কাতারে বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ: কেন কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ?

June 6, 2017 10:41 amComments Off on কাতারে বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ: কেন কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ?Views: 32
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

কাতারে বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ

আরব বিশ্বের সাত দেশের সঙ্গে দোহার সৃষ্ট সংকটের কারণে কাতারে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

দোহায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাতার ও উপসাগরীয় অন্যান্য কয়েকটি দেশের মধ্যে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এছাড়া কাতারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, পরিস্থিতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ ও যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দূতাবাস বাংলাদেশিদের করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা প্রদান করবে। একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একক কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে।

qatar-pressউপসাগরীয় অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনের অভিযোগ এনে সোমবার কাতারের সঙ্গে সাতটি দেশ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। দেশগুলো হচ্ছে- সৌদি আরব, মিসর, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, ইয়েমেন ও মালদ্বীপ। মুসলিম ব্যাদারহুড, ইসলামিক স্টেট (আইএস), অাল কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে কাতারের সহায়তার অভিযোগে দোহার সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক ছিন্নের এ ঘোষণা আসে।

কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা এসব দেশের নাগরিকদের কাতার সফর, সেখানে বসবাস করা বা কাতার হয়ে অন্য কোনো দেশে যাওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এছাড়া অাকাশসীমা ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে প্রতিবেশি দেশগুলো কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে বাইরের দেশগুলো থেকে কাতারে পণ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে কার্যত একঘরে হয়ে পড়া কাতারে শ্রমিক পাঠানো স্থগিত করেছে ফিলিপাইন। গত বছরের এক পরিসংখ্যান বলছে, কাতারে ১ লাখ ৩১ হাজার ফিলিপাইনের শ্রমিক রয়েছে। তবে মোট দুই লাখের বেশি শ্রমিক সেখানে আছে বলেও মনে করেন ফিলিপিনো শ্রমিক নেতা সিলেভেসট্রি বেল্লো।

সম্পর্ক ছিন্নের পরপরই বেড়ে গেলো তেলের দাম

Qatar-oil-Tankকাতারের সঙ্গে সৌদি আরবসহ চার আরব দেশ সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে। তেলের দাম এক শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি মূল্য ৫০ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে।

অবশ্য ট্যাংকারযোগে শিপমেন্ট করা হচ্ছে যে সব তেল তার ওপর বর্ধিত মূল্যের প্রভাব পড়েনি। ভবিষ্যতে সরবরাহ করা হবে যে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল তার দাম এক শতাংশ বেড়েছে।

অবশ্য, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি দেশ কাতার এবং এ গ্যাসের বাজারে সৌদি ও তার মিত্র দেশগুলোর সিদ্ধান্ত কি প্রভাব ফেলবে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের নিয়মিত ক্রেতা মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে মিসর এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতিমাসে ৮ লাখ ৫৭ হাজার ঘন বর্গ মিটার তরল গ্যাস কাতার থেকে আমদানি করে দেশটি। বিদ্যুৎ উৎপাদনেই এ গ্যাসের সিংহ ভাগ ব্যবহার করে মিসর।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে মাসে এক লাখ ৯০ হাজার ঘন মিটার গ্যাস কাতার থেকে আমদানি করে।

পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অন্যতম সদস্য দেশ কুয়েত এখনো সৌদি আরবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়নি। দেশটি ২০১৬ সাল থেকে মাসে দুই লাখ ৮৩ হাজার বর্গ মিটার গ্যাস কাতার থেকে আমদানি করে।

এদিকে, ভারত বা জাপানের মতো এশিয় ক্রেতাদের ওপর সৌদি সিদ্ধান্তের কোনো প্রভাব পড়বে না বলে বাণিজ্যিক মহলগুলো মনে করছে।

আতঙ্কিত কাতারে খাবার মজুদের হিড়িক

qatar-foodখাদ্য সরবরাহ ও মজুদে কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে কাতারের বাসিন্দাদেরকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (এমইসি)। মালদ্বীপসহ আরব বিশ্বের প্রভাবশালী সাত দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় মন্ত্রণালয়ের এই আশ্বস্তে স্বস্তি পাচ্ছেন না দেশটির নাগরিকরা।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে কার্যত একঘরে হতে যাওয়া আমদানি নির্ভর কাতারের বাসিন্দাদের মধ্যে খাদ্য সংকটের তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা নিত্য-খাদ্য ও পণ্য সামগ্রী কিনতে প্রচুর ভিড় জমাচ্ছেন দেশটির বিভিন্ন শপিং সেন্টার ও দোকানে। কাতারের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, প্রধান খাদ্য সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে, কারণ অধিকাংশ পণ্যের দাম নির্দিষ্ট।

মন্ত্রণালয় বলছে, রমজান শুরুর আগে আগেই চার শতাধিক পণ্যের দাম কমিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া ৫০ হাজারের বেশি আইটেমের পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে কাতারের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বিভিন্ন উৎস ও দেশ থেকে সব ধরনের পণ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি অব্যাহত রয়েছে। স্থলপথে কাতারে পৌঁছানো পণ্য-সামগ্রী নিয়েই মানুষের প্রধান দুশ্চিন্তা। আমদানিকৃত পণ্যের বেশিরভাগই বিমান ও সমুদ্র পথে কাতারে পৌঁছে। দেশটির মাংসের বড় একটি অংশের চাহিদাই মেটানো হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত পশু থেকে। শাক-সবজির বৃহৎ একটি অংশ আসে বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে আকাশপথে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনের অভিযোগ এনে সোমবার কাতারের সঙ্গে সাতটি দেশ তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়। দেশগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, মিসর, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, ইয়েমেন ও মালদ্বীপ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্যাদারহুড, ইসলামিক স্টেট (আইএস), অাল কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে কাতারের সহায়তার অভিযোগে দোহার সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক ছিন্নের এ ঘোষণা আসে।

এর পর পরই সন্ধ্যার দিকে কাতারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দিতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে আতঙ্কিত দেশটির নাগরিকরা পণ্য-সামগ্রী কিনতে ভিড় জমান সুপার মার্কেটে। মুহূর্তের মধ্যেই চাল, ডাল, তেল, মাংস এবং অন্যান্য খাদ্য সামগ্রীর সংগ্রহের ব্যাপক তোড়জোড় দেখা যায়। এসব পণ্যের অধিকাংশ আমদানি করা হয় বিমান ও সমুদ্র পথে। তবে মঙ্গলবার সকালের দিকে সুপার মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত পণ্য থাকায় আতঙ্ক কিছুটা কমে যায়।

এদিকে, আরব বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর নাগরিদের জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে কাতার। মধ্যপ্রাচ্যের নজিরবিহীন এ সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে নাগরিকদের পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মঙ্গলবার কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে নাগরিক ও সেদেশে বসবাসকারী প্রবাসীদের এ নজরদারির তথ্য জানিয়ে দিয়েছে। মোবাইলে ফোনে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় বলা হয়েছে, দেশে বসবাসকারী সব নাগরিক ও প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগের সব ধরনের মাধ্যমে নজরদারি করছে মন্ত্রণালয়। এতে দেশবিরোধী, অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভূয়া বার্তার আদান-প্রদান থেকে বিরত থাকতে ও আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের অ্যাজেন্ডা সমর্থন ও গণমাধ্যমে কাতার প্রচার করছে বলে অভিযোগ এনে সম্পর্ক বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি দোহা সঙ্গে আকাশ ও স্থলসীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে রিয়াদ। মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও সব ধরনের যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়া সৌদিতে কাতারের বিমানসংস্থা কাতার এয়ারওয়েজের লাইসেন্স বাতিল ও কার্যালয় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে রিয়াদ। দেশটির নাগরিকদের ওই সাত দেশ ত্যাগের জন্য ১৪ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

কাতার সম্পর্কে পাঁচটি বিস্ময়কর তথ্য

qatarমধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার এখন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রতিবেশী দেশগুলো কাতারের সাথে সম্পর্ক ছেদ করায় বেশ বিপাকে পড়েছে ছোট দেশ কাতার।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ কাতার। এর বাইরে কাতার সম্পর্কে মানুষ কতটা জানে? এখানে কাতার সম্পর্কে পাঁচটি তথ্য তুলে ধরা হলো, যেগুলো আপনি হয়তো জানেন না।

প্রথমত: কাতারে জনসংখ্যায় নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি। দেশটির মোট জনসংখ্যা ২৫ লাখের মতো। কিন্তু এর মধ্যে নারীর সংখ্যা সাত লাখের কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারে হঠাৎ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ২০০৩ সালে দেশটিতে মোট জনসংখ্যা ছিল সাত লাখের নিচে। কিন্তু ২০১৬ সালে মোট জনসংখ্যা হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ।

অভিবাসী শ্রমিকদের দ্বারা কাতারে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। গত দশ বছরে বিপুল পরিমাণে বিদেশী শ্রমিক কাতারে এসেছে। এদের বেশিরভাগই যুবক এবং পুরুষ। ফলে মোট জনসংখ্যায় নারী-পুরুষ ভারসাম্য নেই।

দ্বিতীয়ত: গত এক দশকে লন্ডনে প্রচুর সম্পদ কিনেছে কাতার। কয়েকমাস আগে কাতারের অর্থমন্ত্রী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাজ্যে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫ থেকে ৫১ বিলিয়ন ডলারের মতো। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরো পাঁচ বিলিয়ন পাউন্ডের মতো সম্পদ ক্রয়ের ইচ্ছা আছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটির।

তৃতীয়ত: পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ কাতার। ছোট এ দেশটিতে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুতের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। ২০১৬ সালের এক হিসেবে দেখা যায়, কাতারে মাথাপিছু আয় প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার ডলার। কাতারের পরে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গ। তাদের মাথাপিছু আয় কাতারের চেয়ে ২০ হাজার ডলার কম।

তবে কাতারের সম্পদ বণ্টন বেশ অসামঞ্জস্য। দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির সম্পদের পরিমাণ ২.৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু কাতারে একজন অভিবাসী শ্রমিকের মাসিক আয় ৩৫০ ডলার।

চতুর্থত: কাতার একটি রক্ষণশীল দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশটি শিল্পকলার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে। দেশটি নামী-দামী বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। কাতার আমিরের বোন চিত্রকর্মের জন্য বছরে এক বিলিয়ন ডলারের মতো ব্যয় করেছে বলে জানা যায়। রাজধানী দোহায় ইসলামিক আর্ট জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রায় ১৪০০ বছরের নানা ধরনের চিত্রকর্ম এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।

পঞ্চম: শিল্পকর্মের প্রতি কাতারের আগ্রহ জাদুঘর থেকে বিস্তৃত হয়ে খোলা জায়গায় এসেছে। যারা দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছেন তাদের চোখে বিশাল আকৃতির একটি ভাল্লুকের শিল্পকর্ম চোখে পড়েছে নিশ্চয়ই। প্রায় এক দশক আগে সুইজারল্যান্ডের একজন ভাস্করের তৈরি এ ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জের তৈরি এবং এর ওজন প্রায় ২০টন। ২০১১ সালে নিউইয়র্কে এক নিলাম থেকে প্রায় সাত মিলিয়ন ডলার খরচ করে এ ভাস্কর্যটি ক্রয় করে কাতার সরকার।

কেন কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ?

সিমেয়ন কের
০৭ জুন ২০১৭
 

সৌদি আরবসহ বিশ্বের সাতটি দেশ কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা নজিরবিহীন। দেশগুলো শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কই ছিন্ন করেনি, তারা কাতারের সঙ্গে বিমান, জল ও স্থলপথে সব যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছে। সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ এনে গত সোমবার উপসাগরীয় এই রাষ্ট্রকে একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি আরব, বাহরাইন, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন, লিবিয়া ও মালদ্বীপ।

কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেওয়ার পর চারটি দেশ কাতারের নাগরিকদের সেসব দেশ থেকে চলে যাওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয়। এদিকে সৌদি, মিসর, আমিরাত ও বাহরাইনের নাগরিকদের জন্য কাতার ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাতারের জনসংখ্যা মাত্র ২৭ লাখ, যাদের অধিকাংশই প্রবাসী। ব্যাপক গ্যাসসম্পদ দেশটিকে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে একটিতে পরিণত করেছে এবং দেশটি এশিয়া ও ইউরোপের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। লন্ডনের শার্ড বিল্ডিং ও হ্যারোডস ডিপার্টমেন্ট স্টোরসহ যুক্তরাজ্যে কাতারের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশেও কাতার বিনিয়োগ করেছে।

কাতারের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব কী?

কাতারের ওপর এর প্রভাব হবে গভীর। কেননা, কাতার তার খাদ্যসামগ্রী আমদানির অর্ধেকটা করে সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্তপথে। স্থলপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তা কাতারের নির্মাণশিল্পের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং ২০২২ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য দোহার সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বিমান চলাচলের ওপরও প্রভাব পড়বে। কাতার এয়ারওয়েজ বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান বিমান সংস্থাগুলোর একটি। সৌদি আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় এর পশ্চিমমুখী ফ্লাইটগুলো আর চলতে পারবে না। ইতিমধ্যে কাতারগামী বিমান চলাচল বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান সংস্থা এমিরেটস ও ইতিহাদ।

রিয়াদ ও আবুধাবি বলেছে, দোহায় পৌঁছানোর জন্য অন্যান্য দেশ যাতে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার না করে, সে জন্য তারা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে এসবের বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে কাতারের ডলফিন পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ স্থগিত হয়ে যেতে পারে, যা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশটি।

কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?

ইসলামি আন্দোলনগুলোর প্রতি কাতারের সমর্থন তার আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ক্ষুব্ধ করেছে। এ জন্য কাতারের ব্যাপক সমালোচনা করেছে আবুধাবি। আবুধাবির মতে, কাতারের রাজনৈতিক ইসলামকে প্রশ্রয় দেওয়া, বিশেষ করে ইসলামি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড ও ফিলিস্তিনের জঙ্গি সংগঠন হামাসের সঙ্গে সখ্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার বহু বছর ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধে লিপ্ত। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেই যাচ্ছে। ব্রাদারহুডের আধ্যাত্মিক নেতা শেখ ইয়াসেফ আল-কারাদায়ির বাড়ি কাতারে। দেশটি সৌদি ও আমিরাতের নাগরিকসহ রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে।

অভিযোগ আছে, লিবিয়া, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ইসলামপন্থী দল ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে কাতার। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটাতে চায় যে ইসলামপন্থী দলগুলো, কাতার তাদের সবচেয়ে বড় সমর্থক। সমালোচকেরা বলছেন, ইসলামপন্থীদের সমর্থনের মধ্য দিয়ে কাতার পরোক্ষভাবে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করছে, যেমন তাহরির আল-শামের মতো সংগঠন, যারা পণের বিনিময়ে বন্দীদের মুক্তি দেয়।

সৌদি আরবও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থক। তবে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ইসলামপন্থীদের প্রত্যক্ষ সহায়তা দেওয়া বন্ধ করেছে। পশ্চিমা সমালোচকেরা সন্ত্রাসীদের সহায়তা করার জন্য দোহার কড়া সমালোচনা করেছেন। মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও লিবিয়ায় ইসলামি বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়ার জন্য কাতার ও তুরস্ককে অভিযুক্ত করেছে।

আঞ্চলিকভাবে দোহার সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। তারা উভয় সিরিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইসলামি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার নীতি গ্রহণ করেছে। তুরস্ক কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটিও খুলেছে।

কাতার অবশ্য বলছে, ইসলামি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার মধ্যে কোনো ভুল নেই; কেননা তাদের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে দেশটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

কাতার ও ইরানের মধ্যে সংযোগগুলো কী কী?

রিয়াদ-আবুধাবি জোট সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের শিয়াদের প্রতি দোহার সমর্থন বৃদ্ধি পেতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ইরানের সঙ্গে গ্যাসফিল্ড ভাগাভাগি করায় ইরানের প্রতি সুন্নি রাষ্ট্র কাতারের নমনীয় অবস্থানেরই ইঙ্গিত দেয়।

দোহা সব সময় তার নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য গর্ব করে। কারণ, লেবানন থেকে সুদান পর্যন্ত আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে দোহা তার প্রমাণ রেখেছে। কিন্তু দোহার সমালোচকেরা বলছে, এ ধরনের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা উপসাগরীয় সুন্নি দেশগুলোর স্বার্থে সক্রিয়ভাবে আঘাতকারী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের নামান্তর মাত্র।

কাতারের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে কোটি কোটি ডলার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে জিম্মি করা কাতারিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে কাতার এই অর্থ দেয়। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও বাহরাইনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য রিয়াদ তেহরানকে অভিযুক্ত করেছে। তারা এটাকে ইরানের অনধিকার চর্চা হিসেবে অভিহিত করেছে।

কেন এখন?

কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের প্রচারযুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। দোহা দাবি করে, গত মাসে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির একটি বক্তব্য প্রকাশ করার পর তাদের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়েছে। আমির তাঁর ওই বক্তব্যে মুসলিম ব্রাদারহুড এবং ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং সৌদি আরবের সমালোচনা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় সৌদি আরব। সম্ভবত এ ঘটনাই সৌদি আরবসহ অন্য ছয় দেশকে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে উৎসাহিত করেছে।

কাতারের রাষ্ট্রমালিকানাধীন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরা এই সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের  রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবার লিখিত ই-মেইলের ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই মেইলটি হ্যাকাররা হ্যাক করেছে। এবং সেখানে কাতারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের জন্য নীলনকশার উল্লেখ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের মধ্যে এই দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দেয় সৌদি আরবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর। সৌদি আরব সফরের সময় ট্রাম্প আরব বিশ্বে ইরানের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রিয়াদের নেতৃত্বকে সমর্থন করেন। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, তেহরানের প্রভাব মোকাবিলায় এবং আইএসের মতো সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা ঐক্য গড়ে তুলবে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের আশাবাদ সত্যি হতে যাচ্ছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রোকেয়া রহমান, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে নেওয়া।

সিমেয়ন কের: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর উপসাগরীয় প্রতিনিধি।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.