কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দর্শনের অপূর্ব অনুভূতি

October 25, 2015 11:17 pmComments Off on কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দর্শনের অপূর্ব অনুভূতিViews: 53
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
কুয়াকাটায় দর্শনের অপূর্ব অনুভূতি
কামরান চৌধুরী

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূতি সাগরকন্যা । বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সমুদ্রসৈকত পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই মৌসুমি পাখির কলরবে মুখোরিত সমুদ্রতট। কুয়াকাটায় কয়েকদিন থেকে প্রাণভরে একসঙ্গে অনেক কিছু উপভোগ করতে পারেন। সৈকতের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে দিগন্তজোড়া আকাশ আর সমুদ্রের রাশি রাশি নীল জল। নীল জলের ঢেউ সাদা ফেনা তুলে ভেঙে পড়ছে সৈকতে। এমন মনকাড়া অনেক দৃশ্য চোখে পড়বে সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। দেখা যাবে সমুদ্রের পেট চিরে গনগনে লাল সূর্যোদয় এবং দিন শেষে সমুদ্রের বক্ষে হারিয়ে যাওয়ার অসাধারণ দৃশ্য। সৈকতের পাশে সুন্দর ঝাউবন দেখতে পাবেন। ঝাউগাছের অপরূপ দৃশ্য, স্নিগ্ধ হাওয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা শরীর-মনে মেখে নিতে পারেন। নারকেল বাগানও দেখার মতো, সঙ্গে পিকনিক স্পট।
কুয়াকাটা সৈকতের পূর্বে গঙ্গামতির খাল পাড়ে বনাঞ্চল দেখতে পাবেন। বিভিন্ন গাছপালা ছাড়াও রয়েছে বনমোরগ, বানর ও নানারকম পাখি। গাছগুলো বেশ বড় বড়, চরের হাজার হাজার পাখি এলাকাকে মোহনীয় করেছে। সমুদ্রস্নান ভ্রমণকে আনন্দমুখর করে তোলে। বিশাল বিশাল ঢেউ বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ে। চাঁদনি রাতে বেলাভূমিতে বন্ধু বা আপনজন মিলে আড্ডায় অভাবনীয় আনন্দ পাবেন। মুগ্ধতায় কয়েকদিন কাটাতে পারেন কুয়াকাটায়। বেড়িবাঁধ দিয়ে একটু দূরে মোটরসাইকেলে চলে যান সমুদ্র ও নদীর মোহনায়। যার একপাশে নদী অন্যপাশে সমুদ্র ধারা বইছে, হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে অতি ভোরে সূর্য ওঠা অবলোকন করুন, পানি থেকে কীভাবে সূর্য উঠছে এ দৃশ্য একবার দেখলে সারাজীবন মনে থাকবে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পূর্বে গজমতি ও গঙ্গামতির জঙ্গল ছাড়িয়ে সামনে গেলে দেখতে পারেন লাল কাঁকড়ার দ্বীপ। হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার বিচরণ দেখা যায় ছোট্ট এ দ্বীপে। সাধারণত শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকে, সে সময় স্পিডবোটে যেতে পারেন। পাবেন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন কিছু দেখার অফুরান আনন্দ।কুয়াকাটা নামকরণের উৎস প্রাচীন কুয়াটি এখনও রয়েছে। আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা রাজা মংয়ের নেতৃত্বে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে কুয়াকাটায় বসতি গড়েন। তারা মিঠা পানির জন্য কুয়া খনন এবং নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টি গড়ে তুলেছেন। সৈকতের কাছেই রাখাইন জনগোষ্ঠীর বাসস্থল কেরানিপাড়ার শুরুতেই সীমা বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে রয়েছে কুয়াটি। প্রাচীন এ মন্দিরে রয়েছে প্রায় ৩৭ মণ ওজনের অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি। রাখাইন পল্লীতে দেখতে পাবেন নারীরা কাপড় বুনছে। এদের তৈরি শীতের চাদর বেশ আকর্ষণীয়। রাখাইনদের গৃহ, তাদের আচার-আচরণ দেখতে পাবেন। পাশেই রাখাইন নারীরা দোকানে পসরা সাজিয়েছে, শৌখিন ও ব্যবহার্য দ্রব্যাদি উপহার হিসেবে কিনে আনতে পারেন প্রিয়জনদের জন্য।সাগর পাড়েই দেখবেন শত বছরের পুরনো নৌকা। সম্প্রতি মাটি খনন করে উত্তোলন করা হয় ৭২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২২ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ৯০ টন ওজনের নৌকাটি। জিরো পয়েন্টের দেড় কিলোমিটার দূরে রয়েছে ইকো পার্ক। কুয়াকাটা ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতায় এর আয়তন ৭০০ একর। নারকেল, ঝাউ, আমলকী, বকুল, অর্জুন, জারুল, হিজল, চালতা, পেয়ারা, জাম, হরীতকী, নিম, করমচা, মহুয়া, কামিনী, শেফালি ইত্যাদি গাছে ভরা পার্কটি। কুয়াকাটার ৪ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বৃহৎ মাছ ব্যবসা কেন্দ্র আলীপুর। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যায়। আলীপুর বন্দর ঘুরে দেখতে পারেন বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ এবং মাছের বিশাল আয়োজন ও কারবার। সমুদ্রসৈকত থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে মিশ্রিপাড়ায় বৌদ্ধ মন্দির দেখতে পারেন। এখানে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। অনতিদূরে আমখোলা পাড়ার রাখাইন বসতি দেখলে ভালো লাগবে। কলাপাড়া-খেপুপাড়া সড়কের পাখিমারা বাজারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর, যেখানে পানি ও নদীর নানা উপকরণ সাজানো রয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদীর পানি ও ছবি, নদীর ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে। নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে নির্মিত জাদুঘরে হারিয়ে যাওয়া নদী, বর্তমান নদী ও নদীর ভবিষ্যৎ কী হবে তা জানা যায়।কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিমে ইঞ্জিনবোটে নদী পার হলেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, যা ফাতরার বন নামেও পরিচিত। জায়গাটা সুন্দরবনের মতো হলেও হিংস্র বন্যপ্রাণী নেই। এতে বনমোরগ, বানর, বন্য শুকর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। সারাদিনের জন্য বোট ভাড়া করে ঘুরে ঘুরে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। সৈকতের পশ্চিমে গড়ে উঠেছে শুঁটকিপল্লী। এখানে গেলে দেখা যাবে জেলেদের মাছ শুকানোর নানা কৌশল। কম দামে উন্নতমানের শুঁটকি কিনে আনতে পারেন নিজের, পরিবারের ও আত্মীয়স্বজনের জন্য।ঢাকা থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার। কমলাপুর থেকে বিআরটিসি, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে দ্রুতি, সুরভী, সাকুরা ও অন্যান্য বাসে সরাসরি কুয়াকাটা যেতে পারেন। সময় লাগে ১২ থেকে ১৩  ঘণ্টা। সদরঘাট থেকে লঞ্চে পটুয়াখালী গিয়ে সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা যাবেন। দ্বীপরাজ, সৈকত, সুন্দরবন, রেডসান ইত্যাদি লঞ্চ রয়েছে। এছাড়া বরিশাল থেকে বাসে পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা যেতে পারেন। খুলনা থেকেও কুয়াকাটা যাওয়া যায় বিআরটিসি বাসে। কুয়াকাটায় সরকারি ডাকবাংলো, বিভিন্ন দফতর ও জেলা পরিষদের দুইটি রাখাইন কালচারাল একাডেমির রেস্ট হাউসে থাকতে পারেন। রয়েছে , , নীলাঞ্জনা, , , , বিচ হ্যাভেন, , , স্মৃতিসহ আরও কিছু হোটেল ও মোটেল।
কামরান চৌধুরী : এনজিও কর্মকর্তা ও পর্যটন লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.