা উস্কানির মামলায় একজনকে গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু সে ১৬৪-এ স্বীকারোক্তি দেয়নি। সেই ব্যক্তিও ছাড়া পেয়েছে। আমি যদি সেনা উস্কানি দিতাম তাহলে দুই একজন অফিসারের নাম তো বলতে পারতো। আর এখন তো ে পোস্ট দিলেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়।’ 

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমাদের সমস্যা গণতন্ত্র মানে নির্বাচন হয়ে গেছে। আমার জীবন থেকে ২২ মাস কেন কেরে নিল এর জবাব রাষ্ট্রকে প্রথমে দিতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রের যদি কোন দায়বদ্ধতা থাকে তাহলে সেই দায়ভার নিতে হবে। এটা আমার মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার।’ 

হাসপাতালের কেবিনে সোফায় বসে সামনের টি-টেবিলে পা তুলে দিয়ে একবুক আক্ষেপ নিয়ে অনবরত কথা বলে যান মান্না। তিনি আরও বলেন, ‘দেশে প্রচুর পরিমাণে অগণতান্ত্রিক ধারা আছে, যা মানুষের ব্যক্তি, মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে। গণতন্ত্রের লড়াই হচ্ছে মানুষ যেন মানুষের মতো বাঁচতে পারে নিজের অধিকার নিয়ে। সেটা বাদ দিয়ে শুধু ভোট হয়েছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানে হলো আমার মৌলিক অধিকার। আমি যদি না খেয়ে মারা যাই তার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রকে নিতে হবে।’ 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মান্নাকে হাসপাতালে দেখতে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের ও আমি একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার কথা বলেছেন, এটা এভাবে না বলতেও পারতেন। বিএনপির মহাসচিবও আমাকে দেখতে এসেছেন। আমার ভালো লেগেছে তারা এসেছেন। আমার জাগায় অন্য কেউ থাকলে আমিও তাকে এভাবে দেখতে যেতাম।’  

এ সময় মান্না আবার জেলখানার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি জেলখানায় দেখলাম ১২ বছর, ১৬ বছর বিনাবিচারে অনেকে জেলে রয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিজে উদ্যোগ নিয়ে তাদের মুক্তি দিচ্ছেন। তবে তাদের এই ১৬ বছর কেউ ফিরিয়ে দিতে কি পারবে? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। একটা সরকার নয়, এই সময়ে অনেক সরকার ছিল। কিন্তু কোনো সরকার তাদের কাছে ক্ষমা চায়নি। সরকারের তরফ থেকে কী করলে তাদের এই ক্ষতি কিছুটা পূরণ হবে সে কথাও সরকার কাউকে জিজ্ঞেস করেনি।’ 

‘আমি গণতন্ত্রের লড়াইটাকে চরিত্রগতভাবে বদলে দিতে চাই।  গণতন্ত্রের লড়াইটা শুধু ভোটের লড়াই নয়। এটা মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে প্রত্যেককে এই লড়াই করতে হবে। যে লোকটা আওয়ামী লীগ করছে সে হয়তো দলের মধ্যে গনতান্ত্র না থাকার কারণে মৌলিক অধিকার পাচ্ছে না। আমাদের সবার অনুভর করা উচিত  যেন মানুষের মতো বাঁচতে পারি, মানুষের মতো রাজনীতি করতে পারি। এসব নিয়ে একটু সুস্থ্ হয়ে কাজ করবো’, বলেন মান্না। 

তিনি বলেন, ‘মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্র যদি তৎপর না হয় তবে মানুষ খুব অসহায় হয়ে যায়। সে যে লেভেল হোক না কেন। একটা পর্যায়ে এমন হয়েছিল যে আমি জীবিত না মৃত, আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা- এসব নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এখন আমরা অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছি। নিরাপত্তার প্রয়োজনে লড়াই করবো আমরা।’ 

সূত্র: পরিবর্তন 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.