মহাবিপদের মুখে সুন্দরবন

December 19, 2014 9:07 pmComments Off on মহাবিপদের মুখে সুন্দরবনViews: 15
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

মহাবিপদের মুখে সুন্দরবন

আনু মুহাম্মদ

Last 1গত ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী জাহাজ ডুবে গিয়ে জয়মনি, নন্দবালা, আন্ধারমানিক, মৃগমারী এলাকায় সাড়ে ৩ লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে। ঐ জাহাজ ফার্নেস তেল নিয়ে যাচ্ছিলো একটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জোয়ার ভাটার টানে এই তেল ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত কোন উদ্ধারকাজ শুরু হয়নি। ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারকাজে জাহাজ এসেছে ১১ ডিসেম্বর, উদ্ধারও হয়েছে। কিন্তু এই ছড়িয়ে পড়া তেল যে অপূরণীয় ক্ষতি করলো তার নিরসনে কোন প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা যে সরকারের নেই তাও পরিষ্কার হয়েছে। নদী থেকে তেল সরানোতে সরকারের ব্যর্থতা ও উদ্যোগহীনতার মুখে এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষেরা জীবন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের জানাবোঝা মতো তেল উঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি আওয়াজ ও অকর্মণ্য ভূমিকা একইসঙ্গে অব্যাহত আছে।

এর আগে গত ১২ ও ৩০ সেপ্টেম্বর সিমেন্টের কাঁচামাল বহনকারী দুটো জাহাজ ডুবে গিয়েও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এগুলোর পরিণতি কী হল তা নিয়ে সরকারি কোন রিপোর্ট দেখিনি, সরকার এগুলো ধামাচাপা দিতেই ব্যস্ত থাকেন। সেজন্য ঐসব ঘটনার পরও সরকার এবিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এবারেও তদন্ত কমিটি হয়েছে, সত্য চাপা দেবার জন্যই বোঝা যাচ্ছে।

তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষে গত ১১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর তানজিমউদ্দীন খান এবং প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা জাহাজডুবি পরবর্তী শ্যালা নদীসহ সুন্দরবনের অবস্থা সরেজমিনে বোঝা এবং এধরণের মহাবিপর্যয় মোকাবেলায় কী করণীয় তা নির্দিষ্টকরণের জন্য বিপর্যস্ত এলাকায় পৌঁছান।

ফিরে এসে তাঁরা গত ১৫ ডিসেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে এর উপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সেখানে তাঁরা বলেন, “তেলবাহী জাহাজটিকে দেখে দৃশ্যত সিমেন্ট/বালি বহন করার মত বাহন বলে মনে হয়েছে। এদেশীয় জাহাজটি ছয়টি আলাদা কম্পার্টমেন্টে ফার্নেস তেল পরিবহন করছিল। ছয়টি কম্পার্টমেন্টের মধ্যে চারটিই বিধ্বস্ত ছিল। এই বিধ্বস্ত কম্পার্টমেন্টগুলো দিয়ে দু’দিন ধরে শ্যালা নদীতে মতভেদে আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ তেল নিঃসরিত হয়েছে। এই নিঃসরণের বিস্তারটি শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ ছিলনা। শ্যালা নদীর দুই পার দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন বিটুমিন দিয়ে কালো রং মেখে দিয়েছে।…

“আমরা দুই পারের যত কাছাকাছি গিয়েছি ততই জমাটবদ্ধ ফার্নেস তেলের আস্তরণ চোখে পরেছে। খড়ম নদী ও মৃগমারী খালেও একই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছি। নদীর পার সংলগ্ন ছোট এবং মাঝারী আকারের গাছ ও ঝোপঝাড়গুলো কালো তেলে ঢেকে আছে। স্থানীয় বনজীবিদের সাথে আলাপ করে আমরা বোঝার চেষ্টা করি এই তেল নিঃসরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে। প্রায় পাঁচ-ছয়জন বনজীবিদের সাথে আমাদের আলোচনা হয়। তাদের আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে শুধুমাত্র নদী কিংবা সুন্দরবনই আক্রান্ত হয়নি,তাদের জীবিকাও ব্যহত হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর থেকে নদী ও খালগুলোতে বিভিন্ন মাছ যেমন, পাতারী, পার্শে, ট্যাংরা, চিংড়িপোনা ও কাঁকড়া দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে এবং তারা সেগুলো সংগ্রহ করতে পারছে না। তার বদলে তারা তেল সরাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা এও জানান যে ২০১১ সালে নৌপথটি চালু হওয়ার কারণে এমনিতেই শ্যালা নদী সংলগ্ন এলাকায় মাছের আহরণ ভীষণভাবে কমে গিয়েছে।”

তাঁরা আরও বলেন, “সামগ্রিকভাবে পুরো সুন্দরবনের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন। এই প্রক্রিয়াটির সূত্রপাত শুধুমাত্র এই দুর্ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে ঘটেনি। ইতোমধ্যে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্পভিত্তিক কর্মকান্ড যেমন সাইলো নির্মাণ এব ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীদের সুন্দরবনের জমি কেনার হিড়িক ভীষণ সংবেদনশীল এই শ্বাসমূলীয় বন ও তার প্রতিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি এতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডের মত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে নেই। আমরা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে যেসব বিপর্যয়ের আশঙ্কা অনেকদিন ধরে করে আসছিলাম, শ্যালা নদীতে তেল নিঃসরণ সেই আশঙ্কাগুলোরই একটি বাস্তব নজির।”

সুন্দরবন নিয়ে সরকারের স্ববিরোধী ভূমিকা প্রকট। প্রধানমন্ত্রী একদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে সুন্দরবন বাঁচানোর কথা বলছেন, অন্যদিকে তাঁর সরকার দেশি বিদেশি মুনাফাখোরদের স্বার্থে সুন্দরবনধ্বংসী নানা তৎপরতায় সক্রিয় থাকছে। সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে গত বছর ঢাকা থেকে সুন্দরবন লংমার্চ ছাড়াও প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত আছে। বিভিন্ন প্রকাশনা, গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন। ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজ দেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি, দল, জাতীয় কমিটি ও বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, অসাধারণ জীববৈচিত্রের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প।

সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য আমরা সরকারের কাছে বার বার দাবী জানিয়েছি ক্ষতিকর সব পরিবহণ এবং প্রকল্প বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকে তার সুরক্ষার পরিবর্তে নিকটবর্তী নৌ-পথে বৃহৎ নৌ-পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে,বিশাল কয়লা পরিবহণের উপর নির্ভরশীল একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছে, নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ভূমি দস্যুদেরকে জমি দখলের সুযোগ করে দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আরও বনজমি দখলের তৎপরতা এখন জোরদার। বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের তহবিলে তৈরি হচ্ছে নানা প্রকল্প। বলাইবাহুল্য সরকারের এসব ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কো এবং রামসার সুন্দরবন ঘিরে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মুনাফামুখি তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সরেজমিন তদন্ত শেষে তাই আমাদের স্পষ্ট দাবি তুলতে হবে: (১) সুন্দরবনে তেলবাহী জাহাজডুবির ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, মৎসজীবী বনজীবীদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। (২) শ্যালা ও পশুর নদীতে সুন্দরবনের জন্য হুমকিস্বরূপ নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে; এবং (৩) সুন্দরবনধ্বংসী কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সবরকম ক্ষতিকর ব্যবসায়িক প্রকল্প বাতিল করে ‘সুন্দরবন নীতিমালা’র ভিত্তিতে এর সম্প্রসারণ ও বিকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।

লুটেরা দখলদারদের হাতে আমরা আমাদের অস্তিত্বের স্মারক সুন্দরবন ছেড়ে দিতে পারি না।।
প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ:

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.