আমেরিকায় কলম্বাসের সঙ্গে দেখা হলো না

September 15, 2015 1:13 amComments Off on আমেরিকায় কলম্বাসের সঙ্গে দেখা হলো নাViews: 21
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আমেরিকায় কলম্বাসের সঙ্গে দেখা হলো না

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

শিহাব শাহরিয়ার

গল্পটি এ রকম: দুই অধ্যাপক সকালবেলা আমেরিকার রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটছেন। দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন। এঁদের একজনের গায়ের রং শাদা, অন্যজনের শ্যামলা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একজনের গায়ের সাথে আরেকজন গা লেগে গেল। তখন শাদা চামড়ার অধ্যাপক বলল, তুমি আমাকে ধাক্কা দিলে কেন? তুমি একটা অসভ্য।
উত্তরে শ্যামলা অধ্যাপক বলল, তুমিই অসভ্য, কারণ তোমার সংস্কৃতির বয়স পাঁচশ বছরের, আর আমার সভ্যতা দুই হাজার বছরের।

গল্পটি করেছিলেন প্রয়াত নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্র দেখতে এতো সুন্দর কেন? একজনের এমন প্রশ্নের জবাবে আরেক নন্দিত কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বলেছেন, আমেরিকাকে এই সুন্দর করে গড়ে তুলতে পাঁচশ বছর সময় লেগেছে। এই আমেরিকাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু তাদের দেশের কীর্তিমান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ও জর্জ হ্যারিসন একই সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন কবিতা লিখে ও গান শুনিয়ে। ‘যশোর রোড ১৯৭১’ও ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ…’ বাঙালি চিরদিন স্মরণে রাখবে। যে দেশটি আবিষ্কার করেছিলেন কলোম্বাস। আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ের এই দেশটি পাঁচশ বছরে হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ- অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তি এবং সমরাস্ত্রেও। সেই দেশটি তৃতীয় বিশ্বের একজন নগন্য লেখক হিসেবে দেখার সাধ আমার ভেতরেও জেগে উঠল একদিন।

ঢাকাস্থ আমেরিকান দূতাবাসে ২০০৮ সালে সাক্ষাৎকার দেয়ার প্রায় এক বছর পর ভিসা পেয়ে উড়াল দিয়েছিলাম মার্কিন মুলুকে। বলছি  ২৪ জুন ২০০৯ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ও সংস্কৃতিসেবি বিশ্বজিৎ সাহার মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে সে বছর একসঙ্গে গিয়েছিলাম প্রায় তেরো জন। এঁদের মধ্যে ছিলেন কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ, কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রকাশক মনিরুল হক, সংস্কৃতিসেবী মহিউদ্দিন খোকন এবং আমি। দল বেঁধে যাওয়ার মজাই আলাদা। তবে হুমায়ূন আহমেদ স্ত্রী শাওনকে নিয়েছিলেন বিমানের বিজনেস ক্লাসে। সুতরাং তাঁর সঙ্গে যাবার সময় সেভাবে পরিচয় হয়নি। আমাদের দলনেতা ছিলেন হাসান আজিজুল হক। একটা কথা সবাই মানবেন যে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশের উদ্দেশে বের হলে যাত্রা পথে দেশের শত্রুও বন্ধু হয়ে যায়, বাড়ে আন্তরিকতা। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই-ই হলো। হাসান আজিজুল হক বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কথাশিল্পী কিন্তু তিনি যে রসিক মানুষ, বুঝলাম তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করে। প্রচুর অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর সঙ্গ দারুণ জমে উঠেছিল।

নিউজার্সি সেন্ট্রাল পার্কে বিজ্ঞাপনের শুটিং
আমাদের ট্রানজিট ছিল কাতার। সেখানে রাতে কাটিয়ে পরদিন ভোরে আবার আকাশে উড়াল দিলাম। দীর্ঘ সময় পর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যখন জে.এফ.কে বিমানবন্দরে আমরা নামলাম, তখন ভেতরে ভেতরে সত্যি পুলকিত হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, অবশেষে আমেরিকার মাটিতে পা দিতে যাচ্ছি! ইমিগ্রেশনের ঝুট-ঝামেলা শেষ করে বাইরে এসেই দেখি আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছেন কয়েকজন প্রবাসী বাঙালি। তাদের মধ্যে সাংবাদিক আমান-উদ-দৌলা অন্যতম। আমাকে নিতে এসে অপেক্ষা করছেন আমার দুজন বন্ধু, তারা আমাকে স্বাগত জানালেন। আমি তাদের গাড়িতে উঠে প্রবেশ করলাম শহরের পথে।

সূর্যের আলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। বিশ্বের বাণিজ্য-রাজধানী বলে খ্যাত নিউইয়র্ক শহরের নান্দনিক পথ ধরে যেতে যেতে মাঝে মাঝেই পেছন ফিরে তাকাচ্ছি- মাতৃভূমি বাংলাদেশের দিকে। আহা! আমার নদী-মেঘলা বাংলাদেশ। পরক্ষণেই মনে পড়ল, আমেরিকা কি আসলেই স্বপ্নের দেশ? প্রয়াত বিরলপ্রজ লেখক হুমায়ুন আজাদ যখন আমেরিকা আসেন, তার কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পাশে এক আড্ডায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার আপনি কেন আমেরিকা যাচ্ছেন?
উত্তরে তিনি বললেন, দেশটা তারা কীভাবে তৈরি করেছে, সেটি স্বচক্ষে দেখা দরকার বলেই যাচ্ছি।
আমার মনেও এ রকম একটা বাসনা ছিল।

লং আইল্যান্ডের প্রবেশ পথ
সদ্য আমেরিকায় আসা আমার সিলেটের কবিবন্ধু জিয়া উদ্দিনের ওজনপার্কের বাসায় উঠলাম আপাতত। দুপুরের খাবার সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ছুটলাম জ্যাকসন হাইটের দিকে। শুনেছি আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের সেখানে না গেলে ভাত হজম হয় না। বিশেষ করে যারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত আছেন এবং আগে বাংলাদেশে থাকতেও ছিলেন। সাবওয়ে ব্যবহার করে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বাঙালি পাড়ায়। এই অর্থে বাঙালি পাড়া যে, সেখানে গিয়ে বাঙালিপনায় অভিভূত হয়ে গেলাম। কেননা রেস্টুরেন্ট, দোকান, অফিস আর ব্যবসায়িক নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যেও যেখানে এক টুকরো বাংলাদেশ খুঁজে পেলাম। ওইটুকু জায়গাজুড়ে বাঙালিদের আড্ডার আসর সত্যি প্রাণবন্ত! প্রথম দিনই পরিচয় হলো অনেকের সঙ্গে এবং দেখা হলো যারা আগে দেশে লেখালেখি করতেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুখর ছিলেন। আবার দেখলাম সেখানেও দলাদলি আছে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দ্বন্দ্ব আছে। আমার জন্মজেলা শেরপুরের মিনা ফারাহ`র বাংলাদেশ প্লাজায় কেবলমাত্র বাঙালিদেরই সব দোকান-পাট এবং সেটিকে ঘিরেই আড্ডা চলে। উল্টা দিকে আলাউদ্দিন মিষ্টির দোকানেও আড্ডার একটি ভালো জায়গা।

বিগত সতেরো বছর যাবত যার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় প্রতিবার আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আয়োজন হয়ে থাকে সেই কর্মীষ্ঠ পুরুষ বিশ্বজিৎ সাহার প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা ফাউন্ডেশনে গেলাম। দোতলায় চমৎকার একটি বাংলা বইয়ের দোকান। এখানে চা খেতে খেতে দেখা হলো অনেক প্রবাসী বাঙালির সঙ্গে। বিশেষ করে কয়েকজন কবি ও লেখকের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আড্ডা হলো বহুক্ষণ। এই বইমেলাতেই পরিচয় হলো প্রখ্যাত লেখক সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে। তিন দিনের বইমেলায় সেমিনার, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি, গান এবং আলোচনা অনুষ্ঠানও ছিল। পর্বে পর্বে সাজিয়ে বিশ্বজিৎ সাহা অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং উত্তর আমেরিকাখ্যাত নিউইয়র্ক ও কানাডা থেকে প্রবাসী অনেক লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলার একটি প্লাটফরম তৈরি হয়েছে যেন। বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিও এলেন একদিন। দেখা হলো এক সময় ঢাকায় থাকা অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলার মতো নিউইয়র্কের এই বইমেলাটিও হয়ে উঠলো মিলনমেলা।

জ্যাকসন হাইটে শাড়ির দোকান
পরদিন সিলেটের বন্ধু ফয়সাল আমাকে নিয়ে গেল ম্যানহাটানে নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্রে। হাডসন নদী বয়ে গেছে শহরের মাঝখান দিয়ে। নদী শাসন করে কীভাবে তীরবর্তী অঞ্চলে নান্দনিক শহর গড়ে তোলা যায় টেমসের পর এই নদী দেখে তাই মনে হলো। পৃথিবীর ব্যস্ততম ম্যানহাটান। এখানে একটু বলে রাখি, নিউইয়র্কের পাঁচটি বরো (Borough) বা অঞ্চল রয়েছে। ম্যানহাটন এরই একটি বরো- একে বিশ্ব বাণিজ্যের রাজধানী বলা হয়। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ম্যানহাটানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সেন্ট্রাল পার্কে ঢুকলাম। অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম পার্কের মনোরম দৃশ্য। এখানে প্রতারিত হবার কোনো ভয় নেই। যে কারণে যার যার মতো করে সময় কাটাচ্ছে। কেউ হাঁটছে, কেউ বসে গল্প করছে, কেউ খেলাধুলা করছে আর সবচেয়ে মজা করছে ছেলেমেয়েরা। সাজানো সবুজ ঘাস আর গাছের নিবিড় সমারোহ থেকে বের হয়ে আমরা আবার হাঁটতে থাকলাম রাস্তা ধরে। তখন সন্ধ্যার আলো-আঁধারি। নিয়নগুলো জ্বলে উঠেছে। নির্জন ফুটপাত। এরপর গেলাম জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে। বন্ধু ফয়সল আমার অনেকগুলো ছবি তুলল।

আরো একটু বলে রাখি, আমেরিকায় হাঁটাহাঁটি করলে কোনো ক্লান্তি আসে না। বাড়তি এনার্জির জন্য রাস্তার ধারেই চা-পানের ব্যবস্থা আছে। আমরা মাঝে মাঝেই থেমে দোকানে ঢুকে চা-পান করছি। এরপর আমরা গেলাম কাঠের ঝুলন্ত সেতুতে। সেখানে দাঁড়িয়ে রাতের আলো ঝলমল নিউইয়র্ক দেখে অসাধারণ লাগল। আমার জন্য সবই নতুন, সবই আনন্দের। ঝুলন্ত সেতু থেকে সিএনএন ভবনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাবলাম, পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টায় কত কিছুই না করা সম্ভব! ভাবলাম ঢাকা শহর যানজটমুক্ত ও সুন্দর করতে হলে, এই আমেরিকার মতো পরিকল্পনা করতে হবে।আমাদের শহরেও সাবওয়ে ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে অনেক সুবিধা- সময় বাঁচবে, ভ্রমণও আরামদায়ক হবে।

যে কারণে যাওয়া সেই বইমেলার উদ্বোধন পরদিন। মুক্তধারার সামনে উদ্বোধনী পর্ব। সকালবেলা গিয়ে হাজির হলাম। ধীরে ধীরে এলো প্রবাসী অনেক বাঙালি। অনেক পরিচিত মুখ। ক’জনের কথা বলব? ফকির ইলিয়াস, লতা নাসিরউদ্দিন, নামজুন নেসা পিয়ারি, পূরবী বসু, হাসান ফেরদৌস, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, অনন্ত আহমেদ প্রমুখ। সকালের নরম রোদের ভেতর জাকজমকভাবে বইমেলার উদ্বোধন হলো মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সামনে। তারপর র্যা লি শেষে শুরু হলো তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার একেকটি পর্ব। একটি পর্বে আমার কবিতা পাঠ ছিল। কবিতা পড়ে হাততালি পেলাম। বিশেষ করে দুই প্রখ্যাত কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক ও পশ্চিমবঙ্গের সমরেশ মজুমদার মঞ্চ থেকে নামার সময় অভিনন্দন জানালেন। গেলাম মেলার মাঠে।

লিংকন টানেলে ঢুকছে গাড়ি
বিশ্বজিৎ সাহার প্রশংসাই করতে হয়। বাংলা একাডেমির আদলে সুদূর নিউইয়র্কে বাংলা বইয়ের এই মেলা দেখে সত্যি ভালো লাগল। মেলার মাঠে দেখা হলো এক সময়কার ঢাকার পরিচিত অনেক মুখ- সাগর লোহানী, দর্পণ কবির, তমিজ উদদীন লোদী, সালেম সুলেরী প্রমুখ। সারাদিন কাটালাম বইমেলার অনুষ্ঠান ও বইয়ের স্টলে বসে, আড্ডা দিয়ে। জম্পেশ আড্ডা। সন্ধ্যায় এলেন কবি শামস আল মমীন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন তার জ্যামাইকার বাসায়। পর পর তিন দিন তাঁর বাসায় ছিলাম। প্রতি রাতেই শিল্প, সাহিত্য আর রাজনীতি নিয়ে আড্ডা চলল। একদিন মমীন ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন লং আইল্যান্ডে। দেখার মতো সুন্দর জায়গা! পাহাড়, সমুদ্র আর সমতলজুড়ে নান্দনিক এক স্থানের নাম লং আইল্যান্ড। আমার দেখা নিউইয়র্কের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এটি। দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়েছি!

তিনদিন পর মমীন ভাই চলে এলেন ঢাকায়। আমি গিয়ে উঠলাম বন্ধু ফয়সলের জ্যাকসন হাইটের বাসায়। পরদিন ফয়সল প্রথমে আমাকে নিয়ে গেল তার ব্যবসায়িক এলাকা লিবার্টি এভিন্যুয়ে। সেখান থেকে প্যানসেলভিনিয়া ও নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যে। আরেক বন্ধু মামুন তার গাড়ি চালাচ্ছে আর আমি চোখ মেলে দেখছি আমেরিকার সৌন্দর্য। সব সৌন্দর্যের বর্ণনা করা যায় না। পরিকল্পিতভাবে যে শহর, যে দেশ আমেরিকানরা করেছে তা অপূর্ব। গাড়ি থেকে দেখে নয়ন জুড়িয়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে অনুভব করছি আমার স্ত্রী পুত্রদ্বয়কে।এমন দেখার সঙ্গী ওরা হলে আনন্দটা আরো বেশি হতো। যাই হোক, যেতে যেতে নিউইয়র্ক থেকে নিউ প্যানসেলভিনিয়ায় প্রবেশ করলাম। পথে কয়েকবার মামুন ভাই গাড়ি থামিয়ে হাইওয়ে কফিশপে ঢুকে প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ালেন। ফাঁকে ফাঁকে চলতে লাগল ক্যামেরার ক্লিক।

প্যানসেলভিনিয়াও একই সৌন্দর্যের চাদরে ঢাকা- পরিপাটি, ছিমছাম। বাড়িগুলো একই সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। মামুন ভাই তার এক আত্মীয় বাঙালির বাসায় কয়েক মিনিট কথা বললেন। তারপর আমরা রওনা করলাম নিউজার্সির উদ্দেশে। সে আরেক রকম সুন্দর। এখানে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরের নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করা, বালুময় সৈকত ও আটলান্টিক সিটি আনন্দ-উৎসব করার চমৎকার এক জায়গা। সেখানে আকর্ষণীয় খেলা হলো জুয়া। শুনেছি বিভিন্ন শহর থেকে এমনকি বিভিন্ন দেশের লোকজন এখানে জুয়া খেলতে আসে। কবি নির্মলেন্দু গুণও এখানে জুয়া খেলে লিখেছেন: ‘আমেরিকায় জুয়া খেলার স্মৃতি’নামে একটি বই। কিন্তু আমাদের জুয়া খেলা হলো না, তাতে কী? কিছু জায়গা তো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে পারবো? তাই-ই করলাম। স্বল্প সময়ে অল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে ফিরে এলাম নিউজার্সি থেকে। একই পথে ফিরছি, তবে নিউইয়র্কে প্রবেশের আগে মামুন ভাই হাডসন নদীর তলদেশে নির্মিত দেড় মাইলের লিংকন টানেল দিয়ে নিয়ে গেলেন। আর দূর থেকেই দেখলাম বিখ্যাত স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

জুলাই ৪। আমেরিকার জাতীয় দিবস। সেদিন ঢাকার তরুণ কবি ও আবৃত্তিকার বাচ্চু আমাকে নিয়ে গেলেন ম্যানহাটানে হাডসনের পাড়ে। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। বাজি ফুটিয়ে এমন আনন্দ করতে আর কখনো দেখিনি। তবে একটা কথা না বললেই নয়, আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশংসা না করে পারা যায় না। একদিন সাবওয়েতে ‘ই’ ট্রেনে যাচ্ছি জ্যামাইকা থেকে জ্যাকসন হাইটসে। বেশ কয়েকটি স্টেশন পার হয়ে যেতে হয়। সেদিন একাই ছিলাম। টিকিট নিয়ে ঠিক ঠিক উঠলাম ট্রেনে। স্টেশন গুনে গুনে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভুলে পার হয়ে গেছি কয়েক স্টেশন। ট্রেন থেকে নেমে কিছুটা নার্ভাস হলাম। ভাবছি ডাউন ট্রেনে তিন স্টেশন পিছনে যাবো। সারা স্টেশন ফাঁকা, কারণ সবাই ছুটছে- ওঠানামা করছে দ্রুত। হাঁটতে হাঁটতে একটু এগোতেই দেখা পেলাম উনিশ-কুড়ি বছরের এক যুবকের। তাকে আমেরিকান মনে হলো না। জিজ্ঞেস করতেই জানাল, সেও নতুন। ইন্দোনেশিয়া থেকে পড়াশোনা করতে এসেছে মাসখানেক আগে। সেও ম্যাপ দেখে দেখে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

তার মতো আমিও ম্যাপের দিকে চোখ রাখলাম। ডাউন ‘এ’ না ‘এফ’ ট্রেন হবে বুঝতে পারছি না। মাত্র দেড় থেকে দুই মিনিটের মতো হবে। এরই মধ্যে কোথা থেকে হুট করে জায়েন্ট ফিগারের একজন পুলিশ এসে আমার সামনে দাঁড়াল। কিছুটা ভয়ও পেলাম। কারণ নাইন-ইলেভেন তারিখটি মাথায় এলো। আমাকে সিসি ক্যামেরায় দেখে কোনো সন্দেহ করল কি না? আমি জিজ্ঞেস করার আগেই, ভারী গলায় ভদ্র ভাষায় আমাকে ইংরেজিতে যা বলল, তার বাংলা দাঁড়ায়- স্যার, আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?

স্পেস মিউজিয়াম, ডালাস
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমার গন্তব্যের কথা বললাম। সে বিনীতভাবে বলল, আপনি আমাকে অনুসরণ করুন। আমি তার পিছু পিছু যাচ্ছি, সে আমাকে ট্রেন লাইনের ওপরের ব্রিজ দিয়ে নিয়ে অন্য প্লাটফর্মে মিনিটখানেক দাঁড়াতে বলল। এরই মধ্যে একটি ফিরতি ট্রেন এসে গেল। সে ইশারা দিয়ে ট্রেনে উঠতে বলে আমাকে বিদায় জানাল। আমি যথাবিহীত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ট্রেনে উঠে গেলাম।

নিউইয়র্ক থেকে যাচ্ছি ওয়াশিংটন ডিসি হয়ে ভার্জিনিয়া। ম্যানহাটান থেকে চায়নাদের পরিচালিত বাসে। চার ঘণ্টার পথ। তবে বিশাল হাইওয়ে। গাড়ি ছুটে চলেছে, ছুটে চলেছে। মাঝে একবার বিরতি। রাস্তার দু’পাশের শহর  আর প্রকৃতির খেলা দেখে মন ভরে গেল।  দুপুরের দিকে পৌঁছলাম ডিসিতে। আমাদের জন্য ওর প্রাইভেট কার নিয়ে অপেক্ষা করছে নিজাম। নিজাম ঢাকার মিরপুরে আমার পড়শী। কিছুদিন আগে প্রবাসী হয়েছে এবং ভার্জিনিয়াতে বাড়ি কিনে স্ত্রী-কন্যাসহ বাস করছে। ওরই আমন্ত্রণেই সেখানে যাওয়া। ভার্জিনিয়ার বাঙালি কমিউনিটি আমার সৌজন্যে একটি কবিতা পাঠের আয়োজন করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা নিজাম। নিজাম আমাদের সোজা নিয়ে গেল ভার্জিনিয়ার একটি রেস্টুরেন্টে।

হাডসন নদীতে পর্যটকদের নৌভ্রমণ
সেখানে কবিতা পাঠ ও খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে গেছি অনন্যা প্রকাশনীর মালিক মনিরুল হক, মহিউদ্দিন খোকন, নিউইয়র্ক প্রবাসী টনি ও আমি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, মত বিনিময় হলো,  তারপর খাওয়া দাওয়ার পালা। এরপর নিজাম আমাদের নিয়ে গেল তার বাড়িতে। ওর বউ শিলা নানা রকমের খাবার আয়োজন করে রেখেছে আমাদের জন্য। আমরা সারারাত তাস খেলে পার করলাম আর ফাঁকে ফাঁকে চলল খাবার। স্মরণীয় এক আনন্দময় রাত কাটল ভার্জিনিয়ায়। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে- ভার্জিনিয়ায় তাস খেলার রাত।

পরদিন সকালে ফিরে যাচ্ছি নিউইয়র্কে। সকালের আলোয় ভার্জিনিয়া দেখে আমরা অভিভূত হলাম। কত দৃশ্যনন্দন হতে পারে শহর। নিজাম আমাদের ওয়াশিংটন ডিসির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পথে গাড়ি থামিয়ে নিয়ে গেল ডালাস এয়াপোর্টের পাশে স্পেস মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামের বাইরের খোলামেলা ও নান্দনিক বিল্ডিং দেখলে সকলেরই ভালো লাগবে।

টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। এটি একটি বিষয়ভিত্তিক জাদুঘর। এখানে পৃথিবীর প্রথম বিমানের অংশ থেকে সদ্য তৈরি বিমানের মডেল এবং যাবতীয় জিনিস নিদর্শন হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরের কর্মী বলেই জাদুঘরটি দেখে ভালো লাগল। এরপর ডিসিতে এসে হোয়াইট হাউসের সামনে কিছুক্ষণ ঘুরে গেলাম ভয়েস অব আমেরিকার অফিসে। সেখানে কথাশিল্পী দিলারা হাশেম বহু বছর কাজ করছেন, যিনি নিউইয়র্কে বইমেলায় আমাকে দাওয়াত দিয়ে এসেছিলেন যে, আমি যেন সময় বের করে তার ওখানে যাই। তো সেই কারণেই যাওয়া। দিলারা আপা বিনয়ী মানুষ। আমাদের ঘুরে ঘুরে সমস্ত স্টুডিও দেখালেন এবং পরিচয় করিয়ে দিলেন সকলের সাথে। এদের মধ্যে রোকেয়া হায়দার ও ইকবাল বাহার চৌধুরী এই দু’জনকে আগে থেকেই চিনি। বাকি বাঙালি ও আমেরিকান স্টাফদের সাথেও পরিচয় হলো। সবশেষে আমার একটি পাঁচ-ছয় মিনিটের সাক্ষাৎকার নিলেন দিলারা হাশেম।

ভয়েস অব আমেরিকার হেড অফিস
সাক্ষাৎকারে আমার লেখালেখি, প্রকাশনা এবং আমেরিকায় যোগ দেওয়া বইমেলা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করলেন তিনি। সত্যি আমি দারুণ অভিভূত। মনে পড়ল ব্রহ্মপুত্র নদ। নদের পাড়ের এক অজপাড়া গাঁয়ের এক নগন্য শিহাব শাহরিয়ার ভয়েস অব আমেরিকার স্টুডিওতে বসে নিজের কর্ম নিয়ে কথা বলছে! এও কী সম্ভব? সার্থক আমার জননী-জন্মদাতা, সার্থক আমার শৈশবের প্রিয় নদী। যাদের কোলে-পিঠে ছোটাছুটি করে বড় হয়েছি। ভেতরে ভেতরে আনন্দানুভূতির পাশাপাশি মনের সাহসও বেড়ে গেল, কারণ সময় অপচয় না করে যে কোনো কাজ করলে, তার স্বীকৃতি পাওয়া যায়-ই। মনে হলো আমার আমেরিকা আসার স্বপ্ন যেন পূরণ হলো।

এখানে বলে রাখি, এই সাক্ষাৎকারটি ১২ জুলাই ২০০৯ তারিখে প্রচারিত হয়েছে, যখন আমি বিমানে বাংলাদেশের পথে ছিলাম। যাহোক স্টুডিও থেকে বের হয়ে দিলারা আপার কক্ষে একটু সময় বসে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। রাস্তা ধরে আমি আর মহিউদ্দিন খোকন ভাই হাঁটছি। হেঁটে হেঁটে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে গেলাম। ডিসিতে মনে হলো লোকজন কম। বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরাও কিছুক্ষণ ঘুরে উঠে গেলাম চায়না বাসে নিউইয়র্কের উদ্দেশে। বাস থেকে নেমেই সাবওয়ে ধরে জ্যাকসন হাইটের দিকে যাবো, নিচে নেমে ট্রেন সিলেক্ট করতে আমরা একটু ইতস্তত করছি, তখন রাত দশটার মতো হবে, এমন সময় একজন আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, মনে হলো সাবওয়েতেই কাজ করেন। আমার বললাম, এক্সকিউজ মি?

অপর পাশ থেকে উত্তর এলো- বাংলায় বলেন। আমরা হতবাক এবং একইসঙ্গে পুলকিত। উনি আবার বললেন, আমার কাছে আসার দরকার নেই, আপনাদের সমস্যা দূরে থেকেই বলেন, কারণ এখানে আমার কথা বলা নিষেধ আছে। আমরা বুঝে গিয়ে দূর থেকেই জানতে চাইলাম, আমাদের ট্রেনটি কোন লাইনে দাঁড়াবে?
উনি উত্তর দিয়ে দ্রুত চলে গেলেন। আমরা সঠিক লাইন ধরে ‘ই’ ট্রেনে চলে গেলাম জ্যাকসন হাইটে।

রাতের ব্যস্ত নিউইয়র্ক শহর
দেখা হলো না নায়াগ্রা। কারণ কানাডা যাওয়ার জন্য ভিসা নিতে ম্যানহাটানে গিয়ে আবেদন করলাম কিন্তু ভিসা পেলাম না। অবশ্য তরুণ কবি হাসানআল আবদুল্লাহ আমার সঙ্গে দাঁড়ানো কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও প্রকাশক মনিরুল হককে ভিসা পেতে সহযোগিতা করলেন এবং তারা ভিসা পেলেনও। কী কারণে জানি হাসান আমাকে সহযোগিতা করলেন না। যাহোক এবারের যাত্রায় হলো না, হয়ত ভবিষ্যতে হবে। আর দেখা হলো না কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে। কারণ তিনি সিরিয়াস শারীরিক অসুস্থতায় হাসাপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছেন। বাংলা কবিতার তিন পাণ্ডব রাহমান, মাহমুদ আর কাদরী। আগের দুজনকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু কাদরী ভাইয়ের সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি। বাংলা কবিতার এই বর্ষীয়ান কবির সঙ্গে দেখা হলে ভালই হতো। যদিও আমেরিকা যাবার আগে ঢাকা থেকে আমি ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, অথচ… অথচই।

আর কলম্বাসেরও দেখা পেলাম না। দেখা পেলাম না আব্রাহাম লিংকনের। দেখা পেলাম না অ্যালেন গিন্সবার্গের। দেখা পেলাম না জর্জ হ্যারিসনের। এই অতৃপ্তি নিয়েই আমাকে ফিরে আসতে হলো আমার প্রিয় স্বদেশের মাটিতে। মনে মনে বললাম, আবার গেলে দেখা হবে নিশ্চয়ই। এই যে আশা, সেই আশাই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আমিও সেই আশায় রইলাম।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.