সৈয়দ শামসুল হক: হূত্কলমের স্বপ্নসারথি

December 26, 2013 1:57 pmComments Off on সৈয়দ শামসুল হক: হূত্কলমের স্বপ্নসারথিViews: 378
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

সৈয়দ শামসুল হক

হূত্কলমের স্বপ্নসারথি

রাহেল রাজিব
নিজের সাথে যুদ্ধ করতে হয় প্রতিনিয়ত! মানুষ নিজের সাথে যুদ্ধ করেই জয় করে তার নিজস্ব ভূমি। বাঙালির ঐতিহ্যধারায় বারবার বহির্সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাঙালি ঐতিহ্য সহজাত স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রহীতার কাজ করে থাকে। ফলে বাঙালির এই সংস্কৃতির সংমিশ্রণ বাঙালির চেতনাগত জায়গায় একসময় স্থান করে নেয়। আর্যশক্তির আগমন এবং তাদের সংস্কৃতিবলয় মানুষকে সহজে প্রভাবিত করেছে। ব্রিটিশদের আগমন এখানে তথাকথিত আধুনিকতার আগমন বলে অনেকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে থাকেন। বাঙালির দ্বন্দ্ব-পরিক্রমা পাশ্চাত্য আলোকবর্তিকায় নতুন করে জাগে বলে রেনেসাঁস বা পুনর্জাগরণ বলে দুয়োধ্বনি দিয়ে সেটাকে লালন করার একটা প্রচেষ্টা কমবেশি সকলের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর শাসনকাঠামো কোম্পানি কেন্দ্রিক এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু্ও ছিল শাসন। ফলে ব্রিটিশ শাসনের বলয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার বলয় সৃষ্টি যেন সারকাঠের মধ্যে গোলকের মধ্যে গোলক। এই গোলকের মধ্যে গোলক তৈরিতে সিদ্ধহস্তরা বলয় তৈরি করেই নিজেদের গোষ্ঠীপথ অন্বেষণ করার চেষ্টা করলেন। মহামহিম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজবলয় নিয়েই ছিলেন; ত্রিশ-চল্লিশ বলয় তৈরি করে যে নতুন ধোঁয়ার বলয় উঠল তাতে ধোঁয়াময় হলো বটে, বলয় মিলিয়ে গেল সহসা। বলয়গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যক্তিবোধই প্রধান হয়ে উঠল বলে টিকে গেলেন অনেকে; দুটো বিশ্বযুদ্ধের অবদানও সকলে স্বীকার করেন বটে, কিন্তু সাতচল্লিশ হওয়ার পর পরিবেশ-প্রতিবেশ পাল্টে গেল, সময়ের পালাবদলে দুটো মেরুকরণ হয়েই গেল! বাংলা ভূখণ্ড বিভাজন শুধু নয়; বাঙালি সত্ত্বার বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রমশ। কিন্তু পূর্ববাংলা পিছিয়ে অচ্ছুত-গেঁয়োর দলের সাহিত্যচর্চা বলে বনেদি বিলাসবাবুরা হুঁকোতে গুড়ুক তুলেছেন; এখনো তুলছেন! তবে ভৌগোলিক-রাজনৈতিক পরিচয় বাংলাদেশি সাহিত্য নিজস্ব অবস্থান সুসংহত করে বিস্তার লাভ শুরু করেছে—এটা এখন স্পষ্ট। সময়ের এই ঐক্য আছে এই ভূখণ্ডের লেখকদের মধ্যে; সৈয়দ শামসুল হক সময়ের ঐক্যবিন্দুর শব্দ-কারিগর!

‘বিকালবেলার আগে ভেঙে গেছে বিকালের মেলা-/ শরীর রয়েছে, তবু মরে গেছে আমাদের মন!/ হেমন্ত আসে নি মাঠে, -হলুদ পাতায় ভরে গেছে হূদয়ের বন!’ জীবননান্দ দাশের এই হেমন্ত বিকেল মাড়িয়ে বাংলার কাদা-জল-মাটি-স্পর্শ-গন্ধ আত্মীকরণ শিল্পই বাংলার; বিশেষত বাংলাদেশের। সৈয়দ শামসুল হক অক্ষরে অন্বেষণ করে নিয়েছেন শব্দ-নৈঃশব্দ্য-ঘ্রাণ! উত্তরবাংলার খাড়িনদীর স্রোতময় জীবন রাজধানী ঢাকা পেরিয়ে উড়াল দেয় ইউরোপে; কিন্তু জীবনস্রোত ও বোধের মাত্রায় ভক্তিপ্লাবনে পলি পড়ে বারবার; ফলে সৈয়দ হকের কবিতায় পুরোনো প্রাসাদে উঠে আসে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত পুরুষের নীলরক্ত গর্ব, কিংবা নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিচিত্র! প্রাচীনকে আহ্বান করে তিনি প্রোথিত করেন ভবিতব্যে; বর্তমান সেখানে শুধুমাত্র এক অনুঘটক। বাংলাদেশি ভূখণ্ডময় জননীআভা ও প্রত্নপরিচর্যা তাঁর কবিতার শরীরকে করেছে কারুকার্যময়। নির্মোহ-নির্লিপ্ত শব্দগুলো তবু যেন খুঁজে ফেরে সময়ের ঐক্য—’আমার প্রতিটি খাতা, কণ্ঠের প্রতিটি স্বর, দেয়ালের সমস্ত শূন্যতা,/ প্রতিভার উত্সবের মাঠঘাট জনপদ ব্রহ্ম ভরে গিয়েছিল।/ যতদূর দূরান্তের তুমি, তবু কত কাছে ছিলে;/ একদিন আমার শরীর ঘিরে তোমার বিশাল দুটি করতল থেকে/ কোটি কোটি জ্বলন্ত নক্ষত্র গ্রহ কোমল ফুলের মতো ঝরে পড়েছিল।’ মাত্র চার লাইনের এই স্তবক পাঠান্তে অনুধাবন কিংবা উপলব্ধির রেশ পাওয়া যায় এক ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন এক স্পর্শ ও স্বাদের। রবীন্দ্রপরবর্তী ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার বলয়মুক্তি ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশের প্রায় সব লেখকের মধ্যে আছে; বিশেষত কবিদের কবিতায়। এখানে সৈয়দ শামসুল হক ভিন্ন, প্রথম পর্যায়ের কয়েকটি কবিতার মধ্যে কিছু প্রভাব থাকলেও তিনি খোলসাবৃত থাকেননি, মজ্জাগত জীবনের পাঠকে সহজাত প্রতিক্রিয়ায় তিনি তুলে আনতে পেরেছেন শব্দে, উপরোক্ত স্তবক তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের কবিগণ আর্থ-রাজনীতি ও প্রকৃতি প্রভাবপুষ্ট; সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় এইসব উপাদানের গন্ধ আছে, কিন্তু স্বাদে আছে ভিন্নতা। কুসংস্কারমুক্ত মূল্যবোধ, আমিত্ব বোধকে তিনি ধারণ করেন। পরিধির মধ্যেই কেন্দ্রর অবস্থান এবং এটিই ধ্রুবসত্য। উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—’চেতনার গূঢ় মূলে জল দাও, বীজ,/ শস্য করো চিরকাল, হাসি দাও কান্নার সময়ে/ উপদ্রুত হূদয়ে বাঁধ ভাঙ্গো ভক্তির প্লাবনে’ কিংবা ‘দেবতার বিষয়ে আমি অজ্ঞ চিরকাল;/ জানি না তাদের রীতি’। সৈয়দ শামসুল হকের এই বোধের সাথে গাণিতিক ‘পাই’-এর নিরন্তর সম্পর্ক নিরূপণের এক যোগসূত্র স্থাপন করা যায়, দৃশ্যরূপ কল্পনা করা যায়, কিন্তু পরিণতি অসীম!

গল্পে তিনি মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের সমান্তরালে গ্রামজীবনের ঈর্ষা-দ্বন্দ্বময় সম্পর্ক নিরূপিত এক বোধকে তুলে আনার চেষ্টা করলেন। শীতবিকেল (১৯৫৯), রক্ত গোলাপ (১৯৬৪), আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭), প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮২), জলেশ্বরীর গল্পগুলো (১৯৮৮) গল্পগ্রন্থগুলো উপরোক্ত বিষয়ের সাক্ষ্য বহন করে। বাংলা ছোটগল্পের ভিত্তি ও নিরীক্ষা দুটো রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়ে। মানিক বন্দ্যোপাধায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় গল্পের উপকরণে রং লাগিয়েছেন। বাংলা ছোটগল্প প্রাণ পেয়েছে ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। এরপর সুবোধ ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, জগদীশ গুপ্তরা বাংলা গল্পের শরীরে মানবিক বোধের সকল অনুভূতি সঞ্চার করে দিলেন, বিশেষত জীবনের অদেখা বাঁকগুলো সহসাই এখানে স্পষ্টতর হতে থাকল। চাবুক হাঁকড়ানো সমাপ্তির মতো গল্পের উপাদেয় কাঠামো যেমন পাওয়া গেল বিপরীতে আঙ্গিক রূপায়ণে নিরীক্ষার নিয়ত ছাপও স্পষ্ট হয়ে গেল। সৈয়দ শামসুল হক গল্পবুননে সমসাময়িক ও পূর্বসূরিদের থেকে ভিন্ন পথে হাঁটলেন সহসাই। প্রথম গল্পগ্রন্থের চরিত্রগুলো যেমন—’সম্রাট’ গল্পের

বৃদ্ধ পঙ্গু জহির সাহেব, স্ত্রী মরিয়ম, তার সন্তান শাহেদ রাজনীতি সম্পৃক্ত হয়ে পরিবার ও সমাজের সেই নাটকীয় বিশেষ ক্ষণের দিকে ধাবিত হয়, যা গল্পের মোচড় হিসেবে কাজ করেছে। ‘শীতবিকেল’ গল্পটির নাট্যগুণ পরিচর্যার কারণেই খুব সহজেই চিত্রনাট্যে রূপ পেয়েছে; বিশেষত, চরিত্রের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি চোখে পড়ে। কাহিনির সহজ ও সরল গতি, চরিত্রের নিপাট কাঠামো গল্পটিকে সাধারণ থেকে অসাধারণ পাঠ-প্রক্রিয়ার অংশীদার করেছে। ‘তাস’ গল্পের বিধবা মা, ‘কবি’ গল্পের আবদুর রব, ‘কালামাঝির চড়নদার’-এর সফেদ মল্লিক চরিত্রগুলো চিরায়ত জীবনের সাদামাটা উপস্থিতি নিয়ে হাজির হলেও গল্পের বুনট ও উপস্থাপন ভঙ্গি স্বতন্ত্র ও নিরীক্ষাপ্রিয় করে তুলেছে!

‘সম্রাট’ গল্পে একটি আবহের ভেতরে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছিবি তুলে ধরতে গিয়ে গল্পকার জহির সাহেবকে তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ একটি সুষম পারিবারিক গঠনে দেখালেও আদতে জহির সাহেব অসুখী মানুষ। ছয় বছর আগে দুর্ঘটনার কারণে ক্রাচে ভর দিয়ে চলেন, অর্থাত্ চলত্শক্তি হারাননি। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণটি জহির সাহেব নিজের হাতেই রাখতে চান; কিন্তু অতর্কিত রাজনীতির কড়াল থাবা পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। গল্পকার সূক্ষ্মভাবে আর্থ-সামাজিক পরিবেশকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কটাক্ষ করেছেন, একটি দুর্ঘটনা পরিবারকে নিয়ন্ত্রণহীন করতে পারেনি। কিন্তু সন্তান শাহেদের রাজনীতি সম্পৃক্ততা পরিবারের আবহকে ব্যাহত করে, পরিবারের সবার সামনে শাহেদকে গ্রেফতার করার ঘটনা জহির সাহেবকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। গল্পকার হয়তো সেই সময়ের অস্থিরতাকে স্পষ্ট করতেই এই বিশেষ দুটো ঘটনাকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। কেননা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা কীভাবে ষাটের দশকের শুরুতে বাংলাদেশি চেতনার ভেতর ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছে এবং মজ্জাগতবোধ লাভ করেছে তার আভাস এই গল্পে আছে। বিশেষত একটি পারিবারিক ট্রাজেডির আবহ প্রস্তুত করে গল্পকার মোচড়টি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার বড় একটি কারণ গল্পের গভীরতায় প্রবেশ করলে পাঠক বিষয় থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত; গল্পকার সেদিকে যাননি। একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই গল্পটি শেষ করেন। ‘শীতবিকেল’-এর আনু, পানু, সালু, মীনুসহ তাদের পরিবার একটি মফস্বল শহরের বাসিন্দা; বাবার দারোগার চাকরি, কড়া শাসনে পরিবারটি একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে চলতে থাকে। বড় সন্তান পানুর চাকরির খবর পরিবারটির আনন্দে ভাসার আবহ শেষ হতে না হতেই পানুর ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর খবর আসে। আকস্মিক এই মৃত্যুশোক পরিবারটি সামলে উঠার আগেই তাদের বাবা উেকাচ গ্রহণের দায়ে গ্রেফতার হয়। পারিবারিক এই জটিল চিত্রগুলো আমাদের সমাজে বিরল নয়। কিন্তু গল্পকার দেখানোর চেষ্টা করেছেন—এই ঘটনাগুলোর অভিঘাত কীভাবে পরিবার ও সমাজকে একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এই গল্পের ভাষাভঙ্গি সহজ-সরল-সাবলীল কিন্তু প্রতীকী ব্যঞ্জনা গল্পটিকে বিশেষায়িত করেছে, পাঠকের মনে রেখাপাতা করেছে। ‘তাস’ গল্প বিধবা মায়ের টানাপড়েনের এক সংসার-চিত্র। বিধবা নারী তার স্বামীর একটি ঘড়ির উপস্থিতির মধ্যে তার স্বামীর উপস্থিতি অনুভব করেন। এই স্মৃতিময় ঘড়ির খেয়ালে তিনি সুদূর অতীতে ভেসে যান, স্মৃতি রোমন্থন করেন। সন্তানের তাস খেলা প্রীতি যেন দেয়াল ঘড়ির সাড়ানোর বিপরীত কাজ হিসেবে উঠে আসে। ক্রমাগত তিনি নিজের ভেতরে একটি হিংস্র সত্তা অনুভব করতে থাকেন। স্বামীর স্মৃতি-স্পর্শ-অনুভূতির বিপরীতে সন্তানের উদাসীন মানসিকতা দুটো ঘটনার সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি চরম নাটকে রূপ নেয়। মা রাতের অন্ধকারে ছেলের তাসের প্যাকেট লুকিয়ে এনে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে, পরক্ষণেই উপলব্ধি হয়। সন্তানবাত্সল্য জেগে ওঠে। নারীর স্বামী সাহচর্যময় ঘড়ির বিপরীতে এই ছেঁড়া তাসগুলো যেন খোকনের শৈশবের প্রতিরূপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। নারীর স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার সমান্তরালে মাতৃরূপটিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো গল্পকারের উদ্দেশ্য হিসেবে পরিলক্ষিত হয় না—এখানে লেখক একজন মধ্যবিত্ত নারীর জটিল মনস্তাত্ত্বিক দিকটি স্পর্শ করার চেষ্টা করেছেন। পুরো গল্পটি যেন একটি ক্যানভাস! চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ের ন্যায় দাগ কেটে তিনি নারী চরিত্রটিকে উপস্থাপন করেছেন। গল্পটির পরিমিত ভাষাবোধ ও চিত্ররূপময়তা পাঠককে মোহমুগ্ধ করে রাখে। ‘কবি’ গল্পটি আত্মজৈবনিক আবহপুষ্ট! কবি মুনশী আবদুর রবের সাথে কবির পরিচয়। কবি আবদুর রবের জীবনের বাঁক পরিবর্তন—কলম ছেড়ে লাঙল টেনে ধরা জীবনের তাগিদে, কিন্তু কবি তো কবিই সারাজীবন। দীক্ষিত কবিমাত্রই নিজেকে জারিত করেন শব্দমোহে। কবি আবদুর রবও সেই মোহগ্রস্ততায় ছিলেন। পারিবারিক জটিলতা ও সমাজের রূঢ় পরিস্থিতি তাকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারে না। সমাজপতিদের কোপানলে কবির মৃত্যু হয়, কবিসত্তার মৃত্যু হয় না। ‘প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান’ গল্পে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত পরিবারের উত্তরাধিকারী দেওয়ান ইদ্রিস খাঁ-র জীবনাবহকে তুলে ধরেছেন। সামন্ত পরিবারের দাপট শেষ হয়ে গেছে, পরিবারের সকল সম্পদ বিক্রি হয়ে গেছে। শেষাবধি দেওয়ান ইদ্রিস খাঁ নিজেকে পণ্য করে বিক্রি করে দেয়। অনেকটা হেলুসিনেশনের ব্যবহার গল্পটির মধ্যে আছে। অনেকটা ঘোরলাগা পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ান ইদ্রিস খাঁ তার গল্প বলতে থাকেন। সৈয়দ শামসুল হক গল্প কথনে সবর্দা পরিমিত শব্দচয়নে অভ্যস্ত, তবে নিখুঁত বর্ণনাত্মক করার কারণে কখনো কখনো রাস ছেড়ে দেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখেন সচেতনভাবে। তার গল্পে কাব্যগুণপ্রভাবপুষ্টতা অনস্বীকার্য। অনেক সমালোচক এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখে থাকেন, তবে গল্পে কাব্যগুণপ্রভাবপুষ্টতা একটি বিশেষ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলেই দীক্ষিত পাঠকের হূদয়ে দাগ কাটে।

মানবজাতির ইতিহাস যুগপরিক্রমায় বৈজ্ঞানিক পরিণতি লাভ করেছে—কেননা, মানুষের জৈবিক চাহিদা মানুষকে প্রতিনিয়ত সময়-সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পারস্পরিক অনুবৃত্তে রেখেছে। ফলে মানুষের এই জৈবিক প্রবৃত্তিকে ক্রমাগত নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ হিসেবেই দেখা হয়েছে। নিষিদ্ধ ও অন্ধকারের দিকে মানুষের অদম্য বাসনা মানুষকে কখনো কখনো হিংস্র করলেও সমাজ-সংষ্কারকে উপেক্ষা করতে পারে না। ফলে আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই মানুষ নিজেকে প্রতিনিয়ত বিবর্তনের পথে নিয়ে যায়। যৌনতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—কিন্তু সমাজ কাঠামোর বেড়াজালে মানুষের জৈবিক তাড়নাকে সর্বদাই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে জৈবিক তাড়না পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও আর্থ-সামাজিক-আঞ্চলিক প্রথা নর-নারীর স্বাভাবিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং একারণেই মানুষের মনে যৌনজীবনের কামনা-বাসনা নিয়ত বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এই অতৃপ্ত কামনা থেকেই মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এক অবদমিত মানসিক অবস্থায় পৌঁছায়—যেখানে তার ক্রিয়াকর্ম স্বাভাবিক গণ্ডি পেরিয়ে সবার চোখে পড়ে। কেননা মানুষের অর্ন্তপ্রদেশে ঘুমন্ত চাহিদা থাকে—অনেকটা আগ্নেয়গিরির মতো, সেটির বিস্ফোরণ সমাজকে আলোড়িত করে। সামন্ত সমাজ সর্বদা নারীকে ভোগ্যপণ্য করেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন মানুষের জৈবজীবনে প্রভূত পরিবর্তন এনেছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা যুদ্ধ মানুষের জৈবজীবনকে প্রভাবিত করেছে। হতাশা-নৈরাশ্য-অপ্রাপ্তি কিংবা নেহাতই বিত্তের সম্মোহনে মানুষ ক্রমাগত যৌবনের কৌতূহল চরিতার্থ করার প্রশ্রয় খুঁজেছে। পশ্চিমা জীবনে ফ্রয়েড, এলিস, বার্নাড শ, লরেন্স যে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা বাংলাদেশের প্রথম পর্বের কথাসাহিত্যকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধ সমগ্র বিশ্বে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তার সতত প্রমাণ মেলে সাহিত্যে। বাংলাদেশের সাহিত্য নামক অভিধাটি বর্তমানে অতিচর্চিত। যদিও এই বিভাজন অনেকটা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক, যা সাহিত্যকে সংকুচিত করে। তবুও এটিকে অস্বীকার না করেই বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের প্রথম পর্যায়ে নর-নারীর আড়ালজীবনের প্রতিচিত্র ফুটে উঠেছে। বলা ভালো, মন কেটে চিরে দেখবার এক উত্তেজনা প্রশ্রয় পেয়েছে। মানুষের মনকে অপারেশন টেবিলে এনে তাকে চুলচেরা বিশ্লেষণের প্রবণতা লক্ষণীয় সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসে। এক্ষেত্রে তাঁর কয়েকটি উপন্যাসের প্রসঙ্গ আমরা পর্যায়ক্রমে টানার চেষ্টা করব।

‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসে নায়ক বাবর উচ্চাকাঙ্ক্ষী পিতা কাজী সাহেবের মেয়ে লতিফার বিয়ের কথা শুনে পূর্বপরিচয়কে সে নোংরাভাবে কাজে লাগাতে চায়। লেখকের বর্ণনা—’লতিফা তাকে ভর্ত্সনা করে আর কামুক বাবরকে ভোর রাতে ক্রমবর্ধমান অথচ অপূর্ণ প্রতিহত সেই বাসনাকে নিজ হাতেই বইয়ে দিতে হয়।’ প্রকৃত অর্থে বাবর জৈবিক তাড়নায় নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করে এবং সেই অবদমন থেকেই সে বারবার বিভিন্ন নারীর ওপর উপগত হওয়ার প্রয়াস চালায়। বন্ধু সেলিমের বোন উনিশ বছরের তরুণী বাবলি, হোস্টেলবাসী ছাত্রী জাহেদা তার এই যৌনচক্রে পা দেয়। বাবরের কাছে সঙ্গম একটি শিল্প। তাই সে পরিচয়ের সময়কে ও আলাপচারিতাকে দীর্ঘ করলেও সম্ভোগের সময়টাকে কোনোভাবেই অপচয় করে না। জাহেদা মূলত বাবরের সম্ভোগের শিকার। পুরো উপন্যাসে বাবরকে যেভাবে পাওয়া যায়, তাতে জাহেদার সঙ্গে বাবর একটু ভিন্ন মাত্রা নিয়ে উপস্থিত। এখানে সে স্থির ও শান্ত। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সে ক্রমাগত কৌশলাশ্রয়ী এবং এক্ষেত্রে সে শিল্পচাতুর্যের আশ্রয় নেয়, যা তার ব্যক্তিত্বে নতুন মাত্রা যোগ করে। পুরো উপন্যাসেই বর্ণনার ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক সহজ ও সাবলীল গদ্যের আশ্রয় নিয়েছেন, ফলে চরিত্রগুলো আর্কিটাইপ না হয়ে রক্তে-মাংসে উপস্থিত হতে পেরেছে। ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হকের কৃতিত্ব এখানেই।

‘এক মহিলার ছবি’ উপন্যাসে নাসিমা আধুনিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী। বলা চলে, সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তাই স্বামীর সঙ্গে বিশ্বস্ততা তার কাছে যেমন কঠিনভাবে দাঁড়ায়, তেমনি বিয়েপূর্ব আবেগকেও সে অস্বীকার করতে পারে না। এই দোলাচলে সে প্রথাগত আচরণের শিকার। তার স্বামী তাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়। ‘দেয়ালের দেশ’ উপন্যাসেও প্রেম ও জৈববাসনার পূর্ণ প্রতিফলনের প্রয়াস দেখা যায়। তাহমিনার সহজাত আকাঙ্ক্ষা আবহমান বাঙালির মতোই—মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ। স্বামী আবিদের পিতা হওয়ার অক্ষমতা তাকে নিয়ে যায় বিয়েপূর্ব প্রেমিক ফারুকের কাছে। ফারুকের দ্বারা সে মাতৃত্বের স্বাদ পেলেও তার দ্বিধা কাটে না। কেননা, পিতা ও পিতৃত্বের ফলভোগী দুজন এবং এই দ্বৈরথ তাকে ক্রমাগত নিমজ্জিত করে এমন এক জগতে যা থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। জীবনবাস্তবতা ও নিজের সম্পর্কের বেড়াজালে সে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করে। উপরোক্ত তিনটি উপন্যাসের মতো তার পরিশীলিত গদ্যের ভাণ্ডার বিবিধ উপাচারে ঋদ্ধ।

সৈয়দ শামসুল হক শিল্পের প্রায় সকল শাখায় বিচরণ করেছেন। চলচ্চিত্রের গান ও চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রেও নিজস্বতা অর্জন করেছেন। নিভৃতে তিনি একজন ভাস্কর্যশিল্পীও বটে! সুদীর্ঘ জীবনে সৈয়দ শামসুল হক নিজেকে শিল্পের সকল শাখায় বিচরণ করালেও আপাদমস্তক তিনি কবি, তাঁর কাব্যনাটকের প্রসঙ্গই বলি, গল্প-উপন্যাস কিংবা আত্মজীবনীর পথরেখায় প্রবেশ করি—সেখানে অক্ষর অন্বেষক হিসেবেই তাঁকে নতুন করে বারবার আবিষ্কার করি!

এই ভাষাচিত্রীর জন্মদিনে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। জয়তু সৈয়দ শামসুল হক।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.