যেভাবে কবিতা পড়ি: আহমাদ মোস্তফা কামাল

August 13, 2013 2:14 pmComments Off on যেভাবে কবিতা পড়ি: আহমাদ মোস্তফা কামালViews: 290
Print Friendly and PDF
FaceBook YouTube

যেভাবে কবিতা পড়ি

আহমাদ মোস্তফা কামাল

আহমাদ মোস্তফা কামাল

আহমাদ মোস্তফা কামাল

কবিতা পড়ি ছোটবেলা থেকেই। স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের জন্য কবিতা পড়ার ব্যাপারটি ঠিক সহজলভ্য নয়। বই অনেকেই পড়ে, প্রধানত গল্পের বই, আমিও পড়তাম, কিন্তু ওই বয়সে কবিতার পাঠক হওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। তবু আমার কবিতা-পাগল ফুপার কল্যাণে বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমার রবীন্দ্রপ্রেমী ফুপার কারণে সেটি সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল, কণ্ঠটিও ছিল উদাত্ত, পড়তেনও খুব সুন্দর করে। হয়তো এসব কারণেই কবিতার প্রতি আমার মুগ্ধতা জন্মায় এবং তাঁর কাছেই রবীন্দ্রনাথ পড়তে শুরু করি। স্কুলে থাকতেই সঞ্চয়িতার প্রায় পুরোটা পড়ে ফেলেছিলাম। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগই না বুঝে পড়া। এখনো কবিতা পড়ার সেই নেশা কাটেনি, হয়তো বাকি জীবনে কাটবেও না! সত্যি বলতে কী, এখনো যে সব সময় সব কবিতা বুঝতে পারি তা নয়, পড়তে ভালো লাগে বলে পড়ি।

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

কোনো কোনো কবিতা না বুঝেও বারবার পড়ি, অদম্য এক নেশার মতো ফিরে যেতে হয় অবোধ্য কবিতাটির কাছে। এ রকম একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে কবিতা নাকি বোঝার আগেই স্পর্শ করে। প্রথম পাঠের সময় যেকোনো পাঠকের কাছে একটি কবিতা তার সম্পূর্ণতা নিয়ে ধরা না-ও দিতে পারে, কিন্তু এই পাঠ যে ঘোরটি তৈরি করবে মনে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে তার পক্ষে। ফলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে কবিতাটির কাছে, আর বারবার পড়ার পর কবিতাটি হয়তো তার মনে জীবন সম্বন্ধে একটি অনির্বচনীয় বোধ তৈরি করবে। আর এই বোধ তখন এতটাই তীব্র হয়ে উঠবে যে কবিতাটির অপূর্ব নির্মাণ-কৌশলও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে হয়তো।

আমার একাকিত্বের সময়গুলো, বিষণ্নতার সময়গুলো, বিপন্নতার সময়গুলো ভরে ওঠে সুর আর কবিতার আশ্রয়ে। আমি তাই তাদের প্রেমে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি…

নির্মাণ-কৌশল মানে এর ভাষা, ছন্দ, শব্দ ব্যবহার, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির ব্যবহার। আর ‘ভালো’ কবিতার এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে এর নির্মাণ-কলা এমন এক কৌশলে কবিতার সঙ্গে মোলায়েমভাবে মিশে থাকে যে পাঠকের জন্য সেটি কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করে না। পাঠক ভুলেই যায়, এই কবিতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় কবির তীব্র সচেতনতা ছিল, নির্মাণ-কৌশল নিয়ে তাঁকে প্রচুর ভাবতে হয়েছে।

এখনো মাঝেমধ্যে কবিতায় পেয়ে বসে আমাকে, তখন আর কিছু পড়তে ভালো লাগে না। কখনো কখনো কোনো কোনো কবি দখল করে রাখেন সারাটিক্ষণ। পড়ি, পড়তে পড়তে ভাবি, হঠাৎ করে কোনো একটি কবিতা নতুনতর একটি অর্থ নিয়ে ধরা দেয় আমার কাছে, যে অর্থটি এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, কবিতা (এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যম) সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভু ও সার্বভৌম। একবার কবির কলম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লে সেটি যে কী অর্থ নিয়ে ধরা দেবে পাঠকের কাছে, বলা কঠিন। হয়তো সে জন্যই একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হয়।

কথা না বাড়িয়ে বরং কয়েকটি কবিতার কথা বলি, তাতে এত ভূমিকা করার প্রয়োজন ফুরাবে।

(১)
প্রায় দুই যুগ আগে প্রথম পড়েছিলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ ভৈরবী’ কবিতাটি। শক্তি আমার প্রিয় কবিদের একজন। মনটা এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর কবিতা পড়লে কিংবা মন এলোমেলো হয়ে থাকলে তাঁর কবিতা পড়ি। যেমন পড়ি জীবনানন্দকে বা বিনয় মজুমদারকে কিংবা আবুল হাসানকে। ‘আনন্দ ভৈরবী’ ভালো লেগেছিল প্রথম পাঠেই, হয়তো ওটার ভেতরে একটা সুরেলা ব্যাপার আছে, সে জন্যই- যদিও সবটা বুঝিনি তখন। হয়তো এখনো বুঝি না, তবু বারবার কবিতটি পড়ি, আমাকে দখল করে রাখে এর বিষণ্ন পঙক্তিগুলো। এর ভেতরে একটা হারিয়ে ফেলার বেদনা আছে, প্রিয়জন চলে যাওয়ার দুঃখবোধ আছে। পড়ে দেখুন-
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিলো না আষাঢ়-শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ-ভৈরবী।

ছবি ‘এলায়ে’ পড়ে কখন? যখন গুছিয়ে রাখার প্রিয়জন চলে যায়। ঘর থেকে- বা ঘরকে জীবনের প্রতীক ধরে নিলে- জীবন থেকেও। আষাঢ় শেষের বেলাটিও এমন দুঃখময়-বেদনাভারাতুর ছিল না, বিপুল বরষায় পীড়িত হয়েও বাগানে ফুলগুলো ছিল। আর ছিল আনন্দ ভৈরবী। এই শব্দ দুটো নিয়ে ভেবেছি অনেক, জানি না কী বুঝিয়েছিলেন কবি স্বয়ং, কিন্তু আমার মনে হয়েছে- এও এক বেদনারই প্রকাশ। কারণটা বলি। আনন্দ ভৈরবী রাগটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হলো- এ রাগ ক্লান্তি দূর করে, অবসাদ কাটাতে সহায়তা করে। কিন্তু এর অন্য একটা বৈশিষ্ট্যও আছে- খুব বেশি পুনরাবৃত্তিতে এর চরিত্র নষ্ট হয়; ক্লান্তি হরণ করার বদলে এটা বরং আরো অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। দুদণ্ড শান্তিই হয়তো এই রাগের বিশেষ অবদান। ভেবে দেখুন- একসময় আনন্দ ভৈরবী ছিল, ক্লান্তি-অবসাদ কাটানো যেত; কিন্তু এখন সেটাও উপযোগিতা হারিয়েছে- কারণ অতিব্যবহারে এখন অবসাদই বাড়ে। কিংবা পরের লাইনগুলোও তো বর্তমানের হাহাকার আর অতীতের আনন্দেরই প্রকাশ-
আজ সেই মাঠে আসে না রাখাল ছেলে
কাঁদে না মোহনবাঁশিতে বটের মূল
এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে
বিদ্যুৎ-রেখা মেলে।

মানে, আগে রাখাল ছেলের মোহনবাঁশিতে বটের মূল কাঁদতো, এখন নেই। এখনো মেঘের ফাঁকে ‘বিদ্যুৎ-রেখা মেলে’ কিন্তু সে নেই! কী হাহাকার! আমাদের ভেতরেও তো ‘তাকে’ হারিয়ে ফেলার একটা শঙ্কা থাকে, হয়তো সে জন্যই এই হাহাকার এতটা গভীরে প্রোথিত হয়ে যায়! পরের পঙক্তিগুলোও দুঃসময়ের এক জ্বলন্ত ছবি; কিন্তু আমাকে সবচেয়ে ভাবিয়েছে এগুলোই-
সে কি জানিত না যত বড়ো রাজধানী
তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর
সে কি জানিত না আমি তারে যত জানি
আনখ সমুদ্দুর

বহুদিন পর্যন্ত এই পঙক্তিগুলোর অর্থ পুরোপুরি বুঝেই উঠতে পারিনি আমি; হয়তো এখন কিছুটা বুঝতে পারি। ব্যাপারটা এ রকমভাবে ধরা দেয় আমার কাছে- হয়তো আমি মানুষ হিসেবে ততটা বড় নই, ‘তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর’- তা কি সে জানত না? জেনেও কেন চলে যাবে? সে কি এও জানত না- ‘আমি তারে যত জানি/আনখ সমুদ্দুর!’ ‘আনখ সমুদ্দুর’ শব্দ দুটো বড় রহস্যময়। ‘আপাদমস্তক’ শব্দটি বুঝি আমরা- পা থেকে মাথা পর্যন্ত! কিন্তু ‘আনখ সমুদ্দুর?’ নখ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত? আরেকটু পরিষ্কার করে বলি। নখ হলো শরীরের সবচেয়ে বাইরের অংশ, প্রায় অপ্রয়োজনীয় এবং অনুভূতিহীন, আর সমুদ্র হলো শরীরের সবচেয়ে গভীর অংশ- একমাত্র প্রবেশের পরই তার ঐশ্বর্য উপলব্ধি করা যায়। আমি যেমন তার ‘নখ’ (মানে একেবারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ) চিনি, তেমনই চিনি সমুদ্দুরও (মানে, সবচেয়ে গভীরভাবে)।

কিন্তু এত চিনেই বা কী লাভ হলো? শেষ পর্যন্ত তো ওই ছবি ‘এলায়ে’ পড়ার গল্পই! গভীর বেদনাবহ চলে যাওয়ার গল্প। এ কবিতা পড়লে মন এলোমেলো না হয়ে উপায় আছে?

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আরেকটি কবিতা ‘ও চিরপ্রণম্য অগ্নি’ পড়লেও মন কেমন করে ওঠে। এটি তাঁর একুশতম কাব্যগ্রন্থের কবিতা, সম্ভবত প্রায় শেষ বয়সের রচনা। শক্তি আমার প্রিয় কবিদের একজন। তাঁর অনেক কবিতা প্রায় ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে, পড়তে পড়তে। এটি তারই একটি। কবিতাটি, মৃত্যুর পর কবির আকাঙ্ক্ষা ও মিনতি নিয়ে। মৃত্যুর পর না বলে, সৎকারের সময় বলাই ভালো। অর্থাৎ দাহ করার সময় কবি আগুনের কাছে যে মিনতি জানাচ্ছেন তাই নিয়ে এ কবিতা। শুরু হয়েছে এভাবে-
ও চিরপ্রণম্য অগ্নি
আমাকে পোড়াও।
প্রথমে পোড়াও ঐ পা দুটি যা চলৎশক্তিহীন,
তারপর যে-হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই।
এখন বাহুর ফাঁদে ফুলের বরফ,
এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা,
ওদের পুড়িয়ে এসো জীবনের কাছে
দাঁড়াও লহমা, তারপর ধ্বংস করো
সত্য-মিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ।

বোঝাই যাচ্ছে- মৃত্যু হয়েছে কবির, দাহ করার সব আয়োজন শেষ, আর কবি আগুনকে ‘চিরপ্রণম্য’ সম্বোধন করে পোড়াতে বলছেন তাঁর সব কিছু- চলৎশক্তিহীন পা, প্রেম-পরিচ্ছন্নতাহীন হাত, দায়িত্ববিহীন কাঁধ (যে কাঁধে সারা জীবন ধরে আমরা নানা রকম দায়িত্ব বয়ে বেড়াই), তারপর ‘সত্য-মিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ’- সবই।
সবই? না। এর পরের পঙক্তিতেই আছে-

রক্ষা করো দুটি চোখ
হয়তো তাদের
এখনো দেখার কিছু কিছু বাকি আছে।

কী বাকি আছে? পরের পঙক্তিটি পড়ুন-

অশ্রুপাত শেষ হলে নষ্ট করো আঁখি
কার অশ্রুপাত? নিজের? না, বলাই বাহুল্য। তিনি তো মৃত এখন, নিজের অশ্রুপাতের প্রশ্নই নেই। এই অশ্রুপাত স্বজন-প্রিয়জন এমনকি অপ্রিয়জনদেরও! আমরা তো কখনো কখনো নিজের অজান্তেই এমনটি ভাবি- আমি মরে গেলে কে কে কাঁদবে আমার জন্য? কার দুই চোখ ভেসে যাবে জলে? কার চোখের কোণ ভিজে উঠবে শুধু? কে-ই বা অবরুদ্ধ কান্নায় নিজেকে কেবল পুড়িয়েই চলবে? কবিও তেমনটি ভেবেছেন নিশ্চয়ই, আর তাই অশ্রুপাতগুলো দেখে যেতে চান। কিন্তু এও জানেন, এই অশ্রুপাতও একসময় শেষ হবে, তখন- ‘নষ্ট করো আঁখি!’ কী অভূতপূর্ব একটি পঙক্তি!

কবিতার আসল বাঁকটি অবশ্য দেখা যাবে পরের পঙক্তিগুলোতে। নিজের সব কিছুই পোড়াতে বলছেন তিনি ‘চিরপ্রণম্য অগ্নি’কে, কিন্তু একটি জিনিস না পোড়ানোর জন্য মিনতি জানাচ্ছেন-
পুড়িয়ো না ফুলমালা স্তবক সুগন্ধে আলুথালু
প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে।
ফুলমালা স্তবক যা কিছু দেওয়া হয়েছে তার শবদেহে, তা যেন না পোড়ানো হয়! কেন? কারণ- ‘প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে।’ এ কি শুধু ফুলমালা? না তো! ওতে যে ‘সুগন্ধে আলুথালু’ প্রিয়জনের করস্পর্শ লেগে আছে! ওই করস্পর্শ কি পোড়ানো যায়? কী বিপুল আবেগ, কী ভয়াবহ রোমান্টিকতা!
এবং পরের পঙক্তি-
গঙ্গাজলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত, স্বেচ্ছাচারী…
ওকে পুড়িও না, হে অগ্নি, বরং গঙ্গাজলে ওকে ভেসে যেতে দাও- মুক্ত, স্বেচ্ছাচারী। শেষের ডটচিহ্নগুলোও লক্ষ করার মতো। এই ভেসে যাওয়ার মুক্ততা ও স্বেচ্ছাচারিতা যেন অনন্ত হয়, যেন অনন্তকাল ধরে ‘প্রিয় করস্পর্শ’ নিয়ে ওই ফুলমালা ভেসে যেতে পারে…

(২)
আমার খুব প্রিয় একটা কবিতা শহীদ কাদরীর ‘সংগতি’। কবিতাটি বিখ্যাত। আবৃত্তিকারদের কল্যাণে খ্যাতির প্রায় চূড়ায় এর অবস্থান। কবিতার প্রথম চারটি পঙক্তি এ রকম-
বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ

সবই প্রাপ্তি আর আনন্দের সংবাদভাষ্য, তবে দুটো বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ক্রিয়াপদগুলো ভবিষ্যৎ কালের, অর্থাৎ ঘটনাগুলো এখনো ঘটেনি, তবে ঘটবে; দ্বিতীয়ত, দৃশ্যকল্পগুলো ক্রমশ জৈবিক থেকে নান্দনিক সৌন্দর্যের দিকে এগিয়েছে। প্রথম পঙক্তিতে শূকরের কাদা খুঁজে পাওয়ার দৃশ্যটি কারো কারো কাছে প্রীতিকর নাও মনে হতে পারে, অন্তত যারা এমন দৃশ্য দেখেছেন তাদের কাছে। তবু শূকরের কাছে ব্যাপারটা প্রাপ্তির, সে তো কাদা ভালোবাসে। প্রথম দৃশ্য যাদের কাছে প্রীতিকর মনে হয়নি, দ্বিতীয় দৃশ্যটি তাদের কাছেও নিশ্চয়ই সুন্দর বা নিদেনপক্ষে সহনীয় মনে হবে! পুকুরে-ডোবায়-বিলে-খালে-ছোট নদীতে হিজলের ডালে বসে ধ্যানী মাছরাঙার মাছ-অন্বেষণ এবং তা পেয়ে যাওয়া- কী আনন্দময় একটি দৃশ্য, যদি না তার ঠোঁটে গেঁথে থাকা মাছের মৃত্যু-যন্ত্রণা কাউকে কষ্ট দেয়! দুটো দৃশ্যই জৈবিক প্রাপ্তি ও আনন্দের বিবরণ। কিন্তু তৃতীয় পঙ্‌ক্তিটিই দেখুন। কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে সাদা হয়ে যাচ্ছে- এই দৃশ্য কি ব্যাখ্যা করা সম্ভব? বা ঘন জঙ্গলে ময়ূরের আনন্দময় নৃত্যদৃশ্য? বিশুদ্ধ নান্দনিক দৃশ্য এগুলো। মনে হচ্ছে, জগৎজুড়ে চলবে আনন্দ-আয়োজন। কিন্তু পরের দুই পঙক্তিতেই ভেঙে পড়বে এত সব রূপময় বর্ণনার ফলে সৃষ্ট সুখকল্পনাগুলো; কারণ-
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
সবই হবে। প্রেমিক-প্রেমিকাও মিলিত হবে পরস্পরের সঙ্গে, কিন্তু শান্তি পাবে না। কেন পাবে না? এবং খুব জোর দিয়ে বলছেন তিনি- পাবে না, পাবে না, পাবে না… (শেষের ডটগুলোও বুঝিয়ে দেয়, এই ‘পাবে না’ অনন্তকালীন…)। এ কোন ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন কবি, যখন মিলনেও শান্তি মিলবে না? এর পরের পঙক্তিগুলোও প্রথম লাইনগুলোর মতোই আনন্দমুখর দৃশ্যকল্পনা, তবে বিষণ্নতার সম্ভাবনাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না-
একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো,
পুরনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে

‘একাকী পথিক’ শব্দটির মধ্যেই একটা বিষণ্ন ব্যাপার আছে! তার ঘরে ফেরা আনন্দময় হতে পারে যদি ঘরভর্তি মানুষ থাকে, নইলে বিষণ্নতাই থেকে যায়! কিংবা ঘরভর্তি মানুষও কোনো কোনো একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘুচিয়ে দিতে অক্ষম, সেটি আরো বেদনাদায়ক। যা হোক, পরের পঙক্তি দুটো অসাধারণ। শূন্য হাঁড়িতে শাসা ভাত ফুটে উঠবে ‘তারাপুঞ্জের মতো!’ কী অসামান্য উপমা! এমন চিত্রকল্পময় উপমা কবিতাকে যেন মূর্ত করে তোলে, একেবারে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যেন সব কিছু। তার পরের পঙক্তিতে পুরনো গানের ‘বিস্মৃত-কথা’র প্রসঙ্গ, আর পুরনো গান মানেই নস্টালজিয়া, সুন্দর কিছু স্মৃতি, অনেক অনেক ঘটনা…। এবং এত সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আবার সেই দুটো লাইন- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
এরপরের চার পঙক্তি খেয়াল করা যাক-
ব্যারাকে ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ
ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই
গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ
মেয়েলি গানের- তোমরা দুজন একঘরে পাবে ঠাঁই
যুদ্ধের সব উন্মাদনা শেষ হয়ে যাবে, কুচকাওয়াজ থেমে যাবে, সৈন্যরা বিশ্রামে যাবে; ক্ষুধার্ত বাঘ তার প্রিয় খাবার পেয়ে যাবে; অন্য গ্রাম থেকে বয়ে আসা বাতাস সঙ্গে করে নিয়ে আসবে মেয়েলি গানের ‘স্বাদু আওয়াজ’! কী চমৎকার সব ব্যাপার! কিন্তু তারপর আবার- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…

বারবার এই দুটো লাইন ফিরে ফিরে এসে জানিয়ে দিয়ে যায়, যত শুভ ঘটনাই ঘটুক, যত প্রাপ্তিযোগই ঘটুক না কেন, শান্তি পাওয়া যাবে না। কেন যাবে না, সেই ইঙ্গিত দেননি কবি; কিন্তু বোঝা যায়- তিনি এমন এক অস্থির সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেই পঞ্চাশ বছর আগে; যখন হয়তো ‘সব’ থাকবে, কিন্তু শান্তি মিলবে না কিছুতেই। আমরা কি এখন সেই সময়টিই পার করছি না? এত কিছু আছে আমাদের, তবু শান্তি নেই, স্বস্তি নেই!

(৩)
‘এই মাতোয়ালা রাইত’ শিরোনামে আশ্চর্য-অসাধারণ একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান; পুরনো ঢাকার এক বাসিন্দার মুখ দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন জীবনের এক অসামান্য ব্যাখ্যা।

পুরনো ঢাকার মানুষগুলো যখন সাহিত্যে উঠে আসে তখন এমনিতেই খুব বর্ণিল হয়ে ওঠে, বিশেষ করে তাদের ভাষার কারণে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাসে আমরা এমন অনেক বর্ণিল চরিত্রের দেখা পেয়েছি। কিন্তু কবিতায়? আমার জানা মতে, রাহমানের এই কবিতাই এ বিষয়ে একমাত্র উদাহরণ। কবিতাটি শুরু হয় খুব হালকা চালে, এক আপাদমস্তক নেশাখোরের জবানিতে-
হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের
লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খান্কি
মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা
রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন
আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান
আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও

বোঝা যায়, নেশাখোর এই লোকটি নিশিখোরও বটে- ‘রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা’; আর রাতের কী আশ্চর্য বর্ণনা দিচ্ছে সে, দেখুন- ‘কান্দুপট্টির খান্কি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে!’ রাতের শরীরে ‘কান্দুপট্টির খান্কি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান!’ কী অসাধারণ উপমা! কবিতা আরো কিছুদূর এগোয় হালকা চালেই-
আবে, কোন্ মাম্দির পো সামনে খাড়ায়? যা কিনার,
দেহস্ না হপায় রাস্তায় আমি নামছি, লৌড় দে;
না অইলে হোগায় লাথ্থি খাবি, চটকানা গালে।
গতরের বিটায় চেরাগ জ্বলতাছি বেশুমার।

মনে হচ্ছে, যেন এক রাজা সে, এই রাতের শহরে। কেউ সামনে দাঁড়ালে ‘হোগায় লাথ্থি’ খাবে, অথবা ‘চটকানা গালে।’ কিন্তু এখানেই থামছে না সে, নিজের পরিচয় দিচ্ছে এভাবে-
আমারে হগলে কয় মইফার পোলা, জুম্মনের
বাপ, হস্না বানুর খসম, কয় সুবরাতি মিস্ত্রি।
বেহায়া গলির চাম্পা চুমাচাট্টি দিয়া কয়, ‘তুমি
ব্যাপারী মনের মানু আমার, দিলের হকদার।’

অর্থাৎ, আমাদের যা যা পরিচয় হতে পারে তার সবই ধরা হলো এই পঙ্‌ক্তিগুচ্ছে- কারো সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী, কারো প্রেমিক। এমনকি পেশাগত পরিচয়েও তো পরিচিত হই আমরা! কিন্তু এগুলো কি সত্যিকার অর্থেই আমাদের ‘পরিচয়’ তুলে ধরতে পারে? পারে না। আর তাই কবিতাটিও এতক্ষণের হালকা চাল ছেড়ে এবার প্রবেশ করে এক গভীর দার্শনিক জগতে-
আমার গলায় কার গীত হুনি ঠাণ্ডা আঁসুভরা?
আসলে কেউগা আমি? কোন্হানতে আইছি হালায়
দাগাবাজ দুনিয়ায়? কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ?
চুড়িহাট্টা, চানখাঁরপুল, চকবাজার, আশক
জমাদার লেইন, বংশাল; যেহানেই মকানের
ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল
মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ,
যেমুন আধলি একখান খুব দূর জামানার।

নিজের গলায়ই সে যেন অন্য কারো ‘গীত’ শোনে ‘ঠাণ্ডা’ অশ্রুভরা! এবং প্রশ্ন করে- কে আমি, কোত্থেকে এসেছি এই ‘দাগাবাজ দুনিয়ায়?’ শেষ পর্যন্ত কোথায়ই বা যাব? যেখানেই যাক, সে তো সে-ই একই মানুষ- ‘গোলগাল মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ!’ এবং নিজেকে তার মনে হচ্ছে- খুব দূর অতীতের ‘আধলি একখান!’ মানুষের অস্তিত্ব-অনুসন্ধানের জন্য প্রাচীন সব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে একই তালে কবিতা এগোয়, এবং আমাদের উপস্থিত করে আরো গভীর-গভীরতর প্রশ্নের মুখোমুখি-
আমার হাতের তালু জবর বেগানা লাগে আর
আমার কইলজাখান, মনে অয়, আরেক মানুর
গতরের বিতরে ফাল পাড়ে; একটুকু চৈন নাই
মনে, দিল জিঞ্জিরার জংলা, বিরান দালান। জানে
হায়বৎ জহরিলা কেঁকড়ার মতন হাঁটা-ফিরা
করে আর রাইতে এমুনবি অয় নিজেরেও বড়
ডর লাগে, মনে অয় যেমুন আমিবি জমিনের
তলা থন উইঠা আইছি বহুত জমানা বাদ।

নিজেকেই নিজের কাছে অচেনা লাগে, এমনকি নিজের হাতের তালুও ‘বেগানা’ লাগে, নিজের ‘কইলজাখান’ যেন অন্য কারোর, নিজের শরীরে এসে ‘ফাল পাড়ে!’ আর রাতে নিজেকেও বড় ‘ডর লাগে’, মনে হয় মাটির ভেতর থেকে সে উঠে এসেছে বহুকাল পর! কবিতা থামে না, এবার তার চোখে পড়ে এক শবযাত্রা। পুরনো ঢাকার স্বভাবজাত কৌতুকপূর্ণ ভাষায় তার বর্ণনাও দেয় সে, আর মনে হয়- ‘আজরাইল আইলে’ তাঁকেও অন্ধকার কবরে ‘হান্দাতে’ হবে! এবং মনে হয় এও যে মৃত্যু এক নিত্য সহচরের মতোই সত্য আর কাছের-
এ-কার মৈয়ত যায় আন্ধার রাইতে? কোন ব্যাটা
বিবি-বাচ্চা ফালাইয়া বেহুদা চিত্তর অইয়া আছে
একলা কাঠের খাটে বেফিকির, নোওয়াব যেমুন?
বুঝছোনি হউরের পো, এলা আজরাইল আইলে
আমিবি হান্দামু হ্যাষে আন্ধার কব্বরে। তয় মিয়া
আমার জেবের বিতরের লোটের মতোই হাচা মৌত।

কিন্তু মৃত্যু তো আসলে আমাদের জীবনের পক্ষেই দাঁড় করিয়ে দেয়! আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকা কী সুন্দর, কী অসাধারণ! সেও এবার তা-ই ভাবছে, এবং বেঁচে থাকার গৌরবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে! –
এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে
গোলাব ফুলের বাস, মাঠার মতন চান্নি দিলে
নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ
মাইয়া, গহিন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর
আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ, ঝুম
কাওয়ালীর তান, পৈখ সুনসান বানায় ইয়াদ।
এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া
মৌততক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই।

হ্যাঁ, বেঁচে আছি বলেই তো এখনো ফুলের সুবাস নাকে আসে, চাঁদনি রাত ‘দিলে ঝিলিক মারে’, আর জীবনের নানা আয়োজনের মধ্যে ফিরে ফিরে যাই- নারী, সুর ও সুরার কাছে! আর তাই- ‘মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া মৌততক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই!’ কী অসাধারণ পঙক্তি! কিন্তু এখানে এসেও কবিতাটি থামে না। আত্ম-অনুসন্ধানের পরিক্রমা শেষে কোনো প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাকমতো না পেয়েও যখন সে জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়, বেঁচে থাকার আনন্দে মুখর হয়, তখন আবার ফিরে আসে সেই ভাবনা! অস্তিত্বের অর্থ কী?-
তামাম দালানকোঠা, রাস্তার কিনার, মসজিদের
মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের
পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির-
হগলই খোওয়াব লাগে আর এই বান্দাবি খোওয়াব!

সবই স্বপ্ন তাহলে? এমনকি এই আমিও? আমার অস্তিত্বও? খুব ধাঁধায় ফেলে দেয় ও শেষ পঙক্তি। আমার অস্তিত্ব কি তাহলে অন্য কারো স্বপ্নের ভেতরে প্রোথিত? তার স্বপ্নটি ভেঙে গেলে আমার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে? জীবন-জগৎ-অস্তিত্ব সবই যেন এক বিপুল রহস্যময়তার চাদরে ঢাকা পড়ে, প্রশ্ন জাগে একের পর এক- উত্তর মেলে না।

(৪)
কবিতার কথা লিখব আর জীবনানন্দের কথা লিখব না, তাই কি হয়? তাঁর একেকটা কবিতা আমি ঠিক কতবার করে পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু প্রতিবারই তারা নতুন নতুন রহস্য নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছে, পড়া শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে- সবটুকু ঠিক বুঝে ওঠা গেল না! তাঁর সব কবিতাই কম-বেশি রহস্যময়। এমন পাঠক হয়তো খুব কমই পাওয়া যাবে যিনি প্রথম পাঠেই তাঁর কোনো একটি কবিতা সম্পূর্ণ বুঝে ফেলেছেন! কিন্তু পুরোটা না বুঝলেও ওই পাঠকের জন্য বা স্বয়ং কবির জন্য তা বিপত্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। কারণ এমন এক রহস্যময় সৌন্দর্য আর উজ্জ্বল হীরকখণ্ডের মতো এমন কিছু পঙক্তি থাকে তাঁর কবিতায় যে বারবার ফিরে আসতে হয়, ফিরে ফিরে পড়তে ইচ্ছে হয়! আর এভাবেই একসময় একটি কবিতা হয়তো পাঠকদের বেশ খানিকটা বোধগম্যতার মধ্যে প্রবেশ করে। কবিতা পাঠের অনুভূতিটি অনির্বচনীয়- এমনকি সেই কবিতা না বোঝা গেলেও- তার কোনো নাম নেই, কোনো নামেই সেই অনুভূতিকে ডাকা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা পড়ে সে রকম এক নাম না-জানা অনুভূতি সৃষ্টি হয় আমার।

তাঁর ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতাটি পড়ে নেওয়া করা যাক। এটি শুরু হয়েছে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে-
শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে- ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হলো তার সাধ।

মনে হচ্ছে কবি এখানে নিজেকে আড়াল করে যেকোনো একজন ব্যক্তির গল্প বলছেন। গল্পকাররা যেমন করে নিজেকে আড়ালে এবং সর্বজ্ঞ অবস্থানে রেখে চরিত্র সম্বন্ধে কথা বলে যান, অনেকটা সে রকম। এমনকি চরিত্রগুলোর মনের কথাও তিনি জেনে বসে থাকেন, কিন্তু যেহেতু তিনি প্রকাশ্য হন না কখনো, তাই পাঠকরা লেখকের উপস্থিতি বুঝতে পারেন না। কখনো মনে এই প্রশ্ন জাগে না যে এই গল্প আসলে কে বলছেন! বা যিনিই বলুন না কেন, তিনি গল্পের পাত্রপাত্রীর মনের কথা পর্যন্ত কিভাবে জেনে ফেললেন! এর পরের পঙক্তিগুলো খেয়াল করুন, এবার লোকটির পরিচয় দেওয়া হচ্ছে-
বধূ শুয়ে ছিল পাশে- শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল, আশা ছিল- জ্যোৎস্নায়,- তবু সে দেখিল
কোনো ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল- লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।

অর্থাৎ লোকটি সংসারী মানুষ। বধূ এবং শিশু আছে। এবং তারা পাশেই আছে। প্রেম আছে, আশাও আছে। কিন্তু এর পরের পঙক্তিগুলো এই ইঙ্গিত দেয় যে এই সংসারী মানুষটির জীবনে কোথাও কোনো একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে, তাই, ‘হয়নি ঘুম বহুকাল।’ এই ঘুম চেয়েছিল কি না তা নিয়ে সংশয়পূর্ণ ভাষ্যও দেওয়া হচ্ছে-
এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনো দিন জাগিবে না আর।
এরপর জীবনানন্দ একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ঊর্ধ্বকমার (‘ ‘) মধ্যে কতগুলো কথা বলে জানালেন, এই কথাগুলো তাঁকে বলেছিল- ‘উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে।’
‘কোনো দিন জাগিবে না আর/জানিবার গাঢ় বেদনার/অবিরাম- অবিরাম ভার/সহিবে না আর- ‘/এই কথা বলেছিল তারে/চাঁদ ডুবে চলে গেলে- অদ্ভুত আঁধারে/যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।
এ রকম একজন সুখী-সংসারী মানুষের কাছে যখন ‘উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে’ এভাবে আর কোনো দিন না জাগার লোভ দেখায়, আর সে সেই কথায় সাড়া দিয়ে চলে যায়- বোঝা যায়, প্রশ্নবোধক চিহ্নটি সত্যিই ছিল। আর তা ছাড়া, সেটি না থাকলে ‘গাঢ় বেদনার’ কথা আসবেই বা কেন? এরপর তিনি আরেকটি অভূতপূর্ব কাণ্ড করলেন। আমাদের চারপাশের নিসর্গের তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণিকুলের জীবন-তৃষ্ণা আঁকলেন এক অসামান্য ভঙ্গিতে। এই পঙক্তিগুলো-
তবুও তো পেঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের ইশারায়- অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।
টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।
রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি।
ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন- যেন কোনো বিকীর্ণ জীবন
অধিকার করে আছে ইহাদের মন;
দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িংয়ের ঘন শিহরণ
মরণের সাথে লড়িয়াছে;
গলিত স্থবির ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িং : এসবই যেন বেঁচে থাকার জন্য এক প্রাণপণ লড়াইয়ে নেমেছে। এ সব কিছু কি সে দেখেনি? এর উত্তর মিলবে পরের কয়েকটি পঙক্তিতে-
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা- একা;
যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে।
হ্যাঁ, দেখেছে বটে, সবই দেখেছে সে। কিন্তু তার জীবনটি যে মানুষের; ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িংয়ের নয়! আর তাই তিনি উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ পঙক্তি- ‘যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো- এই পঙক্তিগুলোর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে লোকটির কাছ থেকে বিযুক্ত রেখেছেন, আড়ালে রেখেছেন, দূরে থেকে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু এইখানটায় এসে তিনি সরাসরি লোকটিকে সম্বোধন করছেন এবং আমরা দেখব, এই সম্বোধন চলতে থাকবে এর পরও।
লোকটি যে গেল দড়ি হাতে, তাতে কেউ কি কোনো প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেনি? তিনি আবারও প্রকৃতির অনুষঙ্গ টেনে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করছেন-
অশ্বত্থের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে
বলেনি কি : ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার!-
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!’
জানায়নি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?
এবং জানাচ্ছেন- জীবনের এই স্বাদ অসহ্য বোধ হলো তার, প্রশ্ন করছেন- এত যে অসহ্য বোধ হলো, মর্গে গিয়ে কি জুড়োলো হৃদয়?
জীবনের এই স্বাদ- সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের-
তোমার অসহ্য বোধ হলো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো
মর্গে- গুমোটে
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

কী হয়েছিল লোকটির? কেন সে মরতে গেল? জীবনের কোথায় ফাঁক ছিল তার? প্রশ্নবোধক চিহ্নটাই বা কোথায়? তার এই আত্মহত্যার কারণই বা কী? দাম্পত্য সম্পর্ক, অভাব, দারিদ্র্য, পরাজয়, গ্লানি? এই বিষয়গুলো জানাতেই তিনি এবার কথা বলছেন সরাসরি পাঠকের সঙ্গে-
শোনো/তবু এ মৃতের গল্প;- কোনো/নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;/বিবাহিত জীবনের সাধ/কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,/সময়ের ঊর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ/মধু- আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;/হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে/এ জীবন কোনো দিন কেঁপে ওঠে নাই;
না, কোথাও কোনো ব্যর্থতা নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো- তিনি এই ব্যর্থতাহীনতার কথা বলে একই টানে বলে যাচ্ছেন আরেকটি কথাও-
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।

এর মানে কী? নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়নি, বিবাহিত জীবনের সাধ পূরণ করেছে কোনো খাদ না রেখেই, বধূ মধু ও মনন দুই-ই জানতে দিয়েছে (অর্থাৎ বউ শুধু শরীরের সঙ্গীই হয়নি, মননেরও হয়েছে!), কোনো দিন ক্ষুধার কষ্ট পায়নি- ‘তাই’ তাকে মরতে হলো! তার মানে কি এই যে এত এত সাফল্য না থাকলে তাকে মরতে হতো না? তার মানে কি এই যে জীবনে কিছু কিছু ব্যর্থতা থাকা ভালো? বিষয়টির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তিনি এভাবে- জানি- তবু জানি/নারীর হৃদয়- প্রেম-শিশু-গৃহ- নয় সবখানি;/অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়- /আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে;/ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;/লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই;/তাই/লাশকাটা ঘরে/চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।

অর্থাৎ জীবন-বর্ণনার জন্য আমরা সচরাচর যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলি; আমাদের ক্লান্তি, আমাদের পরাজয়, আমাদের হতাশা, আমাদের দুঃখ ও বেদনা, আমাদের হাহাকার, আমাদের প্রেম-আশা-সুখ ও সাফল্য ইত্যাদি- এ সব কিছুর বাইরে খুব গোপনে-গভীরে এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ থাকে। কী সেই বিস্ময়? সে সম্বন্ধে পরিষ্কার করে কিছুই বলেননি কবি। পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন সেই বিস্ময় খুঁজে দেখার ভার। হয়তো সেই বিস্ময় আমাদের অস্তিত্ব-সংক্রান্ত প্রশ্নাবলি থেকে উদ্ভূত। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, এই পৃথিবীতে আমার ভূমিকা কী, আমার অস্তিত্বের অর্থ কী, আমি না থাকলে কী হতো, আমার অস্তিত্বহীনতায় এই পৃথিবীর আদৌ কিছু যেত-আসত কি না, আমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীকে এমন কী তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, এই জীবন শেষে আমি কোথায় যাব, জীবন মানে কি মাত্র এই কয়েক দিনের খেলা, যা দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়, মৃত্যুই যদি একমাত্র অনিবার্য সত্য হয়, তাহলে এই জীবনের এত এত সব কর্মকাণ্ডের অর্থ কী, যেহেতু মৃত্যুর পর আর কিছুই থাকবে না- এ রকম প্রশ্নের তো শেষ নেই এবং প্রশ্নগুলোর উত্তরও নেই। প্রশ্নগুলো তাই কোনো সমাধান না দিয়ে বরং এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ জন্ম দেয় মনে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো- কবি এখানেই থামেননি। লোকটির আত্মহত্যা, তার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখে এবং ‘বিপন্ন বিস্ময়ের’ মতো একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে পাঠককে ছেড়ে দিয়ে তিনি এবার নিজের কথা বলছেন-
তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,
চোখ পালটায়ে কয় : ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে?
চমৎকার!
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’-
হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব- বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব
কালীদহে বেনো জলে পার;
আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার
অর্থাৎ ওই লোকের যা হয়েছে, তা তো হয়েছেই, আমার জীবন তাতে থেমে থাকবে কেন, আমি বরং ‘চেয়ে দেখি’…। এবং ওই সব সত্য জানার পর তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, জীবনের ‘প্রচুর ভাঁড়ার’ শূন্য না করা পর্যন্ত তিনি যাচ্ছেন না! থেকে যাবেন এখানেই, এই বিপন্ন বিস্ময়মাখা জীবন নিয়ে এই আলোছায়াময় পৃথিবীতেই। আর এখানটাতে এসে কবিতাটি খুব জীবনবাদী হয়ে ওঠে।

অনেক কবিতা পড়েছি- মৃত্যু আর জীবনের এমন অসামান্য মূল্যায়ন আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
এসব কবিতা পড়ি আর আমার বুকের ভেতর যেন একেকটি হিরণ্ময় প্রদীপ জ্বলে ওঠে। আমার একাকিত্বের সময়গুলো, বিষণ্নতার সময়গুলো, বিপন্নতার সময়গুলো ভরে ওঠে সুর আর কবিতার আশ্রয়ে। আমি তাই তাদের প্রেমে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি…
সূত্রঃ কালের কন্ঠ ঈদ সংখ্যা ২০১৩

সর্বশেষ সংবাদ

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.