বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আদালতে ফারমার্স ব্যাংক

January 18, 2016 8:16 pmComments Off on বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আদালতে ফারমার্স ব্যাংকViews: 18
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আদালতে ফারমার্স ব্যাংক
ফখরুল ইসলাম | ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬ 

image

ঋণের তথ্য গোপনের দায়ে বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংককে জরিমানা করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত তা আদায় করতে পারছে না। ফারমার্স ব্যাংক জরিমানা না দিতে আদালতে গেছে। আদালত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট আবেদন করার ঘটনা দেশে এটাই প্রথম বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি সরকারি হিসাব-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিরও সভাপতি। গত রোববার এই কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি নানা অনিয়মের কারণে ফারমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফারমার্স ব্যাংকের পক্ষে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ জানুয়ারি বিচারপতি তারিকুল হাকিম ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ স্থগিতাদেশ দেন। একই দিন ফারমার্স ব্যাংকের আইনজীবী অনুপম বিশ্বাসের নোটসহ বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দিয়ে তা জানায় ফারমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট আবেদন করার ঘটনা দেশে এটাই প্রথম
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী গতকাল সোমবার এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
জরিমানা আরোপের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে আসা ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়মের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইবিএল সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজ, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ, কাজী ইক্যুইটিজ, বিডি সিকিউরিটিজ ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল নামক ছয়টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ফারমার্স ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ৩৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ব্যাংকের শাখাগুলোতে তা ‘ঋণ ও অগ্রিম’ হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে ব্যাংক দেখিয়েছে ‘অন্যান্য বিনিয়োগ’ হিসেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০১৫ সালের ৩০ জুনভিত্তিক ব্যাংকের ঋণ আমানতের অনুপাতের নেতিবাচক চিত্র আড়াল করতেই ফারমার্স ব্যাংক এ কাজ করেছে, যা আসলে উইন্ডো ড্রেসিং (হীন স্বার্থে তথ্য বাড়িয়ে-কমিয়ে দেখানো)। গত ২০ অক্টোবর এক চিঠিতে ফারমার্স ব্যাংকের কাছে বিষয়টির ব্যাখ্যা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফারমার্স ব্যাংক ৩ ডিসেম্বর জবাব দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা সন্তোষজনক মনে হয়নি। জবাবে ফারমার্স ব্যাংক অপেশাদারি আচরণ করেছে এবং তথ্য আড়ালের চেষ্টা করেছে।
৩ জানুয়ারি ফারমার্স ব্যাংককে এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দেয়, ব্যাংক সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে ও পরিকল্পিতভাবে ঋণের তথ্য গোপন করায় ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১০৯ (১১) ধারা অনুযায়ী ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। ১০ দিনের মধ্যে চেকের মাধ্যমে এ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, দণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক মতিঝিল অফিসের সঙ্গে রক্ষিত ফারমার্স ব্যাংকের হিসাব থেকে তা বিকলন করা হবে।
অনিয়মটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানোর কথা বলা হয়। এ নির্দেশ আগেও একবার দেওয়া হয়েছিল বলে চিঠিতে ফারমার্স ব্যাংককে স্মরণ করিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আর, এসবের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টে যায় ফারমার্স ব্যাংক। ফারমার্স ব্যাংকের পক্ষের আইনজীবী অনুপম বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে গতকাল রাতে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক জরিমানা আরোপ করেছে সমর্থিত তথ্যের ভিত্তিতে এবং স্বপ্রণোদিতভাবে।’ জরিমানা আরোপের আগের প্রক্রিয়াগুলোও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুসরণ করেনি বলে অনুপম বিশ্বাস মনে করেন।
তবে এ নিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন ধরেননি। বিষয়বস্তু উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও জবাব দেননি তিনি।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোশতাক আহমেদের বাসায় ফোন করা হলে বলা হয়, তিনি বাসায় নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতে যে কেউ যেতেই পারেন, সেটা তাঁর অধিকার। কিন্তু সংক্ষুব্ধ হলে আগে সাধারণত পরিচালকেরা আদালতে যেতেন। জরিমানা না দিতে কোনো ব্যাংক আদালতে গেছে, সে রকম আমার মনে পড়ে না।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন উচিত হবে, ভালো আইনজীবী নিয়োগ করে আদালতে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করা।
আরও কিছু অনিয়ম: ৩ জানুয়ারির চিঠিতে ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোশতাক আহমেদকে আরও কিছু অনিয়মের কথা জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের নেতিবাচক তথ্য-উপাত্ত থাকা সত্ত্বেও রুবেল ব্রাদার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে চার কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, নির্বাহী কমিটি এবং শাখা জেনেশুনে আমানতকারীদের অর্থকে ঝুঁকিগ্রস্ত করেছে।
চিঠিতে বলা হয়, অ্যাপোলো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো মাল্টি পারপাস এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের জনতা ব্যাংকের একটি ঋণ হিসাব ২০১৪ সালের জুলাইয়ে শ্রেণীকৃত হলেও তিন মাস পরে সেপ্টেম্বরেই নিয়মিত হয়েছে। সিআইবি প্রতিবেদন না নিয়েই ফারমার্স ব্যাংক আরসি-এসটিসি জয়েন্ট ভেঞ্চার নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। এ থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে জনতা ব্যাংকে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা গেছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতার অনুকূলে ঋণসুবিধা দিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করেছে।
প্রাইম ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মোহাম্মদ খালেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ড টেকনোলজির অনুকূলে ঋণ মঞ্জুরির সীমা ১০ কোটি টাকার পরিবর্তে স্থিতি ছিল ১১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এ ছাড়া অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান অনামিকা ইন্টারন্যাশনাল ও অনামিকা এন্টারপ্রাইজকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। জামানত রাখা সম্পত্তির অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়েছে স্কাই লিমিট এন্টারপ্রাইজ ও পারুল কনস্ট্রাকশন নামক প্রতিষ্ঠানের।
রনক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রেজাউল করিমকে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ৮ লাখ ২ হাজার ডলার মূল্যের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে দেওয়া হয়েছে। এলটিআর সীমা ৫ কোটি টাকার বিপরীতে ১৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
প্রধান কার্যালয় আদুরী হাউজিং লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানকে ঋণের অর্থ ছাড়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও শাখা তা ছাড় করেছে। ব্যাংকের শৃঙ্খলার জন্য এগুলো হুমকিস্বরূপ।
সিয়াম এন্টারপ্রাইজ, আলিফ স্টিল করপোরেশন এবং রুট ইন্টারন্যাশনাল নামক তিনটি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর টয়েনবি সার্কুলার রোডের একটি ভবনের ৮, ৯ ও ১০ তলার প্রতি বর্গফুট ফ্লোরের মূল্য দেখিয়েছে ৩১ হাজার টাকা। অথচ ২০১৩ সালেই এ সম্পত্তি কেনা হয় প্রতি বর্গফুট ৪ হাজার ৪৮৭ টাকা হিসেবে।
এ ছাড়া এইচ এম এন্টারপ্রাইজ, এলাইট টেকনোলজিস, সেঞ্চুরি ভিউ ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানগুলো এক খাতের কথা বলে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে তহবিল সরিয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকটি পুষ্প এন্টারপ্রাইজ, পাথর বিতান, মেক্সিল ফেব্রিকস, স্পিড টেকনোলজি ও ইঞ্জিনিয়ারিং, লাকি টিম্বার ও লাকি অটোডোর, জিবেক ট্রেডিং, হোটেল লেকভিউ প্লাজা, ইমেক্সিন ট্রেডিং নামক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযৌক্তিক মাত্রায় ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয় চিঠিতে।

পাঠকের মন্তব্য (৭)
মহম্মদ সালাউদ্দিন
চার মাস পরেই ফারমার্স ব্যাংক মজা টের পাবে।
  ০    ০
Masuk Uddin
That’s called power.
 
Mohammad Younus
হায়রে! আর কত!

রফিক, সরফদিনগর, ঝিটকা, মানিকগঞ্জ।রফিক, সরফদিনগর, ঝিটকা, মানিকগঞ্জ।
ফারমার্স ব্যাংক আদালতে গিয়েও সুবিধা করতে পারবে না কারণ তারা অনিয়ম করেছে।
  ০    ০
Mohammad Shakhawat Hossain
বযংলাদেশে কি কেউ নেই আদালতে পিটিশন দায়ের করবে যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি ব্যাংকের একটি চেয়ারম্যান কেন সঙসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান থাকবেন? কেন তাকে ৬০ মিনিটের মধ্যে অপসারন করা হবে না???
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
জোর যার মুল্লুক তার !!
 
G M KibriaG M Kibria
থোরাই কেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকে।
 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.