মানুষ এতো নির্মম নিকৃষ্ট কেনো?

August 3, 2013 3:54 pmComments Off on মানুষ এতো নির্মম নিকৃষ্ট কেনো?Views: 24
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

মানুষ এতো নির্মম নিকৃষ্ট কেনো?


Beyond The Mango Juice

Beyond The Mango Juice

প্রবাসী জীবনে নানা কারণে মন খারাপ হয়। সত্যি কয়েকদিন যাবৎ মন খারাপ। ক’বছর পর এবার ঢাকায় ফিরে ধাক্কা খেয়েছি! একী হাল আমার প্রিয় শহরের! গোলাম মোর্তুজা উপস্থাপিত চ্যানেল আই-এর সংবাদপত্র প্রতিদিন অনুষ্ঠানে সেই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভিজে যাচ্ছিল।

দেশের একটি ভালো সংবাদ শুনলে মনটা যেমন আনন্দে ভরে উঠে! আর তেমনি মন্দ সংবাদে বিষণ্ণতা কাজ করে। গত বছর প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা বললেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার।’ হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই তাই। যদি আমরা আরো সচেতন এবং যত্নবান হই, তাহলে এই শ্লোগান বাস্তবায়ন করা মোটেও কঠিন নয়। কারণ, পরিবেশ নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক হয়েছে। সেই আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত এবং ছোঁয়া পাওয়া নানাভাবে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছিলেন, গাছেরও প্রাণ আছে। তাই তাদেরকেও খুন করা হয়। আর সেই খুনের কথা ভেবেই মনটা বিষণ্ণ। যদি সবুজ হত্যার তান্ডবের শাস্তি ৩ বছর এবং ৫০ হাজার অর্থ জরিমানার বিধান পাস হয়েছে। তা-ও মন তৃপ্তি পায় না।
এটিএন বাংলা অথবা এনটিভিতে গত ১৬ নভেম্বর খবরে দেখলাম, উত্তরাঞ্চলে রাতের আঁধারে উঠতি আমের বাগান কেটে সর্বনাশ করে দেয়া হয়েছে। শত শত গাছ ‘লাশ’ হয়ে উপুড় হয়ে মাথা থুবড়ে আছে। বেঁচে থাকলে দু’বছর পর ফলন দিতো।

কোনো মর্মান্তিক এই নিষ্ঠুরতা? মানুষ কেনো এতো নির্মম আর নিকৃষ্ট প্রাণী! এটা কীসের প্রতিহিংসা? এ প্রতিহিংসা ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

রাজনৈতিক প্রশ্নটি এ জন্যই জাগলো যে, ওই হত্যার মাত্র একদিন আগেই আম গাছকে জাতীয় ের মর্যাদা দেয়া হয়। ১৫ নভেম্বর ২০১০-এ মন্ত্রিসভার বৈঠকে কদম, তমাল, পলাশ, শিমুল, তাল, হিজলকে ছাড়িয়ে ‘আম গাছ’ জাতীয় মর্যাদায় স্বীকৃতি পেলো। যেমন জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় পাখি দোয়েল, তেমনি আম এখন জাতীয় । বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর দৃষ্টান্ত আছে। উদাহরণ স্বরূপ- কানাডার মেপল, জাপানে শাকুরা, ভারতে বট, ভূটানে সাইপ্রেস, পাকিস্তানে সেড্রাস ডিওড়ব, লেবাননে সেডর, শ্রীলঙ্কার নাগেশ্বর, সৌদীতে খেঁজুর, কিউবায় রয়েল পাম, আয়ারল্যান্ডে ভূঁইচাপা সারিতে স্থান করে নিলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী আম গাছ। ( দ্র: দৈনিক আমার দেশ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)

নানাভাবে আম গাছকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ- মূল্যায়ণ করা হয়। যেমন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্তগামী হয়েছিল, আবার মেহেরপুর আম বাগানে ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়ে উদিত হয়েছে আরেক সূর্য, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতেও আম গাছের উল্লেখ আছে, উল্লেখ আছে বাল্মিকীর রামায়ন, কালিদাসের মেঘ দূতসহ প্রচলিত ছড়ায়- ঝড়ের দিনে মামার বাড়ি আম কুড়াতে সুখ। এসব ঐতিহাসিক, সামাজিক বিবেচনায় স্বাধীনাতার ৩৯ বছর পর আজ আম গাছ স্বীকৃতি অর্জন করলো। দুঃখজনক হলেও, সত্য তার পরের দিনই আম গাছ নিহত হলো শত্রুর হাতে। মানুষ হয়ে আমরা মিলেমিশে থাকতে পারিনা, অথচ ‘আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাঁড় যেন। মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’ কবি বন্দে আলী মিয়ার এই পঙক্তি থেকে আমরা কী কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করবো না?

শুধু আম গাছের বেদনাই নয়, ঈদের পর পত্র-পত্রিকা নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলাম প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের দুঃসংবাদ!
যেমন: ক॥ ফের গাছ কাটছে জাবি প্রশাসন,
খ॥ ভালুকায় এক হাজার আকাশ মনি কর্তন,
গ॥ বিষ প্রয়োগে ২০০ কবুতর মৃত,
ঘ॥ সরকারি গাছ কেটে সাবাড় করেছে দুবৃর্ত্তরা,
ঙ॥ সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে দুবৃর্ত্তরা।

মন খারাপের মাত্রা কানাডার শীতের মতো বৃদ্ধি পেয়ে মাইনাসে চলে গেল।
প্রথম খবরটি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত সড়ক দ্বীপের ঝাঁউ-দেবদারুসহ ৩০ প্রজাতির গাছ ঈদের ছুটি ফাঁকে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে, কেটে ফেলা হয়েছে শহীদ মিনারে পাশের বট ও কড়ই গাছটিও! (দ্র: বাংলা নিউজ ২৪ ডটকম, ২১ নভেম্বর ২০১০)
‘বৃক্ষহত্যাকারী’ মাননীয় ভিসি শরীফ এনামুল কবির বলেছেন, গাছ নয়, আগাছা কেটেছি! বাহ কী চমৎকার বাজে কথা। তাঁর এক কথার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই।

...maybe global warming needed a simple solution!

...maybe global warming needed a simple solution!

দ্বিতীয় সংবাদটি উৎসস্থল ময়মনসিংহের ভালুকার নারাঙ্গী গ্রামে বিরোধপূর্ণ প্রতিহিংসায় প্রায় হাজার খানেক আকাশ মনি কেটে সাবার করে দিয়েছে প্রতিপক্ষের। (দ্র: গাছের দোষ কী?… দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা) অর্থাৎ বাড়া ভাতে ছাই। অপরদিকে যশোরের মনিরামপুরে বিভিন্ন সড়কের পাশের ৭ লক্ষ টাকার গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তেরা (দ্র: দৈনিক সমকাল, ২২ নভেম্বর, ২০১০, ঢাকা)।

অপর সংবাদটি বৃক্ষ নিয়ে নয়, গৃহপালিত পাখি, কবুতর নিয়ে। নওগাঁর রানী নগর গ্রামে এক ইমাম সাহেব সরিষার সাথে বিষ মিশিয়ে তা খেতে বপন করেছেন এবং তা খেয়ে ২০০ কবুতর গণহারে মারা গেছে। কিন্তু তিনি তা গ্রামবাসীকে পূর্বে অবহতি করেন নি। (দ্র: শীর্ষ নিউজ, ২১ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)। এখন বিশ্ব বাঘ সম্মেলন হচ্ছে। বাঘের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অপরদিকে প্রতিনিয়ত শিকার করে শেষ করা হচ্ছে বাঘ। এ সম্পর্কে নাইবা বললাম। মনে পড়লো,ছোটবেলার কথা। আমাদের গ্রামের আশে পাশে ফলন্ত তরতাজা বেগুন গাছ, সজিব মরিচ ক্ষেত রাতে দুবৃত্তরা কেটে সাবার করে দিতো। ভোর বেলা সেই মৃত বেগুন ক্ষেত দেখে মনটা হু হু করে উঠতো। সে তো পাকিস্তান আমলের কথা। এখন তো আমার সোনার বাংলা। সোনার দেশের মানুষেরা পশুর চেয়ে অধম হচ্ছে কেনো? সেই জন্যই কী রবি ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছেন; রেখেছ বাঙালি করে/ মানুষ করো নি! আমরা কবে প্রকৃত মানুষ হবো?

আরো একটি বিষয় মনে পড়লো,একবার স্থানীয় দুর্বৃত্ত কসাই চামড়ার লোভে আমাদের দু’টো গরুকে রাতের আঁধারে গোয়ালঘরে বিষ মিশানো কাঠালপাতা খাইয়ে মেরে ফেলে। আমরা তা বুঝতে পেরে গরু দু’টো কসাইকে না দিয়ে, চামড়া কেটে কেটে মাটিতে পুতে রাখি। ২ বছর আগে সিলেটের শাহজালাল মাজারে পুকুরের পুরনো কচ্ছপ, শোল, গজার মাছগুলোও কে বা কারা বিষ প্রয়োগ করে মেরেছিল। এসব ঘটনার তো শেষ নেই। আরো পিছিয়ে গেলে দেখবো,স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে মিন্টু রোডের এবং শের-এ বাংলা নগরের বিশাল বিশাল অপূর্ব সবুজতায় পূর্ণ পুরনো বৃক্ষগুলো কেটে সাবার করে দিয়ে ছিলেন। কথিত আছে এরশাদকে গাছ থেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। তাই বৃক্ষ কর্তন উৎসব!

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

বৃক্ষের প্রতি দুর্বলতা আমার আজন্মের। তাই ‘একি কান্ড! পাতা নেই’ শীর্ষক পরিবেশ বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫-এ। এছাড়াও গাছ নিয়ে আমার অনেক কবিতা আছে। আমার মিরপুরস্থ বাসার ‘নীমগাছ এবং কাকবন্ধু’ (দ্র: নীড়ে, নীরুদ্দেশে, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৮, স্বরব্যঞ্জন, ঢাকা) এবং ‘নিমগাছ’ (দ্র: ঘৃণিত গৌরব, প্রকাশকাল এপ্রিল, ২০০৫ জাগৃতি প্রকাশনী,ঢাকা)-কবিতা দু’টো নানা কারণে আমার প্রিয় কবিতা।
আমি ২০০৪-এ ফ্রাস্কফোর্ট বইমেলা থেকে বার্লিন গেছি কবি দাউদ হায়দারের সাথে দেখা করার জন্য। তখন ঢাকায় আমার বাড়ি নির্মাণের কাছ চলছে। হঠাৎ মনে পড়লো, ডেভলপার গাছটি কেটে ফেলবে। আমি দ্রুত বার্লিন থেকে ফোন করে অনুরোধ করি, যেন নিমগাছটি না কাটা হয়। এখনো নীম গাছটি বেঁচে আছে।

হাসিনা সরকার যখন প্রথমবার ক্ষমতায়, তখন বন ও পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী ছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তাঁর প্রটোকল অফিসার হিসেবে কয়েক মাস কাজ করেছি। সে সময় সচিব ছিলেন আহবাব আহমদ। তিনি প্রায়ই আমার পরিবেশ বিষয়ক কবিতা আবৃত্তি করতেন, বলতেন-‘একদিন আমরা সবুজ ছেড়ে বাতাসের ওপারে চলে যাবো।’

হ্যাঁ, বৃক্ষ যে নির্মল বাতাস দিচ্ছে অর্থাৎ দিচ্ছে, তার জন্য কী আমাদের কিছুই করার নেই। নামান্তরে চন্দ্রিমা উদ্যানের অনেকগুলো গাছ কেটে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। তখনও রাতের আঁধারে সবুজগাছের প্রাণ হরণ করা হয়েছিল। পরদিন প্রাত: ভ্রমণে গিয়ে মতি ভাই অর্থাৎ প্রথম আলোর সম্পাদক বৃষ্টি ভেজা সকালে করুন দৃশ্য দেখেন এবং পরদিন তাঁর দৈনিকে প্রথম পাতায় একটি মর্মস্পশী প্রতিবেদন লিখেছেন। যা আমাকেও স্পর্শ করে হৃদয়ে নাড়া দেয়। সেই সময় লিখেছিলাম ‘বৃক্ষ কর্তনের পঙক্তি’ শীর্ষক একটি কবিতা। কবিতাটি নিন্মরূপ-
বৃক্ষ কর্তনের শোকে বাতাসগুলো এলোমেলো, পাখিগুলোর মন খারাপ, ছায়াগুলো আর সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হবে না লিলিপুট কিংবা গালিভার। চন্দ্রিমার স্বর্গীয় জোছনায় পরিরা এসে খুঁজে পাবে না মায়াবী রাত্রির ছায়ার স্নিগ্ধতা। বৃষ্টিগুলো বোনের মনের মতো, রোদগুলো ভাইয়ের মতো ‘ভাই-বোন’ খেলবে না পাতাগুলোর সাথে, সবুজ ছাতা হাতে। বাতাস, বৃষ্টি, পাখি, রোদ, ছায়াসমূহ, আর কখনো কানামাছি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুটের আনন্দে মাতবে না চন্দ্রিমা উদ্যান।

গাছের গুঁড়ির কান্না কষ্ট দেখে বিরহী বাতাস হুহু করছে, বেদনার্থ বৃষ্টি ঝরছে ঝির ঝির, শোকার্ত পাখি আতঙ্কে চলে যাচ্ছে নিরাপদ নগরে। বাতাস অভিশাপ দিচ্ছে, বৃক্ষ ঘৃণিত-ঘাতককে দেবে না অক্সিজেন। আজ আর কবিতায় নয়। আজকের কন্ঠের প্রতিফলন ঘটালাম এই সামান্য গদ্যটির মাধ্যমে। লেখাটির সমাপ্তি টানার পূর্বে শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই- রাজশাহীর আম গাছ হত্যাকারীকে নয় বা ভালুকার আকাশমনির খুনীকে নয়, অথবা নওগাঁর কবুতর নিধনকারীকে নয়, প্রশ্নটি শুধু মাননীয় জাবির উপাচার্যকে- স্যার, আপনি কী ভাবে রাতের আঁধারে নিষ্ঠুরভাবে খুন করলেন গাছগুলোকে ?
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল (কানাডা থেকে)

Saifullah Mahmud Dulal

Saifullah Mahmud Dulal

God has cared for these trees, saved them from drought, disease, avalanches, and a thousand tempests and floods. But he cannot save them from fools ~ John Muir আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.