হাদীছের আলোকে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা ও রিপু দমন

November 21, 2014 1:21 amComments Off on হাদীছের আলোকে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা ও রিপু দমনViews: 78
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

হাদীছের আলোকে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা ও রিপু দমন
-মো. মোশাররফ হোসাইন
হযরত ওমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি– “নিশ্চয় সমস্ত কাজের ফলাফল (কেবল আন্তরিক) নিয়্যতের উপর নির্ভর করে। বস্তুত: প্রত্যেকেই যে নিয়্যতে কাজ করবে সে তা-ই পাবে। কাজেই যার হিজরত মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য হয়েছে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্যই হয়েছে বলে পরিগণিত হবে। পক্ষান্তরে, যার হিজরত কোন পার্থিব স্বার্থ লাভের আশায় বা কোন নারীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে হয়েছে, তার হিজরতও উক্ত উদ্দেশ্যেই হয়েছে বলে পরিগণিত হবে”। (আল-হাদীছ)
উৎসমূল ও আনুসঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়: মুহাদ্দিছগণের শিরমণি, ইমাম বুখারী (রাহ.) ও ইমাম মুসলিম (রাহ.) কর্তৃক সংকলিত বিশুদ্ধতম দু’টি হাদীছগ্রন্থ: বোখারী ও মুসলিম শরীফে হাদীছটি বর্ণিত আছে। উল্লেখ্য, মুহাদ্দিছগণের পরিভায়াষ এ ধরনের হাদীছকে “মুত্তাফাকুন আলাইহি” বা ঐক্যমতসমর্থিত হাদীছ বলা হয়। এ ছাড়াও আবু দাউদ, তিরমিজী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ ও অন্যান্য হাদীছগন্থে ওমার (রা.) থেকে হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে। অধিকন্তু, নিয়্যত সম্পর্কে হাদীছে এত বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে যে,অনেক বর্ষিয়ান আলেমে দ্বীনের অভিমত হলো,নিয়্যত পুরো ইসলামী শিক্ষার এক-তৃতীয়াংশ বেষ্টন করে আছে। কারণ, মানুষের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পাদিত হয় মূলত: তার তিনটি অঙ্গের দ্বারা। (১) ক্বলব (অন্তর), (২) মুখ ও (৩) অন্যান্য সাধারণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। নিয়্যত-কর্ম সম্পদিত হয় সেই তিনটি অঙ্গের সর্বশীর্ষ অঙ্গ ক্বলবের দ্বারা। আবার কখনো কখনো শুধু নিয়্যতই স্বতন্ত্র একটি ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। আর অন্য সব ইবাদত তার উপরই নির্ভর করে। এ জন্যই বলা হয়: “মুমিনের নিয়্যত তার তার কাজ হতে উত্তম”। উল্লেখ্য, সালফে সালেহীন এই হাদীছ দিয়ে তাদের যে কোন লেখনী-কর্ম শুরু করতে খুবই পছন্দ করতেন। এ ক্ষেত্রে আলেম-ওলামা, ছাত্র-শিক্ষক নির্বিশেষে সর্বস্তরের জ্ঞান-পিপাষুদেরকে ইখলাস (নিষ্ঠা) তথা নিয়্যতের বিশুদ্ধতার উপর গুরুত্বারোপ ও সতর্ক করাই তাদের মূল টার্গেট। দিকটা বিবেচনা করেই, সৃজনের সূচনার শুভক্ষণে আমার এই ক্ষূদ্র প্রয়াস। এতে রয়েছে পূর্বসূরীদের বাস্তব অনুকরণ এবং উত্তরসূরীদের সবিনয় সতর্কীকরণ।
বর্ণনাকারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়: তাঁর নাম: ওমার ইবনুল খত্তাব, উপনাম: আবু হাফস, উপাধী: আল-ফারুক (সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী)। আ’মুল ফীলের) (১৩ বছর পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)-র খেলাফতের শেষের দিকে তাঁরই হাতে তৎকালীন সাহাবাদের সর্বসম্মতিক্রমে দ্বিতীয় খলীফা হিসাবে তিনি বায়আত (শপথ) গ্রহণ করেন। ১৩ হিজরী মোতাবেক ২২শে জুমাদাল ঊখরা মঙ্গলবার থেকে শুরু করে ২৩ হিজরীর ২৬শে জিলহজ্জ্ব পর্যন্ত মোট দশ বছর, ছয় মাস, চার দিন যাবৎ তাঁর খেলাফত কাল ব্যাপ্ত ছিল। তামাম সাহাবীদের মধ্যে মান-মর্যাদায় হযরত আবু বকর (রা.)-এর পরেই তাঁর স্থান। মুসলিম ইতিহাসে তাকেই সর্বপ্রথম এক বাক্যে আমীরুল মুমিনীন (মুমিনদের নেতা) নামে ভুষিত করা হয়। মহানবী (সা.) থেকে সরাসরি (৫৩৯) পাঁচ’শ উনচল্লিশটি হাদীছ তিনি বর্ণনা করেন। তাঁর শাসনামলে সমগ্র বিশ্বে তিনি নির্ভজাল ন্যায়-পরায়ণতা ও বাক-স্বধীনতার বিরল আদর্শ স্থাপন করেছেন। যার কীয়দাংশও যদি বর্তমান বিশ্বের শাসক গোষ্ঠী চর্চা করতেন, তাহলে এই দুনিয়াটা একটি শান্তির নীড়ে পরিণত হতো। ৬৩ বছর বয়সে ২৩ হিজরী মোতাবেক জিলহজ্জ্ব মাসে আবু লুলুআ নামক ইয়াহুদীর হাতে তিনি শহীদ হন। অত:পর, হযরত আয়েশার ঘরে মহানবীর বাম পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। বর্তমানে মদীনা শরীফের মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে ঘরটি অবস্থিত।

নিয়্যতের হাক্বীকত: আরবী ভাষায় বহুল ব্যবহৃত বিশেষ্য বাচক একটি শব্দ ‘নিয়্যত’। বাংলায় তার প্রতিশব্দ হিসাবে সঙ্কল্প, ইচ্ছা, অভিপ্রায়, প্রত্যাশা, উদ্দেশ্য, মনের আশা ইত্যাদী ব্যবহৃত হয়। আর শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের আশায় কোন ইবাদতের জন্য আন্তরিকভাবে দৃঢ় সঙ্কল্পের নাম ‘নিয়্যত’। অর্থাৎ, যে কোন কাজের জন্য মনে মনে চিন্তা করত: উদ্দেশ্য ঠিক করার নাম নিয়্যত। এক কথায়, মনস্কামনা-ই হলো- ‘নিয়্যত’। নিয়্যতের শাব্দিক ও পরিভাষিক অর্থে এ কথা স্পষ্ট হলো যে, এর আসল স্থান হচ্ছে মানুষের অন্ত:করণ। কাজেই নিয়্যত করার সময় মৌখিক উচ্চারণের কোন দখল নেই। এ ক্ষেত্রে মনস্কামনাই যথেষ্ঠ। কারণ, অন্তরই মানুষের যাবতীয় ইচ্ছা,ভাব ও কামনা-বাসনার একমাত্র উৎস ও নিয়ন্ত্রক। এছাড়া মানুষের মনে কোন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান আসার সাথে সাথেই মনের ভিতর স্বাভাবিকভাবেই এর নিয়্যত হাজির হয়। তাই বান্দা যখন তার করণীয় কোন কাজ সম্পর্কে অবহিত ও মনযোগী হয় তখনই মনের ভিতরে সে সম্পর্কে তার নিয়্যত আপনাতেই সৃষ্টি হয়ে যায়। সুতরাং আসন্ন কাজের জ্ঞান অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও নিয়্যত ছাড়াই সম্পন্ন হওয়ার কল্পনা করা আকল-বুদ্ধি ও যুক্তির পরিপন্থী। নিয়্যতের আসল স্থান যে মানুষের অন্তর, এ প্রসঙ্গে আলোচিত হাদীছ ছাড়াও, আরো অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আল্লাহ তোমাদের শরীর ও চেহারার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেন না,বরং তোমাদের মনের ও কর্মের দিকে দৃষ্টিপাত করেন” (মুসলিম)। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা চেহারা ও শারীরিক অবকাঠামোর মানদন্ডে কাউকে সওয়াব বা শাস্তি দেন না। বরং, অন্তরের একনিষ্ঠতা, নিয়্যতের বিশুদ্ধতা তথা ইখলাসের প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহ মানুষের আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। বাহ্যিক চেহারা ও শারীরিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তালার কাছে কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। অন্তরের পরিশুদ্ধতাই মুখ্য বিষয়।
অন্য হাদীছে আছে। আবু বাকরা নুফাই ইবনুল হারিস আস-সাকাফী (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেন: “দু’জন মুসলিম তাদের নিজ নিজ তরবারি নিয়ে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামী। আবু বাকরা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন,ইয়া রাসূলুল্লাহ! একজন তো হত্যাকারী,নিহত ব্যক্তির কি হলো যে সেও জাহান্নামী? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করার আকাঙ্খী ছিল” (বুখারী ও মুসলিম)। অর্থাৎ, মনে প্রতিপক্ষকে হত্যার নিয়্যত ও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার কারনে নিহত ব্যক্তিকেও শাস্তি দেয়া হবে। এটাই যদি নিহতের পরিণতি হয়। তাহলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে, রাজনৈতিক হীন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব-মারামারি ও সংঘর্ষে নিহতদের শহীদ বলা কতটুকু সমীচীন হবে? তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ম বিবেচনার প্রয়োজন। আরেক হাদীছে মহানবী (সা.) বলেন: “তোমাদের চিন্তা ভাবনা,কামনা-বাসনা ও মতামত আমার আনিত দ্বীন ও শরীয়ত অনুযায়ী না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের কেউই মুমিন হতে পারবে না”। (মিশকাত)। মোটকথা এ সমস্ত হাদীছ, সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীনের প্রত্যক্ষ্য আমল দ্বারা নিয়্যতের উল্লেখিত অর্থই প্রমাণিত হয়।
প্রসঙ্গত, আমাদের দেশের বাজারজাত বিভিন্ন পুস্তিকা ও পঞ্জিকাতে নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদাতের যে সকল লম্বা-লম্বা লিখিত নিয়্যত আমরা দেখতে পাই তার কোন ভিত্তি নেই। ইসলামের স্বর্ণযুগে এগুলোর কোন অস্তিত ছিলো না। পরবর্তী যুগে অজ্ঞতার আড়ালে এগুলো ইবাদত হিসাবে সংযোজন হয়েছে। এ জন্যই অনেক বিজ্ঞ আলেম এগুলোকে বিদাত বা গর্হিত কাজ বলে স্বাব্যস্ত করেছেন। এর চেয়েও দু:খজনক ব্যাপার হলো, এই অহেতুক নিয়্যত মুখস্ত করার পেছনে পড়ে আমাদের অনেকেই নামায, রোজা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এগুলো থেকে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য।
মর্যাদার কাঠগড়ায় নিয়্যতের মূল্যায়ণ: সচরাচর আমাদের সীমীত চিন্তা-চেতনা ও স্থূলদৃষ্টিতে সংখ্যা ও পরিমাণতত্ত্ব তথা গণনার পরিমানের নিরিখে ‘সত্য’ জয়-পরাজয়ের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়ে থাকে। তাইতো ভিন দেশীদের থেকে চাপানো গণতন্ত্রের গুণগান গাইতে আমরা একটুও দ্বিধাবোধ করছি না। মাথাপিছু গণনার আধিক্যই যার মূল ভিত্তি। আবার অনেক সময় নিজেদের অজ্ঞতাবশত: এর সপক্ষে নানা ধরণের খোঁড়া যুক্তিও খাড়া করি। অনেকই আশ্রয় নিচ্ছি বামপন্থিদের আড্ডাখানায়। ক্ষুণ্ণ হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের গড়া ঐষ্যর্যমণ্ডিত নিজস্ব স্বকীয়তা। ধীরে ধীরে বিলিন হতে চলেছে আমাদের আত্মপরিচয়। এ হলো, আমাদের মনগড়া আদালতের হাল-হাক্বীকত। কিন্তু আল্লাহর আদালতে ‘সত্য’ নির্ধারণী মাপকাঠি এর সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সবধরনের ছল-জুয়াচুরি অকেজু। চলে না সেখানে মাথা গণনার ধাপ্পাবাজি। কেননা, তাঁর মহামান্য আদালতে অধিক গণনার পরিমানে নয়, বরং অধিক গুণগত মানের বিবেচনায় জয়-পরাজয় নির্ভর করে। একদা হুজুর (সা.) হযরত মু’আয (রা.) কে বলেন,হে মু’আয! “তুমি ইখলাসের সাথে আল্লাহর এবাদত করবে,তাতে অল্প ইবাদতই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে”৷তিনি (সা.) আরো বলেন: “আল্লাহ তাআলা শুধু বান্দার সে আমলই কবুল করেন, যা ইখলাসের সাথে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার উদ্দেশ্যে করা হয়। (বর্ণনায়: নাসায়ী: ৩১৪০) যে বজ্রধ্বনিতে বৃষ্টি পড়ে না তাতে ঘাস বা তৃণলতা গজায় না। তেমনি মানুষের ঐ সব আমল যাতে ইখলাস থাকে না তা কখনোই ভালো ফল দেয় না। ইতিহাস বার বার আমাদের এই শিক্ষাই দেয়েছে, নিয়্যতের বিশুদ্ধতার গুণগত মান ও প্রমাণের কাছে গণনার পরিমাণ তথা সংখ্যাগুরুর মতামতের দাম এক কানা-কড়িও নাই। ন্যায়-নিষ্ঠ খোদাভক্ত বিচক্ষণ মানুষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চায় সঠিক বাস্তবতা পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোন পক্ষ সংখ্যাগুরু, কোন পক্ষে নামী-দামিদের সমর্থন বেশি, তা দেখে নয়। আর সেটাই যে সঠিক পথ, তারই প্রমাণ, সংখ্যাগুরুদের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মতামতও বাতিল হয়েছে আবর্জনার মতই। তেমনটি না হলে আজও আমাদের মেনে নিতে হত, ইসলাম ও এর দাওয়াত হক (সত্য) নয়। অন্ধবিশ্বাসী অন্য সব ধর্মানুসারীদের বস্তুবাদী দাওয়াতই হক হত।
সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে ‘সত্য’ নির্ধারিত হলে আজও যে কত শত সহস্র অন্ধ-বিশ্বাসকে মেনে নিতে হত, তার ইয়ত্তা নেই। সুদীর্ঘ কাল ধরে বহু অন্ধ-বিশাস, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যাগুরু জনগণের সমর্থন পেয়েও বাঁচতে পারেনি। কারণ, অনিবার্য রূপে যুক্তি, সত্য ও সৎ-নিয়্যতের কাছে অন্ধ-বিশ্বাসের পরাজয় ঘটেছে, ঘটছে ও ঘটবে। ধ্বজাধারী গণতন্ত্র-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও অপেক্ষা করে আছে একই অনিবার্য পরিণতি। গণতন্ত্র-বিশ্বাসীরা শুরাতন্ত্র তথা ইসলামের অনিবার্য জয়কে বাহ্যত বাধাগ্রস্ত করতে পারে মাত্র। অন্ধ-বিশ্বাসীরা ইসলামী শুরাতন্ত্রের জয়যাত্রার গতি স্তব্ধ করতে পারেনি কখনো, পারবেও না। ইসলামের প্রথম যুগের বদরের বিজয়, মক্কা বিজয় এর উজ্জল সাক্ষর।
আজ যদি আমরা ছাহাবাদের সেই স্বর্ণযুগের কথা স্বরণ করি তাহলে এই সত্যটুকু মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারবো। যে সাহাবায়ে কেরাম মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রথম সারিতে অবস্থিত, তাঁদের আমল ও সাধনার পরিমাণ তেমন একটা বেশি দেখা যাবে না কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাঁদের সামান্য আমল ও সাধনা অবশিষ্ট উম্মতের বড় বড় আমল ও সাধনার চেয়ে উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠ তো তাঁদের পূর্ণ ঈমান ও পূর্ণ নিষ্ঠার কারণেই ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ: মানুষ যখনই কোন আমল (কাজ) করে, স্বভাবত সে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ঐ কাজের প্রতি ধাবিত হয়। আর আমলের সাথে নিয়্যতের দৃষ্টান্ত হল শরীরের সাথে যেমন আত্মার। আত্মা বা রূহ ছাড়া যেমন শরীর অচল তেমনিভাবে যে কোন কাজের সাথে নিয়্যত থাকবেই। হয়তবা তা হবে বিশুদ্ধ নিয়্যত বা অশুদ্ধ নিয়্যত। এই নিয়্যতের ভিত্তিতেই মানুষ আল্লাহর নিকট তার ফলাফল পাবে। আল্লাহর কাছে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা ছাড়া কোন আমলই কবুল হয় না। এক হাদীছে মহানবী (সা.) বলেন: “অবশ্যই আল্লাহ তাআলা পূত-পবিত্র একটি সত্ত্বা, কাজেই আপন বান্দা থেকে ভালো তথা বিশুদ্ধ জিনিস ছাড়া কোন কিছুই তিনি কবুল করেন না”(মুসলিম শরীফ)। সকল কাজে নিয়্যতকে গুরুত্ব দেয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রতিটি কাজে দেহ ও আত্মার সমন্তয় সাধন করে কাজটিকে সর্বাধিক বাঞ্ছিত মানে উত্তীর্ণ করা। নিয়্যতের মাধ্যমেই আমরা আমাদের দৈনন্দিন ছোট-বড় যাবতীয় কাজকে ইবাদতে পরিণত করতে পারি। এছাড়া সুনির্দিষ্ট ইবাদতগুলোকেও আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে গ্রহণযোগ্য করাতে পারি। কিন্তু এই ইবাদাত শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব হলে আল্লাহ তাআলা তা গ্রহণ করেন না। ইবাদতে দেহ এবং আত্মার শতভাগ উপস্থিতি তথা মনোযোগ থাকতে হবে। একেই ইখলাস বলে। আর শতভাগ ইখলাসের জন্য যথাযথ নিয়্যত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। কাজেই, একজন মুসলমান যা করে তার মূলে থাকে আখেরাতের ভাবনা;পারিপার্শ্বিকতার চাপে আত্মসান্ত্বনার জন্য সে কিছুই করে না। এ জন্যই, একজন মুসলমানের যে গুণটি অবধারিতভাবে থাকতে হয় তা হচ্ছে নিয়্যতের বিশুদ্ধতা অর্থাৎ ইখলাস।
কোন কাজের শুরুতে ইখলাস অবলম্বন একটা কঠিন কাজ। আবার ইখলাসের মাধ্যমে নিয়্যত ঠিক করে নিলেও এর উপর অটল থাকা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। কারণ, নফস এবং প্রবৃত্তি আকাঙ্খার মাঝে ইখলাস এক কঠোর দেয়াল ও বাধা হয়ে নিজেকে উপস্থিত করে। নিজ প্রবৃত্তি, সামাজিক অবস্থা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা মুকাবিলা করে ইখলাসের উপর টিকে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর উপর অটল থাকতে সর্বাত্মক সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। একে হাদীছের ভাষায় সবচে’ বড় জিহাদ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাক্তির অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা অর্জনই হচ্ছে সবচে’ বড় জিহাদ। এ সংগ্রাম শুধু সাধারণ মানুষ করবে তা কিন্তু নয়। বরং; আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, ইসলামী আন্দোলনের কর্মী, দ্বীনের দায়ী ও নেককার-মুত্তাকী-সকলের প্রয়োজন। এ জন্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ সময় এই বলে দুআ করতেন: “হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর আপনার দ্বীনের উপর অটল রাখুন!” (তিরমিজী শরীফ) বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ সূফিয়ান ছাওরী (রাহ.) বলেন: “আমার কাছে নিজের নিয়্যতের বিশুদ্ধতার কাজটা যত কঠিন মনে হয়েছে অন্য কোন কাজ আমার জন্য এত কঠিন ছিল না। কতবার নিয়্যত ঠিক করেছি! কিন্তু কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবার পাল্টে গেছে”। (আল-জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবুছ ছামে: খতীব বাগদাদী)। ইউসূফ ইবনে হুসাইন রাযী বলেন: “দুনিয়ার সবচে’ কঠিন কাজ হল ইখলাসের উপর অটল থাকা। আমি আমার অন্তর থেকে রিয়া (লোক দেখানো ভাবনা) দূর করার জন্য কত যে প্রচেষ্টা চালিয়েছি! সে দূর হয়েছে বটে তবে আবার ভিন্ন রূপে তা হাজির হয়েছে”। (জামে আল উলূম ওয়া আল-হিকাম : ইবনু রজব)। তাই, মন্দকর্মে উৎসাহ প্রদানকারী নফস বান্দার কাছে ইখলাসকে মন্দরূপে উপস্থাপন করে, দৃশ্যমান করে তোলে এমন রূপে, যা সে ঘৃণা করে মনেপ্রাণে। সে দেখায়, ইখলাস অবলম্বনের ফলে তাকে ত্যাগ করতে হবে বিলাসী মনোবৃত্তির দাসত্ব। তোষামোদী স্বভাব ও মেনে নেয়ার দুর্বলতা যা মানুষকে সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ব্যাপক অবদান রাখে, তাও তাকে ছিন্ন করতে হবে আমূলে। সুতরাং, বান্দা যখন তার আমলকে একনিষ্ঠতায় নিবিষ্ট করে, আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কেউ তার কর্মের উদ্দেশ্য হয় না, তখন বাধ্য হয়েই বিশাল একটি শ্রেণীর সাথে তাকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়, তারাও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, একে অপরের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।
রিপু দমন: ইসলাম ধর্মের যাবতীয় বিধি-বিধান একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পালন করতে হয়। পক্ষান্তরে, যদি ইবাদত-বন্দেগী তথা সৎকর্মগুলো পালনে সামান্যতম নাম-যশের নাম-গন্ধও থাকে সেটাই হবে রিয়া বা লোক দেখানো কাজ। বিশুদ্ধ নিয়্যত তথা ইখলাস বিণষ্টকারী প্রধান উপাদান হচ্ছে এই রিয়া। নবী করিম (সা.) রিয়াকে শিরকের সাথে তুলনা দিয়েছেন এবং দাজ্জালের চেয়েও ভয়ংকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো না যাকে আমি দাজ্জালের চেয়ে বেশী ভয় করি? আমরা বললাম, অবশ্যই আপনি আমাদের বলে দেবেন। তিনি বললেন: তা হল গুপ্ত তথা সূক্ষ্ম শিরক, তা এমন যে, কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়ে খুব সুন্দর করে আদায় করল, কিন্তু তার অন্তরে ক্রিয়াশীল ছিল অন্যকে দেখানোর ভাবনা”। (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ: ৪২০৪)। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহ.) বলেন: “মানুষের কর্তব্য হলো, সে আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালন করবে, তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকবে শুধু তাকে সন্তুষ্ট করার নিয়্যতে। এছাড়া যদি সে এর মাধ্যমে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব লাভের নিয়্যত করে, অন্যকে অবমাননা করার সংকল্প করে, তাহলে এটা হবে জাহিলিয়্যাত তথা চরম মূর্খতা। যা আল্লাহর কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সে যদি এ কাজগুলো মানুষকে দেখানো বা প্রচারের উদ্দেশ্যে করে, তবে তার কোন সওয়াব থাকবে না”। (মিনহাজ আস-সুন্নাহ: ইবনু তাইমিয়া)
মানুষের মহৎ জীবন গঠনে আত্মশুদ্ধি ও সংযমের প্রয়োজন অত্যধিক। মানুষের মধ্যে যেমন রয়েছে ভালো দিক,যার প্রতিনিধিত্ব করে বিবেক। তেমনি রয়েছে কাম,ক্রোধ,লোভ,মোহ,মদ-মাৎসর্য্যের মত ষড় রিপুর তাড়না। ষড়রিপুর বশবর্তী হয়ে মানুষ রিয়ার মতো এহেন গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। তবে যারা বিবেকের বলয়ে প্রবৃত্তির এই রিপুগুলোকে দমন করে সঠিক পথে অটল থাকে তারাই রিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে। নিজের প্রবৃত্তি ও রিপুকে দমন করার মধ্য দিয়ে তারা আত্মশুদ্ধি লাভ করেছে। তারাই মহৎ জীবন গড়তে সক্ষম হয়েছে এবং তারাই সত্যিকারের মানুষ। এই প্রবৃত্তির দাস যারা তাদের মধ্যে আত্মিক চেতনার জন্ম লাভ করে না। ফলে তারা আচরণে পশুতে পরিণত হয়। তখন আশরাফুল মাখলুকাত নামের অযোগ্য হয়ে যায় তারা। কেননা, রিপুসমূহ আমাদের ভোগের কর্দমাক্ত পথে চালিত করে। ফলে আত্মা তার মঞ্জিল থেকে দূরে সরে যায়। আত্মা চালিত হয় অন্ধকার পথে। একমাত্র আল্লাহ্‌র নিয়্যতে,আল্লাহ্‌কে রাজি-খুশী করার জন্য যখন আমরা ইবাদত-বন্দেগী করি তখনই শুধুমাত্র আত্মা এইসব পাপের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারে। রিপু সকল হয় অবদমিত,ফলে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ চলা শুরু হয়। আত্মা প্রবেশ করে অন্ধকার থেকে আলোর রাজ্যে। তখনই আত্মার ভিতরে জন্মলাভ করে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। এই সান্নিধ্য লাভ সম্ভব হয় একমাত্র আল্লাহ্‌র দাসত্বের মাধ্যমে। তবে এই দাসত্ব হতে হবে আন্তরিক। শুধুমাত্র লোক দেখানো বা আনুষ্ঠানিক হলে চলবে না।
ষড় রিপুর প্রবল দাপটে আমাদের অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রকম বিশৃঙ্খলা। মানবের সুন্দর জীবন আজ কিছু অত্যাচারীদের হাতে পর্যবসিত। এই সমাজকে, এই পৃথিবীকে সুন্দর ও শান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলতে যা প্রয়োজন তা আমাদের নিয়্যতের পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন ও আন্তরিক নিষ্ঠা। তথ্য প্রযুক্তির চরম উন্নয়নের দোরগোড়ায় এসে আজ আমরা ইসলামের সমুজ্জ্বল বার্তা ভুলে গিয়ে বিভিন্ন মতবাদ ও দল-উপদলে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। এমন কি নৈতিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে বোকার মতো অনেকই ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগানে মেতে উঠেছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্দর ও উত্তম জীবন যাপনের জন্য ইসলামকে মনোনিত করেছেন। আমাদের উচিত কারো উপর নির্ভরতা নয় বরং প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে অটল থেকে ষড়রিপুর দমনের মাধ্যমে সঠিক ইসলামের পথ অবলম্বন করা। সত্য সাধনা তথা মানবতার সাধনায় ব্রতী হওয়া। তবেই সমাজে এবং পৃথিবীতে অনাবিল শান্তি বিরাজ করবে।
হাদীছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা: ১-নিয়্যত অনুযায়ী সকল কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। যে কোন কাজে কর্তা ভাল-মন্দ যা নিয়্যত করবে সে অনুযায়ী সে সওয়াব পাবে।
২-কোন মহৎ বা ভাল কাজ করে যদি কেউ ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ কিছু লাভের নিয়্যত করে, তবে তা সেই ক্ষুদ্র কাজের জন্যই করা হয়েছে বলে আল্লাহর কাছে গণ্য হবে। যেমন হাদীছের শেষে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোন মেয়েক বিবাহ করার জন্য হিজরতের মত মহৎ কাজ করল, তার হিজরত সেই মেয়ের জন্যই ধরা হবে। আল্লাহর জন্য নয়।
৩-মানুষের যাবতীয় কাজ-কর্ম একমাত্র তার নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ সে যেমন নিয়্যত করবে, আল্লাহর কাছে তেমন ফল পাবে। নিয়্যত ভাল হলে অশেষ সওয়াবের ভাগী হবে। আর খারাপ (রিয়া) হলে কঠিন আযাবের সাথী হবে। কথায় আছে “যেমন কর্ম তেমন ফল”। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আমাদের জীবনে এই হাদীছের প্রয়োগ সম্পর্কে এতটাই উদাসীন যে,আমাদের কর্মে তা খুব কমই প্রতিফলিত হয়।

লেখক: অনার্স আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, এম ফিল (গবেষণারত)আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর।

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.