সংলাপের আগেই আইনের খসড়া

August 27, 2017 8:34 pmComments Off on সংলাপের আগেই আইনের খসড়াViews: 2
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

সংলাপের আগেই আইনের খসড়া

রিয়াদুল করিম

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার আগেই সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তা আইনি মতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনি সংস্কার নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ করছে ইসি। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় এখনো ঠিক হয়নি। কেবল সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট নামে একটি দলের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। এর মধ্যেই কমিশন নিজেদের মতো করে আইন সংস্কারের খসড়া তৈরি করছে।

নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বড় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হলে ইসির সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এতে মনে হবে একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে অংশীজনদের সঙ্গে ইসির চলমান সংলাপ লোক দেখানো। তাঁরা বলছেন, একটি হতে পারে ইসি একটি খসড়া দলগুলোকে দিয়ে নিজেদের চিন্তা জানাবে। এর ভিত্তিতে দলগুলো মত দেবে। অথবা দলগুলোর মতামতের পর ইসি খসড়া তৈরি করবে। কিন্তু ইসি কোনোটাই করছে না। তারা তাদের মতো করে এগোচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনার পর আইনের খসড়া করলে ভালো হতো। আর সংসদীয় সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে কীভাবে জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো হবে, তা স্পষ্ট নয়।

ইসি সূত্র জানায়, সংসদীয় আসনের ভোটার সংখ্যা, জনসংখ্যা, মোট আয়তন ও প্রশাসনিক অখণ্ডতার সমন্বয়ের মাধ্যমে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিধান রেখে একটি আইনের খসড়া করেছে ইসি। ‘দ্য ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ রহিত করে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০১৭’ করার লক্ষ্যে এই খসড়া করা হচ্ছে। এই আইন একাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর করতে চায় ইসি। গতকাল রোববার কমিশনের সভায় এই খসড়া উপস্থাপন করা হয়।

সভা শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, খসড়াটির ওপর সব নির্বাচন কমিশনারের এবং একজন আইন বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে সংসদে পাস করাতে আইনি মতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য তাঁদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ও আইনি সংস্কার-সংক্রান্ত কমিটির প্রধান কবিতা খানম প্রথম আলোকে বলেন, সংলাপের পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। কমিশনের সভায় সবাইকে খসড়া দেওয়া হয়েছে। তাঁরা মতামত দেবেন। এরপর কমিশন খসড়া অনুমোদন করবে। তাঁর দাবি, আইন মন্ত্রণালয়ে খসড়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

নির্বাচন কমিশন গত ১৬ জুলাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে। সেখানে আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণসহ সাতটি বিষয় রাখা হয়। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অংশে বলা হয়, কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নির্বাচনের মূল অংশীজন ও উপকারভোগী সংগঠন—রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সামনে উপস্থাপন করে সবার মতামতের আলোকে কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ইসির কর্মপরিকল্পনার ‘নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ’ অংশে বলা হয়েছে, নির্বাচন-সংক্রান্ত যেকোনো আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়া প্রণয়নে এবং তা সংস্কারের প্রয়োজনে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ থাকা বাঞ্ছনীয়। তাঁদের মতামতের আলোকে এগুলো প্রণীত হলে আইন ও প্রক্রিয়ার প্রয়োগ নিশ্চিত করা সহজ হবে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সবার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে একটি যুগোপযোগী আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কমিশন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, পর্যবেক্ষক সংস্থা, নারী নেত্রী, নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল ইসি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের রোডম্যাপের অংশ হিসেবে সংলাপ করছে। যেহেতু তারা সংলাপ করছে, তাই সবার মতামতের ভিত্তিতে, অন্তত বড় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইনের খসড়া চূড়ান্ত করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা করেন, নির্বাচন কমিশন সেই অপেক্ষা করবে, যাতে সংলাপ লোক দেখানো মনে না হয়। সংলাপের মতামত বিবেচনায় নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি শুরু থেকেই বর্তমান ইসির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ইসির সংলাপ একটি ‘আইওয়াশ’। তারা এই সংলাপকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বিএনপি মনে করে না। তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিয়োগ পেয়েছে। কমিশনাররা সরকারি চাকরি হিসেবে কাজটিকে নিয়েছেন। এ কারণে তাঁরা সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন থেকে শুরু করে যা যা করছেন, সবই সরকারের সমর্থনে করছেন। বিরোধী দলের কোনো দাবি ইসি গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না।

 

সেনা ও ‘না’ ভোট বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব

সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও ‘না’ ভোট প্রবর্তনের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। এর আগে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই সেনাবাহিনীকে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছিলেন। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলেরও দাবি এটি। আওয়ামী লীগ এর বিপক্ষে। এ দুটি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের মনোভাব নেতিবাচক বলে কমিশনের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। এ নিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) কোনো সংশোধনী আনার চিন্তা তারা করছে না।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বলেছিলেন, কারও চাওয়া না-চাওয়া নয়, পরিস্থিতি বিবেচনায় সেনা মোতায়েনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

এরপর ২২ আগস্ট গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যদি সেনাবাহিনী মোতায়েন জরুরি মনে করে এবং নির্বাচন কমিশন যদি দেখে সেনা মোতায়েন করা ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব নয়, তখন সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘না’ ভোট প্রবর্তন ইসির বিষয় নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম প্রথম আলোকে বলেন, সবার সঙ্গে সংলাপের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তা ছাড়া সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সবাই সেনা মোতায়েন বা ‘না’ ভোটের পক্ষে বলেছেন, তা নয়। অনেকে বিপক্ষেও বলেছেন।

সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সুপারিশের বিষয়ে ইসির মনোভাব নেতিবাচক হলেও সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট নামের অপরিচিত একটি দলের প্রস্তাব আমলে নিচ্ছে ইসি। ২০১৩ সালে ইসিতে নিবন্ধিত এই দলটির কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। ইসির ওয়েবসাইটে দলটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে পূর্ব তেজতুরী বাজার। ‘সংগঠন-প্রধান’ ও ‘দল পরিচালনা বোর্ড প্রধান’ হিসেবে যে দুজনের নাম দেওয়া আছে, তাঁরাও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত কেউ নন। এঁদের মধে্য দলের ‘সংগঠন-প্রধান’ ও প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক আবু লায়েস মুন্না। ২৪ আগস্ট এই দলটি সংলাপে অংশ নিয়ে একটি জাতীয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ে এই পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিইসি। এ ছাড়া নিবন্ধিত সব দলের দলীয় প্রধান পরিষদের সদস্য হবেন। রাষ্ট্রপতি পরিষদের অনুমোদন দেবেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি হিসেবেও কাজ করবে এই পরিষদ।

গতকাল কমিশনের বৈঠক শেষে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট জাতীয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কমিশনের সভায় প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ইসি বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করছে। এটি কীভাবে করা যায়, সে জন্য আইনগত দিক খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

সূত্র: প্রথম আলো

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.