ইতিহাসে বিখ্যাত ১৫ জন মুসলিম নারী

December 12, 2014 10:07 amComments Off on ইতিহাসে বিখ্যাত ১৫ জন মুসলিম নারীViews: 347
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

ইতিহাসে বিখ্যাত ১৫ জন মুসলিম নারী

image

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ইতিহাসের বিখ্যাত কিছু মুসলিম নারীর সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেয়াটা চিত্তাকর্ষক একটা ব্যাপার হবে যাদের সম্পর্কে হয়তো আগে তারা কিছুই জানতেন না। যদিও এম্প্রেস থিওডোরা, এলিয়ানোর অফ এ্যাকুইটাইন, জোয়ান অফ আর্ক, এ্যান বলেইন, ক্যাটারিনা স্ফরযা এবং এলিজাবেথ এর মত এক্সট্রাঅর্ডিনারী মহিলারা ইতিহাসের কাছে সুপরিচিত, কিন্তু মধ্যযুগের এবং প্রাথমিক ইসলামী যুগের এদের সমগোত্রীয় কিছু মহিয়সী নারীরা অতটা সুপরিচিত নন ইতিহাসের কাছে। প্রি মডার্ন যুগের কিছু কিছু মুসলিম নারী বিদূষী গবেষক,কবি,সুফিবাদী,শাসক এবং যোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিচে তার একটা সংক্ষিপ্ত লিস্ট দেয়া হলো।

১) খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (মৃত্যুঃ ৬২০ খ্রিষ্টাব্দ)-নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে তাঁর বিখ্যাত বিয়ের আগেও তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং অভিজাত নারী হিসেবে মক্কায় সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ইসলামের নতুন বানীর প্রচার ও প্রসারের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং প্রথম মুসলিম হবার বিশেষত্ব লাভ করেন। এটাও বিশ্বাস করা হয় যে, রাসূল (সঃ) নিজেই বলেছেন [সহীহ মুসলিমের সনদে বর্ণিত], “আল্লাহ আমাকে খাদীজার চেয়ে উত্তম কোন কিছু দেননি। সে আমাকে তখন গ্রহণ করেছে, যখন সকল লোকেরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছি;যখন সবাই আমার আহবানে সন্দেহ পোষন করেছিল, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল;সে তখন আমাকে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে, যখন অন্যান্যরা আমাকে বঞ্চিত করেছে;এবং আল্লাহ শুধুমাত্র তাঁর দ্বারাই আমাকে সন্তান দিয়েছেন।”আসলেই রাসূল(সঃ) এর কন্যা ফাতিমা খাদীজার ও কণ্যা এবং তাঁর মাধ্যমেই (বিশেষভাবে তাঁর দুই পুত্র হাসান এবং হুসাইন) রাসূল (সঃ) এর বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে। এই কারনগুলাই ফাতিমা এবং তাঁর মা খাদীজা কে ইসলামে সবচেয়ে সম্মানিত দুইজন নারী ব্যাক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছে।

২)নুসাইবা বিনতে কা’ব আল আনসারিয়্যা (মৃত্যুঃ ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)- তিনি উম্মে আম্মারা নামেও পরিচিত।তিনি বনু নাজ্জার গোত্রের একজন সদস্য ছিলেন এবং মদীনার প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন । রাসূল (সঃ) এর একজন সাহাবী হিসেবে তাঁর অনেক গুণাবলী ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁকে মূলত স্মরণ করা হয় উহুদ যুদ্ধে (৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর অংশগ্রহনের কারনে,যেখানে তিনি ঢাল ও তরবারী নিয়ে কার্যতই মক্কাবাসী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।তিনি রাসূল (সঃ)কে রক্ষার জন্য নিজের শরীরকে ঢাল হিসেবে বেশ কয়েকবার শত্রুপক্ষের বর্ষা ও তীরের সামনে পেতে দেন।এটা কথিত আছে যে, তিনি ১২তম আঘাতের পরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান এবং যখন জ্ঞান ফিরে আসে (একদিন পরে মদীনায়), তখন জিজ্ঞেস করেন যে,”নবী(সঃ) কি বেঁচে আছেন?”

৩) খাওলা বিনতে আল -আযওয়ার (মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৩৯)- তিনি ও নবী করিম (সঃ) এর সময়কালীন একজন নারী। তিনি ইতিহাসে বহুল পরিচিত ইয়ারমুকের যুদ্ধে (৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে) তাঁর অংশগ্রহনের কারনে। এই যুদ্ধটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।ইসলাম বিজয়ী হবার যুগের ন্যারেটিভ অনুযায়ী, তাঁর যুদ্ধের দক্ষতা বিখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এর সমপর্যায়ের।তাঁর ব্যাপারে অনেক অতিরঞ্জিত অলঙ্কৃত এবং অস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়, যা কিনা পুরা বর্ণনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং কিছু কিছু স্কলার এর মতে তাঁর অস্তিত্বে থাকার ব্যাপারটি ই নাকি সন্দেহে নিপতিত!এত কিছুর পর ও অষ্টম ও নবম শতকের স্কলার যেমন আল -ওয়াকিদী এবং আল -আযদী তাদের লেখায় ও ঐসব যুদ্ধ বিজয়ের ইতিহাসে একজন নারী যোদ্ধার অসাধারন রণনৈপুন্যের কথা বর্ণনা করেন। যদি আসলেই তিনি অস্তিত্বে না থাকতেন, তাহলে তো তাঁর চরিত্রটি আরো বেশি লিজেন্ডারী ও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে! 

৪) আয়েশা বিনতে আবু বকর (মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৭৮)- তাঁর পরিচিতির জন্য আর কোন ভূমিকার প্রয়োজন নাই।আয়েশা ছিলেন রাসূল(সঃ)এর স্ত্রী এবং নবী(সঃ) এর মৃত্যুর পরে মুসলিম উম্মাহর উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব নারী হিসেবে তিনিই রেখেছিলেন। তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ খলীফা উসমান বিন আফফান এবং আলী ইবনে আবী তালিব এর রাজনৈতিক বিরোধিতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিলেন, এমনকি আলী ইবনে আবু তালিবের বিরুদ্ধে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পর্যন্ত দিয়েছিলেন। যদিও তিনি এই যুদ্ধে পরাজয়ের পরেই রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।কিন্তু তিনি ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা অব্যাহত রাখেন।সুন্নি ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি অন্যতম প্রধান একজন হাদীস এর রাবী (যারা হাদীস বর্ননা করেন)।অনেক দিক থেকেই তিনি সবচেয়ে বিতর্কিত নারী চরিত্র ও বটে, বিশেষত তাঁর ইসলামী জ্ঞান গবেষনা, রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরবর্তী সময়ের “ইসলামে নারীর ভূমিকা” বিষয়ের কনজার্ভেটিভ ন্যারেটিভ এর সাথে সাংঘর্ষিক।আয়িশা এর জীবনী সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন, ডেনিস স্পিলবার্গ এর রচিত চমৎকার বই, পলিটিকস, জেন্ডার এন্ড দি ইসলামিক পাস্টঃ দ্যা লিগ্যাসী অফ আয়িশাহ বিনতে আবু বকর (১৯৯৬)।

৫)যয়নাব বিনতে আলী (মৃত্যুঃ ৬৮১ খ্রিষ্টাব্দ)- তিনি নবী মুহাম্মাদ(সঃ)এর নাতনী এবং ফাতিমা(মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৩৩)এবং তার স্বামী আলী ইবনে আবি তালিব (মৃত্যুঃ ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)এর কণ্যা।তিনি আহলুল বায়তের মধ্যে সবচ্বেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত এবং তিনি কারবালা ম্যাসাকার (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ)এর সময়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। কারবালা ম্যাসাকারে হুসাইন ইবনে আলী এবং তাঁর ৭২ জন ভাতিজা ও অন্য ভাইয়েরা নিহত হন উমাইয়্যা শাসক এর সেনাপতির হাতে।একটা সময় তিনিই ছিলেন আহলুল বায়তের কার্যকরী নেতৃত্বের অবস্থানে এবং তাঁর ভাইয়ের উদ্দেশ্যের প্রধান রক্ষাকবচ। কুফায় তিনি তাঁর ভাতিজা আলী এবনে আল হুসাইন কে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন, যখন তাদের সকলকে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার দরবারে শাস্তির জন্য তোলা হয়। তিনি সেখানে এমন ধৈর্য্যশীল এবং জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন যা খলীফাকে বাধ্য করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার জন্য এবং তাদেরকে কারবালায় ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁর শক্তিমত্তা,ধৈর্য্য এবং জ্ঞান তাঁকে প্রাথমিক ইসলামিক যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নারীতে পরিণত করেছে।দামেস্কে তা৬র মাজার এখনো শিয়া ও সুন্নী উভয় শ্রেনীর মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধাপূর্ন জায়গা, যা প্রমান করে যে তাঁর লিগ্যাসী আসলে পুরা মুসলিম উম্মাহর কাছেই স্বীকৃত।

৬) রাবি’য়া আল আদাউইয়া – মুসলিম ইতিহাসের একজন অন্যতম প্রধান মরমী (সুফী),যিনি দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার পূর্বে শৈশবকালের বেশির ভাগ অংশই কাটান দক্ষিণ ইরাকে দাস হিসেবে । তাঁকে “স্বর্গীয় ভালোবাসা” –নামক সুফি মতবাদের একজন অন্যতম পুরোধা মনে করা হয় যার মৌল বিষয় হলো- “খোদা কে ভালোবাসতে হবে শাস্তির ভয় বা পুরস্কারের আশায় নয় বরং স্বীয় স্বার্থেই” । যা তিনি তার একটি কবিতায় এভাবেই চয়ন করেছেন–

“হে খোদা! আমি যদি শপি তোমায় দোযখের ভয়ে , পোড়াইও আমায় অগ্নিশিখায়, 

যদি শপি তোমায় বেহেশতের আশায় , তবে যেনো বেহেশ্ত হতে ত্যাজ্য কোরো আমায়। 

তবে যদি এই প্রার্থনা হয় শুধু তোমারই জন্যে

তব নিত্য সৌন্দর্য্য হতে আমায় করো না বঞ্চিত।”

যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, রাবিয়ার মতো একটি জীবনীকে কেন তার এই আধ্যাতিক জীবনালিপিতে প্রবেশ করানো হল, তখন ত্রয়োদশ শতাব্দীর পন্ডিত ফরিদুদ্দিন আত্তার(১২২০ খ্রিঃ) ব্যাখ্যা করেন, “মহানবী(সঃ) নিজে বলেছিলেন, ‘স্রষ্টার নিকট তোমার বাহ্যিকতা মূল্যবান নয়। এ বিষয়টি মূলতঃ ব্যক্তির অন্তর্নিহিত অভিপ্রায়ের উপরই নির্ভর করে। মানবজাতিরতাদের উদ্দেশ্যঅনুযায়ীপুনরুত্থিত করা হবে।’ আর তাছাড়াও মহান ও পবিত্র স্বত্ত্বা ‘আয়িশা বিনতে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) এর মতো একজন নারীর নিকট থেকে যদি দ্বীনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আমরা গ্রহণ করতে পারি, তবে ‘আইশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) এর দাসীসমতুল্য কারো কাছে থেকেও ধর্মীয় নীতিমালা গ্রহনযোগ্য হতে পারে।”

৭. কর্দোবার লুবনা(৯৮৪ খ্রিঃ) প্রকৃতপক্ষে স্প্যানিশ অঞ্চলের একজন দাসী লুবনা কর্দোবার উমাইয়্যাদ রাজপ্রাসাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি খলিফা আব্দুল রাহমান(৯৬১ খ্রিঃ) এবং তার পুত্র আল হাকাম বিন আব্দুল রাহমানের(৯৭৬ খ্রিঃ) দূর্গ তত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ গণিতবিদ ছিলেন এবং রাজকীয় গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন যা কি না ৫০০,০০০ বই নিয়ে গঠিত ছিল। বিখ্যাত আন্দালুসি বিশেষজ্ঞ ইবনে বাশকুয়ালের মতে, “তিনি সাহিত্য, ব্যকরণ এবং কবিতায় পারদর্শীতা হয়ে ওঠেন। গণিতের উপর তিনি যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার জ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। উমাইয়্যাদ রাজপ্রাসাদে তার মত বিজ্ঞ কেউ ছিল না।” [IbnBashkuwal, Kitab al-Silla (Cairo, 2008), Vol. 2: 324].

৮. আল-মালিকা আল-হুররা আরওয়া আল-সুলায়হি(১১৩৮ খ্রিঃ) তার পুরো নাম ছিল আরওয়া বিনতে আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল-সুলায়হি। ১০৬৭ থেকে ১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি স্বীয় অধিকার বলে ইয়েমেনের রাণী হিসেবে শাসন করেছিলেন। তিনি একজন ইসমাঈলী শিয়া ছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিজ্ঞান, কোরআন, হাদিস, সাহিত্য এবং ইতিহাসে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। পুরাতত্ত্ববিদরা( Chroniclers) তাকে অসাধারন জ্ঞানী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি যে তার নিজের অধিকারবলেই রানী ছিলেন এই মতের উপরে জোর পাওয়া যায় এ কারণে যে, ফাতিমীয় বংশের খলিফা আল-মুন্তাসির বিল্লাহ-এর নামের পরেই শুক্রবারের খুতবায় তার নাম উল্লেখ করা হতো। ফাতেমীয় খলিফা আল মুন্তাসির, আরওয়াকে ইয়েমেনি ফাতিমীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ধর্মীয় পদবী (যা হলো হুজ্জা) দেন।। ইতিহাসের প্রথম কীর্তিমান মুসলিম নারী তিনিই ছিলেন যাকে ইসলামের এতোবড় পদমর্যাদা দান করা হয়। তার সময়ে ইসমাঈলি মিশনারীদের পশ্চিম ভারতে পাঠানো হয়েছিল, সেখানকার গুজরাটে একটি বিশাল ইসমাঈলি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (যা ইসমাঈলীয় বোহরা বিশ্বাসের শক্তিশালী কেল্লায় পরিণত হয়)। প্রকৃতপক্ষে, ইয়েমেন ইসমাঈলি মুভমেন্টের জন্য শক্তিশালী হয়ে উঠে। তিনি১০৯৪ এর ফাতিমীয় মতবিরোধে আল মুস্তা’য়ালি (পরবর্তীতে আল-তায়্যিব)-কে সমর্থনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন এবং তার বিশাল প্রভাবের অন্যতম উদাহরণ হলো তার রাজত্বের অধীনে থাকা ইয়েমেন ও ভারতের কিছু অংশ তাঁর মতকেই সমর্থন দান করেন। ফলে তায়্যিবি ইসমাঈলী আন্দোলনের কেল্লায় পরিণত হয় ইয়েমেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেনের অবকাঠামোতে অনেক কাঠামোগত নির্মাণকাজ ও উন্নতি ঘটে যা মুসলিম বিশ্বের উন্নতির ইতিহাসে একাঙ্গিভুত করা হয়। তিনি ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের একমাত্র এবং মুসলিম রানীর উদাহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

৯) ফাতিমা বিনতে আবি আল-কাসিম ‘আবদ আল-রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে গালিব আল-আনসারি আল-শাররাত (মৃত্যুঃ ১২১৬ সাল): তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দির প্রথমদিকে আল-আন্দালুস (স্পেন) এর সে সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী মহিলা। তার আইনতত্ব ও আইনদর্শন ছাড়াও সুফিবাদের সাথে সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে যে ইসলামিক বিজ্ঞানে তার জ্ঞানের পরিধি ছিলো অনেক বিশাল। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক আবু আল-কাসিম ইবনে আল-তাইলাসান এর মাতা। আন্দালুসি ইমাম আবু জাফর আল-গামাতি (মৃত্যুঃ ১৩০৯ সাল) এর মতেঃ “তিনি তার পিতার তত্ত্বাবধানে অসংখ্য বই মুখস্থ করেছিলেন যার মাঝে আছে আল-মাক্কি-এর তানবিহ, আল-ক্বুদা’য়ি-এর আল-শিহাব, ইবনে ‘উবাইদ আল-তুলাইতালি-এর আল-মুখতাসার। তিনটি গ্রন্থকেই তিনি হৃদয়াঙ্গম করেছিলেন। তিনি আল-কুরআনও মুখস্থ করেছিলেন আবু ‘আব্দুল্লাহ আল-মাদাওয়ারি, যিনি ছিলেন ‘আব্দাল’ [সুফিবাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ] এর একজন অন্যতম সাধক, তাঁর তত্ত্বাবধানে। তিনি তাঁর পিতার সাথে সহীহ মুসলিম, ইবনে হিশাম রচিত সিরাতুন্নবী, আল-মুবাররাদের আল-কামিল, আল-বাগদাদী-এর নাওয়াদির এবং অন্যান্য গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করেছিলেন।” []আবু জাফর আহমদ ইবনে ইব্রাহীম আল-গামাতি, কিতাব সিল্লা আল-সিল্লা (বৈরুত, ২০০৮), পৃষ্ঠাঃ ৪৬০]

১০) রাজিয়া সুলতান (মৃত্যুঃ ১২৪০): ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সালে দিল্লীর সুলতানাতের শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁর পিতা, শামস আল-দীন ইলতুতমিশ (রাজত্বঃ ১২১০-১২৩৬), তার মৃত্যুর আগেই রাজিয়া-কে তার সুলতানাতের উত্তরাধিকারী করেছিলেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি অনেক স্কুল ও গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছিলেন উত্তর ভারতে। সৈন্যবাহিনী নিয়ন্ত্রণে, রাজসিংহাসনে আরোহণ ও পিতার রাজপোষাক পরিধানসহ সকল বিষয়ে, তিনি সুলতানের মতোই ব্যবহার করেছিলেন। চরম সন্ত্রাসপূর্ণ সময়েও তিনি জনসম্মুখে প্রকাশ্যে বের হতেন। ১২৪০ সালে রাজ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দ্বারা অপসারিত ও নিহত হন যারা একজন নারীর দ্বারা রাজক্ষমতা পরিচালনার বিরোধী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে শেষ করা সম্ভব হবে না, কিন্তু আপনারা যদি তার সম্পর্কে আরো জানতে চান তাহলে তার সম্পর্কে রফিক জাকারিয়ে-এর লেখা Razia: Queen of India (1966) পড়তে পারেন। 

১১) শাজার আদ দূর্‌ (মৃ. ১২৫৭): আইয়্যুবি সুলতান আল-সালিহ্‌ আইয়্যুব (রা. ১২৪০-১২৪৯) এর বিধবা স্ত্রী হিসেবে মিশরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। খুব সম্ভবতঃ তুর্কি বংশদ্ভুত দাস কন্যা হিসাবে আয়্যুবি রাজদরবারে জীবন শুরু করেন। ১২৫০ খৃস্টাব্দে তিনি মিশরের সুলতানা হিসাবে এর শাসনভার গ্রহন করেন। তার রাজত্বকালকে সাধারনত মিশরে মামলুক শাসনের সূচনা হিসাবে ধরা হয়। তিনি সপ্তম ক্রুসেডের সময় মিশরের উত্তরাঞ্চল রক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখেন। এ সময় (যদিও উনি নিজে অনুপস্থিত ছিলেন) ক্রুসেডারদের ফারিস্কারের যুদ্ধে (১২৫০ খৃ) পরাজিত ও ফ্রান্সের রাজা নবম লুইকে বন্দি করা হয়। তিনি রাস্ট্রের প্রকৃত প্রধান হিসাবে খুত্‌বায় তার নাম নেয়া হত ও মুদ্রায় “মুসলমানদের রাণী” হিসাবে তার নাম খোদাই করা থাকতো। রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে একজন মহিলার সরাসরি শাসন মেনে নেয়া লোকেদের জন্য কষ্টকর বিধায় নানারকম চাপের কাছে নতি স্বীকার করে উনি তার সেনাপ্রধান ইজ্‌-আদ দীন আইবক এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইজ্‌-আদ দীন আইবক পরিণত হন প্রথম মামলুক সুলতান এ। এ পরিণয় সত্বেও শাজার আদ দূর্‌ তার প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হন। এমনকি রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রে সুলতানের সাথে সাথে তার নামও লেখা থাকতো। রাজনৈতিক ও অন্য এক মহিলার সাথে সম্পর্ক থাকার কারনে বা আরেক স্ত্রী গ্রহনের সিদ্ধান্তের জন্য (এ ব্যাপারে নিশ্চিত জানা যায় না) ১২৫৭ সাল নাগাদ তিনি ইজ্‌-আদ দীনকে হত্যার মাধ্যমে অপসারিত করেন। এ ব্যাপার প্রকাশিত হলে পরে শাজার আদ দূর্‌কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে তার রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। 

১২) জয়নাব বিন্‌তে আহমদ (মৃ. ১৩৩৯): তাকে চতুর্দশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী আলেমদের মধ্যে একজন ধরা হয়। হাম্বলী ফিকাহশাস্ত্রের অনুসারী ছিলেন আর দামেস্কে বসবাস করতেন। তিনি হাদিসশাস্ত্র সহ আরও অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘ইজাযা’ (ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট) লাভ করেন। চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে তিনি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, শামায়েলে তিরমিযী, ইমাম তাহাবীর শর্‌হে মা’আনী ইত্যাদি গ্রন্থ শিক্ষা দিতেন। তার ছাত্রদের মধ্যে উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (মৃ ১৩৬৯), তাজ উদ্‌ দীন সুবকি(মৃ ১৩৫৫) আর ইমাম আয্‌ যাহাবীর (মৃ ১৩৪৮) নাম পাওয়া যায়। ইবনে হাজার আসকালানী উল্লেখিত অনেক ইস্‌নাদে জয়নাব বিন্‌তে আহমদের নাম রয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের অনেক মহিলা আলেমদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। হাদিসশাস্ত্রে মুসলিম মহিলাদের অবদান বিস্তারিত জানতে আসমা সাইয়্যেদ এর লেখা “Women and the Transmission of Religious Knowledge in Islam (2013) ও মোহাম্মদ আকরাম নাদ্‌ভির লেখা “Al-Muhaddithat: The Women Scholars of Islam (2007)” এই বই দুটি দেখা যেতে পারে। 

১৩) সাইয়্যেদা আল হুর্‌রা (মৃ. ১৫৪২): নামের অর্থ “স্বাধীনা নারী”। ছিলেন ষোড়শ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুসলিম মনীষীদের অন্যতম। ১৪৯২ সালে খ্রীস্টানদের স্পেন জয়ের পর আদি বাসস্থান গ্রানাডা থেকে পালিয়ে অন্য অনেকের মত মরক্কোতে বসতি স্থাপন করেন। এখানে তিনি ও তার স্বামী উত্তর প্রান্তের শহর তিতুয়ান শাসন করতেন। ১৫১৫ সালে তার স্বামীর মৃত্যু ঘটলে তিনি একাই শাসন পরিচালনা করতেন। ধীরে ধীরে আরও মুসলমান এ শহরে আশ্রয় নেয়া শুরু করলে ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে এর জনসংখ্যা ও শক্তি উভয়ই বৃদ্ধি পায়। আন্দালুসিয়ার পতন ও সেখানে মুসলিমদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা সহ অন্যান্য কারনে তিনি জলদস্যুতার পথ বেছে নেন এবং তিতুয়ানকে একটি শক্ত নৌ ঘাঁটিতে পরিণত করেন। তিনি আলজিয়ার্স এ বিখ্যাত অটমান অ্যাডমিরাল থেকে দস্যুতে পরিণত হওয়া হায়রেদ্দিন বারবারোসার সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। একসাথে তারা উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের স্পেনীয় রাজশক্তির উপর মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম হন। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে এই যে তার সম্পর্কে মুসলিম সূত্রগুলোর নিরবতা। তার সম্পর্কে বেশিরভাগ সূত্রগুলো আমরা পাই স্পেনীয় ও পর্তুগীজ দলিল দস্তাবেজ থেকে। এগুলোতে আইবেরিয়ান প্রনালীর দক্ষিণপ্রান্তে সফল দস্যু প্রধান হিসাবে তার চালানো অভিযানগুলোর ধ্বংসলীলা ফুটে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি মরক্কোর ওয়াত্তাসীও সুলতান আবুল আব্বাস মুহাম্মদ (রা. ১৫২৬-১৫৪৫) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে মহিলা দস্যু অ্যান বনি ও মেরি রীড অনেকের কাছে সমাদৃত হলেও সাইয়্যেদা আল হুর্‌রার কথা খুব কম লোকেরাই জানে। তার জীবনী আরও গভীরভাবে জানতে ফাতিমা মারনিসির “The Forgotten Queens of Islam (1977)” বইটির সাহায্য নেয়া যেতে পারে। স্প্যানিশ ভাষাভাষীরা দেখতে পারেন Rodolfo Grim Grimau রচিত “Sayyida al-Hurra, Mujer Marroqui de Origen Andalusi,” Anaquel de Estudios Arabes (2000): 311-320.

১৪) পরী খান খানম (মৃ ১৫৭৮): সাফাভি রাজকন্যা ও শাহ প্রথম তাহমাস্‌প (১৫২৪-১৫৭৬) এর স্ত্রী। ইরানের ষোড়শ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের অন্যতম। শিক্ষিত মহিলা কবি হিসাবে বিখ্যাত ও প্রচলিত ইসলামী শাস্ত্র যেমন ফিক্‌হে পারদর্শী। তিনি সাফাভি সিংহাসনে তার ভাই দ্বিতীয় ইসমাইল এর আরোহন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ইসমাইল এর সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে পরী খান খানমের প্রভাব হ্রাস পায়। অবশেষে ইসমাইলের উত্তরাধিকারী, মোহাম্মদ খোদাবন্দের শাসনামলে পরী খানকে হত্যা করা হয়। তার সম্পর্কে আরও জানতে দেখা যেতে পারে, Shohreh Gholsorkhi’র “Pari Khan Khanum: A Masterful Safavid Princess,” Iranian Studies 28 (1995): 143-156.

১৫) কোসেম সুলতান (মৃ ১৬৫১): ইংরেজি ভাষাভাষীদের অনেকেই প্রথম সুলায়মান (১৫২০-১৫৬৬) এর সম্রাজ্ঞী রোজেলানা বা হারেম সুলতান সম্পর্কে জানলেও কোসেম সুলতান সম্পর্কে অজ্ঞাত। তিনি ছিলেন অটোমান সুলতান প্রথম আহমেদ (১৬০৩-১৬১৭) এর সহধর্মিনী। অটোমান ইতিহাসে সুলতান ৪র্থ মুরাদ (১৬২৩-১৬৪০) ও সুলতান ইব্রাহিম (১৬৪০-১৬৪৮) এর মা ও সুলতান ৪র্থ মাহমুদ (১৬৪৮-১৬৮৭) এর দাদী হিসাবে তিনি ছিলেন সম্ভবতঃ সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর প্রভাবশালী নারী। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন গ্রিসের অধিবাসী ও তার নাম ছিল অ্যানাস্তাসিয়া। অল্প বয়সেই তিনি বন্দিনীরূপে অটোমান প্রাসাদে নীত হন এবং সেখানে তিনি সুলতান প্রথম আহমেদের উপপত্নীরূপে পরিগনিত হতেন। Cristoforo Valier নামে এক সমসাময়িক সূত্র হতে জানা যায় যে ১৬১৬ সাল নাগাদ, সুলতানের সহকারীদের মধ্যে কোসেম ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং “তিনি যা চাইতেন সুলতান তাই করতেন ও সুলতানের হৃদয় ছিল সম্পূর্নরূপে তার বশীভূত, তার কোন চাওয়াই অপূর্ন থাকেনি”। ১৬২৩ থেকে ১৬৩২ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ সিংহাসনে আসীন নাবালক সন্তান ৪র্থ মুরাদ এর অভিভাবকরূপে দায়িত্ব পালন করেন। ১৬৫১ সালে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত অটোমান রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ন প্রভাব রাখেন। কোসেম সুলতান ও অটোমান রাজকীয় হারেম সম্পর্কে জানতে লেসলি পিয়ার্সের The Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire (1993) বইটি দেখা যেতে পারে।

লোন ওয়াচ থেকে বিডিটুডের জন্য অনুবাদ করেছেন রিয়াজ হাসান

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.