সংস্কৃতি চর্চার সামাজিক রাজনৈতিক দায় পূরণ: আহমদ রফিক

August 13, 2013 1:55 pmComments Off on সংস্কৃতি চর্চার সামাজিক রাজনৈতিক দায় পূরণ: আহমদ রফিকViews: 28
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

সংস্কৃতি চর্চার সামাজিক রাজনৈতিক দায় পূরণ

আহমদ রফিক

আহমদ রফিক

আহমদ রফিক

বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লিখতে বা বলতে গেলে সংগত কারণে বিভাগপূর্ব সময়ের সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রসঙ্গে লক্ষ করার বিষয় এ দেশে সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতিও নানাভাবে জড়িত, তা অবাঞ্ছিত বা বাঞ্ছিত যাই হোক। এ উত্তরাধিকার দেখা যায় বিভাগোত্তর বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকে- ভাষা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট যুক্ত ফ্রন্টের রাজনীতিতে এবং ষাটের দশকের শেষ দিকে সংস্কৃতি চর্চা ও রাজনীতির প্রবল একাত্মতায়। এর ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায় মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) পরবর্তী সংস্কৃতি চর্চায়, শাসকশ্রেণীকে পক্ষে বা বিপক্ষে যা সংশ্লিষ্ট। এমন ঘটনা বিশ্বে সচরাচর হলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট। বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র এ কারণে যে এ দেশে সংস্কৃতি চর্চার প্রবলতা কখনো কখনো রাজনীতিকে সঠিক ঠিকানা দেখিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আলোচনা শুরুর আগে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে সংস্কৃতি বলতে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, নৃত্য, নাটক ইত্যাদির ষোলকলাই বোঝায় না সেই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজজীবনের বৈচিত্র্যময় বহুভঙ্গিম রূপের প্রকাশও বোঝায়। সংস্কৃতির যেমন রয়েছে বিনোদনের নানা দিক তেমনি সামাজিক অঙ্গীকার ও দায় পালনেরও বিশেষ দিক। লেখক-শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর গরিষ্ঠ অংশ তাই সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী। এমন দুই বিপরীত দিক নিয়ে সংস্কৃতি চর্চার পথচলা।

সমাজ ও সংস্কৃতির পারস্পরিকতার কারণে মুক্ত সংস্কৃতির সুস্থ চর্চা সামাজিক অগ্রগতির সহায়ক। ঠিক বিপরীত বিবেচনায় সামাজিক রক্ষণশীলতার কট্টর প্রভাব প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী লেখক ও সংস্কৃতি চর্চার ধারক এসব বাধা অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলেন। গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ভাষায় ‘উজান গাঙ বাইয়া।’ রবীন্দ্রনাথ ‘অচলায়তন’ নাটক বা ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস এবং এমনি অনেক কিছু লিখে কী বিপদেই না পড়েছিলেন নানান জনের তীক্ষ্ণ সমালোচনার মুখে। কিন্তু পিছু হটেননি। তেমনি জেদি উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলাম। কপালে জুটেছিল ‘কাফের’, ‘শয়তান’ ইত্যাদি উপাধি।

সংস্কৃতি ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের কথা মনে রেখে বলা যায়, সহিষ্ণু গণতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিবেশ প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার সহায়ক। আবার স্বৈরাচারী শাসন ও রাজনীতিও প্রতিবাদী সংস্কৃতির তৎপরতা গড়ে তোলে, দেখা দেয় আন্দোলন। পাল্টে দিতে পারে ছকবাঁধা শাসনের ভিত। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় লেখা।

(দুই)
সংস্কৃতির নানামাত্রিক প্রেক্ষাপট বিচারে পেছন ফিরে তাকালে গত শতকের তিরিশের দশকটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, যদিও চল্লিশের দশক অধিকতর গুরুত্ব বহন করে। রাজনৈতিক বিচারে তিরিশের দশক এক কথায় অগ্নিগর্ভ। চট্টগ্রামে বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রাগার দখল ও জালালাবাদ পাহাড়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ (১৯৩০), ইউরোপিয়ান ক্লাবে বিপ্লবী তরুণী প্রীতিলতার হামলা ও তাঁর মৃত্যু, শাসকশ্রেণীর প্রতি অনুরূপ আক্রমণ, দীর্ঘ অনশনে বিপ্লবী যতীন দাসের প্রতিবাদী মৃত্যু (১৯৩১), বক্শাবন্দী শিবিরে প্রতিবাদী সংস্কৃতি চর্চা, হিজলী বন্দী শিবিরে গুলিতে বরিশালের সন্তান তারকেশ্বর সেনগুপ্তের মৃত্যু (১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১) ইত্যাদি ঘটনা দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেষোক্ত তিনটি ঘটনায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী ভূমিকা স্মর্তব্য।

আর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ১৯৩০ সালে নানা বাধার মুখে রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফর এবং সেখানকার শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা ও জনসংস্কৃতির বিকাশ লক্ষ্য করে কবির মুগ্ধতা ও প্রশস্তি বাচন। একই রকম প্রতিক্রিয়া কৃষি ও কৃষক শ্রেণীর অবিশ্বাস্য উন্নতি লক্ষ্য করে। বিষয়টির গুরুত্ব আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রুশ বিপ্লবের প্রভাবের কারণে, বিশেষ করে বঙ্গীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’, রুশ সাহিত্য ও গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস কিংবা রুশি বিপ্লবের অভিনন্দন বার্তা নিয়ে নজরুলের কবিতা (‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’) ইত্যাদির অসাধারণ জনপ্রিয়তা সংস্কৃতি অঙ্গনে হাওয়া বদলের ইঙ্গিত রাখে।

অন্যদিকে ইউরোপে দুই ফ্যাসিবাদী শক্তির (হিটলার, মুসোলিনি) আগ্রাসী হুমকি এবং স্পেনে তাদের অনুসারী ফ্রাংকো বাহিনীর হাতে গৃহযুদ্ধের সূচনার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথসহ বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রতিবাদী ভূমিকা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তেমনি স্মর্তব্য রোঁমা রঁলা অঁরিবার্বুস প্রমুখের উদ্যোগে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরোধী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথসহ প্রগতিবাদী লেখক-শিল্পীদের সমর্থক সম্পর্ক। আর চীনে জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের তীব্র ধিক্কার (তাঁর রচনায় ও বিবৃতিতে) এবং রবীন্দ্রনাথ বনাম নোগুচি বিতর্ক সংস্কৃতির এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী প্রতিফলন।

আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সামনে রেখে বাংলায় সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক তৎপরতার উত্থান বিস্ময়কর ঘটনা। তিরিশের দশকের শেষ পর্বে গঠিত প্রগতি লেখক সংঘে শুধু প্রগতিবাদীরাই নন, জড়ো হন মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক চেতনার সংস্কৃতি ভুবনের মানুষ। উদ্দেশ্য মানবিক বিশ্ব ও গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদী সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। রক্ষা করা প্রতিক্রিয়াশীল যুধ্যবাজ ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের হাত থেকে।

এরপর গঠিত হয় ‘লীগ অ্যাগেনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়র’ এর শাখা। এসব প্রচেষ্টার প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিভাবক-পরামর্শক বয়োবৃদ্ধ, জীর্ণ স্বাস্থ্য মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্ব শান্তি রক্ষায় ইউরোপে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৈরি হয় তার ঢেউ আছড়ে পড়ে বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অবিশ্বাস্য জোয়ারি প্রতিবাদ বহন করে। এর ব্যাপক প্রকাশ বিশ্বযুদ্ধ শুরুর (সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯) প্রতিক্রিয়ায় চল্লিশের দশকে কবিতায়, গানে, নাটকে, ছোটগল্পে, উপন্যাসে এমনকি চিত্রকলায়। গড়ে ওঠে ১৯৪৩-এ প্রবল সক্রিয়তা নিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ), যার সর্বাধিক বিকাশ বাংলায়। চল্লিশের এ দশক পর্ব হয়ে ওঠে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বলিষ্ঠ দশক।
সর্বভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত ও বঙ্গীয় রাজধানী কলকাতাকেন্দ্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক তৎপরতায় শহর ঢাকাও যথাসম্ভব অংশ নেয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, নৃপেন্দ্র গোস্বামী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, তরুণ সোমেন চন্দ প্রমুখ। এঁদের ক্লান্তিহীন শ্রমে গঠিত হয় প্রগতি লেখক সংঘের স্থানীয় শাখা। এঁরা সমানতালে প্রগতিশীল সংস্কৃতির তৎপরতা চালিয়ে গেছেন তাঁদের সৃষ্টিশীলতায় এবং সেই সঙ্গে প্রগতিবাদ সংস্কৃতি ও রাজনীতির অব্যাহত চর্চায়। এঁদের চেষ্টায় প্রকাশিত হয় প্রগতি সাহিত্য সংকলন ক্রান্তি।

হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের (২২ জুন, ১৯৪১) পরিপ্রেক্ষিতে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢাকায়ও গঠিত হয় ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এ সংগঠনের তৎপরতায় সোমেন চন্দের ছিল অসাধারণ ভূমিকা। ঢাকায় ফ্যাসিস্ট-বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে এই মেধাবী তরুণ সংস্কৃতিকর্মী ১৯৪২-এর মার্চে উগ্র ফ্যাসিস্ট সমর্থকদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন।

চল্লিশের দশকের প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চা যদিও নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক তবু এর মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিস্ট-বিরোধী, যুদ্ধবিরোধী, শান্তিবাদী ও উদার মানবিক চেতনার গণতন্ত্রীদের এক মঞ্চে সংঘবদ্ধ করা। এ লক্ষ্যে তারা সাময়িক সাফল্য অর্জন করেন। এ সাফল্য ছিল সাহিত্যে, সংগীতে, বিশেষভাবে গণসংগীতে ও মঞ্চ নাটকের মতো বিভিন্ন ধারায়। এ ধারা ব্যাহত হয় প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবলতার রক্তাক্ত দেশ বিভাগের কারণে।

(তিন)
দেশ বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের চরম স্বৈরাচারী, প্রগতিবিরোধী শাসনের মধ্যেও সীমাবদ্ধ বৃত্তে মূলত চল্লিশি সংস্কৃতি চর্চার প্রভাবে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। সংস্কৃতি সম্মেলন কেন্দ্রিক এ প্রকাশ অংশত ঢাকায় (১৯৪৭-৪৮) এবং চট্টগ্রামে (১৯৫১), কুমিল্লায় (১৯৫২), আবার পূর্ণাঙ্গজনে ঢাকায় (১৯৫৪) এবং আন্তর্জাতিক চরিত্র নিয়ে কাগমারিতে (১৯৫৭)। এগুলো আমাদের সংস্কৃতি চর্চার অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিবাদী চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছে, বিশেষ করে শেষ চারটিতে। কাগমারি সম্মেলনে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার প্রকাশ ছিল সর্বাধিক।

পঞ্চাশের দশকে উল্লিখিত সংস্কৃতি চর্চার নেপথ্যে ছিল সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে রচিত কবিতা, গণসংগীত, সমন্বয়বাদী লোকসংগীত, সমাজ সচেতন মঞ্চ নাটক, তেভাগা ও কবিগান ছিল সমন্বয়বাদী চেতনার মননশীল প্রবন্ধ। সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের যথাক্রমে স্বদেশি ও প্রতিবাদী গান ও গজল। লক্ষ্য যতটা অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের, ততোধিক প্রগতি-চেতনার বিকাশ ঘটানো। এক সময়কার কৃষক আন্দোলনখ্যাত অঞ্চলের কৃষক-তাঁতি-কারিগর এবং অনুরূপ কলকারখানার শ্রমিকদের মনে প্রেরণা জুগিয়েছে গণসংগীত।

আর ১৯৪৮ হয়ে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ও তার উত্তর প্রভাব উল্লিখিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ জোরদার করতে সাহায্য করেছে, রাজনীতিতে রেখেছে গণতান্ত্রিক সুপ্রভাব। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট তার প্রমাণ। পঞ্চাশের দশকে আমাদের সংস্কৃতি চর্চায় জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিবাদী চেতনার দ্বিমাত্রিক প্রকাশ ঘটলেও প্রগতিশীলতার প্রভাব ছিল অধিকতর।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসনের স্বৈরাচারী, আধা সামরিক ও সামরিক প্রভাব এবং বাম রাজনীতির সীমিত শক্তির কারণে উল্লিখিত প্রগতি সংস্কৃতি সমাজে ব্যাপক দাগ কাটতে পারেনি। সংস্কৃতি চর্চা সীমাবদ্ধ বৃত্তে আবদ্ধ থেকেছে, প্রধানত প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় এবং অংশত শহরে-বন্দরে। ভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে জাতীয়বাদী চেতনা প্রচ্ছন্ন থাকলেও পঞ্চাশের দশকে তা নিজস্ব, স্বতন্ত্র রূপ নিয়ে সুসংহত হতে পারেনি। পেরেছে ষাটের দশকের শেষ দিকে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অর্বাচীন আচরণে, বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও বাঙালির জাতীয়তা বোধের ওপর অন্যায় আক্রমণের কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনার দ্রুত বিকাশ। তবে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক বৈষম্য সাংস্কৃতিক ভুবন পেরিয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তার স্বাতন্ত্র্য বোধের দ্রুত ও ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দ্রুত পায় এগিয়ে যায়। গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়ায় পাক-শাসকদের রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র সংগীতের ওপর আক্রমণ, খণ্ডিত নজরুলকে নিয়ে প্রচার, বাংলা নববর্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানাদির বিরোধিতা, সর্বোপরি বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্বকে বিজাতীয় বিবেচনা করা ইত্যাদি ঘটনা, যা বাঙালি জাতীয়তার চেতনাকে পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভুবনে প্রধান বিষয় করে তোলে। বাম মতাদর্শের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে পিছু হটতে হয়। সংস্কৃতি চর্চায় প্রগতি চেতনাকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে হয়। রাজনীতিতে ক্ষেত্র বিভাজন থেকেই যায়।

এ ঘটনাগুলো বড় দ্রুত ঘটে। বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি (১৯৬৬) থেকে বছর তিনেকের মধ্যেই পরিস্থিতি তুঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ছাত্র ও তরুণদের ভূমিকা সর্বাধিক। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণজাগরণে বামপন্থী তারুণ্যের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও এর ফলাফল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে যায়। তবে এ সময় বাঙালিয়ানার যে প্রবল জোয়ার দেখা যায় (সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ভুবনে) তা ছিল প্রধানত ওপরতলীয় (সুপার ফিসিয়াল), সমাজ গভীরে তা ব্যাপকভাবে দাগ কাটার সুযোগ পায়নি। সে চেষ্টাও দেখা যায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাদি থেকে তা স্পষ্ট।

তবে যত সাময়িক বা ওপরতলীয় হোক এর ফলাফল সত্তরের নির্বাচন ও পাক-শাসকদের আরোপিত যুদ্ধের কারণে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ। সেখানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একাধিপত্য। মধ্য ষাটের দশক থেকে বিভক্ত বাম রাজনীতি স্বাধীনতা-উত্তরকালে আরো বিভক্ত হয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তেমন বিবেচ্য নয়। তবে বাম মতাদর্শের সংস্কৃতি চর্চা মূলত নাটকে (মঞ্চ-নাটক, পথনাটক ইত্যাদিতে) ও অংশত সংগীতে ও নান্দনিক তৎপরতায় কিছুটা হলেও সাংস্কৃতিক ভুবনের জমি দখলে রাখতে পেরেছে। তবে তা একাধিক সংগঠনে বিভক্ত বিধায় (মতভেদগত কারণে) সামাজিক শক্তি হিসেবে ততটা পরিস্ফুট নয়। বিপ্লব বা সমাজ পরিবর্তনের আদর্শ প্রচার করা সত্ত্বেও সমাজে তাদের প্রভাব ব্যাপক নয়। এর কারণ শুধুই কি দূষিত রাজনীতি?

বিষয়টি মনোযোগী আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের যোগ্য। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য শুনতে পাই- ‘স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতি সংস্কৃতির চর্চাও মূলত রাজধানীভিত্তিক এবং তা শ্রেণী-বিশেষের গণ্ডিতে আবদ্ধ। ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবর বা বেঙ্গল গ্যালারি থেকে অনুরূপ উচ্চবর্গীয় অভিজাত এলাকায় সংস্কৃতি চর্চার অবস্থান। অবশ্য ব্যতিক্রমীরা সংখ্যায় অল্প ও যথেষ্ট শক্তিমান নয়। এর একটি কারণ যদিও সমাজে বিত্তবানদের ও বিত্তবান সংস্কৃতির আধিপত্য, সেই সঙ্গে সহযোগী রাজনীতির প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা তবু অন্য কারণও আছে কি না তা বিবেচনার যোগ্য।

প্রগতিশীল সংস্কৃতির চর্চা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভুবনে কেন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখতে পারছে না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ খুবই জরুরি। প্রগতি সংস্কৃতি চর্চার একাংশ তো যতদূর জানি রাজধানীর বাইরে সক্রিয়, তবু তা ব্যাপক জনচেতনার অংশ হয়ে উঠতে পারছে না। সেটা কি বর্তমান রাজনীতির অবদান? সে অবস্থায় মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ সঠিক বাম রাজনীতির বিকাশ কি প্রগতিবাদী সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য। সে পরস্পর-নির্ভরতা ছাড়া প্রগতিবাদী সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপক বিকাশ, জনচেতনায় প্রভাব বিস্তার কঠিন এমন ধারণা কি সঠিক?

(চার)
তবে এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী সংস্কৃতি চর্চা এখন নানা দিক থেকে সমস্যার সম্মুখীন, সে সমস্যা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাস্তব ঘটনা। সমাজবাদী ধারণার কবি, লেখক, শিল্পী, নাট্যকার ও তাঁদের সংশ্লিষ্টজনে সংখ্যায় খুব একটা কম নন। তবু কেন সমস্যা। সেটা কি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব? আমার তা মনে হয় না। শক্তিমান শাসক ও রক্ষণশীল সামাজিক শ্রেণীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিরিশের শেষ দিক থেকে চল্লিশের দশকে প্রগতি লেখক সংঘ, গণনাট্য সংঘ তাদের নানাবিধ তৎপরতায় সংস্কৃতির ভুবনে ঝড় তুলেছিল এ সত্য তো অস্বীকার করার নয়। অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক শক্তির প্রবলতায় সে প্রভাব তাৎক্ষণিক রাজনীতিগত সুফল দেখাতে পারেনি। তবু তাদের ঘোষণার কিছু এখনো বিবেচনাযোগ্য।

যেমন- বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় ঘোষণার পাশাপাশি তাদের বক্তব্য : ‘আমরা চাই জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সর্বাধিক বলার নিবিড় সংযোগ, আমরা চাই যে সাহিত্য প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলুক। নানা মূর্তিতে যে প্রগতিদ্রোহ আজ মাথা তুলেছে তাকে আমরা সহ্য করব না। যা কিছু আমাদের যুক্তিহীনতার দিকে টানে তাকে আমরা প্রগতিবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের সমাজব্যবস্থাকে যুক্তিসংগতভাবে পরীক্ষা করে আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু সমাজের রূপান্তরক্ষম করে তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করব।’

এ বক্তব্যের সঙ্গে কাল প্রয়োজনে কিছু বক্তব্য হয়তো যুক্ত হতে পারে? স্বদেশ-বিদেশ পরিস্থিতি বিচারে। তবে তাদের একটি বক্তব্য বর্তমান সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক মনে হয়। যেমন : ‘উন্মত্ত প্রতিক্রিয়া (প্রতিক্রিয়াশীলতা অর্থে) ও জঙ্গিবাদ সভ্যতার ভাগ্য নিয়ে খেলা করছে আর সংস্কৃতি ধ্বংসের উপক্রম করছে। এ সময়ে আমাদের নীরব থাকা হবে অপরাধ, সমাজের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য তার ঘোর ব্যত্যয় করা হবে।’ উল্লিখিত জঙ্গিবাদ এখন সারা বিশ্বে সক্রিয়। বাংলাদেশেও এর প্রকাশ নানা রূপে, কখনো ধর্মীয় চেতনার প্রতীকে। সমাজ রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে সে পেছন দিকে টানছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীর আদর্শগত দায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে বিরাজমান দুই বা তিনদলীয় ক্ষমতার রাজনীতি জোটবদ্ধ হয়ে পালাবদল করে দেশ শাসন করছে। তাদের অন্ধ দলীয় সমর্থকদের বাইরে তারা জনসাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তবু ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাসী মানুষকে বাধ্য হয়ে ভোট দিতে হয় এদিকে বা ওদিকে। সৎ ও মেধাবী মানুষ এ রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে। অবশ্য প্রতিষ্ঠালোভী বুদ্ধিজীবীদের কথা আলাদা।

এ অবস্থায় প্রগতিবাদী সংস্কৃতির কর্তব্য হবে সমমনা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে টেনে ঐক্যবদ্ধভাবে সংস্কৃতি চর্চার ধারা তৈরি। তবে সংস্কৃতি চর্চাকে রাজধানী মহানগরী থেকে শহরে, গ্রামেগঞ্জে নিয়ে যাওয়া দরকার। এক কথায় সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ নাগরিক বৃত্ত থেকে সংস্কৃতি চর্চার মুক্তি চাই। দরকার জনমানসের সঙ্গে সেতুবন্ধ।
শুদ্ধ তারুণ্যকে এবং দূষণমুক্ত সমমনাদের কাছে টানাও জরুরি। সংস্কৃতি চর্চার মতাদর্শগত তাত্তি্বক চর্চা যেমন দরকার; তেমনি দরকার এর যথার্থ বাস্তবায়ন। একই ধারায় সংস্কৃতির সৃজনশীল শাখায় তৎপরতা গণসংস্কৃতি বিকাশের জন্য অপরিহার্য। গণসংগীত, ঐতিহ্যবাহী পরিশীলিত লোকসংগীত ও লোকনাট্যের আধুনিকায়নও প্রয়োজন। এগুলো জনসংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক। পরীক্ষামূলকভাবে জনবোধ্য নয়। আঙ্গিক উদ্ভাবনও দরকার। বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে সংস্কৃতি চর্চার পক্ষে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দায় পূরণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.