মূল কুরবানীর আগে আরো যেসব কুরবানী জরুরি

September 24, 2014 4:17 pmComments Off on মূল কুরবানীর আগে আরো যেসব কুরবানী জরুরিViews: 747
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
মূল কুরবানীর আগে আরো যেসব জরুরি

মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম :
কুরবানী, ইবরাহিমকুরবানী মুসলিম মিল্লাতের ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় এক ইবাদাত। প্রতিবছর ঈদুল আজহা নামায শেষে আমরা পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে কুরবানী করে থাকি। কিন্তু ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসলে আমরা দেখতে পাই যে, এর আগে আরো কিছু কুরবানী রয়ে গেছে। ঐ কুরবানীগুলো না দেয়া পর্যন্ত এ শেষ কুরবানী দেয়ায় কোন কল্যাণ নেই। প্রতি বছর ঘটা করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পশু কুরবানী করা হয়। কিন্তু কই কোথাও তো পরিবর্তনের চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং এটি এমন এক ট্রেডিশনাল সংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছে যে, আমাদের মহৎ উদ্যোগ ও উদ্দেশ্যকে সমূলে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

‘কারব’ মূল শব্দ থেকে কুরবান উদগত। যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, কুরবানী, উৎসর্গ ইত্যাদি। আল কুরআনে ‘মানাসিক’ শব্দটি কুরবানী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানী নির্ধারণ করেছি (সূরা হজ্জ: ৩৪)।” আল কুরআনে ‘আনহার’ শব্দটিও কুরবানী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “অতএব আপনার প্রভূর জন্য নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন (সুরা কাউসার: ২)।” নির্দিষ্ট পশু নির্দিষ্ট তারিখে তথা জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ আল্লাহর নামে যবেহ করাকে কুরবানী বলা হয়। এর পরোক্ষ অর্থ হচ্ছে, সকল কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক ও লা-শারীক আল্লাহর দিকে মুখ ফিরানো, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করা, শিরকমুক্ত জীবন যাপন করা, সকল পরীক্ষা তথা জান-মালের ক্ষতি, আপদ-মুসিবত ও ভয়-ভীতিতে আল্লাহর উপর পূর্ণ তায়াক্কুল করা এবং ত্যাগের মহিমায় নিজেকে উদ্ভাসিত করা।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, সকল শরীয়তে কুরবানী ইবাদাতের একটি অংশ ছিল। কিন্তু কালক্রমে পৃথিবীর জাতিগুলো আল্লাহর হেদায়াত ভুলে গিয়ে অসংখ্য বেহুদা কাজের মধ্যে কুরবানীর বেলায়ও বিকৃতি ঘটিয়েছে। যেমনিভাবে তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির সামনে তথা গায়রুল্লাহর সামনে মাথা নত করতো তেমনিভাবে পশু বলিদান করতো। জাহেলী যুগে আরববাসীরা তাদের দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে কুরবানী করতো এবং তা দেবতাদের সামনে উপস্থিত করতো। এমনকি আল্লাহর উদ্দেশ্যে যারা কুরবানী করতো তারাও কুরবানীর গোশত, রক্ত ও হাড্ডি কা‘বা ঘরের সামনে পেশ করতো। তাদের বিশ্বাস ছিল যে যেহেতু কা‘বার মালিক আল্লাহ, তাই কুরবানীর গোশত, রক্ত ও হাড্ডি তার সামনে রেখে দিলে তাতে তিনি খুশি হবেন। এ বিশ্বাসের ফলস্বরূপ কেউ কেউ আবার কা‘বার দেয়ালে কুরবানীর পশুর রক্ত মেখে দিত।’ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,“ ইহার (পশুর) গোশত ও রক্ত আল¬াহর কাছে পৌঁছায় না, বরং কুরবানীর ইতিহাস ও যেসব কাজকে কেন্দ্র করে সকলের চাইতে আল্লার নির্দেশ ও ভালবাসাই প্রাধান্য পায়, যাকে খোদাভীতি পূর্ণ সতর্কতা বা তাকওয়া বলা হয়, সেটাই তার কাছে পৌঁছে।”(সূরা হজ্জ: ৩৭)

হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের আকৃতির প্রতি লক্ষ্য করেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তরসমূহ এবং তোমাদের কর্মসমূহই লক্ষ্য করেন।” (মুসলিম)। ইসমাঈল আ. তাঁর পিতার স্বপ্নের কথা শুনে বলেছিলেন, “হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তাই বাস্তবায়িত করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”(আস্ সাফফাত: ১০২)  তাঁদের উভয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। পক্ষান্তরে আদম পুত্র কাবিলের উদ্দেশ্য ছিল অনৈতিক ও পার্থিব লোভ-লালসা চরিতার্থ করা। ফলে তার কুরবানী কবুল হয়নি। অতএব আমরা যারা কুরবানী করি তাদের ভেবে দেখতে হবে যে, আমাদের কুরবানী কি কাবিলের কুরবানী হচ্ছে, না কি হাবিল ও ইসমাঈলের কুরবানী হচ্ছে?

সকল প্রকার মিথ্যা প্রভু তথা তাগুত, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি বিভাগে প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে প্রভু সেজে বসে আছে, তাদের গলায় ছুরি চালাতে হবে। তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে লা-শারীক এক আল্লাহর কাছে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্থন করতে হবে বা পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হবে। হযরত ইবরাহিম আ. সে কাজটিই আগে করেছিলেন। তিনি এমন এক পুরোহিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যে পরিবার নক্ষত্র পূজায় দেশবাসীর নেতৃত্ব দিতো। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে বললেন, “ইসলাম গ্রহণ কর অর্থাৎ  স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পন কর, আমার দাসত্ব স্বীকার কর। তিনি উত্তরে পরিস্কার ভাষায় বললেন, আমি ইসলাম কবুল করলাম অর্থাৎ আমি সারা জাহানের প্রভুর উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করলাম, নিজেকে তার নিকট সোপর্দ করলাম। তিনি রাব্বুল আলামীনের জন্য শত শত বছরের পৈতৃক ধর্ম এবং এর যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান ও আকীদা বিশ্বাস পরিত্যাগ করলেন। এটাই ছিল তাঁর প্রথম কুরবানী। এটাই হলো তাঁর প্রথম ছুরি চালানো যা তিনি পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণ, বংশীয় ও জাতীয়  গোঁড়ামির উপর এবং নিজের প্রবৃত্তির  সেই সকল দুর্বলতার উপর চালিয়েছেন, যার কারণে মানুষ নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে নিজ পরিবেশ ও সমাজের সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে গা এলিয়ে দেয়।

একমাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েমের নিমিত্তে নিজের দেশ ও জাতিকে অসংখ্য মিথ্যা রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। হযরত ইবরাহীম আ. এর পরিবার ও সমাজ পুরোটাই শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন কি রাষ্ট্রশক্তি পরিপূর্ণভাবে শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। এ সব কিছু সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকার পরও কঠিন নির্যাতন ও শাস্তি ভোগ করার প্রস্তুতি নিয়েই প্রথমে নিজের পিতাকে, নিজের খান্দানকে, নিজের জাতিকে, এমনকি নিজ দেশের রাষ্ট্র প্রধানকে পর্যন্ত শিরক থেকে বিরত থাকতে এবং তাওহীদের আকীদা কবুল করতে দাওয়াত দিলেন। এর ফলশ্রুতিতে তিনি একদিকে একা অপরদিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর মোকাবেলায় এক সাড়িতে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু এর পরও হতোদ্যম হননি, তার মুখ অবসন্ন হয়নি। তখনই তাকে রাষ্ট্রীয় চরম দণ্ড হিসাবে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত হয়। তাতেও তিনি বিরত হলেন না। বরং এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পছন্দ করলেন। এটি তাঁর দ্ধিতীয় কুরবাণী। শিরকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ ও লোভ-লালসার গলায় ছুরি চালাতে হবে। যুগে যুগে, কালে কালে আল্লাহর প্রিয়জনদেরকে এ পথ অবলম্বন করার অসংখ্য নজির দেখতে পাওয়া যায়। হযরত ইবরাহীম আ. আগুন থেকে বাঁচার পর এ দেশে থাকা তাঁর আর সম্ভব হলো না। তাওহীদের দাওয়াতের জন্য তিনি দেশের পর দেশ ঘুরতে থাকলেন। কিন্তু চারদিকে শিরক আর শিরকের অনুসারী থাকায় কোথাও তিনি ঠাঁই পেলেন না। তিনি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর ও হিযাযে গিয়েছেন। নিজ বাড়ী, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো ছিল। কিন্তু এ গুলোর প্রতি লোভাতুর হননি। তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার দুর্বার স্পৃহা তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরিয়েছে। এটি তাঁর তৃতীয় কুরবানী। দেশত্যাগ ও নির্বাসনের দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার পর বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাঁকে সন্তান দান করলেন। তিনি তাঁর জন্যও একই ধর্ম ও কর্তব্য ঠিক করলেন। সব কঠিন পরীক্ষায় পাস করার পর চুড়ান্ত ও শেষ কঠিণ পরীক্ষা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইবরাহীম আ. সবকিছু অপেক্ষা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেই বেশী ভালবাসেন কিনা, তার ফয়সালা হতে পারত না। তাই বৃদ্ধ বয়সে একেবারে নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তান লাভ হয়েছিল সে প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে পারেন কি না তারই পরীক্ষা নেয়া হলো। পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। তখন চূড়ান্তরূপে ঘোষণা করা হলো যে, এখন তুমি প্রকৃত মুসলিম হওয়ার দাবীকে সত্য বলে প্রমাণ করেছো। এখন তোমাকে সারা পৃথিবীর ইমাম বা নেতা বানানো যায়। আল কুরআনে এ কথাই বলা হয়েছে, “এবং যখন ইবরাহীমকে তার রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং সে সব পরীক্ষায় ঠিকভাবে উত্তীর্ণ হলেন তখন তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, আমি তোমাকে সমগ্র মানুষের ইমাম বা নেতা নিযুক্ত করছি। তিনি বললেন, আমার বংশধরদের সম্পর্কে কি হুকুম? আল্লাহ তা‘আলা বললেন যালেমদের জন্য আমার ওয়াদা প্রযোজ্য নয়।” (সূরা বাকারা: ১২৪)। প্রতি বছর কুরবানী আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে যায় তা হচ্ছে, ব্যক্তি ও সমাজ থেকে শিরক উচ্ছেদ করা।  কেননা শিরকের গুনাহ আল্লাহ তা‘আলা কখনো মাফ করবেন না। দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে শর্তহীন ও পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তাকওয়া অর্জন করা।  লৌকিকতা পরিহার করা। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা। আল্লাহর নির্দেশ পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করা। সর্বোপরি কুরবানীর সার্থকতা পেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে কুরবানীর ঐতিহাসিক চেতনাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং নিজেদেরকে সেই চেতনার আলোকে প্রস্তুত করে নিতে হবে। হযরত ইব্রাহিম আ. মূল কুরবানীতে অবতীর্ণ হওয়ার আগে নিজের মধ্যে কতগুলো পরিবর্তন এনেছিলেন অর্থাৎ নিজের ভেতর লুকায়িত পশুবত কতগুলো জানোয়ারের গলায় তিনি আগে ছুরি চালিয়ে ছিলেন। যা প্রত্যেক কুরবানকারীকে অবশ্যই পালন করতে হবে।

লেখক : পিইচডি গবেষক, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.