৪ দশকের তিস্তা-সংকটঃ সমাধান কতদূর

May 29, 2015 3:38 pmComments Off on ৪ দশকের তিস্তা-সংকটঃ সমাধান কতদূরViews: 18
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube
৪ দশকের -সংকট
সমাধান কতদূর
মেসবাহ উল্লাহ শিমুল । দৈনিক আমাদের সময় ডট কম
সমাধান কতদূরভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিবদমান তিস্তা নদীর পানি চুক্তির বিষয়টি এখন ইতিহাসের অংশ। প্রবহমান পথের মতোই দীর্ঘ এ নদীর ভাগ্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া। ১৯৫২ সালে সে সময়ের একীভূত পাকিস্তান প্রথম এ নদীর পানির হিস্যা নিয়ে দেনদরবার শুরু করে ভারতের সঙ্গে। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে এ দেনদরবারের ভার পায় অ্যাপিল অব ডিসকর্ড হিসেবে। শুরু হয় ভারতের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক এ নদীর পানির হিস্যা আদায়ে বহুমুখী তৎপরতা। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও সমাধান হয়নি এ সংকটের। এদিকে আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে ঘিরে তিস্তাজট নিরসনে ফের তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরেও তিস্তা নিয়ে কোনো সুখবর থাকছে না বলে জানিয়েছে দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তা চুক্তি আটকে আছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে। আগামী ৬ জুন তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকা আসবেন শুধু একটি শর্তে, তা হলো, তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী আছে। তিস্তা এগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতের সিকিমের সোহামো লেক থেকে এ নদীর উৎপত্তি। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৭ সালে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার রেনলি এ নদীর ম্যাপ তৈরি করেন। নদীটি উত্তরাঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত।

১৯৭২ সালে প্রথম বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবহমান নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে গঠিত হয় যৌথ নদী কমিশন। তবে বছরের পর বছর এ কমিশন কেবল ঢাকা-নয়াদিল্লির মাঝে নিষ্ফল লোক দেখানো বৈঠকই করেছে, তাও অনিয়মিত। এরপর ১৯৯০ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবায় ভারত বাঁধ দিলে তিস্তার পানিপ্রবাহ আটকে যায়। অকার্যকর হয়ে পড়ে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা সেচ প্রকল্প। শুকিয়ে যেতে থাকে নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা। এরই মধ্যে মরে গেছে তিস্তার শাখা-প্রশাখাগুলো। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। যদিও ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ফারাক্কার বাঁধের কারণে পানি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। সর্বশেষ ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ব্যাপক তৎপরতা চালান। মনমোহনের ঢাকা সফরকে ঘিরে পরিবর্তন আনা হয় অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে গঠিত যৌথ নদী কমিশনের কিছু নীতিমালায়। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁকে বসায় সে চুক্তির সব আয়োজনই ভেস্তে যায়। বহুল আকাক্সিক্ষত এ চুক্তি সই হবেÑ জনগণকে দেওয়া এমন প্রতিশ্রুতি রাখতে না পেরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার।

ঢাকার সূত্রগুলো বলছে, ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়টি কেবল দুদেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িত। নয়াদিল্লির সঙ্গে কলকাতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ঢাকার পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে এ চুক্তি হওয়া না হওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর। যে কারণে ২০১১ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়নি। ওই চুক্তি বাতিল হওয়ার পরও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে মমতার দল তৃণমূল সমর্থন প্রত্যাহার করে। এদিকে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের কারণে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের বেশ কিছু জেলাতেও বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। সে কারণে সেখানকার স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১১ সাল নাগাদ এর বিরুদ্ধে ১৫০টি মামলা করে।

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দুই দেশের ফর্মুলা ভিন্ন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সে সময় নদীর মোট প্রবাহের ২০ শতাংশ প্রবহমান রেখে উভয় দেশে ৮০ শতাংশ পানি সমান হারে ভাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশকে মাত্র ৫ শতাংশ পানি দিতে রাজি হন। এদিকে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় কোন অঙ্ক নির্ধারণ করেছেন, সে বিষয়টি ঢাকার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ন্যায্যতার ১৬ আনা পূরণ না হলেও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে বলে তারা জানান। সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে দুদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ পানি ভাগাভাগি করে নিতে সম্মত হয়েছে।

এর আগে ১৯৮৩ সালে উভয় দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের চুক্তিতে তিস্তা নদীর পানির ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ ভারতের অধিকারে রেখে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ মূল প্রবাহের জন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে ওই চুক্তিও আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নিয়মাবলি অনুযায়ী ইচ্ছা করলেই উজানের দেশ এ ধরনের নদীর ওপর ভাটির দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছু নির্মাণ করতে পারে না। ভারতের সংবিধানও আন্তর্জাতিক নদীকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। সংবিধানে নদী বলতে ‘আন্তঃরাজ্য নদী’কেই (ওহঃবৎ-ঝঃধঃব জরাবৎং) বুঝিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিস্তাসহ বাংলাদেশের ভেতরে আসা নদীগুলো আন্তর্জাতিক, না আন্তঃরাজ্যকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ নদী, সেই ব্যাপারে ভারতের সংবিধান কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। ভারতের সংবিধানের ক্ষমতা তালিকার ৫৬নং সন্নিবেশকে নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাই রাজ্যের দোহাই দিয়ে দশকের পর দশক তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিমত তাদের। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, রাজ্য সরকার কেবল পানি সরবরাহ, সেচ, খাল খনন, হ্রদ, নালা ও বাঁধ নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং জলশক্তি ব্যবহার-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবে। আইনজ্ঞরা বলেন, ভারতের সংবিধান পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তি স্বাক্ষরের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরই বর্তায়। সেই কারণে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তিস্তার পানিবণ্টনের মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-১৩ মেয়াদের শেষ দিকে এসে তিস্তা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর সরকার সে সময় আইন অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের শরণাপন্ন হওয়ার চিন্তা করে। মিয়ানমারসহ দেশটির সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে সুফল পাওয়ায় সরকার এ নিয়ে যোগাযোগও শুরু করেছিল বলে সূত্রের দাবি। কিন্তু পরে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ঝামেলা বাড়াতে চায়নি।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা নিয়ে এতদিন আশ্বাসের রাজনীতি চললেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে এ বিষয়ে আন্তরিক। এ জন্য তিনি এ চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়কেও রাজি করিয়েছেন। তাই এখনই সুযোগ এ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মরুপ্রবণ উত্তরাঞ্চলকে রক্ষা করা। এছাড়া কৃষি-জীববৈচিত্র্য থেকে শুরু করে অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে এবং ভারত-সৃষ্ট বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজনৈতিক ঐক্য হওয়া জরুরি।

এদিকে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা গতকাল এক প্রতিবেদনে জানায়, মোদির সঙ্গে মমতা বাংলাদেশ সফরে রাজি হয়েছেন ঠিকই, তবে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা এ সফরে হবে নাÑ এমন শর্তে। এ সফর নিয়ে মোদি-মমতা এরই মধ্যে দুবার একান্ত বৈঠকও হয়েছে। একবার সংসদে আর একবার রাজভবনে। দুবারই বাংলাদেশ নিয়ে মমতার সঙ্গে কথা বলেন মোদি। সর্বশেষ রাজভবনের বৈঠকে মমতাকে বিশেষভাবে তার সফরসঙ্গী হওয়ার অনুরোধ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মমতা জানিয়ে দেন, নীতিগতভাবে তিনি বাংলাদেশ যেতে সম্মত। কিন্তু এর কদিন পরই প্রধানমন্ত্রীকে মমতা জানিয়ে দেন, তিনি যেতে পারবেন না। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সাম্প্রতিক কলকাতা সফর। সেখানে রাজনাথ খুব শিগগির তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এরপরই ক্ষুব্ধ মমতা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এই কথা বলছেন, তার মানে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় তিস্তা চুক্তি সই করে ফেলতে পারেন। সুতরাং তার ঢাকা না যাওয়াই শ্রেয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মমতাকে আশ্বাস দেওয়া হয়, ঢাকা সফরে তিস্তা নিয়ে কোনো কথা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর মতামত ছাড়া শুধু বাংলাদেশের কথায় তিনি চুক্তি করবেন না। এদিকে রাজনাথ গতকাল বলেন, এই সফরেই তিস্তা চুক্তি হয়ে যাবেÑ এমন কথা তিনি বলতে চাননি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে এই চুক্তি হতে পারে। সার্বিক অবস্থা বিচারে এটাই প্রতীয়মান যে, নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সফরে অন্যান্য বিষয়ে সুখবর থাকলেও তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো সুখবর পাওয়ার আশা নেই বাংলাদেশের।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.