পথিকৃৎ ঐতিহাসিক আরসি মজুমদার

December 3, 2014 8:12 pmComments Off on পথিকৃৎ ঐতিহাসিক আরসি মজুমদারViews: 18
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
শ্রদ্ধাঞ্জলি
পথিকৃৎ ঐতিহাসিক
মনির হোসেন

আরসি মজুমদার নামেই তিনি অধিক পরিচিত। পুরো নাম রমেশচন্দ্র মজুমদার। উপমহাদেশের এ বিখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের ওপর অনেক কাজ করেছেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের ওপরও অনেক কাজ করেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। আজ এ খ্যাতনামা ঐতিহাসিকের জন্মদিন।

তিনি ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার খন্দরপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা হলধর মজুমদার এবং মা বিন্দুমুখী। শুরু থেকেই রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯০৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯১১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অধীনে রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক গবেষণা শুরু হয়। ‘অন্ধ্র-কুষাণ কাল’ নামক অভিসন্দর্ভের জন্য ১৯১২ সালে তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন।
১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নিযুক্ত হন। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘করপোরেট লাইফ ইন এনসায়েন্ট ইন্ডিয়া’ শীর্ষক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ প্রকাশ করে। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে তিনি নতুন প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে ‘আর্লি হিস্টরি অব বেঙ্গল’ নামক তার ছোট একটি বই প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে ‘আউটলাইন অব এনসায়েন্ট হিস্টরি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ (পরবর্তী নাম ‘এনসায়েন্ট ইন্ডিয়া’) প্রকাশিত হয়। এ সময়ে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ফরাসি ও ডাচ্ ভাষা শেখেন। ভিয়েতনাম অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর ‘চম্পা’ (১৯২৭) নামক বই প্রকাশ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লেইডেনের কার্ন ইনস্টিটিউট এবং প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশনালে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি বেলজিয়াম, ইতালি ও জার্মানি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পরিভ্রমণ করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা তাকে বেশ কিছু গ্রন্থ রচনায় সহায়তা করেছিল।

ঢাকায় অবস্থানকালে মজুমদার তিন খন্ডে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা করেন, যেগুলোর মধ্যে প্রাচীনকালের ওপর লেখা প্রথম খন্ড তিনি নিজে সম্পাদনা করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পিত হয় স্যার যদুনাথ সরকারের ওপর। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম খন্ডটি প্রকাশ করে। প্রাচীন বাংলার ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রয়াস হিসেবে এটি বিশ্বব্যাপী পন্ডিত মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ১৯৩৬ সালে রমেশচন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের ১১টি খন্ডে রচিত ‘হিস্টরি অ্যান্ড কালচার অব দি ইন্ডিয়ান পিপল’ ছিল মজুমদারের এক গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। এ প্রকল্পে ৭৫ জন পন্ডে কাজ করেন এবং এদের অনেকের সব খন্ড প্রকাশিত হওয়ার আগেই মৃত্যু হয়। এসব পন্ডিতের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও সিরিজের মোট পৃষ্ঠার অর্ধেকেরও বেশি লিখেছিলেন মজুমদার নিজেই। বৃদ্ধ বয়সে তাকে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের ইতিহাসের ওপর গবেষণা করতে হয়েছে এবং প্রায় ৯ হাজার পৃষ্ঠা, ২৮৩টি প্লেট ও ২০টি মানচিত্রসম্বলিত ওই খন্ডগুলো শেষ করতে হয়েছে।

১৯৫০ সালে তিনি ‘ইন্দোলজি কলেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সেখানে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস’ প্রকল্পে তিনি ভারতীয় সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এ দ্বন্দ্ব তাকে ‘দি সিপয় মিউটিনি অ্যান্ড দি রিভোল্ট অব ১৮৫৭’ (প্রথম খ-, ১৯৫৭) এবং ‘হিস্টরি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ (তিন খন্ড, ১৯৬২-৬৩) নামক চারটি বৃহৎ গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৫ সালে মজুমদার নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি শিকাগো এবং পেনসেলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাসের ওপর শিক্ষা প্রদান করেন। তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে রমেশচন্দ্র মজুমদার একজীবনে যা অর্জন করেছেন তা অতুলনীয়। ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য তিনি শ্রমসাধ্য গবেষণার মাধ্যমে আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন। ইতিহাসচর্চায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তার জন্মদিনে আমরা তাকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি।

এ মহান ঐতিহাসিক ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মনির হোসেন, সংস্কৃতি কর্মী।

সূত্রঃ আলোকিত বাংলাদেশ

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.