টার্গেট ‘সংখ্যালঘু’

November 15, 2016 8:03 pmComments Off on টার্গেট ‘সংখ্যালঘু’Views: 8
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

টার্গেট ‘সংখ্যালঘু’

হায়দার আকবর খান রনো ::

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা, মন্দির ভাঙ্গা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার পর এবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাওতাল পল্লীতেও একই ধরনের আক্রমণ করা হয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু অথবা আদিবাসী হবার কারণে যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, তাদের উপর এই রকম হামলা কিছুদিন পর পরই হচ্ছে। বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি, বিশেষ করে জমি দখলের জন্য এই ধরনের জঘন্য কাজে অগ্রসর হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় মদদ অর্থাৎ সরকার দলীয় উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি এবং প্রশাসনের সমর্থন বা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের ঘটনা বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গঠিত এই দেশে এমনটি ভাবা না গেলেও এটাই এখন বাস্তব।

পাকিস্তানী ভাবাদর্শ-দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে খন্ডন ও পরাভূত করা গিয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতে পেরেছিল। কিন্তু এই মহান যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল যে রাজনৈতিক দল-তারা সেই সময় জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তার সীমাবদ্ধতা যে ছিল, তা আমরা যারা সেই সময় যুদ্ধ করেছি, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। ’৭১-এর সংগ্রামের উত্তাপ থাকতে থাকতেই যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা ছিল বিরাট বড় ধাপ্পা। জনগণকে বোকা বানানোর কৌশল। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ? তদানীন্তন শাসকদল যে এই ব্যাপারেও খুব স্পষ্ট ও আন্তরিক ছিল না, তা তখনকার বেশ কিছু ঘটনাবলী দেখলেই বোঝা যাবে। আজকের প্রজন্ম অবশ্য সে সব কথা জানে না। কিন্তু আমার বয়েসী যারা, তারা তো চোখের সামনেই দেখেছে ঘটনাবলী।

তবু ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। এটি ছিল একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা এসে নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পাকিস্তানী ভাবাদর্শের সাথে আপোস করলেন, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ছেটে ফেললেন, সংবিধানকে ইসলামীকরণের উদ্যোগ নিলেন, মুসলিম লীগ, জামায়াতে প্রভৃতি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন এবং কাউকে কাউকে স্বীয় দলে ও মন্ত্রীসভায় স্থান দিলেন। এইভাবে রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা আবার ফিরে এলো। এরপর স্বৈরশাসক এরশাদ সংবিধানে যোগ করলেন ‘ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম।’ এরশাদের ভন্ডামির চূড়ান্ত পর্যায়। ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেল।

এরপর উভয়ই নানাভাবে ওই অপশক্তির সাথে আপোস করেছে। কথায় ও পোশাকে নিজেদের অধিকতর মুসলমান পরিচয় তুলে ধরতে তারা তৎপর। আওয়ামী লীগও যে এই আপোস ও আত্মসমর্পণের পথ নিয়েছিল তাও বহু ঘটনা দ্বারা দেখানো যাবে। কিন্তু , যার একদা মধ্যপন্থী দল হিসাবে পরিচয় ছিল, সেই বিএনপির অধঃপতন ঘটেছিল অনেক বেশি ও দ্রুততর। জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ এখন পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও রূপান্তর ঘটেছে। একদা যেটুকু জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ কাজ করতো, এখন তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আওয়ামী নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনীর মধ্যে কোন আদর্শবোধ কাজ করে না। টেন্ডারবাজী, মাস্তানী, বেপরোয়া লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল, নদী দখল, পরের জমি দখল এবং লুটপাটের ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ, যার পরিণতিতে নিজেদের লোকও যেমন প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে, তেমনি মায়ের পেটের শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। এই সবই এখন শাসক দলের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। দখল করার প্রবৃত্তি যেখানে প্রধান সেখানে সবচেয়ে দুর্বল অংশের জমি সম্পত্তি দখল করার আকাঙ্খা থাকবে না কেন? সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাবে-এই তীব্র আকাঙ্খাই কাজ করেছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাতের এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে, অর্পিত সম্পত্তির নামে যে সকল হিন্দু সম্পত্তি দখল করা হয়েছে, তার ৬০ শতাংশ করেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী কারবার চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের দেশত্যাগ করানো। কারণ হিন্দুভোট আওয়ামী লীগের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভাবে, হিন্দুরা দেশে থাকলে ভোটটা নিশ্চিত, আর দেশত্যাগ করলে জমিটা দখল করা যাবে।

নাসিরনগরের ঘটনায় শাসক দল যে জড়িত তার বহু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। জনৈক মন্ত্রী ও জনৈক সংসদ সদস্য হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলেছেন, অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন- এমন অভিযোগও আছে। ইতোপূর্বে রামুর ঘটনাতেও আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে সকলেই জড়িত ছিল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির বলেছেন, গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগের জামায়েতীকরণ হয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছেন, ‘গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপরে হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি দলের লোকরা যদি এ ধরনের হামলায় জড়িত হয়, তাহলে এই দেশে হিন্দুরা আর বেশিদিন থাকতে পারবে না।’

দেখা যাচ্ছে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করার ক্ষেত্রে বড় দুটি দলেরই স্বার্থ রয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রে ভোটের হিসাব। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে জমি দখলের আকাঙ্খা।

হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলার সহজ উপায় হল, ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ আনা। নাসিরনগরের ক্ষেত্রেও দেখা গেল একজন নিরীহ গরিব হিন্দুর বিরুদ্ধে এমনই ভুয়া অভিযোগ তোলা হলো। সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হলো। তারপরও হিন্দু বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ছিল সন্দেহজনক। শাসক দল, প্রশাসন ও মৌলবাদী শক্তি-সবাই একত্রে হলে তো আসলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

কিছুদিন আগের আরেকটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে। শাসকদের স্নেহধন্য নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সদস্য ও সংসদ সদস্য তার লোকজন নিয়ে জনৈক হিন্দু শিক্ষককে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন। অভিযোগ, উক্ত শিক্ষক নাকি ইসলামবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। হিন্দু নাগরিককে শায়েস্তা করার জন্য এর চেয়ে শস্তা ও সহজ উপায় আর কি আছে।

আমরা দেখলাম, সারাদেশের প্রগতিশীল মানুষ শিক্ষকের পক্ষে দাড়িয়েছিল। কিন্তু ওসমান পরিবারের পক্ষে দাড়িয়ে হিন্দু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সভা করে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রেখেছিল হেফাজতে ইসলাম। কি চমৎকারভাবে মৌলবাদী হেফাজত ও শাসক আওয়ামী লীগ একত্রে মিলে গেল একজন হিন্দু শিক্ষককে মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত করার ও অপমাণিত করার ক্ষেত্রে। অথচ ২০১৩ সালে এই হেফাজতকে দিয়ে খালেদা জিয়া সরকার পতনের ও ইসলামী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন।

এখন শ্রেণী স্বার্থে সবাই এক কাতারে দাড়িয়েছে। লুটপাট যেখানে শ্রেণী বৈশিষ্ট, সেখানে বুর্জোয়া দলগুলোর মধ্যে কোন ফারাক থাকছে না। এই একই কারণে শাসক আওয়ামী লীগ সংবিধানে বড় বড় পরিবর্তন আনলেও এরশাদের অবদান ‘ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম’কে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এক সভায় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অভিযোগ করেছেন, ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে রাজনীতি। ওই সংবিধানে ফিরে না গেলে রামু, সাথিয়া ও নাসিরনগরের মতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

বলাই বাহুল্য, এটা মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কথা। সরকারের ভাষ্য নয়। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বলে দাবিদার, সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দল ও প্রশাসনের মদদে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়, তা ভাবতেও বিস্মিত হতে হয়। যে আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোট হল হিন্দু নাগরিকগণ, সেই আওয়ামী লীগের লোকজন হিন্দুর বাড়িঘর, মন্দিরের হামলা চালায়, অগ্নিসংযোগ করে, হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য দেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। কারণ সবার উপরে শ্রেণী সত্য। আওয়ামী লীগ এখন যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে সেই শ্রেণী কোন উৎপাদক শ্রেণী নয়, তাহলো নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা বুর্জোয়া। আর লুটপাট করার সহজ টার্গেট হলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী।

বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে হলে নির্ভর করতে হবে বামশক্তির ওপর। নাসিরনগরের ঘটনা এই শিক্ষাটি আরেকবার তুলে ধরলো।

রাষ্ট্র কী সংখ্যালঘু আর সাধারন মানুষের বিপক্ষে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন স্বপন বিশ্বাস, একসাথে বাম ছাত্র সংগঠন করতাম, হিন্দু-মুসলিম ভেদ তখনও মাথায় ঢোকেনি। ও ছিল খুবই সম্পন্ন পরিবারের। শ’বিঘা ধানের জমি, দশ বিঘার বাড়ি, মহকুমা শহরে কাপড়ের দোকান, অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু পরিবার। আশির দশকের গোড়াতেই পাড়ি জমাতে হলো ভারতে। মিথ্যে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। ওদের গাঁয়ের বাড়ি অনেকবার গিয়েছি। বাড়ি, বিশাল পুকুর, নিকোনো উঠোন, বিরাট পরিবার-গম্ গম্ করতো সারাক্ষণ। সেই স্বপনরা বাড়িশুদ্ধ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, সবকিছু ফেলে। কলজে ছিঁড়ে গিয়েছিল প্রিয় বন্ধু চলে যাওয়ায়। অভিমানও হয়েছিল তীব্র।

আরো আগে চলে গিয়েছিল নিরঞ্জন, বাসু, মীরারা। মীরার ওপর দৃষ্টি পড়েছিল এক নেতার। হিন্দুর মেয়ে, বিপদ পদেপদে। একরাতে তারা সবাই উধাও। আগের বিকেলেও নিরঞ্জন, বাসুর সাথে ফুটবল খেলেছি ঈদগাঁহ মাঠে। সকালে গিয়ে দেখি শূন্য ভিটে, কিছু ভাঙ্গা বাসন- কোসন ইতস্তত: ছড়িয়ে আছে। আর আছে ওদের পোষা কুকুরটা। অবিশ্রাম কেঁউ কেঁউ করছে শুণ্য ভিটেয় একা। সেবারেও ছোট্ট কিশোরের হৃদয় ভেঙ্গেছে। এভাবে চলে গেল, না বলেই! মনে হয়েছে,ওরা খুব ভাল মানুষ নয়!

স্বপনরা চলে যাওয়ার সময় বুঝেছি। এ রাষ্ট্র সাধারনের, সংখ্যালঘুদের অধিকার স্বীকার করে না। রাষ্ট্র- সমাজ সাধারন মানুষের নিরাপত্তা দেয় না। নিরঞ্জন, বাসুদের বাবা পানির দামে বসতজমি বেচে দিয়ে চলে গেছেন। স্বপনরা সে সুযোগও পায়নি। স্থানীয় প্রতাপশালীরা লুটে-পুটে নিয়েছে সবকিছু। আমরা কি করছি? শুধু হা-হুতাশ। আর এখনও ফি-বছর দেখছি ভোলা, রামু, নওগাঁ, সাঁথিয়া, গাইবান্ধা, নাসিরনগর…. এর কি কোন শেষ নেই? সকলে মিলে এইসব নারকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েই থাকবো?

অবশেষে বার্ধক্যে এসে বুঝেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। যিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও গণতন্ত্রী পার্টি হয়ে সবশেষে আওয়ামী লীগে। শেষতক বলেই ফেলেছেন, “বাংলাদেশে যে ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবার মধ্যেই সংখ্যালঘু বিতাড়নে ঐক্যবদ্ধ মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। …একটা মজার ব্যাপার হলো, সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, জঙ্গীবাদী কিংবা উগ্র সাম্প্রদায়িক যে সরকারই থাকুক না কেন, হিন্দু বা সংখ্যালঘু বিতাড়নে এখানে একটি প্রবল ঐক্যমত্য আছে”…।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, সংসদ সদস্য, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। প্রাক্তন আইন ও রেলমন্ত্রী। সংসদীয় কমিটিতে তারা সাদা-কালো অনেক আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, প্রণয়নের সুপারিশ করেন। মোটকথা প্রবীন এই নেতা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের একটি বড় স্তম্ভ। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, অন্যান্য দলের মত সংখ্যালঘু বিতাড়নে তার দলও পিছিয়ে নেই। কি প্রতিকার করবেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বা কার কাছে প্রতিকার চাইবেন?

দুই. প্রযুক্তিই এখন এই দেশে সাম্প্রদায়িক দস্যুবৃত্তির হাতিয়ার হয়ে উঠলো। সাম্প্রদায়িক হামলা ও সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষেত্র তৈরীতে এটি ভালভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। রামুর ঘটনার সূত্র ধরেই যেন তান্ডব চলেছিল পাবনার সাঁথিয়ায়; যশোরের মালোপাড়ায়। সেই ধারাবাহিকতা ঘটেছে নাসিরনগরে। রামুতে আক্রান্ত হয়েছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়। পাবনায়, যশোরে হিন্দু সম্প্রদায় । নওগাঁ, গাইবান্ধায় সাঁওতাল সম্প্রদায়। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে তান্ডব। কারা গুজব ছড়ায় ফেসবুকে জানা যায়নি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, এটি পরিকল্পিত- যাতে হামলে পড়া যায় সংখ্যালঘুদের ওপর।

মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলে ফেনা তোলা এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষয় নতুন নয়। ঘটনা ঘটতে থাকে। আকষ্মিকতায় গরম হয়ে ওঠে মধ্যরাতের মিডিয়া, টক-শো। প্রশাসন-পুলিশের তৎপরতা বাড়ে, ঘটনা ঘটার পরে। হুমকি চলতেই থাকে “কেউ ছাড়া পাবে না, যে দলেরই হোক”। দেশজুড়ে সমাবেশ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি, সড়ক অবরোধ চলে কিছুদিন। ভেতরে তৈরী হয় ক্ষোভ-ঘৃনা-ক্ষুব্দতা। তারপর হঠাৎই স্থবিরতায় আক্রান্ত হলে বিচারহীনতায় ধামাচাপা পড়ে সবকিছু।

মনে পড়ছে, সাঁথিয়ায় যখন তান্ডব চলছিল, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ওই এলাকাতেই। ঘটনাস্থলের পাঁচ মিনিটের দুরত্বে থানা। প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান থেকে ঘটনাস্থলে আসতে সময় লাগার কথা বেশি হলে বিশ মিনিট। তার সাথে ছিলেন পুলিশ, র‌্যাব, দলীয় নেতা-কর্মীরা। তিনি আসেননি। পুলিশ অবশেষে পৌঁছেছিল, এক থেকে দেড় ঘন্টা পর। তান্ডব, আগুনে ঝলসানো ঘর-বাড়ি ধ্বংসযজ্ঞ, ছাড়া তখন সেখানে আর কিছুই ছিল না।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সাঁথিয়ার ঘটনা তদন্ত করেছিল। তারা প্রতিবেদন দিয়েছিলেন সরকারের কাছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার জন্য দায়ি করেছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের। ঐসব নেতা-কর্মীরা ছায়া বা আর্শীবাদপুষ্ট ছিল প্রতিমন্ত্রীর। সুতরাং মানবাধিকার কমিশনের এরকম ‘ঔদ্বত্বের’ কারনে তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর মিজানুর রহমান অভিযুক্ত হয়েছিলেন ‘‘জঙ্গীবাদের কথিত অর্থদাতা’’ হিসেবে। অভিযোগ এনেছিলেন সরকারের দু’জন সিনিয়র মন্ত্রী। যদিও ভয়াবহ এই অভিযোগের কোন তদন্ত  হয়নি এবং অচিরেই সাঁথিয়া হামলার তদন্ত-বিচার ধামাচাপা পড়ে যায়।

নাসিরনগরে ফেসবুক নাটকের পুনঃমঞ্চায়ন। হামলার আগে একটি মৌলবাদী সংগঠনের সমাবেশে নাসিরনগরের ইউএনও ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যোগ দিয়েছিলেন। এরপরে হামলা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। এন্তার অভিযোগ থাকলেও এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছায়েদুল হক হামলায় তার সম্পৃক্ততার আভিযোগ এবং হিন্দুদের নিয়ে জঘন্য মন্তব্য করেন অস্বীকার করেন অবশেষে। এ হামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ জড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছিল মন্ত্রীর ছত্রছায়ায়, মতান্তরে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির। প্রশাসন ছিল সবকালের মত নিস্ক্রিয়। ঘটনার পর ইউএনও প্রত্যাহার হয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা বহিষ্কার হয়েছেন, কিন্তু আইন-আদালত আমলে আসেননি।

যশোরের মালোপাড়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, আগুন, লুটের ঘটনা হিমাগারে চলে গেছে সেই কবে। ঐ ঘটনায় অভিযোগ ছিল জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ আবদুল ওহাবের দিকে। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছিলেন। ভোটের দিন নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে মালোপাড়ায় হামলে পড়েছিল তার দলবল। এই ঘটনায় অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের সাথেই যুক্ত রয়েছে। কাউকেই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগে কক্সবাজার জেলার রামুতে ১২ টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দির এবং ৪০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর পাশের পটিয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা চলে। এখানেও ছিল ফেসবুক নাটক। কথিত অবমাননাকারী উত্তম বড়ুয়ার শাস্তি দাবি করে প্রথম মিছিল করেছিল ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা আনসারুল ভুট্টো। ৩০ সেপ্টেম্বর সেখানে সমাবেশে হরতাল ঘোষনায়ও ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এরপরে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল বিএনপিও। প্রশাসন ছিল যথারীতি নিস্ক্রিয়। সংখ্যালঘু দলনে কি অপূর্ব ঐক্য!

জমিতে ধান চাষ করবে সাঁওতালরা। সেই ধান কেটে নিয়ে যাবে সংখ্যাগরিষ্ঠরা। বাধা দিলে হামলা। রুখে দাঁড়ালে খুন। রাষ্ট্র-প্রশাসন সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে। আদিবাসী সাঁওতাল নেতা আলফ্রেড সরেনকে মনে আছে? নওগাঁর সাঁওতালদের ধান রক্ষার সংগ্রামে জোতদারদের লাঠিয়ালরা পিটিয়ে হত্যা করেছিল তাকে। হত্যাকারীরা ছিল ক্ষমতাসীন দলের। তারা সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের। হয় বিনপি না হয় আওয়ামী লীগ।

আজ থেকে ১৬ বছর আগে। ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ। বিচার হয়নি সরেন হত্যাকান্ডের। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল সাঁওতাল পল্লী। পুলিশ এসেছিল বটে, তবে খুন, ধংসযজ্ঞের পরে বিরান ভূমিতে। জোতদারদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের সমঝোতা হয়ে যায়। বিচার হারিয়ে যায় কানাগলিতে। ১৬ বছর পর আবার গাইবান্ধায় সাঁওতাল কৃষকদের ওপর চিনিকল মালিকের সন্ত্রাসী ও পুলিশের সম্মিলিত হামলা। চার সাঁওতাল খুন। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ঘর-বাড়ি। এরও বিচার হবে না, এ সত্য জানে সকলে।

তিন. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আসলে কি? এই চেতনার অবয়ব বা আকারটি কি? সংবিধান সেটির অবয়ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা আছে, “… আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষনমুক্ত সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে”…।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা শপথ নিয়েছিলেন সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকার। তার দল ক্ষমতায়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সকলেই শপথ নিয়েছেন সাংবিধানিক আনুগত্যের। যদিও শপথ ভঙ্গের দায়ে আদালতে শাস্তিপ্রাপ্ত দুইমন্ত্রী এখনও মন্ত্রীসভায়। কি করে সংবিধানে বর্ণিত সামাজিক সাম্য ও ন্যায্যতার দিকে এই রাষ্ট্র হাঁটবে? এখানে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংখ্যালঘুদের জন্য তো বটেই, সাধারনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাবান কতিপয় দুর্বৃত্ত।

এইসব ক্ষমতাধর দুর্বৃত্তরা দাপিয়ে-কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। যা খুশি করতে পারছে। তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ নামিয়ে আনছে। এমপির বোন ক্যাডারদের নিয়ে পুলিশ সার্জেন্ট পেটাচ্ছে, পুলিশের কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়ে খবর হচ্ছে। প্রতিপক্ষ না পেলে নিজেরাই মেতে উঠছে খুনোখুনিতে। ক্ষমতাধরদের এখনকার মিশন, দশ টাকা কেজি দরের চাল লুটপাট। এক্ষেত্রে একাকার হয়ে গেছে, রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধি ও কতিপয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা। প্রতিরোধহীন, প্রতিকারহীন, বিচারহীন, জবাবদিহিতাহীন চলছে এইসব কর্মকান্ড।

চার. একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার ও আলবদর-রাজাকারদের মূল টার্গেট ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। মুক্তিযুদ্ধের পরে এরা টার্গেটই থাকলো। শত্রু সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল অর্পিত সম্পত্তি। আদিবাসীদের বলা হয়েছিল বাঙালী হয়ে যাও। যাদেরকে তারা আপন মনে করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির দাবিদার, তাদের স্থানীয় নেতারা দখল করে নিয়েছিল সংখ্যালঘুদের বাড়ি-সম্পত্তি। যে বাড়ি রেখে তিনি ভারতের শরনার্থী হয়েছিলেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, ফিরে দেখলেন, বসত-জমি বেহাত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর এ ধারা অব্যাহত আছে। হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি আতঙ্কে যাদের আপন মনে করে সংখ্যালঘুরা, সেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও বারবার হামলে পড়ছে তাদের ওপর।

এই অপকর্ম মুক্তিযুদ্ধের পর পর শুরু হলেও শেষ হয়নি কোনকালে। ধারাবাহিকতা রয়েছে সবসময়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বাড়ি-জমি দখল করানো হয়েছে সেটেলার বাঙালীদের দিয়ে। খুন-ধর্ষণ-লুট-ডাকাতি এমন কোন নির্মমতা নেই, যা করা হয়নি পাহাড়ী বা সমতলে আদিবাসীদের ওপর। মুখে বলা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতি  ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। রাষ্ট্র সেক্যুলার নয়। বলতে গেলে গায়ে লাগে সকলের, কিন্তু কৃতকর্ম তো ভিন্ন কিছু বলছে না।

সূত্রঃ আমাদের বুধবার

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.