Home শিল্প ও সাহিত্য

শিল্প ও সাহিত্য

ইতিহাসে বিখ্যাত ১৫ জন মুসলিম নারী

ইতিহাসে বিখ্যাত ১৫ জন মুসলিম নারী

[caption id="attachment_24429" align="aligncenter" width="1024"] Photo credit: DMahendra on VisualHunt.com / CC BY-NC-SA[/caption] আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ইতিহাসের বিখ্যাত কিছু মুসলিম নারীর সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেয়াটা চিত্তাকর্ষক একটা ব্যাপার হবে যাদের সম্পর্কে হয়তো আগে তারা কিছুই জানতেন না। যদিও এম্প্রেস থিওডোরা, এলিয়ানোর অফ এ্যাকুইটাইন, জোয়ান অফ আর্ক, এ্যান বলেইন, ক্যাটারিনা স্ফরযা এবং এলিজাবেথ এর মত এক্সট্রাঅর্ডিনারী মহিলারা ইতিহাসের কাছে সুপরিচিত, কিন্তু মধ্যযুগের এবং প্রাথমিক ইসলামী যুগের এদের সমগোত্রীয় কিছু মহিয়সী নারীরা অতটা সুপরিচিত নন ইতিহাসের কাছে। প্রি মডার্ন যুগের কিছু কিছু মুসলিম নারী বিদূষী গবেষক,কবি,সুফিবাদী,শাসক এবং যোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিচে তার একটা সংক্ষিপ্ত লিস্ট দেয়া হলো। ১) খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (মৃত্যুঃ ৬২০ খ্রিষ্টাব্দ)-নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে তাঁর বিখ্যাত বিয়ের আগেও তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং অভিজাত নারী হিসেবে মক্কায় সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ইসলামের নতুন বানীর প্রচার ও প্রসারের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং প্রথম মুসলিম হবার বিশেষত্ব লাভ করেন। এটাও বিশ্বাস করা হয় যে, রাসূল (সঃ) নিজেই বলেছেন [সহীহ মুসলিমের সনদে বর্ণিত], "আল্লাহ আমাকে খাদীজার চেয়ে উত্তম কোন কিছু দেননি। সে আমাকে তখন গ্রহণ করেছে, যখন সকল লোকেরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছি;যখন সবাই আমার আহবানে সন্দেহ পোষন করেছিল, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল;সে তখন আমাকে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে, যখন অন্যান্যরা আমাকে বঞ্চিত করেছে;এবং আল্লাহ শুধুমাত্র তাঁর দ্বারাই আমাকে সন্তান দিয়েছেন।"আসলেই রাসূল(সঃ) এর কন্যা ফাতিমা খাদীজার ও কণ্যা এবং তাঁর মাধ্যমেই (বিশেষভাবে তাঁর দুই পুত্র হাসান এবং হুসাইন) রাসূল (সঃ) এর বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে। এই কারনগুলাই ফাতিমা এবং তাঁর মা খাদীজা কে ইসলামে সবচেয়ে সম্মানিত দুইজন নারী ব্যাক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছে। ২)নুসাইবা বিনতে কা'ব আল আনসারিয়্যা (মৃত্যুঃ ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)- তিনি উম্মে আম্মারা নামেও পরিচিত।তিনি বনু নাজ্জার গোত্রের একজন সদস্য ছিলেন এবং মদীনার প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন । রাসূল (সঃ) এর একজন সাহাবী হিসেবে তাঁর অনেক গুণাবলী ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁকে মূলত স্মরণ করা হয় উহুদ যুদ্ধে (৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর অংশগ্রহনের কারনে,যেখানে তিনি ঢাল ও তরবারী নিয়ে কার্যতই মক্কাবাসী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।তিনি রাসূল (সঃ)কে রক্ষার জন্য নিজের শরীরকে ঢাল হিসেবে বেশ কয়েকবার শত্রুপক্ষের বর্ষা ও তীরের সামনে পেতে দেন।এটা কথিত আছে যে, তিনি ১২তম আঘাতের পরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান এবং যখন জ্ঞান ফিরে আসে (একদিন পরে মদীনায়), তখন জিজ্ঞেস করেন যে,"নবী(সঃ) কি বেঁচে আছেন?" ৩) খাওলা বিনতে আল -আযওয়ার (মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৩৯)- তিনি ও নবী করিম (সঃ) এর সময়কালীন একজন নারী। তিনি ইতিহাসে বহুল পরিচিত ইয়ারমুকের যুদ্ধে (৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে) তাঁর অংশগ্রহনের কারনে। এই যুদ্ধটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।ইসলাম বিজয়ী হবার যুগের ন্যারেটিভ অনুযায়ী, তাঁর যুদ্ধের দক্ষতা বিখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এর সমপর্যায়ের।তাঁর ব্যাপারে অনেক অতিরঞ্জিত অলঙ্কৃত এবং অস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়, যা কিনা পুরা বর্ণনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং কিছু কিছু স্কলার এর মতে তাঁর অস্তিত্বে থাকার ব্যাপারটি ই নাকি সন্দেহে নিপতিত!এত কিছুর পর ও অষ্টম ও নবম শতকের স্কলার যেমন আল -ওয়াকিদী এবং আল -আযদী তাদের লেখায় ও ঐসব যুদ্ধ বিজয়ের ইতিহাসে একজন নারী যোদ্ধার অসাধারন রণনৈপুন্যের কথা বর্ণনা করেন। যদি আসলেই তিনি অস্তিত্বে না থাকতেন, তাহলে তো তাঁর চরিত্রটি আরো বেশি লিজেন্ডারী ও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে! ৪) আয়েশা বিনতে আবু বকর (মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৭৮)- তাঁর পরিচিতির জন্য আর কোন ভূমিকার প্রয়োজন নাই।আয়েশা ছিলেন রাসূল(সঃ)এর স্ত্রী এবং নবী(সঃ) এর মৃত্যুর পরে মুসলিম উম্মাহর উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব নারী হিসেবে তিনিই রেখেছিলেন। তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ খলীফা উসমান বিন আফফান এবং আলী ইবনে আবী তালিব এর রাজনৈতিক বিরোধিতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিলেন, এমনকি আলী ইবনে আবু তালিবের বিরুদ্ধে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পর্যন্ত দিয়েছিলেন। যদিও তিনি এই যুদ্ধে পরাজয়ের পরেই রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।কিন্তু তিনি ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা অব্যাহত রাখেন।সুন্নি ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি অন্যতম প্রধান একজন হাদীস এর রাবী (যারা হাদীস বর্ননা করেন)।অনেক দিক থেকেই তিনি সবচেয়ে বিতর্কিত নারী চরিত্র ও বটে, বিশেষত তাঁর ইসলামী জ্ঞান গবেষনা, রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরবর্তী সময়ের "ইসলামে নারীর ভূমিকা" বিষয়ের কনজার্ভেটিভ ন্যারেটিভ এর সাথে সাংঘর্ষিক।আয়িশা এর জীবনী সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন, ডেনিস স্পিলবার্গ এর রচিত চমৎকার বই, পলিটিকস, জেন্ডার এন্ড দি ইসলামিক পাস্টঃ দ্যা লিগ্যাসী অফ আয়িশাহ বিনতে আবু বকর (১৯৯৬)। ৫)যয়নাব বিনতে আলী (মৃত্যুঃ ৬৮১ খ্রিষ্টাব্দ)- তিনি নবী মুহাম্মাদ(সঃ)এর নাতনী এবং ফাতিমা(মৃত্যুঃ খ্রিষ্টাব্দ ৬৩৩)এবং তার স্বামী আলী ইবনে আবি তালিব (মৃত্যুঃ ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)এর কণ্যা।তিনি আহলুল বায়তের মধ্যে সবচ্বেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত এবং তিনি কারবালা ম্যাসাকার (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ)এর সময়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। কারবালা ম্যাসাকারে হুসাইন ইবনে আলী এবং তাঁর ৭২ জন ভাতিজা ও অন্য ভাইয়েরা নিহত হন উমাইয়্যা শাসক এর সেনাপতির হাতে।একটা সময় তিনিই ছিলেন আহলুল বায়তের কার্যকরী নেতৃত্বের অবস্থানে এবং তাঁর ভাইয়ের উদ্দেশ্যের প্রধান রক্ষাকবচ। কুফায় তিনি তাঁর ভাতিজা আলী এবনে আল হুসাইন কে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন, যখন তাদের সকলকে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার দরবারে শাস্তির জন্য তোলা হয়। তিনি সেখানে এমন ধৈর্য্যশীল এবং জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন যা খলীফাকে বাধ্য করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার জন্য এবং তাদেরকে কারবালায় ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁর শক্তিমত্তা,ধৈর্য্য এবং জ্ঞান তাঁকে প্রাথমিক ইসলামিক যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নারীতে পরিণত করেছে।দামেস্কে তা৬র মাজার এখনো শিয়া ও সুন্নী উভয় শ্রেনীর মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধাপূর্ন জায়গা, যা প্রমান করে যে তাঁর লিগ্যাসী আসলে পুরা মুসলিম উম্মাহর কাছেই স্বীকৃত। ৬) রাবি’য়া আল আদাউইয়া - মুসলিম ইতিহাসের একজন অন্যতম প্রধান মরমী (সুফী),যিনি দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার পূর্বে শৈশবকালের বেশির ভাগ অংশই কাটান দক্ষিণ ইরাকে দাস হিসেবে । তাঁকে “স্বর্গীয় ভালোবাসা” –নামক সুফি মতবাদের একজন অন্যতম পুরোধা মনে করা হয় যার মৌল বিষয় হলো- “খোদা কে ভালোবাসতে হবে শাস্তির ভয় বা পুরস্কারের আশায় নয় বরং স্বীয় স্বার্থেই” । যা তিনি তার একটি কবিতায় এভাবেই চয়ন করেছেন-- “হে খোদা! আমি যদি শপি তোমায় দোযখের ভয়ে , পোড়াইও আমায় অগ্নিশিখায়, যদি শপি তোমায় বেহেশতের আশায় , তবে যেনো বেহেশ্ত হতে ত্যাজ্য কোরো আমায়। তবে যদি এই প্রার্থনা হয় শুধু তোমারই জন্যে তব নিত্য সৌন্দর্য্য হতে আমায় করো না বঞ্চিত।” যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, রাবিয়ার মতো একটি জীবনীকে কেন তার এই আধ্যাতিক জীবনালিপিতে প্রবেশ করানো হল, তখন ত্রয়োদশ শতাব্দীর পন্ডিত ফরিদুদ্দিন আত্তার(১২২০ খ্রিঃ) ব্যাখ্যা করেন, “মহানবী(সঃ) নিজে বলেছিলেন, ‘স্রষ্টার নিকট তোমার বাহ্যিকতা মূল্যবান নয়। এ বিষয়টি মূলতঃ ব্যক্তির অন্তর্নিহিত অভিপ্রায়ের উপরই নির্ভর করে। মানবজাতিরতাদের উদ্দেশ্যঅনুযায়ীপুনরুত্থিত করা হবে।’ আর তাছাড়াও মহান ও পবিত্র স্বত্ত্বা ‘আয়িশা বিনতে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) এর মতো একজন নারীর নিকট থেকে যদি দ্বীনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আমরা গ্রহণ করতে পারি, তবে ‘আইশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) এর দাসীসমতুল্য কারো কাছে থেকেও ধর্মীয় নীতিমালা গ্রহনযোগ্য হতে পারে।” ৭. কর্দোবার লুবনা(৯৮৪ খ্রিঃ) প্রকৃতপক্ষে স্প্যানিশ অঞ্চলের একজন দাসী লুবনা কর্দোবার উমাইয়্যাদ রাজপ্রাসাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি খলিফা আব্দুল রাহমান(৯৬১ খ্রিঃ) এবং তার পুত্র আল হাকাম বিন আব্দুল রাহমানের(৯৭৬ খ্রিঃ) দূর্গ তত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ গণিতবিদ ছিলেন এবং রাজকীয় গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন যা কি না ৫০০,০০০ বই নিয়ে গঠিত ছিল। বিখ্যাত আন্দালুসি বিশেষজ্ঞ ইবনে বাশকুয়ালের মতে, “তিনি সাহিত্য, ব্যকরণ এবং কবিতায় পারদর্শীতা হয়ে ওঠেন। গণিতের উপর তিনি যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার জ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ ছিল। উমাইয়্যাদ রাজপ্রাসাদে তার মত বিজ্ঞ কেউ ছিল না।” [IbnBashkuwal, Kitab al-Silla (Cairo, 2008), Vol. 2: 324]. ৮. আল-মালিকা আল-হুররা আরওয়া আল-সুলায়হি(১১৩৮ খ্রিঃ) তার পুরো নাম ছিল আরওয়া বিনতে আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল-সুলায়হি। ১০৬৭ থেকে ১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি স্বীয় অধিকার বলে ইয়েমেনের রাণী হিসেবে শাসন করেছিলেন। তিনি একজন ইসমাঈলী শিয়া ছিলেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিজ্ঞান, কোরআন, হাদিস, সাহিত্য এবং ইতিহাসে যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। পুরাতত্ত্ববিদরা( Chroniclers) তাকে অসাধারন জ্ঞানী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি যে তার নিজের অধিকারবলেই রানী ছিলেন এই মতের উপরে জোর পাওয়া যায় এ কারণে যে, ফাতিমীয় বংশের খলিফা আল-মুন্তাসির বিল্লাহ-এর নামের পরেই শুক্রবারের খুতবায় তার নাম উল্লেখ করা হতো। ফাতেমীয় খলিফা আল মুন্তাসির, আরওয়াকে ইয়েমেনি ফাতিমীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ধর্মীয় পদবী (যা হলো হুজ্জা) দেন।। ইতিহাসের প্রথম কীর্তিমান মুসলিম নারী তিনিই ছিলেন যাকে ইসলামের এতোবড় পদমর্যাদা দান করা হয়। তার সময়ে ইসমাঈলি মিশনারীদের পশ্চিম ভারতে পাঠানো হয়েছিল, সেখানকার গুজরাটে একটি বিশাল ইসমাঈলি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (যা ইসমাঈলীয় বোহরা বিশ্বাসের শক্তিশালী কেল্লায় পরিণত হয়)। প্রকৃতপক্ষে, ইয়েমেন ইসমাঈলি মুভমেন্টের জন্য শক্তিশালী হয়ে উঠে। তিনি১০৯৪ এর ফাতিমীয় মতবিরোধে আল মুস্তা’য়ালি (পরবর্তীতে আল-তায়্যিব)-কে সমর্থনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন এবং তার বিশাল প্রভাবের অন্যতম উদাহরণ হলো তার রাজত্বের অধীনে থাকা ইয়েমেন ও ভারতের কিছু অংশ তাঁর মতকেই সমর্থন দান করেন। ফলে তায়্যিবি ইসমাঈলী আন্দোলনের কেল্লায় পরিণত হয় ইয়েমেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেনের অবকাঠামোতে অনেক কাঠামোগত নির্মাণকাজ ও উন্নতি ঘটে যা মুসলিম বিশ্বের উন্নতির ইতিহাসে একাঙ্গিভুত করা হয়। তিনি ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের একমাত্র এবং মুসলিম রানীর উদাহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ৯) ফাতিমা বিনতে আবি আল-কাসিম ‘আবদ আল-রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে গালিব আল-আনসারি আল-শাররাত (মৃত্যুঃ ১২১৬ সাল): তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দির প্রথমদিকে আল-আন্দালুস (স্পেন) এর সে সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী মহিলা। তার আইনতত্ব ও আইনদর্শন ছাড়াও সুফিবাদের সাথে সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে যে ইসলামিক বিজ্ঞানে তার জ্ঞানের পরিধি ছিলো অনেক বিশাল। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক আবু আল-কাসিম ইবনে আল-তাইলাসান এর মাতা। আন্দালুসি ইমাম আবু জাফর আল-গামাতি (মৃত্যুঃ ১৩০৯ সাল) এর মতেঃ “তিনি তার পিতার তত্ত্বাবধানে অসংখ্য বই মুখস্থ করেছিলেন যার মাঝে আছে আল-মাক্কি-এর তানবিহ, আল-ক্বুদা’য়ি-এর আল-শিহাব, ইবনে ‘উবাইদ আল-তুলাইতালি-এর আল-মুখতাসার। তিনটি গ্রন্থকেই তিনি হৃদয়াঙ্গম করেছিলেন। তিনি আল-কুরআনও মুখস্থ করেছিলেন আবু ‘আব্দুল্লাহ আল-মাদাওয়ারি, যিনি ছিলেন ‘আব্দাল’ [সুফিবাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ] এর একজন অন্যতম সাধক, তাঁর তত্ত্বাবধানে। তিনি তাঁর পিতার সাথে সহীহ মুসলিম, ইবনে হিশাম রচিত সিরাতুন্নবী, আল-মুবাররাদের আল-কামিল, আল-বাগদাদী-এর নাওয়াদির এবং অন্যান্য গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করেছিলেন।” []আবু জাফর আহমদ ইবনে ইব্রাহীম আল-গামাতি, কিতাব সিল্লা আল-সিল্লা (বৈরুত, ২০০৮), পৃষ্ঠাঃ ৪৬০] ১০) রাজিয়া সুলতান (মৃত্যুঃ ১২৪০): ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সালে দিল্লীর সুলতানাতের শাসনকর্তা ছিলেন। তাঁর পিতা, শামস আল-দীন ইলতুতমিশ (রাজত্বঃ ১২১০-১২৩৬), তার মৃত্যুর আগেই রাজিয়া-কে তার সুলতানাতের উত্তরাধিকারী করেছিলেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি অনেক স্কুল ও গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছিলেন উত্তর ভারতে। সৈন্যবাহিনী নিয়ন্ত্রণে, রাজসিংহাসনে আরোহণ ও পিতার রাজপোষাক পরিধানসহ সকল বিষয়ে, তিনি সুলতানের মতোই ব্যবহার করেছিলেন। চরম সন্ত্রাসপূর্ণ সময়েও তিনি জনসম্মুখে প্রকাশ্যে বের হতেন। ১২৪০ সালে রাজ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দ্বারা অপসারিত ও নিহত হন যারা একজন নারীর দ্বারা রাজক্ষমতা পরিচালনার বিরোধী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে শেষ করা সম্ভব হবে না, কিন্তু আপনারা যদি তার সম্পর্কে আরো জানতে চান তাহলে তার সম্পর্কে রফিক জাকারিয়ে-এর লেখা Razia: Queen of India (1966) পড়তে পারেন। ১১) শাজার আদ দূর্‌ (মৃ. ১২৫৭): আইয়্যুবি সুলতান আল-সালিহ্‌ আইয়্যুব (রা. ১২৪০-১২৪৯) এর বিধবা স্ত্রী হিসেবে মিশরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। খুব সম্ভবতঃ তুর্কি বংশদ্ভুত দাস কন্যা হিসাবে আয়্যুবি রাজদরবারে জীবন শুরু করেন। ১২৫০ খৃস্টাব্দে তিনি মিশরের সুলতানা হিসাবে এর শাসনভার গ্রহন করেন। তার রাজত্বকালকে সাধারনত মিশরে মামলুক শাসনের সূচনা হিসাবে ধরা হয়। তিনি সপ্তম ক্রুসেডের সময় মিশরের উত্তরাঞ্চল রক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখেন। এ সময় (যদিও উনি নিজে অনুপস্থিত ছিলেন) ক্রুসেডারদের ফারিস্কারের যুদ্ধে (১২৫০ খৃ) পরাজিত ও ফ্রান্সের রাজা নবম লুইকে বন্দি করা হয়। তিনি রাস্ট্রের প্রকৃত প্রধান হিসাবে খুত্‌বায় তার নাম নেয়া হত ও মুদ্রায় “মুসলমানদের রাণী” হিসাবে তার নাম খোদাই করা থাকতো। রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে একজন মহিলার সরাসরি শাসন মেনে নেয়া লোকেদের জন্য কষ্টকর বিধায় নানারকম চাপের কাছে নতি স্বীকার করে উনি তার সেনাপ্রধান ইজ্‌-আদ দীন আইবক এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইজ্‌-আদ দীন আইবক পরিণত হন প্রথম মামলুক সুলতান এ। এ পরিণয় সত্বেও শাজার আদ দূর্‌ তার প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হন। এমনকি রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রে সুলতানের সাথে সাথে তার নামও লেখা থাকতো। রাজনৈতিক ও অন্য এক মহিলার সাথে সম্পর্ক থাকার কারনে বা আরেক স্ত্রী গ্রহনের সিদ্ধান্তের জন্য (এ ব্যাপারে নিশ্চিত জানা যায় না) ১২৫৭ সাল নাগাদ তিনি ইজ্‌-আদ দীনকে হত্যার মাধ্যমে অপসারিত করেন। এ ব্যাপার প্রকাশিত হলে পরে শাজার আদ দূর্‌কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এভাবে তার রাজত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১২) জয়নাব বিন্‌তে আহমদ (মৃ. ১৩৩৯): তাকে চতুর্দশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী আলেমদের মধ্যে একজন ধরা হয়। হাম্বলী ফিকাহশাস্ত্রের অনুসারী ছিলেন আর দামেস্কে বসবাস করতেন। তিনি হাদিসশাস্ত্র সহ আরও অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘ইজাযা’ (ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট) লাভ করেন। চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে তিনি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, শামায়েলে তিরমিযী, ইমাম তাহাবীর শর্‌হে মা’আনী ইত্যাদি গ্রন্থ শিক্ষা দিতেন। তার ছাত্রদের মধ্যে উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (মৃ ১৩৬৯), তাজ উদ্‌ দীন সুবকি(মৃ ১৩৫৫) আর ইমাম আয্‌ যাহাবীর (মৃ ১৩৪৮) নাম পাওয়া যায়। ইবনে হাজার আসকালানী উল্লেখিত অনেক ইস্‌নাদে জয়নাব বিন্‌তে আহমদের নাম রয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বের অনেক মহিলা আলেমদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। হাদিসশাস্ত্রে মুসলিম মহিলাদের অবদান বিস্তারিত জানতে আসমা সাইয়্যেদ এর লেখা “Women and the Transmission of Religious Knowledge in Islam (2013) ও মোহাম্মদ আকরাম নাদ্‌ভির লেখা “Al-Muhaddithat: The Women Scholars of Islam (2007)” এই বই দুটি দেখা যেতে পারে। ১৩) সাইয়্যেদা আল হুর্‌রা (মৃ. ১৫৪২): নামের অর্থ “স্বাধীনা নারী”। ছিলেন ষোড়শ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুসলিম মনীষীদের অন্যতম। ১৪৯২ সালে খ্রীস্টানদের স্পেন জয়ের পর আদি বাসস্থান গ্রানাডা থেকে পালিয়ে অন্য অনেকের মত মরক্কোতে বসতি স্থাপন করেন। এখানে তিনি ও তার স্বামী উত্তর প্রান্তের শহর তিতুয়ান শাসন করতেন। ১৫১৫ সালে তার স্বামীর মৃত্যু ঘটলে তিনি একাই শাসন পরিচালনা করতেন। ধীরে ধীরে আরও মুসলমান এ শহরে আশ্রয় নেয়া শুরু করলে ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে এর জনসংখ্যা ও শক্তি উভয়ই বৃদ্ধি পায়। আন্দালুসিয়ার পতন ও সেখানে মুসলিমদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা সহ অন্যান্য কারনে তিনি জলদস্যুতার পথ বেছে নেন এবং তিতুয়ানকে একটি শক্ত নৌ ঘাঁটিতে পরিণত করেন। তিনি আলজিয়ার্স এ বিখ্যাত অটমান অ্যাডমিরাল থেকে দস্যুতে পরিণত হওয়া হায়রেদ্দিন বারবারোসার সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। একসাথে তারা উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের স্পেনীয় রাজশক্তির উপর মারাত্মক আঘাত হানতে সক্ষম হন। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে এই যে তার সম্পর্কে মুসলিম সূত্রগুলোর নিরবতা। তার সম্পর্কে বেশিরভাগ সূত্রগুলো আমরা পাই স্পেনীয় ও পর্তুগীজ দলিল দস্তাবেজ থেকে। এগুলোতে আইবেরিয়ান প্রনালীর দক্ষিণপ্রান্তে সফল দস্যু প্রধান হিসাবে তার চালানো অভিযানগুলোর ধ্বংসলীলা ফুটে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি মরক্কোর ওয়াত্তাসীও সুলতান আবুল আব্বাস মুহাম্মদ (রা. ১৫২৬-১৫৪৫) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে মহিলা দস্যু অ্যান বনি ও মেরি রীড অনেকের কাছে সমাদৃত হলেও সাইয়্যেদা আল হুর্‌রার কথা খুব কম লোকেরাই জানে। তার জীবনী আরও গভীরভাবে জানতে ফাতিমা মারনিসির “The Forgotten Queens of Islam (1977)” বইটির সাহায্য নেয়া যেতে পারে। স্প্যানিশ ভাষাভাষীরা দেখতে পারেন Rodolfo Grim Grimau রচিত “Sayyida al-Hurra, Mujer Marroqui de Origen Andalusi,” Anaquel de Estudios Arabes (2000): 311-320. ১৪) পরী খান খানম (মৃ ১৫৭৮): সাফাভি রাজকন্যা ও শাহ প্রথম তাহমাস্‌প (১৫২৪-১৫৭৬) এর স্ত্রী। ইরানের ষোড়শ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের অন্যতম। শিক্ষিত মহিলা কবি হিসাবে বিখ্যাত ও প্রচলিত ইসলামী শাস্ত্র যেমন ফিক্‌হে পারদর্শী। তিনি সাফাভি সিংহাসনে তার ভাই দ্বিতীয় ইসমাইল এর আরোহন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ইসমাইল এর সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে পরী খান খানমের প্রভাব হ্রাস পায়। অবশেষে ইসমাইলের উত্তরাধিকারী, মোহাম্মদ খোদাবন্দের শাসনামলে পরী খানকে হত্যা করা হয়। তার সম্পর্কে আরও জানতে দেখা যেতে পারে, Shohreh Gholsorkhi’র “Pari Khan Khanum: A Masterful Safavid Princess,” Iranian Studies 28 (1995): 143-156. ১৫) কোসেম সুলতান (মৃ ১৬৫১): ইংরেজি ভাষাভাষীদের অনেকেই প্রথম সুলায়মান (১৫২০-১৫৬৬) এর সম্রাজ্ঞী রোজেলানা বা হারেম সুলতান সম্পর্কে জানলেও কোসেম সুলতান সম্পর্কে অজ্ঞাত। তিনি ছিলেন অটোমান সুলতান প্রথম আহমেদ (১৬০৩-১৬১৭) এর সহধর্মিনী। অটোমান ইতিহাসে সুলতান ৪র্থ মুরাদ (১৬২৩-১৬৪০) ও সুলতান ইব্রাহিম (১৬৪০-১৬৪৮) এর মা ও সুলতান ৪র্থ মাহমুদ (১৬৪৮-১৬৮৭) এর দাদী হিসাবে তিনি ছিলেন সম্ভবতঃ সবচেয়ে ক্ষমতাধর আর প্রভাবশালী নারী। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন গ্রিসের অধিবাসী ও তার নাম ছিল অ্যানাস্তাসিয়া। অল্প বয়সেই তিনি বন্দিনীরূপে অটোমান প্রাসাদে নীত হন এবং সেখানে তিনি সুলতান প্রথম আহমেদের উপপত্নীরূপে পরিগনিত হতেন। Cristoforo Valier নামে এক সমসাময়িক সূত্র হতে জানা যায় যে ১৬১৬ সাল নাগাদ, সুলতানের সহকারীদের মধ্যে কোসেম ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং “তিনি যা চাইতেন সুলতান তাই করতেন ও সুলতানের হৃদয় ছিল সম্পূর্নরূপে তার বশীভূত, তার কোন চাওয়াই অপূর্ন থাকেনি”। ১৬২৩ থেকে ১৬৩২ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ সিংহাসনে আসীন নাবালক সন্তান ৪র্থ মুরাদ এর অভিভাবকরূপে দায়িত্ব পালন করেন। ১৬৫১ সালে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত অটোমান রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ন প্রভাব রাখেন। কোসেম সুলতান ও অটোমান রাজকীয় হারেম সম্পর্কে জানতে লেসলি পিয়ার্সের The Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire (1993) বইটি দেখা যেতে পারে।

সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাসে নির্যাতিত নারীর পাশে ইসলামই সর্বপ্রথম দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে বিতর্কের সুযোগ গৌণ ও সীমিত। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন একজন নারী—খাদিজা (রা.)। সর্বপ্রথম ইসলামের জন্য শহীদও হয়েছেন একজন নারী—সুমাইয়া (রা.)। এগুলো সৎসিদ্ধ ও বিখ্যাত ঘটনা। কিন্তু ইতিহাস গবেষণা করলে দেখা যায়, এর বাইরেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী পদ্ধতিতে জীবনযাপন করে মুসলিম নারীরা পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে অনুপম ও উজ্জ্বল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাদের তালিকা ও নির্ঘণ্ট বেশ দীর্ঘ।

স্বল্প-বিস্তারে হলেও কয়েকজনের নাম এখানে উপস্থাপন করা হলো— আয়েশা (রা.); হাদিস বর্ণনা, ইসলামী আইন, ফিকহ, ইতিহাস, বংশলতিকা, কবিতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) ও উম্মে আবিদুল্লাহ বিন জুবায়ের; তারা উভয়েই হাদিস বর্ণনায় দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন। আয়েশা বিনতে তালহা; তিনি কবিতা, সাহিত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র ও নভোমণ্ডল বিষয়ে অত্যন্ত পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সাকিনা বিনতে হোসাইন ও খানসা; তারা কাব্য ও সাহিত্যে প্রবাদতুল্য ছিলেন। মায়মুনা বিনতে সাদ (রা.); হাদিসশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)ও তার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। কারিমা মারজিয়া (রহ.); হাদিসের বিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.) তার কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন। ফাতিমা বিনতে আব্বাস; প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ। তিনি মিসর ও দামেশকের প্রভাবশালী নেত্রী ছিলেন। উখত মজনি (রহ.); তিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর শিক্ষক। আল্লামা মারাদিয়ি (রহ.) তাঁর কাছ থেকে জাকাতবিষয়ক মাসআলা বর্ণনা করেছেন। হুজায়মা বিনতে হায়ই (রহ.) প্রখ্যাত তাবেয়ি ও হাদিসবিদ ছিলেন। ইমাম তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ (রহ.) তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। আয়েশা বিনতে আহমদ বিন কাদিম স্পেনের অধিবাসী ছিলেন। ক্যালিওগ্রাফিতে অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। লুবনি (রহ.) ভাষাবিদ হওয়ার পাশাপাশি আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রে প্রাজ্ঞ ছিলেন। ফাতিমা বিনতে আলী বিন হোসাইন বিন হামজাহ ছিলেন হাম্বলি মাজহাবের পণ্ডিত। সমসাময়িক আলেমরা তার কাছ থেকে হাদিস শিখেছেন এবং প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ দারেমি শরিফের সনদের অনুমতি নিয়েছেন। রাবিয়া কসিসাহ সুপ্রসিদ্ধ বক্তা ছিলেন। হাসান বসরি (রহ.)ও তার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন। ফাতিমা বিনতে কায়েস শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। উম্মে ফজল, উম্মে সিনান হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। শিফা বিনতে আবদিল্লাহ প্রখ্যাত আইনতাত্ত্বিক ছিলেন। ওমর (রা.) তাকে ইসলামী আদালতের ‘কাজাউল হাসাবাহ’ (Accountability court) ও ‘কাজাউস সুক’ (Market administration) ইত্যাদির দায়িত্বভার অর্পণ করেন। (সূত্র, তাবকাতে ইবনে সাদ : ৮/৪৫-৪৮; দালায়িলুন নবুয়্যাহ : ৫/৪১৬; ইবনে আসির : ৫/৪৫০; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া : ৫/৭৮) শায়েখ আলাউদ্দিন সমরকন্দি (রহ.) ‘তুহফাতুল ফুকাহা’ নামে একটি কিতাব লিখেছেন। এটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন তারই ছাত্র আবু বকর ইবনে মাসউদ কাস্তানি (রহ.)। ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নাম ‘বাদায়েউস সানায়ি’। ইসলামী ফিকহশাস্ত্রে এটি নজিরবিহীন কিতাব। এটা দেখে শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে নিজ মেয়েকে বিয়ে দেন। মেয়েটির নাম ফাতিমা। সমকালীন রাজা-বাদশাহরা মেয়েটিকে বিবাহ করতে আগ্রহী ছিলেন। সে মেয়েটি ছিলেন মুফতি। তার স্বাক্ষরিত অসংখ্য ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে। (ফতোয়ায়ে শামি : ১/১০০) ইবনে কায়েসের বর্ণনায় দেখা যায়, প্রায় ২২ জন নারী সাহাবি ফতোয়া ও ইসলামী আইনশাস্ত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে সাতজন উম্মাহাতুল মুমিনিন বা নবীপত্নী ছিলেন। ১১ শতাব্দীতে মামলুক শাসনামলে তত্কালীন মুসলিম নারীরা দামেশকে পাচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১২টি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে মুসলিম নারীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। যুদ্ধ-সংগ্রামে নারী সাহাবিরা আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালমা (রা.) ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহানবী (সা.)-এর ফুফু সুফিয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রা.) খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মুল খায়ের, জুরকা বিনতে আদি, ইকরামা বিনতে আতরাশ ও উম্মে সিনান অসংখ্য যুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করেন। আজরা বিনতে হারিস বিন কালদা সেনাদলের নেতৃত্ব প্রদান ও আহলে বিসানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। উম্মে আম্মারা (রা.) ওহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর জীবন রক্ষায় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছিলেন। মহানবী (সা.) তাকে ‘খাতুনে ওহুদ’ উপাধি দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সামুদ্রিক অভিযানে প্রথম শাহাদাত বরণ করেন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)। উম্মে আতিয়া আনসারি (রা.) মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উমাইয়া বিনতে কায়েস কিফারিয়া খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হাকিম বিনতে হারিস রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে আয়মন হাবশি (রা.) ওহুদ, হুনাইন, খায়বর ও মোতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে সুলাইম (রা.) খায়বর ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হারাম বিনতে মিলহান ইসলামের প্রথম নারী নৌযোদ্ধা। রাবি বিনতে মুয়াওয়াজ (রা.) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নাসিবাহ বিনতে কাব আনসারিয়া ওহুদ, বনি কুরাইজা, হুদায়বিয়া, খায়বর, হুনাইন ও ইয়ামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (সূত্র : তাবকাতে ইবনে সাদ : ৮/৪১৫; দালায়িলুন নবুয়্যাহ : ২/৭১২) শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে থেকেও মুসলিম নারীরা কী কী অবদান রেখেছেন, এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে ‘সুন্নতে রাসুল ও আধুনিক বিজ্ঞান’ বইয়ের নবম ও দশম খণ্ড দেখা যেতে পারে। বইটি ঢাকার বাংলাবাজার ইসলামী টাওয়ার থেকে আল কাউসার প্রকাশনী প্রকাশ করেছে। লোন ওয়াচ থেকে বিডিটুডের জন্য অনুবাদ করেছেন রিয়াজ হাসান

নুরি বিলগ ছেইলান, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালদের একজন—

নুরি বিলগ ছেইলান, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালদের একজন—যিনি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত একটিও খারাপ সিনেমা তৈরি করেন নি। বরং বলা যায়, তিনি সেই সব বিরলপ্রজ পরিচালকদের একজন, যারা নিজেরাই নিজের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করে এবং নিজের পূর্ববর্তী কাজগুলোকে এমনভাবে ছাপিয়ে যায় যে, আমরা ভাবতে বাধ্য হই, কেবলমাত্র উৎকৃষ্টমানের সিনেমা তৈরির জন্যই বুঝি তাদের জন্ম হয়েছে।

১৯৯৭ সালে নির্মিত তার প্রথম সিনেমা ‘দ্য টাউন’ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’, এই দুই দশকের অধিক সময়ে আমরা তাকেও পাই সেভাবেই। পরিচালক হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এবং বলা যায়, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার পাঠ তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।

১৯৫৯ সালে তুর্কির ইস্তানবুলে জন্ম নেয়া এই পরিচালক ইতিমধ্যেই আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘দ্য টাউন’ [১৯৯৭], ‘ক্লাউডস অব মে’ [১৯৯৯], ‘ডিসট্যান্ট’ [২০০২], ‘ক্লাইমেটস’ [২০০৬], ‘থ্রি মাংকিস’ [২০০৮], ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন এনাটোলিয়া’ [২০১১], ‘উইন্টার স্লিপ’ [২০১৪], ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’ [২০১৮] ইত্যাদি অনবদ্য সব সিনেমা, আর পুরস্কার হিসেবে জিতেছেন ৮৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডস ও কানস ফিল্ম ফেস্টিভাল উল্লেখযোগ্য এবং ‘ডিসট্যান্ট’-এর পর থেকে তিনি প্রায় নিয়মিতভাবেই কানস-এ পুরস্কার জিতে চলেছেন।

বিএফআই সাউথ ব্যাংক [যা পূর্বে ‘ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার’ হিসেবে পরিচিত ছিল আর এটা ‘ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ দ্বারা পরিচালিত] এর এক অনুষ্ঠানে ছেইলানের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জিওফ এনড্রিও। যেখানে তিনি কিভাবে ফটোগ্রাফি থেকে ফিল্ম মেকিং এ এলেন, কেন সাম্প্রতিক সময়ে আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি থেকে সরে এসেছেন এবং কেন তিনি সে বিষয়ে আর সিনেমা তৈরি করতে চান না ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো।

—অরণ্য

সা ক্ষা ৎ কা র ❑❑ জিওফ এনড্রিও আপনারা যদি সিনেমাটি না দেখে থাকেন, তবে বুঝবেন না, যে বয়স্ক লোকটিকে এখানে দেখানো হয়েছে, তিনি নুরির বাবা এবং বয়স্ক মহিলাটি তার মা। এছাড়া আরও একটি চরিত্রে রয়েছেন তার চাচাত ভাই। আর কোনো আত্মীয় কি রয়েছে এই দৃশ্যে? নুরি বিলগ ছেইলান না [শ্রোতাদের হাসি]। জিওফ এনড্রিও আমার মনে হয়, নুরির সিনেমায় কোনো ঘনিষ্ঠ বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা তার সিনেমা তৈরির এক ধরনের কৌশল। এই সিনেমাটি তুর্কির ছোট্ট একটি গ্রামে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এটা আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে কতটা সম্পৃক্ত? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত, অনেকটাই সম্পৃক্ত। কিন্তু, এই ক্লিপটি দেখা আমার জন্য চমকের মতো। আমি গত ১০ বছর হবে এটা দেখি নি। আমি কখনোই আমার সিনেমা দেখি না। সিনেমাটির এডিআর [অটোমেটেড ডায়লগ রিপ্লেসমেন্ট], ডাবিং ছিল যথেষ্ট খারাপ আর এটা তৈরির সময় আমাদের কাছে ভালো ক্যামেরা ছিল না। সিনেমাটির জন্য আমি নিজেই অর্থায়ন করি। এডিআর করার জন্য আমাদের কাছে পেশাদারি লোক ছিল, কিন্তু, তা ঠিকঠাক কাজ করে নি, বিশেষত শিশু ও মহিলাদের অংশটির ক্ষেত্রে। সুতরাং এটা ছিল আমার জন্য বাজে অভিজ্ঞতা। তারপর থেকে আমি লোকেশনের শব্দসহই শুট করার সিদ্ধান্ত নিই। হ্যাঁ, এটা খুবই আত্মজীবনীমূলক সিনেমা। আমি অনেক কিছুই মনে রেখেছিলাম যেগুলো একসাথে এই সিনেমায় এসেছিল, কিন্তু, আমি ভুলে গিয়েছিলাম কোন অংশটি বাস্তব আর কোনটি কল্পনা। আমি মনে করি, চিত্রনাট্য লেখা ও সিনেমা তৈরি এক ধরনের কোলাজ এবং খুবই গোলমেলে ব্যাপার—এটা সংগীত লেখার মতো বিষয়, যেখানে আপনি সব কিছুই ছন্দের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছেন, আর সেই ছন্দ আনার জন্য আপনি কখনও কিছু চিনি, কিছু লবণ এখানে সেখানে যোগ করছেন। বিভিন্ন রকমের বিষয় এখানে একসাথে ওঠে আসে। সিনেমাটির অধিকংশ বিষয়ই ছিল আমার বোনোর স্মৃতি থেকে নেওয়া, বিশেষত সংলাপগুলো। কিন্তু প্রথম অংশটি একটি ক্লাসরুমে করা হয়েছিল আর সেটি আমি লিখেছিলাম। জিওফ এনড্রিও এবং যথারীতি সেখানেও চেখভের উপাদান ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ ছিল। প্রকৃতপক্ষে আমি বিশ্বাস করি যে, আমার সব সিনেমাতেই কিছু না কিছু চেখভের উপাদান রয়েছে, কারণ চেখভ অসংখ্য গল্প লিখেছেন। তিনি প্রায় সকল বিষয়ের উপরেই গল্প লিখেছেন আর আমি সেগুলো ভীষণ ভালোবাসি। সম্ভবত, জীবনকে আমি যেভাবে দেখি, সে বিষয়ে তিনিই আমাকে প্রভাবিত করেছেন। এক অর্থে আমার জন্য জীবন চেখভকে অনুসরণ করে। চেখভ পড়ার পর আপনি একই ধরনের ঘটনা নিজের জীবনেও দেখতে পাবেন। চিত্রনাট্য লেখার সময়, আমি চেখভের গল্পগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করি। সুতরাং বলা যায়, হ্যাঁ, চেখভ এখানে আছে। জিওফ এনড্রিও আপনি উল্লেখ করেছেন যে, এগুলোর কিছু আপনি নিজে লিখেছেন এবং কিছু আপনার বোনের সাথে মিলে। আপনি ছবি তোলেন এবং সিনেমা তৈরি করেন, আর আপনার বোন [এমিন ছেইলান] নিজেও একজন দক্ষ ও যথেষ্ট পারঙ্গম চিত্রগ্রাহক। আপনি কি শিল্পবোধ সম্পন্ন পরিবার থেকে এসেছেন? এবং আপনি কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত, যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার চারপাশে কোনো শিল্প ছিল না। আমি একটি ছোট্ট শহরে বাস করতাম এবং আমার চারপাশে শিল্প বলতে যা পেয়েছি, তা লোকগীতি এবং সম্ভবত সিনেমা। কিন্তু, সেখানে কোনো প্রদর্শনী বা তেমন কিছু ছিল না। আমি নিজেই বিস্মিত হই কিভাবে আমি শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হলাম। আমার মনে হয়, এটা শুরু হয়েছিল যখন আমি হাই স্কুলে ছিলাম এবং ইস্তানবুলে বাস করতাম। আমি সত্যিই জানতাম না কিভাবে, কিন্তু আমি, আমার বোন ও চাচাত ভাই সবাই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমার মনে আছে, কেউ আমাকে ফটোগ্রাফির উপর লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিল। সম্ভবত, তখন থেকেই শুরু। অতএব, আপনি অবশ্যই সাবধান থাকবেন যখন ছোটদের জন্য উপহার সামগ্রী কিনবেন [শ্রোতাদের হাসি]। আমার মনে হয়, সেই বইটিই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল—যা চিত্রগ্রহণকে আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য একটি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিল। আমি একটি ডার্করুম তৈরি করেছিলাম এবং সেখানে ছবিগুলোর প্রিন্ট নিতাম। ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করলাম, এটা একটা শিল্প এবং আমার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েই চলল। আমার বোন আমার পরে চিত্রগ্রহণ শুরু করেছিল। আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না। জিওফ এনড্রিও আপনি ফটোগ্রাফি থেকে কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমার ভালোভাবে মনে নেই, কিন্তু, সে সময় কোনো ভিডিও ক্যামেরা ছিল না, সুতরাং, সিনেমা তৈরির কথা চিন্তা করাও ছিল কঠিন। সে সময়ে এটা হাতে গোনা কিছু মানুষের কাছে ছিল। এমনকি ইউনিভার্সিটি পাস করার অনেক পর, মিলিটারি সার্ভিস করার সময়ও আমি সিনেমা তৈরির কথা ভাবি নি। অন্যান্যদের মতো আমিও সিনেমা দেখতে পছন্দ করতাম, কিন্তু, আমার মনে হয় সিনেমা তৈরি সম্পর্কিত একটি বই আমার জীবন বদলে দেয়। সেটা ছিল রোমান পোলানস্কির জীবনী, যা মিলিটারি সার্ভিসে থাকাকালীন পড়ার সময় আমাকে দারুণ উদ্বুদ্ধ করে। বইটিতে নাজি ক্যাম্পে একদম শূন্য থেকে শুরু করে হলিডউ পর্যন্ত তার জীবনী ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর এবং সে বইটিতে সিনেমা তৈরি আমার কাছে খুব সহজ মনে হয়ছিল। সুতরাং, আমি সিনেমা নিয়ে অনেক বই পড়া শুরু করলাম, যার মধ্যে টেকনিক্যাল বইও ছিল। একদিন আমি একটি শর্ট ফিল্মে অভিনয় করলাম, যেটা ৩৫ মি.মি. এ শুট করা হয়েছিল এবং আমি সিনেমা তৈরির সকল ধাপ পর্যবেক্ষণ করলাম, আর সেটির কাজ শেষ হবার পর ক্যামেরাটি কিনে আনলাম। সেটা ছিল এরিফ্লেক্স ২সি আর সেটি কাজ করার সময় মেশিনগান এর মতো শব্দ তৈরি করত। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শুরু করা, এমনকি ক্যামেরা কিনে আনার ১০ বছর পরও আমি কোনো সিনেমা তৈরি করতে পারি নি। তারপর সেই ক্যামেরাটি দিয়ে আমি একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করলাম। প্রথমে নিজেই শুরু করেছিলাম, যেন-বা ছবি তুলছি এমন মনে করে। কিন্তু, পরে আর মনঃসংযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে সিনেমার মাঝামাঝি একজন সহকারীকে যুক্ত করি এবং দু জন মিলে শর্ট ফিল্মটি তৈরি করি। আমার পরিবারের সদস্যরা তাতে অভিনয় করেছিল এবং আমার মনে হয় সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ। তারপর আবারও মাত্র দু জন নিয়েই আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করলাম। তবে বলতেই হয় যে, সিনেমার কলা-কুশলীরা সবকিছু বহনে আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিল এবং তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি যে, সিনেমা তৈরি করা সম্ভব। তারপর থেকে আমার কাছে বিষয়টি হয়ে উঠেছিল সহজতর। জিওফ এনড্রিও এটা আমাদেরকে খুব ভালোভাবেই পরবর্তী ক্লিপে নিয়ে যায়, যেটা ক্লাউডস অব মে-এর। স্পষ্টতই, ক্লাউডস অব মে আংশিকভাবে তার পূর্বসূরি থেকে সরে এসেছে এবং এই ক্লিপে আমরা প্রায় আগের দৃশ্যটিরই শুটিং দেখলাম। আপনি কি মনে করেন যে, আপনার কাজগুলো একে অপরকে ছাপিয়ে যায়? যদিও আপনি কোনো সিক্যুয়াল তৈরি করেন না, তারপরও আপনার একটি কাজের সাথে অপর একটি কাজের সূত্র রয়েই যায়। নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, আমি নিজেও তাই মনে করি। যখন আমি এই সিনেমাগুলো মধ্যে একটির কাজ শেষ করি, তখন কোনোভাবে অনুভব করলাম যে, এই বিষয়গুলি সম্পর্কে আরও কিছু বলার আছে, যা উজাক [ডিসট্যান্ট] শেষ হবার আগ পর্যন্ত চালু ছিল। সম্ভবত এ জন্য যে, আমি জানতাম তারপর কী ঘটবে, কারণ সেগুলো ছিল আমার জীবনের বেশ ঘনিষ্ঠ। কিন্তু, এই সিদ্ধান্তগুলি ছিল বেশ সহজাত এবং কখনোই তা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। তাছাড়া সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী সিনেমার কাজ শেষ হবার অনেক পরে। জিওফ এনড্রিও উল্লেখিত ক্লিপে পরিচালক স্পষ্টতই তার পিতা-মাতাকে ব্যবহার করছেন সিনেমা তৈরির জন্য। সে শহর থেকে মফস্বলে ফিরে আসে এবং মানুষজনের অলক্ষে তার ক্যামেরাটি চালু করে। এক অর্থে বলা যায় যে, সে তার পরিবারকেই সবসময় ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এই সিনেমায় আত্ম-সমালোচনার কোনো উপাদান ছিল কি? নুরি বিলগ ছেইলান আমিও তাই মনে করি। এই সিনেমাটি তৈরির আগেই ভিডিও ক্যামেরার জন্ম হয়েছিল, সুতরাং, আমি পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের জন্য ক্যামেরাটি কিনেছিলাম। আমি এই অঞ্চলেরই একজন এবং অনেক কিছুই শুট করছিলাম, যেখানে মা-বাবার সাক্ষাৎকার, দাদিকে করা নানাবিধ প্রশ্ন ছিল। এমনকি আমি একটি স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টাও করেছিলাম। পরে ইস্তানবুলে ফিরে এসে যখন আমি আমার ক্যামেরায় যা শুট করেছিলাম তা দেখলাম, লক্ষ করলাম যে, আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। আমার দাদি হয়তো আমাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু আমি তা শুনছি না। সম্ভবত এমন হতে পারে যে, আমি সিনেমাটি নিয়ে কী করব তা ভাবছিলাম। এই বিষয়গুলো আমার মধ্যে অপরাধ বোধের জন্ম দিয়েছিল, ফলে আমি নিজেকে পছন্দ করি নি এবং আমার মনে হয়েছিল, অধিকাংশ পরিচালক কিংবা শিল্পীরা, বিশেষত যারা শহরের, তাদের মধ্যে এই ধরনের আত্মপ্রিয়তা বর্তমান। কিন্তু, গ্রামের মানুষগুলো নিজেদের যা আছে সব উজাড় করে দেয় আর আমরা তা অকাতর গ্রহণ করি। কিন্তু যখন তারা শহরে আসে, তখন তাদের প্রতিদান দিই না। সুতরাং উজাক ছিল সেই বাস্তবতার একটি ধারাবাহিকতা। জিওফ এনড্রিও আপনার কর্মজীবনের এই পর্যায়ে আকর্ষণীয় বিষয় কি, বিশেষত উজাক-এ, যেখানে আপনি নিজেই চিত্রনাট্য লিখছেন, পরিচালনা করছেন, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, অর্থায়ন, এমনকি বিক্রি অব্দি করছেন—এক অর্থে আপনি নিজেই সবকিছু করছেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। এসব কি আপনার জন্য অনেক বেশি ছিল, নাকি বিষয়টি এমন যা করতে আপনি মজা পেতেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি কখনোই অন্যের সিনেমায় সহকারী পরিচালক বা অন্য কোনোভাবে কাজ করি নি, সুতরাং, অন্য পরিচালকরা কিভাবে কাজ করে তা জানার সুযোগ হয় নি। আমি সবকিছুই বই থেকে নিজে নিজে শিখেছি এবং সিনেমার বিক্রি, বাজার সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে তৈরির সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিজে শিখেছি। এমনকি কানস-এ আমি নিজেই সিনেমাটি বিক্রি করছিলাম এবং তারা আমাকে বলেছিল, আর একজন মাত্র পরিচালক ছিলেন যিনি নিজেই নিজের সিনেমা বিক্রি করতেন, তিনি আফ্রিকান পরিচালক আব্দেররেহমান সিসাকো। ঘটনাটি ছিল অস্বাভাবিক এবং ডিস্ট্রিবিউটররা বেশ বিস্মিত হয়েছিল। আমি কিভাবে বিক্রি করতে হয় তা শিখেছিলাম, কিন্তু, এখন আর নিজে করি না। এখন আমার সিনেমার জন্য প্রোডিউসার, চিত্রগ্রাহক সব রয়েছে। যদিও বিষয়টি ছিল অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু সে সময়ে আমি জানতে চেয়েছিলাম। আমি মনে করি, একজন পরিচালকের অনেক কিছুই জানা প্রয়োজন, বিশেষত টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি, অন্যথায় আপনি টেকনিক্যাল লোকজনদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বেন। যদি আপনি টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানেন, তবে তাদের ভালোভাবে বোঝাতে ও পরিচালনা করতে পারবেন। জিওফ এনড্রিও এই সিনেমায়, যে দৃশ্যটি আমরা এইমাত্র দেখলাম, সেখানে আপনি আপনার পিতাকে উৎসাহ দিচ্ছেন যে তাকে কী বলতে হবে। বিষয়টি কি এভাবে বাস্তবেও কাজ করেছিল? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ। এটা আমার প্রথম সিনেমার চিত্রায়ণকে খুব বাস্তবিকভাবে প্রতিফলিত করে। আমার মনে হয়, সেটা ছিল সত্যিকার অথেই বিশৃঙ্খল অবস্থা, যখন আমরা দুজন মাত্র মানুষ বাকি সবাইকেই পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। সেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই তালগোল পাকানো এক পরিস্থিতি। জিওফ এনড্রিও অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে আপনি একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং সেটা উভয় ক্লিপেই উঠে এসেছে যে, গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ শহরের দিকে সরে আসার ফলে তুর্কিস জন-জীবনে কী ঘটছে? যেমন আপনার প্রথম সিনেমা ‘উজাক’-এর কথাই ধরা যাক, যেখানে আপনি সিনেমাটি ইস্তাম্বুল শহরের পটভূমিতেতে একজন ফটোগ্রাফারের জীবন-যাপন তুরে ধরেছেন, যার কাছে তার চাচাত ভাই বেড়াতে আসে মফস্বল থেকে। অনকেগুলো কারণের একটি, যার জন্য আমি ক্লিপটি বেছে নিয়েছি, এখানে আমরা নুরির পরিবারে আগত নতুন সদস্যকে দেখতে পাই—রাস্তায় দাঁড়ানো নারীটি নুরির স্ত্রী, ইব্রু। কিন্তু, অন্য যে কারণে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছি তা হলো, এটি একটি দারুণ দৃশ্য, যেখানে একটি যুবক যুবতীটির দিকে তাকিয়ে আছে এবং সানগ্লাস দিয়ে নিজেকে আকর্ষক করে তোলার চেষ্টা করছে, আর ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই গাড়ির এলার্ম বন্ধ হয়ে যায়। দৃশ্যটি খুবই হাস্যকর এবং এমন অনেক হালকা রসাত্মক উপদান রয়েছে আপনার সিনেমায়। বিষয়টি আমাকে বাস্টার কিটন-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার কাজ খুব কমই পরিচিত। মূলত, আপনার নিজের সিনেমায় কৌতুক অথবা রসবোধ থাকাটা আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? নুরি বিলগ ছেইলান আমার মনে হয়, জীবনকে আমি এভাবেই দেখি। আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না। আমি যথাসম্ভব বাস্তবতার কাছাকাছি থাকতে চাই এবং মনে করি যে, বাস্তব জীবন হাস্যরসে পূর্ণ। আমি যখন ঘরে একা থাকি, নিজেকে অনেক মজার মুহূর্তে খুঁজে পাই। যদি কখনও আমি নিজেকে আয়নায় দেখি, তবে দেখা যাবে আমার অভিব্যক্তি যথার্থই অসংলগ্ন। ফলে, সেগুলোর জন্য আমি কোনো পরিকল্পনা করি না। কিন্তু, এই সিনেমায় অমন অবস্থায় লোকজনদের হাসতে দেখে আমি একটু বিস্মিতই হয়েছি! জিওফ এনড্রিও এই সিনেমায় পরের দিকে তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং ফটোগ্রাফার এই আগন্তুক ভাইকে অহেতুক উৎপাত মনে করতে থাকে। সুতরাং এক সন্ধ্যায় সে পর্ণছবি দেখতে শুরু করে, কিন্তু, যখন চাচাত ভাই আসে, সে দ্রুত তা বন্ধ করে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে। মূলত, যে সিনেমাটি তারা একসাথে দেখছিল, তা ছিল চাচাত ভাইকে ঘুমাতে পাঠানোর একটি কৌশল এবং সেটা বিদ্রূপাত্মক, বিশেষত যখন আপনি তারকোভস্কির একজন অনুরাগী, নয় কি? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, তিনি সে সকল পরিচালকদের অন্যতম যাদের আমি পছন্দ করি। কিন্তু, সেই দৃশ্যে আমি তারকোভস্কির সিনেমা বেছে নিয়েছিলাম এ জন্য না যে আমি তার কাজ পছন্দ করি, বরং সেই দৃশ্যে সিনেমাটি ছিল যথোপযুক্ত এবং আমি চেয়েছিলাম, যে ধরনের সিনেমা গ্রামের লোকেরা দেখে অভ্যস্ত তার সাথে এই ধরনের সিনেমার একটি তুলনা করতে। আমি চেয়েছিলাম ফটোগ্রাফারের [সিনেমার নায়ক] জন্য একটি আদর্শ সিনেমা বিছে নিতে, আর তারকোভস্তি ছিল সে ক্ষেত্রে যথার্থ। সাধারণত সমোলোচনাকারীরা ভেবেছে যে, চাচাত ভাইয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে, কিন্তু, সেটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। জিওফ এনড্রিও সমালোচকরা সব সময়ই ভুল [হাসিসহ]। নুরি বিলগ ছেইলান সম্ভবত আমি কিছু ভুল করেছিলাম [হাসিসহ]। কিন্তু, একটু আগের দৃশ্যে ফটোগ্রাফার তার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করছিল এবং এক বন্ধু তার সমালোচনা করে আদর্শ হারানোর জন্য, আর তারা সে জন্য তাকে দোষারোপ করে। সুতরাং যখন সে বাসায় ফেরে, তখন সে তার আদর্শ পুনরায় ফিরে পাবার জন্য এক ধরনের জিদ অনুভব করে। মূলত সে কারণেই সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে এবং সে মনে করেছিল যে সে তার হারানো উৎসাহ ও উদ্দীপনা ফিরে পাবে। এজন্য সে অপর ব্যক্তিকে আমলেই নেয় না, ফলস্বরূপ তার চাচাত ভাই অবশ্যই বিরক্ত হয়ে ওঠে। অতঃপর, চাচাত ভাই যখন ঘুমাতে যায়, তখন তার মধ্যে কিছু একটা কাজ করে এবং সে পুনরায় তার উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে ও পর্ণ দেখা শুরু করে, কারণ সেটা দেখা ছিল সহজতর। সে তার ভেতরের ক্রোধান্বিত ভাব থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল, আর সে জন্যই পর্ণ দেখা শুরু করেছিল। আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি। জিওফ এনড্রিও এই সিনেমার একটি বিষয় আমাকে আলোড়িত করেছে, তা হলো, অনেক দৃশ্যই খুব অল্প সংলাপসহ শুট করা এবং আমার কাছে মনে হয়েছে, বিষয়টি আপনার সিনেমায় সবসময়ই ঘটে। আপনি কি মনে করেন যে, চরিত্রেরা শব্দ ছাড়াই নিজেদের ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারে? নুরি বিলগ ছেইলান আমি ঠিক জানি না। চরিত্রগুলোকে নিরব রাখার চেষ্টা আমি করি না। চিত্রনাট্যে সেই দৃশ্যে অনেকগুলো সংলাপ ছিল। কিন্তু দৃশ্যায়ন, এই একটিমাত্র ক্ষেত্র, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনি যা লিখেছেন তা সেখানে কাজ করবে কি না। চিত্রগ্রহণের বেলায় আমি সবসময় চেষ্টা করি পরিস্থিতির সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে। ফলে আমি দৃশ্য থেকে সংলাপ বাদ দিই, যার দরুন সেখানে কোনো সংলাপ ছিল না। আমি সেই পরিস্থিতিতে যথার্থ সামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম, আর আমি জানি না এই বিষয়ে আমার কী করা উচিত। মূলত, পরিস্থিতি আমাকে সেভাবেই বুঝিয়েছিল। আর হ্যাঁ, সংলাপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। আমি এই বিষয়ে অনেক অনুসন্ধান করেছি, আর বিষয়টির প্রকৃতি বোঝার জন্য অনেক কথোপকথন রেকর্ড করেছি। এটা কোনো যৌক্তিক অগ্রগতির নিয়ম মানে না। কেউ হয়তো কিছু বলল, কিন্তু দেখা গেল অপর ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বলে বসেছে। যদি আপনি বিশ্লেষণ করেন, তবে সেভাবেই বিষয়টি আপনার কাছে ধরা দেবে। সুতরাং, সংলাপ, যদি আপনি তা ব্যবহার করেন, তবে দেখবেন যে সেটা যৌক্তিক নয় আর তা সিনেমার নিগূঢ়তা বা অর্থ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। আমার কাছে সংলাপ তখনই কাজ করে যখন চরিত্রেরা অনর্থক কথা-বার্তা বলছে, যা সিনেমাটি সম্পৃক্ত নয়। আর আমি যথাসম্ভব সেটাই করার চেষ্টা করি। আমি সংলাপ ছাড়াই সিনেমার অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করি—পরিস্থিতি, অভিব্যক্তি বা এমন অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে। এটাই আমার ইচ্ছা, আর সম্ভবত তাতে আমি সফল নই। জিওফ এনড্রিও যা হোক, আপনি যে সফল হচ্ছেন সেটা প্রতীয়মান—কারণ ‘উজাক’ কানস-এ একটি বড় পুরস্কার জিতেছে এবং তারপর থেকে আপনি নিয়মিতভাবেই তা জিতে চলেছেন। আমরা উল্লেখিত ক্লিপ-এ আপনার স্ত্রীকে দেখেছি, এখন চলুন আমরা ‘ক্লাইমেটস’-এর একটি ক্লিপ দেখি। আপনি হয়তো দৃশ্যটির অভিনেতাকে চিনতে পেরেছেন। সিনেমাটির কাহিনি আপনি আপনার বোন ইব্রুর সাথে লিখেছেন এবং নিজেই দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, আর সিনেমাটি ছিল একটি সম্পর্কের ভেঙে যাবার বিষয়ে। এই বিষয়ে নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে সৎ ও পুরুষোচিত বিষয়ে নির্মিত অসম্ভব বিষাদময় একটি সিনেমা। সত্যিকার অর্থেই এটা অনবদ্য আর তা এমন অনেক দিকই ছুঁয়ে গেছে, যা অপরাপর সিনেমাগুলি স্পর্শ অব্দি করে না। এটা তৈরি করা কি আপনার জন্য যথেষ্ট বেদনাদায়ক ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান না, মোটেও নয়। বস্তুত, আমরা তেমন দম্পতি নই যারা জীবনের অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে কথা বলতে ভয় পায়। আমার বরং সে বিষয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। সুতরাং, আপনি যদি জীবনের অন্ধকার দিকগুলোর সাথে পরিচিত থাকেন, তাহলে আপনি নিরাপদ—এটা থেরাপির মতো—ফলে অন্ধকার বিষয়গুলো একত্রিত হতে বা বাড়তে পারে না। বলা যায়, ছোট থাকতেই সাপের মাথা কেটে ফেলার মতো বিষয়। সুতরাং এটা ছিল কৌশলগত দিক, যা আমাদের জন্য মোটেও কঠিন ছিল না। জিওফ এনড্রিও কেন আপনি নিজেই দুটি চরিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি এই সিনেমাটির মাধ্যমে সেই বিষয়ে বলতে চেয়েছি, যা অন্যকে ব্যাখ্যা করা বা বোঝানো কঠিন। আমি চাই নি যে, কিভাবে অভিনয় করবে তা বোঝেনোর জন্য অভিনেতাদের সাথে লড়াই করতে। আমি চেয়েছিলাম যে, কাজটি তারা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই করুক। তাছাড়া যখন আমি চিত্রনাট্য লিখছিলাম, এক ছুটির দিনে আমি ও আমার স্ত্রী সিনেমাটি নিয়ে কথা বললাম। আমরা একটি পরীক্ষামূলক দৃশ্যায়ন করেছিলাম, যেখানে আমরা অভিনয় করেছিলাম আর ফলাফল আমাদের পছন্দ হয়েছিল। সুতরাং সেটা আরেকটি কারণ যার জন্য আমরা সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলাম। সার্বিকভাবে, তুর্কিতে আমার অভিনয় দর্শকরা পছন্দ করে নি [শ্রোতাদের হাসি], কিন্তু আমার ধারণা পশ্চিমারা পছন্দ করেছিল, অপরপক্ষে আমার স্ত্রীর অভিনয় সৌভাগ্যবশত সকলেই পছন্দ করেছিল। জিওফ এনড্রিও এটা আপনার প্রথম সিনেমা যেখানে প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করেছেন। আমার মনে আছে সমুদ্র সৈকতে আপনাদের দুজনের সেই দৃশ্যটির কথা, যেখানে নৌকা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যেতে থাকে এবং সবকিছুই নিখুঁতভাবে রাখা হয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে। যতদূর মনে আছে, যখন এটা আমি কানস-এ দেখছিলাম, দৃশ্যটি দেখে বেশ চমকে উঠেছিলাম। তাছাড়া পুরো সিনেমাটিই ডিজিটাল ক্যামেরার কাজ দ্বারা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকেই এভাবে আগে করে নি। আপনার কি মনে হয় ডিজিটাল টেকনোলজি অভিব্যক্তি প্রকাশের নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত করছে? নুরি বিলগ ছেইলান অবশ্যই। আমি মনে করি, এটার আরও অজানা ক্ষমতা রয়েছে যা অনেক গভীর ও লুকায়িত বিষয় তুলে ধরতে পারে। সুতরাং ফিল্ম এ শুট করা অর্থহীন—তাহলে কেন আর ফিল্মে শুট করব? এই সিনেমাটি পুরোনো ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে শুট করা হয়েছে, আর ইতিমধ্যে তা অনেক উন্নতিও লাভ করেছে। ফিল্ম এ শুট করা খুব ব্যয়বহুল আর অনেক অসুবিধাও রয়েছে। আমার জন্য এটাই যথার্থ। আমি আর কখনোই ছবি তোলা বা সিনেমা তৈরির জন্য ফিল্মে ফিরে যাব না। আমি মনে করি, আমাদের উদার হওয়া দরকার এবং আমাদের গভীরতম আবেগসমূহ তুলে ধরার বিষয়ে নতুন এই টেকনোলজির সুবিধা গ্রহণ করা প্রয়োজন। জিওফ এনড্রিও চলুন এবার ‘থ্রি মাংকিস’ নিয়ে কথা বলা যাক—এটাকে বরং একটি এক্সপ্রেশনিস্ট সিনেমা বলা যায়, এই অর্থে যে, মাঝে মাঝে লাল রং-এর ছটা ছাড়া আপনি রং-এর বিকৃতি ঘটিয়েছেন, যেটা নিতান্তই একমাত্রিক। এর অধিকাংশই সবুজ ও হলুদ, আর দৃশ্যগুলো খুবই অস্বস্তিদায়ক। এটা অনেকটাই এক্সপ্রেশনিস্ট পেইন্টিং-এর মতো। নুরি বিলগ ছেইলান আমি তা জানি না। বস্তুত, আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি, কেন না আবেগ ও অনুভব ভাববাদিতায় অনেক বেশি দমিত। অথচ অনেক সমালোচকই বলেছেন যে, সিনেমাটি ভাববাদী—হয়তো তারাই ঠিক। আমি আরও বেশি সূক্ষ্ম ও গোপনীয় হতে পছন্দ করি, যাতে দর্শকরা আরও বেশি সক্রিয় হতে পারে। আর রং-এর বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, এটাই স্বাভাবিক যে, একজন কোনো কিছু যেভাবে দেখে, বাকিরা তা সেভাবে দেখে না। আমি যখন পৃথিবীর দিকে তাকাই, সেটাই সেই প্রকরণ যা আমি দেখি। আমার ফটোগ্রাফির হয়তো বিষয়টিতে প্রভাব রয়েছে—আর রং আমি এভাবেই দেখি। আমি যখন রং-এর প্রকরণে সম্পৃক্ত হই, মোটেও বুঝতে পারি না যে আমি এসব রং থেকে খুব দূরে সরে এসেছি। আর অবশ্যই এই সিনেমার ক্ষেত্রে আমি চেয়েছিলাম চরিত্রগুলোকে একটু বিচ্ছিন্ন রাখতে। এই বিচ্ছিন্নতা আমি অন্যভাবে করেছিলাম, উদহারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, সিনেমায় আমি তিনটি চরিত্রের মুখ ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রের মুখ দেখাই নি। আর রংগুলোর ব্যবহার এই বিচ্ছিন্নতা তৈরিতে আমাকে সহায়তা করেছিল। বস্তুত, আমি বেশি কিছু করি নি, শুধুমাত্র কনস্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম আর রংগুলোকে আলাদা করেছিলাম। তারপর একটি রং নির্বাচন করেছিলাম, যেটা ছিল লাল, আর তাকে আর একটু সামনে এনেছিলাম। জিওফ এনড্রিও অন্যান্য বিষয়, যেমন আপনি কোনো বিষয়কে জোরালোভাবে প্রকাশের জন্য সুচারুভাবে শব্দ ব্যবহার করেন, আর কাজটি আপনি একদম শুরু থেকেই করে আসছেন। নুরি বিলগ ছেইলান আমি শব্দের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে পছন্দ করি না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা সিনেমায় এমন একটি শব্দ শুনলাম যা পূর্বে শুনি নি। আমাদের কান খুবই নির্দিষ্টভাবে কাজ করে আর আমরা কেবল তাই শুনি, যা আমরা শুনতে চাই। সুতরাং, শ্রোতাদের জন্য আমি কিছু শব্দ নির্বাচন করি এবং তাদের তা শোনাই। শব্দের মাধ্যমে আমি তাদের সেদিকে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে আমি তাদের নিয়ে যেতে চাই, আর বিষয়টি দৃশ্যপটের বাতাবরণকে তেমন হেয়ে উঠতে সাহায্য করে, যেমনটা আমি চাই। তাছাড়া, আপনি যদি শব্দের মাধ্যমে কোনো কিছু বলতে পারেন, তবে আপনার তা দেখানোর প্রয়োজন নেই। জিওফ এনড্রিও সিনেমাটিকে অবশ্যই অন্যান্য সিনেমা থেকে ভিন্ন মনে হয়—কারণ আংশিক হলেও এটাকে একটি ক্রাইম সিনেমা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। যতদূর আমার মনে হয়, এটা মোটেও আত্মজীবনীমূলক নয়, যদিও অনেক কিছুই উহ্য, তারপরও বর্ণনাবহুল। এক অর্থে, এটা বেশ নাটকীয়। আপনি কি মনে করেন, আপনি এখানে এক ধরনের পথ তৈরি করেছেন এবং সে পথ ধরেই এগুবেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমারও তাই মনে হয়, কেন না আপনি সারা জীবন ধরে তো আর আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি করতে পারবেন না [শ্রোতাদের হাসি]। ক্লাইমেটস তৈরির পর আমি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলাম যে, আমার একটি পরিবর্তন দরকার। কিন্তু, তার অর্থ এই নয় যে, আমি এ পথেই যাব। আমি এখনও জানি না। সে সময় মনে হয়েছিল, আমার পরিবর্তন দরকার আর আমিও তা করেছি। ফলাফল হয়তো আবারও আমাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে, কিন্তু, এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত নই। জিওফ এনড্রিও ঠিক আছে, চলুন তবে তা শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করা যাক। প্রশ্ন- ০১ : আপনার প্রতিটি সিনেমাতেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রঙের সমাবেশ রয়েছে, যা আপনার সিনেমার উল্লেখযোগ্য একটি দিক—সেগুলো কি ইমপ্রেশনিস্টিক নাকি এক্সপ্রেশনিস্টিক? আপনি কি আপনার রং-এর ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন এবং সেগুলো দিয়ে আপনি কি করতে চেয়েছেন? নুরি বিলগ ছেইলান সেগুলো ছিল সিনেমায় ব্যবহৃত রং। আমার পক্ষে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল সহজাত প্রবণতা থেকে। এই সিনেমার কথাই ধরা যাক, আমি সিনেমার শুটিং শুরুর পূর্বে রং নির্ধারণ করেছিলাম। আমি লোকেশনগুলোর কিছু ছবি তুলেছিলাম এবং সিনেমায় কোন ধরনের আবহ কাজ করবে তা নির্ধারণ করার জন্য সেগুলো নিয়ে কম্পিউটারে কাজ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি যা চাই তার কাছাকাছি কিছু পেয়েছিলাম। কিন্তু, সাধারণত আমি সত্যিই আগে থেকে জানি না—নিতান্তই সহজাত প্রবণতা থেকে বিষয়টি ঘটে যায়। আমি চাইলে হয়তো এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব, কিন্তু সেটা হবে মিথ্যা [শ্রোতাদের হাসি)] আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০২ : আপনার বয়স কত ছিল যখন আপনি প্রথম স্বল্প দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি [কোজা, ১৯৯৫] তৈরি করেন? সিনেমাটি কানস-এ পুরস্কৃত হয়েছে—আপনি কি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন যে, সেটি একটি ভালো সিনেমা ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান আমি যথেষ্ট বয়স্ক ছিলাম, বস্তুত ৩৬ বছর। তবে আপনি যদি আগে শুরু করতে পারেন সেটাই মঙ্গলজনক। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর কমপক্ষে ১০ বছর কিছুই করি নি শুধু এই চিন্তা ছাড়া যে, জীবন ধারণের জন্য কী করা যেতে পারে। যখন আপনি তরুণ, তখন আপনি সাহসী আর যৌবনে ভুল করাই শ্রেয়। আমি যখন সিনেমাটি তৈরি করলাম, তখন সবসময় ভেবেছি যে, এটা কোনো সিনেমা নয়। আমি কিছু বিষয় নিয়ে শুট করছিলাম, কিন্তু আমি কখনোই ভাব নি যে, কানস সেটাকে গ্রহণ করবে, কিংবা আমি সেটা অন্যদের দেখাব। আমি ভেবেছিলাম, আমি অর্থহীন কিছু করছি। এডিটিং রুমে আমি সেগুলো দিয়ে একটা ধারণা অথবা গল্প তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। আমার মাথায় কিছু একটা চিন্তা-ভাবনা ছিল, কিন্তু আমি সবসময় ভেবেছিলাম যে তা কাজ করবে না। এমনকি সিনেমাটি শেষ করার পর আমার মনে হয়েছিল, এটা একটি বাজে কাজ এবং কেউই সেটা পছন্দ করবে না। আমি আমার বন্ধুদের জিগ্যেস করেছিলাম, ‘সেটা সিনেমার মতো হয়েছে কি না?’ একই প্রশ্ন পুনরায় করেছি, যখন আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য সম্মল টাউন’, ১৯৯৭ তৈরি করেছিলাম। আমার মনে আছে, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে, যেখানে সিনেমাটি প্রিমিয়ার করা হয়েছিল, সেখানে এটি আমার বোনের সাথে দেখার সময়, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ‘এটাকে সিনেমার মতো মনে হচ্ছে না!’ নিজের পুরোনো সিনেমাগুলো দেখা সত্যিই কঠিন, কারণ আপনি কিছুই বুঝবেন না। একটা সিনেমা শেষ করার পর আপনি সম্পূর্ণরূপে অন্ধ। নিরপেক্ষভাবে নিজের সিনেমাটি দেখার কোনো সুযোগই আপনার থাকবে না। কিন্তু, আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে—আমি সবসময় ভুলগুলো খুঁজতে থাকি, যার দরুণ বিষয়টি যন্ত্রণাদায়ক, আর সেজন্য আমি আমার সিনেমা কখনোই দেখি না। জিওফ এনড্রিও একটি বিষয়ে আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই—উজাক-সহ এখন পর্যন্ত আপনি খুব কম সংখ্যক লোক নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছেন। আপনি যদি ‘উজাক’ সিনেমার শুটিং-এর ভিডিও দেখেন, তবে দেখতে পাবেন একটি ছাতার নিচে মাত্র তিনজন লোক একটি দৃশ্য শুট করছে। এখন আপনি অনেক বেশি লোকজন নিয়ে কাজ করেন, যা আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য, আপনার ক্যারিয়ার বিভিন্ন দিক থেকে অনন্য—বিষয়টা কি আপনার জন্য সহজ ছিল নাকি অনেক কঠিন? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত দুটোই, সহজ এবং যথেষ্ট কঠিন। এটা নির্ভর করে বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন। আমি পুরোনো দিনের মতো কাজ করতে পছন্দ করি না—আমি এখন বৃদ্ধ এবং সামর্থ্য কম। মানুষ এমন এক জীব যে সহজেই বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘উজাক’ পর্যন্ত আমি নিজেই নিজের সিনেমা শুট করেছি। কিন্তু এখন, তা করার কথা কল্পনাও করতে পারি না আর সেটা আমার কাছে কঠিন মনে হয়। আমি অলস আর আমার একটি মনিটরের মাধ্যমে কলা-কুশলী, সম্পাদনা, উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ মনে হয়। আমার মনে হয়, বিষয়টি এমনই হওয়া উচিত আর সে জন্যই আমি এখন এভাবে কাজ করি। কিন্তু, অন্যভাবে ভাবলে বিষয়টি খুব কঠিন। যেমন এই সিনেমায় ২০-২৫ জন মানুষ ছিল ক্যামেরার পেছনে আর সবকিছু করতে যথেষ্ট সময় লাগছিল। লোকজন ও জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের ট্রাকের প্রয়োজন পড়েছিল । যদি আপনার মনে থাকে, ‘উজাক’-এ একটি বরফের দৃশ্য ছিল। এটা ইস্তানবুলে খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল, মাত্র দুদিন। কিন্তু, আমরা দুদিনের মধ্যেই শুটিং-এর সব কিছু শেষ করেছিলাম, কারণ আমরা সংখ্যায় ছিলাম অল্প। একটি মাত্র জিপ দিয়েই আমরা সব কলা-কুশলী, মাল-পত্র বহন করতে পারতাম এবং এক স্থান হতে অন্য স্থানে জলদি যেতে পারতাম। আমাদের কাজ হয়ে যেত অনেক দ্রুত। সুতরাং, এই অর্থে সেটা ছিল আমার জন্য সহজতর। কিন্তু, তারপর আমি অনেক কিছুই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। যদি আমি কোনো কিছুর সমাধান করতে না পারতাম, তখন আমি চিত্রনাট্য বদলে দিতাম এবং আরও অনেক কিছুর সাথেই নিজেকে অভ্যস্ত করাতে রাজি ছিলাম। কিন্তু, এখন আমি বেশি ছাড় দিই না, কারণ আমার একজন প্রোডিউসার আছেন এবং তিনি অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এখন আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট অর্থ ও জনবল আছে। সুতরাং, যখন আপনি নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন, তখন সেগুলো এড়িয়ে যেতে চাইবেন না। অতএব, আমার মনে হয়, বিষয়টি একইসাথে অনেক কঠিন ও সহজতর। জিওফ এনড্রিও অলসতা সম্পর্কে তিনি যা বলছেন সেটা বিশ্বাস করবেন না—আমি তার নোটগুলো পড়েছি, তিনি ‘থ্রি মাংকিস’ সম্পাদনা করার সময় রাতে মাত্র দুঘণ্টা ঘুমাতেন। প্রশ্ন-০৩ : ‘থ্রি মাংকিস’-এর একটি চরিত্র একজন রাজনীতিবিদ আর আপনি সিনেমায় এ.কে. পার্টির নির্বাচনে জয়লাভের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েছেন। আমি ভাবছি, যদি আপনি এই সিনেমার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলেন? তাছাড়া, সিনেমাটি কি তুরস্কের রাজনীতির উপর একটি মন্তব্য হিসেবে গৃহীত হয়েছিল? নুরি বিলগ ছেইলান তুরস্কে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে মনোযোগ টানার জন্য সিনেমাটির যথেষ্ট সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি এটাকে এমনভাবে এডিট করি, যাতে সে বিষয়ে সমালোচনা করার কোনো সুযোগ না থাকে। আমি চাই নি সিনেমাটি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। ফলে অনেকগুলো রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল শুট করার পরও আমি সেগুলো সিনেমায় যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিই, কারণ বিষয়টিকে আমি সিনেমায় একটি পার্শ্ববর্তী উপাদান হিসেবে রেখে দিতে চেয়েছিলাম। দর্শক ও সমালোচনাকারীরা সিনেমার এই দিকটিকে সামনে তুলে আনতে বেশ আনন্দ বোধ করে, কিন্তু সেটাকে আমি পেছনে রাখতেই চেষ্টা করেছি। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৪ : এটা পূর্বেও অনেকবার বলা হয়েছে যে, আপনার কম্পোজিশনের ধরন ‘ইয়াসুজিরো ওজু’ [বিখ্যাত জাপানিজ পরিচালক] এর মতো, বিশেষত খুব নিচু অবস্থানে ক্যামেরার পজিশন রাখা, সম্ভবত হাঁটুর উচ্চতায়, বিশেষত ঘরের ভেতরের দৃশ্যটিতে। আপনি কি ইচ্ছা করেই ওজুকে অনুকরণ করেছেন, নাকি সেটা অনিচ্ছাকৃত ঘটেছে? তাছাড়া, এই বিষয়ে কি আপনি আমাদের বলবেন যে, শুটিং এই বিশেষ ধরন কি ক্যামেরার নড়া-চড়া বা ট্র্যাক-এ শুট করা এড়িয়ে যাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা সিঙ্গেল শট-এর বিপরীত। নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, সে [জিওফ এনড্রিও] রাতে খাবারের সময়ও একই কথা জিগ্যেস করেছিল। বস্তুত, ওজু আমার প্রিয় একজন পরিচালক আর আমি ক্যামেরা বেশি নড়াচড়া করি না—কিন্তু, আমি জানি না সেটা ওজুর কারণে নাকি একজন ফটোগ্রাফার বলে। আমি ক্যামেরার অধিক নড়া-চড়া মোটেও পছন্দ করি না, কারণ এটা সবাইকে ক্যামেরা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আর ক্যামেরার উচ্চতা অধিকাংশ সময় আমিই নির্ধারণ করি, আর আমি মনে করি, ওজুর বেলায় সেটা ঘটে ফাঁকা জায়াগায় উল্লম্ব রেখার অবস্থানের কারণে। বইতে তারা লিখেছে যে, ওজু তার ক্যামেরা ভূমি থেকে ৯০ সে.মি. উপরে রাখত, কিন্তু, আমি তা বিশ্বাস করি নি। এটা নির্ভর করে উল্লম্ব রেখার উপর—আর জাপানিজ বাড়িগুলোতে আপনি তেমন অনেক পাবেন। এসব ছাড়াও চরিত্রের মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ—যদি একটি লোককে আপনি উপর থেকে শুট করেন, তবে নিচ থেকে তাকে শুট করা আলাদা কিছু। আমি সাধারণত প্রতিকৃতির বেলায় মুখের উচ্চতায় শুট করতে পছন্দ করি। বিশেষত ক্লোজ শটগুলোর বেলায় ১ সেমি ও খুব গুরুত্পূর্ণ। সে জন্য বিষয়টি আপনি সিনেমাটোগ্রাফারের উপর ছেড়ে দিতে পারবেন না, কারণ সিনোমাটোগ্রাফার কখনোই জানে না কিভাবে পরবর্তী শট-এর সাথে যুক্ত হতে হবে, কেবল পরিচালকই জানেন পূববর্তী শট-এর সাথে পরবর্তী শট-এর সম্পর্ক। সেজন্য পরিচালক খুব সাবধানতার সাথে ক্যামেরার অবস্থান নির্ধারণ করেন, যাতে ব্যাঘাত ছাড়াই মানসিকতা সচল থাকে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৫ : কেন আপনি সিনেমায় প্রচলিত সংগীত ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি সিনেমায় সংগীত পছন্দ করি না, এটা আমার কাছে নির্ভরতার মতো মনে হয়। যদি আপনি সিনেমাটিক ভাবে কোনো কিছু প্রকাশ করতে না পারেন, তখন সেটাকে ছাপিয়ে যাবার জন্য আপনি সংগীত-এর সহায়তা নিতে পারেন। আমি বিষয়টির বিপক্ষে নই, কিন্ত যদি সম্ভব হয় তবে তা ব্যবহার না করারই চেষ্টা করি। এডিটিং-এর সময় আমি অনেক সংগীতাংশ ব্যবহারের চেষ্টা করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিই। তাছাড়া আমার কাছে সিনেমায় বাতাবরণের শব্দই সবচেয়ে সুন্দর। সুতরাং আমি সংগীত-এর চেয়ে বাতাবরণের শব্দই ব্যবহার করতে পছন্দ করি, কারণ সংগীত বিষয়গুলোকে দমিত করে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৬ : কেন আপনি সিনেমাটির নাম ‘থ্রি মাংকিস’ দিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান এটি মূলত কনফুসিয়াস থেকে আগত, যেখানে তার একটি ইতিবাচক অর্থ রয়েছে, কিন্তু পরে সেটি নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। এটা বাস্তবতা থেকে আমাদের পলায়নপরতার মনোভাব প্রতিফলিত করে। জিওফ এনড্রিও এটা কোনো মন্দ দেখে না, শোনে না বা বলে না। নুরি বিলগ ছেইলান সেটাই ছিল মূল বিষয়। জিওফ এনড্রিও এবং অবশ্যই সিনেমাটি সে সব মানুষ সম্পর্কে যারা ভাব করে যে কিছুই ঘটবে না; এটা বস্তুত মিথ্যা সম্পর্কিত। প্রশ্ন- ০৭ : আমি মৃত বালকটি সম্পর্কে আগ্রহী, যাকে দু বার দেখা যায়—কেন আপনি তাকে সে দুটি দৃশ্যে রেখেছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি চেয়েছিলাম বালকটিকে সে-সব দৃশ্যে রাখতে যেখানে একটি চরিত্রের সহনীয়তা প্রয়োজন, বিশেষত সেই চরিত্রটির ক্ষেত্রে যে কিনা বালকটির মৃত্যুর জন্য এক ধরনের অপরাধ বোধ করে।
জিওফ এনড্রিও
প্রশ্ন- ০৮ : আমরা ‘থ্রি মাংকিস’-্এর লোকেশনগুলো সর্ম্পকে জানতে কৌতূহল বোধ করছিলাম, বিশেষত সেই বাড়িটি এবং যেখানে মহিলাটি রাজনীতিবিদের সাথে দেখা করে। এটি কি ‘কোকা মোস্তাফা পাশা’র নিকটবর্তী কোথাও?
নুরি বিলগ ছেইলান
আপনি ঠিক ধরেছেন। জায়গাটি ছিল ইয়েদিকুল ট্রেন স্টেশনের কাছে, একদম বিপরীতে। তাছাড়াও আমরা ব্ল্যাক সি’র কাছে, এনাটোলিয়ান অংশেও শ্যুট করেছিলাম।
জিওফ এনড্রিও
তাছাড়া বাড়িটি সর্ম্পকে এই বিষয়টিও তো ছিল, যে সেটি ভেঙে ফেলা হবে। কিন্তু আপনি যেভাবে এর চিত্রায়ণ করেছেন, তাতে সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়।
নুরি বিলগ ছেইলান
তারাও আমাকে সেটাই বলেছিল, কিন্তু পরে আর করে নি [শ্রোতাদের হাসি]।
জিওফ এনড্রিও
প্রশ্ন- ০৯ : একটি দৃশ্যে, বালকটি যখন দরজার চাবির ফুটোর মধ্যে দিয়ে দেখছিল, তখন আমরা তার মুখে ঘাম ও তা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তে দেখি। বিষয়টি কি নিতান্তই অকস্মাৎ ছিল?
নুরি বিলগ ছেইলান
সিনেমার কিছু দৃশ্য নিতান্তই অকস্মাৎ, কিছু নয়। কিছু সময় আপনাকে একটি দৃশ্য ২০-৩০ বার শুট করতে হয় আর তারপর আপনি সেটাই বেছে নেবেন, যেটাতে আপনি মনে করেন যথার্থ বর্ণনা ওঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, রান্না ঘরে কম্পনরত ছুরির কথা বলা যেতে, সেটা অকস্মাৎ ছিল না। কিছু কিছু সময় আমি সত্যিই গুলিয়ে ফেলি, কোনো অকস্মাৎ আর কোনটি নয়।
জিওফ এনড্রিও
দুঃখজনকভাবে, এই সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি টানতে হবে। আসুন আমরা সবাই করতালির মাধ্যমে নুরি বিলগ ছেইলানকে ধন্যবাদ জানাই।

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.। প্রকাশিত বই : যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা] কাক সিরিজ [কবিতা] এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প] ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com

পোশাক খাত এ মুহূর্তে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেঃ রুবানা হক

সাক্ষাৎকার :রুবানা হক

পোশাক খাতের ভালো গল্পগুলো বিশ্ববাসীকে শোনাতে চাই

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর নতুন সভাপতি হিসেবে আজ শনিবার দায়িত্ব নিচ্ছেন মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড.রুবানা হক। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুল হকের স্ত্রী। বিজিএমইএর ৩৬ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী সভাপতি। পোশাক খাত নিয়ে তার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি গুলশানে তার বাসায় সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবানা হক। তিনি বলেছেন, পোশাক খাতের ভালো গল্পগুলো তিনি বিশ্ববাসীকে শোনাতে চান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবু হেনা মুহিব। সমকাল :নির্বাচনী ইশতেহারে আপনি বলেছেন, পোশাক খাত এ মুহূর্তে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভাবমূর্তি, পোশাকের দর, রফতানি বাজারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবেন- এই ক্রান্তিকাল কী। রুবানা হক :ক্রান্তিকাল এজন্য বলছি যে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো সমস্যায় আছে। শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারছে না। তাদের কষ্ট হচ্ছে। বাজারের চেহারা বদলে গেছে। যারা পোশাক কেনেন, অর্থাৎ ভোক্তাদের রুচি বদলে গেছে। তারা এখন অনেক কম কিনছেন। কিন্তু দামি অর্থাৎ মানসম্পন্ন ভালো পোশাক তারা খোঁজেন। বাজারে দুই ধরনের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। একটি হলো, একেবারেই বেসিক অর্থাৎ কম দামের কাপড় এবং মূল্য সংযোজিত বা উচ্চমূল্যের পোশাক। এই মানের পোশাক আমাদের এখানে কম হয়। আমাদের ৩১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৫ বিলিয়ন শুধু টি-শার্ট পণ্য। কাজেই মূল্য সংযোজিত পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আবার কিছু নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোই চ্যালেঞ্জ। আবার চ্যালেঞ্জ আছে যেখানে, সেখানে সুযোগও আছে। আমাদের সুযোগ হয়েছে, আমরা চেষ্টা করব। সমকাল :ভাবমূর্তি সংকটের বিষয়টি? রুবানা হক :ভাবমূর্তির ঘাটতি কাটাতে নিজেদের গল্পগুলো গুছিয়ে বলতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো আমাদের বিরুদ্ধে যা তা লিখছে। গার্ডিয়ানও সেদিন এরকম একটা রিপোর্ট করেছে। খুবই ভালো একটি কমপ্লায়েন্ট কারখানা, অথচ এটার বিরুদ্ধে যা-তা লিখে দিল। ৪০ লাখ শ্রমিকের শিল্প। সেখানে তো কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকতেই পারে। আমরা যদি ভুল মেনে নিয়ে সেটা ঠিক করতে পারি, তাহলে সম্মিলিত আস্থার জায়গায় আসতে পারি। মিডিয়া, সুশীল সমাজ, মালিক-শ্রমিক এই জায়গাগুলোতে আস্থা অর্জন করা জরুরি। এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমার একটাই পরিচয় নয়। আমি কেবল পোশাক কারখানা চালাই তা-ই নয়। আমি লিখি, আমার বিশ্বাসের জায়গা আছে। আমি আনিসের বিধবা স্ত্রী। আমি তার আদর্শ ধারণ করি। আমার পক্ষে কোনো বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। আমিই খুবই সরল মানুষ, কিন্তু বুঝি কীভাবে এগোতে হবে। আমার মনন আমাকে ধেয়ে বেড়ায়, আমার বিবেক আমাকে ধেয়ে বেড়ায়। আমার পক্ষে কখনও কোনো ফাঁকি হবে না। পোশাক খাতে কোনো সংকট হলে আমাদের ত্রুটি থাকলে আমি ভুল স্বীকার করে মিডিয়ার সহযোগিতা নিতে পারি। আমাদের পোশাক খাতে অনেক ভালো গল্প আছে। আমরা গল্পগুলো বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই, শোনাতে চাই। দ্বিতীয়ত, আমাদের ২০ ভাগ মাত্র সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে কাজ করি, বাকি ৮০ শতাংশ বায়িং হাউসের মাধ্যমে হচ্ছে। এর কারণ, আমাদের দর কষাকষিতে দুর্বলতা আছে। দর কষাকষির জায়গায় আমরা দুর্বল থাকি। এজন্য ক্রেতারা আমাদের চেপে ধরে। সমকাল :বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষিতে এই দুর্বলতা কেন? রুবানা হক :আমাদের উদ্যোক্তাদের একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। পাশের কারখানা হয়তো কেউ ১ ডলারে একটা কাজ করে। তার থেকে কমে আমি হয়তো হুট করে ৭৫ সেন্টে কাজ করলাম। এরকম যারা করে তারা মনে করে কারখানার চাকা চললেই হলো। এ শিল্পে ওভার ক্যাপাসিটির সমস্যা আছে। একেক জন ১০০-২০০ লাইনের কারখানা করে বসে আছি। সেরকম কাজ হয়তো সব সময় থাকে না। এখন চাকা সচল রাখতে গিয়ে অসম প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এতে গোটা শিল্পকে মাশুল দিতে হচ্ছে। এ কারণে শ্রীলংকায় বেইজ সিলিং করে দেওয়া হয়েছে। আমরাও সেরকম চিন্তা করছি। কোনো কারখানা দর কষাকষির সহযোগিতা নিতে চাইলে তাদের সহযোগিতা দেব। সমকাল :দর কষাকষিতে দুর্বলতার ক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় হচ্ছে ভাবমূর্তির দুর্বলতা। রুবানা হক :হ্যাঁ, এই সুযোগটাও নিয়ে থাকে ক্রেতারা। এ জন্য আমরা ভাবমূর্তিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ, ভাবমূর্তি ঠিক করা গেলে আমরা বলতে পারব, এত বেশি গ্রিন কারখানা কোনো দেশে নেই। আমাদের অনেক ভালো গল্প আছে। মিরপুরের একজন নারী শ্রমিকের আয়ের ওপর পরিবারের ৫ সদস্য নির্ভরশীল। আবার ধরেন, শেয়ারড বিল্ডিংয়ের কারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অথচ এসব কারখানাকে উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে দিলে দর কষাকষিতে শক্তি বাড়বে। সমকাল :আমাদের মনোযোগ ছিল অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সকে তাড়ানোর দিকে। রুবানা হক :অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে তাড়ানোর পক্ষে আমিও। তারা আমাদের অনেক উপকার করেছে। তবে অ্যাকর্ড নানা ছুতা খুঁজছে। অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব অয়েজের ভিসা নেই হয়তো। কাজের অনুমতি হয়তো নেই। তাদের অনেক দুর্বলতা আছে। তারপরও তারা থাকছে ৮টি শর্তের ভিত্তিতে। এই শর্তগুলোর চারটা আমার লেখা। বাকি চারটা মহিউদ্দিন ভাইয়ের (বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি) লেখা। এই শর্ত থেকে আমরা সরব না। এই শর্ত খাড়া থাকলে অ্যাকর্ড কাজ চালিয়ে গেলেও কোনো সমস্যা তৈরি করার সুযোগ থাকবে না। অ্যাকর্ডের অফিসে বিজিএমইএর সেল থাকবে। এই সেল প্রতিদিনের কাজ তদারক করবে এবং আদায় করবে। দুই পক্ষের প্রকৌশলীরা যেকোনো বিষয়ে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। সমকাল :পোশাক খাত এগিয়ে নিতে আপনার পরিকল্পনা কী? রুবানা হক :আমাদের গল্পগুলো কখনই গুছিয়ে বলতে পারিনি। আমার পরিকল্পনা আছে, প্রতিটি কারখানার সাধারণ শ্রমিকের গল্পটা সুতায় বেঁধে দিতে পারি কি-না। ছোট একটা বারকোডে ৭ সেকেন্ডের একটা গল্প বলা। ক্রেতারা তা জানুক। এথিক্যাল বায়িং (ক্রয় বাণিজ্যে নৈতিকতা) নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তারা জানুক যদি তারা বাংলাদেশের পোশাক না কেনে তাহলে এই শ্রমিকরা যাবে কোথায়। ক্রেতাদের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে আমার স্বপ্ন আছে। আমার আরও কিছু পাগলা স্বপ্ন আছে। আমাকে এমনিতে সবাই শ্রমিকপাগল বলে। ২০ মিলিয়ন ডলারের ওপরে যাদের রফতানি তাদের কারখানায় স্কুল থাকতে হবে। আমি শ্রমিকদের স্বপ্ন দেখাতে চাই। আমি ৫৫ বছরে পিএইচডি করেছি। শ্রমিকরা কেন আরও বড় কাজ করার জন্য এগোতে পারবে না। আমাদের ১৫০ শ্রমিক এখন এশিয়ান উইম্যান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। তারা ইংরেজিতে কথা বলতে খুব সাবলীল। আমাকে ইংরেজিতে মেইল করে, কেন ল্যাপটপ দিচ্ছি না। অর্থাৎ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ আছে সামনে। এজন্য শ্রমিকদের তৈরি করতে তাদের পুনঃদক্ষতার সুযোগ দিতে হবে। যদি শ্রমিকদের দিয়ে না পারি, তাহলে তাদের সন্তানদের দিয়ে চেষ্টা করব। এ বিষয়ে সরকারের এটুআই প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা আছে আমার। সমকাল :তৈরি পোশাকের দুর্বলতার কারণে গোটা রফতানি খাতের মার্কিন জিএসপি স্থগিত করা হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে আপনাকে কতটা পীড়া দেয়? রুবানা হক :ভীষণ পীড়া দেয়। তবে, এই স্থগিতাদেশ মূলত রাজনৈতিক কারণে। কলম্বিয়ার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের দেশের সঙ্গে চুক্তি করে আমেরিকা। অথচ আমাদের জিএসপি স্থগিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও শ্রম-সংক্রান্ত অনেক দুর্বলতা আছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই সেখানে। শ্রমিক ইউনিয়ন কয়টা আছে তাদের। সমকাল :শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? রুবানা হক :হ্যাঁ, এটা সত্য। মিডলেভেল ম্যানেজমেন্টে আমাদের দুর্বলতা আছে। বিজিএমইএতে এ-সংক্রান্ত কী প্রকল্প আছে সেটা দেখতে হবে। শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য দাবি আদায়ে যা করতে হয় আমি তা করব। আমার কাছে দাবি করতে হবে না। আগেই বলেছি আমার কাছের লোকজন আমাকে শ্রমিকপাগল বলে। সুতরাং তাদের বিষয়ে আমার একটা মমত্ববোধ আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পর ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে সুদে গৃহায়ন ঋণ থেকে শুধু আমি এবং মহিউদ্দিন ভাই ঋণ পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার ৫ বছর পরও কাজ না হলে সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। আর একটা কথা বলি, শ্রমিকদের জন্য কোনটা কল্যাণ সেটা বুঝতে হবে। কোনো কিছু গড়তে অনেক সময় লাগে। ধ্বংস করতে লাগে আধা মিনিট। এটা বোঝা দরকার। সমকাল :স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে পোশাক রফতানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি? রুবানা হক :রফতানিতো বাড়াতেই হবে। আগামী বছর ৪০ বিলিয়ন এবং পরের বছর ৫০ বিলিয়ন। এটা বাড়ানোর জন্য এক্সিট প্ল্যান করা হবে। যারা টিকতে পারছে না তাদের আইনসম্মতভাবে বিদায় নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যারা সহযোগিতা দিলে সক্ষমতা বাড়বে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হবে। বড় কারখানাগুলোকে উচ্চ মূল্যের পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। নতুন বাজার বিশেষ করে রাশিয়ায় যেখানে ৪৫ শতাংশ হ্রাস করা কিংবা এরকম অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা, ইউরোপের যে সব দেশে বাজার বাড়েনি সেখানে বাড়ানো। এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কাজ করতে চাই।

মিশেল ওবামার দুই সন্তানের জন্ম হয়েছে আইভিএফ বা টেস্ট টিউব...

Michelle Obama reveals daughters were conceived by IVF

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিকামিং’প্রকাশ পেলো। মিশেল ওবামার দুই সন্তানের জন্ম হয়েছে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) বা টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে। Former First Lady Michelle Obama has released a memoir in which she reveals difficulties about her marriage and pregnancy with her two daughters. https://twitter.com/twitter/statuses/1060875880363307009 এটি মিশেলের দ্বিতীয় বই। এর আগে ২০১২ সালে তাঁর প্রথম বই ‘আমেরিকান গ্রোন’ প্রকাশিত হয়। এতে হোয়াইট হাউসে তাঁর করা সবজির বাগান সম্পর্ক লিখেছেন এবং স্বাস্থ্যকর জীবন সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে উৎসাহ জোগাতে প্রচার চালান। প্রকাশনী সংস্থা পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বইটি বিভিন্ন দেশে প্রচারে অংশ নেবেন। বইটি ২৪টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। বইটির মাধ্যমে পাঠককে তাঁর ভুবনে স্বাগত জানানো হয়েছে। জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা তাঁকে পূর্ণতা দিয়েছে, এর বিবরণ আছে বইয়ে। শৈশব থেকে শিকাগোর সাউথ সাইডে তাঁর কর্মজীবন, মাতৃত্ব ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা, বিশ্বের বিখ্যাত সব স্থানে তাঁর সময় কাটানোর বিষয়গুলো বইয়ে উঠে এসেছে। বইটি প্রকাশের সময় বারাক ওবামা বইটির ১০ লাখ কপি ওবামার পরিবারের নামে তৈরি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে দান করার পরিকল্পনা করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শিশুদের জন্য শিক্ষায় সমসুযোগ নিশ্চিত করতে নতুন বই, শিক্ষা উপকরণ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করে থাকে। একই প্রকাশনা থেকে বারাক ওবামাও একটি আত্মজীবনীমূলক বই লিখছেন। এ বছরেই বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা।

রেড বার্ডস: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের এক জ্বলন্ত চিত্র

রেড বার্ডস: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের এক জ্বলন্ত চিত্র

 রিফাত মুনিম
dhaka lit fest logo
মোহাম্মাদ হানিফের তৃতীয় উপন্যাস, “রেড বার্ডস” এর পটভূমি হল চারিদিকে বিশাল মরুভূমি ঘেরা এক শরনার্থী শিবির। জায়গা ও মরুভূমির কোনো নাম উপন্যাসে উল্লেখ করা হয় নি। তবে পাঠকের বুঝতে কষ্ট হয় না যে এটি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ। হয়তো বালির এই সমুদ্রটি আফগানিস্তান বা ইরাক। তবে একটি বিষয় পুরোপুরি নিশ্চিত যে জায়গাটি মার্কিন বিমানের বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত, চারিদিক বাড়িঘরের ভাঙা টুকরোয় লণ্ডভণ্ড; আর শিশু থেকে বৃদ্ধ- কেউই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। খালেদ হুসাইনির “এ থাউজ্যান্ড স্প্লেনডিড সান্স” এর পটভূমি ছিল আফগানিস্তানে, বিশেষত কাবুলে। হানিফের উপন্যাসটি পড়ে এরকম নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, তবে এটা ছাড়াও আরো গভীর পার্থক্য রয়েছে। হুসাইনির গল্পতে বিভিন্নরূপেই প্রমাণিত হয় যে এটা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের এক অফিসিয়াল বর্ণনা। গীতিময় অলঙ্কারে এক গদ্য তিনি গেঁথেছেন যেখানে দেখা যায় মরিয়ম ও লায়লা চরিত্র দু’টি তাদের নির্যাতনকারী স্বামীর হাত থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে যা তালেবানদের উত্থানের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হয়। “দ্য কাইট রানার” উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত পাঠকরা সহজেই এর পরের ঘটনাবলি আঁচ করতে পারবেন: নারীদের প্রহার করা, নির্যাতন করা এবং অবস্থা সবচেয়ে করুণ হয় যখন তালেবানদের দ্বারা ওই নারীদেরকে জনসম্মুখে হত্যা করা হয়। হ্যাঁ, তারা অবশেষে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বারা নিরাপত্তা পেয়েছে এবং আফগানরাও তাদের শহরে ফিরে এসেছে যেখানে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে রিচার্ড অ্যাটেনবরো’র সিনেমা ‘গান্ধী’ (১৯৮২) সম্পর্কে সালমান রুশদীর তীব্র সমালোচনার প্রসঙ্গ এনে বলা যায়, এটা সত্য আর রাজনৈতিক গভীরতার ফাঁদে পড়া ভুলের মাশুল। অন্য দিকে, হানিফ আমাদেরকে এমন এক গল্প উপহার দেন যা মার্কিন আগ্রাসনের কাহিনীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখে। শৈলীর আমেজ বাদ দিয়ে তিনি দিয়েছেন এক তীব্র বর্ণনা, যা পুড়িয়ে দেয়, যা দহন করে; ঠিক যেন মরুভূমির খরতাপ আর মার্কিন ফাইটার জেটের বোমার ভয়ঙ্কর আগুনের মতো। তবে প্রজ্ঞা, আয়রনি, অ্যাবাসার্ডিটির অসাধারণ মিশেল তিনি ঘটিয়েছেন যা দার্শনিক প্রশ্ন উদ্রেক করে, মার্কিন অর্থ দেওয়া যুদ্ধ ও এই সম্পর্কিত যুদ্ধ-অর্থনীতিকে অনবদ্যভাবে বিদ্রুপ করে। মূল উত্তেজনা তৈরি হয় যখন মোমোর বড় ভাই আলি উধাও হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের সঙ্গে আলি কাজ করতো, কয়েকমাস পরে  রহস্যজনকভাবে তার বয়সী অনেকের মতো সেও উধাও হয়ে যায়। না খেতে পেয়ে এল্লি যখন প্রায় মৃত অবস্থায় তখন তাকে পাওয়া যায়। যে ক্যাম্পে এল্লির বোমা মারার কথা ছিল সেখান থেকে মোমো তাকে ড্রাইভ করে নিয়ে আসে। গল্পে ইউএসএইড এর একজন পরামর্শকও থাকে যাকে “মঙ্গলকারী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী অথবা যুদ্ধের সময়কার মুসলিম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি একটি বই লিখছেন। এই ধরণের বিচিত্র আয়রনি ছাড়াও, উপন্যাস জুড়ে রয়েছে চিন্তা, আবেগ, অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ যা পড়ে আমি বারবার শব্দ করে হেসে উঠছিলাম যেমনটা হাসি পেয়েছিল হানিফ কুরেইশির “দ্য বুদ্ধ অফ সাবার্বিয়া” অথবা ফিলিপ রথের “পোর্টনইয়’স কমপ্লেইন্ট” পড়ার সময়। একই সাথে, মার্কিন মদদপুষ্ট যুদ্ধে একজন আরব অথবা আফগান মা অথবা ভাইয়ের হারানোর বেদনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার হাস্যকর কাজকর্ম এবং মার্কিন সৈনিক ও সাহায্য সংস্থার কর্মীদের মানবিক দিকগুলোও সম্পর্কেও আমাকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। দার্শনিক অনুসন্ধান ও অনবদ্য সাহিত্যিক দক্ষতার সঙ্গে বইটি দিতে পেরেছে অসাধারণ বিদ্রুপও।

মাত্র ৫৬ বছরে চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু

চলে গেলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু

  জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু আর নেই (ইন্না ... রাজিউন। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সকালে নিজের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। আইয়ুব বাচ্চুর ব্যক্তিগত গাড়িচালক জানান, হাসপাতালে নেয়ার পথে গাড়িতে এক পর্যায়ে তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এ সময় তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। স্কয়ার হাসপাতালের মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল বিভাগের পরিচালক ডা. মীর্জা নাজিমুদ্দীন জানান, সকাল সাড়ে আটটায় বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন আইয়ুব বাচ্চু। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক তার গাড়িতে করে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমরা সব ধরনের চেষ্টা করেছি। তবে পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়। তিনি আরও জানান, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো তার হার্টে রিং পরানো হয়। তবে সম্প্রতি তিনি ঘনঘন হৃদরোগে ভুগছিলেন। দুই সপ্তাহ আগেও তিনি শরীর চেকআপ করাতে হাসপাতালে এসেছিলেন। ডা. নাজিমুদ্দীন বলেন, সম্প্রতি তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। যাকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় কার্ডিওমায়োপ্যাথি। হাসপাতালে আনার সময় কার্যকারিতা শূন্যের ঘরে চলে আসে। আর এতেই তার মৃত্যু হয়। আইয়ুব বাচ্চু ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে গায়ক, লিডগিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন। এর আগে তিনি দশ বছর সোলস ব্যান্ডের সাথে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সঙ্গীতজগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ফিলিংসের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে। অত্যন্ত গুণী এই শিল্পী তাঁর শ্রোতা-ভক্তদের কাছে এবি নামেও পরিচিত। তাঁর ডাক নাম রবিন। মূলত রক ঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিকাল সঙ্গীত এবং লোকগীতি দিয়েও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।   https://youtu.be/83NXg6qfTQc

লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

ভিডিও রিপোর্ট

  Posted by Kheiruz Zaman on Friday, October 12, 2018
On the inauguration event of ‘Jasmin Khan Foundation’ on 10-12-2018 in its office at Clover Road, Pacoima, CA. Posted by Majib Siddiquee on Friday, October 12, 2018

‘দ্য লাস্ট গার্ল’ এর নোবেল বিজয়

নাদিয়া মুরাদ ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী।এখন ওর ২৫ বছর বয়স। ২০১৪ সালে নাদিয়া তখন ২১ বছরের একজন উচ্ছল মুসলিম তরুণী। ইরাকের একটি পাহাড়ি এলাকা নাম তার সিনজার। এই পাহাড়ি অঞ্চল সিনজারে একটি গ্রাম ইয়াজিদি। সেই গ্রামে নাদিয়ার জন্ম থেকে বেড়ে উঠা। ২০১৪ সালের ইয়াজিদি গ্রামে আকস্মিক হামলা চালায় আইএস জঙ্গিরা,যারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম হিসেবে। মুসলিম নামধারী এই আইএস জঙ্গিরা নির্বিচারে শুরু করে গনহত্যা। গ্রামের প্রায় সব পুরুষ ও বয়স্ক নারীদের হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে নাদিয়ার ছয় ভাই এবং তার মাও ছিলেন। জঙ্গিরা গ্রামের অন্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়াকেও ধরে নিয়ে যায় এবং যৌনদাসী হিসেবে বন্টন করে দেয়। নানা হাত ঘুরে একসময় মসুল পৌঁছে যান নাদিয়া। এই সময়ে তাকে আইএস জঙ্গিরা অসংখ্যবার ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করে। এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন নাদিয়া, ফল ধরা পড়া। বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। কিছুদিন পর তাকে আবারও বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল। একদিন সুযোগ বুঝে আইএস বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এক সুন্নি মুসলিম পরিবারে আশ্রয় নেন নাদিয়া। ওই পরিবার তাকে মসুল থেকে পালিয়ে আসতে সব রকম সহায়তা করে।নাসির নামে এক সুন্নি মুসলমান নাদিয়াকে স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আইএসের কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা মসুল সীমান্ত পার করে দেন। জীবনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীকে জানাতে ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে একটি বই লেখেন নাদিয়া, যা ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়। ওই বইতে তিনি লেখেন,“কখনও কখনও ধর্ষিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই সেখানে ঘটত না। একসময় এটা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।" আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর পাঁচ হাজারের বেশী পুরুষ কে হত্যা করে। ধরে নিয়ে যায় তিন হাজারের বেশী যুবতী নারীকে। তাদের উপর চালায় যৌন নির্যাতন। প্রতিদিন এই নারীরা শিকার হত ধর্ষণের। ২০১৫ সালে ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আইএসের হাতে নিপীড়নের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নাদিয়া। তিনি মানবাধিকার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহারের বিরুদ্ধেও কাজ শুরু করেন। নিজের আত্মজীবনী "‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে লেখা একটি বইয়ে সেই কাহিনি তুলে ধরেন তিনি। যৌন সহিংসতা ও হয়রানিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে লড়াই করে এই বছর ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জঙ্গিদের হাতে ধর্ষণের শিকার ইয়াজিদি নারী নাদিয়া। দাড়িয়ে স্যালুট তোমাকে হে নারী। তোমার জন্য থাকছে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।।

সন্দেহবাদিতা

সন্দেহবাদিতা

মো. রফিকুল ইসলাম
(সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা: লেখাটি নিতান্তই রম্যকথন। সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। গল্প ও জোকসগুলো সংগৃহীত) আমার প্রবাসী বন্ধুটি আবারও অনুরোধ করেছে সন্দেহ বা সন্দেহবাদিতা বা সাসপিশন নিয়ে কিছু লিখতে। আগেরবার মনে করেছিলাম বন্ধু হয়ত জ্ঞানের বহর বাড়াতে আমাকে দিয়ে ঘাটাঘাটি করিয়ে কিছু লিখিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এবারে একটু সন্দেহ হল। ঘটনা কি? এতো জ্ঞানার্জন নয়। নিশ্চয় অন্য কোন বিষয় আছে। বন্ধুকে হালকা চেপে ধরতেই স্বীকার করতে বাধ্য হলো সে সন্দেহের আওতায় আছে। কার সন্দেহের আওতায় আছে তা নিশ্চয় আপনাদের বলে দিতে হবে না। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। তিনি ধর্মপত্নীর সন্দেহের ঘেরাটোপে আবদ্ধ আছেন। কিছুতেই এ জাল ছিন্ন করতে পারছেন না। তাই সন্দেহের আদি অন্ত নাড়াচাড়া করে যদি মনে একটু শান্তি আসে তাই এ অনুরোধ। শুধু আমার বন্ধু কেন শতকরা নব্বই ভাগ বিবাহিত পুরুষই নিজ নিজ পত্নীর সন্দেহের তালিকায় থাকেন। পরিসংখ্যান নিয়ে আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে? আপনার সন্দেহ যুক্তিসংগত। ঠিক ধরেছেন, এটা কোন জরিপের ফলাফল নয় নিতান্তই আমার অনুমান মাত্র। এ ধরনের কোন জরিপ আছে কিনা সেটাও আমার জানা নেই। জানার দরকারও নেই। আপনি কি বিবাহিত। তাহলে বুক হাত দিয়ে ভাবুন তো একবার, না, বলার দরকার নেই। আপনি কি সন্দেহের বাইরে? যদি হন তাহলে আপনি ভাগ্যবান। না হলে ঐ নব্বই জনের একজন আপনি। দাঁড়ান দাঁড়ান কিসের সন্দেহের আওতায় আছেন তা কিন্তু এখনও বলিনি। উল্টাপাল্টা কিছু ভেবে বসবেন না যেন। একটু ধৈর্য ধরুন সব খোলাসা হবে। বাংলা ভাষায় সন্দেহকে সংশয়, অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা, দ্বিধা, অপ্রতীতি, খটকা বা অভিশংকা ইত্যাদি নানাভাবে বর্ণনা করা যায়। সন্দেহের ইংরেজি পরিভাষা সাসপিশন শব্দটি ল্যাটিন Suspere শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ To suspect। ইংরেজি ভাষায় সাসপিশন শব্দটি চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে ভাষায় এর যেদিনই ব্যবহার শুরু হোক না কেন সন্দেহ অবিশ্বাস যে আদি মানব সন্তানের সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু হয়েছে সে বিষয়ে কিন্তু কোন সন্দেহ নেই। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না, সন্দেহ হচ্ছে তাহলে আদি পিতার বেহেশতের সেই নিষিদ্ধ ফল খাবার ঘটনাটি নতুন করে মনে করুন তাহলেই আপনার সন্দেহভঞ্জন হবে। আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের সন্দেহের আওতায় পড়ছি। আবার আমরাও মাঝে মধ্যে অন্যকে সন্দেহের আওতায় আনছি। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে যারা অন্যকে সহজে সন্দেহ করতে চায় না। এজন্য অবশ্য তাদের বিপদে পড়ার সম্ভবনাও থাকে। যাক সে বিষয় পরে বলা যাবে আগের বিষয় আগে। দু'টো শ্রেনির সন্দেহের আওতায় আসলে আমরা সব থেকে বেশি নাস্তানাবুদ হই। এক নিজ স্ত্রী আর দ্বিতীয় পুলিশ। একটিতে আপনি বেইজ্জত হতে পারেন পরিবারের মধ্যে আর দ্বিতীয়টিতে জনসম্মুখে। প্রথমটি নিয়ে হয়ত অনেকের সংশয় বা সন্দেহ হচ্ছে। উদাহরন দিচ্ছি মিলিয়ে নিন। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামী সম্পর্কে অতিশয় উচ্চ ধারনা পোষন করে। যেমন স্বামী বেচারা হয়ত সরকারী বা বেসরকারী নির্ধারিত বেতনে চাকুরী করে বা ছোট খাট ব্যবসা করে সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। স্ত্রী নিজেও হয়ত চাকুরী করে। সেও জানে তার স্বামীর আয় কত। তবুও সে সব সময় সন্দেহ করবে নিশ্চয় তার স্বামী গোপনে আত্মীয় স্বজনকে টাকা পাচার করে দিচ্ছে। ভাববে স্বামী তার ভাইকে জমি বা বাড়ি কিনে দিচ্ছে বা ভাগ্নে বা ভাস্তেকে পড়ার খরচ দিচ্ছে নিজ সংসারের দিকে না তাকিয়ে। সব স্ত্রীরই ধারনা তার স্বামীর নিশ্চয়ই এক্সট্রা ইনকাম আছে অথবা আছে অফুরান্ত অর্থের ভান্ডার। সে স্ত্রী সন্তানকে বঞ্চিত করে শুধু বাবা মার সংসারে বা আত্মীয়দের অকাতরে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে। এতো গেল টাকা পয়সা নিয়ে। অন্য বিষয়! বেচারা স্বামীর হয়ত কোন কারনে বাসায় ফিরতে দেরি হচ্ছে। তো শুরু হয়ে গেল মুহূর্মুহু টেলিফোন। যদি কোন কারনে মোবাইল অফ থাকে বা ব্যাটারী শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্বামী বেচারার কপালে দুঃখ আছে। প্রায় প্রত্যেক স্ত্রীই ভাবে তার স্বামীর প্রেমে তাবত সুন্দরীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। তাই দেরি হলে তাদের ধারনা স্বামী প্রবর এতক্ষন নিশ্চয় স্ফূর্তি করে আসলেন। ওই যে বলছিলাম স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের সামর্থ্য সম্পর্কে অতি উচ্চাশা পোষন করে। তবে কোন কোন বুদ্ধিমান জ্ঞানী ব্যক্তি স্বামী নামের এ আসামীদের এ অবস্থা থেকে উদ্ধারে কিছু কিছু পথ বাৎলে দিয়েছেন। তার দু'একটা টিপস আপনাদের দেই। কাজে লাগাতে পারেন। এতে কাজও হতে পারে। কাজে না লাগলে আমাকে দোষ দেবেন না যেন। এগুলো আমার আবিষ্কারও নয় বা আমার দ্বারা পরীক্ষিতও নয়। যেমন ধরুন, আপনি হয়ত ট্যুরে আছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে টেলিফোন করবেন কোথায় কি করছেন তার রানিং কমেন্ট্রি দিয়ে। একে বলা যায় হাজিরা কল। আপনি হয়ত সন্ধ্যার পর বন্ধু বা বান্ধবীদের নিয়ে আসলেই স্ফুর্তি করছেন। এ সময় স্ত্রীর কল। কি করবেন? ঘাবড়াবেন না। খুব পরিশ্রান্তের সুরে জবাব দিন সারাদিন একঘেয়ে মিটিং করে এই মাত্র হোটেলে ফিরলেন। কাজে লাগতে পারে এমনকি সহানুভূতিও পেতে পারেন। অথবা ধরুন, আপনার স্ত্রীও হয়ত জানে আপনি স্ফূর্তির জায়গায় আছেন। তখন প্রেমঘন স্বরে বলুন আই মিস ইউ। তুমি থাকলে ভাল লাগতো। দেখবেন আপনার সাত খুন মাপ হতেও পারে। তবে অতিশয় বুদ্ধিমান স্বামীরা কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে দিব্যি স্ত্রীর নাকের ডগায় স্ফূর্তি করে বেড়াচ্ছে। একটা গল্প বলি শুনুন। একদিন কুদরত সাহেব ভুলে মোবাইল বাসায় ফেলে অফিসে গেছেন। অফিস থেকে ফোন করে স্ত্রীকে দুপুরে লাঞ্চের সাথে ড্রাইভারের কাছে ফোন পাঠিয়ে দিতে বললেন। স্ত্রী এ সুযোগে স্বামীর ফোনটি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন। ফোনবুকে ঢুকে দেখলেন সন্দেহজনক তিনটি নম্বর গর্জিয়াস ওম্যান, প্রেটি লেডি ও মাই লাভ নামে সেভ করা। স্ত্রীর তো মাথায় খারাপ হবার যোগাড়। কুদরত সাহেবকে নিতান্তই গোবেচারা মনে হয় যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। অথচ তলে তলে এত। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে। আজকেই ধরতে হবে। একেবারে জন্মের শিক্ষা দিতে হবে। ছোক ছোকানির সাধ মিটিয়ে দিতে হবে। আসুক আজ বাড়িতে। তবে তার আগে ধরতে হবে এ তিন শাঁকচুন্নি কারা। কুদরত সাহেবের ফোন থেকে ফোন করলে নিশ্চয় ধরবে। তখনই বুঝা যাবে তারা কারা। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই গর্জিয়াস ওম্যানকে ফোন করলেন। ওপাশের ফোন কল রিসিভ করলো। হ্যালো বাবাজী, কেমন আছ? আমার মেয়ে কেমন আছে। অসময়ে ফোন করলে? কোন অসুবিধা? মা আমি তোমার মেয়ে বলছি। তোমার জামাই ভুলে ফোন রেখে গেছে। সে ফাঁকে তোমাকে ফোন করলাম। আরও দু'চার কথা বলে ফোন রেখে দিলেন। স্ত্রী ধাক্কা খেলেন। আজকাল মানুষ নিজের মাকেই পাত্তা দেয় না আর সে কিনা শাশুড়ির নাম সেভ করেছে। আসলেই লোকটা নরম মনের মানুষ। তা বলে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তিনি এবারে ফোন করলেন প্রেটি লেডির নম্বরে। হ্যালো দুলাভাই। আচ্ছালামু আলাইকুম। এতদিনে আপনার একমাত্র শালীর কথা মনে পড়লো। ঋতু, আমি তোর আপা বলছি রে। তোর দুলাভাই ভুলে ফোন বাসায় রেখে গেছে। তুই কেমন আছিস। আরও অল্পকিছু কথা বলে ফোন রেখে দিল। না! তার স্বামীটা তো আসলেই ভাল মানুষ। নিজের বোন নেই তাই শালীকে বোনের মত দেখে। কিন্তু মাই লাভটা কে? খটকা এখনও দূর হয়নি। এবারে রিং দিল মাই লাভের নম্বরে। রিং হচ্ছে। ওমা তার নিজের নম্বরও বাজছে। নিজের ফোন হাতে নিয়ে দেখে তার স্বামীর নম্বর। সে পুরো থ হয়ে গেল। তার ভীষণ কান্না পেল। ফেরেস্তার মত স্বামীকে সে সন্দেহ করলো। তার খুব অনুশোচনা হল। সে সারাদিন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলো। বিকেলে কুদরত সাহেব ফিরলে পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললো। মাফ চাইলো। আর কুদরত সাহেবের হাতে তুলে দিল দশ হাজার টাকা ইচ্ছেমত খরচ করতে। এ টাকাটা সে অনেক কষ্টে জমিয়েছিল। অথচ একদিন আগে হলে জান থাকতে সে এ টাকা কাউকে দিত না। কিন্তু সে আজ এতটাই অনুতপ্ত আর তার পতিভক্তি ও পতিপ্রেম এতটাই উথলে উঠেছে যে এ টাকা তার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। কুদরত সাহেব টাকাটা নিলেন। এ টাকায় একটি সুন্দর শাড়ি কিনে গিফট দিলেন বান্ধবী সিনথিয়াকে। ভাবছেন, কুদরত সাহেবের স্ত্রী ফোনে সিনথিয়ার নম্বর পেল না কেন? পাবে কি করে ওটা তো সেভ ছিল গফুর চাচা মোটর মেকানিক নামে।

সন্দেহবাদিতা ২

স্ত্রীর সন্দেহের আসামী হলে কি কি হতে পারে তার ধারনা ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন। এবারে তাদের সন্দেহ যে কখনও কখনও উপকারী হতে পারে তার একটা উদাহরন দেই। ধরুন, আপনি সকালের ঘুমটা খুব পছন্দ করেন তাই সকালে দেরি করে উঠেন। কিন্ত আপনার স্ত্রী চান আপনি সকালে উঠে হাটতে যাবেন যাতে আপনি স্লীম থাকেন। কি আর করা, আপনার কষ্ট হলেও স্ত্রী আজ্ঞা পালনে নিতান্ত অনিচ্ছায় হাটতে বের হন। কিন্তু আপনি সকালের ঘুমটা খুব মিস করেন। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে শুধু স্ত্রীর মনে একটু সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবেন। কিভাবে? দিন কয়েক পর হেঁটে বাসায় ফিরে উৎফুল্লভাব দেখান বা চাইলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জনপ্রিয় কোন গানের কলিও ভাজতে পারেন। ভাব দেখান আপনার হেঁটে খুব ভাল লাগছে। নিশ্চিত আপনার স্ত্রী আপনার উৎফুল্লতার কারন জানতে চাইবে। বলবেন, " আর বলো না হেঁটে খুব মজা পাচ্ছি। সকালবেলা আমরা যে রাস্তায় হাঁটি সে রাস্তার পাশে বাচ্চাদের স্কুলে সুন্দর সুন্দর মায়েরা বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে আসে। বাচ্চাদের স্কুলে ঢুকিয়ে তারা রাস্তার ধারে আড্ডা দেয়।" ব্যস আর কিছু বলার দরকার নেই। আপনার কথা শুনে স্ত্রীর কথা বন্ধ হয়ে যাবে, মুখ ভার হবে। আপনি সারাদিন চুপটি থাকুন। শুধু ঘুমুতে যাওয়ার আগে সকালে হাঁটতে যাওয়ার কোন প্রসংগ তুলতে পারেন বা নাও তুলতে পারেন। কিন্তু নির্দেশ পাবেন, "কাল থেকে আর তোমাকে হাঁটতে যেতে হবে না।" আঃ! কি শান্তি! নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন। পুলিশের সন্দেহের আসামী হলে কি সমস্যা হতে পারে তার একটু ধারনা দেওয়া যাক এবার। আপনি কপালদোষে পুলিশের সন্দেহের আওতায় যদি এসেই পড়েন তাহলে পুলিশের সন্দেহভঞ্জনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৪ ধারায় আপনি লাল দালানে ঢুকে যেতে পারেন। কপাল ভাল হলে উকিল মোক্তার ধরে বাড়ি ফিরে বাড়ির ভাত খেতে পারবেন। আর যদি কপাল খারাপ হয় তাহলে লাল দালানে ভাত খেতে হতে পারে। কতদিন? তা জানতে জনপ্রিয় জোকটি শুনুন। এক বনের ধারে এক শেয়াল দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ সে দেখলো একটা মহিষ ব্যস্ত সমস্ত হয়ে দৌড়ে গভীর বনের মধ্যে ঢুকছে। শিয়াল তাকে জিজ্ঞেস করলো, "এই মহিষ, তুমি এত ব্যস্ত হয়ে কই যাও।" উত্তরে মহিষ বললো, "ও, তুমি জানো না বুঝি। হাতি ধরতে বনে পুলিশ এসেছে।" "আরে বোকা মহিষ তাতে তোমার কি তুমি তো আর হাতি না?" শিয়াল মহিষকে টিটকারি মারলো। মহিষ হেসে জানালো, "এটা এমন দেশ ২০ বছর জেলে থেকেও আমি প্রমান করতে পারবো না আমি হাতি না, মহিষ।" শুনে শেয়াল নিজেও আর দাঁড়ালো না, দৌড় লাগালো। পুলিশ উকিল মোক্তার কোর্ট কাচারীর কথা যখন এসেই গেল তখন সেখানকার কাজ কারবার সম্পর্কে একটু বিদ্যার্জন করা যাক। আদালতে বাদী পক্ষের সব সময় চেষ্টা থাকে মামলার ঘটনা কিভাবে বিচারক বা জুরিবোর্ডকে বিশ্বাস করানো যায়। অন্যদিকে আসামি পক্ষের কাজ কারবার সন্দেহ নিয়ে। অর্থাৎ বিচারক বা জুরিবোর্ডের মনে ঘটনার বিষয়ে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া। যে যত ভালভাবে এ কাজ করতে পারবে সে তত ভাল উকিল। কখনও কখনও সন্দেহ সংশয়ের জয় হয় কখনওবা নির্ঘাত পরাজয়। এ নিয়ে একটি গল্প হয়ে যাক। এক উকিল এক হত্যা মামলার আসামীর পক্ষে আইনি লড়াই করছে। এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারলো যদিও ভিকটিকের লাশ পাওয়া যায়নি কিন্তু আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ এমন যে তার মক্কেলের শাস্তি এড়ানো খুবই কঠিন হবে। তখন সে মামলার জুরি বোর্ডকে বললো, "সম্মানিত জুরিবোর্ড আপনারা আজ যার হত্যাকান্ডের জন্য আমার মক্কেলকে আসামীর কাঠ গড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সে কিছুক্ষনের মধ্যেই হেটে আমাদের এখানে চলে আসবে।" বলেই সে কোর্টরুমের দরজার দিকে তাঁকালো। জুরিবোর্ডও দরজার দিকে তাঁকালো। কিন্তু কিছুই ঘটলো না। কেউ এলো না। তখন উকিল বললো, "এই মাত্র যে কথাটি বলেছিলাম তা ছিল একটা বিবৃতি মাত্র। কিন্তু আপনারা সবাই আমার কথায় দরজার দিকে তাঁকিয়ে ভিকটিমের কোর্টরুমে ঢোকার অপেক্ষা করছিলেন। এর একটাই অর্থ আপনারা হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সন্দিহান। সুতরাং আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনীত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়েও আপনাদের সন্দেহ আছে। অতএব আমার মক্কেল হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।" এরপর দ্রুত জুরিবোর্ড সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন ও রায় দিয়ে দিলেন। কি আশা করছেন আপনারা, জুরিবোর্ড আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়ে দিলেন। যদি বলি আপনারা ঠিক ধরতে পেরেছেন। কোন সন্দেহ হচ্ছে আপনাদের? সন্দেহ হলে কোন কথা নেই। না হলে একটি কথা আছে। এবারে কিন্তু সন্দেহবাতিকগন জিতে গেছেন। উকিলের যথার্থ সন্দেহ উদ্রেক সত্ত্বেও আসামিকে জুরিবোর্ড সাজা দিয়ে দিয়েছিলেন। কারন জুরিবোর্ড উকিল সাহেবের সন্দেহ উদ্রেকের বিবৃতির উপরই সন্দেহ করেছিলেন। কেন? উকিলের বিবৃতি শুনে বেচারা আসামি যে দরজার দিকে ভ্রক্ষেপই করেনি। কারন তার হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে নিজের কোনই সন্দেহ ছিল না। জন উইলসন বলেছেন, যে যাকে সন্দেহ করে সে তার ভাল কাজকেও স্বীকৃতি দিতে পারে না। তার মানে সন্দেহবাতিকেরা ভালকাজকেও সন্দেহের চোখে দেখে।আমাদের ধর্মপত্নীগণ ও পুলিশের কাজই হল সন্দেহ করা। সুতরাং এরা ছাড়া জন উইলসন সাহেবের কথামত সাধারন মানুষের সব কাজে সন্দেহ করা মানায় না। তাহলে সে সন্দেহবাতিক নামের ব্যাধিক্রান্ত হতে পারে। আবার একেবারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে সকল কথায় সকলকে বিশ্বাস করলেও অনেক সময় কপাল চাপড়াতে হয়। তাই মাঝে মাঝে কিন্তু সন্দেহবাতিক হওয়ারও প্রয়োজন আছে। এসব পরিস্থিতিতে সন্দেহ না করলে বরং আপনি ঠকে যেতে পারেন । একটা গল্প শুনুন তাহলে বুঝতে পারবেন সন্দেহ না করলে কি বিপদ হতে পারে। নগেন ও যতীন দু'বন্ধু। একদিন যতীন নগেনকে বললো, "জানিস দোস্ত আমাদের পুরোহিতের বৌটা না হেব্বি দেখতে।" নগেন বললো, "বলিস কিরে যতীন?" নগেন : "হা রে! আজ রাতে আমি পুরোহিতের বাড়ি যাব। তুই পুরোহিতকে পাহারা দিবি।" যতীন: "কিভাবে?" যতীন নগেনকে বললো, "আরে পুরোহিত যখন মন্দিরে থাকবে তুই পুরোহিতের সংগে কথা বলে তাঁকে মন্দিরে দু'ঘন্টা আটকে রাখবি।" নগেন আর পুরোহিত মন্দিরে কথা বলছে। নগেন: "পুরোহিত মশাই, আপনি গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন ও ভাল পুরোহিত। আপনি অনেকদিন ধরে এ মন্দিরে পুজা করে আসছেন।" এরকম নানা কথা বলতে বলতে দু'ঘন্টা কেটে গেল। পুরোহিতের নগেনের এ গাল গল্পে সন্দেহ হল। সে বললো, " আচ্ছা নগেন, আজ তুমি হঠাৎ আমার সাথে এত কথা বলছো কেন? আগে তো কখনই বলোনি।" নগেন আমতা আমতা করে বললো, "না মানে এমনি পুরোহিত মশাই?" পুরোহিত : "মানে মানে না করে আসল কথা বলো তো।" নগেন তখন জানালো যে যতীন তাঁকে দু'ঘন্টা মন্দিরে আটকে রাখতে বলেছিল। কারন তাঁর বউ নাকি হেব্বি সুন্দরী। যতীন আজ তাঁর বাড়িতে যাবে। পুরোহিত নগেনকে জিজ্ঞেস করলো, "নগেন, তুমি বিয়ে করেছো। নগেন: "হ্যাঁ। পুরোহিত মশাই।" পুরোহিত: "আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। আমার বউ পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।" এবার আপনি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন কখন কাকে সন্দেহ করবেন বা কখন কাকে ক্লিন চিট দিবেন। অথবা কিভাবে নিজ পত্নীর সন্দেহ সংশয়কে সামাল দেবেন। পুলিশের সন্দেহ দূর করার চেষ্টা না করাই ভাল। বেশি চেষ্টা করলে পুলিশের সন্দেহকে বরং আরও উসকে দিবেন। (সমাপ্ত)

কেন আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছিঃ সম্পাদক পরিষদ

সম্পাদক পরিষদ:

জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে :

১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ২. এ আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ৩. এ আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। ৫. এ আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যাঁরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তাঁরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি, কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে এ আইনেও সাংবাদিকরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এ আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উম্মোাচন করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি, এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন-অযোগ্য। এর ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে। উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তিসংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন-অযোগ্য, পাঁচটি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে এক বছর কারাদ-, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ চার বছর থেকে সাত বছর কারাদ-। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনটি শুধু তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদ-। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তার মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।

বিশদ ব্যাখ্যা

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।

ধারা ৮

৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা। (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন। (২) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মাণ হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন। (৩) উপ-ধারা (১) ও (২)-এর অধীন কোনো অনুরোধপ্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো, ব্লক করিবে।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এখানে দুটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যে কোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যে কোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যে কোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে। প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্ল­ক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্ল­ক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

ধারা ২১

২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এ আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদন্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান। আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজম্মে র জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

ধারা ২৫

২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মসংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এ আইন ব্যবহার করতে পারেন। তারা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উম্মোাচন করে, এমন যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এ বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে। এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না-ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে। রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণœ করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এ আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।

ধারা ২৮

২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কীভাবে জানবেন কখন ও কীভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এ পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওইসব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ‘আঘাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

ধারা ২৯

২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-Gi section 499--এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।

ধারা ৩১

৩১। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দন্ডে। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লি­ষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ-প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসন্ন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এ আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই না-ও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।

ধারা ৩২

৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদ-, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অনধিক এক (এক) কোটি টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্লø্যাটফরমে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দফতরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া যেতে পারে, তাই তো? এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।

ধারা ৪৩

৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্ল­াশি, জব্দ ও গ্রেফতার। (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্ন বর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন : (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ; (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি; (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি। এতে পুলিশকে যে কোনো জায়গায় প্রবেশ, যে কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যে কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেফতার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এ আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪টিই জামিন-অযোগ্য, তখন গ্রেফতারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়্্গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকা- ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেফতার-আতঙ্ক তাদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তারা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তারা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যে কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেফতার করতে তারা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন। এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার ও সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যে কোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করেই আইনের এ ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ধারা ৫৩

৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা। এই আইনের :(ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১) এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এ আইনের প্রায় ১৯টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

উপসংহার

১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে;
২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে;
৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বার বার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী;
৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী;
৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লে­ষণ ও ব্যাখ্যা করেছি। এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এ আইন প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে। এ আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে। পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়নসম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন: ‘আপনারা বলে থাকেন যে বাক-স্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।’ ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তারা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি।... নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে...। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।... ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তারা তাদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’  

পরকীয়া!!

পরকীয়া

মোঃ রফিকুল ইসলাম

সাধারনভাবে বিবাহিত কোন পুরুষ বা মহিলা নিজ স্ত্রী বা স্বামী ব্যতীত অন্যকোন মহিলা বা পুরুষের সংগে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত হলে তাকে পরকীয়া বলা হয়। তবে আইনের ভাষায় অবশ্য শুধু প্রেমের সম্পর্ক নয় শারিরীক সম্পর্ক হতে হবে। পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার অনেক কারন সমাজ বিজ্ঞানীগণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি কারনকে অগ্রগণ্য বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।

১. একাকীত্ব: জীবন জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারনে।

২. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: মানসিক দূরত্ব বা ঝগড়াঝাটি ইত্যাদি কারনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা।

৩. প্রেম ভালবাসার ঘাটতি: নানা কারনে প্রেম ভালবাসার ঘাটতি দেখা দিলে।

৪. যৌন সম্পর্কে বিরক্তি: কোন এক পক্ষের বিরক্তি বা অক্ষমতা দেখা দিলে।

৫.অন্তরঙ্গতার ঘাটতি নানাবিধ কারনে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অন্তরঙ্গতার অভাব হলে।

তবে সমাজবিজ্ঞানীরা যাই বলুক বা ব্যাখ্যা দিক না কেন মানুষ স্বভাবগতভাবে নিজেরটা নিয়ে কমই সন্তুষ্ট থাকে। হোক সেটা নিজের স্ত্রী বা স্বামী বা খাবার দাবার বা অন্যকোন জিনিস। রবি ঠাকুরের নরেশ পরেশ দু'চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের গল্পে যেমন আছে। নরেশ নিজের পছন্দের পাত্রী ছেড়ে পরেশের পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করার পর যখন নরেশের ছেড়ে দেয়া পাত্রীকে পরেশ বিয়ে করে তখন নরেশ দ্বন্দ্বে পড়ে যায় এই ভাল কি সেই ভাল নিয়ে এবং নিজের স্ত্রীর খুত আবিষ্কার করে। তেমনি খাবার দাবার নিয়েও গ্রামে একটা শ্লোক প্রচলিত আছে, নিজের বাড়ির পিঠা খাইতে লাগে তিতা, "পরের বাড়ির পিঠা খাইতে লাগে মিঠা।" খাবার নিয়ে বরং একটা গল্পই বলি। বিপত্নীক সরকার সাহেবের অনেক বয়স হয়েছে। মুখের স্বাদ কমে গেছে। প্রতিদিনই খাবার নিয়ে জ্বালাতন করেন। নিজের বৌমার রান্না ভাল লাগে না। শুধু পাশের বাড়ির চাচাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে ডাল বা তরকারী আনতে বলেন। একদিন সন্ধ্যায় খেতে বসেছেন। ডাল ভাল লাগছে না। পাশের বাড়ি থেকে ডাল আনতে বললেন। কাঁহাতক আর মানুষকে বিরক্ত করা যায়। তাই বৌমা চালাকি করে নিজেদের ডাল কাজের মেয়েকে দিয়ে শাড়ির আঁচলের তলায় বাইরে পাঠিয়ে আবার কয়েক মিনিট পর নিয়ে এসে বলে এই যে আপনার ঘটুর বৌয়ের ডাল। সরকার সাহেব এবার ডাল খেয়ে সন্তুষ্ট হন। আর বলেন, "দেখ তো আমার ঘটুর বৌয়ের ডাল। তোরা কি রান্না করিস মুখেই দেওয়া যায় না।" অথচ কয়েক মিনিট আগে এ ডালই তার ভাল লাগছিল না। মানুষ নিজের স্ত্রী বা স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকাটা বোধহয় একটা চিরন্তন বিষয়। এজন্য অনেকেই সুযোগ খুঁজে কিভাবে তার সঙ্গীকে পরিবর্তন করা যায়। কি কথাটা আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে আমি একটা ঘটনা বলি। এরপর আপনারাই না হয় বিচার করুন। বইয়ের নামে শুধুমাত্র একটি বর্ণের ভুলের কারনে একটি বইয়ের বিক্রি মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বেড়ে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ পর্যন্ত হয়েছিল। নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছে হচ্ছে বইটির কি নাম ছিল। বইটির নাম ছিল How to change your life. কিন্তু ভুলক্রমে l এর পরিবর্তে w হওয়াতে এ বিপত্তি ঘটেছিল। এতে বইয়ের নাম হয়েছিল How to change your wife. তাহলে বুঝুন ওয়াইফ পরিবর্তনের কলাকৌশল জানতে স্বামীরা কেমন উদগ্রীব ছিলো। পুরুষ লোকদের স্ত্রীদের সংগে কথা বললে নাকি বড় বড় রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি কমে যায়। তবে সেটা নিজ স্ত্রী নাকি পরস্ত্রী সেটা একটা প্রশ্ন। আসুন দেখি সমীক্ষা কি বলে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে স্ত্রীর সংগে কথা বলা পুরুষের জন্য খুবই চিত্তবিনোদন ও জীবনী শক্তি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এটা পুরুষের শতকরা ৯০ ভাগ উদ্বেগ ও ৮০ ভাগ হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এছাড়া এটা শতকরা একশ ভাগ চিত্তবিনোদনকারী। তবে এ গবেষনা সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হল এটা কার স্ত্রীর সাথে কথা বলার কথা বলা হয়েছে সেটা বলতেই ভুলে গেছে। তার মানে এ সমীক্ষা পরকীয়ার মাহাত্ম্যকে তুলে ধরছে। পরকীয়ার মাহাত্ম্য যেমন আছে তার ঝক্কিও কিন্তু কম নয়। পরকীয়া করে ধরা পড়লে বা ধরা পড়ার আশঙ্কা হলে স্বামী বা স্ত্রীর হাতে নাস্তানাবুদ বা কখনও জীবনের উপরও আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। একটা গল্প বলি তাহলে হয়ত বিষয়টা একটু পরিষ্কার হতে পারে। দুই ভূতের আলাপ পরিচয় হয়েছ। তারা কে কিভাবে মারা গিয়ে ভূত হয়েছে তাই নিয়ে কথা বলছে। ১ম ভূত: ভাই, আপনি কিভাবে মারা গেলেন? ২য় ভূত: আমি ঠান্ডায় মারা গেছি। ১ম ভূত: তা ঠান্ডায় মারা যাবার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিল। ২য় ভূত: আসলে আমি দূর্ঘটনাক্রমে একটা রিফ্রেজারেটরে আটকা পরেছিলাম। প্রথমে আমি ঠান্ডায় কাঁপছিলাম। পরে আমার শরীর জমে যায়। চারদিকে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে এবং এক পর্যায়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যাই। ১ম ভূত: আহা! কি করুন মৃত্যূ। ২য় ভূত: আপনি কিভাবে মারা গেলেন? ১ম ভূত: আমার হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল। ২য় ভূতঃ ও তাই, তা কিজন্য আপনার হার্ট এ্যাটাক হল। ১ম ভূত: আসলে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার স্ত্রীর অন্য এক পুরুষের সাথে সম্পর্ক আছে। একদিন যখন কাজ থেকে ফিরছিলাম তখন একজোড়া জুতা আমার বাসার দরজার বাইরে দেখতে পেলাম। তখন বুঝলাম যে ব্যাটা আমার স্ত্রীর সাথে আছে। কিন্তু শোবার ঘরে গিয়ে দেখি স্ত্রী একা। তখন আমার জেদ শয়তানটা কোথায় পালিয়ে আছে তা খুঁজে বের করা। আমি টয়লেট, নীচতলার ঘর, স্টোর রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজেও শয়তানটাকে পেলাম না। আমি দৌড়ে উপরের তলায় গেলাম। ওয়ারডোর্ব খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। কিন্তু এই দৌড়াদৌড়ি ও উত্তেজনা সহ্য করতে পারলাম না। হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেল। ২য় ভূত: ইস্! আপনি কেন শয়তানটাকে খুঁজতে ফ্রিজটা খুঁজলেন না। শয়তানটা সেখানেই লুকিয়ে ছিলো। সেখানে খুঁজলে আজ আমরা দু'জনই বেঁচে থাকতাম। কখনও কখনও বুদ্ধিমান ও চালাক লোকেরা নির্বিঘ্নে পরকীয়া চালিয়ে যান তার স্ত্রী বা স্বামীর নাকের ডগায়। আবার কেউ কেউ ধরা খেয়ে নাজেহালও হন। আবার কেউ কেউ কখনও কখনও পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে সন্তানের বাবা মা হয়ে সমাজের চোখেও নাজেহাল হন। এগুলোর দু'একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা খোলাসা হবে। প্রথমেই বুদ্ধিমান লোকেরা কিভাবে কি করে দেখা যাক। এক বিবাহিত লোকের তার অফিস সেক্রেটারির সংগে সম্পর্ক ছিল। একদিন সে অফিস শেষে তার সেক্রেটারির বাসায় গেল এবং সারা বিকেল তার সাথে প্রেম করল। এক পর্যায় সে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ জেগে উঠে পোষাক পড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। বের হবার আগে সে তার প্রেমিকাকে তার জুতোজোড়া বাইরে নিয়ে ঘাস ও কাদা ময়লার সাথে ঘষতে বললো। এবারে ঘাস ময়লা লাগা জুতো পায়ে সে বাসায় ফিরে গেলো। "তুমি সারা বিকেল কোথায় ছিলে?" স্ত্রী জানতে চাইলো। "আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলবো না। আমার সেক্রেটারির সাথে প্রেম করছিলাম।" "আমার কাছে মিথ্যা বলো হারামীলোক। তুমি গলফ খেলছিলে।" এবারে একটু কম বুদ্ধিমান লোকেরা এ কাজ করতে গিয়ে কিভাবে ধরা পড়ে আসুন দেখি। এক মহিলার স্বামী সকালবেলা যখন চা পান করছিল তখন সে তার স্বামীর পিছনে এসে দাঁড়ালো। "আমি তোমার প্যান্টের পকেটে এক টুকরো কাগজ পেয়েছি তাতে মেরিলো নাম লেখা, "ক্ষিপ্ত স্ত্রী জানতে চাইলো, "নিশ্চয়ই তোমার কাছে এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আছে।" "জান। তুমি শান্ত হও।" লোকটি জবাব দিল, "মনে করতে পার গত সপ্তাহে আমি ঘৌড়দৌড় মাঠে গিয়েছিলাম। এটা ছিল আমি যে ঘোড়ার উপর বাজি ধরেছিলাম তার নাম।" স্ত্রী কিছু বললো না। পরদিন সকালে গোপনে স্বামীর পিছনে এসে দাঁড়ালো এবং স্বামীর মাথায় সজোড়ে চাটি মারলো। স্বামী ক্ষেপে গিয়ে জানতে চাইলো কেন তাকে চাটি মারা হল। স্ত্রী জানালো, "তোমার ঘোড়া কাল রাতে ফোন করেছিল।" পরকীয়ার ফলে জন্ম নেয়া বাচ্চার পিতৃত্ব নিয়ে ঝামেলার গল্প বলি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন এমন ঝামেলায় অনেকেই জড়িয়েছে। হাতের কাছের উদাহরন ইতালীতে খেলার সময়ে ম্যারাডোনার ছেলের বাবা হওয়া। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে ম্যারাডোনা জুনিয়ারকে সে মেনে নিয়েছে। এবারে গল্পে আসি। এক লোক রাস্তার ধারে বসে চা খাচ্ছেন। হঠাৎ একটা বাচ্চা দৌড়ে এসে বললো, "প্লিজ সাহায্য করুন। আমার বাবা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছে।" ভদ্রলোক বাচ্চার পিছে পিছে গেলেন এবং দেখতে পেলেন দু'জন লোক মারামারি করছে। তিনি বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তোমার বাবা?" সে জবাব দিল, "আমি জানি না, কে আমার বাবা তা নিয়েই তো তারা মারামারি করছে।" এবারে পরকীয়ার ভয়াবহতা নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। ২০১৬ সালে স্ট্যাটিক ব্রেইন রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরকীয়ার উপর এক গবেষনা পরিচালিত হয়। এতে দেখা গেছে আধূনিক কালের মানুষের তার সংগীর সাথে অবিশ্বস্ততার এক করুন চিত্র। তার কিছু আপনাদের জন্যে তুলে ধরছি। যথা-- এক তৃতীয়াংশ বিয়ের স্বামী বা স্ত্রী বা উভয়ই শারিরীক বা মানসিকভাবে তার সংগীর সাথে অবিশ্বস্ত থাকে। শতকরা ২২ ভাগ পুরুষ এবং শতকরা ১৪ ভাগ নারী স্বীকার করেছে যে তারা তাদের সংগীর সাথে অবিশ্বস্ত ছিল। শতকরা ৩৬ ভাগ নারী পুরুষ তাদের সহকর্মীদের সংগে সম্পর্কিত ছিল। শতকরা ১৭ ভাগ নারী বা পুরুষ তাদের দেবর বা শ্যালিকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। যারা একবার পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তাদের পরবর্তীতে পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৩৫০ ভাগ। ভুল নয় ঠিক পড়ছেন ৩৫০ ভাগ। বিযের দু'বছরের মধ্যেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। শতকরা ৩৫ ভাগ নারী পুরুষ সফরকালে পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। শতকরা ১০ ভাগ পরকীয়া হয় অনলাইনে। অন লাইনের সম্পর্কের শতকরা ৪০ ভাগ বাস্তব জীবনের সম্পর্কে রূপ নেয়। এসব কারনে বুদ্ধিমান কেউ কেউ আগে থেকেই উত্তর পুরুষদের পরিবারের পরকীয়া ঠেকানোর জন্য অন্যরকম কিছু পদ্ধতিও ভেবে রাখেন। এবারে এমনই এক গল্প বলি। এক ইটালীয় মাফিয়া ডন মৃত্যু শয্যায় মুমূর্ষু অবস্থায় তার নাতিকে ডাকলো, "শোন। আমি চাই তুমি আমার ক্রমিয়ামের আস্তর দেওয়া . ৩৮ ওয়ালথার পিপিকে রিভলবারটি নাও যাতে মৃত্যুর পরও তুমি আমাকে মনে রাখো।" নাতি বললো, "কিন্তু দাদু, আমি তো এসব পিস্তল রিভলবার পছন্দ করি না। তারচেয়ে আমাকে তোমার রোলেক্স ঘড়িটা দিতে পার না?" "শোন সনি, ঘড়ি আমি দিতে পারি। কিন্তু তুমি জান, একদিন তোমাকে আমার এ ব্যবসায় চালাতে হবে। তোমার অনেক টাকা হবে। বিশাল বাড়ি হবে, সুন্দরী স্ত্রী হবে। হয়ত বাচ্চা কাচ্চাও হবে। একদিন হয়ত তুমি অসময়ে বাসায় ফিরবে। হয়ত বিছানায় তোমার স্ত্রীর সংগে অন্য কোন পুরুষকে পাবে। তখন তুমি করবে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলবে, টাইমস আপ, সময় শেষ?" সবশেষে যারা পরকীয়ায় অভ্যস্থ তাদের জন্য একটা হুশিয়ারী গল্প বলে এ আখ্যান শেষ করতে চাই। ব্যবসায়ী জামশেদ সাহেব পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত আছেন। প্রায়ই তিনি ব্যবসায়ের কাজে বিদেশে যান। তো একবার তিনি ব্যবসায়ের কাজে নেপাল যাবার কথা বলে স্ফূর্তি করতে বান্ধবীর বাসায় উঠেছেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে বিমান দূর্ঘটনায় বিমানের সবাই মারা গেছে। ফলে তিনি আর বাসায় ফিরতে পারছেন না। সুতরাং যারা বিদেশে যাবার কথা বলে এরকম স্ফূর্তি টূর্তি করেন বা করবেন বলে মনস্থির করেছেন তাদের একটু সমঝে চলাই বোধহয় ভাল। নাহলে কখন কি হয়ে যায় আল্লাহ মালুম।

‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

ফাহমিদা তাপসী
[caption id="attachment_22484" align="alignleft" width="483"]মাশরুনা এ. চৌধুরী মাশরুনা এ. চৌধুরী[/caption] কথা ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু মাশরুনা এ. চৌধুরী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই ‘বড় হয়ে ডাক্তার হব’ এমন ভাবনাই গেঁথেছিল ছোট্ট মেয়েটির মনে। আর হবেইবা না কেন, ডাক্তার বাবাকে দেখে সে পেশার প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সে প্রভাবও ছিল ছোটবেলার চাওয়ায়। মুখে প্রকাশ না করলেও বোনদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষক খেলাটাই তার বেশি প্রিয় ছিল। মোদ্দাকথা মা-বাবা দুজনের পেশা বেশ গাঢ় প্রভাব ফেলেছিল পরিবারের সবার ছোট মেয়েটির মনে। তবে বিধি বাম। ডাক্তার হিসেবে নয়, বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে। বলছিলাম মাশরুনা এ. চৌধুরীর কথা। আজকের আয়োজনে থাকছে চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্ট এবং বিআইএফএফএলের সিএফও এ নারীর সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশ—

ছোটবেলায় যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছেন, সেখানে কি পৌঁছতে পেরেছেন?

সে সময় কিছুই বুঝতাম না, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলতাম বড় হয়ে ডাক্তার হব। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, ডাক্তার বাবার স্টেথোস্কোপ নিয়ে যতটা না খেলেছি, তার চেয়ে বেশি খেলেছি টিচার টিচার খেলা। তাই বলা যায় শিক্ষিকাও হয়তো হতে চাইতাম। এ দুই পেশার কোনোটাই বেছে নিতে পারিনি পরবর্তীতে, তবে দুটো পেশার সঙ্গেই বর্তমান অবস্থানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম মানুষের সেবা করব বলে। বর্তমানে যে পেশায় যুক্ত রয়েছি, সে পেশায় থেকে কিন্তু সাধারণের সেবাই করছি। অন্যদিকে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি আইসিএবিতে। সব মিলে বলা যায় ছোটবেলায় দেখা স্বপ্ন সরাসরি ছুঁতে না পারলেও একেবারেই পারিনি, বিষয়টি তা নয়।
বিআইএফএফএলে আপনার কাজের ক্ষেত্র নিয়ে যদি বলেন—
২০১৬ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডে যোগদান করি। এখানে নারী চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে আমিই প্রথম। অ্যাকাউন্টস এবং ফিন্যান্স পুরো বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছি। এ প্রতিষ্ঠানে এর আগে একজনই সিএফও ছিলেন। তিনি বেশিদিন কাজ করেননি বিধায় নতুনভাবেই সব কিছু শুরু করতে হয়েছে।
আপনার মতে বাজেটের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ কী?
আগে থেকে অনুমান করা বা ফোকাস টার্গেট করা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে। কেননা এটা আগে থেকে কিন্তু বোঝা মুশকিল কারা আমাদের গ্রাহক হবেন।
কর্মক্ষেত্রে কীভাবে অন্যদের সহযোগিতা এবং স্বাধীন চিন্তার ভারসাম্য রক্ষা করে থাকেন?
আমাদের কাজটিই হচ্ছে দলবদ্ধ হয়ে করার। আমি সে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছি শুধু। সেদিক থেকে পুরো দলের সহযোগিতা না থাকলে আমার কাজ সম্পন্ন করা কঠিন। সহকর্মীদের সহযোগিতা রয়েছে বলেই হয়তো কাজ করা সহজ হচ্ছে। অন্যদিকে আমি কীভাবে চাচ্ছি, সে বিষয়টি আমার নিম্নপদস্থদের বুঝিয়ে দেয়া কিন্তু আমার দায়িত্ব। একজন সিএফও হিসেবে আমি সে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।

প্রাপ্তির খাতায় যা আছে—

প্রতি বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয় আইসিএবিতে। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সেসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে একটি ক্রম তৈরি করে। বিআইএফএফএলে যোগদানের পর প্রথমবারের মতো আর্থিক প্রতিবেদন আইসিএবিতে জমা দিই এবং আইসিবিতে পাবলিক সেক্টরে তৃতীয় স্থান অর্জন করি আমরা। এটা বিআইএফএফএলের ইতিহাসে প্রথম। এখানেই শেষ নয়, আমাদের সে বার্ষিক প্রতিবেদনটি কিন্তু আইসিএবি সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস সংক্ষেপে সাফাতেও পাঠিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা বার্ষিক প্রতিবেদন জমা হয় সেখানে। সেখান থেকে বাছাইকৃতদের অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। তবে আইসিএবি থেকে সাফা অ্যাওয়ার্ডে পাঠানোর আগে আরো একটি বাছাই প্রক্রিয়া চলে। সেখানে পুনরায় আমাদের প্রতিবেদনটি বাছাই করা হয়। এবং আমরা সাফা বিপিএ অ্যাওয়ার্ডে ২০১৬ সার্টিফিকেট অব মেরিট তকমা জিতে নিই।
প্রতিষ্ঠানের চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহীদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
আমার জানা মতে, পুরো বাংলাদেশে নারী চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হিসেবে রয়েছেন দুজন। যারা সিএফও হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাদেরকে বলব প্রচণ্ড পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি নিয়ে যারা পড়েন, তাদের প্রচুর পড়াশোনা করে উত্তীর্ণ হতে হয়। সেদিক থেকে বলা যায়, সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই, ধৈর্য থাকা চাই।

অবসর কাটে কীভাবে?

যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ততার পাল্লাই ভারী। অবসর নেই বললেই চলে। পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। এছাড়া প্রাকৃতিক বিষয়গুলো আমাকে খুব টানে। তাই বাসার বারান্দায় বাগান করা আমার শখ। সময় পেলেই সেখানেই ঢেলে দেই পুরোটা সময়। এছাড়া গান গাই কখনো কখনো। আমার মা বাংলাদেশ বেতারে টানা ২০ বছর সেতার বাজিয়েছেন। ফলে আমাদের চার বোনের সবাই মোটামুটি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অবসর পেলে গানের চর্চা চালিয়ে যেতে ভালো লাগে।

বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে অভিধান লিখছি: অসীম সাহা

বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে অভিধান লিখছি: অসীম সাহা

কবি অসীম সাহা’র লেখালেখির জীবন শুরু ১৯৬৪ সাল থেকে। ১৯৬৫ সালে ঢাকার একটি দৈনিকে তার ছাপার অক্ষরের যাত্রা শুরু। সাহিত্যের সকল বিষয়ে তুখোড় এই লেখক সেই থেকে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া, কিশোর কবিতা, গান প্রভৃতি রচনায় সিদ্ধহস্ত। কবি অসীম সাহা শুধু কল্পনার কবি নন, বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়কে লেখার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন কখনো নিরব প্রতিবাদের ভাষায়, কখনো সুখ-দুঃখ, প্রেম, প্রকৃতির স্পর্শে তুলেছেন কলমের ঝড়। অসীম সাহা এখনও অব্যাহতভাবে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ভাষা ও ছন্দ নিয়ে অক্লান্ত কাজ করে চলেছেন। বাংলা অভিধানকে সহজবোধ্য করে তুলবার জন্য তিনি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে সহজ অভিধান লিখছেন, যা বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব ঘটাবে বলে তিনি এক আন্তরিক সাক্ষাৎকারে পরিবর্তন ডটকমকে জানান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত বাঁধন চৌধুরী পদ্য লেখার গল্পটা বলুন । শুরু করলেন কিভাবে, কখন ? শুরু করলাম মানে ...যে কোনো কবিই শুরু করেন আকস্মিক ভাবে। এটা কিভাবে হয় বলা খুব মুশকিল। তবে আমাদের বাড়িতে একটা সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। আমার বাবা ছিলেন দার্শনিক মানুষ। ভারতের দর্শনের উপর তার বই আছে। আমার মা ছিলেন গায়িকা, আমার বোনের গায়িকা হিসেবে খ্যাতি ছিল, আমার নানা গান গাইতেন, আমার মামারা গান করতেন, আমার ওয়াইফ গান গায়। ছোটবেলা থেকে শুরু করে মানে এই পর্যন্ত এসে পিতৃ পরিবার এবং শ্বশুরবাড়ির পরিবার এসব দিক থেকে একটা কালচারাল আবহ পেয়ে আমার বিকশিত হবার পথটা সহজ হয়েছে। ১৯৬৪ সাল থেকে লিখতাম, কিন্তু খুব একটা যে হতো তা না। এরপর ১৯৬৫ এ কলেজে একবার আমার কাছে কবিতা চাইলো, আমি রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ কবিতা অনুকরণ করে একটা কবিতা লিখে পাঠালাম। তখন টিচার বললেন, তুমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা অনুকরণ করেছো। তখন একটু লজ্জাও পেলাম বিব্রতও হলাম। মনে হলো, আমাকে কবিতা লিখতে হবে। এরপর আমি কবিতা লিখে লিখে পত্রিকায় পাঠাই কিন্তু ছাপা হয় না। এরপর আমি একটা গল্প লিখলাম ১৯৬৫ এর ১৪ই আগস্ট। গল্প লিখে রফিকুল হক দাদাভাই এর ‘দৈনিক পয়গাম’পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় আমার যাত্রা শুরু হলো ছাপার অক্ষরে। তারপর থেকে ক্রমাগত লিখতে থাকলাম আর ঐ পত্রিকাতেই ছাপা হতে থাকলো এবং অন্যান্য পত্রিকায়ও প্রচুর পরিমাণে ছাপা হতে থাকলো। আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু-ফর্ম নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন বা দুর্বলতা আছে? লেখার ক্ষেত্রে আপনি কোনটা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ? না, না আমার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে দুর্বলতা নেই। তবে, যখন আমি ১৯৬৭ এ প্রথম জীবনানন্দ দাসের কাব্য সংগ্রহ পাই, সেটা পেয়ে আমি দেখলাম এই প্রথম নতুন ধরণের কবিতা। তার আগেতো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইত্যাদি পড়েছি, তা অন্য ধরণের। তখন মনে হলো কবিতায় নতুন একটা প্রভাবের দরকার। আমি তখন একটা কবিতা লিখলাম, আধুনিক গদ্য কবিতা বলতে যা বোঝায় তা-ই লিখলাম। কিন্তু তখনো ছাপা হয়নি। আমি ১৯৬৯-এ ঢাকায় চলে আসি। তখন একটা পত্রিকায় ছাপা হলো এবং এভাবেই আধুনিক কবিতার যাত্রা শুরু হলো। তারপর থেকে তো অনর্গল লিখতে থাকলাম ভাল মন্দ মিলিয়ে। তখনতো আসলে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল কবিতা লিখে নামটা ছাপা, পরিচিত হওয়া। যেটা হয় আর কি! এরপর আমার বন্ধু নিরঞ্জন অধিকারীরঅনুরোধে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলাম। এবং রবীন্দ্রনাথের উপর প্রথম আমি একটি প্রবন্ধ লিখলাম জগন্নাথ হল বার্ষিকীতে। তখন আমার প্রবন্ধের চাহিদা এতো বেড়ে গেলো যে, কেউ আর কবিতা চায় না শুধু প্রবন্ধ চায়। আমিও প্রবন্ধ লেখা শুরু করলাম, পাশাপাশি কবিতার জগতেও নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছি। কবিতা লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা কী করে আপনি কাব্যে রূপান্তর করেন? আমার একটা সিরিজ কবিতা আছে ‘উদ্বাস্তু’নাম। যেসব মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যায় তাদের একটা যন্ত্রণা আছে। হারানোর যন্ত্রণা। মাতৃভূমি, শেকড় উপড়ে ফেলার যে যন্ত্রণা, সে যন্ত্রণা যে যায় একমাত্র সে-ই বোঝে। তাদের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আমি ধারণ করার চেষ্টা করেছি। আমি দশটা সিরিজ কবিতা লিখেছি, দশটাই সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ওর মধ্যে উদ্বাস্তু জীবনের যে যন্ত্রণা এটাকে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি। যেমন এবার একটা বই বের হয়েছে ‘পাঁজর ভাঙ্গার শব্দ’ অর্থাৎ দেশ ত্যাগ করে যে পাঁজর ভেঙ্গে যায়, তার যে হাহাকার তৈরি হয়, শুন্যতা তৈরি হয় তা ধরবার চেষ্টা করা। আমার সবগুলো কবিতা প্রায় ঐ ধরণের। ‘পাঁজর ভাঙ্গার শব্দ’ তার মধ্যে কষ্টগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। আমার অনেক অনেক কবিতা, প্রচুর কবিতা আছে শুধু এই বিষয় নিয়ে। যেমন ভারত থেকে এখানে চলে এসেছে, এখান থেকে ওখানে চলে গেছে এসব বিষয় নিয়ে। আর এমনিতে প্রেমের কবিতা তো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আছে। ব্যক্তিগত প্রেম থেকে আসে, কল্পিত প্রেম থেকে আসে, অন্যের প্রেম থেকে আসে। কখন প্রেমের কবিতা কিভাবে আসবে বলা যায় না। ব্যক্তিগত, কল্পিত প্রেমের সাথে যেভাবে কবিতা অঙ্কুরিত হয় এমন দু’একটা সুখ স্মৃতির কথা যদি শোনাতেন কবি ... আমি ১৯৬৯ সালে একটা রেলস্টেশনে বসে আছি, জানালার ধারে দেখলাম একটি মেয়ে বসে আছে। খুব সুন্দরী, চোখে স্নানগ্লাস। তাকে আমি চিনিনা। দূর থেকে একঝলক দেখা। ওর দিকে তাকিয়েছিলাম, ট্রেনটা আস্তে আস্তে চলছে......। ঐটার উপর আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম। আবার চিটাগাং আমি গেলাম কবিতা পড়তে। সেখানে পাহাড়ের উপরে বিভা নামের একটি মেয়ের সাথে পরিচয়। খুব অল্প সময়ের পরিচয়, অল্পসময়ের কথা। তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই রাতেই চিটাগাং চলে যাই। ওর সাথে আর দেখা হয়নি। তো আমি বিভা নামে একটি কবিতা লিখেছিলাম। অতএব কবিতা এইভাবে আসে একঝলক দেখা। তার সাথে প্রেম হতেই হবে,শা রীরিক সম্পর্ক হতে হবে নট নেসেসারি। কাজেই কল্পনার মিশেল দিয়ে যে কবিতা রচনা করতে পারেন, তার বাস্তবসম্মত রূপক একটা তৈরি করতে পারেন সে আসল কবি। এখানে শুধু আমার কথা বলছিনা, প্রত্যেক কবিই তাই। লেখক কবিদের দশক বিচার প্রচলিত আছে । আপনি আপনার দশককে কিভাবে উপস্থাপন বা চিহ্নিত করছেন? আমি ব্যক্তিগতভাবে দশক বিশ্বাস করি না। তবে দশক যদি বলি, আমাদের দশকটা হচ্ছে একটা সবচেয়ে সমৃদ্ধ দশক এর ভেতর সন্দেহ নেই সবাই স্বীকার করবে, যারা সমালোচক তারাও স্বীকার করেছেন। ষাটের দশক হচ্ছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। এই সময়টাতে আমাদের সব চেয়ে বড় লেখক যারা আছে্ন, তারা এসেছেন। যেমন – রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, শিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, নুরুল হুদা, হাবিবুল্লাহ সিরাজি, আবু কায়সার, আমি, মাহাবুব সাদিক ... যতবলি এরকম আরও আছেন। এরা সবাই হচ্ছেন ষাট দশকের। লেখার জন্য প্রিয় সময় কোনটা ? রাত। সবসময় রাত। আমি দিনের বেলায় পারতো পক্ষে লিখিনা। রাত বারোটার দিকে শুরু করি, এরপর ৩টা-৫টা পর্যন্ত লিখি। আমি দিনের বেলায় লিখতে পারি না। যখন নিরব নিঃশব্দ থাকে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখন একা জেগে থাকি। প্রকৃতির কোন উপাদানটি আপনাকে চমৎকৃত করে, ভাবায় ? যেমন রবীন্দ্রনাথের কিন্তু বর্ষা ঋতু খুব পছন্দ। বর্ষা ঋতু আমার ঘরের মধ্যে থাকলে পছন্দ কিন্তু বাইরে বেরুলে আমার একদম পছন্দ না। এটার দুটো দিক আছে – বর্ষার সৌন্দর্য একটা অন্যরকম আছে বটে, সেটা আমি যতটা দেখে আমি অনুভব করি বা ভাল লাগে। আবার যখন ভাবি এই বর্ষণের ফলে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায় তখন আর আমার ভাল লাগে না। যারা দূরে থেকে শুধু সৌন্দর্য দর্শন করতে চায়, যেমন চাঁদ দেখা জ্যোৎস্নার আলো উপভোগ করা এসব আমরা চাঁদের কাছে না গিয়েও পেয়ে থাকি। রবীন্দ্রনাথও ঐভাবে দেখেছেন। আমি এটা খারাপ অর্থে বলছিনা। আর আমরা যারা আজকের কবি, তাদের সাথে বাস্তবতার সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর। সেকারণে এসব উপেক্ষা করে কবিতাকে শৈল্পিকভাবে শিল্পমণ্ডিত করবো এটা মেনে নেয়া যায় না, আমি অন্তত মানতে পারি না। যে কারণে এগুলো আমাকে ভাবায়, কষ্ট দেয়। তবে নির্দিষ্ট করে আমি খুব পছন্দ করি ঐ সময়টা যে সময়টা খুব বৃষ্টি থাকে না, আবার গরমও থাকে না, শীতও থাকে না অর্থাৎ নাতিশীতোষ্ণ সময়টা আমার পছন্দ। আপনার আলোচিত কাব্যগ্রন্থ কোনগুলো? আমার আলোচিত কাব্যগ্রন্থ কোনটা সেটাতো আমি বলতে পারবো না। তবে আমার সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ যেটা- যেখানে আমি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি অনেক বেশি। যেটা বাংলাদেশে এখনও হয়নি ওটা হচ্ছে ‘ম বর্ণের শোভিত মুকুট’। ওখানে আমি ব্যাকরণ, ছন্দ, ভাষা প্রভৃতিকে নিয়ে প্রেমের কবিতাকে মণ্ড বানিয়েছি। কতটা কী হয়েছে জানিনা তবে এটায় আমি কাজ করেছি। এক বসায় লিখেন? না কাটা ছেড়া করে না ধীরে ধীরে কেটে ছিড়ে লিখে থাকেন? আমি এক বসায় লিখি। সেটা গল্প হোক, কবিতা হোক আমি পারতপক্ষে চেষ্টা করি এক বসায় লিখতে। ব্যতিক্রম হয় না তা নয়। তবে যতক্ষণ লেখা শেষ না হয় আমি অস্থির থাকি। আর বিশেষ করে যখন গদ্য লিখতে যাই তখন সঙ্গতি হারিয়ে ফেলবার ভয়ে শারীরিক যত কষ্টই হোক আমি লিখে ফেলি। আপনি কি মেটাফোর? অর্থাৎ নিজস্ব শব্দ তৈরি করেন? হ্যাঁ আমি শব্দ তৈরি করি। যেহেতু কবিতা লেখার পাশাপাশি ভাষা, ছন্দ নিয়েও কাজ করেছি এবং কাজ করছি এজন্য আমি শব্দ তৈরি করি। যেমন এই মুহূর্তে আমি বাংলা ভাষার সবচেয়ে সহজ অভিধান লিখছি। এর আগে এতো সহজ অভিধান লেখা হয় নাই। আগামী ফেব্রুয়ারিতে আশা করছি বের করতে পারবো এবং আশা করি বাংলা সাহিত্যে একটা বিপ্লব হবে। কবি অসীম সাহার ব্যক্তিগত জীবন, সংসার, প্রেম বিয়ে সম্পর্কে আপনার পাঠকদের কিছু বলুন । বৌদির সাথে কি প্রেমের বিয়ে ছিল? হ্যাঁ। আমি প্রেম করেছি। এটা প্রেম বলা যায় কি না জানিনা তবে একধরণের মোহ তৈরি হয়েছিল। ওটাকে ঘোরও বলা যেতে পারে। কারণ আমার বয়স তখন মাত্র ১৯ ছিল আর আপনাদের বৌদির বয়স ছিল ১৪। অপরিণত বয়সের কারণে আমাদেরকে পুলিশ ধরতে এসেছিল। এটা মাদারীপুরের ঘটনা। আমরা পাশাপাশিই থাকতাম। আমাদের বাড়ির পেছনে ওরা থাকতো। আমাদের উঠোন দিয়ে ও প্রতিদিন স্কুলে যেতো। ওভাবেই আমাদের একটা ভাললাগা তৈরি হয় এবং আমরা দু’জন পালিয়ে যাই। আমাদের সহযোগিতা করে ওর বান্ধবীরা আর আমার দুই বন্ধু। পালিয়ে গিয়ে আমি মামার বাড়িতে উঠি। তারা আমাকে খুব হেল্প করে। এরপর বাড়িতে যখন ফিরে আসি তখন আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। পুলিশ এসে বলে- আরে, এই বয়সে তোমার এতো সাহস!এইটুকু বয়সে তুমি এইটুকু একটা মেয়েকে বিয়ে করেছ! তবে যেহেতু দুজনের অভিভাবক রাজি ছিল তাই পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে নি। এখন আমাদের বিয়ের ৫০ বছর পার হয়ে গেছে। আমরা আগে যেমন ছিলাম তেমনি আছি, সেরকমই থাকতে চাই। সেরকমই থাকবো। দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই যে, গভীর প্রেম কখনো ভুল জায়গায় পড়ে না। আমার ঘরে যিনি আছেন তিনি আমার জীবনের জন্য এতোই উপযোগী, যে কারণে আমাকে কখনোই ডানে বায়ে তাকাতে হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। আমি তার কাছে ঋণী এজন্য যে, আমার স্ত্রী আমার বয়সে অনেক ছোট হলেও আমাকে জীবনের সমস্ত বিপদে আপদে আড়াল করে রেখেছে এই একটি মাত্র মানুষ। আপনি সুস্থ শরীরে দীর্ঘজীবী হোন। অনেক অনেক শুভকামনা। পরিবর্তন ডটকম ও আপনার জন্য আমার শুভাশিষ।

তৈল মর্দন

তৈল মর্দন

মোঃ রফিকুল ইসলাম
তৈল বা তেল একটি রাসায়নিক তরল পদার্থ যা সাধারন অবস্থায় পানির সংগে অমিশ্রণীয় কিন্তু অন্য তেলের সংগে সহজে মিশ্রণীয়। তেল সাধারনত প্রানিজ, ভেষজ ও খনিজ জাতীয় হতে পারে। একে খাওয়া যায়, রূপচর্চায় ব্যবহার করা হয়, ধর্মীয় আচারে এর প্রয়োজন হয়, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়, পিচ্ছিলকারক হিসেবে গাড়ি বা কলকব্জায় এবং চিত্রকলাসহ নানা কাজে এর ব্যবহার হয়। তবে আমাদের আলোচনা এ রাসায়নিক তেল নিয়ে নয় বরং অন্য আরেক ধরনের তেল নিয়ে। এ তেল বায়বীয়। বাস্তবে এ তেলের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও এর ব্যবহারে অর্থাৎ এ তৈল মর্দনে বাস্তবিক ফল লাভ করা সম্ভব। এ তৈল মর্দনও বাস্তবে করতে হয় না বরং ক্ষমতাশালীদের কথা বা কখনও কখনও কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে হয়। তেল বা তৈল মর্দনের কোন আলোচনা করতে গেলে সবার আগে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের কথা বলতেই হয়। কারন তিনি অনেক আগেই তৈল মর্দনের অভাবনীয় সাফল্যের বর্ণনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দিয়ে গেছেন। তাঁর বর্ণনায় তৈল মর্দনের স্তুতিগাথা কেমন ছিল? ঊদ্ধৃতি দিচ্ছি, "বাস্তবিক তৈল সর্বশক্তিমান, যাহা বলের অসাধ্য, যাহা বিদ্যায় অসাধ্য, যাহা ধনের অসাধ্য, যাহা কৌশলের অসাধ্য— তাহা কেবল তৈল দ্বারা সিদ্ধ হইতে পারে।" তিনি আরও বলেন— "যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও প্রফেসর হইতে পারে। আহাম্মক হইলেও ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকলেও সেনাপতি হইতে পারে এবং দুর্লভ রাম হইয়াও উড়িষ্যার গভর্নর হইতে পারে।" তৈল মর্দনের প্রতিশব্দ হিসেবে তোষামোদ, খোশামোদ, মোসাহেবি, চাটুকারিতা ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যারা এ কর্মটি করে ব্যূৎপত্তি অর্জন করতে পারে তাদেরকে বোধহয় ধামাধরা বা মোসাহেব বলা হয়। তৈল মর্দন বা চাটুকারিতা বা তোষামুদি শুধু আজকের বিষয় নয়। অনেক আগে থেকেই অনেক জ্ঞানী গুনী কবি সাহিত্যিক, ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ নিজেরা যেমন চাটুকারিতা পছন্দ করতেন আবার অনেকে চাটুকারিতা করে সাহিত্য রচনা করেছেন বা অন্যের চাটুকারিতা করে সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন। যেমনটি ইংরেজ কবি স্পেনসার তার ‘দ্য ফেয়ারি কুইন’ কাব্য রচনা করেছিলেন রানী প্রথম এলিজাবেথকে তোষামুদি করে। তেমনি আবার ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপীয়ার জুলিয়াস সীজার নাটক রচনা করেছিলেন রাজা প্রথম জেমসকে উদ্দেশ্য করে। এতো গেলো বিদেশের গল্প। এবারে দেশীয় ঘটনা কিছু বলা যাক। আমাদের এক প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁর মা মারা গেলে কোনও কোনও মন্ত্রী নাকি প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি কান্না-কাঁটি করেছিলেন । কে একজন নাকি একেবারে গড়াগড়ি করে কেঁদেছিলেন। তাঁর এক মন্ত্রী প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিলে রাজপথ ঝাড়ু পর্যন্ত দেওয়ার ঘোষনা প্রকাশ্য সভায় দিয়েছিলেন। এছাড়া অনেক কবি সাহিত্যিকও নাকি নানা সময়ে কবি প্রেসিডেন্টকে তোষামুদি করে নানা সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছিলেন বলে প্রচার ছিল। সত্য মিথ্যা আল্লাহ মালুম। তেলবাজ বা মোসাহেব হতে হলে কিছু গুনাবলী থাকতে হবে। যে কেউ তেলবাজ হতে পারবে না। সবচেয়ে যে জিনিসটা তেলবাজের থাকা চলবে না সেটা হল আত্ম সম্মানবোধ। কারন তাকে বসের সামনে প্রয়োজনে নিজেকে হেয় করে বসকে মহান করে তুলতে হবে। তার একেবারেই থাকা যাবে না চক্ষু লজ্জা। কারন আর সবাই খালি চোখে যা দেখবে সেটা বলা যাবে না। বরং বস যা দেখতে চায় বা বস যা শুনলে খুশী হবে তাকে সেটাই দেখতে হবে বা বলতে হবে। কেমন? ধরুন বস হয়ত কোথাও বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি হয়ত জানতে চাইলেন বক্তৃতা কেমন হল অথবা জানতে না চাইলেও তাকে বত্তৃতার বিষয়ে মন্তব্য করতে হবে । বক্তৃতা জঘন্য অখাদ্য হলেও তেলবাজকে বলতে হবে মারভেলাস বক্তৃতা হয়েছে স্যার। বা ভাল ভাল বিশেষন প্রয়োগ করে বক্তৃতার প্রসংশা করতে হবে। অবশ্য তাকে কিছুটা পরিমিতি বোধেরও পরিচয় দিতে হবে মাঝে মধ্যে। যেমন ওই বক্তৃতার প্রসংগে যদি তেলবাজ বা মোসাহেব বলে বসে স্যার আপনার বক্তৃতা এমন হয়েছে যে গেটিসবার্গ এ্যাড্রেস ফেল। তবে সবচেয়ে বলদ বসও তেল ধরে ফেলতে পারে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। তৈল মর্দনের আরও একটি ধ্রুপদী উদাহরন দেওয়া যায়। হয়ত কোন রাজনৈতিক নেতা সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন। নেতা হয়ত জানতে চাইলেন সমাবেশে কত লোক হয়েছিল। সংগীয় মোসাহেবকে বাস্তবে পাঁচ হজার লোক হলেও কয়কগুন বাড়িয়ে বলতে হবে। আবার তার বিরোধী পক্ষের সমাবেশ হলে বাস্তবে বিশ হাজার লোক হলে পাঁচ হাজারে নামিয়ে আনতে হবে। সত্য কথা বললে মোসাহবের চাকুরী নট হয়ে পড়তে পারে। অথবা অন্যপক্ষের দালাল প্রতিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তৈল মর্দন পছন্দ করেন না এমন লোক পাওয়া বিরল। কোন বস হয়ত তৈল মর্দন পছন্দ করেন না। তাকেও তেলবাজরা তেল মেরে তৈলাক্ত করে ফেলতে পারে। ভাবছেন কিভাবে? এ প্রসংগে বরং একটা গল্প বলি। ফরাসী সম্রাট নাকি তৈল মর্দন পছন্দ করতেন না। তাই তিনি একবার সে কথা তার সহকারীদের জানিয়ে বললেন যে তাঁকে কেউ তেল মারতে পারবে না। শুনে এক সহকারী বললেন যে মশিঁয়ে সম্রাটকে তৈল মর্দন করা যাবে কিনা আগামীকাল জানাবেন। পরদিন তিনি সম্রাটকে জানালেন, "আমি সারা রাত ধরে চিন্তা করে দেখলাম মশিঁয়ে প্রেসিডেন্ট । আসলেই আপনাকে তেলমারা সম্ভব নয়।" শেষেমেষ নাকি সম্রাট স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এ কথায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি তেলে সিক্ত হয়েছিলেন। আমাদের দেশে এরকম হলে কি হতে পারে তার একটা কাল্পনিক চিত্র আঁকা যাক। তেলবাজরা হয়ত এমনভাবে বসকে বলবে, "আমরা জানি স্যার আপনি তেলমারা একদমই পছন্দ করেন না।" তারপর হয়ত বিভাগের কোন নামকরা অফিসারের নাম করে বলবে, "তিনিও স্যার আপনার মত তেলমারা পছন্দ করেন না। অথচ তিনি সৎ, দক্ষ ও জনপ্রিয় কর্মকর্তা। আপনিও স্যার তার মত বা কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি।" আসলে হয়ত তিনি সততা দক্ষতার ধারে কাছেও নেই। বস মুখে যতই না না করুন না কেন নামজাদা কারও সাথে তুলনীয় হলে মনে মনে পুলকিত হবেন না এমন বস দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তেলবাজের গুনাবলী তো গেলো। এবারে দেখা যাক কোন শ্রেণির লোক তেলবাজ হয়ে। ১. ফাঁকিবাজ কর্মচারী বা কর্মী ২. অযোগ্য বা কম যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি। কম যোগ্যতা পুষিয়ে দেয় তার তেল মর্দন। ৩. লোভী ব্যক্তি। তেলবাজের কিভাবে লাভবান হওয়া যায় সেটাই মুখ্য চিন্তা থাকে। নীতি আদর্শের কোন বালাই তাতে নেই। কিছু মানুষ বোধহয় তেলমারার স্বভাব জন্মগতভাবে অর্জন করে। তাই তারা সুযোগ পেলেই তেলমারার চেষ্টায় রত থাকে। এবারে এরকমই একজনের গল্প বলা যাক। কয়েকজন শিক্ষানবীশ অফিসার শিক্ষাসফরে গেছেন। এক পর্যায়ে তাঁদের অন্য বিভাগের এক কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সূচী নির্ধারিত হয়েছে। সে কর্মকর্তা তাঁদের একই পদ মর্যাদার তবে সামান্য সিনিয়র। তাই সবাই পরামর্শ করেছে তাঁরা সাক্ষাৎকালে কর্মকর্তার সাথে নাম পুরুষে কথা বলবেন, স্যার ডাকবে না। সেভাবেই তাঁরা সাক্ষাৎকালে গল্প করছিলেন। সাক্ষাৎ পর্ব প্রায় সমাপ্ত হয়ে এসেছে। চা সার্ভ করা হয়েছে। সবাই নিজ নিজ চায়ের কাপে পছন্দ মত দুধ চিনি মিশিয়ে নাড়ছেন। এর মধ্যে একজন শিক্ষানবীশ অফিসার সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হোস্ট অফিসারের জন্য চা বানাচ্ছেন। চায়ে দুধ মিশিয়ে চিনি মিশাতে গিয়ে হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "স্যার, চায়ে চিনি ক'চামচ দিব?" সবাই বাকরুদ্ধ। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করলেন। অফিসার কি বুঝলেন কে জানে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কোন সমস্যা?" সবাই একযোগে না না করে উঠলেন। তাঁরা দ্রুত চা-পর্ব শেষ করে বেরিয়ে এলেন। বাইরে এসেই সবাই সে তেলবাজ শিক্ষানবীশ অফিসারের উপর হামলে পড়লেন। তাঁর এ তেলমারা স্বভাবের জন্য সবাই তাঁকে পই পই করে কথা বলতে বারন করেছিলেন। কিন্তু তিনি বহু কষ্টে অনেকক্ষন চেপে থাকলেও শেষ রক্ষা আর হয়নি। তেল মারতে হাত মুখ নিসপিস করছিল। তাই সুযোগ আসতেই মনের অজান্তেই একটু তৈল মর্দন করে দিয়েছেন। অর্থাৎ যার তেলমারা স্বভাব হাজার চেষ্টা করুন তবুও তাকে তৈল মর্দন থেকে বিরত রাখতে পারবেন না। কিছু মানুষ যেমন তেল মারা পছন্দ করেন বা তেল মারা তার জন্মগত স্বভাব আবার তেমনি কিছু মানুষ আছে যারা তেল মারা একেবারে পছন্দ করেন না বা তেল মারা তার ধাতে সয় না। না হলে কি কেউ নির্বাচনী পোস্টারে এমন কথা লেখে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? খোলাশা করছি। ময়মনসিংহ জেলার ৮ নং আকুয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বর প্রার্থী তার নির্বাচনী পোস্টারে লিখেছে, " আমি মোঃ তৈয়ব আলী প্রাইমারী পাশ সকলের দোয়া ও ভোট চাই। ভোট দিলে দিবাইন না দিলে তেল মারার পাইতাম না।" তার যে নির্বাচিত হতে পারার বিন্দুমাত্র সম্ভবনা ছিল না তা বোধহয় বিস্তারিত খোঁজ খবর না নিয়েই বলা যায়। আবার ইচ্ছা থাকলেও মোসাহেবি কিন্তু সবাই করতে পারে না। এজন্য আলাদা বিদ্যা অর্জন করতে হয়। একালে যেমন আমরা অফিস আদালতে কিংবা রাজনীতির মাঠে বা বাংলা সিনেমায় চেয়ারম্যানের ছাতিধরা মোসাহেব দেখি তেমনি আগের যুগেও কিন্তু মোসাহেবদের কদর নেহায়তে কম ছিল না। কোন কোন রাজা বা জমিদার রীতিমত মোসাহেব নিয়োগ দিতেন তার মোসাহেবি করতে। রবি ঠাকুরের দুই বিঘা কবিতায় মোসাহেবির সুন্দর একটা উদাহরন আছে। যেমন "রাজা যত বলে পারিষদ বলে তার শতগুন। " এ রকমই মোসাহেব নিয়ে এক গল্প বলি। একবার কৃষ্ণনগরের এক জমিদারের খুব শখ হল মোসাহেব পুষবেন বলে। অনেকেই দরখাস্ত করলো জমিদারের মোসাহেব হতে। কিন্তু জমিদার বাবু মোসাহেব নির্বাচন করবেন কিভাবে। বড় ফাঁপরে পড়ে গেলেন। শেষমেষ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবারের সভাসদ গোপালভাঁড়ের শরানাপন্ন হলেন। ও হ্যাঁ গোপাল কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় ভাঁড় ছিলেন। নানা হাস্যরস বা ক্যারিক্যাচার করে রাজাকে আনন্দ দিতেন। মোসাহেব ছিলেন না। বরং রাজাকে উচিৎ কথা বলতে ছাড়তেন না। কখনও রাজাকে নিয়ে রসিকতাও করতেন। যা মোসাহবি আচরনের বিপরীত। সেই গোপাল ভাঁড় ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। গোপাল প্রার্থীদের সবাইকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। প্রথম প্রশ্ন : "আপনি কি মোসাহেবি করতে পারবেন ?" উত্তর: "কেন পারবো না? পারবো?" দ্বিতীয় প্রশ্ন: "না। আমার মনে হয় না, আপনি পারবেন?" উত্তর : "কি বলেন ভাঁড় মশাই, অবশ্যই পারবো।" প্রায় সবাই একই উত্তর দিলেন। গোপাল ভাঁড় তাদের আর কোন প্রশ্ন করলেন না। শুধু একজন প্রাথীকে তিনি তিনটি প্রশ্ন করলেন। তার প্রশ্নোত্তর ছিল এ রকম। প্রশ্ন : আপনি কি পারবেন? উত্তর: "ঠিকই বলেছেন। আমারও সন্দেহ হচ্ছে আসলেই কি আমি পারবো?" প্রশ্ন : "আপনি মনে হয় না পারবেন।" উত্তর : "আমারও তাই মনে হচ্ছে আমি বোধহয় পারবো না।" প্রশ্ন : "পারবেন না কেন? পারবেন।" উত্তর : "তাইতো পারবো না কেন, অবশ্যই পারবো।" কোন্ প্রার্থীকে এবং কেন নির্বাচন করেছিলেন তা নিশ্চয়ই আপনাদেরকে বলে দিতে হবে না। হ্যাঁ। ঠিক ধরেছেন শেষোক্ত প্রার্থীই নির্বাচিত হয়েছিলেন। কারন তিনি প্রশ্ন কর্তার সাথে কখনও দ্বিমত করেননি। সুতরাং তার চেয়ে ভাল মোসাহেব আর কেউ হতে পারতো? হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের আমলে শুধু কথার তেলেই অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ সম্ভব ছিল। তবে আজকাল শুধু কথার তেলের ধার বোধহয় একটু কমে গেছে। এজন্য সাথে কড়ি ও কামিনীরূপ তেলও দিতে হয়। কেউ কেউ কড়ি তেলেই সন্তুষ্ট থাকেন। কেউ আবার নিজেকে সৎ ভাবেন তাই কড়ি নেন না। তাকে হয়ত কামিনীতে সন্তুষ্ট করতে হয়।আবার কেউ কেউ আছেন সর্বভুক। কড়ি কামিনী সবই ভালবাসেন। তৈল মর্দন করতে যারা অভ্যস্ত তারা নির্বিঘ্নে কাজে লেগে থাকুন আখেরে লাভ হবে। যারা নবীশ আছেন তারা ফরমুলা মেনে চেষ্টা চালিয়ে যান সফলতা আসবেই। তবে অবশ্য সীমার মধ্যে থাকুন নাহলে কিন্তু আম ছালা দু'ই যাবে। তৈল মর্দনে জাগতিক অনেক কিছু লাভ করা সম্ভব। যেটা শাস্ত্রী মহাশয় বলে গেছেন। তবে জনান্তিকে বলে রাখি দুর্জনেরা কিন্তু বলেন শাস্ত্রী মহাশয়ও নাকি তৈল মর্দনের কারনেই এত সুন্দর তৈল বিষয়ক রচনা লিখতে পেরেছিলেন। তাই বলে আপনারা আবার মনে করবেন না আমিও কারও তৈল মর্দনে এটা লিখার চেষ্টা চালিয়েছি। আমার মত অভাজনকে আর কে তৈল মর্দন করবে বলুন?

আমাদের নাম অবক্ষয়

আমাদের নাম অবক্ষয়/দর্পণ কবীর

(উৎসর্গ: খুন হওয়া সাংবাদিক সুবর্ণ নদীকে) সুবর্ণ, আপনি যেখানে লাশ হয়ে পড়ে আছেন, রাষ্ট্রও ঠিক এখানে এক গলিত লাশ! যে কথাগুলো গণতন্ত্রের সুরভী মেখে স্বাধীনতার ফুল হয়ে আপনার লেখনীতে ফুটে উঠতে চেয়েছিল, সেই কথাগুলো আপনার রক্তস্রোতের ধারা হয়ে আমাদের অবনত করে গেল নিদারুন লজ্জা আর গ্লানিতে। সুবর্ণ, আমাদের মাথার ওপর লটকে থাকা আকাশ এতোটা নিচে নেমে এসেছে, আমরা কোনো প্রিয়মুখ দেখতে পাচ্ছি না, আর কী আশ্চায, মুখোশ পড়া খুনীরা কণ্ঠ মেলাচ্ছে কোরাসে। অন্ধকারও মেকী আলো হয়ে আমাদের দাঁড় করিয়েছে বিভ্রান্ত-বৃত্তে! সুবর্ণ, আপনি নদী বলেই তের শ’ নদীর জল স্থির হয়েছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গনের সময়। আপনার নেই কোনো পরাজয়, শুধু আমাদের নাম হয়েছে ‘অবক্ষয়!’ ২৯ আগষ্ট, ১৮। নিউইয়র্ক।

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.