সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি বান্দরবান

September 30, 2015 4:35 pmComments Off on সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি বান্দরবানViews: 20
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি
কামরান চৌধুরী

পাহাড়-বন-অরণ্যে ঘেরা বান্দরবান জেলার প্রতিটি স্থানই চিত্তাকর্ষক। প্রকৃতির লীলাভূমি খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর ঘেরা এই পার্বত্যভূমিতে জনবসতি কম। সর্বত্রই সৌন্দর্যের পরশ, সবুজ লতাগুল্ম-লজ্জাবতী পথের দুই পাশ দিয়ে স্পর্শ করতে চায়। মাতামুহুরী, সাঙ্গু, বানখিয়াং নদী জেলাটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। নদীর জল স্বচ্ছ। শঙ্খ বা সাঙ্গু নদীর দুই তীরেই পাহাড় আর অরণ্য, নাম না জানা পাখির ঝাঁক। রয়েছে বন্যহাতি, বানরসহ নানা ধরনের প্রাণী। পাহাড়ের গায়ে গায়ে রয়েছে উপজাতিদের ঘরবাড়ি। একচিলতে কাপড় পরে উপজাতি মহিলারা নদীতে স্নান করছে, নদী বা ছড়া থেকে পানি নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও চোখে পড়বে।

বান্দরবান শহরের অন্য প্রান্তে কালো পাহাড়ে লবণাক্ত মাটির লবণ ঝরনার পানিতে মিশে থাকত। সুপেয় পানি পান করতে অসংখ্য দল বেঁধে হাতে হাত ধরে শঙ্খ নদী পার হতো। সে দৃশ্য বাঁধের মতো মনে হতো বলে স্থানটির নাম বান্দরবান। এলাকাটি ‘ম্যাঅকছি ছড়া’ হিসেবে পরিচিত। ভাষায় ‘ম্যাঅক’ অর্থ বানর আর ‘ছি’ অর্থ বাঁধ। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, নির্জন বন আর দেশের সবচেয়ে উঁচু কেওক্রাডং-তাজিনডং পর্বতের কারণেই বান্দরবানে সবার চোখ মুগ্ধতায় ভরে ওঠে। জেলাটির সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হলো রাস্তা, যা উঁচু-নিচু অসমতল। শহরকে ঘিরে দর্শনীয় স্বর্ণমন্দির, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, নীলাচল, বম রাজার বাড়ি, আদিবাসী কালচারাল সেন্টার, শঙ্খ নদী ইত্যাদি রয়েছে। মন ভরে ক্লান্তিহীন ঘুরে স্পটগুলো দেখতে পারেন। দার্জিলিং পাড়ায় ঘুরতে পারেন। রাতের নীরব-নিস্তব্ধ শহর খুবই মোহময়। যেখানেই থাকুন, আপনার হৃদয়-মন রোমাঞ্চিত হবে প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়ায়। যান্ত্রিকতা কোলাহলতা মুছে দেয় অপার শান্তি। প্রাণ খুলে প্রকৃতির সঙ্গে যতটা মিশতে পারবেন ততটাই শান্তি পাবেন।

শহরের পাশে দৃষ্টিনন্দন সাঙ্গু নদী পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ঘুরে চলেছে। কখনও দূরের আকাশ ছুঁয়েছে, কখনও পাহাড়ি জঙ্গলে হারিয়েছে। বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে নদীতে পানি কম থাকে। নদীর ওপর সেতুতে দাঁড়িয়ে সকাল-বিকাল অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। শহরের চার কিলোমিটার দূরে ২ হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র। স্থানটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অত্যন্ত পছন্দের। গাড়িতে বা হেঁটেও নীলাচলে যেতে পারেন, সেখানে আকর্ষণীয় কাচের টাওয়ার, দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি, গোলঘর, সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত উপভোগের আঙিনা ও রাতযাপনের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। নীলাচল থেকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী, দূর শহর খোলা চোখে দেখা যায়। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়, সবুজের সমারোহ। নীলাচলের কাছেই মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে। মেঘলায় বিশাল লেকের ওপর দুইটি ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। চিত্তবিনোদনের জন্য রয়েছে , শিশুপার্ক, সাফারি পার্ক, চিড়িয়াখানা, স্পিডবোটে ভ্রমণের সুযোগ। চোখে-মনে লেগে থাকবে ছায়াঘেরা বনানী। পাশের চা-বাগানের সৌন্দর্য অতুলনীয়। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে পারেন অনেকদূর, যেখানে কলাগাছের সারি আপনাকে স্বাগত জানাবে, বিশ্রামের ঘরও আছে। মোহমুগ্ধতায় ঘণ্টা দুই এলাকাটি ঘুরে দেখতে পারেন।

স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন ‘বুদ্ধ ধাতু স্বর্ণ জাদী’ শহর ছেড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ১ হাজার ৬০০ ফুট পাহাড়ের চূড়ায়। উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দিরটি সব ধর্মাবলম্বী ও পর্যটকের কাছে পবিত্র স্থান। এর স্বর্ণখচিত নির্মাণশৈলী সবারই মন কাড়ে। ১২৩টি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয় মন্দিরে। রয়েছে ছোট-বড় শতাধিক বুদ্ধমূর্তি। শহরের মধ্যপাড়ায় রয়েছে বোমাং রাজবাড়ি। শত বছরের ঐতিহ্যে ঘেরা রাজবাড়িতে রাজার বংশধররা থাকেন। অনুমতি নিয়ে দেখতে পারেন রাজবাড়িটি, বোমাং রাজার রাজমুকুট, সোনার তরবারি, রাজজৌলুসসমৃদ্ধ বাড়িটি এখনও সবার নজর কাড়ে। এছাড়া দেখবেন বোমাং রাজার সার্কেল অফিস। বাড়ির সামনে মাঠে শীতকালে মেলা বসে।

শহরের কাছে প্রাকৃতিক ঝরনা বনপ্রপাত। আমতলীর লালব্রিজ এলাকাটি আকর্ষণীয়। প্রবহমান স্বচ্ছ ঝরনা ঝরঝর করে বয়ে চলেছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছে কসাইপাড়ার পাশে প্রবহমান শীলকুম ঝরনা, যা হাজার হাজার মানুষের পানির জোগান, প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের আনন্দ জোগায়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল কেন্দ্র রয়েছে শহরে। এখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পোশাক, জীবনযাপন পদ্ধতি, নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, গয়না, অস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র, বাসন-কোশন, বই, তাদের জীবনযাত্রা ও উৎসবের ছবি সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবেন। উপহার হিসেবে আদিবাসীদের তৈরি পোশাক এবং বাঁশের শোপিস আনতে পারেন।

চাঁদের গাড়ি, রিকশা, ইজিবাইক অথবা হেঁটে শহরের সব জায়গায় যেতে পারেন। বাজারে দেখবেন আদিবাসী নারীরা সবজি, ফল, শুঁটকিসহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছে। এখানে ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়- মারমা, , , ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বম, খেয়াং, চাক, পাংখো ও তঞ্চঙ্গ্যা বাস করে। যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও উৎসব রয়েছে। ওদের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেন, তাদের বাড়িঘর দেখতে পারেন, কত সহজ-সরল তাদের জীবন। শহরের মাঝে বৌদ্ধ খিয়াং রয়েছে, আছে মারমা হোটেল ও আদিবাসী পরিচালিত হোটেল। মাছ, শামুক, ঝিনুক, শূকর, হরিণ, খাসির গোশত, সবজিসহ নানা রুচিকর খাবার পাওয়া যায়। বান্দরবানে যাবেন অথচ এ হোটেলের খাবারের স্বাদ মুখে নেবেন না, ভাবাই যায় না।

ঢাকা থেকে প্লেন, ট্রেন বা বাসে চট্টগ্রাম, বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে পূরবী ও পূর্বাণী বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। বান্দরবানে সরাসরিও আসতে পারেন , সেন্টমার্টিন, এস আলম, , বিআরটিসি ও ইউনিক পরিবহনে। বাসগুলো ঢাকার গাবতলী, আরামবাগ, কমলাপুর থেকে ছাড়ে, সময় লাগে ৯ ঘণ্টা। থাকার জন্য , থ্রিস্টার, প্লাজা বান্দরবান, গ্রিন হিল, হিলবার্ড, পূরবী, হলিডে ইন, ছাড়াও সার্কিট হাউসসহ অন্যান্য দফতরের রেস্টহাউস রয়েছে।

কামরান চৌধুরী : এনজিও কর্মকর্তা ও পর্যটন লেখক

kamran2070@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.