রহমতের উৎসব

July 28, 2014 2:11 amComments Off on রহমতের উৎসবViews: 21
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

রহমতের উৎসব

image

আজ অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের শেষ দিন। আমরা  কেউ জানি না আবারও একটি রমজান মাস আমাদের জীবনে আসবে কিনা। মহান আল্লাহ যেন এবারের রমজানকেই জীবনের শেষ রমজান না করেন।

আমরা রমজানে খোদাভীতি ও খোদাপ্রেমের মত যেসব বিষয় যতটা অর্জন করেছি তা যেন সারা জীবনের জন্য ধরে রাখতে পারি এবং দিনকে দিন এইসব বিষয়ে আমাদের অবস্থানকে আরো উন্নত করতে পারি সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে ঈদ আমাদের জন্য অর্থহীন হয়ে পড়বে।

পবিত্র ঈদের জামাআতে শরিক হওয়ার আগেই ঈদের ফিতরা পরিশোধ করা উত্তম। আপনার প্রধান খাদ্যগুলোর প্রায় তিন বা সাড়ে তিন কেজি’র আর্থিক মূল্যই হচ্ছে একজনের জন্য প্রদেয় সর্বনিম্ন ফিতরা।

রমজান ছিল পাপ বর্জনের চর্চার মাস, আত্মশুদ্ধির মাস, কুরআন তিলাওয়াতের এবং আল্লাহকে জানার ও খোদাপ্রেমের মাস। রমজান ছিল শবে কদর বা ব্যক্তির মেরাজ তথা মহান আল্লাহর সঙ্গে প্রেম-অভিসারে মিলিত হওয়ার মাস।  এ মাসে কুরআন-হাদিস ও জ্ঞান চর্চারও উদ্দেশ্য ছিল খোদাপ্রেম বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। খোদাপ্রেমই হল সমস্ত সৌভাগ্য ও প্রশান্তির মূল উৎস। আর এর প্রাথমিক চাবিকাঠি হল জ্ঞান। একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহর ইবাদতের মূলও হচ্ছে ভালবাসা ও জ্ঞান।

একবার বিশ্বনবী (সা.) মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে দুই দল লোককে দেখতে পেলেন। প্রত্যেক দলই নির্দিষ্ট একটি কাজে ব্যস্ত ছিল। একদল ইবাদত বন্দেগি ও যিকির আজকারে ব্যস্ত ছিল, অন্যদিকে আরেক দল শিক্ষা নেয়া ও দেয়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। রাসূল (সা.) উভয় দলের দিকে তাকিয়ে আনন্দিত ও উৎফুল্ল হলেন। রাসূল (সা.) তাঁর সাথে আগত লোকদের দিকে ফিরে বললেন:

 এই উভয় দলই ভাল কাজ করছে এবং উভয় দলই সৌভাগ্যবান। এরপর রাসূল (সা.) বললেন: কিন্তু আমি মানুষকে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দিতে এসেছি। এরপর তিনি যে দলটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কাজে ব্যস্ত ছিল তাদের দিকে গেলেন এবং তাদের পাশে বসলেন।

হযরত আলী (আ.)’র যুগে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী খারেজীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের অজ্ঞতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। তাদের জ্ঞান ছিল চিন্তাহীন। কুরআনের বাহ্যিক দিক বা কভার ও প্রকৃত কুরআনের তফাৎ তারা বুঝতো না। কুরআনের আয়াতের শাব্দিক অর্থ ছাড়া অন্য কোন চিন্তা-ভাবনা তারা করতো না, সেরূপ যোগ্যতাও তাদের ছিল না। তাই যারা কুরআনের গভীর অর্থ জানেন-এমন লোকদের কথাবার্তা তারা মেনে নিতে পারতো না। ফলে তারা মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আসের মত লোকদের অতি সাধারণ ছল-চাতুরী, প্রতারণা ও ভণ্ডামির ফাঁদে পড়ে ধোঁকা খেয়েছিল।  

আলী (আ.) ছিলেন কোরআনের জীবন্ত ভাষ্যকার ও মুফাসসির। অথচ খারিজিরা তাঁকেই কুরআনের তাফসীর বোঝাতে চেয়েছিল। এরা অজ্ঞতা ও ইবাদতকে সমান্তরালে চালিয়েছিল। আলী (আ.) চেয়েছিলেন তাদের অজ্ঞতার সাথে যুদ্ধ করতে। কিন্তু তাদের এতসব ইবাদত,তাকওয়া ও যোহদ তাদের অজ্ঞতা থেকে আলাদা ছিল না।

আসলে খারিজিদের ইবাদতের সাথে অজ্ঞতার কোন পার্থক্যই ছিল না,আর তাই মহানবীর (সা.) পর ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত আলী (আ.) -এর কাছে খারিজিদের নিষ্প্রাণ ও শুষ্ক ইবাদতের কোন মূল্যই ছিল না। ফলে আলী (আ.) তাদেরকে হত্যা বা দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের ইবাদত, পরহিজগারিতা ও একাগ্রতা তাদেরকে আলীর (আ.) আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে নি।

মহান আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের অন্যতম উপায় হল উত্তম আচরণ। তাই যে আল্লাহর প্রেম চায় তাকে নিজের অশোভন আচরণকে প্রশংসনীয় আচরণে পরিণত করতে হবে। কারণ প্রতিটি প্রশংসনীয় আচরণই রবের নৈকট্য হাসিলের একেকটি মাধ্যম। আর প্রতিটি নৈতিক অপরাধ আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়ার একেকটি পদক্ষেপস্বরূপ এবং তাঁর অসন্তোষ উদ্রেককারী। তাই খোদাপ্রেমিককে অহংকারের জাহেলিয়াত ছেড়ে আসতে হবে বিনয়ের আলোর দিকে। তাকে লোভ-লালসার নীচতা ছেড়ে স্নেহ-ভালবাসার উত্তম গুণের দিকে এবং কার্পণ্যের কলুষতা থেকে মহানুভবতা ও দানশীলতার মহত্ত্বের দিকে আসতে হবে। অকৃতজ্ঞতার অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে কৃতজ্ঞতার সমুন্নত শিখরের দিকে আসতে হবে। তাকে আসতে হবে কপটতার অন্ধকার থেকে অকপটতা ও আন্তরিকতার আলোর দিকে। আর এইসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই আমরা ঈদ উৎসব পালন তথা মানবীয় ফিতরাত পালনের উৎসব হিসেবে ঈদুল ফিতর পালনের যোগ্যতা অর্জন করব।

প্রকৃত ঈদ উৎসবের যোগ্যতা রাখেন কেবল খোদা-প্রেমিক। আর খোদাপ্রেমিককে বস্তুজগতের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও সম্পদের সাথে জড়িয়ে পড়ারূপ মরু মরীচিকা থেকে প্রেমের বাগিচা এবং আসমানগুলো ও ধরণির মহান অধিপতির ওপর নির্ভরতার দিকে আসতে হবে। তাকে নিজেকে নিরাপদ ভাবার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ধারণা এবং অসচেতনতারূপ অন্ধকার থেকে খোদা-ভীতিরূপ আলোর দিকে যেতে হবে। খোদা-প্রেমিককে হতাশা ও অবিশ্বাসের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে আশা ও আস্থার আলোর দিকে, ক্রোধ ও আক্রোশের ছায়া থেকে ধৈর্য ও সহনশীলতার আলোর দিকে আসতে হবে। তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বিপদাপদের মুখে অধৈর্য ও উদ্বিগ্ন হওয়া রূপ অন্ধকার থেকে ধৈর্য ও ভাগ্য বা তাকদীরের তিক্ততার কাছে আত্মসমর্পণরূপ আলোর দিকে যেতে হবে। খোদা-প্রেমিককে উদাসীনতার অন্ধকার থেকে সচেতনতা ও স্মরণ রাখারূপ নুরের দিকে যেতে হবে। তাঁকে জটিল পরিস্থিতিজনিত হতবিহ্বলতা ও স্বেচ্ছাচারিতার অন্ধকার থেকে দৃঢ়তা ও বিনয়ের নুরের দিকে আসতে হবে। খোদা-প্রেমিককে পার্থিব উপায়-উপকরণের ওপর নির্ভরশীতার অন্ধকার থেকে যিনি সব প্রভুর প্রভু তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণরূপ আলোর দিকে এবং প্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার গোলামিরূপ অন্ধকার থেকে মহান সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যরূপ জ্যোতির দিকে ফিরতে হবে।  খোদাপ্রেমিককে হতে হবে ইসলামের নামে সক্রিয় আমেরিকান ইসলামসহ ভেজাল ইসলামগুলোর দূষণ থেকে মুক্ত এবং প্রকৃত মুহাম্মাদি ইসলামের অনুসারী। আমেরিকান ইসলামের অনুসারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি গণহত্যা দেখেও নীরব থাকে, অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলোর মুসলমানদের ওপর লেলিয়ে দেয় আলকায়দা ও আইএসআইএল-এর মত নানা সন্ত্রাসী তাকফিরি গ্রুপকে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত খোদাপ্রেমিক হওয়ার তৌফিক দিন।

 ৩০ তম রমজানের দোয়া
اليوم الثلاثون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ صِيامى فيهِ بِالشُّكْرِ وَالْقَبُولِ عَلى ما تَرْضاهُ وَيَرْضاهُ الرَّسُولُ، مُحْكَمَةً فُرُوعُهُ بِالاُْصُولِ، بِحَقِّ سَيِّدِنا مُحَمَّد وَآلِهِ الطّاهِرينَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعالَمينَ .
হে আল্লাহ ! তুমি ও তোমার রাসুল ঠিক যেমনিভাবে খুশি হবে তেমনি করে আমার রোজাকে পুরস্কৃত কর এবং কবুল করে নাও। আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তার পবিত্র বংশধরদের উসিলায় আমার সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলকে মূল এবাদতের সাথে যোগ করে শক্তিশালী কর। আর সব প্রশংসা ও স্তুতি জগতসমূহের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর।
রহমতের উৎসব-২৯

রমজানের রোজা বা সংযম সাধনার উদ্দেশ্য হল খোদাভীতি অর্জন। আর এ জন্য  ‘যুহ্ দ্’ বা পরকালের জন্য দুনিয়াদারি ও বস্তুবাদীতা পরিহার জরুরি। “যুহ্দ্-এর পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেছেন: …যাতে করে পার্থিব বিষয়াদির মধ্য থেকে যা যা তোমরা হারিয়েছ সে ব্যাপারে তোমরা দুঃখিত না হও এবং মহান আল্লাহ্ যে নেয়ামতগুলো তোমাদের দেবেন সে ব্যাপারে তোমরা আনন্দিত না হও।” যে ব্যক্তি অতীতের ব্যাপারে দুঃখ করে না এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে আনন্দিত হয় না আসলে সেই যুহদের দুই প্রান্ত নিজ হাতের মুঠোয় আনতে সক্ষম হয়েছে।

 

আলী (আ.) বলেছেন: “যুহ্দ্ হচ্ছে সংক্ষিপ্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ, নেয়ামতগুলোর ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং হারামগুলোর ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন।”

 

তবে মহানবী (সা.) স্পষ্টভাষায় বলেছেন,“ইসলাম ধর্মে বৈরাগ্যবাদের কোন স্থান নেই।”যখন মহানবী (সা.)-কে জানান হলো একদল সাহাবী জগৎ-জীবন ও সংসার ত্যাগ করে কেবলই নির্জনবাস ও ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হয়েছে তখন তিনি তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বলেছিলেন,

 

 “আমি যে তোমাদের নবী আমিও তো এমন নই।”মহানবী (সা.) তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, ইসলাম একটি সামাজিক ধর্ম। এ ধর্ম জীবন ও সমাজমুখী। এ ধর্ম জগৎ-জীবন-সংসার ত্যাগের আহ্বান জানায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজবিমুখ ইবাদত ও ইবাদতবিমুখ সমাজ-মুখিতা উভয়ই নিন্দনীয়।

তবে ইসলাম যে ‘যুহ্ দ্’-এর কথা বলে তার দর্শন হচ্ছে আত্মত্যাগ বা কুরবানি, মানবিকতা ও মানবসেবা।

 

একবার মহানবী (সা.) তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা যাহরা (আ.)-এর ঘরে এসে দেখতে পেলেন যে, ফাতেমা যাহরার বাহুতে একটি রূপার ব্রেসলেট এবং একটি সুশোভিত পর্দা দরজায় ঝুলানো আছে। ফলে মহানবীর পবিত্র মুখমণ্ডলে অপছন্দের ভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ফাতিমা যাহরা তখনই ওই পর্দা ও ব্রেসলেট এক ব্যক্তির মাধ্যমে মহানবীর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যাতে তিনি সেগুলো গরীব-দুঃখীদের দিয়ে দেন। হযরত ফাতিমা প্রকৃত বিষয়টি বুঝতে পেরে অন্যদের নিজের ওপর প্রাধান্য দেয়ায় মহানবী বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তাঁর পিতা তাঁর জন্য কুরবান হোক’।

 

হযরত আলী বলেছেন,“মুত্তাকী বা খোদাভীরু হলো ঐ ব্যক্তি যে তার নিজের প্রতি নিজের কঠোরতা আরোপের কারণে কষ্টের মধ্যে থাকে, অথচ জনগণ তার পক্ষ থেকে স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তি লাভ করে থাকে।”

 

মদীনার আনসাররা যাঁরা দরিদ্র অবস্থায় থেকেও দীনী মুহাজির ভাইদের আপ্যায়ন করেছেন এবং তাঁদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁদের প্রশংসায় পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে : (ইকো)

 

 “অন্যদের তারা তাদের নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয় যদিও তারা দরিদ্র ও অভাবী।”

হযরত আলী বলেছেন, “আলেমদের কাছ থেকে মহান আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন যেন তাঁরা জালেমদের ভূরিভোজন এবং মজলুমদের ভুখা-নাঙ্গা থাকার ব্যাপারে সন্তুষ্ট না থাকেন।”

 

কদরের রাতে ফেরেশতাদের আগমন ঘটে। তারাই সৌভাগ্যবান যারা  নিজেদেরকে ফেরেশতার গুণে গুণান্বিত করতে পেরেছেন।

 

এ রাতের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা এবং আত্মিক উন্নয়ন ঘটানো জরুরি। নামাজ যেমনভাবে মুমিনের মিরাজ, দোয়া ও শবে কদরও তেমনি মুমিনদের মিরাজ ও ঊর্ধ্বগমনের পথ। আমাদের এমন কাজ করা উচিত যাতে আত্মিক উন্নয়ন ঘটে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যে বস্তুর মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে আমাদেরকে তা থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। অতি লোভ, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি, বদমেজাজ, রূঢ়তা, অমানবিক ও মানবতাবিরোধী আচরণ, আগ্রাসন, সীমা লঙ্ঘন, বিশৃঙ্খলা, অশ্লীলতা, অন্যায়, অবিচার, জুলুম ইত্যাদি মানুষের আত্মিক আবর্জনা।

 

মানুষের জীবনের সবক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বজায় রাখা জরুরি। একজন মু’মিন মুসলমানের চূড়ান্ত সৌভাগ্য বা মুক্তির জন্য তা অপরিহার্য। ন্যায়-বিচারবোধের আলোকে জীবন পরিচালনা করতে না পারলে নামাজ-রোজা ও হজ-জাকাতের মত ইবাদতগুলো কোনো কাজেই আসবে না। বিশ্বনবী (সা.) একবার চুরির অপরাধে ধরা পড়া এক সভ্রান্ত মহিলাকে শাস্তি দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করতো তবে তার হাত কেটে দিতাম আমি।

 

আলী (আ.) বলেছেন:  

“যদি কোন মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে থাকে, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে থাকে, বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, তাহলে তার অধিকার খর্ব করা উচিত নয়। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে যদি ঐ মুমিন ব্যক্তি অন্যায় করে তাহলে কখনই উচিত নয় যে, তার অবদান ও ভূমিকার কারণে তার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া; বরং সে ব্যক্তি কারো অধিকার খর্ব করলে তার নিকট হতে অধিকার ফিরিয়ে না নেয়া অন্যায় বলে পরিগণিত হবে।”

 

নাজ্জাশী ছিল হযরত আলীর (আ.) পক্ষে তাঁর গুণগানকারী একজন কবি যে সিফ্ফিন যুদ্ধে যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করে ও হযরত আলীর খেলাফতের বৈধতার সপক্ষে সবচেয়ে সুন্দর ও অর্থবহ কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেছিল, কিন্তু ঐ একই ব্যক্তি যখন রমযান মাসে মদপান করেছে বলে হযরত আলী (আ.) জানলেন, তখন তাকে সর্বসমক্ষে মদপানের শাস্তিস্বরূপ বেত্রাঘাত জারি করেন।

অর্থসহ ২৯ তম রমজানের দোয়া
اليوم التّاسع والعشرون : اَللّـهُمَّ غَشِّني فيهِ بِالرَّحْمَةِ، وَارْزُقْني فيهِ التَّوْفيقَ وَالْعِصْمَةَ، وَطَهِّرْ قَلْبي مِنْ غَياهِبِ التُّهْمَةِ، يا رَحيماً بِعِبادِهِ الْمُؤْمِنينَ .
হে আল্লাহ ! আজ আমাকে তোমার রহমত দিয়ে ঢেকে দাও। গুনাহ থেকে মুক্তিসহ আমাকে সাফল্য দান কর। আমার অন্তরকে মুক্ত কর অভিযোগ ও সন্দেহের কালিমা থেকে । হে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি দয়াবান।

রহমতের উৎসব-২৮

রমজান মু’মিনদের জন্য ইবাদত ও সৎকর্মের বসন্ত। এ মাসে খোদাপ্রেমের অভিসারের  রাত্রি জাগরণে মানুষ ভুলে যায় আমিত্বকে। রমজান কুরআন তিলাওয়াতের বসন্ত। তবে কুরআন তিলাওয়াত হতে হবে ভাবনা-চিন্তা-ভিত্তিক। কুরআনের অর্থ নিয়ে গভীর-চিন্তা ভাবনা মানুষকে দেখায় সুপথ এবং ঈমানকে করে জোরালো।  কুরআন তিলাওয়াতের সময় মু’মিন হন অশ্রু-সজল। কুরআনের জাদুকরী প্রভাবের কথা ভেবেই মক্কার কাফির নেতারা তাদের অনুসারীদের বলতেন, কোথাও যাতে কুরআনের তিলাওয়াত শুনতে না হয় সে জন্য কানে তুলো দিয়ে রাখবে। কিন্তু সাহিত্যমোদী কাফির নেতারা নিজেরাই রাতের বেলায় কুরআনের মধুর ও বিস্ময়কর বাণীর তিলাওয়াত শোনার জন্য গোপনে বা মুখোশ পরে তিলাওয়াতের স্থানে হাজির হতেন! ধরা পড়ে যাওয়া কাফির নেতারা এভাবে একে-অপরের কাছে লজ্জিত হত। বহু কাফির কুরআনের আয়াত শুনেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতো। দু-একটি আয়াত শোনার পরই তাদের বিবেক বলে উঠতো- এমন চমৎকার কথা বা বাক্য কোনো মানুষের কথা হতে পারে না। কুরআনের এই জাদুকরি প্রভাব আজও বহাল রয়েছে এবং আজো তা বহু অমুসলিমকে প্রতি দিনই ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করছে।

ইসলাম হচ্ছে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা বা মান-কেন্দ্রীকতার ধর্ম। তাই এ ধর্ম বাহ্যিক ইবাদতের আকার-আকৃতি ও পরিমাণের চেয়ে ইবাদতের মধ্যে নিষ্ঠা বা মানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কম মনোনিবেশ করে বিশ আয়াত কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে মনোযোগসহ দুই আয়াত কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য কুরআন নাজিলের মাস রমজান ছাড়া অন্য সময়ও নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন জরুরি।

মনোযোগ ও খোদাপ্রেমের আকুলতাসহ দুই রাকাত নামাজ মনোযোগহীন হাজার রাকাত নামাজের চেয়েও উত্তম। কারো উপকার করে উপকারের কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া এর সাওয়াবকে বরবাদ করে দেয়। কোনো স্বার্থের আশায় পাওয়ার আশায় বা  কেবল সালাম বা মৌখিক ধন্যবাদ লাভের আশায় কারো উপকার করা এবং নিঃস্বার্থে বা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উপকার করার মধ্যে পার্থক্য হল আকাশ-পাতাল।

 

আলী (আ.)’র মতে যে ব্যক্তি বেহেশতের আশায় ইবাদত করে তার ইবাদত হল ব্যবসায়ীর ইবাদত; যে দোযখের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করে তার ইবাদত হল মজুর বা দাসের ইবাদত; আর যে আল্লাহর দয়া ও মহত্ত্বে অভিভূত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ইবাদত করে তার ইবাদত হল মুক্ত বা স্বাধীনচেতা মানুষের ইবাদত।  তাই তিনি বলেছেন: হে আল্লাহ! আমি তোমার দোযখের আগুনের ভয়ে বা তোমার বেহেশতের লোভে তোমার এবাদত করি না। আমি তোমার  ইবাদত করি এ কারণেই যে তোমাকে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য বলে চিনতে পেরেছি।

ইসলাম হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এ ধর্ম জীবনের সবক্ষেত্রে অযৌক্তিক আচরণের বিরোধী। যখন ও যে সময়ে যে কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলাম  ঠিক তা-ই করতে বলে। একজন নারী যখন কোনো মু’মিন মুসলমানের সামনে ডুবে মারা যেতে থাকে তখন তিনি এটা বলতে পারেন না যে এই মহিলা ডুবে যাক, আমি তো বেগানা মহিলাকে স্পর্শ করতে পারি না! না, বরং এক্ষেত্রে ওই নারীকে উদ্ধার করা একটি মানবিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তদ্রূপ এটাও বলা যাবে না যে, কাফিরের সঙ্গে অন্যায় আচরণে সমস্যা নেই। বরং সব ক্ষেত্রেই ন্যায়-বিচার বজায় রাখা মুসলমানের জন্য ফরজ।

সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজের নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। নিজের সন্তান বা পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনকেও এই দায়িত্বের আওতা থেকে মুক্ত রাখা যাবে না। তবে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনকে পরিশুদ্ধ করার আগে প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নিজেকে সংশোধন করা।

ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম রমজানের আরেকটি বড় শিক্ষা। পবিত্র ঈদের জামাত এই ইসলামী ঐক্যের একটি মাধ্যম। তাই বলা হয়েছে, যতটা সম্ভব মুসলিম নারীরাও যেন ঈদের জামাতে শরিক হয় যাতে ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের অধিক্য দেখে তাদের সমীহ করে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার ইমাম খোমেনী (র.) বর্তমান যুগে মুসলিম বিশ্বের প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যা তথা ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য রমজানের শেষ শুক্রবারে চালু করেছেন বিশ্ব কুদস দিবস পালনের প্রথা। দখলদার ইহুদিবাদীদের হাত থেকে মুসলমানদের প্রথম কিবলা উদ্ধারের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং মজলুম ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসাই এ দিবস পালনের একটি বড় উদ্দেশ্য। দেশে দেশে  মজলুম মুসলমানদের সহায়তার জন্য যদি আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না দেই তাহলে আমরা আসলে মুসলমান বলেই দাবি করতে পারি না। এ অবস্থায় আমাদের ঈদ-উৎসব পালন করাটাও হবে চরম পরিহাস মাত্র।

অর্থসহ ২৮ তম রমজানের দোয়া
اليوم الثّامن والعشرون : اَللّـهُمَّ وَفِّرْ حَظّي فيهِ مِنَ النَّوافِلِ، وَاَكْرِمْني فيهِ بِاِحْضارِ الْمَسائِلِ، وَقَرِّبْ فيهِ وَسيلَتى اِلَيْكَ مِنْ بَيْنِ الْوَسائِلِ، يا مَنْ لا يَشْغَلُهُ اِلْحـاحُ الْمُلِحّينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে নফল এবাদতের পর্যাপ্ত সুযোগ দাও। ধর্মীয় শিক্ষার মর্যাদায় আমাকে ভূষিত কর। তোমার নৈকট্য লাভের পথকে আমার জন্যে সহজ করে দাও। হে পবিত্র সত্ত্বা ! যাকে, অনুরোধকারীদের কোন আবেদন নিবেদন , ন্যায়বিচার থেকে টলাতে পারে না।

রহমতের উৎসব-২৭

রমজানের রোজার উদ্দেশ্য হল তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। আমরা যদি রমজান মাসে মনের অসংযত ইচ্ছা ও খেয়ালিপনার লাগামগুলো টেনে ধরে সেগুলোর ওপর বিবেক ও প্রজ্ঞাকে বিজয়ী করতে সক্ষম হই তাহলেই আমাদের রোজা রাখা হবে সার্থক। আমরা যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে নিয়মিত অনুশীলন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে মন্দ দোষগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি তাহলেই পরিণত হব প্রকৃত মানুষে। 

 

হযরত হোর (আ.) অতি উচ্চ মর্যাদা ও শাহাদতের পথ বেছে নিয়ে অমর হয়ে আছেন। তাঁর বিবেক মুহূর্তের মধ্যে এটা বুঝতে পেরেছিল যে ইয়াজিদ বাহিনীর বড় কর্মকর্তার পদে বহাল থেকে পদ-প্রতিপত্তি ও সম্পদের অধিকারী হওয়ার চেয়ে সত্যের পথে ইমাম হুসাইন (আ.)’র সহযোগী হওয়া এবং শহীদ হওয়ার মধ্যেই রয়েছে চিরন্তন সৌভাগ্য আর অতুল সম্মান। তাই ইয়াজিদের দল ত্যাগ করে ইমাম হুসাইন (আ.)’র শিবিরে যোগ দিতে বিলম্ব করেননি তিনি। কিন্তু একই ধরনের প্রলোভনের মুখে পরাজিত হয়েছিল ইবনে জিয়াদ,শিমার এবং ওমর সাদের বিবেক।  

 

খোদাভীতি মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করে। বাস্তব জীবনে খোদাভীতির অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। ইরানের উত্তরাঞ্চলে একটি ছোট শহরের এক রূপসীর  রূপের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল আশপাশের অনেক অঞ্চলে। রূপসীর যুবক স্বামী হজে যাওয়ার সময় স্ত্রীকে কার জিম্মায় রেখে যাবেন তা নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েন। অনেকেই নিন্দার ভয়ে বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে না পারার ভয়ে ওই রূপসীকে আশ্রয় দিতে রাজী হননি। অবশেষে একজন মধ্যবয়সী ধার্মিক ব্যক্তি ওই রূপসীকে নিজের বাড়ীতে আশ্রয় দেন। যুবক মাস ছয়েক পরে হজ থেকে ফিরে স্ত্রীকে ফেরত আনতে গেলেন। কিন্তু ওই বাড়ীর মহিলারা  যুবকের কাছে তার স্ত্রীকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে। তারা জানায় আশ্রয়দাতার নির্দেশ ছাড়া ওই নারীকে ফেরত দেয়া যাবে না। যুবক জানতে পারেন যে আশ্রয়দাতা তথা বাড়ীর কর্তা অনেক দূরে এক ভিন্ন শহরে রয়েছেন। যুবক সেখানে গিয়ে ওই তার অনুমতি নিয়ে নিজের স্ত্রীকে ফেরত আনতে সক্ষম হন।

 

যুবক ওই ব্যক্তির নিজ শহর ত্যাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, তোমার স্ত্রীকে আমার বাড়ীর মহিলাদের কাছে হস্তান্তর করেই ভাবলাম আমার মধ্যে এমন খ্যাতিমান রূপসীর রূপ দেখার লোভ জাগতে পারে, আর তা হবে অবৈধ এবং আমানতের খিয়ানত, তাই সিদ্ধান্ত নিলাম দূরের কোনো শহরে চলে যাব। 

 

পবিত্র রমজানে এবং বিশেষ করে কদরের রাতে বেশি বেশি তওবা বা ইস্তিগফার ও দোয়া করা জরুরি। কি কি বিষয়ে দোয়া করা উচিত তা জানা তথা উন্নত মানের দোয়া সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের উচিত বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের রেখে যাওয়া দোয়াগুলো পড়া। যেমন, আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)’র প্রণীত দোয়া-ই কুমাইল, ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)’র প্রণীত দোয়ায়ে আবু হামজা সামালি, দোয়ায়ে সাহারি, দোয়ায়ে তওবা ইত্যাদি।

 

দোয়ায়ে কুমাইলে খোদা-প্রেমিক আলী (আ.) বলেছেন: ‘হে আল্লাহ যদি তুমি আমাকে তোমার শত্রুদের সঙ্গে শাস্তি দিতে নিয়ে যাও এবং তোমার আজাব ভোগকারী লোকদের সঙ্গে আমাকে জড়ো করো আর তোমার ওলিদের কাছ থেকে আমাকে পৃথক করে নাও, তাহলে হয়তো হে আমার প্রভু, হে মালিক, হে ইলাহ! হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার সমস্ত শাস্তি ধৈর্যের সঙ্গে সয়ে নেব। কিন্তু তোমার থেকে বিচ্ছিন্নতা আমি কিভাবে সহ্য করবো? কিংবা ধরা যাক, আমি তোমার দোযখের আগুনের প্রজ্বলন সইতে পারলাম, কিন্তু কেমন করে আমি তোমার ক্ষমা ও দয়ার বঞ্চনা সয়ে নেব?’

 

দোয়ায়ে আবু হামজা সামালির একাংশে এসেছে:

 ‘হে আমার প্রভু! তুমি যদি আমাকে আগুনে নিক্ষেপ কর, সেটা কেবল তোমার শত্রুদেরই খুশি করবে, কিন্তু তুমি যদি আমায় বেহেশত দাও তাহলে সেটা তোমার নবীকে আনন্দিত করবে। আমি জানি, তোমার শত্রুপক্ষের আনন্দের চেয়ে তোমার নবীর আনন্দই তোমার কাছে বেশি প্রিয়। … যদি তুমি আমাকে শাস্তি দিতে চাও আমার দোষগুলোর জন্য তবে আমি তোমার অনুকম্পা চাইব, যদি তুমি আমাকে দোযখে নিক্ষেপ করো তবে আমি দোযখের অধিবাসীদের কাছে তোমার প্রতি আমার ভালবাসার কথা জানাবো।’

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, একজন মু’মিন পুরুষ বা নারী যখন অনুতপ্ত হন তখন তার চেয়ে আর কেউই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় নন। আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: যখন নামাজের সময় হয়, একজন ফেরেশতা মানুষকে ডেকে বলতে থাকেন- উঠে দাঁড়াও এবং তোমাদের পেছনে যে আগুন তোমরা প্রজ্বলিত করেছ সেটা তোমাদের মুখ দিয়ে তথা নামাজ আদায় করে নিভিয়ে ফেলো। 

 

 

আসুন আমরা মহান আল্লাহর অপার রহমত,বরকত ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ পবিত্র রমজান মাসে আমাদের সব অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি ও পাপের জন্য  আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আল্লাহ তো জানেন আমরা কেউই ফেরেশতা ও মাসুম নই। কিন্তু আমরা প্রকৃত মানুষের স্বভাব বা ফিতরাতের দিকে ফিরে যেতে চাই যতটা আমাদের পক্ষে সম্ভব।

 

হে আল্লাহ! আমাদেরকে প্রকৃত মানুষ হবার সৌভাগ্য দান করুন। আমরা যেন রমজান মাসে সার্বিকভাবে পবিত্র হয়ে ঈদুল ফিতরের সত্যিকারের আনন্দ উপভোগের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি  আপনার মহাকরুণার ওসিলায় সেই সৌভাগ্য আমাদের দান করুন।

 

অর্থসহ ২৭ তম রমজানের দোয়া
اليوم السّابع والعشرون : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ فَضْلَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَصَيِّرْ اُمُوري فيهِ مِنَ الْعُسْرِ اِلَى الْيُسْرِ، وَاقْبَلْ مَعاذيري، وَحُطَّ عَنّيِ الذَّنْبَ وَالْوِزْرَ، يا رَؤوفاً بِعِبادِهِ الصّالِحينَ
হে আল্লাহ ! আজকের দিনে আমাকে শবেকদরের ফজিলত দান কর। আমার কাজ কর্মকে কঠিন থেকে সহজের দিকে নিয়ে যাও। আমার অক্ষমতা কবুল কর এবং ক্ষমা করে দাও আমার সব অপরাধ। হে যোগ্য বান্দাদের প্রতি মেহেরবান।

রহমতের উৎসব-২৬

রমজান মাসে আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত আল্লাহর প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস অর্জন। আল্লাহর প্রতি আমাদের বিশ্বাস বা ঈমান নড়বড়ে বলেই আমরা নানা পাপে লিপ্ত হই। কিন্তু নবী-রাসূল, ইমাম ও প্রকৃত মু’মিনরা গুনাহ বা অন্যায় কাজ করাকে এমনভাবে পরিত্যাগ করেন ঠিক আমরা যেভাবে বিষকে পরিহার করি বা জেনেশুনে আত্মহত্যাকে এড়িয়ে চলি। আমরা অনেক সময় অন্ধকারে লাশ দেখলে ভয় পাই। কিংবা অন্ধকারে কোনো লাশের সঙ্গে রাত কাটাতে রাজি হই না। এর কারণ, সে যে মৃত এই বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তা সুদৃঢ় নয়। একইভাবে আল্লাহ যে সব অবস্থায় আমাদের দেখছেন তা অন্তত পাপ করার সময় আমরা মনে রাখি না।

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) একবার এক মু’মিন যুবককে প্রশ্ন করেন: রাত কিভাবে কাটালে? রাতভর ইবাদতের কারণে ক্লান্ত-শ্রান্ত এবং শীর্ণকায় ওই যুবক সাহাবি বলেন: নিশ্চিত ঈমান বা বিশ্বাস নিয়ে রাত কাটিয়েছি। বিশ্বনবী (সা.) চমকে উঠে তাকে আবারও প্রশ্ন করেন: তোমার এমন নিশ্চিত ঈমানের প্রমাণ বা নিদর্শন কী?  যুবক বলেন: এখনই বেহেশত ও দোযখের চিত্র দেখছি। আপনি যদি জানতে চান তাহলে বলে দিতে পারব আমাদের (সাহাবিদের মধ্যে) কারা বেহেশতি ও কারা জাহান্নামী। মহানবী (সা.) খুশি হন, তবে তাঁকে এইসব গোপন রহস্য ফাঁস করতে নিষেধ করেন। ওই যুবক পরে নিজের আগ্রহ অনুযায়ী জিহাদ করে শহীদ হন।    

 

মহাপুরুষেরা মহাপুরুষ হতে পেরেছেন সময়মত আকল বা বিবেক ও দূরদৃষ্টির প্রয়োগের মাধ্যমে পশু-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন বলেই। হযরত ইউসুফ (আ.) যদি বিবেক ও জ্ঞানকে কামনা বাসনার দাসে পরিণত করে জোলায়খার অসৎ আহবানে সাড়া দিতেন ও সংযমী হতে ব্যর্থ হতেন তাহলে মিশরের জনগণের মুক্তিদাতা হওয়ার গৌরব এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য তাঁর জুটত না। কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিখ্যাত আলেম মিরদমাদ ছাত্র-জীবনে  দেশের রাজকন্যাকে কাছে পেয়েও দোযখের কথা ভেবে প্রদীপের আগুনে আঙ্গুল পুড়িয়ে রাত কাটিয়েছেন। এই সততার জন্যই রাজা তার কাছে ওই কন্যাকে বিয়ে দেন এবং উপাধি দেন-মিরদমাদ বা শ্রেষ্ঠ জামাই।

 

একজন ‘অহানগার’ তথা সামান্য কামারও মুহূর্তের মধ্যেই সংযম চর্চা করে আল্লাহর ওলি হওয়ার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। একজন নারীকে অসহায় অবস্থায় বা বাগে পেয়ে কুমতলব হাসিল করতে চেয়েছিল এই কামার। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে সেই নারী ভয়ে কাঁপছে থর থর করে তখন তাকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন,কেন কাঁপছ? ওই নারী বলেছিল,আল্লাহ তো আমাদের দেখছেন, তাই ভয়ে কাঁপছি। ওই নারীর বিবেক ও জ্ঞানের আলো হঠাৎ করেই কামারের হৃদয়েও খোদাভীতি এবং বিবেকের আলো জাগিয়ে তুলল। ফলে কামার সেই খোদাভীরু নারীকে নিষ্কৃতি দিলেন। সেই নারী ছিল সাইয়্যেদ বংশের তথা নবী(দ.) বংশের মেয়ে। কামার স্বপ্নে দেখলেন, হযরত মা ফাতিমা (সা.)-কে। তিনি কামারকে বলছেন,তুমি যেহেতু আমার বংশের মেয়ের ইজ্জত রক্ষা করলে তাই তোমার জন্য দোযখের আগুনকে হারাম করা হল। এরপর কামার দেখলেন, তিনি জ্বলন্ত লোহা বা কয়লা কিংবা আগুন ধরলেও বিন্দুমাত্র তাপ অনুভব করেন না। অর্থাৎ এই দুনিয়াতেই আগুন তার বশীভূত হল। এ ছাড়াও আরো কিছু মহৎ ও অসাধারণ গুণের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি মহান আল্লাহর অনুগ্রহে।

 

রজব আলী নামের একজন দর্জিও আধ্যাত্মিক উচ্চ মর্যাদা হাসিল করেছিলেন একই ধরনের সংযমের গুণে। এই দর্জি অদৃশ্যের অনেক খবর বা রহস্য দেখতে পেতেন। আয়াতুল্লাহ বাহজাত (র.) খোদাভীতি ও আত্মসংযমের চর্চার কারণেই মানুষের প্রকৃত চেহারা বা অবস্থা উপলব্ধি করতেন। আর এ জন্যই তিনি চলতে ফিরতে মানুষের দিকে কম তাকাতেন। দৃষ্টিকে সংযত রাখতে দেখা গেছে ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার ইমাম খোমেনী (র.)-কেও।

নিজেকে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র মনে করা অহংকারকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম বা বিনয়ের লক্ষণ। মহাপুরুষরা তাদের অসাধারণ এবং অজস্র অবদানকেও অতি তুচ্ছ মনে করতেন। কারণ, তারা জানতেন বিন্দুমাত্র অহঙ্কারও তাদের সব অর্জনকে বরবাদ করে দিতে পারে। তাই সুখে-দুঃখে সব অবস্থাতেই তারা ছিলেন মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট এবং রাজার ব্যাপক অনুগ্রহ লাভে ধন্য ভিক্ষুকের মতই সদা-কৃতজ্ঞচিত্ত।

  

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর মহান সঙ্গীদের আত্মত্যাগ মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন ও সাফল্য। অথচ নবী-নাতনি ও ইমামের বোন হযরত জয়নাব (সালামুল্লাহি আলাইহা) কারবালার সেইসব অকল্পনীয় আত্মত্যাগের ঘটনার পর বিনম্র চিত্তে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলেছিলেন: হে আল্লাহ! আমাদের এই ক্ষুদ্র কুরবানি তুমি গ্রহণ কর।

অর্থসহ ২৬ তম রমজানের দোয়া
اليوم السّادس والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ سَعْيي فيهِ مَشْكُوراً، وَذَنْبي فيهِ مَغْفُوراً وَعَمَلي فيهِ مَقْبُولاً، وَعَيْبي فيهِ مَسْتُوراً، يا اَسْمَعَ السّامِعينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমার প্রচেষ্টাকে গ্রহণ করে নাও। আমার সব গুনাহ মাফ করে দাও। আমার সব আমল কাজ কবুল করো এবং সব দোষ-ত্রু টি ঢেকে রাখ। হে সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রোতা।

রহমতের উৎসব-২৫

পবিত্র রমজানের রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের দিনগুলো প্রায় শেষ। আর মাত্র ৪ বা সর্বোচ্চ ৫ দিন পরই আসছে ঈদ। মহান আল্লাহর রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের অফুরন্ত ভাণ্ডার সারা বছর ঠিক সেভাবে খোলা থাকবে না যতটা খোলা থাকে এই মাসে। আর এই মাসের যে কোনো দিনে চাওয়া মাত্রই যা দেয়া হয় তার মূল্য অপরিসীম। তবে বিশেষ করে, কদরের রাতে যা দেয়া হয় তা সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।  শবে কদর এমন এক অমূল্য ফুল যা বছরে কেবল একবারই ফোটে। এই ফুলের নির্যাস তথা আধ্যাত্মিক আতর এতো মূল্যবান যে অন্য সময় তা কেনার ক্ষমতা আধ্যাত্মিক জগতের বড় বড় রাজা-বাদশাহ তথা নবী-রাসূল বা ওলিদেরই রয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহ দয়া করে এই দিনে এমন অমূল্য জিনিষও বিনা মূল্যে যে কোনো মু’মিনকে দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।

 

আমরা আগেই বলেছি রোজার মূল উদ্দেশ্য হল: আত্ম-সংশোধন তথা খোদাভীরু হওয়া। যে ব্যক্তি সারা বছরই খোদাভীরু সে রোজার মাসে আরো খোদাভীরু হন। আর যে খোদাভীরু ছিলেন না মোটেই রোজা তাকে অন্তত খোদাভীরু করবে। খোদাভীরু ব্যক্তিকে তুলনা করা যায় এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে যে কাঁটা বিছানো পথে এমনভাবে চলবে যে কাঁটা তার পায়ে বিঁধবে না। কু-প্রবৃত্তি বা নফসের কুমন্ত্রণার কাছে খোদাভীরু পরাজিত হয় না।

 

মানুষকে দেয়া হয়েছে পাশবিক নানা প্রবৃত্তি এবং এর পাশাপাশি দেয়া হয়েছে আকল বা বিবেক ও জ্ঞান। মানুষ যদি পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে আঁকলের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তাহলেই সে হয় সৃষ্টির সেরা জীব বা পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি। অর্থাৎ এ অবস্থায় মানুষের মর্যাদা ফেরেশতার চেয়েও বেশি।

 

আবার অন্যদিকে, মানুষের বিবেক যদি কু-প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয় তাহলে তাহলে সে হয়ে পড়ে পশুর চেয়েও অধম। কারণ, পশুকে জ্ঞান ও বিবেক দেয়া হয়নি। তাই বলা যায় বিবেকহীন মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।

 

পশুরাও কিছু নিয়ম বা নীতি মেনে চলে। যেমন,  হিংস্র পশু যখন অভুক্ত থাকে না তখন সে অন্য প্রাণীর ওপর হামলা করে না। পশুরা অল্পতেই তুষ্ট থাকে। অথচ মানুষ নামধারী অনেক প্রাণী যতই পায় ততই চায়। তার বাড়ির সংখ্যা এক থেকে বেড়ে দশটি হওয়ার পরও আরও চাইতে থাকে। এমনকি সুযোগ পেলে সে গরিব বা হত-দরিদ্র ব্যক্তির বাড়িও কেড়ে নেয়!

 

আরবি রমজান শব্দটি এসেছে ‘রমজ’ থেকে। রমজ শব্দের অর্থ হল জ্বালিয়ে দেয়া। এই মাসে হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, পেটুকতা বা ভোজন-বিলাস, কাম, ক্রোধ, খেয়ালিপনা ইত্যাদি বহু মানবীয় দোষ-ত্রুটিকে জ্বালিয়ে দেয়া যায় সংযম বা আত্মনিয়ন্ত্রণের আগুনে। অন্য কথায় এই মাস হল শ্রেষ্ঠ জিহাদের মাস। কারণ, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, নফস বা প্রবৃত্তির (লাগামহীন) চাহিদার  সঙ্গে যুদ্ধ করাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধ।

 

আমরা যদি রমজান মাসে মনের অসংযত ইচ্ছা ও খেয়ালিপনার লাগামগুলো টেনে ধরে সেগুলোর ওপর বিবেক ও প্রজ্ঞাকে বিজয়ী করতে সক্ষম হই তাহলেই আমাদের রোজা রাখা হবে সার্থক। আমরা যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে নিয়মিত অনুশীলন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে মন্দ দোষগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি তাহলেই পরিণত হব প্রকৃত মানুষে। মানুষের প্রকৃত ফিতরাত বা স্বভাবগুলো এভাবেই অর্জিত হতে পারে। অর্থাৎ নিজের কামনা-বাসনাগুলোর ওপর বিবেকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা ফিরে পেতে পারি আল্লাহর প্রকৃতি প্রতিনিধির মর্যাদা। এ জন্যই রমজান শেষে যে ঈদ আসে তাকে বলা হয় ঈদুল ফিতর বা মানুষের প্রকৃতি তথা ফিতরাতকে ফিরে পাওয়ার উৎসব। এই ঈদের আনন্দ কেবল তার জন্যই প্রযোজ্য যে নিজেকে সংশোধন করতে পেরেছে ঠিক যেমন ইফতার করা কেবল রোজাদারের জন্যই শোভনীয়।

অর্থসহ ২৫ তম রমজানের দোয়া

اليوم الخامس والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْني فيهِ مُحِبَّاً لاَِوْلِيائِكَ، وَمُعادِياً لاَِعْدائِكَ، مُسْتَنّاً بِسُنَّةِ خاتَمِ اَنْبِيائِكَ، يا عاصِمَ قُلُوبِ النَّبِيّينَ .

হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার বন্ধুদের বন্ধু এবং তোমার শত্রুদের শত্রু করে দাও। তোমার আখেরী নবীর সুন্নত ও পথ অনুযায়ী চলার তৌফিক আমাকে দান কর। হে নবীদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষাকারী।
রহমতের উৎসব-২৪

পবিত্র রমজানের প্রাণ বা হৃদয় হলো শবে কদর। আরবিতে ‘কাদর’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে পরিমাপ। এই রাতে কি পরিমাপ করা হয়? এর উত্তর হল: কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বণ্টন করা হবে সারা বছরের জন্য- তাই পরিমাপ করা হয় সৌভাগ্যের এই রাতে। কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বরাদ্দ করা হয়? এর উত্তর হল: আপনি যতটা চান ততটাই বরাদ্দ করা হয়। কারণ, এই রাতে যিনি দান করেন তিনি হলেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের অধিকারী অসীম দয়ালু ও দাতা মহান আল্লাহ। কেউ যদি কম চায় তাহলে তো কেউই তাকে বেশি দেয় না। মহান আল্লাহর কাছে কেউ যদি কম চায় তাহলে তা আল্লাহর জন্য এক ধরণের অবমাননাকর বিষয়। ধরুন একজন মহারাজা এক বিশেষ দিনে বলছেন, আজ যে যা চাইবে তাকে তা-ই দেয়া হবে। শত শত বা হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও হীরা-জহরত দেয়া হবে চাওয়া মাত্রই। এ অবস্থায় কেউ যদি বলেন আমাকে কয়টা রূপার মুদ্রা দেন। রাজা তাকে অপমান করা হচ্ছে ভেবে তাড়িয়ে দিতে পারেন প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে।

 

শবে কদরের রাতে কেউ যদি প্রতিজ্ঞা করে, হে আল্লাহ আমি আর মিথ্যা কথা বলবো না, আমি আর গিবত করবো না। তাহলে মহান আল্লাহ তার এই সৎ সিদ্ধান্তের আলোকে তাকে সারা বছর ধরে সম্মান ও মর্যাদা দানের ব্যবস্থা করবেন এবং তার রুটি-রুজিতেও দেবেন বরকত। কেউ যদি এ রাতে সিদ্ধান্ত নেয় যে আমি যথাসম্ভব দরিদ্র ও ইয়াতিমদের সহায়তা করবো এবং দূরে সরে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেব, তাহলে আল্লাহও তাকে এই সৎ সিদ্ধান্তের আলোকে সারা বছর ধরে নানা পুরস্কার দেবেন। মোট কথা এই রাতে যে যত বেশি ভাল কাজ করার ও পাপাচার বা বদ-অভ্যাস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেবে আল্লাহ তাকে ততই বরকত দেবেন গোটা এক বছর ধরে। তবে এ রাতে বড় বড় সৎকর্মের বা মহত কাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও যদি কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকে এবং এইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বাস্তব কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার বা উন্নতি তার ভাগ্যে জুটবে না। শবে কদরের রাতে কেউ অতীতের পাপের জন্য ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন। কিন্তু এরপর আবার পরের দিন থেকে একই বা নতুন নতুন নানা পাপে জড়িয়ে পড়লে বাস্তবে শবে কদর থেকে সে কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হল না।

  

আল্লাহ সব সময়ই দয়ালু। কিন্তু তাই বলে তাঁর দয়াকে পাপ করার অবাধ লাইসেন্স হিসেব গ্রহণ করা ধৃষ্টতা ও বোকামি ছাড়া আর কিছুই হবে না।   

 

একবার এক যুবক আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.)’র কাছে এসে জানান যে, পাপ বর্জন করা আমার জন্য খুবই কঠিন; এখন এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?

 

আলী (আ.) তাকে তিরস্কার করে বলেন: ৫ টি শর্ত পূরণ করতে পারলে যত খুশি পাপ করো। এই ৫ টি শর্ত হলো: প্রথমত আল্লাহর দেয়া রিজিক ভোগ করবে না, দ্বিতীয়ত আল্লাহর রাজ্য থেকে বেরিয়ে যাও, তৃতীয়ত এমন এক জায়গা খুঁজে নাও যেখানে আল্লাহ তোমাকে দেখবেন না, চতুর্থত এমন ক্ষমতা অর্জন করো যাতে করে মৃত্যুর ফেরেশতাকে তোমার জান কবজে বাধা দিতে পার এবং পঞ্চমত এমন শক্তি অর্জন করো যাতে দোযখের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা ‘মালিক’ তোমাকে দোযখে ছুঁড়তে চাইলে তুমি তা প্রতিরোধ করতে পারো।

 

কিন্তু এটা স্পষ্ট যে-এই ৫ শর্ত পূরণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

 

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন: যারা ঈমান আনে ও নেক কাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপ পরিবর্তন করে দেবেন পুণ্যের মাধ্যমে। (২৫:৭০)

 

মানুষের বোঝা উচিত তার মূল্য কত বেশি। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী কিছু সম্পদ ও চাকচিক্যের মোহে পরকালের অসীম জীবনকে বরবাদ করা হবে চরম বোকামি। অথচ আমরা সামান্য মূল্যে আমাদের ঈমান ও ধর্মকে বিকিয়ে দিচ্ছি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বেহেশত ও চরম সৌভাগ্য দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন অথচ আমরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করছি না। এমনকি শবে কদরের মত সৌভাগ্যের সুবর্ণ সুযোগগুলোকেও হাতছাড়া করছি উদাসীনতার কারণে। মানুষ হচ্ছে এমন এক সত্তা যার প্রাণ ও ঈমানের মূল্য একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন। তাই বেহেশতের চেয়ে কম মূল্যে তা বিক্রি করা উচিত নয়।

 

কবি নজরুল বলেছেন: আল্লাহর কাছে আমরা যেন কখনও ক্ষুদ্র কিছু না চাই এবং আমাদের উচিত চাপরাশির তকমার চেয়ে তলোয়ারকে বড় মনে করা ।

অর্থসহ ২৪ তম রমজানের দোয়া
اليوم الرّابع والعشرون : اَللّـهُمَّ اِنّي اَسْأَلُكَ فيهِ ما يُرْضيكَ، وَاَعُوذُبِكَ مِمّا يُؤْذيكَ، وَاَسْأَلُكَ التَّوْفيقَ فيهِ لاَِنْ اُطيعَكَ وَلا اَعْصيْكَ، يا جَوادَ السّائِلينَ .
হে আল্লাহ ! আজ তোমার কাছে ঐসব আবেদন করছি যার মধ্যে তোমার সন্তুষ্টি রয়েছে। যা কিছু তোমার কাছে অপছন্দনীয় তা থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তোমারই আনুগত্য করার এবং তোমার নাফরমানী থেকে বিরত থাকার তৌফিক দাও। হে প্রার্থীদের প্রতি দানশীল।

রহমতের উৎসব-২৩

দেখতে দেখতে পবিত্র রমজানের বরকতময় দিনগুলোর বেশিরভাগই অতিক্রান্ত হয়ে গেল।

 বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, শবে কদর হচ্ছে রমজানের প্রাণ বা হৃদয়।

 

সম্ভাব্য শবে কদরের দু’টি রাতও চলে গেল। আমাদের এখন নিজের হিসেব নিজেরই নেয়া উচিত যে কতটা রহমত ও বরকত অর্জন করতে পেরেছি আমরা এবারের এই রমজানে। রমজানের বরকতের একটা বড় দিক হল-এ মাসে আমরা নিজের অবস্থা তথা আত্মশুদ্ধি ও উন্নয়নের একটা পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ পাই।

 

আমরা অনেকেই জীবনে অনেকগুলো রমজান মাস ও অনেকগুলো শবে কদর পেয়েছি। কিন্তু আমরা কি সেই এক বা দুই যুগ আগের অবস্থা থেকে নিজেদের উন্নত করতে পেরেছি? আমরা কি এখনও অনায়াসে গিবত করছি? আমরা কি এখনও অশালীন কথা বলছি ও শুনছি বা নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখছি এবং এসবের মধ্যে মজা অনুভব করছি? আমরা কি এখনও অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করার ব্যাপারে কার্পণ্য অনুভব করি? আমরা কি এখনও কেবল সুখের সময় বা আরামের সময় আল্লাহ ও ধর্মের জয়গান করছি এবং একটু বিপদ বা কষ্ট এলেই হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে ধর্ম ও আল্লাহর প্রতি ক্ষিপ্ত হচ্ছি? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি হয় ইতিবাচক তাহলে তার অর্থ হচ্ছে আমরা কেবল পণ্ডশ্রমই করে যাচ্ছি! এখনও যদি আমাদের মধ্যে দয়াশীলতা, ক্ষমাশীলতা, মানুষের প্রতি ভালবাসা ও পরোপকারিতার মত নানা মহৎ গুণগুলোর অস্তিত্ব না থাকে, বরং হিংসা, ক্রোধ, ক্ষমাহীনতা ও প্রতিহিংসার মত দোষগুলো থেকে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের ঈমান অন্তঃসারশূন্য বা খুবই কাঁচা এবং কয়েক যুগের নামাজ-রোজা আমাদের মোটেও উন্নত করেনি। প্রশ্ন উঠতে পারে-এর কারণ কি?

 

আসলে যুগ যুগ ধরেও নামাজ-রোজা করার পরও আমাদের অনেকের অবস্থার বাস্তব উন্নতি না হওয়ার কারণটি হল কোনো একটি আধ্যাত্মিক কাজ বা আমল করতে পারাটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার প্রভাব নিজের মধ্যে ধরে রাখাটা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও তা অনেক বেশি কঠিন কাজ। আপনি অনেক ফসল বা অর্থ সঞ্চিত করতে পারেন পরিশ্রমের মাধ্যমে। কিন্তু অর্জনের যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়, সংরক্ষণের যোগ্যতাও থাকতে হবে। যে গুদামে আপনার ফসল রাখবেন তাতে যাতে পোকা বা ইঁদুর ঢুকে ফসলগুলো ধ্বংস করে না ফেলে সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে অনেকেই উদাসীন। ফলে দুনিয়ার ছোট ছোটো স্বার্থ বা অর্থের মোহে পরকালের বিপুল সঞ্চয়কে যে নিমিষেই ধ্বংস করে ফেলছি সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। পুরো রমজান মাসে ইবাদত করে ও  নামাজ পড়ে যতটা পুণ্য জমা করেছি তা গিবত, চোগোলখুরি, তোহমৎ বা হিংসার মত পাপগুলো খেয়ে ফেলছে। ফলে পরকালে যখন রেজাল্টশীট হাতে দেয়া হবে, তখন অবাক হয়ে বলবো-নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছে ফেরেশতারা! এখানে আমার নামটি থাকলেও আমার ৫০-৬০ বছরের নামাজ রোজার ফলগুলো যে দেখছি না! সেইসব মসজিদে যাওয়া ও প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আজানের পরপরই নামাজে উপস্থিত হওয়ার সেই বিপুল সাওয়াবগুলো কোথায়?

 

তাই আমাদের এখনই দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হতে হবে পুণ্যগুলোকে সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে। মৃত্যু যে খুব বেশি দূরে তা ভাবা ঠিক হবে না। আজ না হোক, কাল না হোক, বহু বছর পরে হলেও মৃত্যু আমাদের হবেই। সেই কবরে তো খালি হাতে যাওয়া যাবে না। নামাজ-রোজা ও কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াবগুলোকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সাওয়াব-বিধ্বংসী পাপগুলো থেকে বিরত থাকতেই হবে। অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ও প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলা-মেশার ক্ষেত্রে তাদের অধিকারগুলো মেনে চলতে হবে। অফিসে-আদালতে, নিজ নিজ কাজে বা ব্যবসায় সততা বজায় রাখতে হবে।

 

আমরা যদি কারো অধিকার লঙ্ঘন করে থাকি সে জন্য সম্ভব হলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ক্ষতিপূরণের পথ বন্ধ হয়ে থাকলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং আমার অধিকার যারা ক্ষুণ্ণ করেছে তাদেরকে ক্ষমা করতে হবে। শবে কদরের রাতে এভাবেই ক্ষমা চাইতে হবে এবং অন্যদের ক্ষমা করে দিয়ে তাদের জন্যও আল্লাহর রহমত কামনা করতে হবে। সহজে ক্ষমা লাভের এটাই মোক্ষম উপায়। 

 

একবার এক ব্যক্তি কিছু শসা কিনতে যান। কেনার সময় বেছে বেছে ভালো শসাগুলো নিতে গেলে বিক্রেতা বলেন, না! সরস-নীরস সবই নিতে হবে, বাছাবাছি চলবে না! ক্রেতা বললেন: হে দয়াময় খোদা! পরকালে আমাদেরও এভাবেই যেন সবাইকে বেহেশতে যেতে দেয়া হয়!  আমার মত পাপী আর নেককারের মধ্যে তফাৎ কোরো না! খোদাপ্রেমিকরা এভাবে দোয়া করার সময় পাপীদের জন্যও দোয়া করেন বলে আল্লাহ খুশি হন।

অর্থসহ ২৩ তম রমজানের দোয়া
اليوم الثّالث والعشرون : اَللّـهُمَّ اغْسِلْني فيهِ مِنَ الذُّنُوبِ، وَطَهِّرْني فيهِ مِنَ الْعُيُوبِ، وَامْتَحِنْ قَلْبي فيهِ بِتَقْوَى الْقُلُوبِ، يا مُقيلَ عَثَراتِ الْمُذْنِبينَ .
হে আল্লাহ ! আমার সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দাও। আমাকে সব দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র কর। তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে আমার অন্তরকে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কর। হে অপরাধীদের ভুল-ত্রুটি মার্জনাকারী।

রহমতের উৎসব-২২

পবিত্র রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো অতিক্রম করছি আমরা। কারণ, রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যেই রয়েছে পবিত্র কদরের রাত।  কেউ কেউ মনে করেন ১৯, ২১ ও ২৩ তম রোজার মধ্যেই শবে কদর থাকার সম্ভাবনা বেশি। আবার অনেকে মনে করেন, শবে কদরের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রাতটি হল ২৭ রোজার রাত। আবার অনেকে মনে করেন যেহেতু কোন রাতটি শবে কদর তা  সুনিশ্চিতভাবে নির্ধারিত করা হয়নি এবং একেক বছর একেক বেজোড় রাতে শবে কদর হতে পারে তাই রমজানের শেষ দশ দিনের প্রতিটি বেজোড় রাতকেই শবে কদর হিসেবে ধরে নিয়ে আল্লাহর প্রেমপূর্ণ ইবাদতে মশগুল থাকা উচিত।  এই রাতগুলোতে দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও নানা ধরনের নফল ইবাদতগুলো হওয়া-উচিত খোদা-পরিচিতি এবং খোদা-প্রেমের গভীর-চিন্তা-ভাবনাযুক্ত। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ আমলগুলোর পাশাপাশি এই দিন ও রাতগুলোতে দান-খয়রাতও বিশেষভাবে জরুরি ও পরিপূরক। অবশ্য মাত্রাতিরিক্ত নফল ইবাদতে লিপ্ত হতে গিয়ে আমরা যেন ফরজ ইবাদতের ক্ষতি না করি ও বেশি জরুরি কাজগুলোর কথা ভুলে না যাই।

 

বলা হয় এক ঘণ্টার জরুরি ইসলামী জ্ঞান চর্চা ৭০ বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। কারণ অজ্ঞতাই হল ইবাদতের মধ্যে আন্তরিকতাহীনতা, নিষ্প্রাণতা এবং বিনম্রতা ও ভীতি-বিহ্বলতা না থাকার মূল উৎস।

 

অজ্ঞতা মানুষকে পাপ ও জাহান্নামে ঠেলে দেয় বলে জাহান্নাম হল চির-অন্ধকার এবং এমনকি জাহান্নামের আগুনও কোনো আলো দেয় না, বরং অন্ধকারকে আরো গাঢ় করে। হাদিসের আলোকে বলা যায়, আমরা যদি গিবত, অপবাদ ও অন্যদের হেয় করার মত পাপাচারসহ বাড়তি কথা বলা থেকে মুক্ত থাকতাম এবং অবাঞ্ছিত ভালবাসা বা মোহগুলো থেকে দূরে থাকতাম তাহলে আল্লাহর নবী-রাসূল বা ওলিরা যা দেখতেন আমরা অন্তর্দৃষ্টির নূরের মাধ্যমে সেসবই দেখতে পেতাম।

 

জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞানের  জাকাত হল অন্যকে জ্ঞান দান করা তথা সুপথ দেখানো। জ্ঞানীরা যদি বাস্তবতাগুলো ও বিশ্বনবী (সা.) থেকে যা শুনেছিলেন তা জনগণের মধ্যে প্রচার করে জনগণকে সচেতন করতেন তাহলে কারবালার মত মহা-বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটতো না। যারা এই দুনিয়ায় জ্ঞানপাপী বা অন্ধ ও  স্বার্থপর তারা পরকালেও অন্ধ থাকবে এবং কেউই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না।

 

মহান আল্লাহ সুন্দর, তাই তিনি সৌন্দর্য ভালবাসেন। তবে প্রকৃত সৌন্দর্য হল চারিত্রিক পবিত্রতা ও আচার-আচরণের সৌন্দর্য। বলা হয় সৌন্দর্যের জাকাত হল চরিত্রকে পবিত্র রাখা।

 

মহান আল্লাহ দানশীল। তাই বছরের যে কোনো সময় এবং বিশেষ করে রমজানের দিনগুলোতে দরিদ্রদের ইফতার দেয়া, জাকাত দেয়া, ইয়াতিমদের খাদ্য দেয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় কাজ। এ ছাড়াও নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের খোজ-খবর নেয়াও রমজানের অন্যতম পছন্দনীয় কর্মসূচি। বিশেষ করে, মা-বাবার সেবা করা ও মৃতদের নামে সদকা দেয়া সব সময়ের মত এ সময়ও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় কাজ। আর যাদের মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের উচিত রমজানে ও বিশেষ করে শবে কদরে মৃত মা-বাবার জন্য বেশি বেশি দান-খয়রাত করা, সদকা দেয়া এবং সমস্ত নফল ইবাদতের সওয়াব তাদের নামে উৎসর্গ করা। বলা হয় মা-বাবার দিকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসাপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে তাকানোও ইবাদত।  ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী নবী-রাসূল ও মাসুম ইমামদের নামেও সদকা দেয়া খুবই পছন্দনীয় কাজ।

 

সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালবাসা, নবী-রাসূল আর ইমামদের দেয়া হেদায়াত, মহাপুরুষদের ধৈর্য ও কষ্ট-সহিষ্ণুতা, সাহস, মহানুভবতা এবং ন্যায়পরায়ণতার জন্য মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু মহান আল্লাহই তাদের মধ্যে দান করেছেন এইসব গুণ। এ জন্য আমাদের উচিত মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানানো। আমরা যদি মহামানবদের দোয়াগুলো লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো যে তাতে তারা আল্লাহর দেয়া নানা নেয়ামত ও সুযোগ-সুবিধাগুলোকে যত বেশি সম্ভব আলাদাভাবে উল্লেখ করে আল্লাহর প্রশংসা করেন। পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সুখ-শান্তি যেমন অজস্র প্রকারের হয়, তেমনি বিপদ-আপদ এবং কষ্টও হয় অজস্র ধরনের। তাই এসবের তুলনা করে আল্লাহর প্রেম ও প্রশংসায় বিমুগ্ধ হয়ে থাকেন খোদা-প্রেমিকরা। প্রকৃত খোদা-প্রেমিকরা পার্থিব ও পারলৌকিক কোনো পুরস্কার বা শাস্তির বিষয়ে মনকে মশগুল না রেখে আল্লাহর কাছে কেবল আল্লাহর প্রেম বা সন্তুষ্টিই কামনা করেন। আসলে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বা প্রার্থনা। 

 

মহানবী (সা.) বলেছেন: পরিতৃপ্ততা বা তুষ্টচিত্ততা হচ্ছে এমন এক সম্পদ যার কোনো ক্ষয় নেই।

 

আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: আমি ধনী হতে চেয়েছিলাম, তুষ্টচিত্ততার চেয়ে আর কিছুতে তা পাইনি, আমি সম্মান ও মর্যাদা চেয়েছি জ্ঞান ছাড়া অন্য কিছুতে তা পাইনি, আমি মহত্ত্ব চেয়েছি, আল্লাহকে ভয় করা ছাড়া আর কিছুতে তা পাইনি, আমি প্রশান্তি চেয়েছি, আর তা পেয়েছি লোকজনের সঙ্গে অতিরিক্ত মেলা-মেশা ত্যাগ করে, তাই দুনিয়াদার লোকদের সঙ্গ ছাড়ো, প্রশান্তি পাবে।

 

অর্থসহ ২২ তম রমজানের দোয়া
اليوم الثّاني والعشرون : اَللّـهُمَّ افْتَحْ لى فيهِ اَبْوابَ فَضْلِكَ، وَاَنْزِلْ عَلَيَّ فيهِ بَرَكاتِكَ، وَوَفِّقْني فيهِ لِمُوجِباتِ مَرْضاتِكَ، وَاَسْكِنّي فيهِ بُحْبُوحاتِ جَنّاتِكَ، يا مُجيبَ دَعْوَةِ الْمُضْطَرّينَ .
হে আল্লাহ ! আজ তোমার করুণা ও রহমতের দরজা আমার সামনে খুলে দাও এবং বরকত নাজিল কর । আমাকে তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দাও। তোমার বেহেশতের বাগানের মাঝে আমাকে স্থান করে দাও। হে অসহায়দের দোয়া কবুলকারী।

রহমতের উৎসব-২১

পবিত্র রমজানের রাত্রি জাগরণের সময় জ্ঞান-সাধনা ও আল্লাহর গুণগুলো নিয়ে ভাবনা-চিন্তার কথা আমরা বলেছিলাম। আমরা জেনেছি যে আল্লাহ নিজেকে আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলীর নূর বলে উল্লেখ করেছেন যার একটি অর্থ হতে পারে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাময়তা। ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীনে যাও।

 

মহান আল্লাহর নানা নাম থেকেই স্পষ্ট যে তিনি দয়াশীল রাহিম, জাওয়াদ বা দানশীল, ক্ষমাশীল বা গাফুর, মহানুভব বা আজিম, রিজিকদাতা বা রাজ্জাক, প্রজ্ঞাময় বা হাকিম, দোষ-ত্রুটি গোপনকারী বা সাত্তার, বিজয়ী বা কাহহার, ধৈর্যশীল বা সাবুর, ন্যায়বিচারক বা আদিল, জ্ঞানী বা আলিম ইত্যাদি। তাই মহাপুরুষদের আচার-আচরণ বা চরিত্রেও এইসব নাম ও গুণের প্রভাব দেখা যায়। তবে আল্লাহর এইসব গুণের যে মাত্রা তা হল অসীম ও অকল্পনীয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে এইসব গুণ সসীম।

 

কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন ছাড়া মহাপুরুষদের জীবনী অধ্যয়নও মহান আল্লাহকে চেনার এবং তাঁর নৈকট্য অর্জনের পন্থাগুলো জানার অন্যতম মাধ্যম। রমজানে পাপ বর্জন ও গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নেয়া ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্ভব নয়। তার আগে জানতে হবে গুনাহগুলোর ধ্বংসাত্মক পরিণতি ও গুনাহর নানা কারণ এবং প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে।  আর এ জন্যও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে আকুলভাবে। দোয়া-ই কুমাইলে বলা হয়েছে:

 

হে আল্লাহ ! আমার ঐসব পাপ ক্ষমা করে দাও যা’ সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দেয় । সংযমবিধ্বংসী পাপগুলো হল: মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন, জুয়া খেলা, তামাশা ও বিদ্রূপপূর্ণ খেলায় অংশ নেয়া, অন্য মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়ে গল্প করা এবং সন্দেহবাদী ও নাস্তিকদের সাথে ওঠাবসা করা ইত্যাদি। (আনিসুল লাইল,ইমাম জাফর সাদিক)

একই দোয়ায় বলা হয়েছে: হে আল্লাহ ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা’ দুর্যোগ ডেকে আনে। দুর্যোগ-ডেকে-আনা পাপগুলো হল চুক্তি ভঙ্গ করা, লজ্জাজনক কাজ প্রকাশ করা, আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশের বিপরীত রায় দেয়া, জাকাত দিতে অস্বীকার করা বা বাধা দেয়া, মাপে কম দেয়া ইত্যাদি। (মালবুবি)

দোয়া-ই কুমাইলে আরো বলা হয়েছে: হে আল্লাহ! আমার ঐ সব পাপ ক্ষমা করে দাও যা’ তোমার নিয়ামতগুলোকে গজবে পরিবর্তিত করে দেয় ।  এ জাতীয় পাপের কিছু দৃষ্টান্ত হচ্ছে: মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করা, একজন আলেমকে  চুপ করিয়ে দেয়া বা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা, আল্লাহর রহমতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং আল্লাহর সাথে শরীক করা, নিজের দারিদ্র প্রচার করা, আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া ও আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা ইত্যাদি। (ইমাম জাফর সাদিক,আনিসুল লাইল)

একই দোয়ায় বলা হয়েছে: হে আল্লাহ ! আমার ঐসব পাপ ক্ষমা করে দাও যা’ দোয়া কবুল হবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।  এ জাতীয় কিছু পাপ হল: বিকৃত ঈমান পোষণ, দোয়া কবুল হবার ব্যাপারে অবিশ্বাস, ভাইয়ের প্রতি মুনাফেকি, সময়মত নামাজ না পড়া, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন না করা ইত্যাদি। ( প্রাগুক্ত। )

দোয়া-ই কুমাইলে আরো বলা হয়েছে: হে আল্লাহ! আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা’ দুর্ভাগ্য বা কষ্ট ডেকে আনে । এ জাতীয় কিছু পাপ হল:  যারা কষ্টে আছে তাদের সাহায্য না করা, নির্যাতিত ব্যক্তি- যারা সাহায্য প্রার্থনা করছে- তাদের রক্ষার জন্যে অগ্রসর না হওয়া এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধের বিরোধিতা করা ইত্যাদি। (ইমাম  যেইনুল আবেদীন, আনিসুল লাইল। )

একই দোয়ায় বলা হয়েছে: হে আল্লাহ আমার ঐ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দাও যা আশাকে বিনষ্ট করে দেয়। এ জাতীয় কিছু পাপ হল:  আল্লাহর অনুগ্রহের ব্যাপারে নিরাশ হওয়া, আল্লাহর ক্ষমাশীলতায় আস্থা না রাখা, আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ওপর ভরসা করা এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে অবিশ্বাস করা। (ইমাম জাফর সাদিক)

একই দোয়ায় বলা হয়েছে: হে আল্লাহ আমার কৃত সমস্ত পাপ ও ত্রটি ক্ষমা করে দাও।

অর্থসহ ২১ তম রমজানের দোয়া

اليوم الحادي والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ لى فيهِ اِلى مَرْضاتِكَ دَليلاً، وَلا تَجْعَلْ لِلشَّيْطانِ فيهِ عَلَيَّ سَبيلاً، وَاجْعَلِ الْجَنَّةَ لى مَنْزِلاً وَمَقيلاً، يا قاضِيَ حَوائِجِ الطّالِبينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত কর। শয়তানদের আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দিওনা। জান্নাতকে আমার গন্তব্যে পরিণত কর। হে প্রার্থনাকারীদের অভাব মোচনকারী ।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.