নেতাদের তুষ্ট করার প্রতিযোগিতা লন্ডনেও

July 23, 2013 2:50 amComments Off on নেতাদের তুষ্ট করার প্রতিযোগিতা লন্ডনেওViews: 9
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

২৩/০৭/২০১৩
নেতাদের তুষ্ট করার প্রতিযোগিতা লন্ডনেও

গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশে সভা-সেমিনার প্রতিদিনই হয়। রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যক্তির সুবিধাজনক সময়ে অংশগ্রহণের সদয় সম্মতি আদায়ে খ্যাত-অখ্যাত সংগঠনগুলোর আয়োজকদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সুতরাং, সেই হিসাবে লন্ডনের সেমিনারে এতজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকের উপস্থিতি প্রবাসীদের জন্য ছিল একটা চমৎকার সুযোগ। আর ঝামেলাটা সেখানেই। আগামী নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রবাসীদের মধ্যে তাই নেতাদের চেহারা দেখানোর একটা তাগিদও ছিল। ফলে আমন্ত্রিত না হয়েও সেখানে হাজির হয়ে যান অনেকে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি লোক থাকলে যে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়, আয়োজকেরা সেটা কেন নেবেন সুতরাং, শুরুতেই বিশৃঙ্খলা। এর এক দিন আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের লন্ডনে পদাপর্ণকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর শুনেছি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রতিযোগিতা। পরের দিন ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের এক ইফতারে গিয়ে তিনি এতটাই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন যে স্থানীয় সংবাদপত্রে তাঁর উদ্ধৃতি এসেছে এভাবে, ‘এখানে এতটা অসভ্যতা হবে জানলে আসতাম না।’ নেতাদের তুষ্ট করার এই প্রতিযোগিতা শুধু বিএনপির একক সমস্যা নয়, আওয়ামী লীগেরও। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোয় শৃঙ্খলা কোনো দিন আসবে কি না এবং অপ্রয়োজনীয় নেতাতোষণের সংস্কৃতির কোনো দিন অবসান ঘটবে কি না, তাতে আমার প্রবল সন্দেহ।

রাজনৈতিক আলোচনায় ধর্মীয় উগ্রপš’ার উত্থানের বিপদ প্রশ্নে স্পষ্টতই বিএনপি ছিল কিছুটা অস্বস্তির মুখে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখার প্রশ্নে বিএনপিকে যে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়নি, তাতে আমি কিছুটা অবাক হয়েছি। লর্ড অ্যাভবেরি অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপের উল্লেখ করে বলেন, এগুলো থেকে যা ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাতে তো বিএনপিই আগামী সরকার গঠন করবে। সুতরাং, নিজেদের স্বার্থেই তো তাদের আপসরফা করে নির্বাচনটা নির্বিঘ্ন করা উচিত। লর্ড অ্যাভবেরির মন্তব্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় তাঁদের একটুও বিচলিত বা বিস্মিত হতে দেখিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে ধারাবাহিকতার প্রশ্নটি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌক্তিকতার বিষয়টিতে বিএনপি তাদের অবস্থানটা বেশ জোরালোভাবেই তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে তারা সংলাপ না হওয়ার দায় সরকারের ওপর চাপানোয় কিছুটা সফল হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে হাউস অব লর্ডসে অনুষ্ঠিত একই ধরনের সেমিনারের সমঝোতার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কথা ছিল রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আমাদের দুই দলের মধ্যে সংলাপ হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং সংকট ঘনীভূত হয়েছে। তাঁর সূত্রেই আমরা জানলাম, জাতিসংঘের মহাসচিব সংলাপের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন। তাঁর বিশেষ দূত তারানকো ডিসেম্বর ও মে মাসে যে দুবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তারানকো প্রধানমন্ত্রীসহ উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে কিছুটা আশাবাদী হয়েছিলেন। মির্জা ফখরুলের দাবি, তারানকো তখন নাকি জানিয়েছিলেন যে তিনি সংলাপে সবার আগ্রহের ইঙ্গিত পেয়েছেন। মির্জা ফখরুলের অভিযোগ, সেই আশাবাদে পানি ঢেলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদের নীরবতা যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ বলেই মনে হয়।

নির্দলীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, যেখানে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে মেয়রদের পদত্যাগ করে নির্বাচন করতে হয়, সেখানে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থেকে নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্বাচন হবে-এই যুক্তি ধোপে টেকে না। তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকার দেশ শাসনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল, সংবিধান সংশোধনে তাদের কোনো ম্যান্ডেট নেই এবং সে কারণেই আদালত আরও দুবার তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা চালু রাখার যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটা একতরফাভাবে পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন প্রশাসনের বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া রাজনৈতিক সংকটের যে কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নেই, সেটা মোটামুটি সবাই মানছেন। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের অনুরোধ, সমাধানটা যেন বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা নিজেরাই করেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলীর বক্তব্য এ ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধে ব্রিটিশ এমপিদের দলে টানার চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে উল্টো ফল হচ্ছে। ব্রিটিশ এমপিদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে উৎসাহী হন না, এই আশঙ্কায় তিনি যে মতপ্রকাশ করবেন, তা কারও পছন্দ না হলে তাঁকে দলীয় পক্ষপাতিত্বের জন্য অভিযুক্ত করা হবে। রুশনারা আলীর এই উপলব্ধি তো বাংলাদেশের সুশীল সমাজের অনেকেরই দীর্ঘকালের মর্মবেদনার কারণ। কেননা, আমাদের রাজনীতিকেরা জর্জ বুশের তত্ত্বে বিশ্বাসী, ‘আপনি হয় আমার পক্ষে, নয়তো শত্রুপক্ষে, অন্য আর কোনো পক্ষ নেই বা পথ নেই।’

বিদেশবিভুঁইয়ে এ ধরনের আলোচনার ফোরামগুলোকে রাজনৈতিক দলগুলো যে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটা বেশ আশার কথা। কিন্তু সমস্যা থেকে যাচ্ছে রাজনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। এসব নেতা নিজেদের সাফল্য জাহির করতে যতটা উৎসাহী হন, জবাবদিহিতে ততটা নন। হতে পারে তাঁরা মনে করেন, বিদেশিদের কাছে আমাদের কিছু জবাব দেওয়ার নেই। কিন্তু বিশ্বায়নের কালে সার্বভৌমত্বের সেকেলে ধারণায় আটকে থাকার দিন আর নেই। এখন প্রতিবেশী ছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তের সমস্যাগুলোরও শরিক আমরা সবাই। সুতরাং, বিশ্বের সবার কাছে খোলাসা হওয়ার প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে লর্ড অ্যাভবেরি এবং তাঁর সতীর্থরা বাংলাদেশে দুর্নীতির যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তার কোনো জবাব ছিল না। কর ফাঁকি, বিদেশে অর্থ পাচারের সমস্যা, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক জরিপে বাংলাদেশে দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি, পদ্মা সেতুর প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় দুর্নীতির ভূমিকা ইত্যাদির কথা উঠে এসেছে ওই আলোচনায়। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর বিদেশে সম্পদ পাচারের অভিযোগ নিয়েও কথা বলেছেন লর্ড অ্যাভবেরি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দুর্নীতির এই হতাশাজনক ধারণাকে বদলে দেওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। বিশ্বজুড়ে পরিচালিত ট্রান্সপারেন্সির জরিপ বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র, এমন উদ্ভট যুক্তি দেশের ভেতরে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও বহির্বিশ্বে তা চলে না।

সেমিনারে আওয়ামী লীগের দু-একজন নেতা অবশ্য খুব আস্থার সঙ্গে বলেছেন, নির্বাচন যথাসময়েই হবে এবং বিরোধী দলও তাতে অংশ নেবে। তাঁদের এই আস্থার ভিত্তি কী, তার কোনো ব্যাখ্যা অবশ্য কেউ দিতে পারেননি। শুধু বলেছেন, এসব রাজনৈতিক বিরোধ মিটে যাবে। রাজনৈতিক বিরোধ যদি মেটানোই যায়, তাহলে তা দ্রুত মিটিয়ে নেওয়াই তো ভালো। তাহলে অন্তত বিদেশিদের কাছ থেকে আর সবক শুনতে হয় না। আর কিছু নিরীহ প্রাণও রক্ষা পায়।

কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.