সবরের পুরস্কার অফুরন্ত

October 4, 2015 11:33 pmComments Off on সবরের পুরস্কার অফুরন্তViews: 12
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
সবরের পুরস্কার অফুরন্ত
মাহবুবুর রহমান নোমানি
জাফর খান গাজী মসজিদ ও দরগাহ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে অবস্থিত। স্থাপনা দুটি বাংলায় বিদ্যমান মুসলিম নিদর্শনগুলোর মধ্যে সর্বপ্রাচীন বলে বিবেচিত। একটি শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ৬৯৭ হিজরি/১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছে। ত্রিবেণী (তিনটি নদীর সঙ্গমস্থল যথা গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী এবং এ থেকেই এ নামকরণ) হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে একটি প্রাচীন তীর্থস্থান। মুসলমানরা তাদের বাংলা বিজয়ের প্রথম দিকে এটি দখল করে।

মানুষের মহৎ একটি গুণ সবর বা ধৈর্য। ধৈর্যশীল ব্যক্তি সর্বমহলে প্রশংসিত। মহান আল্লাহর কাছেও অতি পছন্দের পাত্র। তিনি পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীল ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাকে (আইয়ুবকে) ধৈর্যশীল পেয়েছি। সে কতই না উত্তম বান্দা।’ (সূরা সোয়াদ : ৪৪)।

এ ধরাপৃষ্ঠে যত নবী-রাসুল এসেছেন, প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্য-স্থৈর্যের মূর্তপ্রতীক। ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের পরেই তারা নবুয়ত লাভে ধন্য হয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তাদের থেকে (বনি ইসরাইল) অনেক ইমাম (নবী) বানিয়েছি মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য, যখন তারা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।’ (সূরা সেজদা : ২৪)। সূরা আম্বিয়াতে কতিপয় পয়গম্বরের আলোচনার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা প্রত্যেকই ছিলেন ধৈর্যশীল।’ (সূরা আম্বিয়া : ৮৫)। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যাকে ধৈর্যের গুণ দান করা হয়েছে, সে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু প্রাপ্ত হয়েছে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

জগতের প্রত্যেক কাজে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জীবনে সফল হতে চাইলে ধৈর্যের বিকল্প নেই। ধৈর্যের পাহাড় মাড়িয়ে মানুষ সফলতার মুখ দেখে। তাই বলা হয়, ‘সবরে মেওয়া মিলে।’ কোরআন ও হাদিসে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ যেমন রয়েছে, তেমনি তার অফুরন্ত প্রতিদান ও পুরস্কারের কথাও বর্ণিত হয়েছে বহু জায়গায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং শত্রুর মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। তাহলে তোমাদের জীবনে সফলতা আসবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ২০০)। অন্যত্র বলেন, ‘ধৈর্যধারণকারীদের অপরিসীম পুরস্কার দেয়া হবে।’ (সূরা জুমার : ১০)।

ধৈর্যের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ধৈর্যধারীর সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ আছেন। পবিত্র কোরআন বলছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা বাকারা : ১৫৩)। আল্লাহর পক্ষ থেকে ধৈর্যশীলদের প্রতি রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। এরশাদ হয়েছে, ‘আপনি সবরকারীদের জান্নাতের সুসংবাদ দিন।’ (সূরা বাকারা : ১৫৫)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘তাদের ধৈর্যের কারণে জান্নাতে অট্টালিকা দেয়া হবে এবং তাদের সেখানে সালাম দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে।’ (সূরা ফোরকান : ৭৫)।

হাশরের ময়দানে ঘোষণা করা হবে, ‘ধৈর্যশীলরা কোথায়? অতঃপর তাদের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

সবর তিন ধরনের- ১. নিজেকে হারাম ও নাজায়েজ বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা। মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি সর্বদা মন্দকর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবিলায় জয়ী হওয়ার জন্য যেমন ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রয়োজন, তেমনি নিজের প্রবৃত্তির মোকাবিলার জন্য পাহাড়সম ধৈর্যের প্রয়োজন। এজন্য প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘প্রকৃত মুজাহিদ সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য প্রবৃত্তির সঙ্গে জিহাদ করে এবং প্রকৃত মোহাজির সে ব্যক্তি যে গোনাহ পরিহার করে।’ (মুস্তাদরাক : ২৪)। বস্তুত ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবল মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে ইউসুফ (আ.) এর ঘটনা সবার জন্য আদর্শ। সাতটি কক্ষ আবদ্ধ করে রানী জোলাইখা স্বীয় মনস্কামনা পূরণ করার মিনতি করলে পয়গম্বর ইউসুফ (আ.) আল্লাহর ওপর ভরসা করে বন্ধ দরজার দিকে দৌড় দেন। আর আল্লাহর সাহায্য তখনই এসে ধরা দেয়। সবগুলো দরজার কপাট আপনাআপনি খুলে যায়।

২. ইবাদতে ধৈর্যধারণ : মানবমন আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে আগ্রহী নয়। তাই ইবাদত-বন্দেগিতে নফসকে বাধ্য করতে হবে। আরবি সবর শব্দের অর্থ সংযম অলবম্বন বা নফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ। স্বভাবগতভাবে মানবমন বা নফস মন্দকর্মপ্রবণ হলেও মেহনত-মুজাহাদার মাধ্যমে তা অধীনে চলে আসে। বুজুর্গানেদ্বীন রাতের ইবাদতে পা ফুলিয়ে ফেলতেন। শীতকালে ঠা-া পানি দ্বারা অজু করে আরামের নিদ্রা দূর করতেন। এর জন্য অবশ্যই দৃঢ় মনোবল ও পাহাড়সম ধৈর্যের প্রয়োজন। আর আল্লাহর সাহায্য লাভের উপায় হচ্ছে ধৈর্য ও ইবাদত। এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। (সূরা বাকারা : ১৫৩)।

৩. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ : মানুষের জীবন বিপদাপদের ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এই ক্ষুদ্র জীবনে মানুষকে ছোট-বড় বিভিন্ন বিপদাপদের মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো বিপদ পরীক্ষাস্বরূপ আর কোনো কোনো বিপদ শাস্তিস্বরূপ হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলো তোমাদেরই কৃতকর্মের কারণে।’ (সূরা শুরা : ২৯)। অন্য আয়াতে বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, জান ও মালের ক্ষতি এবং ফলফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সবরকারীদের সুসংবাদ দাও।’ (সূরা বাকারা : ১৫৫)। বিপদে ধৈর্য না ধরলে অস্থিরতা ও পেরেশানি বৃদ্ধি পাবে বৈ কমবে না। দুনিয়ার বালা-মুসিবত দ্বারা জীবনের পাপ মোচন হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘মোমিন বান্দা সর্বদা কোনো না কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে এমন হয় যে, সে পৃথিবীর বুকে বিচরণ করে নিষ্পাপ অবস্থায়।’ (ইবনে মাজাহ : ২৯২)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘মোমিন ব্যক্তির জীবন, সম্পদ ও সন্তানসন্ততি বারবার বিপদাপদের সম্মুখীন হয়। পরিশেষে আল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে নিষ্পাপ অবস্থায়।’ (তিরমিজি : ২/৬৫)। দয়ালু আল্লাহ তায়ালা অনেক মানুষকে তাদের কৃত পাপের জন্য সতর্কস্বরূপ ইহকালে নানাবিধ বালা-মুসিবত ও দুঃখ-যাতনা দিয়ে থাকেন। যাতে তারা সাবধান হয়ে পাপ-পঙ্কিলতার পথ পরিহার করে সৎপথে ফিরে আসে। সুতরাং দুনিয়ার মুসিবত আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবাণী ও রহমত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘গুরু শাস্তির আগে অবশ্যই আমি তাদের লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।’ (সূরা সেজদা : ২১)।

প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘যাদের আল্লাহ ভালোবাসেন, তাদের বিভিন্ন মুসিবতে পতিত করেন। সুতরাং যারা তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর যারা অসন্তুষ্ট হয়, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি। (তিরমিজি : ২/৬৫)। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা নামাজ, রোজা, দান, সদকা ইত্যাদির প্রতিদান ওজন করে দেবেন। কিন্তু বিপদাপদে ধৈর্যধারণকারীদের প্রতিদান ওজন করে নয়, বরং অপরিমিত ও হিসাব ছাড়া দেয়া হবে। তা দেখে অন্যরা বাসনা করবে, হায়, দুনিয়াতে আমাদের দেহ কাঁচি দ্বারা কর্তিত হলে আমরাও সবরের এ প্রতিদান লাভ করতাম।’ (মাআরেফুল কোরআন : ১১৭৫)।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.