চালকরা কি ভাড়াটে খুনি হতে যাচ্ছে?

September 28, 2015 11:29 pmComments Off on চালকরা কি ভাড়াটে খুনি হতে যাচ্ছে?Views: 13
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
চালকরা কি ভাড়াটে ি হতে যাচ্ছে?

জননিরাপত্তার খবর নেই। চালক নিরাপত্তায় ব্যস্ত। ‘জনতুষ্টি’তে মন নেই। চালকতুষ্টিতে গদগদ। জীবন বাঁচাতে তোড়জোড় নেই। অথচ চালক বাঁচাতে এক পায়ে খাড়া। এ একটি ক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারের যেন অভিন্ন নীতি। প্রকৃতপক্ষে গাড়িচালকদের বিচিত্র আবদারের কাছে সরকারগুলো যেন ‘কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা’! নইলে সড়ক দুর্ঘটনায় যে দেশে প্রতিদিন আটজন প্রাণ হারায়, সেদেশে নিয়মনীতির তোয়াক্কা ছাড়া ছয় মাসে ৩২ হাজার পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়ন হয় কী করে? কিংবা সাড়ে ৩ লাখ ফিটনেসহীন গাড়ি রাস্তা দাপায় কী করে। (প্রথম আলো ২৫, ২৮ জুলাই, ২০১৫)। অবশ্য ওই আবদার না গিলেও উপায় নেই। চালকদের হাতে যে পরিবহন ধর্মঘটের ‘পারমাণবিক অস্ত্র’! ওই অস্ত্রের মুখে বেপরোয়া যান চালিয়ে মানুষ হত্যার সাজা ১৯৮৩ সালেও ছিল ১৪ বছর, তিন বছরের মাথায় দুই দফায় কমে তা ঠেকল তিন বছরে। অথচ যুক্তরাজ্যে ও কানাডায় ওই সাজা ১৪ বছর। মাদকাসক্ত অবস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে জরিমানাও আছে। আর মৃত্যুটা খুনের সমতুল্য হলে সাজা যাবজ্জীবন কারাদন্ড। (উইকিপিড়িয়া)।

তাতে গোদের ওপর বিষফোঁড়া, গাড়িচালকদের নেতা খোদ নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি। সরষের মধ্যে ভূতের মতো ‘দুষ্ট’ চালকদের স্বার্থে তিনি একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন- কখনও একা, কখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহযোগে। যেমন- লাইসেন্স নবায়নের ২৪ শর্ত পূরণের বদলে চোখ পরীক্ষা দিয়েই নবায়নের ঘোষণা, তার ফেডারেশনের তালিকা ধরে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ১ লাখ ৯০ হাজার চালককে লাইসেন্স প্রদান, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলে ছাড় দেয়া, যত্রতত্র যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা না করা এবং সড়কপথে ডাকাতি হলে তদন্ত ছাড়া চালক বা হেলপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার সুপারিশ ইত্যাদি। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার ফেডারেশনের একটি ‘সমঝোতা চুক্তিও(!)’ হয়েছে। যার অন্যতম ফসল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘সড়ক দুর্ঘটনার মামলা দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় করা যাবে না। করতে হবে ৩০৪(খ) ধারায়।’ (প্রথম আলো, ২৫ আগস্ট ২০১৫)। তাতে মৃত্যুদন্ডযোগ্য (ধারা-৩০২) মামলা পরিণত হবে তিন বছর কারাদন্ডযোগ্য মামলায়। (৩০৪(খ) ধারা)।

ওই চুক্তির ভিত্তিতে এর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় দায়েরকৃত ৩০২ ধারার মামলাগুলোও ৩০৪(খ) ধারাতে যাবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এরই মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলায় এরূপ ধারা বদল হয়েছে। সেখানে সরাসরি পিটিয়ে হত্যা, ট্রাক থেকে ফেলে সার্জেন্ট হত্যার মামলাও আছে। মামলাগুলোতে আসামিরা সব বাস-ট্রাকের চালক ও হেলপার। তন্মধ্যে পাঁচটিতে অভিযোগপত্রও দাখিল হয়েছে। (প্রথম আলো, ৫ অক্টোবর ২০১৩)।

প্রশ্ন হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলার ধারা বদলের কাজটা করছে কীভাবে? অভিযোগপত্র পেশের পর আদালত ছাড়া এ কাজ করার এখতিয়ার তো কারও নেই। (ফৌজদারি কার্যবিধির ২২৭ ধারা)।
এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে চালকদের দুর্ঘটনা সংঘটনে উসকানি দেবে। বেপরোয়া যান চালনায় উৎসাহ দেবে। এ কার্যক্রম চলতে থাকলে এমনও হতে পারে, গাড়িচালকদের আগামীতে আমরা হয়তো ভাড়াটে খুনিরূপে দেখতে পাব। কাউকে মারতে চাইলে লোকজন তখন আর পেশাদার খুনিদের ভাড়া করবে না। অধিকতর নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গাড়িচালকদের নিয়োগ দেবে। কারণটাও যুক্তিযুক্ত। গুলি করে বা অন্যভাবে মারলে বা সারা জীবন জেলে পচার ঝুঁকি। আর গাড়িচাপা দিয়ে মারলে মাত্র তিন বছর জেল। এর কমও হতে পারে। হতে পারে কোনো সাজাই হলো না- এদেশের রেওয়াজ যে তাই! তাছাড়া ভাড়াটে খুনি নিয়োগে অনেক খরচ। লাখ-কোটি তো এ কাজে মামুলি ব্যাপার। সেক্ষেত্রে চালকরা হয়তো ৪০ থেকে ৫০ হাজারেই রাজি হয়ে যাবে। প্রয়োজনে খুনের পরিকল্পনাকারী হয়তো চালককে বলবে, ‘সমস্যা নেই। তুমি যে ক’দিন জেলে থাকবে, সে ক’দিন তোমার পরিবারের খরচ আমরা চালাব। দুই থেকে তিন বছর একটি পরিবার চালানো এ আর এমন কী।’ আর চালকরা ভাববে, একদাগে এত টাকা! তার ওপর বিনা কষ্টে দুই থেকে তিন বছর পরিবার চালানো। বাহ্, প্রস্তাবটা তো মন্দ নয়! এভাবে হয়তো পিস্তল, ছুরি, চাপাতির বদলে গাড়ি দিয়ে মানুষ খুনের অদ্ভুত একটা সংস্কৃতি এদেশে চালু হয়ে যেতে পারে।

এ ধরনের একটি আত্মঘাতী ও জনবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও নৌপরিবহনমন্ত্রীর বারবার সাফাই- ‘দুর্ঘটনার মামলা ৩০২ ধারায় করা আইনসম্মত নয়’ (প্রথম আলো, ২৫ আগস্ট ২০১৫ ও ৫ অক্টোবর ২০১৩)। এ বক্তব্য সঠিক নয়।

৩০২ ধারা কী বলছে? কেউ খুন (murder) করলে তাকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হতে হবে। সঙ্গে জরিমানা। দুর্ঘটনার মামলাগুলো (যদি প্রকৃতপক্ষে তা দুর্ঘটনা হয়) সাধারণত দন্ডবিধির ৩০৪(ক) ও ৩০৪(খ) ধারায় হয়।

৩০৪(ক) ধারামতে, বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজ দ্বারা কারও মৃত্যু ঘটানোর (যা ‘অপরাধজনক ’ নয়) সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর; যেখানে মৃত্যুটা ওই কাজের সরাসরি ফল। আর কারও অবহেলা নেই। (১৯৪২ এএলএল ৩২৮)।

আর ৩০৪(খ) ধারা বলছে, বেপরোয়াভাবে বা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জনপথে যান বা অশ্ব চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটালে (যা ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ নয়) সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর।

‘অপরাধজনক নরহত্যা’ (Culpable Homicide) শব্দটা এখানে ব্যাখ্যার দাবিদার। মৃত্যু ঘটানোর ইচ্ছায় বা মৃত্যু ঘটাতে পারে এরূপ দৈহিক আঘাতের ইচ্ছায় বা মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে জেনেও এমন কোনো কাজ দ্বারা কারও মৃত্যু ঘটানোকে ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ বলে। (২৯৯ ধারা-দন্ডবিধি)। ওই নরহত্যা আবার দুই ধরনের- ‘খুন’ ও ‘খুন নয়’। যে নরহত্যা সচেতন, সুপরিকল্পিত, স্বেচ্ছাকৃত, নৃশংস; যেখানে মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেকটা সুনিশ্চিত; তা খুন। যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। (৩০২ ধারা)। আর যে নরহত্যা আকস্মিক, হঠাৎ উত্তেজনা বা প্ররোচনাপ্রসূত; যেখানে মৃত্যুটা সুনিশ্চিত নয়; হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, তবে তা ‘খুন নয়’। তার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড। (৩০৪ ধারা)।

দুর্ঘটনার মামলা সাধারণভাবে ৩০৪(ক) বা ৩০৪(খ) ধারায় বিচার্য হলেও তার অর্থ এ নয় যে, অবিবেচনাপ্রসূত কিংবা অজুহাতহীন হত্যামাত্রই এ ধারায় শাস্তিযোগ্য। কোনো বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজে ‘অপরাধজনক নরহত্যা’র গুণাগুণ থাকলে কিংবা জেনেশুনে-ইচ্ছেকৃতভাবে কারও মৃত্যু ঘটানো হলে তা অবশ্যই দুই ধরনের ‘অপরাধজনক নরহত্যা’র যে কোনো এক ধরনের আওতাভুক্ত হতে পারে। (পিএলডি ১৯৫৯ লাহোর ৭৬০)। তাছাড়া শুধু গাড়ির গতিরোধকের ওপর নির্ভর করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কেউ কোনো কাজ করলে তাকে ৩০৪ ধারার (সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদন্ড) আওতায় আনা যাবে। (১৯৪৫ এএলএল ১৬)। উচ্চ আদালতের এসব সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, অপরাধের ধরন বিবেচনায় দুর্ঘটনার মামলা কখনও ‘খুন’, কখনও ‘খুন নয়’ এরূপ ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ হিসেবেও গণ্য হতে পারে, যা ৩০২ বা ৩০৪ ধারায় বিচার্য।

লক্ষণীয় হলো, দুর্ঘটনার মামলা স্থানান্তরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উপরোক্ত চার ধারার মধ্যে সবচেয়ে কম সাজার ধারাটিই বেছে নিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশগুলোর একটি। ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৭ হাজার ৫৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালে মারা যায় ৮ হাজার ৫০০ জন। (কালেরকণ্ঠ, ২ আগস্ট, ২০১৫)। জুলাইয়ে ঈদের সময় ১১ দিনে রেকর্ডসংখ্যক ২৫২ জন মারা যায়। এই তো ৮ সেপ্টেম্বরও সিরাজগঞ্জে দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচজন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়। (সমকাল অনলাইন)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, এতে বার্ষিক ক্ষতি জিডিপির দুই শতাংশ। ডলারের অঙ্কে যা ১ দশমিক ২ বিলিয়ন।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে এদেশে এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ আইনি প্রতিকার বিরল। সড়ক দুর্ঘটনায় ২০০৮ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৪২৬টি মামলা হয়। ২০০৯ সালে শুধু ঢাকায় হয় ৬১৭টি মামলা। তবে সাজার ঘটনা ২১ বছরে মাত্র একটি। তাও আবার আসামি পলাতক। (প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ও ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩)। চালকরূপী ঘাতকদের এমন অভয়ারণ্যে রাষ্ট্রযন্ত্র আবার দিলদরিয়া! সরকার কোথায় প্রচলিত আইনি কাঠামোকে আরও সুশক্ত ও সক্রিয় করে, জনগণকে সুরক্ষা দেবে তা না, উল্টো ঘাতকদের সুরক্ষায় ব্যস্ত। তো জনগণের মুক্তি কোথায়? নৌ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওইসব উদ্যোগ শুধু রাষ্ট্রে ‘আইনের শাসন’ ও ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’র পথে শুধু অন্তরায়ই নয়; জনজীবন, জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার প্রশ্নে তা মূর্তিমান অশনিসঙ্কেত।

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ

aftabragib@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.