মরুভূমির বন্দীশালায় কাঁদছে জুলেখারা

October 20, 2013 2:24 pmComments Off on মরুভূমির বন্দীশালায় কাঁদছে জুলেখারাViews: 27
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

আরব আমিরাত, ২০ অক্টোবর:  বাংলাদেশের মতো বিদেশের মাটিতেও আমাদের নারী শ্রমিকেরা পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সচল রাখছেন সংসারের চাকা, আর দেশকে করছেন সমৃদ্ধ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। কিন্তু এসব নারী শ্রমিকের অনেক ঘটনা রয়ে যায় দৃশ্যপটের আড়ালেই, যা স্থান পায় না খবরের পাতায়।

সংসদে সরকারি দল নিজেদের গুণগান ও বিরোধী দলের সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ খবর রাখে না সেসব নারী শ্রমিকের, যাঁরা বৃদ্ধা মা, অসহায় সন্তান কিংবা পরিজনদের মুখে হাসি ফোঁটাতে হয়ে যান পরদেশে পরবাসী। নেমে পড়েন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। অমানুষিক পরিশ্রমের পর মাসের শেষে বেতন না পেয়ে যাঁদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারী শ্রমিকদের আমিরাতে আসতে খরচ নেই বললেই চলে। অপর দিকে, তাঁদের অবস্থানও ভালো। কিন্তু আমাদের কিছু অসাধু দালালের প্রতারণা ও দূতাবাসের উদাসীনতায় বাংলাদেশী নারীদের জীবনে নেমে আসে নারকীয় দুর্ভোগ।

আরব আমিরাতে আছেন, এমন কয়েকজন বাঙালি নারী শ্রমিকের দুঃখের কাহিনী নিয়ে আমাদের এ আয়োজন।

কেস স্টাডি-১.
থেমে গেল জীবনযাত্রা: মেয়েটির নাম উম্মে কুলছুম (ছদ্ম)। সেই ছোটকালেই মারা গেছেন বাবা। বাবার দেওয়া নাম ফুলবানু। মেয়েটি অনেক সুন্দরী। তাই বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘ফুলবানু’। বিধবা মায়ের সংসারে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারেননি মেয়েটি। কিন্তু মানিকগঞ্জের নিজের এলাকায় অষ্টম শ্রেণীতে সেরা মেধাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বড় একটি বোন ও এক মা। এই নিয়ে তাঁদের সংসার। সংসারে লেগেই আছে অভাব-অনটন।

হঠাৎ একদিন স্থানীয় দালাল এসে ফুলবানুর মাকে যুক্তি দেয়, তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিলে হাসপাতালে চাকরি পাবে। পরিষ্কার করার কাজ। বেতন থাকবে মাসে বাংলাদেশি টাকায় ১৮ হাজার। আর সঙ্গে থাকা-খাওয়া ফ্রি।

অভাবের সংসারে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন মা। দালালের চাহিদা মতো এক লাখ ৩০ হাজার টাকাও দিলেন সুদ করে এবং স্বামীর রেখে যাওয়া নিজের ভিটের কিছু অংশ বিক্রি করে। ফুলবানু এলেন দুবাইতে। এখানে খাপ মেরে বসে ছিল দুবাইয়ের স্থানীয় দালাল। এয়াপোর্ট থেকে বের হতেই সে ফুলবানুকে রিসিভ করল। নিয়ে গেল নির্জন একটি ফ্ল্যাটে।

ফুলবানু জিজ্ঞেস করলো, ‘আমরা হাসপাতালে কখন যাব।’ দালালের পরিকল্পিত উত্তর, ‘কাল যাব। আজ এখানে বিশ্রাম করো।’ ফুলবানুর আকাশটা কেমন যেন কালো হতে লাগল। তিনি আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগলেন।

সেদিনই ফুলবানুর জীবনে ঘটে যায় বড় অঘটন। হারিয়ে যায় তার বেঁচে থাকার অবলম্বন সতীত্ব। এ রকম অনেক দিন চলে তাঁর উপর অত্যাচার। চাইলেও তিনি বাড়িতে ফোন করতে পারেন না। অপর দিকে মায়ের সুদের টাকার কথা মনে হলে নিজেকে বড়ই অপরাধী লাগে। এমনটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায় ফুলবানু।

দেড় মাস এ রকম অত্যাচার চলে তাঁর ওপর। একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বিপথগামীদের হাতে। নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফুলবানু গলাটিপে হত্যা করে নিজের সাধ-আহ্লাদকে। তিনিও হয়ে যান তাদেরই একজন…

কেস স্টাডি-২.
কত দিন ধরে ‘মা’ ডাক শোনা হয়নি জুলেখার : ‘ভাইরে, লেখি আর কী অইব? যা অইবার তো অই গেছে। হেয়ার হরেও লেখেন, যাতে অইন্য কেউ এ রুকম ন আইয়ে। আই আর মতো এ রুকম কষ্ট না করে।’ এমন সিদা-সাপটা উত্তর মধ্যবয়সী নারী শ্রমিক জুলেখার।

পঙ্গু স্বামীর সংসারে সন্তানদের মানুষ করতে দুই বছর আগে এসেছেন আমিরাতের আবুধাবিতে। কাজ করছেন একটি বাসায়। বিদেশ আসতে তাঁকে দিতে হয়েছে এক লাখ টাকা। দালাল ভিসাটি ফ্রি পেয়েছে। কিন্তু জুলেখার কাছ থেকে নিয়েছে ক্যাশ টাকা। তা-ও আবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দেনা ও গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ দিয়ে।

সেই ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাঁকে। আসার সময় দালাল বলেছিল, একটি বাচ্চাকে দেখাশোনার কাজ করতে হবে। কিন্তু এখানে এসে ঘটেছে এর ব্যতিক্রম। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও মাসের শেষে নিজের ভাগ্যে জোটেনি বেতন।

দালাল বলেছিল, মাসে ৭০০ দেরহাম বেতন পাবে। সঙ্গে ঈদে থাকবে বকশিশ। আসার প্রথম বছরে ৩৫০ দেরহাম করে বেতন পেলেও তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে সন্তানদের মুখ থেকে ‘মা’ ডাক শোনা হয়নি দুই মাস ধরে। আরবি ঘরে থাকে বিধায় আশপাশে কোথাও ফোনের সুবিধা নেই। কবে যে তাঁর দেনা শোধ হবে, আর দেশে ফিরে সন্তানদের মুখ দেখবে-এই চিন্তায় কাটে জুলেখার দিনরাত।

কেস স্টাডি-৩.
পরিবার গর্বিত,মেয়ে তার অফিসে কাজ করে বলে : ঢাকা শহরের মেয়ে স্বপ্না (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া স্বপ্নার শখ ছিল শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু ভাইহীন সংসারে পরিবারের চাকা সচল করার আশায় পাড়ি জমান আমিরাতের শারজাতে।

তিনি জানেন, তাঁর ভিসা একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের। ভিসায়ও লেখা তা-ই। কিন্তু এখানে এসেই তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে লড়াই করে নাচ করতে হয় তাঁকে। অন্যের মন ভুলিয়ে নিজের পরিবারের চাকা সচল রাখতে হচ্ছে তাঁকে।
পরিবারের সবাই গর্বিত তাঁর মেয়ে অফিসে কাজ করে বলে। মেয়েও মাসে মাসে টাকা পাঠান, যা দিয়ে চলে যায় সংসার। কিন্তু এর চেয়ে দ্বিগুণ টাকা চলে যায় মধ্যসত্বভোগী দালালের পকেটে।

নিজের ভবিষ্যৎ ও দালালের প্রতারণায় বিষন্নতায় আছে স্বপ্নারা। না পারছেন মুখ ফুটে কিছু বলতে, আবার না পারছেন এ পথ থেকে ফিরে আসতে। স্বপ্নারা জানেন না, তাঁদের ভাগ্যে কী আছে?

এ তো মাত্র তিনটি দৃশ্য উপস্থাপন করা হলো ভিন্ন চিত্রে। এ রকম আরও হাজারো দৃশ্যের রূপায়ণ ঘটছে আরব আমিরাতের এই মরুর বুকে। ফুলবানু, জুলেখা বা স্বপ্নারা এক অজানা পথে আছেন। তাঁরা নিজেই জানেন না, কখন শেষ হবে তাঁদের জীবনের এই বেদনাদায়ক অধ্যায়।

আরবি বাসায় কাজ, হাসপাতালের ক্লিনার কিংবা অন্যান্য সাংসারিক সহযোগিতামূলক কাজে নারী শ্রমিকদের কাজ করতে হয় নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে। কেউ বা আবার অমানুষিক কাজ করেও বেতনটা না পাওয়ায় আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছেন।

 

লুৎফুর রহমান, আরব আমিরাত।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.