ইটের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ

January 9, 2016 9:51 pmComments Off on ইটের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশViews: 45
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
ইটের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ

image

প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অাসা অতিথিদের একাংশ। ছবি: প্রথম অালো

কৃষিজমি নষ্ট ও পরিবেশের ক্ষতি করে ইট তৈরি বন্ধ করতে হবে। মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে যেসব নতুন উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে, তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের যেসব বিভাগ অবকাঠামো নির্মাণ ও তা তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিয়ে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর সংশোধন করতে হবে।

আজ শনিবার প্রথম আলো ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সহযোগিতা দেয় বিশ্ব পরিবেশ তহবিল (জিইএফ) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
গোলটেবিলের শুরুতেই ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, সরকারিভাবে দেশে বর্তমানে ইটভাটার সংখ্যা ৬ হাজার ৯৩০টি আর বছরে দেশে ইটের চাহিদা দেড় হাজার কোটি পিস। এই ইট প্রস্তুত করতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়, যার বেশির ভাগই কৃষিজমির উপরিভাগ (টপ সয়েল) থেকে সংগ্রহ করা হয়। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে ইটের চাহিদা বাড়ছে।

রিজওয়ানা বলেন, ইট প্রস্তুত খাত দেশের গ্রিনহাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস; এ খাতে বছরে ২২ লাখ টন কয়লা ও ১৯ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়, যা বছরে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টন গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করে। তিনি বলেন, ভারতে ইটভাটা একটি মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বা লাল ক্যাটাগরির শিল্প এবং ইটভাটার জন্য মাটি তুলতে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করতে হয়। বাংলাদেশে এখনো তা কম দূষণকারী বা কমলা-খ হিসেবে চিহ্নিত এবং মাটি কাটতে কোনো ইআইএ করতে হয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মন্ডল বলেন, বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। ফলে কৃষি জমি থেকে মাটি নিয়ে, পরিবেশ ধ্বংস করে ও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি করে যেভাবে ইটভাটাগুলো চলছে তা চলতে পারে কি না, তা আমাদের ভাবতে হবে। সরকারি বিভিন্ন কাজে ইটের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত হওয়া উপকরণ ব্যবহারের ব্যাপারে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক তাঁর উপস্থাপনায় ইটের বিকল্প হিসেবে বেশ কিছু নির্মাণ উপকরণের ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরেন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদী খনন থেকে উঠে আসা বালু দিয়ে ইটের বিকল্প উপকরণ প্রস্তুত করার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উপকরণ দিয়ে অনেক উঁচু ভবনও নির্মাণ করা যাবে। যেখানে দেয়াল, ছাদসহ বিভিন্ন অংশে কোনো লাল ইটের ব্যবহার লাগবে না।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অসিত কুমার বাউল বলেন, সরকারের কোনো একটি মধ্যম মানের প্রকল্প ইটের বিকল্প উপাদান দিয়ে নির্মাণ শুরু করলে তা অন্যদেরও উৎসাহিত করবে। যারা ইটের বিকল্প উপাদান প্রস্তুত করছে তাদের পণ্য বিক্রি বাড়বে। ফলে বিকল্প উপকরণ খাতে বিনিয়োগে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবে।

বাংলাদেশ অটো ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নওশেরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা লাল পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে বালু দিয়ে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে ইট প্রস্তুত করেছি। ওই কারখানা স্থাপনে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছি। কিন্তু পরিবেশবান্ধব ওই সাদা ইট কেউ কিনছে না। সরকারের কথা মানতে গিয়ে আমি যেন অপরাধী হয়ে গেলাম।’

বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে ইট তৈরিতে প্রস্তুত। কিন্তু সরকারকে আগে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, পরে এসে তারা আবার যাতে না বলে এই পদ্ধতি বাতিল, এভাবে ইট প্রস্তুত করা যাবে না। ভবিষ্যতে মাটি দিয়ে আমরা ইট বানাতে পারব কি পারব না? যদি না পারি তাহলে এখনকার আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই অন্য উপকরণের কাঁচামাল ব্যবহার করে ইট প্রস্তুত করা যাবে কি না, এসব ব্যাপারে আইনে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।’

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও নির্মল বায়ু প্রকল্পের পরিচালক এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান ইটভাটার কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নানা ক্ষতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রতিবছর সাড়ে তিন হাজার মানুষ বায়ুদূষণজনিত অসুখে মারা যায়। এই বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ ইটভাটা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোলায়মান হায়দার বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ইটভাটা-সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ইটভাটাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে।

আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সোহেল আহমেদ বলেন, ইটভাটা আইনে বলা হয়েছে এ-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো পরিবেশ আদালতে মীমাংসা হবে। কিন্তু শুধু চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পরিবেশ আদালত এবং ঢাকায় আপিল আদালত আছে। তাই সব জেলায় পরিবশে আদালত স্থাপনের বিষয়টিকে আইনে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ আইনে ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইটভাটাগুলোর শ্রমিকদের অবস্থা নিয়মিত তদারকি করা উচিত।

ইউএনডিপির কর্মসূচি এনালিস্ট আলমগীর হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ইটভাটা আইন দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হলেও তা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইটের বিকল্প তৈরির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে একত্রে কাজ করার সুপারিশ করেন তিনি।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মাছুমুর রহমান ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ইটভাটাগুলোতে পরিদর্শন করতে গিয়ে অনেক সময় ইটের ঢিল খেতে হয়েছে। ফলে আইন এমনভাবে করতে হবে যাতে তা প্রয়োগের সুযোগ ও জনবল কাঠামো থাকে।

ইটভাটা এলাকার ভুক্তভোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জের অধিবাসী আলতাফ হোসেন বলেন, ইটভাটার কারণে তাদের এলাকায় রোগ-বালাই বেড়ে গেছে। আমের ওজন ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সঞ্চালনার সময় বলেন, আমাদের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ—প্রথমত, ইটভাটায় বায়ুদূষণমুক্ত ইট তৈরির প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, মাটির ইটের পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে বালিসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ইট তৈরি; তৃতীয়ত, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারকে গুণ, মান ও দাম সবদিক থেকে যে ভালো, তা ব্যাপক প্রচার করা। এগুলো করতে পারলে ইটভাটার মালিক থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউএনডিপির গ্রিন ব্রিক প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আমান উল্লাহ বিন মাহমুদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান খান, বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির মহাসচিব আবু বকর।
সূত্র: প্রথম আলো

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.