এ বছরের মাঝামাঝি থেকে ‘বলিউডের ফোর্থ খান’ বলে পরিচিত ইরফানের বাংলাদেশের প্রথম সারির পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বাংলা ছবি করা নিয়ে উত্তাল ছিল দুই বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এমনকী হতচকিত ছিল বলিউডও।

মুম্বইয়ের বা হলিউডের তাবড় তাবড় পরিচালকরা যেখানে ইরফানের সঙ্গে মিটিং করার ডেট পান না, সেখানে কীসের মোহে ইরফান ঢাকাতে গিয়ে বাংলা ছবি করছেন — এই প্রশ্ন আরব সাগর তীরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল এপ্রিল মাস থেকে।

এত দিনে বোধ হয় আসল কারণটা সামনে এল। এবং খবরটা এতটাই চাঞ্চল্যকর যে কোনও মতে সেটা আজ সকাল পর্যন্ত চেপে রাখা হয়েছিল দুই বাংলার সংবাদ মাধ্যমে।

হ্যাঁ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবিতে ইরফান খান অভিনয় করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে। গল্পটাও নাকি অনুপ্রাণিত তাঁর জীবন থেকে। যদিও অভিনেতা থেকে পরিচালক কেউই এ ব্যাপারে ‘কনফার্ম’ করছেন না কিছুই।

শ্যুটিংয়ের আগে হুমায়ূন আহমেদের প্রচুর ভিডিয়ো দেখেছিলেন ইরফান। সেগুলো দেখেই হোমওয়ার্ক করেছিলেন।

“হাসি সবসময় যে সুখের প্রকাশ তা নয়, আপনি কতটা দুঃখ লুকোতে পারেন তাও বোঝায়’’

যা শোনা যাচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান ছাড়াও তাঁর কন্যা শীলা আহমেদের চরিত্রে অভিনয় করছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। এবং হিমুর স্রষ্টার প্রথম পক্ষের স্ত্রী গুলতেকিনের ভূমিকায় রয়েছেন রোকেয়া প্রাচী।

অন্য দিকে ডিভোর্সের পর ২০০৫য়ে হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন তাঁর কন্যার সমবয়সী মেহের আফরোজ শাওন-কে। শাওনের চরিত্রে অভিনয় করছেন টালিগ়ঞ্জের পার্নো মিত্র।

কিন্তু কেনই বা এত রাখঢাক ছবিটা নিয়ে? কেনই বা হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান অভিনয় করছেন তা জানা সত্ত্বেও এত দিন সেটা মিডিয়া থেকে লুকিয়ে রাখা হল?

“চট করে কারও প্রেমে পড়ে যাওয়া কাজের কথা না। অতি রূপবতীদের কারও প্রেমে পড়তে নেই। অন্যেরা তাদের প্রেমে পড়বে, তা-ই নিয়ম।”

যা খবর, তার প্রধান কারণ গল্পটা স্পর্শকাতর। হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শীলা আহমেদ এবং শাওন — দু’জনই নাকি ছিলেন ছোটবেলার বন্ধু। নিজের মেয়ের বন্ধুকে হুমায়ূন আহমেদের ‘নিকাহ’ করা নিয়ে সে সময় তোলপাড় হয় গোটা বাংলাদেশ।

এমনকী শোনা যায়, নিউ ইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরেও শাওনের প্রতি যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ছিলেন হুমায়ূনের প্রথম পক্ষের পরিবার। কোনও মতে শ্যুটিংয়ের সময় যাতে ঝামেলা না হয়, সে জন্যই এত রাখঢাক।

পুরো ব্যাপার নিয়ে কী বলছেন পরিচালক মোস্তফা ফারুকী?

‘‘আমি চাইছি দর্শক ছবিটা দেখুক আগে। আমি নিজেও হুমায়ূন আহমেদের বিরাট ফ্যান। ওঁর ‘অরা’তেই বাংলাদেশে আমাদের সবার বড় হওয়া। এটুকুই বলব, আমি একটা পরিবারের গল্প বলছি, কয়েকজন মানুষের ভাললাগা, দুঃখ, ক্ষোভ, হিংসা — এই আবেগগুলো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। সেটা কার জীবন অবলম্বনে, সেটার বিচার ছবি দেখার পরে হলেই বেটার,’’ বলছেন ফারুকী।

অন্য দিকে হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শীলা আহমেদ এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

‘‘আমি বাংলাদেশের মেনস্ট্রিম মিডিয়াতে এ রকম কোনও খবর দেখিনি। আমি সত্যি কিছু জানি না। তবে ফারুকীর ছবিতে যদি লেখা থাকে ‘এটা হুমায়ূন আহমেদের জীবন অবলম্বনে’ তা হলে অবশ্যই ওর আমাদের কাছ থেকে পারমিশন নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ও যদি কয়েকটা ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটা বানায়, সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তবে ফারুকী যে বাবাকে, বাবার লেখাকে অসম্ভব ভালবাসে সেটা আমি জানি। এখন ছবিটা দেখেই যাবলার বলব,’’ বললেন হুমায়ূন-কন্যা শীলা আহমেদ।

“সারা জীবন পাশাপাশি থেকেও এক সময় একজন অন্যজনকে চিনতে পারে না। আবার এমনও হয়, এক পলকের দেখায় একে অন্যকে চিনে ফেলে।”

অন্য দিকে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী, মেহের আফরোজ শাওনও বুধবার সকালে যথেষ্ট আশ্চর্য হলেন কলকাতা থেকে আনন্দplus-এর কাছে খবরটা পেয়ে। তিনিও এর আগে জানতেন না ইরফান খান তাঁর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করছেন।

‘‘আমি আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম এ রকম একটা ছবি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের ওপর। আমার কোনও ধারণাই নেই। পরিচালক কি কোনও দিন হুমায়ূন আহমেদকে মিট করেছিলেন? আমার মনে হয় না। আমি একজনের ওপর ছবি করছি, তার পরিবারের সঙ্গে কথা না-বলে, এটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর।
খুব খারাপ লাগছে,’’ সাফ জবাব হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের।

‘‘মেয়েদের দু’টি জিনিস খুব খারাপ, একটি হচ্ছে সাহস, অন্যটি গোঁয়ারতুমি’’

তবে এত রাখঢাক, এত বিতর্ক — এসব একজনকে একটুও বিচলিত করতে পারেনি।

 ইরফান খান। যা খবর, ছবির শ্যুটিংয়ের আগে হুমায়ূন আহমেদের প্রচুর ভিডিয়ো দেখেছিলেন তিনি। সেগুলো দেখেই হুমায়ূন আহমেদের কথাবার্তা বলার ধরন — এ সব নিয়ে হোমওয়ার্ক করেছিলেন।

প্রসঙ্গত এই ছবিটা একসঙ্গে প্রযোজনা করছে বাংলাদেশের জ্যাজ মাল্টিমিডিয়া, অশোক ধানুকার এসকে মুভিজ এবং ইরফান খান স্বয়ং। ছবির গোটা শ্যুটিংটা হয়েছে  বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকেশনে যেমন গুলশন, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং বনানী।

‘‘কার জীবনের গল্প সেটা সত্যি জানি না। তবে শুধু বাংলা শিখবেন বলে ইরফান পনেরো দিন বাংলা টিউটর রেখেছিলেন মুম্বইতে। ইরফানের ইনভল্ভমেন্টটা অবাক করার মতো,’’ এসকে মুভিজের তরফে বলছিলেন হিমাংশু ধানুকা। অন্য দিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাও ছবিটা নিয়ে অসম্ভব উত্তেজিত।

‘‘আমাদের পরিচালক যখন গল্পটা বলেছিলেন তখন সেটা কার জীবন থেকে ইন্সপায়ার্ড সেটা জানা সম্ভব ছিল না। অভিনেত্রী হিসেবে আমি জানতেও চাইনি।
তবে চরিত্রটা আমাদের কাছে অসম্ভব চ্যালেঞ্জিং ছিল। একজন মানুষ যার মনের ভিতরে ঝড় চলছে কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বুঝতে পারা যাচ্ছে না, এটাই ছিল চরিত্র। আর ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে অভিনয় করাটা আমার জীবনের একটা মেমোরেবল এক্সপেরিয়েন্স,’’ বলেন তিশা।

‘‘অপেক্ষা হল শুধুমাত্র ভালবাসার একটি চিহ্ন। সবাই ভালবাসি বলতে পারে কিন্তু সবাই অপেক্ষা করে সেই ভালবাসা প্রমাণ করতে পারে না’’

অন্য দিকে ছবি নিয়ে ইরফানের প্যাশন দেখে স্তম্ভিত পার্নো মিত্রও।

‘‘ইরফানের সঙ্গে অভিনয় মানে ওয়ার্কশপ অ্যাটেন্ড করা। এই ছবিতেও মীরা নায়ারের ‘নেমসেক’‌য়ের মতো বাঙালি অ্যাকসেন্টে ইংরাজি বলেছে ইরফান। শুধু সেটে ওর অভিনয় দেখাটাই একজন অভিনেতার কাছে বিরাট পাওয়া,’’ বলছেন পার্নো।

এই ছবিতে তো শোনা যাচ্ছে তিনি হুমায়ূনের দ্বিতীয় স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করছেন। সেটা কি পার্নো জানতেন? ‘‘শ্যুটিংয়ের আগে আমি জানতাম না। শ্যুটিংয়ের সময় কানাঘুষো শুনেছিলাম। তবে কারও জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হলেও ফারুকী এটা নিজের মতো করে লিখেছেন, আমার তাই মনে হয়েছে,’’ বলেন পার্নো।

শোনা যাচ্ছে, ‘ডুব’ নিয়ে ইরফান এতটাই উত্তেজিত, নিজেই বিশ্বের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে ছবিটা পাঠানোর জন্য বারবার মিটিং করছেন পরিচালক এবং প্রযোজকদের সঙ্গে।

কিন্তু ছবি রিলিজ হলে কি সাহিত্যিকের পরিবারের তরফ থেকে কোনও রকম ঝামেলা আশা করছেন পরিচালক?

‘‘মনে হয় না কোনও ঝামেলা হবে। ছবিটা একই দিনে বাংলাদেশ, ভারত ও নর্থ আমেরিকায় মুক্তি পাবে। আমি একটা মানবিক গল্প বলেছি, যার বিচার করবেন দর্শক,’’ সাফ জবাব ফারুকীর।

সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান খানের প্রথম বাংলা ছবি নিয়ে বিতর্ক শুরু হল বলে।

গঙ্গা এবং পদ্মা পারে তাঁকে নিয়ে আজও এই আলোড়ন এবং মাতামাতি দেখে হয়তো সেই পরিচিত হাসিটাই হাসতেন লেখক নিজে।

হুমায়ূন আহমেদ।

তাঁর শেষ উপন্যাস কি তাহলে ইরফান খান?

“আলোটুকু তোমায় দিলাম।

ছায়া থাক আমার কাছে।”