ঈদের ছুটিতে দার্জিলিংয়ে এক চক্কর

July 7, 2015 8:00 pmComments Off on ঈদের ছুটিতে দার্জিলিংয়ে এক চক্করViews: 9
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

ঈদের ছুটিতে দার্জিলিংয়ে এক চক্কর

ফেরদৌস জামান :রাইজিংবিডি ডট কম

ফেরদৌস জামান : ভেবে দেখুন গ্রীষ্মের উত্তপ্ত শহর পেছনে ফেলে আপনাকে নিয়ে আপন গতিতে  ছুটে চলেছে বলেরো জীপ। গাড়িটি শহর ছেড়ে ক্রমেই প্রবেশ করছে চা-বাগান ঘেরা পথে। মনে হবে দু’পাশে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যেনো সবুজ গালিচা বিছানো। দূরের আবছা কালো পহাড়ের প্রাচীর নিকটবর্তী হচ্ছে ক্রমশ। জীপটি কিন্তু তারই শরীর বেয়ে ছুটে চলেছে উপরে। আন্দাজ করে উঠতে পারবেন না, এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়ে গেছে বেশ খানিকটা সময়। সমুদ্র সমতল থেকে ১৫০০ ফুট উচ্চতায় পাংখাবাড়ি গিয়ে মিলবে বিরতি। মূলত এখান থেকেই সমতলের প্রকৃতির সঙ্গে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। থেকে থেকে মেঘের ফাঁক দিয়ে রৌদ্রের উঁকিঝুকি। গাছ-লতাপাতার প্রজাতি অন্যরকম হতে শুরু করবে। বহু পুরনো পাইন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। পথের পাশের দেয়ালে ফুটে থাকে নানা রঙের অজস্র ফুল। ভাবলে সমস্যা নেই, প্রকৃতির এ সবই আপনার জন্য। প্রচণ্ড গড়মে দুই-চার দিনের জন্য প্রকৃতির শীতল পরশ নিতে কাছেপিঠে দার্জিলিংয়ের বিকল্প নেই। ধরুন এবারের ঈদের ছুটিতে আপনি পরিবারসহ শৈল শহর দার্জিলিং যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। সে কথা মাথায় রেখে আপনার ভ্রমণ সহায়ক কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো এই লেখায়।
ঘুম স্টেশন : মেঘ রোদ্দুরের খেলা শেষ। এখানে শুধু মেঘের একক রাজত্ব। ঘুম স্টেশনের গায়ে সেটে থাকে কয়েক পড়ত মেঘের আবরণ। মনে রাখবেন, এখানে কিন্তু ঘুমানো ভীষণ অন্যায়! এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম রেল স্টেশন। উচ্চতা ৭,৪০৭ ফুট। অল্প কয়েক বছর আগেও নিয়মিত ট্রেন (টয় ট্রেন) চলতো। বর্তমানে ট্রেনের সিডিউল বেশ অনিয়মিত। তাতে অবশ্য পর্যটকদের ক্ষোভের শেষ নেই। তবে ভাগ্য যদি ভালো হয়ে থাকে, আপনার কপালে মিলেও যেতে পারে। দার্জিলিং নাকি এক সময় সিকিমের অংশ ছিল। ১৮৩৫ সালে স্বাস্থ্য নিবাস স্থাপনের জন্য তৎকালীন ইংরেজ সরকার সিকিম রাজার কাছ থেকে দার্জিলিংসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি পাহাড় বার্ষিক তিন হাজার টাকা খাজনায় নিয়ে নেয়। পরে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ইংরেজরা এটি অধিকার করে। এ সবই আসলে এত উঁচুতে রেলস্টশন স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য।

গোল্ডেন সানরাইজ :  গোল্ডেন সানরাইজ বা সোনালি সূর্যদয় দেখতে চাইলে শেষ রাতে গিয়ে আপনাকে টাইগার হিলে বসে থাকতে হবে। কীভাবে যাবেন, সে ভাবনার কোনো কারণ নেই। যে হোটেলে উঠবেন সেখানে বলে রাখলে আগের রাতেই পেয়ে যাবেন টাইগার হিল যাওয়ার জন্য জীপ। দার্জিলিং ঘুরে দেখার ব্যবস্থাপনা বেশ সুশৃঙ্খল। দর্শনীয় কয়েকটি স্থান মিলিয়ে একটি প্যাকেজ। একের পর এক সব জায়গা ঘুরে দেখতে প্যাকেজ মূল্য দুইশ রুপির বেশি নয়। আর আপনারা যদি পাঁচ-সাতজন হয়ে থাকেন তাহলে তো কোনো কথাই নেই, রিজার্ভ করে নিন একটি জীপ। প্রথম দিন প্যাকেজ ভ্রমণ করে পরের দিন থেকে নিজের মত ঘুরতে থাকুন একটির পর একটি স্পট। টাইগার হিল থেকে সূর্যদয় দেখা দার্জিলিং-এর প্রধান আকর্ষণ। ভ্রাম্যমান কফি বিক্রেতা গোর্খা নারীরা বার বার এসে কফির অফার করে বলবে, ‘লিজিয়ে না সার এক কাপ!’ ঠকঠক শীতের কাঁপুনি থেকে বাঁচতে ধোঁয়া তোলা কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সূর্যদয় দেখার অনুভূতি সত্যি অন্যরকম। সূর্যালোকের প্রথম স্পর্শে সোনালি রঙে ঝলসে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ ঢাকা শ্বেত শরীর। সে দৃশ্য ভুলবার নয়।

ঘুম মনাস্ট্রি : অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপনা, যা আসলে একটি বৌদ্ধ মন্দির বা বিহার। এখানে রয়েছে বুদ্ধের ১৫ ফুট উঁচু এক বিশাল মূর্তি। সংরক্ষিত আছে বহু বৌদ্ধ শাস্ত্র, নেপালি ভাষায় লিখিত তাল পাতা আর কাগজের বহু পুঁথি। দিবা-রাত্রী জ্বলছে প্রদীপ। মহামতি বুদ্ধের মূর্তির সামনে বসে একাগ্র মনে আরাধনা আর মন্ত্র উচ্চারণ করে গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত লামাগণ। মন্দিরের ভেতরে বাইরে মেঘ, প্রদীপ আর বৈদ্যুতিক আলোর সে এক অপরূপ ব্যাঞ্জনা!
বাতাসিয়া : গোর্খা ওয়ার মেমোরিয়াল বাতাসিয়ায় প্রবেশ মূল্য দশ রুপি। বাতাসিয়া অর্থ বায়ুময় স্থান। এটি এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। রেল চালু থাকলে যাত্রা পথে চক্রাকারে দেখে নেয়া যায় এই ঐতিহাসিক স্থান। বর্তমানে রেল বন্ধ থাকায় লাইনের উপর দিয়ে বসে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান। বিক্রি হয় স্থানীয়দের হাতে বোনা টুপি, মাফলার, গায়ের চাদরসহ অনেক কিছু। ৪০ রুপি ভাড়ায় মেলে গোর্খা নারী পুরুষের ঐতিহ্যবাহী  পোশাক। ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখতে গোর্খা পোশাকে নিজের ছবি তুলে রাখতে পারেন।

সরবরী নাইটিঙ্গেল পার্ক :  এই পার্কটির রাতের আকর্ষণ চমৎকার। মেঘের ছোঁয়া লেগে নানা রঙের বাতিগুলো থেকে অনবরত বিচ্ছুরিত হয় এক স্বপ্নীল কারুকার্য। মাঝখানে উন্মুক্ত মঞ্চ ঘিরে সাজানো আসন আপনারই জন্য। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় গোর্খা নৃত্য।

চুনু সামার ফলস :  দার্জিলিংয়ের আর এক আকর্ষণ চুনু সামার ফলস। প্রচলিত নাম রক গার্ডেন। শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৮ কি.মি.। সমস্ত পথই ভীষণ উপরের দিকে চলে গেছে। এখানে রয়েছে বিশাল এক ঝরনা। ঝরনার পাশ ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে পথ উঠে গেছে অনেক উপরে। সেখানে ফুটে থাকে নানান সব পাহাড়ি ফুল, যা হয়তো কোনো দিনই দেখেননি। পর্যটকের উপচে পরা ভিড় অথচ সমস্ত কোলাহল চাপা পড়ে সেই ঝরনার গর্জনে।

পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্ক : এটি দার্জিলিংয়ের নামকরা দর্শনীয় জায়গা। পার্কে প্রবেশের পর থেকে পথের দুই ধারে বিশাল পাইন গাছ ঘিরে দীর্ঘ জাল। জালের মধ্যে নানান রকম প্রাণি-  সাইবেরিয়ান বাঘ, কমন লেপার্ড, কালো ভালুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। গাছের ফাঁকে বসে থাকে হিমালয়ান রেড পান্ডা- এটি এখন বিলুপ্তপ্রায়।

হিমালয়ান মাউন্টেনারিং ইন্সটিটিউট : পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্কের মধ্যে দিয়ে এগুলেই হিমালয়ান মাউন্টেনারিং ইন্সটিটিউট। এটি পর্বতারোহীদের নিকট তীর্থক্ষেত্র। পর্বতারোহণ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া হয়। এ ছাড়াও পর্বতারোহণের জন্য যা কিছু লাগে তা দিয়ে একটি জাদুঘর আছে সেখানে। সংরক্ষিত আছে প্রথম এভারেস্টজয়ী তেনজিং নোর্গের ব্যবহৃত পর্বতারোহণের জিনিসপত্র।

দার্জিলিংয়ের পথে পথে দেখার অনেক কিছু রয়েছে। পৃথিবীখ্যাত চা-বাগান, ব্রিটিশ আমলের স্কুল, কলেজ, গীর্জা, মন্দির ইত্যাদি। এখানকার মেঘ এক পরম বিস্ময় এবং রহস্যময়- ঘরের মধ্যে মেঘ, পথে মেঘ। আবার হঠাৎ দেখা যাবে রোদ, পরক্ষণেই আবার দেখা যাবে মেঘে ঢাকা অন্ধকার। গোর্খাদের সুশৃঙ্খল জীবন ও সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে পরিপূর্ণ স্বপ্নের দেশ দার্জিলিং।
ভিসা নেবেন যেভাবে : ভিসা আবেদনের জন্য প্রথমে ই-টোকেন সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। অথবা আপনার শহরে খোঁজ করে দেখতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠান সেবাটি দেয় কিনা। স্থান ও মৌসুম ভেদে প্রতি টোকেনের জন্য খরচ হবে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। টোকেন পেতে সময় লাগবে ৩-৪ দিন। টোকেনে প্রদেয় তারিখ ও সময় মোতাবেক গুলশান এক নম্বর ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারে প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে হবে। গুলশান ছাড়াও ধানমন্ডি দুই নম্বরে ভিসা ইস্যু সেন্টার এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া মতিঝিল শাখায় কাগজপত্র জমা দেওয়া যাবে। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভিসা ইস্যু সেন্টার রয়েছে। ভিসা ফি ছয়শ টাকা।

যেভাবে যাবেন :  ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি শ্যামলী-বিঅরটিসি’র সরাসরি বাস সেবা চালু রয়েছে। ঢাকা-শিলিগুড়ি-ঢাকা ফিরতি টিকিট মূল্য ৩৫০০ টাকা। এ ছড়াও যদি ভেঙে ভেঙে যেতে চান তাহলে ঢাকা থেকে লালমনিরহাট বুড়িমাড়ী স্থলবন্দর হয়ে যেতে হবে। কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এসআর, শ্যামলী ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া- এসি ৮৫০, ননএসি ৬৫০ টাকা। সীমান্তের ওপার চেংরাবান্ধা থেকে প্রতিনিয়ত শিলিগুড়ির বাস পাওয়া যায়। এ ছাড়াও জীপ বা এ্যাম্বাসেডর রিজার্ভ করা যেতে পারে। শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি দার্জিলিংয়ের জীপ পাওয়া যায়। সেখানে এক থেকে দেড় হাজার রুপির মধ্যে হোটেল রুম পাওয়া যাবে।

দেশের কিছু ট্যুর অপারেটর কোম্পানি ঈদ উপলক্ষে দার্জিলিং ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছে। তাদের মাধ্যমেও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ দিনের প্যাকেজে চাহিদা অনুযায়ী জনপ্রতি ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগবে।
যোগাযোগ :
মেকমাই ট্রিপ বিডি
ফোন : ০২-৯১৪৫৯৬৫, ০১৯৭৭১১৫০০৮
www.makemytrip-bd.com

সাউথ এশিয়ান টুরিজম
ফোন : ০১৭১৬-৪৬৬০৪৭
www.southasiantourism.com

সাবরিনা ট্রাভেল এ্যান্ড টুরস
০১৭৭৪-৭৫৫১৩১
sabrinatravels1141@gmail.com

রেইনবো হলিডেজ
ফোন : ০২-৯৫৭০৬৩৭, ০১৮৪২-৩৮৩৩৯৯
www.rainbowholidays.com

 
রাইজিংবিডি/ঢাকা/তাপস রায়

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.