ফকির লালন শাহকে ‘বর্তমান’ করে তোলা

20131016-235157.jpg

ফকির লালন শাহকে ‘বর্তমান’ করে তোলা ফরহাদ মজহার বাজার ব্যবস্থায় সবকিছুই পণ্য হয়ে ওঠে, লালন ব্যতিক্রম কেউ নন। ফলে লালন সাধক ছিলেন বলে তাকে নিয়ে সিডি, ভিডিও বা সিনেমার ব্যবসা হবে না, এই গ্যারান্টি দেওয়া কঠিন। তাকে নিয়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নাই। লালন সাঁইজীকে বাজারের বিষয়ে পরিণত করার বিরোধিতা করেন অনেকে। অভিযোগ ওঠে, লালন কর্পোরেট বাণিজ্যের বিষয়ে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন। আপত্তিকর মনে হয়। আপত্তি ওঠা স্বাভাবিক। ফলে ফকির লালন শাহকে বাজারের দূষণ থেকে বিশুদ্ধ রাখার একটি বাসনা ও চেষ্টা দানা বেঁধে উঠতেই পারে। লালন নিয়ে একটা বাজারি আগ্রহ যেমন তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি একটা উদ্বিগ্নতাও আছে। পহেলা কার্তিকে ফকির লালন শাহের তিরোধন দিবস। ভাবছি, লালন যখন তিরোহিত, তিনি যখন জীবদেহে স্বয়ং হাজির নাই, তখন তাঁর ডাকনাম কেন্দকানদিকে ফেরালে তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয় বা হতে পারে। লালনকে নানান দূষণ থেকে রক্ষা রেখে বিশুদ্ধ রাখার বাসনার প্রসঙ্গ টানছি আলোচনায় সহজে প্রবেশ করবার জন্য। বাংলা ১২৯৭ সালে (খ্রিষ্টীয় ১৮৯০) তাঁর তিরোধানের পর ১২৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। এই দিনে কুষ্টিয়ার ছে্উঁড়িয়ায় তাঁর ভক্ত, অনুসারী ও অনুরাগীরা ছোটখাট যে অনুষ্ঠান করতেন সেটা এখন লালন একাডেমিক সরকারি অনুষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। তিরোধানের দিন তো শোকের দিন। কিন্তু এখন সেটা আর শোকের দিন হিশাবে নয়, রীতিমতো উৎসব হিশাবে পালন করা হয়। এছাড়া ফকির লালন শাহ জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমায় যে ‘সাধুসঙ্গ’ করতেন সেই দিনটি সাধুগুরুরা সাধুসঙ্গ হিশাবেই পালন করে আসছিলেন। কিন্তু সেটাও এখন একটা মেলায় পরিণত হয়েছে। লালন একাডেমি দোলপূর্ণিমাতেও সরকারি ভাবে মেলা বসান। সাধুগুরুদের এখন কমই দেখি। পনের বিশ বছর আগেও ছোট ছোট দলে বিভিন্ন জায়গায় রাতভর গান আর তত্ত্বালোচনা দেখেছি। এখন হল্লা বেড়েছে। সাধুগুরুদের আগমন কমেছে। এলেও তাঁরা একদিন এক রাত থেকে চলে যেতে দেখি। তত্ত্বালোচনা একদমই হয় না, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু তার মগ্নতা ও গভীরতা কমেছে, অন্যদিকে সেটা ক্রমাগত চাপা পড়ে যাচ্ছে কোলাহলে। গত কয়েক দশকে নিজের চোখের সামনেই ছেঁউড়িয়াকে বদলে যেতে দেখেছি। একই সঙ্গে দেখেছি লালনপন্থী সাধুগুরুদের মধ্যেও লালন চর্চার রূপান্তর। যে জীব চর্চা আগে সম্ভব ছিল, গ্রামে সেই জীবন ধারণ এখন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। চর্চাও বৈষয়িক কারণে বদলে যাচ্ছে। লালনের গানচর্চার মধ্যেও রূপান্তর ঘটেছে। আগে শিল্পী গড়ে উঠতো বিভিন্ন সাধুসঙ্গে গান গেয়ে এই ভাবের পরিমন্ডলে পরীক্ষা দিয়ে। এখন কারা উঠে আসতে চায় ‘বাংলাদেশ তোমাকে খুঁজছে’ ধরণের অনুষ্ঠানের বিচারকদের সন্তুষ্ট করে। শিল্পীর খ্যাতি বা সাফল্য লালনপন্থী সাধুগুরুদের সন্তুষ্টি অর্জনের ওপর আর নির্ভরশীল নয়। লালনের গানের সঙ্গে আর লালনের জীবন ও ভাবচর্চার একটা বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে। ‘লালন গীতি’ নামে সাধকের জীবন চর্চা থেকে আলাদা করে যে ছেদটা টানা হয়েছিল সেটা এখন পূর্ণ বিচ্ছেদে পরিণত হয়েছে। ‘লালন গীতি’ নামে একটা গানের ঘরানা তৈরি হয়েছে যার সঙ্গে সাধক জীবনের কোন সম্পর্ক নাই। ব্যান্ড শিল্পীরাও লালন গাইছেন। নাচাকুঁদা করছেন। নতুন মাধ্যম নতুন যে শ্রোতা শ্রেণী তৈরি করেছে তাদের মনোরঞ্জনের ওপর সেই গীতির গায়কী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সাধুসঙ্গে যে গান ভাবচর্চার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে নিজের বিকাশ ঘটাত, সেই চর্চার পরিমন্ডল থেকে গান আলাদা হয়ে গিয়েছে। আজকাল আবার ছেঁউড়িয়ায় দেখি হিন্দি গানের দূরে লালনের গান সুর করবার চেষ্টা। মোট কথা, পুরানা সম্পর্ক পুরানা প্রতিষ্ঠানগুলো সব ভেঙে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে। শ্রুতি ও কণ্ঠনির্ভর সংস্কৃতির মধ্যে ভাবচর্চার যে ধারা এতোকাল বিকশিত হতে পেরেছে, অক্ষর, মুদ্রাযন্ত্র বা ডিজিটাল যুগে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা কঠিন। সেটা আদৌ সম্ভব কিনা, কিংবা সম্ভব হলে তার চর্চার রূপ কেমন হবে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যার মীমাংসা হয়নি। বাজার এখন সর্বব্যাপী, পুঁজিই এই যুগে ধর্ম। ফলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ফকির লালন শাহের একটা বদল ঘটবে। ঘটছেও। কিন্তু সব কিছুকে পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়া তীব্র হওয়ার কারণেই ফকির লালন শাহের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কথাটা পুরাপুরি সত্য নয়। বাজার ব্যবস্থা সর্বব্যাপী হয়ে ওঠায় আগেও বদল ঘটছিল। যদি রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখি তাহলে দেখব লালন একাডেমি প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে মতিজান-লালনের কবর ও স্মৃতিক্ষেত্র থেকে ফকিরদের উৎখাত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অনেক আগে। গুরুবাদী ফকির লালন শাহ কবর পূজারি ছিলেন না। কিন্তু যেখানে তিনি দেহ রেখেছেন, সেটা এখন ‘মাজার’ হয়ে গিয়েছে। এখন দেখি আরবি লেখা গিলাফ দিয়ে মতিজান ও তাঁর সমাধিও মাঝে মধ্যে ঢাকা হয়। লালনের জীবদ্দশায় মলম শাহের যে বাড়ি তাঁর আখড়া ছিল সেখানে তার চর্চার ধারা আর তাঁর তিরোধানের পরে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে চর্চার ধারার মধ্যেও ছেদ পড়েছিল। তাঁর দুই শিষ্য মনিরুদ্দিন ও ভোলাই শাহের মধ্যে মতপার্থক্য ও আখড়ার মালিকানা নিয়া ঝগড়া-বিবাদের ইতিহাস আমাদের জানা। ফকির লালন শাহের নামে তার শিষ্যরা যা টিকিয়ে রেখেছেন তাদের প্রত্যেকে ফকির লালন শাহকে যে যেমন বুঝেছেন তেমনি চর্চা করেছেন। তাঁরাও তাদের মত করেই বাংলার সাধনা বা ভাবচর্চার ধারায় অবদান রেখেছেন। অর্থাৎ লালনের শিষ্যদের মধ্য দিয়ে লালনের বিশুদ্ধ কোন ধারা বহাল থাকে নি। এই বিশুদ্ধতার অনুমানে ফকির লালন শাহ নিজেও সায় দিতেন না। আখেরি নবী সম্পর্কে তাঁর নিজের একটা গান রয়েছে এই রকম : নবীর সঙ্গে ছিল ইয়ার চারজন চারকে দিলেন নবী চারমত যাজন নবীবিনে পথে গোল হোল চার মতে ফকির লালন বলে যেন গোলে পড়িস নে। নবীর চার সাহাবাকে নবী চার রকম যাজন বা শিক্ষা দিয়েছিলেন। নবীর তিরোধানের পর চারজন চার ভাবে নবীকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই গোলমালে পড়া যাবে না। এটা তো ফকির লালন শাহ সম্পর্কেও সত্য। তার তিরোধানের পর তাঁর শিষ্যরা যে যেমন বুঝেছেন তেমনি করেই লালনকে ব্যাখ্যা করবেন, তাঁর শিক্ষা ও নির্দেশাবলী চর্চা করবেন, এটাই হবার কথা। তেমনি করেই তারা চর্চা করেছেন। যতটুকু তাঁরা বুঝেছেন ততোটুকুই তাঁরা তাঁদের জীবনে ফকির লালন শাহকে ‘বর্তমান’ করে তুলেছেন। ফকির লালন শাহের এখন যে খ্যাতি বা পরিচিতি সেটা তাঁর শিষ্যদের জীবন ও ভাবচর্চার খ্যাতি নয়। লালনের খ্যাতির জন্য তাঁর গানের ভূমিকা মুখ্য। কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও কথা আছে। লালনের গান এর আগে খোদা বক্স, মকসেদ আলীসহ আরো অনেকে গেয়েছেন। তাদের একটা পরিচিতিও রয়েছে। লালনকে জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে তাঁরা বিশেষ কোন আবেদন তৈরি করতে পারে নি। এমনকি আবদুল আলিম যখন লালনের গান বেতারে গাইলেন এবং তুলনামূলক ভাবে অধিক জনপ্রিয় করলেন তখন সেই গানগুলো মধ্যবিত্ত শ্রেণী ‘পল্লীগীতি’ হিশাবেই শুনেছে। পল্লীগীতি হিশাবেই কিছু শ্রোতা আবদুল আলিম তৈরি করতে পেরেছিলেন। যেমন, ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘কে কথা কয়রে দেখা দেয় না’, ‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’, ‘এই দেশেতে এই সুখ হোল’ ইত্যাদি গান তার মারফত পল্লীগীতি হিশাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ‘লালনগীতি’ নিজের পরিচিতি নিয়ে হাজির হওয়া শুরু করে স্বাধীনতার পর ফরিদা পারভিনের গলা ও গায়কী ধরে। স্বাধীনতা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে নতুন আগ্রহ তৈরি করবার কারণে এটা ঘটেছে, নাকি এই সময় টেপ ও ক্যাসেট রেকর্ডার ভূমিকা রেখেছে সেটা নির্ণয় করা গবেষণার বিষয়। এই দিকগুলো মনে রাখলে লালনকে বিশুদ্ধ রাখার চিন্তার মুশকিল আমরা ধরতে পারব। আসলে ফকির লালন শাহ তাঁর গানের জন্য যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন সাধক ও ভাবুক হিশাবে প্রতিষ্ঠা পান নি, বললেই চলে। এই অভাবের কথা মনে রেখেই প্রশ্ন তোলা যায় ফকির লালন শাহকে কেন্দ্র করে বাংলার ভাবান্দোলনের যে চর্চা এখন জারি আছে, তার অভিমুখ কোনদিকে ফেরালে তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয় বা হতে পারে। সোজা কথায় লালনকে কিভাবে বুঝলে ও চর্চা করলে তিনি এই কালে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন? দুই. শুরুতেই বলা যায় ফকির লালন শাহের বিশুদ্ধতা রক্ষার বাসনা শেষাবধি প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত হয় কিংবা পর্যবসিত হবার বিপদে পড়ে। এই বাসনা ত্যাগ করা দরকার। লালন যখন জীবিত ছিলেন তখনও তাঁকে কিংবা তার চর্চা ও গানকে বিভিন্ন জাত ও শ্রেণী নিজের নিজের জায়গা থেকেই ব্যাখ্যা করেছে। লিঙ্গভেদে লালনের তাৎপর্যও ভিন্ন হয়েছে। তাহলে বিশুদ্ধ লালনকে খুঁজব কোথায়? অর্থাৎ জাত, শ্রেণী ও নারী-পুরুষ ভেদের দিক থেকে বিভিন্ন লালন তো আছেই তার ওপর বাজার লালনের যে ভূত নির্মাণ করে সেটা যেমন আপত্তির, ঠিক একই ভাবে তার বিপরীতে লালনকে ‘বিশুদ্ধ’ ভাবে পাঠ ও হাজির করবার বাসনাও সমান মুশকিলের। তবে লালনকে বাজারের বিষয়ে পরিণত করার বিরোধিতা মাত্রই নেতিবাচক নয়। ইতিবাচক বিরোধিতার বাসনা ভিন্ন। সেই বাসনাকে বিশুদ্ধ লালন সন্ধানের আকুতির মধ্যে চেনা যাবে না। বরং তার আকুতি বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনার মধ্যে। এই বাসনার চরিত্র রাজনৈতিক হতে বাধ্য। সেই বাসনার দিক থেকে দেখলে বাংলার ভাবচর্চার দরকারি অভিমুখটা শনাক্ত করা সহজ হয়। এই পথেই লালনকে বর্তমান করে তুলবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই অভিমুখটা স্পষ্ট হলে ফকির লালন শাহ জীবনযাপন ও ভাবচর্চার মধ্যদিয়ে যে জগতটা তৈরি করবার সাধনা করেছেন তাকে চেনা, জানা ও বোঝার চেষ্টা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। নইলে ফকির লালন শাহ এবং তার অনুসারী ও অনুরাগীরা বড়জোর নৃতাত্ত্বিক বা সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রান্তিক অনুষঙ্গ হিশাবে থাকবেন তারা। বাউল ফকির হিশাবে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে তাদের অন্তর্গত করে নেবার জন্য যেটা দরকার। এর অধিক কিছু হবে না। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের বাসনা থেকে কাজ করা না হলে এখনকার লড়াই সংগ্রামে ফকির লালন শাহ প্রাসঙ্গিক হবেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ ও রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক করে তোলাকেই আমরা তাঁকে ‘বর্তমান’ করে তোলা বলছি। কিভাবে এই অভিমুখটা নির্দিষ্ট করা যায় সেই বিষয়ে দুই একটি প্রস্তাব দেবার জন্যই এই লেখা। প্রথমেই যে দিকটা স্পষ্ট করা দরকার সেটা হলো আমাদের কিছু অভ্যাস বদলানো জরুরি। ফকির লালন শাহকে মরমি বা আধ্যাত্মিক পুরুষ হিশাবে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত; এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। লালন বেদ-কোরান শাস্ত্রকথা বা কোন কানকথা বা লিখিত কথাকে আক্ষরিক সত্য বলে মেনে নেন নি। আমরা জগতকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক ইত্যাদি ভাগে ভাগ করতে অভ্যস্ত। এই অভ্যাসের জায়গা থেকে লালনকে বোঝা কঠিন। লালন মানুষের ভজনা করেছেন। সেখানে ইহলোক - পরলোক ভেদ নাই, দেহ ও আত্মার বিভাজন নাই। আমরা যেহেতু আত্মাকে দেহ থেকে আলাদা করে ভাবতে অভ্যস্ত, ফলে দেহসাধনার কথা শুনলে আমরা তাকে দৈহিকতা ছাড়া আর কিছু বুঝি না। এই দৈহিকতার মানেও আমাদের কাছে হয়ে ওঠে যৌনতার চর্চা। এর ফলে দেহের বাইরে যে আসলে ‘মানুষ’ নামক বিমূর্ত কিছু নাই, এই অতি প্রাথমিক ‘বস্তুবাদী’ শিক্ষা আমাদের নজরের আড়ালে চলে যায়। তখন লালনকে বুঝতে গিয়ে আমরা নানান গুহ্য সাধন প্রণালী, চারিচন্দ্র ভেদ ও নানান আচার-অনুষ্ঠানকে মুখ্য জ্ঞান করা শুরু করি। যেহেতু গোপন ও রহস্যময় জগতের দিকে মানুষের একটা স্বাভাবিক কৌতূহল থাকে, তখন গোপন যৌনচর্চার আলোকে লালনকে এক রহস্যময় পুরুষ হিশাবে গড়ে তোলা হয়। এর পরিণতি কি হতে পারে সেটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’ উপন্যাস ও সেই উপন্যাস নিয়ে গৌতম ঘোষের বানানো ছবির উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে লালন চন্দ্র কর নামে এক চরিত্র বানানো হয়েছে যে রীতিমতো রতিগ্রস্ত। তার গুরু তাকে মেয়ে সাপ্লাই দেয়। যৌনতার চর্চা ছাড়া তার অন্য কোন সাধনা নাই। নারী যার কাছে নিছকই সাধনার উপায় বা তথাকথিত ‘সাধনসঙ্গিনী।’ সেখানে লালন এমনই এক ব্যক্তি যেকোন চিন্তা করতে জানে না, গান বা বাক্য তার মধ্যে আপনা আপনি আসে, আপনা আপনি পয়দা হয় ইত্যাদি। ওপরে ‘বস্তুবাদী’ কথাটা উদ্ধৃতি চিহেৃর মধ্যে রেখেছে এ কারণে যে বস্তু ও ভাবের বিভাজন মেনে ‘বস্তুবাদ’ ও ‘ভাববাদ’ হিশাবে যেভাবে আমরা চিন্তাকে পরস্পর বিরোধী স্রোতে বিভক্ত করি, লালনকে বুঝতে হলে এই বিভাজনের ফাঁদে পা দিলে চলে না। দুইয়ে দুইয়ে জগতকে বিভক্ত করে ভাববার অভ্যাস ত্যাগ করার দিক থেকে থেকে আমরা লালনকে ‘বর্তমান’ করে তোলার অভিমুখ নির্দিষ্ট করবার প্রথম সূত্রটি তাহলে আমরা এখানে পাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, বাংলার ভাবান্দোলনের জাতপাত, শ্রেণী ও নারীপুরুষ ভেদ বিরোধী যে রাজনৈতিক ধারা শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দের আমল থেকে শুরু হয়েছিল ফকির লালন শাহের আবির্ভাব ও বিকাশ নদিয়ার সেই ভাবের মধ্যেই। এই রাজনীতিই লালনের আবির্ভাবকে সম্ভব করে তুলেছে। জাতপাত বিরোধী নদিয়ার এই ভাবের বিকাশের ক্ষেত্রে ফকির লালন শাহের গুরুত্ব অপরিসীম। এর রাজনৈতিক দিকটা বোঝার জন্য শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসটি আমাদের জানা দরকার এবং সেই প্রয়োজনে সুলতানি আমল ও ইসলামের ভূমিকা বোঝা জরুরি। এই ক্ষেত্রে কাজ হয়েছে খুবই কম, যদিও সম্প্রতি কিছু কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যে ভাবগত জায়গায় দাঁড়িয়ে ফকির লালন শাহ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও ভেদবুদ্ধির রাজনীতির বিরোধিতা করেছেন তাকে বিশেষ ভাবে বোঝা দরকার। সেই ক্ষেত্রে তাঁর ভাবুকতা ও রাজনীতিকে আমরা আলাদা করতে পারি না। মানুষের ভজনা করেছেন তিনি, কিন্তু মানুষে মানুষে সমান এই বুর্জোয়া সাম্যবাদ ফকির লালন শাহ প্রচার করেন নি। তার মধ্যে এই প্রকার কোন ‘মানবতাবাদ’ নাই। তাহলে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের বিরোধিতার যুক্তিটা তিনি কিভাবে খাড়া করেছেন? তাঁর যুক্তি হচ্ছে, ‘ব্রাহ্মণ, চন্ডাল, চামার, মুচি সকলেই এক জলে সূচি’। সকলেরই সূচনা ‘একই জল’। রজোবীজের প্রাকৃতিকতায় সকল মানুষের সূচনা ঘটেছে ‘একই জলে।’ মানুষের মধ্য দিয়েই মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রকৃতি, প্রক্রিয়া বা প্রাকৃতিকতার দিক থেকে অভেদ প্রতিষ্ঠার এই বিশিষ্টতার দিকে নজর রাখা দরকার। ‘দেহ’ কেন বাংলার ভাবান্দোলনের কেন্দ্রীয় বিষয় সেটা আমরা এই ক্ষেত্রেও দেখছি। তৃতীয় দিকটা হচ্ছে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’-র প্রশ্ন। যে জীবন সাধকরা চর্চা করেছেন সেখানে ত্যাগের ভূমিকা প্রধান, এটা সহজেই বোঝা যায়। সম্পত্তি বা বিষয়-আশয় ত্যাগের দিকটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিষয়-আশয় ত্যাগ করতে গিয়ে ফকির লালন শাহ ‘বর্তমান’-কে ত্যাগ করেন নি। বাস্তব জগতকে ত্যাগ করবার কথা বলেন নি। এখানে শিক্ষণীয় দিকটা হচ্ছে বিপ্লব বা আইন করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি উৎখাত করলে সেটা উৎখাত হয়ে যায় না। সেটা ফিরে আসে। কারণ ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে ‘আমি বা ‘আমিত্ব’ জড়িত। ‘আমি’-র মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা জগতকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগদখলের বাসনা থেকে যায়। ‘আমি’ আবার নিজেকে সম্পত্তির দখলদার বা মালিক হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করবার ফাঁক পেয়ে যায়। তাহলে বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রশ্ন এই ‘আমি’-র সঙ্গ মোকাবেলার প্রশ্ন। বিদ্যমান ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তরের রাজনীতির মধ্যে ব্যক্তির রূপান্তর প্রধান বিষয় হিশাবে গণ্য করবার একটা শিক্ষা এখানে আমরা পেতে পারি। লালনকে সহজে বিপ্লবী রাজনৈতিক চর্চার দিক থেকে বোঝার জন্য ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র দিক থেকে ওপরে কথা পেড়েছি। আসলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রশ্ন মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রশ্ন। একই সঙ্গে নিজের সঙ্গে নিজের এবং অপরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নির্ণয়ের প্রশ্নও বটে। এই সম্পর্ক নির্ণয়ের পদ্ধতি কি হবে? এই দিক থেকে যদি ভাবি তাহলে দেখি লালন যখন ‘জ্যান্তেমরা’-র কথা বলেন তখন তার একটা গভীর রাজনৈতিক মানে দাঁড়ায়। লালন সাধকদের জ্যান্তে মরবার বা মৃত্যুর আগেই মরে যাবার চর্চা করতে বলেন। এর নগদ লাভ হচ্ছে তখন মানুষের আর মরণের ভয় থাকবে না। মরণের ভয় আছে বলেই মানুষের পরকালের ভয় আছে। পরকালের ভয় থাকার অর্থ হচ্ছে ধর্মতত্ত্ববিদ বা মোল্লা-পুরোহিতের বিধান ও হুকুম মেনে নেওয়া। কিন্তু জ্যান্তেমরার অর্থের সন্ধানে আমরা আরও গভীরে যেতে পাই। ঠিক যে জ্যান্তেমরার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে জীবিত থেকেও মৃত হবার সাধনা করা। কিন্তু জীবিত থেকেও মরে যাওয়া আবার কিভাবে সম্ভব? সহজ কথায় এর অর্থ হচ্ছে জীবের যে জীবমূলক বাসনা তাকে দমন করা। এতে মনে হতে পারে লালন জীবের জীবনকে অস্বীকার করছেন। আসলে তা নয়। আগেই বলেছি লালন ‘বর্তমান’ চর্চা করেন। অতএব জীবের জীবন ছাড়া মানুষের যে কোন জীবন হতে পারে না এই কাণ্ডজ্ঞান তো তাঁর অবশ্যই ছিল। শুধু তাই নয়। জীবের জীবনই সাধনার ক্ষেত্র এটাই তার মৌলিক প্রস্তাব। কারণ যাকে ‘পরম’ বা পরমার্থিক সত্য বলি তার আস্বাদন একমাত্র জীবের জীবনেই সম্ভব। তাহলে ‘জ্যান্তেমরা’ কথাটা জীবের জীবনকে অস্বীকার করা নয় বরং জীবজীবনের সত্যকে নিঃশর্তে মেনে নেয়া। জীবের জীবনে পরমের আস্বাদনের জন্যই পরমকে ‘বর্তমান’ করে তোলার জন্যই জ্যান্তে মরবার চর্চা করতে হবে। কিন্তু জীবকে তাহলে মরবার সাধনা করতে হবে কেন? অর্থাৎ জীবমূলক কামনাবাসনা ত্যাগ চর্চার কি দরকার? দরকার কারণ মানুষ ‘জীব’ একথা সত্য, কিন্তু মানুষ শুধু জীব নয়। এ এমন এক জীব যার মধ্যে পরমার্থিক সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। মানুষ মাত্রেই পরম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির। সেই সম্ভাবনাকে বর্তমান করে তোলা সম্ভব যদি জীবমূলক কামনাবাসনার জায়গায় মানুষ পরমের আকাঙ্খা - পরমার্থিক বাসনার চর্চা করতে শেখে। বিদ্যমান ব্যবস্থার রূপান্তর কামনা করা বাংলার ভাবুকতার দিক থেকে পরমার্থিক বাসনা। অন্যদিক থেকে জীবের বাসনা মূলত ভোগের বাসনা। তাহলে জ্যান্তে মরার অর্থ মানুষের জীবনকে ভোগীর জীবনে পর্যবসিত হতে না দেওয়া। ভোগের জীবন ত্যাগ করার অর্থ হচ্ছে জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও নতুন ভাবে বিন্যস্ত করা। জগত শুধু ভোগের বিষয় নয় এই শিক্ষা দেওয়া। জগত মানুষের কাছ থেকে আলাদা থেকে মানুষের বাইরে মানুষের ভোগের জন্য হাজির এ ভাবনা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পোড়ায় যেমন সক্রিয়, তেমনি পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণও এই জীবমূলক বাসনার মধ্যে। যদি এতটুকু আমরা বুঝি তাহলে জ্যান্তেমরা হবার জন্য খিলকা নিয়ে ফকিরিবেশ ধারণকে আমরা শুধু লালনপন্থীদের একটা আচার আকারে নয়, মানুষের পরমার্থিক সত্যকে বর্তমান করে তোলার আবশ্যিক চর্চা হিশাবে বুঝতে শিখব। ফকিরি রহস্যও আমাদের কাছে গুহ্য কোন ব্যাপার হয়ে থাকবে না। আরও অনেক দিক নিয়ে আলোচনা দরকার। ওপরে যে তিনটি দিক নিয়ে কথা বলেছি, সেই দিকে আমাদের নজর ফেরাতে পারলে কম অর্জন হবে না। লালন শাহকে নিয়ে অনেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আরো হবে। তাঁর সাধক জীবনের চর্চা ও অনুশীলন তিনি যেভাবে করেছেন তাকে যথাসম্ভব জানা দরকার। তাঁর সাধনার আচার, অনুশীলন বিধিবিধান কেমন ছিল? তিনি সাধুসঙ্গ করতেন কিভাবে? তাঁর ‘কালাম বা গানের যথাসম্ভব সঠিক পাঠ নির্ণয়ের উপায় কি? ইত্যাদি দিকগুলো জানা, বোঝা ও আলোচনার দরকার আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই কাজগুলো তখনই এই কালে প্রাসঙ্গিক হবে যখন আমরা বাংলার ভাবান্দোলনের ঐতিহাসিক অভিমুখ ক্রমে ক্রমে নির্দিষ্ট করে তুলতে পারব। লালনের রাজনৈতিক-দার্শনিক তাৎপর্য যতো বেশি নিজেদের কাছে আমরা পরিস্কার করে তুলব ততোই ফকির লালন শাহ আমাদের জন্য ‘বর্তমান’ হয়ে উঠবেন।

যেভাবে কবিতা পড়ি: আহমাদ মোস্তফা কামাল

যেভাবে কবিতা পড়ি

আহমাদ মোস্তফা কামাল

[caption id="attachment_937" align="alignleft" width="225"]আহমাদ মোস্তফা কামাল আহমাদ মোস্তফা কামাল[/caption]কবিতা পড়ি ছোটবেলা থেকেই। স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের জন্য কবিতা পড়ার ব্যাপারটি ঠিক সহজলভ্য নয়। বই অনেকেই পড়ে, প্রধানত গল্পের বই, আমিও পড়তাম, কিন্তু ওই বয়সে কবিতার পাঠক হওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। তবু আমার কবিতা-পাগল ফুপার কল্যাণে বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমার রবীন্দ্রপ্রেমী ফুপার কারণে সেটি সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল, কণ্ঠটিও ছিল উদাত্ত, পড়তেনও খুব সুন্দর করে। হয়তো এসব কারণেই কবিতার প্রতি আমার মুগ্ধতা জন্মায় এবং তাঁর কাছেই রবীন্দ্রনাথ পড়তে শুরু করি। স্কুলে থাকতেই সঞ্চয়িতার প্রায় পুরোটা পড়ে ফেলেছিলাম। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগই না বুঝে পড়া। এখনো কবিতা পড়ার সেই নেশা কাটেনি, হয়তো বাকি জীবনে কাটবেও না! সত্যি বলতে কী, এখনো যে সব সময় সব কবিতা বুঝতে পারি তা নয়, পড়তে ভালো লাগে বলে পড়ি। [caption id="attachment_938" align="alignright" width="300"]অঙ্কন : মাহবুবুল হক অঙ্কন : মাহবুবুল হক[/caption]কোনো কোনো কবিতা না বুঝেও বারবার পড়ি, অদম্য এক নেশার মতো ফিরে যেতে হয় অবোধ্য কবিতাটির কাছে। এ রকম একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে কবিতা নাকি বোঝার আগেই স্পর্শ করে। প্রথম পাঠের সময় যেকোনো পাঠকের কাছে একটি কবিতা তার সম্পূর্ণতা নিয়ে ধরা না-ও দিতে পারে, কিন্তু এই পাঠ যে ঘোরটি তৈরি করবে মনে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে তার পক্ষে। ফলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে কবিতাটির কাছে, আর বারবার পড়ার পর কবিতাটি হয়তো তার মনে জীবন সম্বন্ধে একটি অনির্বচনীয় বোধ তৈরি করবে। আর এই বোধ তখন এতটাই তীব্র হয়ে উঠবে যে কবিতাটির অপূর্ব নির্মাণ-কৌশলও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে হয়তো।
আমার একাকিত্বের সময়গুলো, বিষণ্নতার সময়গুলো, বিপন্নতার সময়গুলো ভরে ওঠে সুর আর কবিতার আশ্রয়ে। আমি তাই তাদের প্রেমে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি…
নির্মাণ-কৌশল মানে এর ভাষা, ছন্দ, শব্দ ব্যবহার, চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির ব্যবহার। আর 'ভালো' কবিতার এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে এর নির্মাণ-কলা এমন এক কৌশলে কবিতার সঙ্গে মোলায়েমভাবে মিশে থাকে যে পাঠকের জন্য সেটি কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করে না। পাঠক ভুলেই যায়, এই কবিতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় কবির তীব্র সচেতনতা ছিল, নির্মাণ-কৌশল নিয়ে তাঁকে প্রচুর ভাবতে হয়েছে। এখনো মাঝেমধ্যে কবিতায় পেয়ে বসে আমাকে, তখন আর কিছু পড়তে ভালো লাগে না। কখনো কখনো কোনো কোনো কবি দখল করে রাখেন সারাটিক্ষণ। পড়ি, পড়তে পড়তে ভাবি, হঠাৎ করে কোনো একটি কবিতা নতুনতর একটি অর্থ নিয়ে ধরা দেয় আমার কাছে, যে অর্থটি এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, কবিতা (এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যম) সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভু ও সার্বভৌম। একবার কবির কলম ছেড়ে বেরিয়ে পড়লে সেটি যে কী অর্থ নিয়ে ধরা দেবে পাঠকের কাছে, বলা কঠিন। হয়তো সে জন্যই একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হয়। কথা না বাড়িয়ে বরং কয়েকটি কবিতার কথা বলি, তাতে এত ভূমিকা করার প্রয়োজন ফুরাবে। (১) প্রায় দুই যুগ আগে প্রথম পড়েছিলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দ ভৈরবী' কবিতাটি। শক্তি আমার প্রিয় কবিদের একজন। মনটা এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর কবিতা পড়লে কিংবা মন এলোমেলো হয়ে থাকলে তাঁর কবিতা পড়ি। যেমন পড়ি জীবনানন্দকে বা বিনয় মজুমদারকে কিংবা আবুল হাসানকে। 'আনন্দ ভৈরবী' ভালো লেগেছিল প্রথম পাঠেই, হয়তো ওটার ভেতরে একটা সুরেলা ব্যাপার আছে, সে জন্যই- যদিও সবটা বুঝিনি তখন। হয়তো এখনো বুঝি না, তবু বারবার কবিতটি পড়ি, আমাকে দখল করে রাখে এর বিষণ্ন পঙক্তিগুলো। এর ভেতরে একটা হারিয়ে ফেলার বেদনা আছে, প্রিয়জন চলে যাওয়ার দুঃখবোধ আছে। পড়ে দেখুন- আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি এমন ছিলো না আষাঢ়-শেষের বেলা উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল আনন্দ-ভৈরবী। ছবি 'এলায়ে' পড়ে কখন? যখন গুছিয়ে রাখার প্রিয়জন চলে যায়। ঘর থেকে- বা ঘরকে জীবনের প্রতীক ধরে নিলে- জীবন থেকেও। আষাঢ় শেষের বেলাটিও এমন দুঃখময়-বেদনাভারাতুর ছিল না, বিপুল বরষায় পীড়িত হয়েও বাগানে ফুলগুলো ছিল। আর ছিল আনন্দ ভৈরবী। এই শব্দ দুটো নিয়ে ভেবেছি অনেক, জানি না কী বুঝিয়েছিলেন কবি স্বয়ং, কিন্তু আমার মনে হয়েছে- এও এক বেদনারই প্রকাশ। কারণটা বলি। আনন্দ ভৈরবী রাগটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হলো- এ রাগ ক্লান্তি দূর করে, অবসাদ কাটাতে সহায়তা করে। কিন্তু এর অন্য একটা বৈশিষ্ট্যও আছে- খুব বেশি পুনরাবৃত্তিতে এর চরিত্র নষ্ট হয়; ক্লান্তি হরণ করার বদলে এটা বরং আরো অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। দুদণ্ড শান্তিই হয়তো এই রাগের বিশেষ অবদান। ভেবে দেখুন- একসময় আনন্দ ভৈরবী ছিল, ক্লান্তি-অবসাদ কাটানো যেত; কিন্তু এখন সেটাও উপযোগিতা হারিয়েছে- কারণ অতিব্যবহারে এখন অবসাদই বাড়ে। কিংবা পরের লাইনগুলোও তো বর্তমানের হাহাকার আর অতীতের আনন্দেরই প্রকাশ- আজ সেই মাঠে আসে না রাখাল ছেলে কাঁদে না মোহনবাঁশিতে বটের মূল এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ-রেখা মেলে। মানে, আগে রাখাল ছেলের মোহনবাঁশিতে বটের মূল কাঁদতো, এখন নেই। এখনো মেঘের ফাঁকে 'বিদ্যুৎ-রেখা মেলে' কিন্তু সে নেই! কী হাহাকার! আমাদের ভেতরেও তো 'তাকে' হারিয়ে ফেলার একটা শঙ্কা থাকে, হয়তো সে জন্যই এই হাহাকার এতটা গভীরে প্রোথিত হয়ে যায়! পরের পঙক্তিগুলোও দুঃসময়ের এক জ্বলন্ত ছবি; কিন্তু আমাকে সবচেয়ে ভাবিয়েছে এগুলোই- সে কি জানিত না যত বড়ো রাজধানী তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর সে কি জানিত না আমি তারে যত জানি আনখ সমুদ্দুর বহুদিন পর্যন্ত এই পঙক্তিগুলোর অর্থ পুরোপুরি বুঝেই উঠতে পারিনি আমি; হয়তো এখন কিছুটা বুঝতে পারি। ব্যাপারটা এ রকমভাবে ধরা দেয় আমার কাছে- হয়তো আমি মানুষ হিসেবে ততটা বড় নই, 'তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর'- তা কি সে জানত না? জেনেও কেন চলে যাবে? সে কি এও জানত না- 'আমি তারে যত জানি/আনখ সমুদ্দুর!' 'আনখ সমুদ্দুর' শব্দ দুটো বড় রহস্যময়। 'আপাদমস্তক' শব্দটি বুঝি আমরা- পা থেকে মাথা পর্যন্ত! কিন্তু 'আনখ সমুদ্দুর?' নখ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত? আরেকটু পরিষ্কার করে বলি। নখ হলো শরীরের সবচেয়ে বাইরের অংশ, প্রায় অপ্রয়োজনীয় এবং অনুভূতিহীন, আর সমুদ্র হলো শরীরের সবচেয়ে গভীর অংশ- একমাত্র প্রবেশের পরই তার ঐশ্বর্য উপলব্ধি করা যায়। আমি যেমন তার 'নখ' (মানে একেবারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ) চিনি, তেমনই চিনি সমুদ্দুরও (মানে, সবচেয়ে গভীরভাবে)। কিন্তু এত চিনেই বা কী লাভ হলো? শেষ পর্যন্ত তো ওই ছবি 'এলায়ে' পড়ার গল্পই! গভীর বেদনাবহ চলে যাওয়ার গল্প। এ কবিতা পড়লে মন এলোমেলো না হয়ে উপায় আছে? শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আরেকটি কবিতা 'ও চিরপ্রণম্য অগ্নি' পড়লেও মন কেমন করে ওঠে। এটি তাঁর একুশতম কাব্যগ্রন্থের কবিতা, সম্ভবত প্রায় শেষ বয়সের রচনা। শক্তি আমার প্রিয় কবিদের একজন। তাঁর অনেক কবিতা প্রায় ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে, পড়তে পড়তে। এটি তারই একটি। কবিতাটি, মৃত্যুর পর কবির আকাঙ্ক্ষা ও মিনতি নিয়ে। মৃত্যুর পর না বলে, সৎকারের সময় বলাই ভালো। অর্থাৎ দাহ করার সময় কবি আগুনের কাছে যে মিনতি জানাচ্ছেন তাই নিয়ে এ কবিতা। শুরু হয়েছে এভাবে- ও চিরপ্রণম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও। প্রথমে পোড়াও ঐ পা দুটি যা চলৎশক্তিহীন, তারপর যে-হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই। এখন বাহুর ফাঁদে ফুলের বরফ, এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা, ওদের পুড়িয়ে এসো জীবনের কাছে দাঁড়াও লহমা, তারপর ধ্বংস করো সত্য-মিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ। বোঝাই যাচ্ছে- মৃত্যু হয়েছে কবির, দাহ করার সব আয়োজন শেষ, আর কবি আগুনকে 'চিরপ্রণম্য' সম্বোধন করে পোড়াতে বলছেন তাঁর সব কিছু- চলৎশক্তিহীন পা, প্রেম-পরিচ্ছন্নতাহীন হাত, দায়িত্ববিহীন কাঁধ (যে কাঁধে সারা জীবন ধরে আমরা নানা রকম দায়িত্ব বয়ে বেড়াই), তারপর 'সত্য-মিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ'- সবই। সবই? না। এর পরের পঙক্তিতেই আছে- রক্ষা করো দুটি চোখ হয়তো তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকি আছে। কী বাকি আছে? পরের পঙক্তিটি পড়ুন- অশ্রুপাত শেষ হলে নষ্ট করো আঁখি কার অশ্রুপাত? নিজের? না, বলাই বাহুল্য। তিনি তো মৃত এখন, নিজের অশ্রুপাতের প্রশ্নই নেই। এই অশ্রুপাত স্বজন-প্রিয়জন এমনকি অপ্রিয়জনদেরও! আমরা তো কখনো কখনো নিজের অজান্তেই এমনটি ভাবি- আমি মরে গেলে কে কে কাঁদবে আমার জন্য? কার দুই চোখ ভেসে যাবে জলে? কার চোখের কোণ ভিজে উঠবে শুধু? কে-ই বা অবরুদ্ধ কান্নায় নিজেকে কেবল পুড়িয়েই চলবে? কবিও তেমনটি ভেবেছেন নিশ্চয়ই, আর তাই অশ্রুপাতগুলো দেখে যেতে চান। কিন্তু এও জানেন, এই অশ্রুপাতও একসময় শেষ হবে, তখন- 'নষ্ট করো আঁখি!' কী অভূতপূর্ব একটি পঙক্তি! কবিতার আসল বাঁকটি অবশ্য দেখা যাবে পরের পঙক্তিগুলোতে। নিজের সব কিছুই পোড়াতে বলছেন তিনি 'চিরপ্রণম্য অগ্নি'কে, কিন্তু একটি জিনিস না পোড়ানোর জন্য মিনতি জানাচ্ছেন- পুড়িয়ো না ফুলমালা স্তবক সুগন্ধে আলুথালু প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে। ফুলমালা স্তবক যা কিছু দেওয়া হয়েছে তার শবদেহে, তা যেন না পোড়ানো হয়! কেন? কারণ- 'প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে।' এ কি শুধু ফুলমালা? না তো! ওতে যে 'সুগন্ধে আলুথালু' প্রিয়জনের করস্পর্শ লেগে আছে! ওই করস্পর্শ কি পোড়ানো যায়? কী বিপুল আবেগ, কী ভয়াবহ রোমান্টিকতা! এবং পরের পঙক্তি- গঙ্গাজলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত, স্বেচ্ছাচারী... ওকে পুড়িও না, হে অগ্নি, বরং গঙ্গাজলে ওকে ভেসে যেতে দাও- মুক্ত, স্বেচ্ছাচারী। শেষের ডটচিহ্নগুলোও লক্ষ করার মতো। এই ভেসে যাওয়ার মুক্ততা ও স্বেচ্ছাচারিতা যেন অনন্ত হয়, যেন অনন্তকাল ধরে 'প্রিয় করস্পর্শ' নিয়ে ওই ফুলমালা ভেসে যেতে পারে... (২) আমার খুব প্রিয় একটা কবিতা শহীদ কাদরীর 'সংগতি'। কবিতাটি বিখ্যাত। আবৃত্তিকারদের কল্যাণে খ্যাতির প্রায় চূড়ায় এর অবস্থান। কবিতার প্রথম চারটি পঙক্তি এ রকম- বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ, কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ সবই প্রাপ্তি আর আনন্দের সংবাদভাষ্য, তবে দুটো বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ক্রিয়াপদগুলো ভবিষ্যৎ কালের, অর্থাৎ ঘটনাগুলো এখনো ঘটেনি, তবে ঘটবে; দ্বিতীয়ত, দৃশ্যকল্পগুলো ক্রমশ জৈবিক থেকে নান্দনিক সৌন্দর্যের দিকে এগিয়েছে। প্রথম পঙক্তিতে শূকরের কাদা খুঁজে পাওয়ার দৃশ্যটি কারো কারো কাছে প্রীতিকর নাও মনে হতে পারে, অন্তত যারা এমন দৃশ্য দেখেছেন তাদের কাছে। তবু শূকরের কাছে ব্যাপারটা প্রাপ্তির, সে তো কাদা ভালোবাসে। প্রথম দৃশ্য যাদের কাছে প্রীতিকর মনে হয়নি, দ্বিতীয় দৃশ্যটি তাদের কাছেও নিশ্চয়ই সুন্দর বা নিদেনপক্ষে সহনীয় মনে হবে! পুকুরে-ডোবায়-বিলে-খালে-ছোট নদীতে হিজলের ডালে বসে ধ্যানী মাছরাঙার মাছ-অন্বেষণ এবং তা পেয়ে যাওয়া- কী আনন্দময় একটি দৃশ্য, যদি না তার ঠোঁটে গেঁথে থাকা মাছের মৃত্যু-যন্ত্রণা কাউকে কষ্ট দেয়! দুটো দৃশ্যই জৈবিক প্রাপ্তি ও আনন্দের বিবরণ। কিন্তু তৃতীয় পঙ্‌ক্তিটিই দেখুন। কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে সাদা হয়ে যাচ্ছে- এই দৃশ্য কি ব্যাখ্যা করা সম্ভব? বা ঘন জঙ্গলে ময়ূরের আনন্দময় নৃত্যদৃশ্য? বিশুদ্ধ নান্দনিক দৃশ্য এগুলো। মনে হচ্ছে, জগৎজুড়ে চলবে আনন্দ-আয়োজন। কিন্তু পরের দুই পঙক্তিতেই ভেঙে পড়বে এত সব রূপময় বর্ণনার ফলে সৃষ্ট সুখকল্পনাগুলো; কারণ- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না... সবই হবে। প্রেমিক-প্রেমিকাও মিলিত হবে পরস্পরের সঙ্গে, কিন্তু শান্তি পাবে না। কেন পাবে না? এবং খুব জোর দিয়ে বলছেন তিনি- পাবে না, পাবে না, পাবে না... (শেষের ডটগুলোও বুঝিয়ে দেয়, এই 'পাবে না' অনন্তকালীন...)। এ কোন ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন কবি, যখন মিলনেও শান্তি মিলবে না? এর পরের পঙক্তিগুলোও প্রথম লাইনগুলোর মতোই আনন্দমুখর দৃশ্যকল্পনা, তবে বিষণ্নতার সম্ভাবনাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না- একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো, পুরনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে 'একাকী পথিক' শব্দটির মধ্যেই একটা বিষণ্ন ব্যাপার আছে! তার ঘরে ফেরা আনন্দময় হতে পারে যদি ঘরভর্তি মানুষ থাকে, নইলে বিষণ্নতাই থেকে যায়! কিংবা ঘরভর্তি মানুষও কোনো কোনো একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতা ঘুচিয়ে দিতে অক্ষম, সেটি আরো বেদনাদায়ক। যা হোক, পরের পঙক্তি দুটো অসাধারণ। শূন্য হাঁড়িতে শাসা ভাত ফুটে উঠবে 'তারাপুঞ্জের মতো!' কী অসামান্য উপমা! এমন চিত্রকল্পময় উপমা কবিতাকে যেন মূর্ত করে তোলে, একেবারে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যেন সব কিছু। তার পরের পঙক্তিতে পুরনো গানের 'বিস্মৃত-কথা'র প্রসঙ্গ, আর পুরনো গান মানেই নস্টালজিয়া, সুন্দর কিছু স্মৃতি, অনেক অনেক ঘটনা...। এবং এত সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আবার সেই দুটো লাইন- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না... এরপরের চার পঙক্তি খেয়াল করা যাক- ব্যারাকে ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ মেয়েলি গানের- তোমরা দুজন একঘরে পাবে ঠাঁই যুদ্ধের সব উন্মাদনা শেষ হয়ে যাবে, কুচকাওয়াজ থেমে যাবে, সৈন্যরা বিশ্রামে যাবে; ক্ষুধার্ত বাঘ তার প্রিয় খাবার পেয়ে যাবে; অন্য গ্রাম থেকে বয়ে আসা বাতাস সঙ্গে করে নিয়ে আসবে মেয়েলি গানের 'স্বাদু আওয়াজ'! কী চমৎকার সব ব্যাপার! কিন্তু তারপর আবার- প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না... বারবার এই দুটো লাইন ফিরে ফিরে এসে জানিয়ে দিয়ে যায়, যত শুভ ঘটনাই ঘটুক, যত প্রাপ্তিযোগই ঘটুক না কেন, শান্তি পাওয়া যাবে না। কেন যাবে না, সেই ইঙ্গিত দেননি কবি; কিন্তু বোঝা যায়- তিনি এমন এক অস্থির সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেই পঞ্চাশ বছর আগে; যখন হয়তো 'সব' থাকবে, কিন্তু শান্তি মিলবে না কিছুতেই। আমরা কি এখন সেই সময়টিই পার করছি না? এত কিছু আছে আমাদের, তবু শান্তি নেই, স্বস্তি নেই! (৩) 'এই মাতোয়ালা রাইত' শিরোনামে আশ্চর্য-অসাধারণ একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান; পুরনো ঢাকার এক বাসিন্দার মুখ দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন জীবনের এক অসামান্য ব্যাখ্যা। পুরনো ঢাকার মানুষগুলো যখন সাহিত্যে উঠে আসে তখন এমনিতেই খুব বর্ণিল হয়ে ওঠে, বিশেষ করে তাদের ভাষার কারণে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাসে আমরা এমন অনেক বর্ণিল চরিত্রের দেখা পেয়েছি। কিন্তু কবিতায়? আমার জানা মতে, রাহমানের এই কবিতাই এ বিষয়ে একমাত্র উদাহরণ। কবিতাটি শুরু হয় খুব হালকা চালে, এক আপাদমস্তক নেশাখোরের জবানিতে- হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খান্কি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও বোঝা যায়, নেশাখোর এই লোকটি নিশিখোরও বটে- 'রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা'; আর রাতের কী আশ্চর্য বর্ণনা দিচ্ছে সে, দেখুন- 'কান্দুপট্টির খান্কি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে!' রাতের শরীরে 'কান্দুপট্টির খান্কি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান!' কী অসাধারণ উপমা! কবিতা আরো কিছুদূর এগোয় হালকা চালেই- আবে, কোন্ মাম্দির পো সামনে খাড়ায়? যা কিনার, দেহস্ না হপায় রাস্তায় আমি নামছি, লৌড় দে; না অইলে হোগায় লাথ্থি খাবি, চটকানা গালে। গতরের বিটায় চেরাগ জ্বলতাছি বেশুমার। মনে হচ্ছে, যেন এক রাজা সে, এই রাতের শহরে। কেউ সামনে দাঁড়ালে 'হোগায় লাথ্থি' খাবে, অথবা 'চটকানা গালে।' কিন্তু এখানেই থামছে না সে, নিজের পরিচয় দিচ্ছে এভাবে- আমারে হগলে কয় মইফার পোলা, জুম্মনের বাপ, হস্না বানুর খসম, কয় সুবরাতি মিস্ত্রি। বেহায়া গলির চাম্পা চুমাচাট্টি দিয়া কয়, 'তুমি ব্যাপারী মনের মানু আমার, দিলের হকদার।' অর্থাৎ, আমাদের যা যা পরিচয় হতে পারে তার সবই ধরা হলো এই পঙ্‌ক্তিগুচ্ছে- কারো সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী, কারো প্রেমিক। এমনকি পেশাগত পরিচয়েও তো পরিচিত হই আমরা! কিন্তু এগুলো কি সত্যিকার অর্থেই আমাদের 'পরিচয়' তুলে ধরতে পারে? পারে না। আর তাই কবিতাটিও এতক্ষণের হালকা চাল ছেড়ে এবার প্রবেশ করে এক গভীর দার্শনিক জগতে- আমার গলায় কার গীত হুনি ঠাণ্ডা আঁসুভরা? আসলে কেউগা আমি? কোন্হানতে আইছি হালায় দাগাবাজ দুনিয়ায়? কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ? চুড়িহাট্টা, চানখাঁরপুল, চকবাজার, আশক জমাদার লেইন, বংশাল; যেহানেই মকানের ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ, যেমুন আধলি একখান খুব দূর জামানার। নিজের গলায়ই সে যেন অন্য কারো 'গীত' শোনে 'ঠাণ্ডা' অশ্রুভরা! এবং প্রশ্ন করে- কে আমি, কোত্থেকে এসেছি এই 'দাগাবাজ দুনিয়ায়?' শেষ পর্যন্ত কোথায়ই বা যাব? যেখানেই যাক, সে তো সে-ই একই মানুষ- 'গোলগাল মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ!' এবং নিজেকে তার মনে হচ্ছে- খুব দূর অতীতের 'আধলি একখান!' মানুষের অস্তিত্ব-অনুসন্ধানের জন্য প্রাচীন সব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে একই তালে কবিতা এগোয়, এবং আমাদের উপস্থিত করে আরো গভীর-গভীরতর প্রশ্নের মুখোমুখি- আমার হাতের তালু জবর বেগানা লাগে আর আমার কইলজাখান, মনে অয়, আরেক মানুর গতরের বিতরে ফাল পাড়ে; একটুকু চৈন নাই মনে, দিল জিঞ্জিরার জংলা, বিরান দালান। জানে হায়বৎ জহরিলা কেঁকড়ার মতন হাঁটা-ফিরা করে আর রাইতে এমুনবি অয় নিজেরেও বড় ডর লাগে, মনে অয় যেমুন আমিবি জমিনের তলা থন উইঠা আইছি বহুত জমানা বাদ। নিজেকেই নিজের কাছে অচেনা লাগে, এমনকি নিজের হাতের তালুও 'বেগানা' লাগে, নিজের 'কইলজাখান' যেন অন্য কারোর, নিজের শরীরে এসে 'ফাল পাড়ে!' আর রাতে নিজেকেও বড় 'ডর লাগে', মনে হয় মাটির ভেতর থেকে সে উঠে এসেছে বহুকাল পর! কবিতা থামে না, এবার তার চোখে পড়ে এক শবযাত্রা। পুরনো ঢাকার স্বভাবজাত কৌতুকপূর্ণ ভাষায় তার বর্ণনাও দেয় সে, আর মনে হয়- 'আজরাইল আইলে' তাঁকেও অন্ধকার কবরে 'হান্দাতে' হবে! এবং মনে হয় এও যে মৃত্যু এক নিত্য সহচরের মতোই সত্য আর কাছের- এ-কার মৈয়ত যায় আন্ধার রাইতে? কোন ব্যাটা বিবি-বাচ্চা ফালাইয়া বেহুদা চিত্তর অইয়া আছে একলা কাঠের খাটে বেফিকির, নোওয়াব যেমুন? বুঝছোনি হউরের পো, এলা আজরাইল আইলে আমিবি হান্দামু হ্যাষে আন্ধার কব্বরে। তয় মিয়া আমার জেবের বিতরের লোটের মতোই হাচা মৌত। কিন্তু মৃত্যু তো আসলে আমাদের জীবনের পক্ষেই দাঁড় করিয়ে দেয়! আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকা কী সুন্দর, কী অসাধারণ! সেও এবার তা-ই ভাবছে, এবং বেঁচে থাকার গৌরবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে! - এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে গোলাব ফুলের বাস, মাঠার মতন চান্নি দিলে নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ মাইয়া, গহিন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ, ঝুম কাওয়ালীর তান, পৈখ সুনসান বানায় ইয়াদ। এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া মৌততক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই। হ্যাঁ, বেঁচে আছি বলেই তো এখনো ফুলের সুবাস নাকে আসে, চাঁদনি রাত 'দিলে ঝিলিক মারে', আর জীবনের নানা আয়োজনের মধ্যে ফিরে ফিরে যাই- নারী, সুর ও সুরার কাছে! আর তাই- 'মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া মৌততক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই!' কী অসাধারণ পঙক্তি! কিন্তু এখানে এসেও কবিতাটি থামে না। আত্ম-অনুসন্ধানের পরিক্রমা শেষে কোনো প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাকমতো না পেয়েও যখন সে জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়, বেঁচে থাকার আনন্দে মুখর হয়, তখন আবার ফিরে আসে সেই ভাবনা! অস্তিত্বের অর্থ কী?- তামাম দালানকোঠা, রাস্তার কিনার, মসজিদের মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির- হগলই খোওয়াব লাগে আর এই বান্দাবি খোওয়াব! সবই স্বপ্ন তাহলে? এমনকি এই আমিও? আমার অস্তিত্বও? খুব ধাঁধায় ফেলে দেয় ও শেষ পঙক্তি। আমার অস্তিত্ব কি তাহলে অন্য কারো স্বপ্নের ভেতরে প্রোথিত? তার স্বপ্নটি ভেঙে গেলে আমার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে? জীবন-জগৎ-অস্তিত্ব সবই যেন এক বিপুল রহস্যময়তার চাদরে ঢাকা পড়ে, প্রশ্ন জাগে একের পর এক- উত্তর মেলে না। (৪) কবিতার কথা লিখব আর জীবনানন্দের কথা লিখব না, তাই কি হয়? তাঁর একেকটা কবিতা আমি ঠিক কতবার করে পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু প্রতিবারই তারা নতুন নতুন রহস্য নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছে, পড়া শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে- সবটুকু ঠিক বুঝে ওঠা গেল না! তাঁর সব কবিতাই কম-বেশি রহস্যময়। এমন পাঠক হয়তো খুব কমই পাওয়া যাবে যিনি প্রথম পাঠেই তাঁর কোনো একটি কবিতা সম্পূর্ণ বুঝে ফেলেছেন! কিন্তু পুরোটা না বুঝলেও ওই পাঠকের জন্য বা স্বয়ং কবির জন্য তা বিপত্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। কারণ এমন এক রহস্যময় সৌন্দর্য আর উজ্জ্বল হীরকখণ্ডের মতো এমন কিছু পঙক্তি থাকে তাঁর কবিতায় যে বারবার ফিরে আসতে হয়, ফিরে ফিরে পড়তে ইচ্ছে হয়! আর এভাবেই একসময় একটি কবিতা হয়তো পাঠকদের বেশ খানিকটা বোধগম্যতার মধ্যে প্রবেশ করে। কবিতা পাঠের অনুভূতিটি অনির্বচনীয়- এমনকি সেই কবিতা না বোঝা গেলেও- তার কোনো নাম নেই, কোনো নামেই সেই অনুভূতিকে ডাকা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা পড়ে সে রকম এক নাম না-জানা অনুভূতি সৃষ্টি হয় আমার। তাঁর 'আট বছর আগে একদিন' কবিতাটি পড়ে নেওয়া করা যাক। এটি শুরু হয়েছে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে- শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে- ফাল্গুনের রাতের আঁধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ মরিবার হলো তার সাধ। মনে হচ্ছে কবি এখানে নিজেকে আড়াল করে যেকোনো একজন ব্যক্তির গল্প বলছেন। গল্পকাররা যেমন করে নিজেকে আড়ালে এবং সর্বজ্ঞ অবস্থানে রেখে চরিত্র সম্বন্ধে কথা বলে যান, অনেকটা সে রকম। এমনকি চরিত্রগুলোর মনের কথাও তিনি জেনে বসে থাকেন, কিন্তু যেহেতু তিনি প্রকাশ্য হন না কখনো, তাই পাঠকরা লেখকের উপস্থিতি বুঝতে পারেন না। কখনো মনে এই প্রশ্ন জাগে না যে এই গল্প আসলে কে বলছেন! বা যিনিই বলুন না কেন, তিনি গল্পের পাত্রপাত্রীর মনের কথা পর্যন্ত কিভাবে জেনে ফেললেন! এর পরের পঙক্তিগুলো খেয়াল করুন, এবার লোকটির পরিচয় দেওয়া হচ্ছে- বধূ শুয়ে ছিল পাশে- শিশুটিও ছিল; প্রেম ছিল, আশা ছিল- জ্যোৎস্নায়,- তবু সে দেখিল কোনো ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার? অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল- লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার। অর্থাৎ লোকটি সংসারী মানুষ। বধূ এবং শিশু আছে। এবং তারা পাশেই আছে। প্রেম আছে, আশাও আছে। কিন্তু এর পরের পঙক্তিগুলো এই ইঙ্গিত দেয় যে এই সংসারী মানুষটির জীবনে কোথাও কোনো একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে, তাই, 'হয়নি ঘুম বহুকাল।' এই ঘুম চেয়েছিল কি না তা নিয়ে সংশয়পূর্ণ ভাষ্যও দেওয়া হচ্ছে- এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি! রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার; কোনো দিন জাগিবে না আর। এরপর জীবনানন্দ একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ঊর্ধ্বকমার (' ') মধ্যে কতগুলো কথা বলে জানালেন, এই কথাগুলো তাঁকে বলেছিল- 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে।' 'কোনো দিন জাগিবে না আর/জানিবার গাঢ় বেদনার/অবিরাম- অবিরাম ভার/সহিবে না আর- '/এই কথা বলেছিল তারে/চাঁদ ডুবে চলে গেলে- অদ্ভুত আঁধারে/যেন তার জানালার ধারে উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে। এ রকম একজন সুখী-সংসারী মানুষের কাছে যখন 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে' এভাবে আর কোনো দিন না জাগার লোভ দেখায়, আর সে সেই কথায় সাড়া দিয়ে চলে যায়- বোঝা যায়, প্রশ্নবোধক চিহ্নটি সত্যিই ছিল। আর তা ছাড়া, সেটি না থাকলে 'গাঢ় বেদনার' কথা আসবেই বা কেন? এরপর তিনি আরেকটি অভূতপূর্ব কাণ্ড করলেন। আমাদের চারপাশের নিসর্গের তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণিকুলের জীবন-তৃষ্ণা আঁকলেন এক অসামান্য ভঙ্গিতে। এই পঙক্তিগুলো- তবুও তো পেঁচা জাগে; গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে আরেকটি প্রভাতের ইশারায়- অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে। টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা; মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে। রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি; সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি। ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন- যেন কোনো বিকীর্ণ জীবন অধিকার করে আছে ইহাদের মন; দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িংয়ের ঘন শিহরণ মরণের সাথে লড়িয়াছে; গলিত স্থবির ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িং : এসবই যেন বেঁচে থাকার জন্য এক প্রাণপণ লড়াইয়ে নেমেছে। এ সব কিছু কি সে দেখেনি? এর উত্তর মিলবে পরের কয়েকটি পঙক্তিতে- চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা- একা; যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে। হ্যাঁ, দেখেছে বটে, সবই দেখেছে সে। কিন্তু তার জীবনটি যে মানুষের; ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িংয়ের নয়! আর তাই তিনি উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ পঙক্তি- 'যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।' লক্ষণীয় বিষয় হলো- এই পঙক্তিগুলোর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে লোকটির কাছ থেকে বিযুক্ত রেখেছেন, আড়ালে রেখেছেন, দূরে থেকে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু এইখানটায় এসে তিনি সরাসরি লোকটিকে সম্বোধন করছেন এবং আমরা দেখব, এই সম্বোধন চলতে থাকবে এর পরও। লোকটি যে গেল দড়ি হাতে, তাতে কেউ কি কোনো প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেনি? তিনি আবারও প্রকৃতির অনুষঙ্গ টেনে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করছেন- অশ্বত্থের শাখা করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে করেনি কি মাখামাখি? থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে বলেনি কি : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে? চমৎকার!- ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!' জানায়নি পেঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার? এবং জানাচ্ছেন- জীবনের এই স্বাদ অসহ্য বোধ হলো তার, প্রশ্ন করছেন- এত যে অসহ্য বোধ হলো, মর্গে গিয়ে কি জুড়োলো হৃদয়? জীবনের এই স্বাদ- সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের- তোমার অসহ্য বোধ হলো; মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো মর্গে- গুমোটে থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে! কী হয়েছিল লোকটির? কেন সে মরতে গেল? জীবনের কোথায় ফাঁক ছিল তার? প্রশ্নবোধক চিহ্নটাই বা কোথায়? তার এই আত্মহত্যার কারণই বা কী? দাম্পত্য সম্পর্ক, অভাব, দারিদ্র্য, পরাজয়, গ্লানি? এই বিষয়গুলো জানাতেই তিনি এবার কথা বলছেন সরাসরি পাঠকের সঙ্গে- শোনো/তবু এ মৃতের গল্প;- কোনো/নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;/বিবাহিত জীবনের সাধ/কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,/সময়ের ঊর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ/মধু- আর মননের মধু দিয়েছে জানিতে;/হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে/এ জীবন কোনো দিন কেঁপে ওঠে নাই; না, কোথাও কোনো ব্যর্থতা নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো- তিনি এই ব্যর্থতাহীনতার কথা বলে একই টানে বলে যাচ্ছেন আরেকটি কথাও- তাই লাশকাটা ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে। এর মানে কী? নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়নি, বিবাহিত জীবনের সাধ পূরণ করেছে কোনো খাদ না রেখেই, বধূ মধু ও মনন দুই-ই জানতে দিয়েছে (অর্থাৎ বউ শুধু শরীরের সঙ্গীই হয়নি, মননেরও হয়েছে!), কোনো দিন ক্ষুধার কষ্ট পায়নি- 'তাই' তাকে মরতে হলো! তার মানে কি এই যে এত এত সাফল্য না থাকলে তাকে মরতে হতো না? তার মানে কি এই যে জীবনে কিছু কিছু ব্যর্থতা থাকা ভালো? বিষয়টির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তিনি এভাবে- জানি- তবু জানি/নারীর হৃদয়- প্রেম-শিশু-গৃহ- নয় সবখানি;/অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়- /আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে;/ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;/লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই;/তাই/লাশকাটা ঘরে/চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে। অর্থাৎ জীবন-বর্ণনার জন্য আমরা সচরাচর যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলি; আমাদের ক্লান্তি, আমাদের পরাজয়, আমাদের হতাশা, আমাদের দুঃখ ও বেদনা, আমাদের হাহাকার, আমাদের প্রেম-আশা-সুখ ও সাফল্য ইত্যাদি- এ সব কিছুর বাইরে খুব গোপনে-গভীরে এক 'বিপন্ন বিস্ময়' থাকে। কী সেই বিস্ময়? সে সম্বন্ধে পরিষ্কার করে কিছুই বলেননি কবি। পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন সেই বিস্ময় খুঁজে দেখার ভার। হয়তো সেই বিস্ময় আমাদের অস্তিত্ব-সংক্রান্ত প্রশ্নাবলি থেকে উদ্ভূত। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, এই পৃথিবীতে আমার ভূমিকা কী, আমার অস্তিত্বের অর্থ কী, আমি না থাকলে কী হতো, আমার অস্তিত্বহীনতায় এই পৃথিবীর আদৌ কিছু যেত-আসত কি না, আমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীকে এমন কী তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, এই জীবন শেষে আমি কোথায় যাব, জীবন মানে কি মাত্র এই কয়েক দিনের খেলা, যা দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়, মৃত্যুই যদি একমাত্র অনিবার্য সত্য হয়, তাহলে এই জীবনের এত এত সব কর্মকাণ্ডের অর্থ কী, যেহেতু মৃত্যুর পর আর কিছুই থাকবে না- এ রকম প্রশ্নের তো শেষ নেই এবং প্রশ্নগুলোর উত্তরও নেই। প্রশ্নগুলো তাই কোনো সমাধান না দিয়ে বরং এক 'বিপন্ন বিস্ময়' জন্ম দেয় মনে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো- কবি এখানেই থামেননি। লোকটির আত্মহত্যা, তার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখে এবং 'বিপন্ন বিস্ময়ের' মতো একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে পাঠককে ছেড়ে দিয়ে তিনি এবার নিজের কথা বলছেন- তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা, থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে, চোখ পালটায়ে কয় : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে? চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার'- হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার? আমিও তোমার মতো বুড়ো হব- বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব কালীদহে বেনো জলে পার; আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার অর্থাৎ ওই লোকের যা হয়েছে, তা তো হয়েছেই, আমার জীবন তাতে থেমে থাকবে কেন, আমি বরং 'চেয়ে দেখি'...। এবং ওই সব সত্য জানার পর তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, জীবনের 'প্রচুর ভাঁড়ার' শূন্য না করা পর্যন্ত তিনি যাচ্ছেন না! থেকে যাবেন এখানেই, এই বিপন্ন বিস্ময়মাখা জীবন নিয়ে এই আলোছায়াময় পৃথিবীতেই। আর এখানটাতে এসে কবিতাটি খুব জীবনবাদী হয়ে ওঠে। অনেক কবিতা পড়েছি- মৃত্যু আর জীবনের এমন অসামান্য মূল্যায়ন আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এসব কবিতা পড়ি আর আমার বুকের ভেতর যেন একেকটি হিরণ্ময় প্রদীপ জ্বলে ওঠে। আমার একাকিত্বের সময়গুলো, বিষণ্নতার সময়গুলো, বিপন্নতার সময়গুলো ভরে ওঠে সুর আর কবিতার আশ্রয়ে। আমি তাই তাদের প্রেমে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি... সূত্রঃ কালের কন্ঠ ঈদ সংখ্যা ২০১৩

সংস্কৃতি চর্চার সামাজিক রাজনৈতিক দায় পূরণ: আহমদ রফিক

সংস্কৃতি চর্চার সামাজিক রাজনৈতিক দায় পূরণ

আহমদ রফিক

[caption id="attachment_933" align="alignleft" width="220"]আহমদ রফিক আহমদ রফিক[/caption]বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লিখতে বা বলতে গেলে সংগত কারণে বিভাগপূর্ব সময়ের সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রসঙ্গে লক্ষ করার বিষয় এ দেশে সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতিও নানাভাবে জড়িত, তা অবাঞ্ছিত বা বাঞ্ছিত যাই হোক। এ উত্তরাধিকার দেখা যায় বিভাগোত্তর বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকে- ভাষা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট যুক্ত ফ্রন্টের রাজনীতিতে এবং ষাটের দশকের শেষ দিকে সংস্কৃতি চর্চা ও রাজনীতির প্রবল একাত্মতায়। এর ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায় মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) পরবর্তী সংস্কৃতি চর্চায়, শাসকশ্রেণীকে পক্ষে বা বিপক্ষে যা সংশ্লিষ্ট। এমন ঘটনা বিশ্বে সচরাচর হলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট। বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র এ কারণে যে এ দেশে সংস্কৃতি চর্চার প্রবলতা কখনো কখনো রাজনীতিকে সঠিক ঠিকানা দেখিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলোচনা শুরুর আগে একটি কথা বলে নেওয়া দরকার যে সংস্কৃতি বলতে সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, নৃত্য, নাটক ইত্যাদির ষোলকলাই বোঝায় না সেই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজজীবনের বৈচিত্র্যময় বহুভঙ্গিম রূপের প্রকাশও বোঝায়। সংস্কৃতির যেমন রয়েছে বিনোদনের নানা দিক তেমনি সামাজিক অঙ্গীকার ও দায় পালনেরও বিশেষ দিক। লেখক-শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর গরিষ্ঠ অংশ তাই সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী। এমন দুই বিপরীত দিক নিয়ে সংস্কৃতি চর্চার পথচলা। সমাজ ও সংস্কৃতির পারস্পরিকতার কারণে মুক্ত সংস্কৃতির সুস্থ চর্চা সামাজিক অগ্রগতির সহায়ক। ঠিক বিপরীত বিবেচনায় সামাজিক রক্ষণশীলতার কট্টর প্রভাব প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী লেখক ও সংস্কৃতি চর্চার ধারক এসব বাধা অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলেন। গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ভাষায় 'উজান গাঙ বাইয়া।' রবীন্দ্রনাথ 'অচলায়তন' নাটক বা 'ঘরে বাইরে' উপন্যাস এবং এমনি অনেক কিছু লিখে কী বিপদেই না পড়েছিলেন নানান জনের তীক্ষ্ণ সমালোচনার মুখে। কিন্তু পিছু হটেননি। তেমনি জেদি উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলাম। কপালে জুটেছিল 'কাফের', 'শয়তান' ইত্যাদি উপাধি। সংস্কৃতি ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের কথা মনে রেখে বলা যায়, সহিষ্ণু গণতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিবেশ প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার সহায়ক। আবার স্বৈরাচারী শাসন ও রাজনীতিও প্রতিবাদী সংস্কৃতির তৎপরতা গড়ে তোলে, দেখা দেয় আন্দোলন। পাল্টে দিতে পারে ছকবাঁধা শাসনের ভিত। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় লেখা। (দুই) সংস্কৃতির নানামাত্রিক প্রেক্ষাপট বিচারে পেছন ফিরে তাকালে গত শতকের তিরিশের দশকটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, যদিও চল্লিশের দশক অধিকতর গুরুত্ব বহন করে। রাজনৈতিক বিচারে তিরিশের দশক এক কথায় অগ্নিগর্ভ। চট্টগ্রামে বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রাগার দখল ও জালালাবাদ পাহাড়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ (১৯৩০), ইউরোপিয়ান ক্লাবে বিপ্লবী তরুণী প্রীতিলতার হামলা ও তাঁর মৃত্যু, শাসকশ্রেণীর প্রতি অনুরূপ আক্রমণ, দীর্ঘ অনশনে বিপ্লবী যতীন দাসের প্রতিবাদী মৃত্যু (১৯৩১), বক্শাবন্দী শিবিরে প্রতিবাদী সংস্কৃতি চর্চা, হিজলী বন্দী শিবিরে গুলিতে বরিশালের সন্তান তারকেশ্বর সেনগুপ্তের মৃত্যু (১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১) ইত্যাদি ঘটনা দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেষোক্ত তিনটি ঘটনায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী ভূমিকা স্মর্তব্য। আর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ১৯৩০ সালে নানা বাধার মুখে রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফর এবং সেখানকার শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা ও জনসংস্কৃতির বিকাশ লক্ষ্য করে কবির মুগ্ধতা ও প্রশস্তি বাচন। একই রকম প্রতিক্রিয়া কৃষি ও কৃষক শ্রেণীর অবিশ্বাস্য উন্নতি লক্ষ্য করে। বিষয়টির গুরুত্ব আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রুশ বিপ্লবের প্রভাবের কারণে, বিশেষ করে বঙ্গীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের 'রাশিয়ার চিঠি', রুশ সাহিত্য ও গোর্কির 'মা' উপন্যাস কিংবা রুশি বিপ্লবের অভিনন্দন বার্তা নিয়ে নজরুলের কবিতা ('তোরা সব জয়ধ্বনি কর') ইত্যাদির অসাধারণ জনপ্রিয়তা সংস্কৃতি অঙ্গনে হাওয়া বদলের ইঙ্গিত রাখে। অন্যদিকে ইউরোপে দুই ফ্যাসিবাদী শক্তির (হিটলার, মুসোলিনি) আগ্রাসী হুমকি এবং স্পেনে তাদের অনুসারী ফ্রাংকো বাহিনীর হাতে গৃহযুদ্ধের সূচনার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথসহ বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রতিবাদী ভূমিকা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তেমনি স্মর্তব্য রোঁমা রঁলা অঁরিবার্বুস প্রমুখের উদ্যোগে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরোধী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথসহ প্রগতিবাদী লেখক-শিল্পীদের সমর্থক সম্পর্ক। আর চীনে জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের তীব্র ধিক্কার (তাঁর রচনায় ও বিবৃতিতে) এবং রবীন্দ্রনাথ বনাম নোগুচি বিতর্ক সংস্কৃতির এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী প্রতিফলন। আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সামনে রেখে বাংলায় সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক তৎপরতার উত্থান বিস্ময়কর ঘটনা। তিরিশের দশকের শেষ পর্বে গঠিত প্রগতি লেখক সংঘে শুধু প্রগতিবাদীরাই নন, জড়ো হন মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক চেতনার সংস্কৃতি ভুবনের মানুষ। উদ্দেশ্য মানবিক বিশ্ব ও গণতান্ত্রিক প্রগতিবাদী সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। রক্ষা করা প্রতিক্রিয়াশীল যুধ্যবাজ ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের হাত থেকে। এরপর গঠিত হয় 'লীগ অ্যাগেনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়র' এর শাখা। এসব প্রচেষ্টার প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিভাবক-পরামর্শক বয়োবৃদ্ধ, জীর্ণ স্বাস্থ্য মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্ব শান্তি রক্ষায় ইউরোপে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৈরি হয় তার ঢেউ আছড়ে পড়ে বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অবিশ্বাস্য জোয়ারি প্রতিবাদ বহন করে। এর ব্যাপক প্রকাশ বিশ্বযুদ্ধ শুরুর (সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯) প্রতিক্রিয়ায় চল্লিশের দশকে কবিতায়, গানে, নাটকে, ছোটগল্পে, উপন্যাসে এমনকি চিত্রকলায়। গড়ে ওঠে ১৯৪৩-এ প্রবল সক্রিয়তা নিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ), যার সর্বাধিক বিকাশ বাংলায়। চল্লিশের এ দশক পর্ব হয়ে ওঠে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার বলিষ্ঠ দশক। সর্বভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত ও বঙ্গীয় রাজধানী কলকাতাকেন্দ্রিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক তৎপরতায় শহর ঢাকাও যথাসম্ভব অংশ নেয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, নৃপেন্দ্র গোস্বামী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, তরুণ সোমেন চন্দ প্রমুখ। এঁদের ক্লান্তিহীন শ্রমে গঠিত হয় প্রগতি লেখক সংঘের স্থানীয় শাখা। এঁরা সমানতালে প্রগতিশীল সংস্কৃতির তৎপরতা চালিয়ে গেছেন তাঁদের সৃষ্টিশীলতায় এবং সেই সঙ্গে প্রগতিবাদ সংস্কৃতি ও রাজনীতির অব্যাহত চর্চায়। এঁদের চেষ্টায় প্রকাশিত হয় প্রগতি সাহিত্য সংকলন ক্রান্তি। হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের (২২ জুন, ১৯৪১) পরিপ্রেক্ষিতে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢাকায়ও গঠিত হয় 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি'। এ সংগঠনের তৎপরতায় সোমেন চন্দের ছিল অসাধারণ ভূমিকা। ঢাকায় ফ্যাসিস্ট-বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে এই মেধাবী তরুণ সংস্কৃতিকর্মী ১৯৪২-এর মার্চে উগ্র ফ্যাসিস্ট সমর্থকদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। চল্লিশের দশকের প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চা যদিও নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক তবু এর মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিস্ট-বিরোধী, যুদ্ধবিরোধী, শান্তিবাদী ও উদার মানবিক চেতনার গণতন্ত্রীদের এক মঞ্চে সংঘবদ্ধ করা। এ লক্ষ্যে তারা সাময়িক সাফল্য অর্জন করেন। এ সাফল্য ছিল সাহিত্যে, সংগীতে, বিশেষভাবে গণসংগীতে ও মঞ্চ নাটকের মতো বিভিন্ন ধারায়। এ ধারা ব্যাহত হয় প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবলতার রক্তাক্ত দেশ বিভাগের কারণে। (তিন) দেশ বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের চরম স্বৈরাচারী, প্রগতিবিরোধী শাসনের মধ্যেও সীমাবদ্ধ বৃত্তে মূলত চল্লিশি সংস্কৃতি চর্চার প্রভাবে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। সংস্কৃতি সম্মেলন কেন্দ্রিক এ প্রকাশ অংশত ঢাকায় (১৯৪৭-৪৮) এবং চট্টগ্রামে (১৯৫১), কুমিল্লায় (১৯৫২), আবার পূর্ণাঙ্গজনে ঢাকায় (১৯৫৪) এবং আন্তর্জাতিক চরিত্র নিয়ে কাগমারিতে (১৯৫৭)। এগুলো আমাদের সংস্কৃতি চর্চার অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিবাদী চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছে, বিশেষ করে শেষ চারটিতে। কাগমারি সম্মেলনে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার প্রকাশ ছিল সর্বাধিক। পঞ্চাশের দশকে উল্লিখিত সংস্কৃতি চর্চার নেপথ্যে ছিল সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে রচিত কবিতা, গণসংগীত, সমন্বয়বাদী লোকসংগীত, সমাজ সচেতন মঞ্চ নাটক, তেভাগা ও কবিগান ছিল সমন্বয়বাদী চেতনার মননশীল প্রবন্ধ। সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের যথাক্রমে স্বদেশি ও প্রতিবাদী গান ও গজল। লক্ষ্য যতটা অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের, ততোধিক প্রগতি-চেতনার বিকাশ ঘটানো। এক সময়কার কৃষক আন্দোলনখ্যাত অঞ্চলের কৃষক-তাঁতি-কারিগর এবং অনুরূপ কলকারখানার শ্রমিকদের মনে প্রেরণা জুগিয়েছে গণসংগীত। আর ১৯৪৮ হয়ে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ও তার উত্তর প্রভাব উল্লিখিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ জোরদার করতে সাহায্য করেছে, রাজনীতিতে রেখেছে গণতান্ত্রিক সুপ্রভাব। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট তার প্রমাণ। পঞ্চাশের দশকে আমাদের সংস্কৃতি চর্চায় জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিবাদী চেতনার দ্বিমাত্রিক প্রকাশ ঘটলেও প্রগতিশীলতার প্রভাব ছিল অধিকতর। কিন্তু পাকিস্তানি শাসনের স্বৈরাচারী, আধা সামরিক ও সামরিক প্রভাব এবং বাম রাজনীতির সীমিত শক্তির কারণে উল্লিখিত প্রগতি সংস্কৃতি সমাজে ব্যাপক দাগ কাটতে পারেনি। সংস্কৃতি চর্চা সীমাবদ্ধ বৃত্তে আবদ্ধ থেকেছে, প্রধানত প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় এবং অংশত শহরে-বন্দরে। ভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে জাতীয়বাদী চেতনা প্রচ্ছন্ন থাকলেও পঞ্চাশের দশকে তা নিজস্ব, স্বতন্ত্র রূপ নিয়ে সুসংহত হতে পারেনি। পেরেছে ষাটের দশকের শেষ দিকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অর্বাচীন আচরণে, বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও বাঙালির জাতীয়তা বোধের ওপর অন্যায় আক্রমণের কারণে জাতীয়তাবাদী চেতনার দ্রুত বিকাশ। তবে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক বৈষম্য সাংস্কৃতিক ভুবন পেরিয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তার স্বাতন্ত্র্য বোধের দ্রুত ও ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দ্রুত পায় এগিয়ে যায়। গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়ায় পাক-শাসকদের রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র সংগীতের ওপর আক্রমণ, খণ্ডিত নজরুলকে নিয়ে প্রচার, বাংলা নববর্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানাদির বিরোধিতা, সর্বোপরি বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্বকে বিজাতীয় বিবেচনা করা ইত্যাদি ঘটনা, যা বাঙালি জাতীয়তার চেতনাকে পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভুবনে প্রধান বিষয় করে তোলে। বাম মতাদর্শের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে পিছু হটতে হয়। সংস্কৃতি চর্চায় প্রগতি চেতনাকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে হয়। রাজনীতিতে ক্ষেত্র বিভাজন থেকেই যায়। এ ঘটনাগুলো বড় দ্রুত ঘটে। বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি (১৯৬৬) থেকে বছর তিনেকের মধ্যেই পরিস্থিতি তুঙ্গ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ছাত্র ও তরুণদের ভূমিকা সর্বাধিক। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণজাগরণে বামপন্থী তারুণ্যের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও এর ফলাফল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে যায়। তবে এ সময় বাঙালিয়ানার যে প্রবল জোয়ার দেখা যায় (সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ভুবনে) তা ছিল প্রধানত ওপরতলীয় (সুপার ফিসিয়াল), সমাজ গভীরে তা ব্যাপকভাবে দাগ কাটার সুযোগ পায়নি। সে চেষ্টাও দেখা যায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাদি থেকে তা স্পষ্ট। তবে যত সাময়িক বা ওপরতলীয় হোক এর ফলাফল সত্তরের নির্বাচন ও পাক-শাসকদের আরোপিত যুদ্ধের কারণে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ। সেখানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একাধিপত্য। মধ্য ষাটের দশক থেকে বিভক্ত বাম রাজনীতি স্বাধীনতা-উত্তরকালে আরো বিভক্ত হয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তেমন বিবেচ্য নয়। তবে বাম মতাদর্শের সংস্কৃতি চর্চা মূলত নাটকে (মঞ্চ-নাটক, পথনাটক ইত্যাদিতে) ও অংশত সংগীতে ও নান্দনিক তৎপরতায় কিছুটা হলেও সাংস্কৃতিক ভুবনের জমি দখলে রাখতে পেরেছে। তবে তা একাধিক সংগঠনে বিভক্ত বিধায় (মতভেদগত কারণে) সামাজিক শক্তি হিসেবে ততটা পরিস্ফুট নয়। বিপ্লব বা সমাজ পরিবর্তনের আদর্শ প্রচার করা সত্ত্বেও সমাজে তাদের প্রভাব ব্যাপক নয়। এর কারণ শুধুই কি দূষিত রাজনীতি? বিষয়টি মনোযোগী আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের যোগ্য। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য শুনতে পাই- 'স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতি সংস্কৃতির চর্চাও মূলত রাজধানীভিত্তিক এবং তা শ্রেণী-বিশেষের গণ্ডিতে আবদ্ধ। ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবর বা বেঙ্গল গ্যালারি থেকে অনুরূপ উচ্চবর্গীয় অভিজাত এলাকায় সংস্কৃতি চর্চার অবস্থান। অবশ্য ব্যতিক্রমীরা সংখ্যায় অল্প ও যথেষ্ট শক্তিমান নয়। এর একটি কারণ যদিও সমাজে বিত্তবানদের ও বিত্তবান সংস্কৃতির আধিপত্য, সেই সঙ্গে সহযোগী রাজনীতির প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা তবু অন্য কারণও আছে কি না তা বিবেচনার যোগ্য। প্রগতিশীল সংস্কৃতির চর্চা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভুবনে কেন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখতে পারছে না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ খুবই জরুরি। প্রগতি সংস্কৃতি চর্চার একাংশ তো যতদূর জানি রাজধানীর বাইরে সক্রিয়, তবু তা ব্যাপক জনচেতনার অংশ হয়ে উঠতে পারছে না। সেটা কি বর্তমান রাজনীতির অবদান? সে অবস্থায় মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ সঠিক বাম রাজনীতির বিকাশ কি প্রগতিবাদী সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য। সে পরস্পর-নির্ভরতা ছাড়া প্রগতিবাদী সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপক বিকাশ, জনচেতনায় প্রভাব বিস্তার কঠিন এমন ধারণা কি সঠিক? (চার) তবে এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী সংস্কৃতি চর্চা এখন নানা দিক থেকে সমস্যার সম্মুখীন, সে সমস্যা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাস্তব ঘটনা। সমাজবাদী ধারণার কবি, লেখক, শিল্পী, নাট্যকার ও তাঁদের সংশ্লিষ্টজনে সংখ্যায় খুব একটা কম নন। তবু কেন সমস্যা। সেটা কি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব? আমার তা মনে হয় না। শক্তিমান শাসক ও রক্ষণশীল সামাজিক শ্রেণীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিরিশের শেষ দিক থেকে চল্লিশের দশকে প্রগতি লেখক সংঘ, গণনাট্য সংঘ তাদের নানাবিধ তৎপরতায় সংস্কৃতির ভুবনে ঝড় তুলেছিল এ সত্য তো অস্বীকার করার নয়। অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক শক্তির প্রবলতায় সে প্রভাব তাৎক্ষণিক রাজনীতিগত সুফল দেখাতে পারেনি। তবু তাদের ঘোষণার কিছু এখনো বিবেচনাযোগ্য। যেমন- বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় ঘোষণার পাশাপাশি তাদের বক্তব্য : 'আমরা চাই জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সর্বাধিক বলার নিবিড় সংযোগ, আমরা চাই যে সাহিত্য প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলুক। নানা মূর্তিতে যে প্রগতিদ্রোহ আজ মাথা তুলেছে তাকে আমরা সহ্য করব না। যা কিছু আমাদের যুক্তিহীনতার দিকে টানে তাকে আমরা প্রগতিবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের সমাজব্যবস্থাকে যুক্তিসংগতভাবে পরীক্ষা করে আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু সমাজের রূপান্তরক্ষম করে তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করব।' এ বক্তব্যের সঙ্গে কাল প্রয়োজনে কিছু বক্তব্য হয়তো যুক্ত হতে পারে? স্বদেশ-বিদেশ পরিস্থিতি বিচারে। তবে তাদের একটি বক্তব্য বর্তমান সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক মনে হয়। যেমন : 'উন্মত্ত প্রতিক্রিয়া (প্রতিক্রিয়াশীলতা অর্থে) ও জঙ্গিবাদ সভ্যতার ভাগ্য নিয়ে খেলা করছে আর সংস্কৃতি ধ্বংসের উপক্রম করছে। এ সময়ে আমাদের নীরব থাকা হবে অপরাধ, সমাজের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য তার ঘোর ব্যত্যয় করা হবে।' উল্লিখিত জঙ্গিবাদ এখন সারা বিশ্বে সক্রিয়। বাংলাদেশেও এর প্রকাশ নানা রূপে, কখনো ধর্মীয় চেতনার প্রতীকে। সমাজ রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে সে পেছন দিকে টানছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীর আদর্শগত দায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে বিরাজমান দুই বা তিনদলীয় ক্ষমতার রাজনীতি জোটবদ্ধ হয়ে পালাবদল করে দেশ শাসন করছে। তাদের অন্ধ দলীয় সমর্থকদের বাইরে তারা জনসাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তবু ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাসী মানুষকে বাধ্য হয়ে ভোট দিতে হয় এদিকে বা ওদিকে। সৎ ও মেধাবী মানুষ এ রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে। অবশ্য প্রতিষ্ঠালোভী বুদ্ধিজীবীদের কথা আলাদা। এ অবস্থায় প্রগতিবাদী সংস্কৃতির কর্তব্য হবে সমমনা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে টেনে ঐক্যবদ্ধভাবে সংস্কৃতি চর্চার ধারা তৈরি। তবে সংস্কৃতি চর্চাকে রাজধানী মহানগরী থেকে শহরে, গ্রামেগঞ্জে নিয়ে যাওয়া দরকার। এক কথায় সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ নাগরিক বৃত্ত থেকে সংস্কৃতি চর্চার মুক্তি চাই। দরকার জনমানসের সঙ্গে সেতুবন্ধ। শুদ্ধ তারুণ্যকে এবং দূষণমুক্ত সমমনাদের কাছে টানাও জরুরি। সংস্কৃতি চর্চার মতাদর্শগত তাত্তি্বক চর্চা যেমন দরকার; তেমনি দরকার এর যথার্থ বাস্তবায়ন। একই ধারায় সংস্কৃতির সৃজনশীল শাখায় তৎপরতা গণসংস্কৃতি বিকাশের জন্য অপরিহার্য। গণসংগীত, ঐতিহ্যবাহী পরিশীলিত লোকসংগীত ও লোকনাট্যের আধুনিকায়নও প্রয়োজন। এগুলো জনসংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক। পরীক্ষামূলকভাবে জনবোধ্য নয়। আঙ্গিক উদ্ভাবনও দরকার। বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশে সংস্কৃতি চর্চার পক্ষে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দায় পূরণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.