পুরাণ পিগম্যালিয়ন

December 27, 2013 2:56 amComments Off on পুরাণ পিগম্যালিয়নViews: 12
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

পুরাণ পিগম্যালিয়ন

শান্তা মারিয়া : নিজের ভালোবাসা দিয়ে যিনি জয় করেছিলেন সম্ভব অসম্ভবের সীমানা—তার নাম পিগম্যালিয়ন (Pygmalion)। পিগম্যালিয়নের কাহিনী পাওয়া যায় ওভিদের মেটামরফোসিসে। পিগম্যালিয়নের কাহিনী গ্রিক পুরাণেও ছিল। সেখানে তিনি ছিলেন একজন রাজা এবং দেবী আফ্রোদিতির বিশেষ ভক্ত। তবে গ্রিক পুরাণে এই কাহিনী তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। ওভিদ এই কাহিনীর যে বর্ণনা দেন তা জনপ্রিয়তা পায়।

এই কাহিনীতে মূলত চিত্রিত হয়েছে প্রেমের দেবী ভেনাসের অপার মহিমা। ভেনাসের বা আফ্রোদিতির জন্মস্থান ছিল সাইপ্রাস দ্বীপের নিকটবর্তী সমুদ্রে। এই দ্বীপে ভেনাসের পূজা হতো বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে। সাইপ্রাসের এক যুবক ছিলেন পিগম্যালিয়ন। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা ভাস্কর। তার বিশেষ খ্যাতি ছিল নারীমূর্তি তৈরির জন্য। নারীমূর্তি নির্মাণে খ্যাতি লাভ করলেও তিনি বাস্তব জীবনে নারীদের পছন্দ করতেন না। কারণ তার চোখে পড়ত নারীর হাজারো দোষত্রুটি। কোনো নারীকেই তার চোখে নিখুঁত সুন্দরী বলে মনে হতো না।

অবশেষে তিনি স্থির করলেন এমন এক নারীমূর্তি নির্মাণ করবেন যা শুধু নিখুঁতই হবে না, হবে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। জীবন্ত নারীর যেসব দোষত্রুটি থাকে তা থেকে মুক্ত হবে এই মূর্তি। নারী কত সুন্দর হতে পারে তা তিনি দেখাবেন এই মূর্তির মাধ্যমে। তিনি গজদন্ত দিয়ে নির্মাণ করতে শুরু করলেন সেই মূর্তি। দিনের পর দিন রাতের পর রাত পরিশ্রমের পর সম্পন্ন হলো সেই নারীমূর্তি। দেখতে তা এতই সুন্দর যে, পিগম্যালিয়ন মুগ্ধ হলেন নিজের সৃষ্টিতে। আর শেষ পর্যন্ত নিজের সৃষ্টির প্রেমে পড়লেন তিনি।

দিনের পর দিন কাটতে লাগল আর সেই মূর্তিকে বেশি করে ভালোবাসতে লাগলেন পিগম্যালিয়ন। তিনি সেই মূর্তিকে আলিঙ্গন করতেন, চুম্বন করতেন। তার সঙ্গে কথা বলতেন। তার জন্য উপহার নিয়ে আসতেন। তাকে বিভিন্ন পোশাকে সজ্জিত করতেন। তাকে রাতে তিনি নিয়ে আসতেন নিজের শয্যায়। তার কাছে সে ছিল যে কোনো জীবন্ত মানবীর মতো। সে ছিল তার প্রেমিকা।

কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ মূর্তি তো তার কোনো ভালোবাসারই প্রতিদান দিতে পারত না। পিগম্যালিয়ন গভীর বিষাদে ডুবে যেতে লাগলেন। কারণ তার প্রেমিকা কোনো সাড়াই দিতে পারত না প্রেমিকের শত সোহাগের। তিনি অন্তরের গভীর থেকে জানতেন তার প্রেমিকা এক নিষ্প্রাণ পুতুল মাত্র। সে কোনো দিনই তার ভালোবাসায় সাড়া দেবে না। তবু তিনি তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারলেন না। তার পরিবর্তে কোনো জীবন্ত নারীকে ভালোবাসার কথা ভাবতে পারলেন না। তিনি একান্তভাবে বিশ্বস্ত রইলেন এক পুতুলের প্রতি।

পিগম্যালিয়নের এই ব্যর্থ প্রেম চোখে পড়ল প্রেমের দেবী ভেনাসের। তিনি বুঝতে পারলেন পিগম্যালিয়ন প্রকৃত প্রেমিক। কারণ একমাত্র প্রকৃত প্রেমিকই কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশা না করে নিঃশেষে নিজের ভালোবাসা সমর্পণ করতে পারে।

এদিকে সাইপ্রাসে শুরু হলো ভেনাসের পূজার উত্সব। দেবীর জন্মের পর এই দ্বীপই তাকে প্রথম সাদরে গ্রহণ করেছিল। দেবীকে সাইথিয়াও বলা হতো। সাইপ্রাসে ভেনাসের পূজা হতো সাড়ম্বরে। ভেনাসের মন্দির প্রাঙ্গণে পূজা দিতে আসত অসংখ্য মানুষ। প্রেমিক-প্রেমিকারা আসত দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজেদের প্রেমকে আরও দৃঢ় করতে। যারা এখনও কারো প্রেম লাভের সৌভাগ্য পায়নি তারা আসত দেবীর সুনজর প্রত্যাশা করে। আবার অনেক হতাশ প্রেমিক-প্রেমিকা আসত তাদের প্রেমাস্পদের ভালোবাসা লাভে দেবীর সাহায্য প্রার্থনা করতে।

পিগম্যালিয়ন দেবীর মন্দিরে পূজা দিতে গেলেন। দেবীকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, তার সৃষ্ট নারীমূর্তির অনুরূপ কোনো নারীকে তিনি পাবেন কি না। তবে মনে মনে তিনি চাচ্ছিলেন যেন তার প্রেমিকা-মূর্তিই জীবন লাভ করে। তবে সেটি এতই অসম্ভব প্রার্থনা যে, তিনি সাহস করে তা জানাতে পারলেন না। তবে দেবী তার মনের কথা বুঝে নিতে দেরি করলেন না। দেবী তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। আর তার প্রতীক হিসেবে দেবীর বেদীতে যে অগ্নিশিখা ছিল তা তিনবার উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠল।

পিগম্যালিয়ন ঘরে ফিরলেন। বরাবরের মতোই তিনি স্পর্শ করলেন মূর্তিটিকে। মনে হলো যেন তার স্পর্শে শীতলতার পরিবর্তে পাওয়া গেল উষ্ণতা। তিনি চুম্বন করলেন তাকে। আবার মনে হলো যেন তা মানবীর ঠোঁটের মতো কোমল। পিগম্যালিয়ন মনে করলেন এসবই তার মনের ভুল। কিন্তু তিনি যেন অনুভব করলেন মূর্তির ভিতরে প্রাণের স্পন্দন। পিগম্যালিয়ন এবার জড়িয়ে ধরলেন তার প্রিয়তমাকে। আর তার আলিঙ্গনের ভিতরেই ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল সেই মূর্তি। সে পরিণত হলো রক্তমাংসের এক জীবন্ত নারীতে।

এই অসম্ভব ঘটনায় দারুণ বিস্মিত হলেন পিগম্যালিয়ন। তবে তিনি বুঝলেন, এ সবই দেবী ভেনাসের কৃপা। দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল তার মন। পিগম্যালিয়ন তার প্রেমিকার নাম রাখলেন গ্যালাতিয়া।

পিগম্যালিয়ন ও গ্যালাতিয়ার বিয়েতে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং ভেনাস। তার বরদানে আমৃত্যু সুখে বসবাস করলেন এই প্রেমিক জুটি। প্যাফোস নামে তাদের একটি সন্তান হয়। তার নামে একটি নগরীর নামকরণ করা হয় যেখানে দেবী ভেনাস পূজিত হতেন বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে।

রোমানরা গ্রিকদের মতো কল্পনাবিলাসী ও কাব্যপ্রেমী ছিল না। তাদের মতো তাদের পুরাণও ছিল বাস্তব-ঘনিষ্ঠ। কিন্তু পিগম্যালিয়নের কাহিনীতে প্রমাণিত হয় বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি বিশিষ্ট রোমানরাও ভালোবাসার অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করতে কুণ্ঠিত ছিল না মোটেই।

সূত্রঃ বর্তমান

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.