বাংলাদেশে উবার নিষিদ্ধ: উবার’কে নিয়ম মেনেই আসতে হবে: সেতুমন্ত্রী 

November 25, 2016 6:56 pmComments Off on বাংলাদেশে উবার নিষিদ্ধ: উবার’কে নিয়ম মেনেই আসতে হবে: সেতুমন্ত্রী Views: 6
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

উবার’কে নিয়ম মেনেই আসতে হবে: সেতুমন্ত্রী

অ্যাপভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা ‘উবার’কে স্বাগত জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা উবারের বিপক্ষে নয়। তবে উবারের মতো আধুনিক এ পরিবহন ব্যবস্থা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আসতে হবে।

 

শনিবার সকালে বনানীর কাকলী বাসস্ট্যান্ডে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ‘সড়ক নিরাপত্তা ক্যাম্পেইনে’ সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।  

 

ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা উবার নিয়ে এসেছে, তারা সরকারের কাছে এটি পরিচালনায় অনুমতি নেয়নি। একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে এটিকে জনগণের সেবায় আনতে হবে। সরকার এমন ডিজিটাল ব্যবস্থাকে অবশ্যই স্বাগত জানায়।তবে তা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আসতে হবে।

 

মন্ত্রী বলেন, সড়কে ফ্রি স্টাইলে গাড়ি চালানো যাবে না। যারা মোবাইলে ইয়ার ফোন কানে দিয়ে মধুর গানের সুরে সুরে গাড়ি চালান তাদেরকে সাবধান করা হচ্ছে। তারা এসব অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

 

তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালাতে হবে, একই সঙ্গে পথচারীদের সচেতন হতে হবে রাস্তা পারাপারে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতাই জান-মালের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।

 

সড়ক নিরাপত্তায় গণসচেতনতায় এসময় অ্যাম্বাসেডর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মডেল অভিনেতা মনির খান শিমুল, চলচ্চিত্র অভিনেতা মিশা সওদাগর, ওমর সানি, লিটু আনাম, সঙ্গীতশিল্পী এসআই টুটুল।

 

এছাড়া গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ  ও বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

​উবার নিয়ে বিআরটিএ’র তুঘলকি কাণ্ড!

হিটলার এ. হালিম

রাজধানী ঢাকায় সদ্য চালু হওয়া অ্যাপনির্ভর কার সেবা ‘উবার’-কে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) অবৈধ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিআরটিএ দ্রুতগতিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় অনেকেই বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে কোনও পক্ষকে বিশেষ সুযোগ করে দেওয়া হলো কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ কেউ বিআরটিএকে দুষছেন এই বলে যে, সিএনজি চালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য না কমিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে চালু হওয়া সাশ্রয়ী বাহন উবারকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বেশিরভাগ ফেসবুক পোস্টদাতা উবারের প্রশংসা করে বলেছেন, এই বাহন মধ্যবিত্ত যাত্রীকে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের একটা উপলক্ষ করে দিয়েছিল। বিআরটিএ-র এই সিদ্ধান্তে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। 

প্রসঙ্গত, উবার হলো অ্যাপভিত্তিক একটি ট্যাক্সি ক্যাব সেবা। যাত্রী তাদের স্মার্টফোনে গুগল প্লে থেকে উবার অ্যাপ ডাউনলোড করে ডাকতে পারবেন ট্যাক্সি। সেই ট্যাক্সিতে যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছে ভাড়া মেটান নগদ টাকা বা কার্ডের মাধ্যমে। উবার ট্যাক্সি সার্ভিস হলেও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনও গাড়ি নেই। তারা বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও চালককে উবারে নিবন্ধন করে যাত্রীসেবা সার্ভিস চালু করে। এই গাড়ি ও যাত্রীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করিয়ে দিয়ে উবার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন বা সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে গাড়ির মালিকের কাছ থেকে।  

বিআরটিএ শুক্রবার গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ঘোষণা দেয় উবার অবৈধ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনলাইনভিত্তিক ট্যাক্সি সার্ভিস ‘উবার’ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে যা মোটরযান আইন ও বিধির পরিপন্থী। এ ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট ‘উবার’ মালিক ও চালকগণকে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। অন্যথায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় স্মার্টফোনে ট্যাক্সিসেবা ‘উবার’ চালু হলো ঢাকায় শীর্ষক প্রকাশিত সংবাদের প্রতি বিআরটিএ-র দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। বিআরটিএ তথা সরকারের অনুমোদন ব্যতীত কোনও ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি, অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিআরটিএ-র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা হয়ে থাকে ‘ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস গাইড লাইন-২০১০’ অনুযায়ী। কোনও কোম্পানি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করলে তাকে অবশ্যই​ বিআরটিএর মাধ্যমে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। ভাড়ায় চালিত বা রেন্ট এ কার হিসেবে পরিচালিত মোটরকার ও মাইক্রোবাস পৃথক সিরিজে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এ ছাড়া মোটরযান বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি মোটরকার ও মাইক্রোবাসের পৃথক রঙ (কালো বডি ও হলুদ টপ) থাকা এবং মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রুট পা​রমিট গ্রহণ বাধ্যতামূলক। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ’র পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ট্যাক্সি ক্যাব ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে।  উবার এই সেবা বিআরটিএ –এর অনুমতি ছাড়া চালু করেছে। এটা গুরুতর অন্যায়। এই ধরনের ট্যাক্সি সার্ভিস চালু বাংলাদেশ আইনে (ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন-২০১০) অনুমোদিত না।’

মো. নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘উবার ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিদেশে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন না।’ উবারকে এ দেশে ব্যবসা করতে দিলে ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন-২০১০ পরিবর্তন করতে হবে বলে তিনি জানান।  

এদিকে উবারের জনসংযোগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটি থেকে জানানো হয় দুই-একদিনের মধ্যে  বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হবে। তবে পরবর্তীতে উবার থেকে পাঠানো বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বলেছেন, ‘উবার একটি প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যা বিশ্বের ৭৪টি দেশের ৪৫০টি শহরের নাগরিক যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে স্মার্টফোনে অ্যাপসের মাধ্যমে। বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল লক্ষ্যমাত্রায় তাল মিলিয়ে সরকারের সঙ্গে আমরা কাজ করতে চাই। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের শহরগুলোতে আমরা এ অনন্য সেবা চালু করতে চাই।’

এ বিষয় জানতে চাইল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যেকোনও ধরনের সেবার আবির্ভাবকে স্বাগত জানাই।প্রথমত বিআরটিএ এটা কেন বন্ধ  করবে তার কোনও কারণ দেখি না। এটা একটা সার্ভিস, জনগণকে দেওয়ার জন্যই। আর আমার জানা মতে দেশে এমন কোনও আইন নেই যে, একটা অ্যাপ চালু করা যাবে না। অ্যাপটি জনগণের জীবনকে সহজ করে তুলছে, ফলে এটা চালু রাখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় বিআরটিএ ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিসের জন্য একটা বিধিবিধান মেনে চলে। মনে হয় সেই বিধিবিধানের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’  বিআরটিএ-কে এই মনোভাব থেকে সরে এসে জনগণের সেবার মনোভাবের প্রতি মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান তিনি।

চাকরিবিষয়ক ওয়েবসাইট বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উবার কি সে সম্পর্কে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের সঠিক কোনও ধারণা নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত উবার গ্রাহক থেকে টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত টেকনিক্যালি উবার নিজে কোনও ট্যাক্সি বা রেন্ট-এ-কার সার্ভিস দিচ্ছে না। উবার-এর বিজনেস মডেল হচ্ছে ট্যাক্সি বা রেন্ট-এ-কার মালিকদের কাছ থেকে রেফারেল ফি বা কমিশন নেওয়া। আইনগতভাবে এক্ষেত্রে অনেকটা ই-কমার্স বা এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য ফেসবুক যেমন একটি প্লাটফর্ম, উবারও সেরকমই একটি প্লাটফর্ম।

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘উবার ভালো করেই জানে এই আইনগত ব্যাপারটি। না জানার কোনও কারণ নেই। তারা গত এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা বাংলাদেশের জন্য দুটি জিনিস করেছে – প্রথমত তারা শুধুমাত্র রেন্ট-এ-কার লাইসেন্স যাদের আছে তাদেরকেই রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে গাড়ির মালিক বা ড্রাইভার হিসাবে। এটি তারা করেছে যাতে যে কোনও আইনগত দায় গাড়ির মালিকের কাছে থাকে। আইনগত ভাবে রেন্ট-এ-কার মালিক এই ক্ষেত্রে প্রধান পার্টি উবার থেকে শুধু প্লাটফর্ম আর রেফারেল সার্ভিস নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত উবার সচেতনভাবে ক্রেতার সাথে সরাসরি কোনও আর্থিক লেনদেনে যাচ্ছে না (যেটি বিদেশে উবার করে থাকে- ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল পেমেন্ট দিয়ে)। এই দিক থেকেও উবার নিজে কোনও পার্টি না।’

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক ফেসবুকে লিখেছেন, বিআরটিএর কর্মতৎপরতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। এরা উবার চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়িমড়ি করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছে যে, উবার বাংলাদেশের ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন -২০১০ অনুসরণ করছে না তাই উবার বেআইনি সার্ভিস, বাংলাদেশে উবার চালানো যাবে না।বিষয়টি দেখে আমার সেই পাগলের কথা মনে পড়ল, যে একটা হাতে কাগজ নিয়ে ঘুরে বেড়াত আর চিল্লাতো, বউ নাই তো কী হয়েছে, এই যে হাতে কাবিন আছে।’

দুটি গোষ্ঠীর হাতে দেশের ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসা জিম্মি উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, এই দুই দলেরই পরিবহন সেক্টরে ন্যূনতম কোনও অভিজ্ঞতা নেই। এরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্যাক্সি নামাতে পারেনি, আমি গত দুই মাসে আমার চলাচলের পথে একটাও হলুদ ট্যাক্সি দেখিনি- সুতরাং এর অপর্যাপ্ততা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। বিআরটিএ এখন সেই ট্যাক্সি সার্ভিসের দোহাই দিয়ে এই দেশে উবার চালু হতে দেবে না।

আরিফ জেবতিক আরও লিখেছেন, দেশে উবার চালু হওয়ার সপ্তাহ যেতে না যেতে বিআরটিএ কেন বিজ্ঞপ্তি দিতে লাফিয়ে পড়ে, সেটা বুঝতে হলে বড় বিশারদ হতে হয় না। উবার সমর্থন করি, গণপরিহনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হওয়া প্রতিটি ছোটবড় উদ্যোগকে সমর্থন করি।

ফিরে আসুক উবার

তুষার আবদুল্লাহ

ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে বছর তিনেক আগে প্রথম ‘উবার’ নামটি শুনি। তখন ‘উবার’ ধারণাটি মাত্র প্রকাশ হচ্ছিল। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে উদ্ভুত এই ধারণাটি কোম্পানিতে রূপ নিয়েছে, তাও বেশিদিন হয়নি।
কোম্পানিটি তার প্রচার-প্রসারের কাজ শুরু করেছে কেবল। বাংলাদেশের এক তরুণ প্রকৌশলী তখন কাজ করেন ‘লিঙ্কন্ড ইন’এ। তিনি আমাকে গুগল, ফেসবুক ঘুরে দেখিয়ে যখন ‘লিঙ্কন্ড ইন’ ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খাওয়াতে বসলেন, তখনই জানালেন- তিনি উবারে যোগ দিচ্ছেন। সঙ্গে বুঝিয়ে দেন এই উবার কিভাবে কাজ করবে। অলস বসে থাকা গাড়ি বা গাড়ির মালিক কিভাবে শহরের গণপরিবহন চাহিদা মেটাতে পারেন, সেই আয় করতে পারবেন বাড়তি কিছু, সেই ধারণাটি শুনে মুগ্ধই হয়েছিলাম।
মুগ্ধতার সঙ্গে মন খারাপ হয়েছিল এই ভেবে যে, আমাদের ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে যেমন যানজট তাতে অলস বসে থাকা গাড়িকে কে রাস্তায় নামাবে? ভাবনায় এটাও ছিল আমেরিকায় অলস বসে থাকা গাড়ির মালিক যাত্রী পরিবহন করতে তার মান-সম্মান নিয়ে ভাববেন না। সেখানকার সমাজেরও এ বিষয় নিয়ে ভাববার বিন্দুমাত্র ফুরসত নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে কোনও চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, কোনও প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ কি অবসর সময়ে উবার চালক হবেন? তিনি তো তার  সামাজিক স্ট্যাটাসের কথাই ভাববেন। জাত গেল জাত গেল বলে… বাঙালিরতো অনেক কিছুই হলো না। এই ভাবনা নিয়েই সেইবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিরেছিলাম।
বছর না ঘুরতেই দেখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক শহরে স্মার্টফোন ভিত্তিক ট্যাক্সিসেবা উবার চালু হচ্ছে। সবার মুখে উবারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। উবার  সেবায় গ্রাহকরা সন্তুষ্ট। যে সব শহরে দীর্ঘদিন থেকে ট্যাক্সি সেবা চালু ছিল, কিন্তু ট্যাক্সিচালক বা সেবার নানা রকম বিড়ম্বনায় পড়তেন যাত্রীরা তারা উবার পেয়ে খুশি। পাশের শহর কলকাতাতেও উবার বাজিমাত করেছে। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন দেখতে গিয়ে দেখলাম হলুদ-সবুজ সকল রঙের ট্যাক্সি চালকরা চিন্তিত। তাদের আয় রোজগারে ভাটা পড়েছে। যাত্রীরা ট্যাক্সি না ডেকে উবার ডাকছেন। নিজেও উবার ডেকে দেখলাম অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী এবং সেবার মানও ভালো। আমেরিকা থেকে ফিরে এখনও উড়োজাহাজ যাত্রার ক্লান্তি এবং দিবা-রাত্রীর গড়মিলের ঘোর কাটেনি। চারদিন আগে ‌এক সাংবাদিক বন্ধু, এখন বিজ্ঞাপন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ফোন দিয়ে বললেন- একটি ব্রেকিং নিউজ দেই। ঢাকার রাস্তায় উবার নামছে আজ থেকেই। কথা সত্যি ঢাকার রাস্তায় উবার। প্রথম যাত্রী হয়েছেন ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখলাম সবাই উবারকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এবং বন্ধুদের অনেকে, যাদের গাড়ি আছে তারা উবার সেবা দেওয়ার জন্য অ্যাপসে যেয়ে নিজের নাম যুক্ত করছেন। একদিন বাদেই দেখি তাদের কেউ কেউ উবার সেবা দিয়ে আয়ের খবরও জানাচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ঢাকায় টেক্সি সেবা চালু হয়েছিল। নাগরিকদের ভোগান্তি-বিড়ম্বনা ও নিরাপত্তাহীনতার সর্বোচ্চ উপহার দিয়ে রাস্তা থেকে উঠে গেছে একের পর এক কোম্পানি। বেশ কিছু সময় পর স্বল্প সংখ্যায় কিছু টেক্সি-ক্যাব রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু তা সাধারণের সাধ্যের বাইরে। গণমানুষের জন্য ট্যাক্সি নামানোর নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর, উবার চালু হয়েছে। মনে হলো উবার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে একটি প্রতিবেদন করা দরকার। বিশেষ করে উবার সেবার সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্ত। রিপোর্টার মাঠে গেল। তার সঙ্গে বিআরটিএ এবং পুলিশের কেউ কথা বলে না। কারণ তারা উবার কী সেটাই জানেন না। কখনও শুনেননি উবারের কথা এমন কর্মকর্তাও আছেন। রিপোর্টার নিরাশ হয়ে ফিরে আসার পর আমি পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করে অনুরোধ করি- উবার বিষয়ে মন্তব্য দেওয়ার জন্য। তিনি আমার কাছেই জানতে চান উবার কবে চালু হলো? তারপর আমাকে টেলিফোনে রেখেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইন্টারকমে উবারের কথা বললেন। বুঝতে পারলাম ওই কর্মকর্তাদের কারও উবার সম্পর্কে জ্ঞান নেই। তিনি ওই কর্মকর্তাদের উবার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বললেন। ওয়েব সাইট ঘাটতে বললেন। তারপর আমাকে জানালেন আমরা নিজেরা একটু বুঝে নেই তারপর কথা বলি। আমি শুধু তাকে বললাম আর্ন্তজাতিক একটি অনলাইন ভিত্তিক একটি ট্যাক্সিসেবা রাজধানী চালু হয়ে গেল, আর আপনারা টেরই পেলেন না? আপনারা আছেন নাকি নাই? ওই কর্মকর্তা ফোন রেখে দেন আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে।

দ্বিতীয় দিনেও পুলিশ এবং বিআরটিএ কোনও মন্তব্য করেনি। তবে বৃহস্পতিবার ২৪ নভেম্বর বিআরটিএর একজন পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি শুক্রবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই বিবৃতিতে স্মার্টফোন ট্যাক্সিসেবাকে অবৈধ, বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তি দেখে সাধারণ নাগরিকেরা আর হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। বিআরটিএ’র জ্ঞান এখনও ট্যাক্সি সেবা বলতে কালোবডি হলুদ টপেই সীমিত। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে বলতে গলা ভেঙে আসা আমলাতন্ত্র নিজেদের দুর্নীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, এমন ডিজিটাল সেবাকে আতুঁড় ঘরেই মেরে ফেললেন। বিআরটিএ এবার যেভাবে লাফিয়ে উঠে উবারকে ঝেঁটে দিলো, তা দেখেও নগরবাসী বিস্মিত। যার আঙ্গিনায় প্রতিদিন সকাল-বিকাল অবৈধ রুটপারমিট দেওয়া হচ্ছে, ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, যে শহরে সকলের নাকের ডগা দিয়ে রুটপারমিটহীন যানবাহন চলছে, লাইসেন্স না নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, অবৈধ জরাজনীর্ণ গাড়ি চলছে সেই শহরের বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশ উবারকে ক্রসফায়ারে ফেলতেই পারে। তারা উবারকে অবৈধ না বলে, নিজেরা উবারের এই অনলাইন সিস্টেমের সঙ্গে নিজেদের আত্মীয়তা তৈরি করতে পারতো। যদি প্রকৃতঅর্থেই তারা যাত্রীবান্ধব প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী হয়ে থাকেন।

শেষ কথা হলো উবার কোনও সবুজ সংকেত ছাড়া পথে নিশ্চয়ই নামেনি। রাষ্ট্রের কোনও না কোনও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। সেই কর্তৃপক্ষ নিশ্চিয়ই এখন সজাগ হবেন। আর যদি তা না হয়ে উবার দুঃসাহসিক ভাবেই পথে নেমে পড়ে থাকে, তাহলে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা ট্রাফিকের নজরদারীর গলদটাই প্রকাশ্যে এসে যায়। যাইহোক সব অংকের হিসেব চুকিয়ে ভাগশেষে বলতে চাই-সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ সেবা দিতে বিআরটিএ এবং পুলিশ উবারকে প্রশ্রয় দিতেই পারেন। আজকে না হয় দুর্নীতির স্বার্থে উবার ফিরিয়ে দিলেন। কাল আরেকটি ডিজিটাল অ্যাপসে আপনার দুর্নীতি ধরা পড়বেই। অতএব আজই হোক না আত্মসমপর্ণ। আমরা কিছু মনে করবো না।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/বাংলা ট্রিবিউন

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.