শতবর্ষের ‘সাধনা’

September 27, 2014 10:09 pmComments Off on শতবর্ষের ‘সাধনা’Views: 1020
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
শতবর্ষের ‘সাধনা’
১৯১৪ সালে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় যোগেশচন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। সারা জীবনের সাধনায় যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন, এ বছর তার ১০০ বছর পূর্ণ হলো। ২০০ বছরের উপনিবেশ যুগপর্বে, আর বায়োমেডিসিনের বিশ্বজনীন দাপটে কোণঠাসা আমাদের ভারতীয় আয়ুর্বেদের একটি ক্ষীণস্রোত যোগেশের প্রায় একার চেষ্টায় আজ অবধি জারি আছে। জানাচ্ছেন কাজল রশীদ
সাধনা ঔষধালয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ফটো : ফোজিত শেখ

শেকড়ের ডানা হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বুঝি যোগেশচন্দ্র ঘোষ ও সাধনা ঔষধালয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ প্রযোজ্য। শত বছরের ঐতিহ্যস্নাত এ প্রতিষ্ঠান উপমহাদেশের আধুনিক আয়ুর্বেদ ঔষধালয়ের অন্যতম পথিকৃৎ এক প্রতিষ্ঠান, যা আজ একটি নাম; একটি ইতিহাস! এর শেকড় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়ায় হলেও তা একদা ডানা মেলেছিল চীনসহ ইউরোপ-আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে। ৫ হাজার বছর ধরে যে চিকিৎসাবিধান আজও প্রচলিত রয়েছে, তার নাম আয়ুর্বেদ-যা কখনও কখনও মূল স্রোত থেকে সরে গেলেও তার উপস্থিতি লুপ্ত হয়নি; বরং সমাজের বৃহত্তর এক অংশের কাছে তার আবেদন আজও অটুট এবং অক্ষুণ্ন রয়েছে।

আমাদের এ ভূখন্ডের আধুনিক সময়ের স্টিমরোলারের পেষণে অনেক কিছু হারিয়ে কিংবা আড়ালে পড়ে গেলেও আয়ুর্বেদ তার অস্তিত্ব মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যেতে দেয়নি। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, তার প্রয়োজনীয়তা সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বলে আজও তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি।

উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে আয়ুর্বেদের ইতিহাস ৫ হাজার বছরের পুরনো হলেও এ শাস্ত্রের প্রথম লিখিত বই ‘চরক সংহিতা’। বইটির রচয়িতা চরকের জন্ম ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। সংস্কৃতে লিখিত বইটি অনূদিত হয়েছে ল্যাটিন, আরবি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায়। আজ থেকে হাজার বছর আগে যখন আজকের পাশ্চাত্যে হাসপাতালের ধারণা ছিল না, তখন এখানে আয়ুর্বেদের বেশ কয়েকটি আরোগ্যশালার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়, আয়ুর্বেদ এখানে আমজনতার চিকিৎসা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত ছিল। বেদে এর কথা বহু স্তরে বহুভাবে এসেছে। তারপর হাজার বছরের পথপরিক্রমায় আয়ুর্বেদের জনপ্রিয়তা যখন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল, তখন একে পুনরুজ্জীবন দিয়েছেন পাশ্চাত্য প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রী যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তাঁর জীবন তিনি এ শিল্পের প্রতি উৎসর্গ করেছিলেন। এ শুধু কথার কথা নয়, জীবন দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। তাঁর মৃত্যু যেমন ছিল বেদনাবিধুর, তেমনি দেশপ্রেমের অনন্য এক উজ্জীবক শক্তি। দুস্থ-অসহায় মানুষের সাকল্যাণে নিবেদিত যোগেশ বাবুর জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল ‘সাধনা ঔষধালয়’। নতুন নতুন সৃষ্টির মাঝেই যোগেশ বাবু বেঁচে ছিলেন।

সময়টা তখন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার অনেকেই শহর ছেড়ে পালিয়েছে। পুরো এলাকায় বাড়ি কাম কারখানায় কেবল যোগেশ বাবু রয়ে গেলেন। বিরাট এলাকাজুড়ে সাধনা ঔষধালয় কারখানা। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়; করেছেন গবেষণা। তাঁর একমাত্র সাধনাস্থল এ কারখানা। এখানকার একেকটা ইটে আছে তাঁর মমতার ছোঁয়া! নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিলেন কারখানার শ্রমিকরা। সবাই যখন কাজ সেরে ফিরে যেতেন, তখন কেবল থাকত সুরুজ মিয়া এবং রামপাল। সুরুজ মিয়া এবং রামপাল কারখানার দারোয়ান। তারা দীর্ঘ ১৭ বছর যোগেশ বাবুর সঙ্গে কাটিয়েছেন। ২৫ মার্চের পর সবাই যখন একে একে বাবুকে ফেলে চলে গেলেন, গেলেন না কেবল এ দুজন!

২৫ মার্চের পরের ঘটনা। গভীর রাত। একটি মিলিটারি জিপ এসে থামল। পাঁচ থেকে ছয়জন সশস্ত্র সৈনিক জিপ থেকে নামল। তাদের সবার হাতে ভারি অস্ত্র। একে একে গেটের তালা ভেঙে ফেলল তারা। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ল। পাহারাদার সুরুজ মিয়ার হাতের বন্দুকও গর্জে উঠল। সেনাদের দিকে তাক করে তিনিও গুলি ছোড়া শুরু করলেন। শুরু হলো অসম যুদ্ধ। সামান্য অস্ত্র, সামান্যতম অস্ত্র চালনায় পারদর্শী এক সাধারণ বাঙালি সুরুজ মিয়া পাহারাদারের কাছে হার মানল পাকিস্তানি সৈন্যরা। রাতের অাঁধারে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে গেল। সুুরুজ মিয়া যোগেশ বাবুকে বললেন পালিয়ে যেতে। যোগেশ বাবুর এক কথা, মরতে হয় দেশের মাটিতে মরব। আমার সন্তানসম এসব ছেড়ে আমি কোথায় যাব? পরদিন সকাল। পাকিস্তানি আর্মি আবার ফিরে এলো বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং লোকবল নিয়ে। পাকিস্তানি সেনারা নিচে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করাল।

এরা যোগেশ বাবুকে উপরে নিয়ে যায় এবং বুলেটের গুলিতে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। জানা যায়, পাকিস্তানি আর্মিরা শুধু তাঁকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লুটে নিয়ে গিয়েছিল যোগেশ বাবুর অর্জিত অনেক অর্থ-সম্পদ। সেদিন ছিল ৪ এপ্রিল।

কিছুদিন আগে কলকাতার এক লেখক সাধনা ঔষধালয় সম্পর্কিত এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন কিছু কিছু দেখা গেলেও প্রতিষ্ঠানটির সেই রমরমা অবস্থা আর নেই। যোগেশচন্দ্র এক সময় জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির ফেলো এবং আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির এ সদস্য পরে আয়ুর্বেদে আগ্রহী হন। বিখ্যাত টুথপাউডার ‘সাধনা দশন’ থেকে শুরু করে ‘শ্রী গোপাল তেল’ এদেরই সৃষ্টি। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা যোগেশচন্দ্র ঘোষ ৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রাণ হারান।

সর্বজনস্বীকৃত সত্য হলো, অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ এ দেশের আয়ুর্বেদশাস্ত্রের এক কিংবদন্তিতুল্য নাম। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সাধনা ঔষধালয়’ এর মাধ্যমে এ সুনাম অর্জন করেন। পৃথিবীতে যত দিন আয়ুর্বেদশাস্ত্র থাকবে, তত দিন এ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্রের নাম। দুঃখের বিষয় এ প্রজন্ম তো বটেই, এদেশের শিক্ষিতজনদের অনেকেই তাঁর সম্পর্কে কোনোকিছু জানে না। তার চেয়েও দুর্ভাগ্য, তাঁর রক্ত ও ঘামে গড়া প্রতিষ্ঠান সাধনা ঔষধালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কিছু জানেন না। এ লেখা তৈরির সময় তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেও এ ব্যাপারে কিছু জানা সম্ভব হয়নি। যতটুকু জানা সম্ভব হয়েছে, তা শুধু ইন্টারনেটের কল্যাণে। একাধিক ওয়েবসাইট, ব্লগ এবং ব্যক্তিপর্যায়ের লেখালেখি থেকে।

জানা যায়, অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষের জন্ম ১৮৮৭ সালে শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে। তাঁর বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রামের বাড়িতেই তাঁর ছেলেবেলা কাটে। গ্রামের এক স্কুলেই তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ও মেধা দেখে পূর্ণচন্দ্র ঘোষ তাঁকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। তখন পুরান ঢাকাই ছিল মূল শহর। সেখানে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা জুবিলি স্কুলে তিনি ভর্তি হন। ১৯০২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে যোগেশচন্দ্র ঘোষ প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। তারপর ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকান্ডের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তাঁর বন্ধুদের অনেকেই তখন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি সরাসরি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে স্বদেশ চিন্তা যে তাঁর ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না- যার প্রমাণ বিদেশি ওষুধের চেয়ে তিনি দেশীয় গাছগাছড়ার মাধ্যমে চিকিৎসাকে গুরুত্ব দিতেন। যোগেশচন্দ্র ঘোষ ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন; তারপর চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে গিয়ে কুচবিহার কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এমএ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পান প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে রায়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই তাঁকে দেশজ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যাপক উৎসাহিত করেন। বলা যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই তাঁকে স্বদেশ প্রেমের বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া হাতে-নাতে শিখিয়ে দেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পর তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ড চলে যান। সেখান থেকে এফসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি আমেরিকায় যান এবং সেখান থেকে এমসিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি-বাকরি নিয়ে আমেরিকায় বেশ স্বচ্ছন্দেই জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা না করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯০৮ সালে দেশে ফিরেই যোগেশচন্দ্র ঘোষ যোগ দেন ভাগলপুর কলেজে। সেখানে একটানা চার বছর রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে গৌরবের সঙ্গে কাজ করেন। পরে চলে আসেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। ১৯১২ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর তিনি জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন কয়েক বছর অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তাঁর চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজকেও একই গতিতে এগিয়ে নিয়ে যান। অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ কিশোর বয়স থেকেই দ্রব্যগুণ সম্পর্কে যে উৎসাহ লাভ করেছিলেন, যৌবনে শিক্ষাগুরু বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি এ বিষয়ের ওপরই গবেষণা শুরু করেন। যোগেশ বাবুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান দেখে প্রফুল্লচন্দ্র রায় লিখেছিলেন, ‘প্রফেসার শ্রীযোগশচন্দ্র ঘোষ, আয়ুবর্ে্বদশাস্ত্রী, এম-এ, এফ-সি-এস (লন্ডন), এম-সি-এস (আমেরিকা) কর্তৃক পরিচালিত সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা পরিদর্শন করিয়া বড়ই প্রীতি লাভ করিলাম। এখানে বহুল পরিমাণে ঔষধাদি প্রস্তুত হইয়া থাকে এবং প্রফেসার ঘোষ স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া কারখানা তত্ত্বাবধান ও ঔষধাদি প্রস্তুত করিয়া থাকেন। ঔষধগুলি যাহাতে বিশুদ্ধ ও অকৃত্রিম হয় তৎপ্রতি অধ্যক্ষের বিশেষ দৃষ্টি আছে। এই কারখানার ঔষধ বিশুদ্ধভাবে প্রস্তুত করা হয় বলিয়াই এখানকার ঔষধগুলি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য দেশসমূহে খুব কাটতি হইতেছে-ইহাই আমার বিশ্বাস ও ধারণা। প্রফেসার ঘোষ আমার একজন প্রাক্তন ছাত্র। আয়ুবর্ে্বদে তাহার এই অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়া বড়ই আনন্দ লাভ করিলাম।’

মানুষকে রোগ থেকে স্বল্প মূল্যে মুক্তি দিতে যোগেশচন্দ্র ঘোষ দেশীয় গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি ১৯১৪ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গেন্ডারিয়ায় ৭১ দীননাথ সেন রোডে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। অনেকের ধারণা, তিনি নিজের স্ত্রীর নামে এ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করেছিলেন, কিন্তু তা নয়। তিনি নিজের স্বপ্ন-সাধনা থেকে প্রতিষ্ঠানের এরূপ নামকরণ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এটি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও সুনাম অর্জন করে; দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর গবেষণা, অদম্য সাধনা ও কর্মোদ্যমের ফলে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদীয় ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালি আধুনিক মানে উন্নীত হয়।

ডা. অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ নিজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশজ মানুষের সংযোগের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত কল্যাণের ঊর্ধ্বে উঠিয়া দেশের বৃহত্তম কল্যাণ কামনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করিলে সেই প্রতিষ্ঠান দেশেরও প্রিয় হয়। সিংহ যখন জাগে, তখন তাহার স্বপ্ন, তন্দ্রা এবং নিদ্রা যায় না, তাহার সিংহত্ব জাগে। জাতি যখন জাগে, তখন সকল দিক দিয়াই জাগে। একার চেষ্টাতে জাগে না, সকলের চেষ্টাতেই জাগে। সর্বপ্রকার পরিপুষ্টি লইয়া দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হউক, এই কামনা প্রতিদিনের কামনা। সুতরাং জনসাধারণ সাধনা ঔষধালয়কে তাঁহাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলিয়া গণ্য করিবেন না কেন?’

যত দূর শোনা যায়, অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ জগন্নাথ কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর আয়ুর্বেদ ওষুধের উৎকর্ষ সাধন ও আয়ুর্বেদ ওষুধকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলতে নিজস্ব গবেষণাগারেই তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। শুধু রোগী দেখা ছাড়া খুব একটা জনসমক্ষে আসতেন না। এ সময় তিনি রোগব্যাধির কারণ ও লক্ষণ, আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, আয়ুর্বেদ ওষুধের ব্যবহার পদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘অগি্নমন্দা ও কোষ্ঠবদ্ধতা’, ‘আরোগ্যের পথ’, ‘গৃহ চিকিৎসা, চর্ম ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি’, ‘চক্ষু কর্ণ নাসিকা ও মুখ রোগ চিকিৎসা’, ‘আয়ুর্বেদ ইতিহাস’, ‘টেঙ্ট বুক অব এনঅরগানিক কেমিস্ট্রি’, ‘সিম্পল জিওগ্রাফ’, ‘সিম্পল এরিথমেটিক’ ইত্যাদি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে এদেশের বহু হিন্দু পরিবার ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ফেলে দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যায়; কিন্তু যোগেশ চন্দ্র ঘোষ তা করেননি। তিনি দেশের মায়ায় বাঁধা পড়ে এখানেই থেকে যান। বার বার তাঁর জীবনে নানা দুঃসময় এসেছে, তবু কেউ তাঁকে নিজ দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। তিনি ভালোবাসতেন এদেশকে আর এদেশের মানুষকে। ১৯৬৪ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার শহর হিসেবে ঢাকার কুখ্যাতি ছড়িয়েছে, তখনও নির্দ্বিধায় সব সঙ্কট মোকাবিলা করেছেন তিনি। সে সময়ের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আসিফ সিরাজ বলেন, ‘সেই দুর্যোগকালে আমরা তাঁর কাছে ছুটে যাই তাঁর সাহায্যের আশায়। তিনি আমাদের বিমুখ করেননি। তাঁর সাধনা ঔষধালয়ের বিরাট লৌহকপাট খুলে দেন। গেন্ডারিয়া, দনিয়া ও শনিরআখড়ার ভীতসন্ত্রস্ত হিন্দু পরিবার তাঁর কারখানায় নিশ্চিন্তে আশ্রয় পায়, বেঁচে যায়। দারোয়ানরা বন্দুক হাতে পাহাড়া দিতেন, আর আমরা ছেলেরা রাস্তায় লাঠি-হকিস্টিক নিয়ে এবং কারখানার ভেতরে হামলা হলে তিনি দারোয়ানদের গুলি চালানোর হুকুম দেয়ায় রায়টকারীরা হামলা করার সাহস পায়নি। এখন ভাবি, কারখানার নিরাপত্তা, লুটপাটের কথা ভেবে তিনি তো আমাদের ফিরিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, আর এখানেই তাঁর মহানুভবতা, মানবতাবোধ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। এমন মানুষকেও মরে যেতে হয় হায়েনাদের হাতে। …গেন্ডারিয়ার এমন কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন নেই, যারা তাঁর কাছ থেকে কমবেশি আর্থিক সহযোগিতা পায়নি।’ অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি ছিলেন সদালাপী। মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত সহজেই মিশতে পারতেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ পরিবারের সদস্যের মতোই আপন করে নিতেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। শেষে খুব বেশি একটা বাইরে বেরোতেন না; শুধু নিজের পড়াশোনা আর গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন; সকাল-বিকাল ঘরের সামনের খোলা ছাদে পায়চারি করতেন। প্রতিদিন ঘণ্টাখানেকের জন্য নিচে নেমে আসতেন; রোগী দেখতেন; ব্যবস্থাপত্র দিতেন। এছাড়া অফিস ও কারখানার কাজকর্ম তদারকি করতেন এবং ‘সাধনার বাঁদর’ বলে খ্যাত কুঠুরি মৃগয়াদের খাদ্য খাওয়াতেন। এ ছিল তাঁর দৈনিক রুটিন।

এক নজরে সাধনা ঔষধালয়

সাধনা ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীযোগেশচন্দ্র ঘোষ আয়ুর্বেদশাস্ত্রী হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। যদিও তাঁর পেশাগত জীবনের পুরোটা সময় গেছে রসায়নশাস্ত্রের শিক্ষকতায়। তিনি এমএ, এফসিএস (লন্ডন), এমসিএস (আমেরিকা), ভাগলপুর কলেজের রসায়নশাস্ত্রের ভূতপূর্ব অধ্যাপক এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রসায়নবিজ্ঞানে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানচর্চা এবং নানা প্রকার রাসায়নিক গবেষণাই তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত ছিল। পাশ্চাত্য রসায়নবিজ্ঞানের এরূপ গবেষণা ও নানারূপ বিশ্লেষণ কাজে (Analysis)  যখন তিনি গবেষণাগারে (Laboratory) মগ্ন ছিলেন, সে সময় প্রাচ্য আয়ুর্বেদের প্রতি হঠাৎ তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তিনি এর বিজ্ঞানসম্মত, সুমীমাংসিত এবং সুসমাপ্ত চিকিৎসাপদ্ধতি, সর্বোপরি এর অপূর্ব রসায়নশক্তি-সমুৎপাদক, বিস্ময়কর ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালিতত্ত্ব বিশেষরূপে আলোচনা করে এ প্রাচ্য বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি বহু ওষুধের রাসায়নিক বিশ্লেষণ (Analysis) করে দেখেন এবং এর আশ্চর্য শক্তিসমন্বয় ও বিস্ময়কর ক্রিয়া দর্শনে বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হন। তিনি দেখেন, আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার সাফল্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে এর শক্তিশালী ওষুধের ওপর। বিশুদ্ধ উপাদানগুলো শাস্ত্রনির্দিষ্ট মাত্রা ও নিয়ম-প্রণালিতে মিশ্রিত এবং ওষুধ প্রস্তুতপদ্ধতি ত্রুটিবিহীন ও নির্দোষ হলে এর প্রত্যেকটি ওষুধ এক-একটি তাড়িত যন্ত্রের (Electric Dynamo) মতোই শক্তির আধার হয়ে ওঠে। এজন্য চাই শুধু অনাহত নিয়মানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ এবং নিষ্ঠা ও সতর্কতা।

যখন যোগেশচন্দ্র ঘোষ বুঝতে পারলেন, কতকগুলো অর্ধশিক্ষিত, দায়িত্বজ্ঞানহীন, লোভী ব্যক্তির হাতে পড়ে সতর্কতা, নিষ্ঠা ও সততার অভাবে পৃথিবীর এ শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞান ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে এবং যত্নপূর্বক চেষ্টা করলে এর সংস্কার সাধনের দ্বারা দেশের একটি পরম কল্যাণকর গৌরবকে রক্ষা করা সম্ভব, তখন তিনি তার আজীবনলব্ধ জ্ঞান ও প্রতিভা নিয়ে কয়েকজন সুযোগ্য কর্মীসহ যে সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন, তা-ই হলো শতবর্ষের আলোয় উদ্ভাসিত এ সাধনা ঔষধালয় নামে সুপরিচিত বিরাট প্রতিষ্ঠান।

যাদের পদধূলিতে ধন্য সাধনা

সাধনা ঔষধালয় পরিদর্শন করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা, যাদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের অভিমত এখানে ছাপা হলো। তাঁরা যোগেশবাবুর প্রতিষ্ঠান দেখে যে প্রীত ও মুগ্ধ হয়েছেন, তা উঠে এসেছে তাদের অনুভূতিতে। এখানে কয়েকজনের অভিমত ভাষারীতি ও বানান অপরিবর্তিত রাখা হলো।

সাধনা ঔষধালয় সম্পর্কে বিশিষ্টদের অভিমত

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু : ‘আমি ঢাকার সাধনা ঔধালয় পরিদর্শন করিয়াছি এবং তাহাদের ঔষধ সুসংরক্ষণ, প্রস্তুত-প্রণালী ও সৌষ্ঠবষুক্ত কার্য্যসম্পাদন-ব্যবস্থা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর শাস্ত্রীয়তা ও অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হইয়াছি। অধ্যক্ষ মহাশয়ের জনহিতৈষণার মনোভাবও বিশেষ প্রশংসার যোগ্য। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ম্মপ্রচেষ্টাকে সমর্থন করিলে আয়ুরবেদকেই সমর্থন করা হইবে। সত্যসত্যই আয়ুবেদানুষারী বলিয়া সাধনার প্রস্তুত ঔষধাবলীর ব্যবহারের দ্বারা যে কেবল রোগ-আরোগ্যের পক্ষে বাঞ্ছিত লাভই হইবে, তাহা নয়, পরন্তু ঔষধগুলির এই প্রকার ফলপ্রসূশক্তি আয়ুরবেদীয় চিকিৎসকগণের জনপ্রিয়তাকেও বহুল পরিমাণে বর্দ্ধিত করিবে। ঢাকার এই সর্ব্বপ্রধান ঔষধালয়ের কর্তৃপক্ষ যেরূপ নিষ্ঠা ও সফলতার সহিত আয়ুবর্ে্বদের সেবা করিতেছেন, তাহাতে আমি তাহাদিগকে অভিনন্দিত না করিয়া পারিলাম না।’

ডাক্তার মঙ্গ বি, টুন, এল-আর সি-পি অ্যান্ড এস্‌ (এডিনবরা) : ‘গস্র্মী রোগাক্রান্ত আমার দুইটি রোগীকে আপনার ‘সারিবাদি সালসা’ ব্যবহার করাইয়া এক মাসের মধ্যে আমি তাহাদিগকে আরোগ্য করিয়াছি।

আপনার ঔষধগুলি আশ্চর্য্য সুফলপ্রসদ।’

ডাক্তার এজে উইটাঞ্জ, (কলম্বো, সিলোন) : ‘বড়োই আনন্দের সহিত আপনাকে জানাইতেছি যে আপনার প্রস্তুত মকরধ্বজ আমার অনেক রোগীকে সেবন করাইয়া আশ্চর্য্য সুফল প্রাপ্ত হইয়াছি।’

অজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : ‘কিছুদিন হইতে আপনাকে পত্র লিখিব লিখিব মনে করিতেছিলাম। কারণ-আপনার সর্বজ্বর বটী খাইয়া আমার জ্বর সারিয়াছে, এই কথাটা ইচ্ছা ছিল আপনাকে কৃতজ্ঞতার সহিত নিবেদন করিব। আমি মুখ মুখেও বহু পরিচিত ব্যক্তিকে ইহার উল্লেখ করিয়াছি।’

সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, মডার্ণ রিভিয়ূ ও প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক : ‘সাধনা ঔষধালয়ের সমুদয় বিভাগের বহু বিস্তৃত কার্য্য দেখিয়া প্রীত হইলাম। এখানে আয়ুর্বেদবিহিত প্রণালী অনুসারে সমুদয় ঔষধ বিশুদ্ধ উপাদানসমূহ হইতে প্রস্তুত হয়। ইহা সন্তোষের বিষয় যে, এই সকল ঔষধ শুধু ভারতবর্ষে নহে, ভারতের বাহিরেও সমাদৃত হয়।’

আনন্দ বাজার পত্রিকা : ‘সাধনা ঔষধালয়ের অধ্যক্ষ মহাশয় নিজে বিশেষভাবে সমগ্র প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধান করেন। তিনি যত্ন সহকারে পরীক্ষা করিয়া না দেখিবার পূর্বে সাধনা ঔষধালয়ের কোন ঔষধ বাজারে বাহির করা হয় না। কাজেই সাধনা ঔষধালয়ের ঔষধের বিশুদ্ধতা ও কার্যকারিতা গ্যারান্টি প্রদত্ত।’

আব্দুল হামিদ খান ভাসানী : ‘লুপ্তপ্রায় আয়ুবর্ে্বদের পুনরুজ্জীবনের জন্য অধ্যাপক শ্রীযোগেশচন্দ্র ঘোষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কাহিনী আমি অনেক দিনই শুনিয়াছি। তাহার সাধনা ঔষধালয়ের নামও আমার নিকট বিশেষ পরিচিত। আয়ুরবেদীয় চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের দেশের নিজস্ব সম্পদ। এই কারণেই আয়ুবর্ে্বদ সম্বন্ধে চিরকালই আমার একটা গর্ব্ব এবং মমত্ববোধ আছে। বিভিন্ন ঔষধ প্রস্তুতরত সাধনা ঔষধালয়ের কারখানাটি পরিদর্শন করিয়া আজ আমি বিশেষ আনন্দ লাভ করিয়াছি।

আমাদের দেশের শতকরা নব্বই জন লোকই হইল দরিদ্র। অধিক মূল্যের বিদেশী ঔষধ ক্রয় করিয়া রোগের চিকিৎসা করা তাহাদের পক্ষে একান্তই অসাধ্য ব্যাপার। সুলভ মূল্যের আয়ুরবেদীয় ঔষধাদির প্রয়োজন এ দেশে অবশ্য স্বীকার্য্য। সাধনার ঔষধাদি সবেনে বহুলোক উপকৃত হইতেছেন। তাই সাধনা ঔষধালয়ের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হউক, ইহাই আমি আন্তরিকভাবে কামনা করি।’

তথ্যঋণ

১. উইকিপিডিয়া  ২. বাংলাপিডিয়া ৩. গুণীজন ওয়েবসাইট ৪. বিভিন্ন ব্লগ ৫. সাধনা ঔষধালয় লিমিটেড

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.