ফ্যাশনে রবি ঠাকুরের নারীরা

May 5, 2014 6:04 pmComments Off on ফ্যাশনে রবি ঠাকুরের নারীরাViews: 108
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
ফ্যাশনে রবি ঠাকুরের নারীরা
ছায়া কমল

নৌকো-গলার ফুলহাতা বস্নাউজের সঙ্গে নকশি পাড়ের দেশি তাঁতের শাড়ি। মাঝখানে সিঁথি সাজিয়ে সামনে চুল সেট করে পেছনে লম্বা বেণি। কপালে ছোট একরঙা টিপ, কানে দুল, গলায় চিকন চেইনে ছোট্ট লকেট আর হাতে দু’গোছা চুড়ি। এমন সাজে সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা মেয়েটির নাম লাবণ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতার লাবণ্য। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফ্যাশন সচেতনতা ফুটে ওঠে তার উপন্যাস আর ছোটগল্পের পরতে পরতে। বিশেষ করে তার নায়িকাদের সাজপোশাকে আধুনিকতা যেন রবি ঠাকুরের ব্যক্তিত্বকেই উপস্থাপন করে। তার সময়কার সেই ফ্যাশন স্টাইল একালের নারীদের কাছেও খুব প্রিয়।

রবি ঠাকুর যেন শাশ্বত বাংলার ফ্যাশন বিষয়ে তখনই দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। তার ‘মধ্যবর্তিনী’ গল্পে নিবারণের ছোট বউ শৈলবালার সাজের বর্ণনার দিকে একবার চোখ দেয়া যাক_ ‘শৈলবালাকে ডাকিয়া প্রথমে আপনার বিবাহের বেনারসি শাড়িখানি পরাইল, তাহার পর তাহার আপদমস্তক এক একখানি করিয়া চুল বাঁধিয়া প্রদীপ জ্বালিয়া দেখিল, বালিকার মুখখানি বড়ো সুমিষ্ট, একটি সদ্য পক্ব সুগন্ধ ফুলের মতো নিটোল, রসপূর্ণ।’ অর্থাৎ রবীন্দ্র যুগেও বিয়েতে কনের পোশাকের ক্ষেত্রে বেনারসি শাড়িকেই প্রাধান্য দেয়া হতো।

অন্যদিকে ‘সুভা’ গল্পে বাকপ্রতিবন্ধী সুভাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এলে কনে দেখার সাজে দেখা যায়, ‘সুভার মা একদিন সুভাকে খুব করিয়া সাজাইয়া দিলেন। অাঁটিয়া চুল বাঁধিয়া, খোঁপায় জরির ফিতা দিয়া, অলঙ্কারে আচ্ছন্ন করিয়া তাহার স্বাভাবিক শ্রী যথাসাধ্য বিলুপ্ত করিয়া দিলেন।’ সে সময়ে মেয়েদের কেশবিন্যাসে খোঁপার বাহার ছিল দর্শনীয়। বিভিন্ন আঙ্গিকে সাজিয়ে তোলা হতো খোঁপা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প-উপন্যাসের নায়িকারা খোঁপায় রুপোর কাঁটা ব্যবহার করতেন, যা এখনকার মেয়েদেরও পরতে দেখা যায়। তবে তাদের ব্যবহারের ধরনটা একটু ভিন্ন। বেণি করে খোঁপা বাঁধার সময় নেই তাদের। খানিকটা স্টাইলিশ আবার কেউবা এলোমেলোভাবে খোঁপা বেঁধে রুপোর বদলে নানা নকশার কাঠ, মেটাল বা প্লাস্টিকের কাঁটা বা ক্লিপ গুঁজে দেন। রুপোর কাঁটার নকশায়ও নতুনত্ব এসেছে। নানা উৎসবে তারা খোঁপার শোভা বাড়াতে ব্যবহার করেন বাহারি কাঁটা। সেইসঙ্গে কানের একপাশের চুলে ক্লিপ দিয়ে আটকে দেন রঙবেরঙের তাজা ফুল। অথবা খোঁপায় জড়িয়ে দেয়া হয় গাজরা বা বেলি ফুলের মালা।

একহারা ঢঙের চওড়া পাড়ের তাঁতের শাড়ি অথবা বেনারসি শাড়ির সঙ্গে হাই গলার থ্রি কোয়ার্টার অথবা ঘটি হাতার কুচি করা বস্নাউজ_ এ রকম পোশাক পরা কাউকে দেখলেই ঠাকুর বাড়ির বউ-ঝিদের কথা মনে ওঠে। কিংবা মনে হতে পারে রবি ঠাকুরের সৃষ্ট কোনো সেরা নারী চরিত্রের কথা।

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বউ-ঝিদের শাড়ি পরার ঢঙ, গহনা, সাজসজ্জা বাঙালি নারীর জীবনে যেন অহরহ খুঁজে পাওয়া যায়। সে সময়ে ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা নানা ঢঙে শাড়ি পরতেন। একহারা ঢঙের শাড়ি পরে অাঁচলের অংশের ভাঁজগুলো পরিপাটি করে কাঁধের কাছে ব্রোচের সাহায্যে আটকে নিতেন। অনেকে আবার শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে পেটিকোট গুঁজে দিতেন। দেখতে যেন কুচির মতো লাগত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজ ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ঠাকুর বাড়িতে প্রথম কুচি দেয়া শাড়ি এবং শাড়ির সঙ্গে শেমিজ পরার প্রচলন করেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের নারীদের মতো রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস ও নাটকের নারীরাও ফ্যাশনে যুগ যুগ ধরে বাঙালির রুচিবোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

‘নষ্টনীড়’-এর নায়িকা চারুলতা। শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ঘরের বউ। তার সাজসজ্জা পোশাক-আশাকে সেই রুচিশীলতার ছাপ প্রকাশ পায় সব সময়। পরনে দেশি তাঁত অথবা ঐতিহ্যময় জামদানি শাড়ির সঙ্গে রঙবেরঙের লেইস লাগানো ফুলহাতার বস্নাউজ। গায়ে সোনার গহনা। হাতে চুড়ি, বালা, গলায় কয়েক লহরের চেইন, কানে দুল, নাকে নথ, আলতা পরা পায়ে মল, লম্বা সিঁথি কেটে সামনের দু’পাশের চুলগুলো একটু ঢেউ খেলিয়ে বেণি করে সেই বেণি পেঁচিয়ে খোঁপা বাঁধা। সেই খোঁপা আবার ছোট ছোট সোনালি কাঁটা দিয়ে সাজানো।

অন্যদিকে ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী যেন চিরায়ত বাঙালি নারীর স্নিগ্ধ রূপ। ছোট্ট হাতার কুচি দেয়া বস্নাউজের সঙ্গে দেশীয় তাঁতের শাড়ি, হাতে-কানে-গলায়-মাথায় রক্তকরবী ফুলের গহনা এবং পিঠজুড়ে খোলা চুল সবাইকে মুগ্ধ করে। আর ‘চোখের বালি’র আশালতা যে বনেদি পরিবারের বউ, তা তার জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা আর চালচলনে বোঝা যায়। সিল্কের কাপড়ে কুচি দেয়া থ্রি কোয়ার্টার হাতার বস্নাউজের সঙ্গে পরনে ঢাকাই শাড়ি মসলিন, কারুকার্যময় চওড়া পাড়ের তাঁতের শাড়ি। অাঁচলে রুপার চাবির গোছা, গলায় লম্বা হার, হাতভর্তি সোনার চুড়ি, নাকে বড় নথ, পায়ে নূপুর, উঁচু চূড়ো খোঁপা। খোঁপায় রুপোর নকশি কাঁটা। সব মিলিয়ে আশালতার সাজসজ্জায় আভিজাত্যের পাশাপাশি রুচিবোধেরও পরিচয় মেলে।

‘ঘরেবাইরে’ উপন্যাসের নায়িকা বিমলা সাধারণ পরিবারের মেয়ে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান নিখিলেশের স্ত্রী। বিয়ের পর বিমলা নিজেকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পান_ ঠিক রবি ঠাকুরের নিজের মতো করেই।

তাই বলে ‘হৈমন্তী’ গল্পের সাদাসিধে হৈমন্তীর খালি পায়ে বধূ সেজে বসে থাকা যে রবি ঠাকুরের পছন্দের বিষয় ছিল না, তা নয়। সে ও পরেছিল তাঁতের শাড়ি। সে শ্বশুর-শাশুড়ির গঞ্জনা সহ্য করেও নিজেকে যতটা সম্ভব সাজিয়ে রেখেছিল স্বামীর মন গলাতে।

‘মালঞ্চ’ নাটকের নীরজা অসুস্থ হলেও তার পরনে দেখা যায় লেইসের সুচি দেয়া থ্রি কোয়ার্টার হাতার বস্নাউজের সঙ্গে চওড়া পাড়ের দামি তাঁতের শাড়ি। গায়ে সোনার গহনা, হাতভর্তি চুড়ি, কানে দুল, গলায় লম্বা হার, পায়ে আলতা। তার পোশাকের ধরন মিলে যায় ‘চিরকুমার সভা’ নাটকের স্পষ্টবাদী নায়িকা নির্মলার সঙ্গেও।

আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বাঙালিই। আর এ কারণেই তিনি বাঙালি নারীকে পোশাক-পরিচ্ছদে অনন্য করে তুলেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। আর তাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলেন উর্বশীর মতোই। এ কারণে তিনি নিজেই যেন গেয়ে ওঠেন- ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ সুন্দরী রূপসী/হে নন্দনবাসিনী উর্বশী’।

মডেল : বাধন, রুবা ও ফাহমিদা পোশাক ও গহনা : আড়ং মেকআপ : বিন্দিয়া আলোকচিত্রী : ওয়ালিদ বিন হোসেন স্টাইলিং : ফয়েজ হাসান
সূত্রঃ আলোকিত বাংলাদেশ

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.