১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ৫০ বছর

October 25, 2015 11:20 pmComments Off on ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ৫০ বছরViews: 51
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
১৯৬৫ সালের - যুদ্ধের ৫০ বছর
মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন

১৯৬৫ সালের কথা। আমি তখন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োজিত ছিলাম। আর বাসা ছিল গ্রীন রোডের স্টাফ কোয়ার্টাসে (সরকারি বাসা)। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। যদিও আমার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ দ্বিতীয় খন্ডে (বাবার আমলের কথা) এ যুুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে। হঠাৎ করে মিডিয়া মারফত জানতে পারলাম, পাকিস্তান এবং ভারত উভয় দেশেই সেপ্টেম্বরে এ যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। তাছাড়াও বিমানবাহিনীর এয়ার কমান্ডার (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী একটি ইংরেজি দৈনিকে ২২ সেপ্টেম্বর এ যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, যা পড়ে আমি এ প্রবন্ধটি লিখতে উৎসাহিত হলাম। তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এ যুদ্ধ আমাদের সামনেই ঘটে গেল। মাত্র ১৭ দিনের যুদ্ধ (৬ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর) উভয় দেশের ক্ষয়ক্ষতি নেহাৎ কম ছিল না। এ যুদ্ধে আমরা সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম, সাইরেনের শব্দে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, যদিও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হয়তো বা জানেই না, এমনকি কোনো দিন শোনেওনি যে ৫০ বছর আগে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের জন্যই আমার এ লেখা, যাতে করে তারা জানতে পারবে, পাকিস্তান ও ভারতের এ শত্রুতা দীর্ঘদিনের এবং এ যুদ্ধ হয়েছিল সেই ৫০ বছর আগে, যখন বর্তমান বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এ যুদ্ধের কারণ ও ফল সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হলো :

এ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল সেই পুরনো শত্রুতা, যার উদ্ভব হয়েছিল কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে। ষাটের দশকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান, আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মানবতাবাদী নেতা লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর দর্শনে বিশ্বাস করতেন এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ কোনো দিনই পছন্দ করতেন না। তিনি অতি সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। কিন্তু রাষ্ট্রের যে পররাষ্ট্রনীতি তা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বলেই ধরে নেয়া হয়। ফলে সরকারপ্রধান ইচ্ছামাফিক যা কিছু করতে পারেন না। তাছাড়া দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধের ঝুঁকি তো নিতেই হয়। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান দুইটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর থেকেই লক্ষ্য করছি, দুই দেশের মধ্যে বৈরী মনোভাব এবং শত্রুতা যেন স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে বসে আছে। এর মূল কারণ কাশ্মীরের দখল নিয়ে রশি টানাটানি, খন্ড খন্ড যুদ্ধ এখানে-সেখানে সবখানে এর কোনো সমাধান দেখছি না। ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ভারত ও পাকিস্তান দুইটি রাষ্ট্রের সীমানা মোটামুটিভাবে ঠিক করে দিলেও কাশ্মীর সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না, সমস্যাটি সেখানেই। কাশ্মীরের তৎকালীন মহারাজা হরি শিংয়ের প্রতি নির্দেশ ছিল কাশ্মীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। তার জন্য তিনটি বিকল্প ছিল, যথা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা স্বাধীন থাকা। তিনি স্বাধীন থাকতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম কাশ্মীরে মুসলিম বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং পাস্তুন উপজাতিরা কাশ্মীরের কিয়দংশ দখল করে নেয়।মহারাজা ভাবলেন তার পক্ষে স্বাধীন কাশ্মীর রক্ষা করা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে ভারতের সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। ভারত সাহায্য দিতে সম্মত হলো; কিন্তু শর্ত ছিল, কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে য্ক্তু হতে হবে। ভারত জম্মু ও কাশ্মীরকে একটি নতুন স্টেট হিসেবে বিবেচনা করল এবং পাকস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ভারত সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, মহারাজা হরি শিংয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতি জনগণের সমর্থন ছিল কিনা, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রশ্ন তুলল ভারতের সেনাবাহিনীকে ডেকে আনার কোনো বৈধ অধিকার নেই কাশ্মীরের মহারাজার, কারণ মহারাজা উত্তরাধিকার সূত্রে এ কাশ্মীরের অধিকার পাননি। তিনি ব্রিটিশের নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কিছুই না। এসব চিন্তাভাবনা করেই পাকিস্তান কাশ্মীরে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ডগলাস গ্রেসি (Douglas Gracey) পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আদেশ অমান্য করে সৈন্য পাঠাতে সম্মত হননি। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সৈন্য পাঠাতে সমর্থ হয়; কিন্তু এরই মধ্যে ভারত কাশ্মীরে দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। শুধু গিলগিট এবং বালতিস্তান গিলগিটের স্কাউটস এবং চিত্রলের সেনাবাহিনীর দ্বারা পাকিস্তানের জন্য সংরক্ষিত হয়।এ অবস্থায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে নানা দেনদরবারের পর ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি, যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে লেখা হলো, পাকিস্তান তার সেনাবাহিনীকে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নেবে, আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ভারতের কিছু সৈন্য কাশ্মীর রাজ্যে অবস্থান করবে। এসব শর্ত পালনের পর কাশ্মীরে গণভোট হবে (Plebiscite)  অর্থাৎ কাশ্মীরের জনগণই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত এ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। এখানে উল্লেখ্য, কাশ্মীর বিতর্ক নিয়ে এ যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২১ অক্টোবর এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয় ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এ সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ১০টি বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে, এতে উভয় দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নেহাৎ কম হয়নি। তাছাড়াও ছোটখাটো আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণ যে কত হয়েছে এর কোনো ইয়ত্তা নেই। যুদ্ধবিরতির সময় কাশ্মীরের উত্তর ও পশ্চিম অংশের কিছু অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) বর্তমানে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে, বাকি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বের বিশাল অংশ (দুই-তৃতীয়াংশ) ভারতের নিয়ন্ত্রণে, যাকে বলা হয় জম্মু ও কাশ্মীর রাষ্ট্র। আর পাকিস্তানের অংশকে বলা হয় আজাদ কাশ্মীর।১৯৪৮ থেকে ১৯৬৫ দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে এ দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ হয়নি বা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হয়নি। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে সীমানা নিয়ে ভারতের যুদ্ধ বেধে যায়। ভারতের উত্তর প্রান্তে ম্যাকমোহন লাইন ভারত এবং চীনের সীমারেখা নির্ধারণ করে। এ যুদ্ধ হয়েছিল শীতকালে, ফলে ভারতীয় বাহিনী ঠান্ডায় কাবু হয়ে যায় এবং এ যুদ্ধে ভারত দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে চীন নিঃশর্তভাবে একতরফা বর্ডার এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান এ সুযোগটি নিতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রথম কচ্ছের রানে সৈন্য পাঠান এবং ওই সংঘর্ষের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে কাশ্মীর জয়ের স্বপ্ন দেখেন এবং মুজাহিদের ছদ্মবেশে কাশ্মীরে পাকিস্তান নিয়মিত সৈন্যবাহিনী পাঠায় এবং সেখান থেকেই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী জম্মুর আখনুর দখলের চেষ্টা করে; কিন্তু ভারতের বিমান বাহিনীর তৎপরতার ফলে তা আর সম্ভব হয়নি। এরপর পাকিস্তান বিমান বাহিনী কাশ্মীর এবং পাঞ্জাবের এয়ার বেসগুলোতে বোমা ফেলতে আরম্ভ করে, ফলে এবার যুদ্ধ কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের বিমান বাহিনী প্রতিশোধ নিতে আরম্ভ করে এবং এ বিমান বাহিনীর সহায়তায় ভারতের সেনাবাহিনী পাঞ্জাব এলাকায় পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করে। এভাবে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের খবরে শোনা গেল, ভারতীয় বাহিনী পাঞ্জাব সেক্টরে পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডে ঢুকে পড়েছে এবং লাহোরের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বীরদর্পে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সমগ্র দেশে (পূর্ব পাকিস্তানসহ) জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে ইত্যাদি।বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ফেরদাউস খান সে দিনই লন্ডনের পথে করাচি যাত্রা করেছিলেন। ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে তিনি লন্ডন বিমানবন্দরে অবতরণ করলে দেখতে পান, বিরাট হরফে লেখা একটি সাইনবোর্ড- যার বিষয়বস্তু ছিল, ‘LAHORE CAPTURED’. তিনি বিস্মিত হলেন। কথা নেই, বার্তা নেই, আজ সকালেই তিনি করাচি থেকে লন্ডন এসেছেন, অথচ হঠাৎ কী হলো যে এক বেলার মধ্যেই লাহোর দখল হয়ে গেল। হোটেলে পৌঁছে, বিবিসির খবর শুনতে লাগলেন মন দিয়ে। না খবর সত্য নয়। তখনও লাহোর দখল হয়নি, তবে লাহোর ফ্রন্টে পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডে ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা প্রবেশ করেছে এবং প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। খবর এ পর্যন্তই। দেশজুড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ বেধে যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, East Bengal Regiment-এর বীর সৈন্যদের বীরোচিত প্রতিরোধ ও Suicidal Squad-এর আত্মাহুতির ফলে ভারতীয় সৈন্য বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।গ্রিন রোড স্টাফ কোয়ার্টার্সের সিঁড়ির সামনে ব্যাফলওয়াল তৈরি করা হয়েছিল। সামনে ছোট মাঠটিতে বাঙ্কার খোঁড়া হলো, যাতে করে বিপদের সময় আমরা আত্মরক্ষা করতে পারি। ট্রেনিং কলেজ এবং অন্যান্য প্রতিটি অফিস ও প্রতিষ্ঠানে খোলা হলো কন্ট্রোলরুম। আমরা সেখানে পালা করে ডিউটি করতাম। সাইরেন বেজে উঠলে হাটবাজারের রাস্তার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেত। তবে আমরা এটাও জানতাম, পূর্বপাকিস্তানে কিছুই হবে না। কেননা এখানে প্রতিরক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। ভারত অহেতুক এ পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করবে কোন দুঃখে। তবুও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলোতে যেমন কুরমিটোলা, লালমনিরহাট, চট্টগ্রামে বোমা ফেলা হয়েছিল। তবে তেজগাঁও বিমানবন্দরে কোনো হামলা হয়নি। তা ছিল অক্ষত অবস্থায়। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ভারত পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ক্ষতি করতে চায়নি। ২৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। ১৭ দিনের যুদ্ধে উভয় দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নেহাৎ কম ছিল না। লাহোর রক্ষা পেলেও শিয়ালকোট সেক্টরে এক বিশাল অঞ্চল ভারতীয় সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছিল। পরে জাতিসংঘ ও বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতি করা হয়। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। এ যুদ্ধেই প্রথম বঙ্গ শার্দুল ‘ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট’ বীরত্বের জন্য খ্যাতি লাভ করে। স্কোয়াড্রন লিডার মাহবুবুল আলম বেশ ক’টি ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস করে দেন। বিমান বাহিনীতে আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উইং কমান্ডার তোয়াব, স্কোয়াড্রন লিডার আলাউদ্দিন আহমদ (শহীদ), ফ্লাইট লে. সাইফুল আজম, ফ্লাইং অফিসার হাসান, স্কোয়াড্রন লিডার এম কে বাশারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যতদূর মনে পড়ে, শহীদ আলাউদ্দিন আহমদ ছিলেন এদেশের প্রখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ডা. টি আহমদের ছেলে, যা সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়েছিল। বিমান বাহিনীর এ বীর যোদ্ধাদের বিভিন্ন সামরিক পদকে ভূষিত করা হয়েছিল। এ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরাই বুকে মাইন এবং গ্রেনেড বেঁধে ভারতীয় ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন এবং অনেক ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে ফেলেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক মাস পর শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারিতে বর্তমান উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে। সেখানে দুই দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বৃহৎশক্তির সদস্যরা। সোভিয়েত রাশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের মধ্যস্থতায় এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে গতানুগতিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল দুই দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ ভূখন্ডে ফেরত যাবেন, উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকবে এবং শান্তিপূর্ণভাবে যুদ্ধবন্দিদের বিনিময় করা হবে। এ যুদ্ধে কোন দেশজয়ী হলো আর কোন দেশ পরাজিত হলো, এ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না, তবে এ যুদ্ধে পাকিস্তান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যেদিন বিকালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো সে রাতেই তাসখন্দ হোটেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী হঠাৎ করেই সম্ভবত ‘স্ট্রোক’ হয়ে দেহত্যাগ করেন, যা ছিল অপ্রত্যাশিত এবং সবার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। চুক্তি স্বাক্ষর করে তিনি হয়তো বা দেশ এবং মানবতার জন্য কিছু ভালো কাজ করলেন; কিন্তু জীবনের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজয় বরণ করলেন।চুক্তির শর্ত যাই থাকুক না কেন, এ যুদ্ধের পরই দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চিড় ধরে। ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ হয়ে যায়, আর্থিক সহযোগিতা লোপ পায়। ফলে দুই দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এককালের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর গোলাম ফারুক এভাবেই বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখতেই হবে, এতে করে দুই দেশই লাভবান হবে। শুধু তাই নয়, এ সংঘর্ষের ফলে রেডিও পাকিস্তান ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ সব ভারতীয় অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। তাসখন্দ চুক্তির পর পাক-ভারত সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও বেতার-টেলিভিশন প্রচারের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব পাকিস্তানের মিডিয়ায় এ অনুষ্ঠানগুলো প্রচারিত হয়নি।এ কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে যে বিতর্ক তার সমাধান কি কোনো দিনই হবে না। সব ধরনের আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিদিনই রক্ত ঝরছে, দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা বেড়েই চলেছে, প্রতিরক্ষা বাজেটে টাকার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে সন্ত্রাসী হামলা। পৃথিবী বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে বিস্ময়করভাবে এগিয়ে চলেছে; কিন্তু আমাদের চিন্তাধারা এবং মন-মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘে ভাষণদানকালে উত্তেজিত হয়ে তার হাতের ফাইলপত্র সব ছিঁড়ে ফেলে জাতিসংঘের সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন এবং সান্ত¡না বাক্য উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমরা কাশ্মীরের জন্য হাজার বছর লড়াই করে যাব।’ সেই হাজার বছর অবশ্য এখনও অনেক দূর। ততদিন এ পৃথিবী থাকলে হয়।রাজনীতির ক্ষেত্রে হিংসা-বিদ্বেষ, জেদাজেদি, প্রতিহিংসা পরিহার করে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোই হবে উত্তম কাজ। বর্তমানে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির মূলমন্ত্রই হওয়া উচিত- পরস্পরের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান, আপস-মীমাংসা, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, ত্যাগের মনোভাব পোষণ করা অর্থাৎ প্রয়োজনে ছাড় দেয়া, আত্মসংযম, প্রতিবেশী দেশ তথা পৃথিবীর সব দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সুসম্পর্ক রাখা, প্রতিবেশী দেশ ক্ষুদ্র হলেও তার সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা, প্রভুসুলভ নয় ইত্যাদি।পাঠক, আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় অনুধাবন করেছি তা হলো- যুদ্ধ ফ্রন্ট কি ঘটছে, কে প্রথম গুলি ছুড়েছে, কার গুলিতে কে মারা গেল, প্রথম আক্রমণ কে করল, ঠেলাঠেলিতে কে প্রথম ধাক্কা দিল, কারা প্রথম বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করল এ বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা এক দুরূহ কাজ। একমাত্র এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে এবং মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। কাজেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের খবরাখবর নিয়ে সব সময় উত্তেজিত হওয়া বা মাতামাতি করা উচিত হবে না। তা নাহলে ‘অশ্বত্থামা হতো’ এই মিথ্যা সমাচারে, কুরুক্ষেত্রে রণে দ্রোণ তেজিলেন দেহ’র মতো অবস্থা হবে।
অধ্যাপক মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন : সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.