আত্মোৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জনে কোরবানি

September 23, 2015 4:25 pmComments Off on আত্মোৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জনে কোরবানিViews: 15
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আত্মোৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জনে কোরবানি

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী |
 অলংকরণ : তুলি
শব্দের অর্থ হলো আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নৈকট্য অর্জন ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায় বলা হয় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা। কোরবানি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘সব সম্প্রদায়ের জন্য আমি কোরবানির বিধান (নিয়ম) দিয়েছি, তিনি (আল্লাহ) তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা: হজ, আয়াত: ৩৪) মানব ইতিহাসের সূচনাকাল থেকে চলে আসা একটি , যা মূলত স্রষ্টার উদ্দেশে সৃষ্টির নজরানা।মানব ইতিহাসের প্রথম কোরবানিদাতা হলেন আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল (রা.) ও কাবিল। বাবা আদম (আ.) বললেন, তোমরা আল্লাহর নামে কোরবানি করো, যার কোরবানি কবুল হবে, তার দাবি গ্রহণযোগ্য হবে। অতঃপর তারা উভয়ে কোরবানি দিলেন। হাবিলের কোরবানি কবুল হলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)–কে বলেন, আদম (আ.)-এর পুত্রদ্বয়ের বৃত্তান্ত আপনি তাদের শোনান। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো আর অন্যজনেরটা কবুল হলো না।…অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন। (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ২৭) এতে প্রতীয়মান হয়, কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য , অর্থাৎ খোদাভীতির প্রয়োজন। লোকদেখানো কোনো আল্লাহ তাআলা কবুল করেন না।

আজকের মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রথা চলমান আছে, এ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি কী? এটা কোথা থেকে এসেছে?’ প্রিয় নবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এটা হলো তোমাদের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত বা আদর্শ। এই আদর্শ অনুসরণের জন্যই আল্লাহ পাক তোমাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন।’ সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে?’ উত্তরে মহানবী (সা.) বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমে তোমরা একটি করে নেকি পাবে।’ সাহাবায়ে কেরাম বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা যদি ভেড়া কোরবানি করি? ভেড়ার তো অনেক বেশি পশম, এর বিনিময়েও কি আল্লাহ আমাদের সওয়াব দেবেন?’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর ভান্ডার অফুরন্ত। কেউ যদি তাকওয়ার সঙ্গে আল্লাহর নামে ভেড়া কোরবানি করে, তাহলে তার বিনিময়ে তাকে সে পরিমাণ সওয়াব আল্লাহ অবশ্যই দান করবেন।’

কোরবানির ইতিহাস পবিত্র কোরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে এক সহিষ্ণু পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে আমি জবাই করছি, তোমার অভিমত কী?” সে বলল, “হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” যখন তাঁরা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন, তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহিম! আপনি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলেন! এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কোরবানির বিনিময়ে। আমি এটা পরবর্তীদের স্মরণে রেখে দিলাম। ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য অভিবাদন! আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও শুভেচ্ছা।’ (সূরা: সাফফাত, আয়াত: ১০০-১১০)

প্রতিটি মানুষ ইবাদত করবে শুধু তার মহান মালিক আল্লাহ তাআলার। মুমিন বান্দা তার কোনো ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করবে না। অর্থাৎ ইবাদত হতে হবে সব ধরনের শিরকমুক্ত, শুধু এক আল্লাহর উদ্দেশে। মহান রাব্বুল আলামিন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে সে শিক্ষাই দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: ‘বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।’ এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল কোরবানি শুধু আল্লাহর উদ্দেশেই হতে হবে। লৌকিকতা বা সামাজিকতার উদ্দেশে নয়। সুতরাং কেউ যদি লাখ টাকার গরু দিয়ে লোকদেখানোর জন্য অথবা নিজের দম্ভ-অহংকার প্রকাশের জন্য কোরবানি দেয়, তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে ওদের গোশত-রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা: হজ, আয়াত: ৩৭)

প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্বাস্থ্য-চেহারা ও ধন-সম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। সুতরাং কোরবানির আগেই কোরবানিদাতার নিয়ত বা সংকল্প শুদ্ধ করে নিতে হবে।

কোরবানি ইসলামি ঐতিহ্য। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত। এখানে সুন্নত অর্থ তরিকা বা পদ্ধতি, আদর্শ বা অনুসৃত বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘ফা ছল্লি লিরব্বিকা ওয়ানহার’ অর্থাৎ হে নবী (সা.)! আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। (সূরা: কাওসার, আয়াত: ২)। এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কোরবানি একটি ওয়াজিব (আবশ্যিক) বিধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে-কাছে না আসে। (ইবনে মাজা)

কোরবানির তিন দিনে (১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এ উভয়ের যেকোনো একটির মূল্য সমপরিমাণ ব্যবসাপণ্য বা নগদ অর্থ) থাকে, কোরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, একান্ত অপারগ না হলে কোরবানি করা তাদের জন্যও উত্তম। কারণ, হাদিস শরিফে আছে, কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানির চেয়ে শ্রেষ্ঠ আমল আর নেই। কোরবানির রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) জীবনের পড়ন্তবেলায় প্রিয় সন্তান, কলিজার টুকরা শিশু ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে তাঁর রাস্তায় কোরবানির মাধ্যমে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কালজয়ী অনন্য যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তা পছন্দ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত কোরবানিকে পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয় করে দেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এবং শিখতে পারে যে অর্থ-সম্পদ, টাকাপয়সা আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে ব্যয় করতে হয়। এমনকি প্রয়োজনে আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও যেন মানুষের কোনো দ্বিধা-সংশয় না থাকে। তা ছাড়া কোরবানি আত্মত্যাগের প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন। মানুষের ষড়্রিপু তথা হিংসা, লোভ, কাম, ক্রোধ, ত্যাগের মাধ্যমে মনের পশুবৃত্তি তথা কুপ্রবৃত্তিকে জবাই করতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে ধনলিপ্সা, যশলিপ্সা, লোভ-লালসা, জাগতিক কামনা-বাসনা ও দুনিয়াপ্রীতিকে কোরবানি করে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য অর্জন করা কোরবানির শিক্ষা।

ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করা, সকালে গোসল করা, মিসওয়াক করা, সম্ভব হলে নতুন জামা অথবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তায় ফিরে আসা, আসা-যাওয়ার সময় তাকবির তাশরিক (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ) বলা, খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা ইত্যাদি।

কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা সুন্নত এবং অতি উত্তম আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেটপুরে খায় কিন্তু তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। (তিরমিজি)
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.