বিশ্ব ইজতেমার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

January 9, 2015 11:17 amComments Off on বিশ্ব ইজতেমার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশViews: 33
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

image

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতবর্ষের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে তবলিগ জামায়াতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাধক হযরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তবলিগী জামায়াতের পুনর্জাগরণ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পাশে এক জনবিরল নীরব অঞ্চল ‘মেওয়াত’। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্ম-কর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান ‘মেও’ জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতী মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) বিশ্বব্যাপী এ তবলিগ জামায়াতের কার্যক্রম শুরু করেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জনগণের বৃহত্তর অংশে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তার বাস্তব অনুশীলন না হলে মানবসমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। বরং সাধারণ মানুষের জীবনে দ্বীন ইসলাম না আসলে মুমিন হতে পারে না। ১৩৪৫ হিজরীতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি তবলিগী গাশ্‌ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মাঝে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তবলিগ জামায়াত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন। এভাবে গ্রামে গ্রামে কাজ করার জন্য জামায়াত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে কাজ অব্যাহত থাকল।

১৩৫২ হিজরীতে তৃতীয় হজ পালনের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে, গরীব মেওয়াতী কৃষকদের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘর-সংসার ছেড়ে মাদরাসায় দ্বীন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেওয়া বা জাহেলী বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে তাদের ছোট ছোট জামায়াত আকারে ইলমী ও দ্বীনী মারকাজগুলোতে গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেই ধর্মীয় মজলিসে উলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেওয়া হতো। দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ধর্মীয় মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের অনুশীলনের পাশাপাশি তিনি মুসলমানদের অনুসৃত প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রয়োজনীয় কিছু সূরা- ক্বেরাত শিক্ষাদান, দোয়া-দুরুদ, জরুরি মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে অবহিত করে তার তবলিগী জামায়াতকে একটি ভ্রাম্যমাণ মাদরাসাতে রূপান্তরিত করেন। এভাবেই পর্যায়ক্রমে তবলিগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে।
উল্লেখ্য, শুরুতে তাবলিগী কাজ ব্যাপক সমর্থন পায়নি। ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ ব্যাপারে মহান সাধক হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় অপরিসীম ভূমিকা রাখে। মাওলানা ইলিয়াস শাহ আখতার (রহ.) সারাজীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে এই দাওয়াত ও তবলিগ জামায়াত তথা বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় মজবুত ও শক্তিশালী অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন। সারাবিশ্বের লাখ লাখ দ্বীনদার মুসলমান আলোর পথের দিশারী এই মহান সাধককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তার ইন্তেকালের পর বিশ্ব মুসলিম ঐক্য ভ্রাতৃত্বের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় প্রধান মুবাল্লিগ নিযুক্ত হন তার সুযোগ্য ছেলে হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.)। তিনি তবলিগের দাওয়াতী জামায়াতকে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছিয়ে থাকেন। এই তবলিগের দাওয়াতের সূত্র ধরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেনের মাটিতে ৫০০ বছর পর মসজিদের মিনারে আজানের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউছুফ কান্ধলভীর (রহ.) যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এর আন্দোলন সবচেয়ে বেশি ও শক্তিশালী ছিল। বার্ষিক ইজতেমার প্রয়োজন অনুভব করে হযরত মাওলানা ইউছুফ কান্ধলভী (রহ.) মুরুব্বীদের নিয়ে পরামর্শ করেন। বৈঠকে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশের নাম বেরিয়ে আসে। উল্লেখ্য, তবলিগ জামায়াতের সদর দফতর দিল্লিতে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হয়। আর সেই থেকেই বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সমাবেশ ও মহাসম্মেলন ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকাস্থ কাকরাইল মসজিদে। আল্লাহ তায়ালা ইজতেমার জন্য বাংলাদেশকে কবুল করেছেন। এটি আমাদের দেশের জন্য পরম রহমত ও করুণার ঝর্ণাধারাই বটে।

অবশ্য মাওলানা ইলিয়াছ আখতার কান্ধলভীর (রহ.) নির্দেশে হযরত মাওলানা আব্দুল আযীযের (রহ.) মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তবলিগ জামায়াতের মেহনত শুরু হয়। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিযামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়ার নূহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এ ইজতেমায় প্রায় ২৫,০০০ তবলিগ দ্বীনদার মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণীর কিছু মানুষের কাছে দ্বীনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী তবলিগী জামায়াতের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তবলিগী জামায়াতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তৎকালীন হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি বিশ্ব ইজতেমা টঙ্গীর তুরাগ নদীর (কহর দরিয়া) উত্তর-পূর্ব তীর সংলগ্ন ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

(দ্য রিপোর্ট/জানুয়ারি ০৯, ২০১৫)

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.