ফিরে দেখা সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড

November 5, 2013 1:55 pmComments Off on ফিরে দেখা সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডViews: 11
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

স্টাফ রিপোর্টার: ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। সময় সকাল নয়টা। নির্ধারিত সময়ের দরবার হলে সবাই এসে পৌঁছান। মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর  জেনারেল শাকিল আহমেদ দরবার হলে প্রবেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিবুল হক প্যারেড হস্তান্তর করেন। কয়েক মিনিট পর ডিজি ও ডিডিজি মঞ্চে তাদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসেন। ’র কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম সিদ্দিকুর রহমান (ঘটনার আট দিন পর হৃদরোগে মারা যান) কোরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। সবাইকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন মেজর জেনারেল শাকিল। এ সময় তিনি আগের দিনের প্যারেডে অংশগ্রহণকারীদের প্রশংসা করেন। এরপর তিনি ‘অপারেশন ডালভাত’ কার্যক্রম প্রসঙ্গ তোলেন। ডালভাতের ডিএ (দৈনিক ভাতা) সৈনিকেরা ঠিকভাবে পেয়েছে কি না, তাও জানতে চান। কিন্তু সৈনিকদের জবাব ছিল কিছুটা বিষণœœ ও ক্ষীণ। দরবারে সাধারণত সৈনিকদের এধরনের মানসিকতা দেখা যায় না।
সকাল সাড়ে ন’টা, ডিজি বক্তৃতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক সিপাহী (মাঈন, ১৩ ব্যাটালিয়ন) আকস্মিকভাবে মঞ্চে উঠেই ডিজি’র দিকে অস্ত্র তাক করে। মুহূর্তের এ ঘটনায় উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দরবার হলে হট্টগোল শুরু হয়। ওই সময় ডিজি মাথা ঘুরিয়ে থাকালে ওই সৈনিক প্রায় জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার  জেনারেল বারী ও কর্নেল আনিস অস্ত্র নিয়ে আগন্তুক সিপাহী নিরস্ত্র করে ধরে ফেলেন। প্রায় একই সময় আরেক সিপাহী (কাজল, ৪৪ ব্যাটালিয়ন) একই দিক থেকে এসে মঞ্চে  উঠে।  তিনি কোথাও না  থেমে মঞ্চের দক্ষিণ পাশের জানালার কাচ ভেঙে বাইরে চলে যান। তখন বাইরে একটি গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। দরবার হলে প্রায় তিন হাজার সৈনিক এবং জেসিও ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সবাই  জানালা-দরজা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে পড়েন। অনেক কর্মকর্তাও ওই সময় দরবার হল থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। তখনও বোঝা যাচ্ছিল না পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নিচ্ছে। ডিজি, ডিডিজি, সব সেক্টর কমান্ডার, সব পরিচালক, তিনজন মহিলা ডাক্তার, সাত-আটজন লে. কর্নেল, ১৫-১৬ জন মেজর, দু’জন ক্যাপ্টেন, কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর, আরপি জেসিও, এনএসএ, ডিএডি ফসিউদ্দীন, বিডিআর মসজিদের দুই ইমাম, তিন-চারজন সিপাহীসহ ৪৫-৫০ জন দরবার হলে থেকে যান। ১৫-২০ মিনিট পর দরবার হলের পূর্ব-দক্ষিণ কোণ থেকে আবারও গুলির আওয়াজ। একই সঙ্গে ‘ধর ধর’ চিৎকার শোনা যায়। ওই সময় দরবার হলের ভেতর সামনের লোকজন দৌড়াদৌড়ি করে বের হয়ে যান। এদিকে সিপাহী মঈনকে কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের জুতার ফিতা দিয়ে হাত পা বেঁধে ফেলেন। মঈন তখনও অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে। ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল কর্মকর্তাদের বলেন, সবাইকে যেন আবার দরবার হলের ভেতর ডেকে আনা হয়, দরবার আবার শুরু হবে। বিদ্রোহীরা তখন দরবার হল ঘিরে ফেলে। নয়টা ৪০ মিনিটের দিকে দরবার হলের বাইরে থেকে কয়েকটি গুলির আওয়াজ পাওযা যায়। তখন ডিজি শাকিল বলেন, ‘কে ফায়ার ওপেন করছে? তাদের ফায়ার করতে নিষেধ করো। সিচুয়েশন ট্যাকল হয়েছে। এর মধ্যে দেখা গেল লাল-সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিডিআর সৈনিকেরা দরবার হল ঘিরে কিছুক্ষণ পর পর গুলি করছে। তখন দরবার হলের জানালা খুলে কর্নেল গুলজার, কর্নেল এমদাদ, লে. কর্নেল এরশাদ এবং লে. কর্নেল কামরুজ্জামান চিৎকার করে বলেন, ‘তোমরা ফায়ার করো না, যার যার পজিশনে ফেরত যাও।’ এ সময় দেখা যায়, অনেক সৈনিক দৌড়ে এসে এসব সৈনিককে গুলি সরবরাহ করছে। একটি পিকআপ এ সময় রাস্তা দিয়ে দরবার হলে পাশের মাঠে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে কাচ ভেঙে গুলি দরবার হলের ভেতর ঢুকছিল। কর্মকর্তারা আত্মরক্ষার্থে কেউ দেয়াল ঘেঁষে, কেউ পিলারের আড়ালে আশ্রয় নেন। দরবার হলের দিকে গুলি হচ্ছে দেখে মেজর মো. মাকসুদুল হক ক্রলিং করে দরবার হলের পূর্বদিকে (গাড়ি থামার বারান্দা) নিচে পৌঁছে যান। সেখানে ৮-১০ জন সৈনিক ও ধর্মীয় শিক্ষক গুলি থেকে বাঁচতে শুয়েছিলেন। সেখান থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ৫ নম্বর ফটকের দিক থেকে মাথায় লাল কাপড় বাঁধা একজন সিপাহী পোর্চের দিকে গুলি করতে থাকে। ধর্মীয় শিক্ষকের সঙ্গে শুয়ে থাকা  সৈনিকদের একজন তখন ‘আমরা সিপাহী’ বলে চিৎকার করে। জবাবে গুলি বর্ষণকারী চিৎকার করে বলে, ‘সিপাহীরা, সব মাথার ওপর হাত তুলে দৌড়ে এলাকা ত্যাগ করো।’ তখন এসব সিপাহীর সঙ্গে মেজর মাকসুদও মাথার ওপর হাত তুলে দৌড় দেন এবং সামনের আবাসিক কোয়ার্টারের পেছনের দেয়াল টপকে বাইরে চলে যান। এ সময় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ডিজি শাকিল কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর (এসএম) নুরুল ইসলামকে বলেন, ‘আপনি তো কোনোদিন সৈনিকদের এ রকম ক্ষোভ আছে একবারও বলেননি!’ তখন কেউ একজন ডিজিকে বললেন, ‘স্যার, গাড়ি লাগানো আছে, আপনি চলে যান।’ ডিজি বলেন, ‘আমি কোথায় যাব এবং কেন যাব?’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকা সেক্টর কমান্ডার এবং ঢাকার অধিনায়কদের উদ্দেশে বললেন, ‘ইউ অল রাশ টু দ্য ইউনিট অ্যান্ড গেট ব্যাক ইউর পিপল এবং সবার সঙ্গে কথা বলো অ্যান্ড ট্রাই টু মটিভেট দেম।’ এরপর ঢাকা সেক্টর কমান্ডার ও অধিনায়কেরা দরবার হল থেকে নিজ নিজ ইউনিটের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর ডিজি মাইকে ঢাকা সেক্টর কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক এবং সুবেদার মেজরদের নিজ নিজ ব্যাটালিয়নে কোতের (অস্ত্রাগার) নিয়ন্ত্রণ নেয়ার এবং  সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ দেন। তাদের শান্ত করারও পরামর্শ দেন তিনি। এ সময় ঢাকার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুজিব, ৩৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এনায়েত ও ১৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল বদরুল নিজ নিজ ইউনিটের দিকে রওনা দেন। এর মধ্যে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা চারদিক থেকে দরবার হলের দিকে বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে। তখন দরবার হল থেকে কিছু কর্মকর্তা ও বিডিআর সদস্য বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করে বের হয়ে পড়েন। দরবার হলে ডিজি, ডিডিজি, সব সেক্টর কমান্ডার, পরিচালক, সদর দপ্তর ও বিডিআর হাসপাতালের কর্মকর্তা এবং ডাল-ভাত কর্মসূচি ও প্যারেড উপলক্ষে সংযুক্ত কর্মকর্তারা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। গোলাগুলি বাড়তে থাকলে কর্মকর্তারা পর্দার পেছনে মঞ্চের দুই পাশে আশ্রয় নেন। একপাশে দক্ষিণ দিকে তিন মহিলা কর্মকর্তা এবং লে. কর্নেল লুৎফর রহমান খান, লে. কর্নেল রবি, লে. কর্নেল বদরুল হুদা, মেজর জাহিদসহ আরও কয়েকজন। অন্যপাশে ডিজি, ডিডিজি, লে. কর্নেল কামরুজ্জামান ও আরও ক’জন ছিলেন। মেজর জায়েদী কিছুক্ষণ উত্তর পাশে, পরে দক্ষিণ পাশে অবস্থান করেন। মঞ্চের পর্দার ভেতরে যাওয়ার সময় কর্নেল আনিস ও লে. কর্নেল কামরুজ্জামান বেঁধে রাখা সৈনিক মাঈনকে টেনে পর্দার ভেতরে নিয়ে যান। এ ছাড়া অনেকে হলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের টয়লেটের দিকে বিভিন্ন আড়ালে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল রেজা, কর্নেল আফতাব, কর্নেল আরেফিন, কর্নেল এমদাদ, লে. কর্নেল সাজ্জাদ, মেজর ইকবাল, মেজর মনির, মেজর মাকসুমসহ আরও অনেকে। তখন মেজর সালেহ, মেজর জায়েদী, কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর, নায়েব সুবেদার অ্যাডজুটেন্ট ও কর্নেল আনিস (ডিওটি) একটু পর পর মাইকে কথা বলে উত্তেজিত  সৈনিকদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন।  সকাল ন’টা ৪৮ মিনিটের দিকে ডিজি শাকিল আহমেদ ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। সবাই যার যার মোবাইল ফোনে বাইরে যোগাযোগ করছিলেন। তখন জেনারেল শাকিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে সবাই চুপ করে থাকেন। শাকিল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক আপনার সরকারকে হেয় করার জন্য বিদ্রোহ করেছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি দু’দিন ধরে চলে হত্যা ও তাণ্ডব।  খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয় বিডিআর-এ কর্মরত সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। বাদ যায়নি নারী ও শিশুরাও। ভয়ে অনেকেই লুকিয়ে ছিলেন বাথরুমে, ঘরে রাখা খাটের নিচে। কেউবা আলমিরার ভেতরে। সেখান থেকে তাদেরকে ধরে এনে বিডিআর জওয়ানরা গুলি করে হত্যা করে। এদের মধ্যে কারও কারও লাশ পাইপ লাইন দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় বাইরে। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ এই ঘটনায় পিলখানার বাইরে রিকশাচালক, শিক্ষার্থীসহ ১৭ জন  বেসামরিক লোক প্রাণ হারান। দু’দিনের এই নরহত্যায় নিহত হন ৭৪ জন। সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পর পোশাকসহ একসঙ্গে পুঁতে রাখা হয় মাটিতে। বিদ্রোহী জওয়ানরা আত্মসমর্পণ করার পর মাটি খুঁড়ে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.