পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার কৌশলঃ কারা কোথায় আছেন

August 15, 2017 5:21 amComments Off on পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার কৌশলঃ কারা কোথায় আছেনViews: 10
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রে আইনি লড়াই কানাডায় জনমত সৃষ্টি
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কিনারা করতে পারছে না সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে দেশটির সরকারের আশ্বাস পাওয়া গেছে। কিন্তু জাস্টিস বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। ফলে বাংলাদেশ সরকার রাশেদ চৌধুরীকে দেশে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে। অপরদিকে, কানাডায় পালিয়ে থাকা খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে দেশটির সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য জনমত গঠনের কাজ করছে বাংলাদেশ।

বিদেশে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত এই টাস্কফোর্সে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরত আনার ব্যাপারে অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে  আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘তেমন অগ্রগতি নেই।’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অগ্রগতির প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অগ্রগতি ওইটুকুই।’ তবে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র এ ব্যাপারে যুগান্তরকে জানিয়েছে, রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় সরকার ফেরত দিতে চাইলে তার অ্যাটর্নি আদালতে যেতে পারেন। রাশেদ চৌধুরী সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় ও গ্রিনকার্ড পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে তাকে ডিপোর্ট করা সম্ভব নয়। কাজেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাকে ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার একটি আইনি ফার্ম নিযুক্ত করে রেখেছে।

রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি দিয়েছিল কিনা জানতে চাইলে সূত্রটি জানায়, বিএনপি সরকারের সময় এই ইস্যুটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়া হয়। সেই সুযোগেই রাশেদ চৌধুরী রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন চ্যানেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিষয়টি দেখা হবে’ বলে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়কে আশ্বাস দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ আশ্বাস যথেষ্ট নয়। রাশেদ চৌধুরীকে দেশে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এই অনুমোদন পেতে আইনি লড়াই জোরদার করবে বাংলাদেশ।

সূত্রটি জানায়, তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এলে প্রসঙ্গটি তার সামনেও তোলা হয়েছিল। হিলারি তখন দেশে ফিরে গিয়ে বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারপর আর কোনো সাড়া নেই। এরপর তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশের কাছে ফিরিয়ে না দেয়ার ইঙ্গিতই দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে সব রকমের কৌশলই গ্রহণ করা হবে।

পলাতক আসামিদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং রাশেদ চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা তাদের অবস্থানের কথা স্বীকার করে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের ধারণা- রিসালদার মুসলেহ উদ্দিনও যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম ও আবদুল মাজেদ কোথায় আছেন সে সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। কানাডায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। এ কারণে নূর চৌধুরীকে ফেরত দিচ্ছে না দেশটি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

জানতে চাইলে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার শামীম আহমেদ এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, ‘রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাংলাদেশের জোরালো পদক্ষেপ অব্যাহত আছে। সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা নেয়া হচ্ছে। আমরা আশা করি, ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু অপরাধীদের আশ্রয় দেবে না বলে নীতি গ্রহণ করেছে; সেই নীতির আওতায় বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকেও ফেরত দেবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুনিদের ফিরিয়ে আনতে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও ইন্টারপোলের সহায়তার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কানাডায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডা সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রু–ডোর কাছে নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। ট্রু–ডো এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ আছে বলে জানিয়েছেন। রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কানাডার বিদায়ী হাইকমিশনার বেনয়েত পিয়েরে লারামি। এদিনও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর জন্য কানাডার প্রতি আহ্বান জানান। নূর চৌধুরী নিজেই কানাডায় আইনি লড়াই করছেন যাতে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো না হয়।

কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজানুর রহমান সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেছেন, নূর চৌধুরী কানাডায় নাগরিকত্ব পাননি, শরণার্থী মর্যাদাও পাননি। ২০০৩-০৪ সালের দিকে এসবের জন্য আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কানাডায় ‘প্রি-রিস্ক রিমুভাল অ্যাসেসমেন্ট’ নামের একটা আইন আছে। ঝুঁকি আছে এমন ব্যক্তিরা এ আইনে সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর নূর চৌধুরী এ আইনের আওতায় আবেদন করে কানাডায় আছেন। তিনি আরও বলেন, নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা কানাডায় জনমত গড়ে তুলছি। সেখানে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান চলছে। পাশাপাশি চলছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। পার্লামেন্ট হিলের ক্যাফেটেরিয়ায় নৈশভোজ ও সেমিনারের আয়োজন করে সেখানকার এমপিদের এ ব্যাপারে বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজানুর রহমান আরও বলেন, কানাডায় আলবার্টা প্রদেশের প্রিমিয়ারের (প্রাদেশিক প্রধান) সঙ্গে দেখা করে নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাডানা সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রু–ডোর সঙ্গে আলোচনায় খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ট্রু–ডো তখন শেখ হাসিনাকে বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে।’ ট্রু–ডোর সেই বক্তব্যের সূত্র ধরেই আমরা কানাডার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ছয়জন বর্তমানে পলাতক আছেন। পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আরেক খুনি আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে মারা গেছেন। তার ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত হয়েছেন যে, তিনি মারা গেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তার বিচার বন্ধ করা হয়। আত্মস্বীকৃত এই ১২ খুনিকে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করার পথ সুগম করে। তারপর বিচারের আয়োজন করা হয়। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

যেসব খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তারা হলেন, সাবেক লে. কর্নেল ফারুক রহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), শাহরিয়ার রশিদ খান এবং একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) ও সাবেক মেজর বজলুল হুদা। ঢাকা ও ব্যাংককের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি সাক্ষরের পর বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকলেও সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র ফিরিয়ে দেয়।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে বিভিন্ন মিশনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে। লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় কনস্যুলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তিনি টোকিওতেও দায়িত্ব পালন করেন। রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনকে তেহরান ও জেদ্দায় পোস্টিং দেয়া হয়। লে. কর্নেল আজিজ পাশা রোমে বাংলাদেশ মিশনে প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি নাইরোবিতেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ২ জুন তিনি জিম্বাবুয়েতে মারা যান।
<iframe src=”https://www.facebook.com/plugins/page.php?href=https%3A%2F%2Fwww.facebook.com%2FEkushNewsMedia%2F&tabs=timeline&width=340&height=500&small_header=true&adapt_container_width=true&hide_cover=false&show_facepile=true&appId=143159262947373″ width=”340″ height=”500″ style=”border:none;overflow:hidden” scrolling=”no” frameborder=”0″ allowTransparency=”true”></iframe>

সূত্রঃ যুগান্তর

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.