বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই

June 26, 2015 1:33 amComments Off on বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেইViews: 6
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই

বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই

অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও বাতাসে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের গ্যাসের প্রভাবে সৃষ্টি হয় কালো মেঘের। আর এই কালো মেঘই বজ্রপাত সৃষ্টির প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টির সময় বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন মৌলিক ও যৌগিক গ্যাসের পরিমাণ বেশী থাকার কারণে অতিরিক্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটত। ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে এ সব গ্যাসের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে পৃথিবী ও এর বায়ুমণ্ডল জীবের বসবাসের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি অর্থাৎ ঝড় ও বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে প্রচুর বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। আর এতে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণ। সম্প্রতি কয়েক বছরে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আতংকিত অনেকেই।শুধু এ বছরের মে ও জুন মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত দ্য রিপোর্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সারাদেশে বজ্রপাতে ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতকে সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনা না করে বজ্রপাতের কারণ নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে। আর বজ্রপাতের ক্ষতি রোধেও প্রতিকার খুঁজতে হবে। তবে এখনো পর্যন্ত বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কোনো দফতরের কাছে। আর সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করায় বজ্রপাত প্রতিরোধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষ মৃত্যুর সংখ্যা। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশী।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। আর বজ্রপাতজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন। ঝড়-বৃষ্টির দিনে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা স্বাভাবিক হলেও সম্প্রতি এর পরিমাণ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। আর এই অস্বাভাবিকতার কারণ হিসেবে কালো মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারও বজ্রপাতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, স্বাভাবিক বায়ুতে ৭৮ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ নাইট্রোজেন, ২০ দশমিক ৯৫ ভাগ অক্সিজেন, দশমিক ৯৩ ভাগ আর্গন ও দশমিক শূন্য ৩৯ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড ও সালফারসহ সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস থাকে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে ৬৪-১৪৩ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড বিদ্যমান। আর প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড রয়েছে ২৫-৩২ মাইক্রোগ্রাম। যা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী।

এদিকে, মে-জুন মাস কালবৈশাখী ঝড়ের মৌসুম হলেও বড় কোনো ঝড় বা বৃষ্টিপাত ছাড়াই সামান্য ঝড়ো বাতাসের সঙ্গেই ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। আর এতে করে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ।

ঝড়ো বাতাসের প্রভাবে দ্রুতগতির কালো মেঘের মধ্যে ঘর্ষণ ও সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হওয়া ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। ইলেকট্রনের প্রবাহকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বিদ্যুৎ বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদা মেঘের উপাদানের অধিকাংশই জলীয়বাষ্প বা পানির কণা হয়। ফলে সাদা মেঘে ঘর্ষণের বা সংঘর্ষের ফলে যথেষ্ট ইলেকট্রন সৃষ্টি হয় না। কিন্তু কালো মেঘে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বেশী থাকায় দ্রুত গতির কারণে এ সব যৌগিক গ্যাসের মধ্যে সংঘর্ষে প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয়। আর এ সব ইলেকট্রন বাতাসের জলীয়বাষ্পের মাধ্যমে ভূমিতে চলে আসে এবং সৃষ্টি হয় বজ্রপাতের।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে অতিমাত্রায় নাইট্রোজেন, সালফার ও কার্বন গ্যাসের নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ সব গ্যাস মেঘের জলীয় কণার সঙ্গে মিশে যায়। মে-জুন মাসে ঋতু পরিবর্তনের কারণে বাতাসে প্রচুর জলীয়বাষ্প সৃষ্টি হয়। ফলে স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহের কারণে এ সব জলীয়বাষ্প উপরের দিকে উঠতে থাকে। এতে কালো মেঘের মধ্যকার ঘর্ষণে তৈরী হওয়া ইলেকট্রন বা বিদ্যুৎ এ সব জলীয় কণাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ভূমিতে চলে আসে। কালো মেঘে থাকা যৌগিক গ্যাসগুলো রোদের তাপে এবং বাতাসের দ্রুতগতির কারণে প্লাজমা (বিক্রিয়ার অনুকূল) অবস্থায় থাকে। এতে সামান্য ঘর্ষণ বা সংঘর্ষে এ সব যৌগ গ্যাস পরস্পরের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটায়। ফলে সৃষ্টি হয় প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রনের। মেঘের জলীয় কণায় এ সব গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে ইলেকট্রন বা বিদ্যুৎ সৃষ্টির পরিমাণও ততটা বাড়বে।

বজ্রপাতের কারণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান ও বর্তমান সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. আব্দুল মতিন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ছয় হাজার বার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। তবে এ সব বজ্রপাতের বেশীরভাগই ঘটে থাকে সমুদ্র, পর্বতমালায় কিংবা বনাঞ্চলে বিশেষ করে রেইন ফরেস্ট অঞ্চলগুলোতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি মহাবিশ্ব ও পৃথিবী সৃষ্টির সর্বজন গ্রহণযোগ্য যে মতবাদটি আছে অর্থাৎ বিগ ব্যাং তত্ত্বটি দেখি তাহলে দেখা যাবে, মহাবিশ্বে প্রথমে এক পরমাণুক (এটমিক) হাইড্রোজেন গ্যাস ছিল। যা ছিল আয়নিত (বিক্রিয়ার অনুকূল) অবস্থায়। প্রথম হাইড্রোজেনের দু’টো প্রোটন মিলিত হয়ে হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয়। এরপর এই দু’টো গ্যাসের মধ্যে বিক্রিয়ায় বিশাল একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এরপর বিস্ফোরণে ছিটকে পড়া এ সব গ্যাস পুনঃবিক্রিয়ার মাধ্যমে আরও বেশ কিছু মৌলিক ও যৌগিক গ্যাসের সৃষ্টি হতে থাকে। এভাবে এক প্রকার চেইন বা শিকল বিক্রিয়ার মাধ্যমে এ সব উত্তপ্ত গ্যাস ঘনীভূত হতে থাকে। পরে তা কঠিন মৌলিক ধাতু, ধাতু যৌগে পরিণত হয়ে পৃথিবী সৃষ্টি হয়। শুরুতে পৃথিবীর চার পাশের যে বায়ুমণ্ডল ছিল তা জীবের বসবাসের অনুকূল ছিল না। এ সময় বায়ুতে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেনের মতো মৌলিক গ্যাসের পাশাপাশি সালফার, কার্বন ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের পরিমাণও বেশী ছিল। এ সব গ্যাস ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয় কালো মেঘের, যা বৃষ্টিপাত ঘটায়। বায়ু প্রবাহের সঙ্গে এ সব কালো মেঘ কখনো বিপরীত মুখ থেকে কখনো একটি স্তরের উপর আরেকটি স্তর চলে যাওয়ায় পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ বা ঘর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে করে সালফার ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে। বিস্ফোরণাকারে জলকণাসহ এ সব বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন এসিড, যা বৃষ্টির পানির মাধ্যমে ভূমিতে পড়ে। আমরা যাকে এসিড বৃষ্টি বলে থাকি। একই সঙ্গে এ সব বিক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন সৃষ্টি হয়। আর ইলেকট্রনই হল তড়িৎ বা বিদ্যুৎ। ইলেকট্রন সব সময় সুপরিবাহী পদার্থ যেমন— ধাতু ও পানির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া ইলেকট্রন বৃষ্টির জলীয় কণার মাধ্যমে ভূমি চলে আছে। এবং অনুকূল একটি মাধ্যমের সাহায্যে এই বিদ্যুৎ মাটিতে চলে যায় (যাকে আমরা আর্থিন বলে থাকি)। আসলে বজ্রপাতের ইলেকট্রনগুলো যখন কোনো মাধ্যম না পায় তখন সেগুলো সব উঁচু স্থান বা ধাতব বস্তুতে আকর্ষিত হয়। তাই ঝড় বৃষ্টির সময় ফাঁকা জায়গায় মানুষ বা পশু থাকলে বজ্রপাতের ঘটনা তাদের উপরই ঘটে থাকে। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ শাসন আমলে যখন বাংলাদেশের মৌজা পরিমাপ করা হয়েছিল তখন ধাতব পিলার বিভিন্ন সীমানায় স্থাপন করা হয়েছিল। উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন শংকর ধাতুর এ সব পিলার বজ্রপাত ঘটলে সেগুলো টেনে নিত। পরবতী সময়ে পিলারগুলো চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে বজ্রপাত সচরাচর মানুষসহ অন্যান্য পশুপাখির উপরে ঘটছে। সরকারিভাবে এই ধরনের পিলার বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হলেও আমরা চাইলেও না দেওয়ার কারণে— তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়নি।’

মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে বজ্রপাতের পরিমাণও ততটা বাড়তে থাকবে। আর ভূমিতে বজ্রপাত ঘটার পেছনে অপরিকল্পিত মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ারও দায়ী।’

এই প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘মোবাইল টাওয়ারগুলো উচ্চতার কারণে বজ্রপাতের প্রথম শিকার হওয়ার কথা। কিন্তু আর্থ কানেকশন (ভূ-সংযোগ) ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং বজ্রপাতের বিদ্যুতের প্রবাহকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বা প্রযুক্তি এ সব টাওয়ারে রয়েছে। একই সঙ্গে এ সব টাওয়ার অত্যধিক ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড (তড়িৎ চৌম্বকক্ষেত্র) সৃষ্টি করায় বজ্রপাতে তৈরী হওয়া ইলেকট্রনও টাওয়ারগুলোর দিকে আকৃষ্ট হয়। আর উচ্চপ্রযুক্তির কারণে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ এ সব টাওয়ার কিছুটা ভূ-সংযোগের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলে বাকীটা অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। ফলে যত্রতত্র বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। বাসাবাড়িতে আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি তার ক্ষমতা মাত্র ২২০ ভোল্ট। শিল্পকারখানায় ১২০০ ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। আর জাতীয় গ্রিডে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১১০ ভোল্ট বিদ্যুতই যথেষ্ট।’ (উল্লেখ্য, ১ মেগা ভোল্ট = ১০ লাখ ভোল্ট, এই হিসেবে একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।)

বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশে যে মেঘ তৈরী হয় তার ২৫ থেকে ৭৫ হাজার ফুটের মধ্যে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে বেশী। এ এলাকায় তড়িৎ প্রবাহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংঘর্ষ ঘটে। এখানে খাড়াভাবে যে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয় তার তাপমাত্রা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট। বজ্রপাতের গতিও প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার বেগে নিচে বা উপরের দিকে চলে যায়। ফলে এ পরিমাণ তাপসহ বজ্রপাত মানুষের দেহের উপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক। সাধারণত আকাশের ৪ মাইল সীমার মধ্যে মেঘের সৃষ্টি হয়। এ সীমার উপরে পানি, বাতাস থাকলেও তা ঠাণ্ডা এবং হালকা পরিমাণে থাকে। আকাশের এ সীমার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মেঘের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে কালো বা ঘন কালো মেঘ থেকে বেশী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বিকেলের দিকেই এ ধরনের মেঘ বেশী সৃষ্টি হতে দেখা যায়। অন্য সময়ে সংঘটিত মেঘে বজ্র আওয়াজ থাকলেও বজ্রপাতের ঘটনা কম থাকে। সূর্যতাপ না থাকায় এবং ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে রাতের বেলায় বজ্রপাতের ঘটনা খুব কম হয়ে থাকে।

বজ্রপাতের অন্যতম কারণ কালো মেঘের উপাদান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কিউ এম মাহবুব দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বজ্রপাতের কারণ নিয়ে আমাদের তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে সৃষ্টির শুরু থেকেই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। এখনও পর্যন্ত আমরা জানি বজ্রপাত ঘটে কালো মেঘের সংঘর্ষের ফলে। সাদা মেঘে বজ্রপাত ঘটানোর মতো উপাদান থাকে না। বাংলাদেশে জুন-জুলাই মাসে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাতাসে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। আর এই জলীয়বাষ্প বাতাসের প্রভাবে উপরে উঠে কালো মেঘের সৃষ্টি করে। আর কালো মেঘ বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টি করে।’

অধ্যাপক মাহবুব আরও বলেন, ‘কালো মেঘে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইডসহ সালফার ও নাইট্রোজেনের বেশ কিছু যৌগ গ্যাস বিদ্যমান থাকে। বায়ুমণ্ডলের অন্যতম উপাদানগুলো হল, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ও কার্বন মনো-অক্সাইড। কিন্তু বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে সালফার ও নাইট্রোজেনের অন্যান্য যৌগিক গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেছে। শিল্প-কারখানার নির্গত টক্সিক গ্যাসগুলো জলীয়বাষ্পের সঙ্গে একত্রিত হয়ে কালো মেঘের সঙ্গে মিশে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে আমাদের এ বিষয়ে কোনো গবেষণা না থাকায় আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এ সব টক্সিক গ্যাস বজ্রপাতের জন্য দায়ী কিনা। তবে এ সব গ্যাসের পরিমাণ বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতের পরিমাণটাও এখন বেড়েছে। যেহেতু কালো মেঘের সংঘর্ষে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে, তাই এ সব টক্সিক গ্যাস বজ্রপাতের জন্য দায়ী হতে পারে। এই মুহূর্তে বজ্রপাতের ঘটনাকে নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে না দেখে এর কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রযুক্তিগত হোক বা প্রতিরোধের মাধ্যমে হোক এর প্রতিকারে উপায় বের করতে হবে।’

বজ্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সম্পর্কে সরকারি কোনো কার্যক্রম আছে কিনা জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহ কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করে। তা ছাড়া এ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ও প্রতিকারের জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কিন্তু বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এখনও বিবেচনা করা হয়নি। সাধারণত বৃষ্টিপাতের সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া কালবৈশাখী ঝড় কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এখন বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করলে সাধারণ বৃষ্টিপাতকে একইভাবে বিবেচনা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বজ্রপাত কেন ঘটে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো গবেষণা হয়নি। কারণ এটা আমরা সবাই জানি বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের সময় মেঘের ঘর্ষণে বজ্রপাত হয়ে থাকে। বায়ুমণ্ডলের দূষণের কারণে বজ্রপাত হচ্ছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে ‍এই বিষয় নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে বলে মনে হচ্ছে।’

(দ্য রিপোর্ট/জুন ২6, ২০১৫)

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.