হেমন্তের ফ্যাশন

November 18, 2014 4:49 pmComments Off on হেমন্তের ফ্যাশনViews: 9
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
হেমন্তের ফ্যাশন
বালিহাঁসের মতো শীতার্ত নরম কিন্তু তীক্ষ হাওয়ার পালকগুলো লিফলেটের মতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দিয়ে শীত এসে বসে কুয়াশাডোবা শিরিষের আবছায়ায়। চলছে হেমন্ত প্রহর তবু প্রকৃতিতে শীতের আমেজ। বিস্তারিত লিখেছেন রেজা ফারুক
পাতাবাহারের প্রিন্টেড চিবুকে টুপ করে একফোঁটা শিশির পতনের শব্দে রাতের নিঝুম নির্জনতা ক্ষুণ্ন না হলেও একরত্তি সাদা শিশিরের ফোঁটার ঝরে পড়ার কানকোতেই এক লাজুক ঋতুর উচ্ছ্রিতিটা জেগে ওঠে নিবিড়ভাবে। চলছে হেমন্ত প্রহর তবু প্রকৃতিতে শীতের আমেজ। ঋতুচক্রের এক নীরবকাল হলো শীতকাল। ভোরের কুয়াশার ধূসর শাটল ট্রেনে চড়ে হেমন্তের শেষে নিভৃত ইস্টিশনে নেমে যখন শীতের চন্দ্রডোবা সকালের প্লাটফর্মে শীত তার লটবহর নিয়ে চিলতে কাঠের বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বসে ঠিক তখন ঝরঝরে ঝরা কিশোর পাতারা প্রকৃতির পরিবর্তনের সংবাদটা ছড়িয়ে দেয় সমগ্র নিসর্গজুড়ে। আর ঘুরে দাঁড়ায় ফিকে রোদজ্বলা দুপুর। শীতমগ্ন বিকেল আর সন্ধ্যাগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে। হাইপাওয়ারের ঘোলা চশমার কাঁচের মতো।

আবহমান বাংলার মাঠে-প্রান্তরে, গ্রামেগঞ্জে, বনে-অরণ্যে শীতের আবেশটা জেগে ওঠে হেমন্তে-অঘ্রাণের শেষ প্রান্তে এসে। গ্রামীণ জনপদের পাশাপাশি নগর জীবনও পরে এর হাল্কা-টুটাফাটা রেশ। তবে শীত গ্রাম-বাংলায় যত দ্রুত জেঁকে বসে। নাগরিক জীবনে ততটা দ্রুতলয়ে শীত নামে না। গ্রামের নদী, হাওর, দীঘি, বিলজুড়ে সাদা বকের মতো ঝাঁক বেঁধে শীত নামে। বালিহাঁসের মতো শীতার্ত নরম কিন্তু তীক্ষ হাওয়ার পালকগুলো লিফলেটের মতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে দিয়ে শীত এসে বসে কুয়াশাডোবা শিরিষের আবছায়া বিষণ্ন শাখার ব্যালকনিতে পাতা ইজিচেয়ারে। তারপর একটু দম নিয়ে গাঢ় প্রবাহে উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্বে-পশ্চিমে দ্রুতগামী মেলট্রেনে চড়ে শীত সমগ্র বাংলার আপাত অঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রবল দাপটে। শীত আসে খুব মৃদুপায়ে। সাদা ধবধবে খরগোশের মতো চুপ করে প্রকৃতির নির্জন সোফায় বসে থেকে থেকে হেমন্তের শেষ রাত্রির জাহাজে চেপে এসে নামে পৌষজাগা ভোরের বন্দরে।

আর শুরু হয় দৈনন্দিন জীবনের দ্রুত বদলে যাওয়ার আয়োজন। গ্রাম থেকে শহর। মাঠ থেকে গ্রামের চিকন ধুলোর রাস্তা ধরে শীতের কিশোর ধীরপায়ে গ্রামগঞ্জের জনপদ ছাপিয়ে পাথুরে নগরে এসে দাঁড়ায় প্রবল বলিষ্ঠতা নিয়ে। গ্রামের সাধারণ ঘরবাড়ি থেকে শহরের ফ্ল্যাট বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায় শীতের আমেজ। আর এই আমেজের ভিতর দিয়েই পথ চলতে শুরু করে চিরায়ত বাংলার সমগ্র জনপদ। খাবার-দাবার, পোশাক-আশাকসহ চলায়-ফেরায় সবকিছুতেই একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন পরস্ফুুিটিত হয়ে ওঠে। শীতের প্রাক্কালে বাগানে-বাগানে ফুটতে থাকে শীতফুল। হলদে শর্ষে ফুলের মখমলি ছবির মর্মে বেজে ওঠে পাখোয়াজের নিঃসঙ্গ মূর্ছনা আর নদীতে দাঁড়টানা নৌকার মতো গাংচিলগুলো ভেসে যায় রুপালি বরফ ঠাণ্ডা পানির অবসন্ন স্রোতে নিরুদ্দিষ্ট পথে। জীবনযাপনে শীত তুমুল ইমেজ নিয়ে ফোটে। জনজীবনে শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দিন রাতের পুরো রুটিনই পাল্টে যায়। নেপথলিন কিংবা ডিওডোরান্টের গন্ধজাগা লেপ-কম্বল কাঁথার পাশাপাশি স্যুট-ব্লেজার, সুয়েটার, জাম্পার, কার্ডিগান, চাদর, শাল, আলোয়ান, মাফলার, গলাবন্ধ, কানটুপি, ওভারকোট, ফারকোটসহ উষ্ণতাময় গরম কাপড়ের এক বিশাল অবস্থান তৈরি হয়ে শীতকালজুড়ে। অবস্থাপন্ন বা সচ্ছল মানুষের জীবনে শীতের ফিরে ফিরে আসাটা বিশেষ আনন্দের হলেও, ছিন্নমূল কিংবা অভাবি শীত পোশাকহীন মানুষের জীবনে শীতকালীন পুরো সময়টা এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রহর হিসেবে যন্ত্রণা কষ্টের কাল হিসেবে এসে হানা দেয়। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হাউসগুলো ফ্যাশনেবল শীতের পোশাক সাজায় ডিসপ্লেতে। দৈনন্দিন জীবনে শীতের প্রহরগুলো এই বাংলায় একটা ভিন্ন চিত্র নিয়ে উপস্থিত হয় হেমন্তের শেষ প্রহরে এসে।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.