বাবা আমাকে সমৃদ্ধ, সাহসী ও অকুতোভয় হতে শিখিয়েছেন:

February 27, 2016 11:44 pmComments Off on বাবা আমাকে সমৃদ্ধ, সাহসী ও অকুতোভয় হতে শিখিয়েছেন:Views: 20
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

বাবা আমাকে সমৃদ্ধ, সাহসী ও অকুতোভয় হতে শিখিয়েছেন: অভিজিৎকন্যা
বিদেশ ডেস্ক
১৮:২৯, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৬

এক বছর আগে একুশে বইমেলা থেকে বেরিয়ে আসার পথে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার অভিজিৎ রায়কে। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ভূমিকাসহ একটি লেখা প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। প্রয়াত এ লেখককে নিয়ে লিখেছেন তার সৎ কন্যা তৃষা আহমেদ।
এক বছর পর আজ বাবাকে স্মরণ করলেও সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি কিছুতেই মনে করতে চান না তৃষা।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তৃষা লিখেছেন, তার বাবা তাকে সমৃদ্ধ, সাহসী আর অকুতোভয় হতে শিখিয়েছেন। প্রিয় মানুষটি চলে গেলেও বন্ধুসুলভ বাবার সেই শিক্ষাই পাথেয় হয়ে আছে তার।

সিএনএন ভূমিকায় লিখেছে, আজ থেকে ঠিক একবছর আগে, একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে অনেক মানুষের সামনেই দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন অভিজিৎ। তার অপরাধ? তিনি ছিলেন একজন ব্লগার। ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে তিনি লেখালেখি করতেন। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে ‘নাস্তিক’ চিহ্নিত করে হামলা চালায় এবং হত্যা করে। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে আরও কয়েকজন ধর্মনিরপেক্ষ লেখককে একই কায়দায় হত্যা করা হয়।

অভিজিতের সৎকন্যা জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তৃষা আহমেদ তার বাবার স্মৃতি ও সেদিনের হামলার কথা লিখেছেন, যা তিনি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন…
তৃষার ভাষায়, যে দেশ নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ দাবি করে সেই দেশে বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রাণ দিয়ে তিনি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন’।

তৃষা লিখেছেন, কিছু সময়ের জন্য, তাকে ‘বাবা’ বলতে অদ্ভুত লাগতো। কারণ, তিনি ছিলেন মজার একজন মানুষ। ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষা শেষে গ্রীষ্মে আমরা নতুন বাসায় উঠি। বাড়ির পেছন থেকে তিনি আমাকে দুটি লম্বা লাঠি এনে দিলেন। চ্যালেঞ্জের সুরে বললেন ‘তলোয়ার লড়াই’- এর কথা। বললেন, তোমাকে পেটাতে আমার অনেক ভালো লাগবে, আমিও কৃত্রিম ঠাট্টার সুরে পাল্টা উত্তর দিলাম। সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত আমরা এই কাঠের তলোয়ার দিয়ে লড়াই চালিয়ে গেলাম।

প্রতিবার হেরে গেলেও আমি মানতে চাইতাম না। আবার খেলা দাবি করতাম এবং আমি প্রতিবারই আমি হেরেছি। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তুমি আমাকে কখনই জিততে দাও না? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি চাও না আমি তোমাকে আমার সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করি?’

যদিও আমার বাবা কম্পিউটার প্রোগ্রামারের চাকরি করতেন কিন্তু বাসায় ফিরে তিনি হয়ে যেতেন একজন লেখক। তার বইগুলো ছিল সমকামিতার নেপথ্যের বিজ্ঞান নিয়ে, ধর্মীয় উগ্রপন্থার ‘ভাইরাস’ সম্পর্কে। বাংলাদেশের মূলধারায় ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক আলোচনাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার ফলে সুপরিচিত একজন অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

একাদশ শ্রেণিতে ন্যাশনাল এপি পরীক্ষার এক মাস আগে, আমার ক্যালকুলাস শিক্ষক চলে গেলেন। চলে যেতে হচ্ছে বলে তিনি দুঃখও প্রকাশ করলেন। কিন্তু তিনি এটা এজন্যই করেছেন যে, হাই স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তার যথেষ্ট উপার্জন হচ্ছিল না।

বাবা ও আমি একটি চুক্তিতে পৌঁছালাম। তিনি আমাকে ক্যালকুলাস ও পদার্থবিদ্যায় সাহায্য করবেন, যদি আমি তার লেখাগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিই।

আমি বলতাম, ‘বাবা, এ বাক্যগুলো বিদঘুটে! তুমি কীভাবে এ ধরণের ব্যাকরণ দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছ?’ তিনি বলতেন, ‘তৃষা, প্লিজ শুধু সম্পাদনা করে যাও। বিষয়বস্তু ভালো।’ আসলেই সবসময়ই এর বিষয়বস্তু চমৎকার ছিল। আমরা একটি ভালো কাজ করছিলাম।

প্রতি ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় একটি জাতীয় বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা আমার মা-বাবার নিজ শহর। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে, তারা আমাকে বাল্টিমোরের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার দেখে গেলেন। এখানে আমি এখনও শিক্ষার্থী। তারা আমার জন্য এক বাক্স উপহার নিয়ে এলেন। এসব উপহারের মধ্যে ছিল চকলেট, কাপড়, নোটবুক, কলম। কিন্তু তাদের কিছু দিতে না পেরে আমার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছিল। দ্রুত আমার ব্যাকপ্যাক থেকে দু’টো স্কার্ফ নিয়ে তাদের উপহার দিলাম।
পুরোটা রাত আমার বাবা ওই স্কার্ফ পরে ছিলেন। আমার মা কৌতুক করে আমাকে বললেন, তুমি তাকে যখনই নতুন কোনও জিনিস দাও, সে এটা ভীষণ গর্ব নিয়ে পরে!

২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা। তত্ত্বীয় নিউরোসাইয়েন্সের লেকচার ক্লাসের একেবারে পেছনের দিকে বসলাম। দুপুরে আমার ফোনে বাংলাদেশ থেকে আমার কাজিনদের পাঠানো তিনটি আনরিড করা মেসেজ দেখতে পেলাম।

আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এল। আমার শরীর কেঁপে উঠলো। আমার রুমমেটকে ফোন দিলাম। সে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে, তুমি ঠিক আছো? আমি জবাব দিলাম, ‘আমার বাবা মারা গেছে। মা বাংলাদেশে আইসিইউতে।’

২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ফুলে যাওয়া লাল চোখ নিয়ে ফেসবুকে লিখলাম: ‘আমার বাবা ছিলেন একজন বিখ্যাত বাংলা লেখক। বিজ্ঞান ও নাস্তিক্যবাদ নিয়ে লেখার জন্য তিনি বেশ পরিচিত। তার বইয়ের প্রচারের জন্য গত সপ্তাহে তিনি ও আমার মা বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ১৫ ঘণ্টা আগে, মৌলবাদীরা আমার বাবাকে কুপিয়ে খুন করেছে। আমার মা মারাত্মকভাবে আহত। তিনি এখনও হাসপাতালে। বাবার মৃত্যু এখন বাংলাদেশে খবরের শিরোনাম।

এটা আমি যতটা না নিজের জন্য শেয়ার করেছি, তার চেয়ে বেশি করেছি আমার বাবার জন্য। পৃথিবীর অধিকতর ভালোর জন্য তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন।

আমার ৬ বছর বয়সে বাবা ও মা প্রেম করতেন। পরের ১২ বছরে, তিনি আমার বন্ধু, নায়ক, সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী, নাচের সহযোগী (যদিও আমরা দু’ জনই খুবই বাজে নাচতাম) এবং আমার পিতায় পরিণত হন। তিনি আমাকে কখনই শান্ত হতে বা আরও ভদ্র হতে বলেননি। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন সমৃদ্ধ, সাহসী ও অকুতোভয় হতে।

আমি ক্ষুব্ধ বা আমার হৃদয় ভেঙে গেছে বললে কম বলা হবে। কিন্তু দুনিয়াটা যত বাজেই হোক না কেন, একে আরেকটু ভালো বানানোর লড়াই বন্ধ রাখার কোনও কারণ নেই। তিনি আমাকে যা শিখিয়েছেন, যে ভালোবাসাটা দিয়েছেন, আমি চিরকাল তা বয়ে বেড়াব। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা। প্রত্যেকটা জিনিসের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। শব্দকে হত্যা করা যায় না।’

হ্যাশট্যাগ দিয়ে তৃষা লিখেছেন #‎WordsCannotBeKilled.

তৃষা আহমেদ লিখেছেন, তার এ শব্দগুলোই মানুষ দেখেছে। কিন্তু তারা যা দেখেনি, তা হচ্ছে, প্রতি রাতে আমাকে ঘুমের ওষুধ খেতে হয়েছে। এটা এজন্যই খেতে হয়েছে যে, আমি যেন এমন দুঃস্বপ্ন না দেখি যে, বাবা নিজের রক্তের ওপর পড়ে আছেন। তারা যেটা দেখেনি সেটা হচ্ছে, মাকে আর দেখবো না বলে বা তাকে আর আগের মতো পাবো না বলে আমার দুঃশ্চিন্তা।

ওই দিনটাতে আমি সারাদিন বাংলাদেশি চ্যানেলের খবর দেখে কাটিয়েছি। দেখেছি, হাজারো মানুষ আমার বাবার মুখ ব্যানারে এঁকে তার খুনের বিচার দাবিতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন। মানুষ দেখেনি, একটা মেয়ে ছিল যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।

৩ মার্চের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এলে প্রথমে আমি মাকে চিনতে পারছিলাম না। তার মাথা ছিল ন্যাড়া। রাত ১০টার দিকে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়েছিলাম। তিনি চিকিৎসকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন এফবিআইয়ের এজেন্ট এবং একদল নিরাপত্তারক্ষী। সন্দিগ্ধভাবে দেখলাম, যিনি তার হুইলচেয়ার ঠেলছিলেন তার সঙ্গে তিনি মজা করছেন। আমার গ্র্যান্ডফাদার তাকে দেখে ফুঁপিয়ে উঠলেন। ব্যান্ডেজের ওপর দিয়েই বার বার করে তার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

মায়ো ক্লিনিকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানকার ডাক্তাররা তার ব্যান্ডেজ খুলে দেন। তার সেলাইয়ের ওপর আমার দৃষ্টি পড়লো। তার মাথায় চারবার ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই সরাসরি তার মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারেনি। হামলায় তার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কাটা পড়েছে।
যখন তিনি ভাবতেন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তখন তিনি কান্নাকাটি শুরু করতেন। তিনি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তার বাহুর নিচে আমার আঙুল রাখতাম।

২২ মার্চ আমি একা ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। বন্ধুদের কাছে বলি, আমার মা এবং আমি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারি। মা আমাকে একা কোথাও যেতে না করেছেন; সেটা দিনের যে কোনও সময়েই হোক না কেন! আর রাতের বেলায় কোথাও যেতে মানা। আমি এফবিআইয়ের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিলেও আমি আশঙ্কায় ভুগছিলাম।

৩ মে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার এক ভিডিওতে ইসলামের নামে অভিজিৎ রায়কে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। আমি জানি আল কায়েদা, আইএস এবং অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু আমি লেখা দিয়েই মোকাবেলা করে যাবো। এই লেখা দিয়েই আমি-আমরা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হওয়া অপশক্তির আদর্শ ছুড়ে ফেলবো’।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.