জটিল ষোড়শ সংশোধনীর সরল বিশ্লেষণ

August 24, 2017 10:56 pmComments Off on জটিল ষোড়শ সংশোধনীর সরল বিশ্লেষণViews: 15
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

গোলাম মোর্তোজা

জটিল ষোড়শ সংশোধনীর সরল বিশ্লেষণ:

আইনের মানুষ না হয়ে, আইন বিষয়ে কিছু লেখা খুব সহজ নয়। সাংবাদিক হিসেবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে, নিজে পড়ে-জেনে লেখা যে অসম্ভব তাও নয়। তারপরও মনে করছিলাম, ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে কিছু লিখবো না। না লিখতে চাইলেও, চুপ থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। টকশোতে প্রসঙ্গটি বারবার আসছিল। আর এখন ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের আলোচনাটা মোটেই আইনগত জায়গায় নেই। জাতি, ব্যক্তি, ঘৃণা, বিদ্বেষের জায়গায় চলে গেছে। এই জায়গাটায় নিয়ে গেছেন রাজনীতিবিদরা। রায়ে যা লেখা নেই, অভিযোগে তা সামনে আনা হচ্ছে। আবার সম্পূর্ণ অসত্য বক্তব্য বারবার সামনে আনা হচ্ছে। যা এই রায়ের সঙ্গে একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয়। বিষয়গুলো নিয়ে খুব সহজ-সরলভাবে কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।
১. এই রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিন্তু বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। এর আগেও অনেকবার এনেছেন। সামনে আনছেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি বলছেন, ‘প্রধান বিচারপতি নিজে বলেছেন তিনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। সুতরাং তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে থেকে পাকিস্তানিদের সহায়তা করেছেন’।
সাংবাদিক হিসেবে এই গুরুতর অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম ‘আমি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলাম’ এ কথা মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র সিনহা কখনও কোথাও বলেননি। কোথাও এর কোনও তথ্য-প্রমাণ নেই।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মামলায় প্রসঙ্গ এসেছিল যে, কেন কিছু সংখ্যক মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার করা হচ্ছে, কেন সব অপরাধী, রাজাকারদের বিচার করা হবে না…। এমন প্রসঙ্গের প্রেক্ষিতে বিচারকের আসনে বসে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র সিনহা বলেছিলেন ‘ধরেন, আমি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলাম। কিন্তু জ্বালাও-পোড়ায়ে, খুন-ধর্ষণ করিনি। এখন এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ আর এই অপরাধ কি এক হবে…?’
এই বক্তব্যটির ‘ধরেন’ শব্দটি বাদ দিয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলছেন ‘তিনি (প্রধান বিচারপতি) নিজে বলেছেন তিনি ‘শান্তি কমিটি’র সদস্য ছিলেন’।

সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে ‘সিনহা বাবু’ হিসেবে উল্লেখ করে টকশোতে কথা বলেন।
একজন প্রধান বিচারপতির প্রতি একজন সাবেক বিচারপতি এই সম্বোধন এবং বিকৃত করে বক্তব্য উপস্থাপন বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। পাঠক তার মতো করে নিশ্চয় বুঝে নেবেন বা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবেন।
২. এবার আসি ষোড়শ সংশোধনীর রায়-পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে। আসলে রায়-পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে নয়, যে অংশ বা বক্তব্য বা অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে সেই প্রসঙ্গে। মোটা দাগে যে অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে-
ক. বঙ্গবন্ধুকে হেয় বা কটাক্ষ করা হয়েছে।
খ. রায়ে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ লিখে জাতির জনক যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তা অস্বীকার করা হয়েছে।
গ. সংসদ সদস্যদেরকে হেয় বা অসম্মান করা হয়েছে।
৩. এবার এই অভিযোগগুলো বিষয়ে রায়ে- পর্যবেক্ষণে যা লেখা হয়েছে, সেটা দেখা যাক। এখানে বলে রাখা দরকার যে, রায়- পর্যবেক্ষণের কোথায়, কোন অংশে কোন বাক্য বা শব্দ দিয়ে এসব ‘কটাক্ষ’ বা ‘অসম্মানে’র ঘটনা ঘটেছে, তা সুনির্দিষ্ট করে আজকে পর্যন্ত বলা হয়নি। অভিযোগের ধরন থেকে ধারণা করা যায় পর্যবেক্ষণের এই বক্তব্যটি থেকে বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ বা অসম্মানের প্রসঙ্গটি আসতে পারে-
‘No nation – no country is made of or by one person. If we want to truly live up to the dream of Sonar Bangla as advocated by our father of the nation, we must keep ourselves free from this suicidal ambition and addiction of ‘I’ness. That only one person or one man did all this and etc.’
(‘কোনও জাতি বা দেশ কোনও এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়ে ওঠে না, কিংবা কোনও একজন দ্বারা তা গঠিতও হয় না। আমরা যদি সত্যিই জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে আমিত্বের আসক্তি এবং এই আত্মঘাতি প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে।’)
পাঠক এই অংশের বাংলা এবং ইংরেজি অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করেন। এখানে লেখা হয়েছে ‘জাতির জনকের সোনার বাংলা’। এই অংশের আগে রায়ে তিনবার বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতির জনকের সোনার বাংলার মানে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্যে ‘আমিত্ব বা আমি করেছি’ মানসিকতা পরিত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর করা সংবিধানে যেমন আছে ‘আমরা জনগণ’ তেমনি বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের আন্দোলন-সংগ্রামে, দল গঠন প্রক্রিয়ার কোথাও ‘আমিত্ব’ ব্যাপারটা ছিল না। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়লে যে কেউ তা বুঝতে সক্ষম হবেন।

আওয়ামী লীগও বলে ‘হাজার বছরের বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। সেই বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে রায়ের পর্যবেক্ষণে লেখা হয়েছে, ‘পাকিস্তানি জান্তা কল্পনা করতে পারেনি, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এমন বিপুলভাবে জয়লাভ করবে।… এতে কোনও সন্দেহ নেই আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন’।
পুরো রায়ের কোথাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলা হয়নি, কটাক্ষ তো বহুদূরের বিষয়। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু এবং তা ‘আমরা’ তত্ত্বে ‘আমি’ তত্ত্বে নয়। বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ তাও ‘আমরা’ তত্ত্বেরই প্রমাণ বহন করে। তা পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে। স্পষ্ট করে একাধিক জায়গায় লেখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুই ‘জাতির জনক’।
‘আমরা’ বিষয়টি বোঝাতে গিয়েই ‘কোনও জাতি বা দেশ এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়ে ওঠে না’ লেখা হয়েছে। এটা বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর করা যে বাংলাদেশের সংবিধান তার মূল ভিত্তি ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’।
৪. ‘জাতির জনক’ একজন এবং তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাহলে রায়ে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ লেখা হলো কেন? এর মাধ্যমে জাতির জনক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে নয়, অনেককে বোঝানো হয়েছে, এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, যিনি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে ‘সিনহা বাবু’ হিসেবে সম্বোধন করেন।
গত ২১ আগস্ট একাত্তর টেলিভিশনের টকশো ‘একাত্তর জার্নালে’ সঞ্চালক মিথিলা ফারজানা ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বিষয়টি নিয়ে আমাকেও প্রশ্ন করেছিলেন। ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক স্বীকার করে নিচ্ছি, এই প্রশ্নের পরিষ্কার করে জবাব দিতে পারিনি। তারপর গত দু’দিন রায়টি আরও গভীরভাবে পড়ে বোঝার চেষ্টা করেছি। যা বুঝলাম তা হলো-
ক. রায়-পর্যবেক্ষণে ‘ফাদার অব দ্য নেশন’ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে। ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ের ৩০, ৫৪ এবং ২০০ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’ হিসেবে লেখা হয়েছে। পুরো রায়ে আরও কোথাও থাকতে পারে। আমি নিজে তিন জায়গায় লেখা দেখেছি। আপনারা যে কেউ এই পৃষ্ঠাগুলোতে গিয়ে তা দেখে নিতে পারেন।
খ. এর পরে আসছে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ কেন লেখা হলো, ‘এস’ কেন যোগ করা হয়েছে? পুরো রায়টি পড়লে, একটির সঙ্গে আরেকটি মেলালে এটা নিশ্চিতভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’ স্বীকৃতি নিয়ে কোনও রকম প্রশ্ন তোলা হয়নি। পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, রায়ে তাও লেখা হয়েছে। রায়ে লেখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন’। রায়ে গণপরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকে (যাদের নেতা বঙ্গবন্ধু) যারা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, সম্মিলিতভাবে তাদেরকে ‘ফাউন্ডার্স’ এবং ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ হিসেবে বোঝানো হয়েছে। তাদের ত্যাগ ও সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।‘ফাদার অব দ্য নেশন’ আর ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ শব্দ দুটি দিয়ে ঐতিহাসিক সত্যি আইনগত স্বীকৃতি বা ভিত্তি পেয়েছে। ‘ফাদার্স’র ‘এস’ দিয়ে বঙ্গবন্ধু যে ‘জাতির জনক’ তা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, এটা শতভাগ অপব্যাখ্যা। অসত্য ব্যাখ্যা, এর সঙ্গে সত্যের কোনও সম্পর্ক নেই। পুরো রায়ে পর্যবেক্ষণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে। পুরোটা পড়লে ‘ফাদার অব দ্য নেশন’ এবং ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ শব্দ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। আমেরিকায় সাত জনকে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বলা হয়। এই ধারণা থেকে গণপরিষদের বিজয়ীদের অবদানের আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেহেতু অধিকাংশ মানুষ রায়টি পড়েননি, সেহেতু রায়ের আংশিক নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। দুর্ভাগ্য যে, সাবেক বিচারপতিও বিভ্রান্তি ছড়ানোর দলে যোগ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে দু’একজন সাবেক বিচারপতি দু’একটি গণমাধ্যমকেও বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন।
৫. এবার আসি সংসদ সদস্যদের অসম্মান করা প্রসঙ্গে। অভিযোগ করা হচ্ছে রায়ে সংসদ সদস্যদের ‘অপরিপক্ব’ বলা হয়েছে। বাস্তবে সংসদ সদস্যদের নয়, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ‘ডিসফাংশনাল’ বলা হয়েছে। রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আমাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ‘অকার্যকর’ বলা হয়েছে। ‘ইমম্যাচিউর’ বা ‘অপরিপক্ব’ বলা হয়েছে। তা কি অসত্য? সংসদ সদস্যদের ষোড়শ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশের পর সংসদে এবং পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বাইরের আলোচনা কি রায়ের পর্যবেক্ষণ প্রমাণে যথেষ্ট নয়!

আরও মজার বিষয় রায়-পর্যবেক্ষণের কোথাও ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার নির্বাচনে গঠিত সংসদের কথা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। অথচ বর্তমান সংসদ সদস্যরা মনে করে নিয়েছেন, তাদের কথা বলা হয়েছে!
ষোড়শ সংশোধনীর হাইকোর্টের রায়ে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘অপরাধমূলক কর্মকান্ড তথা ক্রিমিনাল অফেন্সে’র প্রসঙ্গ জোরালো ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ রায়ে ‘অপরাধমূলক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগের এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো এটা নিয়ে কেউ কোনও কথা বলছেন না। প্রধান বিচারপতিসহ ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেওয়া ৭ জন বিচারপতিকে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানানোর কথা! তা না করে রায়ে যা লেখা হয়নি, তার জন্যে তারা বিষোদ্গার করছেন!!
৬. রায়ে কী লেখা হবে, পর্যবেক্ষণের সীমারেখা কতটা, তা নির্ভর করে যিনি বা যারা রায়-পর্যবেক্ষণ লিখছেন তাদের ওপর। উন্নত-অনুন্নত সারা পৃথিবীর নজীর তাই। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক বা সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সারা জীবনে যত রায়-পর্যবেক্ষণ লিখেছেন, নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী লিখেছেন। অন্য কেউ বা সাবেক কোনও বিচারপতি তাকে নির্দেশনা দেননি। দিতে পারেন না। রায় বা পর্যবেক্ষণের সমালোচনা অবশ্যই করতে পারেন। রায়-পর্যবেক্ষণে যা লেখা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা করতে পারেন, যা লেখা হয়নি তা সামনে এনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন না।
ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রধান বিচারপতিসহ ৭ জন বিচারপতির সর্বসম্মত রায়। পূর্বের অষ্টম সংশোধনী, ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় সর্বসম্মত ছিল না। এগুলো ছিল বিভক্ত রায়। অর্থাৎ সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বেঞ্চের সব বিচারপতি একমত হয়ে রায় দেননি। তাতে যদিও রায়ের কোনও সমস্যা নেই। উল্লেখ করছি এই কারণে যে, মাননীয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের অন্য ৬ জনসহ সবাই একমত হয়েই ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করেছেন। সমালোচনা করার সময় সাবেক বিচারপতিদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে বিচারপতিরা একমত। ভিন্নমত আছে পর্যবেক্ষণে। তা থাকা খুব অস্বাভাবিক কোনও বিষয় নয়। রায় দেখে সংক্ষুব্ধ হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, অস্বাভাবিক নয় সমালোচনা করাও। অস্বাভাবিক হলো, রায়ে যা লেখা হয়নি, পর্যবেক্ষণে যা বোঝানো হয়নি, সেসব অস্তিত্বহীন বিষয় সামনে এনে বিষোদ্গার করা, বিষোদ্গারে রসদ জোগানো।
রায়-পর্যবেক্ষণে ৪৬ বছরের বাংলাদেশের একটি ছবি আঁকা হয়েছে। এই ছবি কারও পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এই ছবি পত্রিকায় লেখা হচ্ছে, টকশোতে আলোচনা হচ্ছে। ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ঠিক নেই, সব প্রতিষ্ঠান দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সংসদ অকার্যকর’- এসবই এসেছে ষোড়শ সংশোধনীর রায়-পর্যবেক্ষণে আঁকা ছবিতে। এই ছবির কোনও অংশ কি অসত্য? উত্তরে বলা হচ্ছে, না ঠিক আছে, অসত্য নয়। কিন্তু আদালত বলবে কেন? আদালত একথা বলতে পারে না। এসব বিষয় মামলার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়।
বিচারকরা রায় – পর্যবেক্ষণ লিখবেন, আর বাইরে থেকে ঠিক করে দেওয়া হবে ‘প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক’ বিষয়? এই বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি আমরা
৭. বিচারপতিদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকবে, না সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নীতি অনুসরণ করা হবে? সংসদ ষোড়শ সংশোধনী পাস করে সেই ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল মানে সেই ক্ষমতা আর সংসদের হাতে থাকলো না। কথা, আলোচনা-সমালোচনা-বিষোদ্গার যাই করা হোক না কেন, সংসদের হাতে এখন এই ক্ষমতা নেই। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী রায় সরকার মেনে নিয়েছে, খুশি না হয়েও। পর্যবেক্ষণ নিয়ে আপত্তি। এখন ‘পর্যবেক্ষণ’ বাতিল বা আংশিক সংশোধন সমালোচনা বা বিষোদ্গার করে হবে না। আইনি পথে আপিল করতে হবে। প্রধান বিচারপতির চরিত্র হনন করে সমাধান পাওয়া যাবে না। অন্য ছয়জন বিচারপতি স্বাধীন মতামত দিতে পারেননি বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা রায়ের ক্ষেত্রে যে হয়নি- স্পষ্টভাবেই বোঝা গেছে। পর্যবেক্ষণে মতান্তর আছে।
প্রধান বিচারপতি একজন বিচারপতির বিরুদ্ধের অভিযোগ তদন্ত না করার জন্যে চিঠি দিয়েছেন বলে অভিযোগ আনা হচ্ছে। কোন প্রেক্ষাপটে, কী চিঠি দিয়েছেন, না দেখে মন্তব্য করা যাবে না। প্রশ্ন আসবে, যখন প্রধান বিচারপতি চিঠি লিখেছিলেন এবং সেটা যদি আইনসঙ্গত না হয়ে থাকে, তখনই তো বিষয়টি সামনে এনে তদন্ত-ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর প্রধান বিচারপতির দোষ খোঁজাকে অনেকেই উদ্দেশ্যমূলক ‘চরিত্র হনন’ হিসেবেই দেখবেন। পাকিস্তান প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সরকার পরিবর্তন বা এজাতীয় কোনও হুমকি দেননি। প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, অ্যাটর্নি জেনারেলও বলছেন তা সঠিক নয়। যদিও পাকিস্থান প্রসঙ্গ সামনে আনাটাই অসঙ্গত মনে করি। কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তার ‘নেতৃত্ব এবং উন্নয়ন’র প্রশংসা করলেন। তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানালো হলো, টেলিভিশনে ফলাও করে প্রচারও করা হলো। সুতরাং পাকিস্তান বিষয়ে আমাদের একটা স্পষ্ট নীতি থাকা দরকার।
৮. সামরিক শাসনসহ অসংখ্য বিষয় যে রায়ের পর্যবেক্ষণ এসেছে, তার প্রেক্ষাপট রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল তৈরি করেছিলেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল ব্যবস্থা সামরিক শাসকরা এনেছেন, এই যুক্তি দিয়ে সামরিক শাসকদের সবকিছু বাদ দেওয়ার নীতির পক্ষে আবেগী যুক্তি আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে তথ্য ছিল খণ্ডিত। বিচারপতিরা প্রতিটি বিষয় উল্লেখ করে দেখিয়েছেন। রায়-পর্যবেক্ষণে দেখানো হয়েছে, সামরিক শাসকদের সংযোজন ‘বিসমিল্লাহ’ ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দেওয়া হয়নি। সামরিক শাসকদের সবকিছু সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেলের এই উপস্থাপনা সঠিক নয়। বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে বিস্তারিত ইতিহাস প্রাসঙ্গিকভাবে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণে এনেছেন বিচারপতিরা।
আর এখন যা করা হচ্ছে, তা বিবেচনা প্রসুত কিছু নয়। রাজনীতিবিদদের বিশেষ করে যারা দেশ পরিচালনা করছেন, তাদের তা অনুধাবন করা দরকার।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.