লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

ভিডিও রিপোর্ট

  Posted by Kheiruz Zaman on Friday, October 12, 2018
On the inauguration event of ‘Jasmin Khan Foundation’ on 10-12-2018 in its office at Clover Road, Pacoima, CA. Posted by Majib Siddiquee on Friday, October 12, 2018

‘দ্য লাস্ট গার্ল’ এর নোবেল বিজয়

নাদিয়া মুরাদ ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী।এখন ওর ২৫ বছর বয়স। ২০১৪ সালে নাদিয়া তখন ২১ বছরের একজন উচ্ছল মুসলিম তরুণী। ইরাকের একটি পাহাড়ি এলাকা নাম তার সিনজার। এই পাহাড়ি অঞ্চল সিনজারে একটি গ্রাম ইয়াজিদি। সেই গ্রামে নাদিয়ার জন্ম থেকে বেড়ে উঠা। ২০১৪ সালের ইয়াজিদি গ্রামে আকস্মিক হামলা চালায় আইএস জঙ্গিরা,যারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম হিসেবে। মুসলিম নামধারী এই আইএস জঙ্গিরা নির্বিচারে শুরু করে গনহত্যা। গ্রামের প্রায় সব পুরুষ ও বয়স্ক নারীদের হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে নাদিয়ার ছয় ভাই এবং তার মাও ছিলেন। জঙ্গিরা গ্রামের অন্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়াকেও ধরে নিয়ে যায় এবং যৌনদাসী হিসেবে বন্টন করে দেয়। নানা হাত ঘুরে একসময় মসুল পৌঁছে যান নাদিয়া। এই সময়ে তাকে আইএস জঙ্গিরা অসংখ্যবার ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন করে। এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন নাদিয়া, ফল ধরা পড়া। বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। কিছুদিন পর তাকে আবারও বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল। একদিন সুযোগ বুঝে আইএস বন্দিদশা থেকে পালিয়ে এক সুন্নি মুসলিম পরিবারে আশ্রয় নেন নাদিয়া। ওই পরিবার তাকে মসুল থেকে পালিয়ে আসতে সব রকম সহায়তা করে।নাসির নামে এক সুন্নি মুসলমান নাদিয়াকে স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আইএসের কড়া নিয়ন্ত্রণে থাকা মসুল সীমান্ত পার করে দেন। জীবনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীকে জানাতে ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে একটি বই লেখেন নাদিয়া, যা ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়। ওই বইতে তিনি লেখেন,“কখনও কখনও ধর্ষিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই সেখানে ঘটত না। একসময় এটা প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।" আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর পাঁচ হাজারের বেশী পুরুষ কে হত্যা করে। ধরে নিয়ে যায় তিন হাজারের বেশী যুবতী নারীকে। তাদের উপর চালায় যৌন নির্যাতন। প্রতিদিন এই নারীরা শিকার হত ধর্ষণের। ২০১৫ সালে ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আইএসের হাতে নিপীড়নের ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নাদিয়া। তিনি মানবাধিকার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহারের বিরুদ্ধেও কাজ শুরু করেন। নিজের আত্মজীবনী "‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে লেখা একটি বইয়ে সেই কাহিনি তুলে ধরেন তিনি। যৌন সহিংসতা ও হয়রানিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে লড়াই করে এই বছর ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জঙ্গিদের হাতে ধর্ষণের শিকার ইয়াজিদি নারী নাদিয়া। দাড়িয়ে স্যালুট তোমাকে হে নারী। তোমার জন্য থাকছে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।।

সন্দেহবাদিতা

সন্দেহবাদিতা

মো. রফিকুল ইসলাম
(সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা: লেখাটি নিতান্তই রম্যকথন। সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। গল্প ও জোকসগুলো সংগৃহীত) আমার প্রবাসী বন্ধুটি আবারও অনুরোধ করেছে সন্দেহ বা সন্দেহবাদিতা বা সাসপিশন নিয়ে কিছু লিখতে। আগেরবার মনে করেছিলাম বন্ধু হয়ত জ্ঞানের বহর বাড়াতে আমাকে দিয়ে ঘাটাঘাটি করিয়ে কিছু লিখিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এবারে একটু সন্দেহ হল। ঘটনা কি? এতো জ্ঞানার্জন নয়। নিশ্চয় অন্য কোন বিষয় আছে। বন্ধুকে হালকা চেপে ধরতেই স্বীকার করতে বাধ্য হলো সে সন্দেহের আওতায় আছে। কার সন্দেহের আওতায় আছে তা নিশ্চয় আপনাদের বলে দিতে হবে না। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। তিনি ধর্মপত্নীর সন্দেহের ঘেরাটোপে আবদ্ধ আছেন। কিছুতেই এ জাল ছিন্ন করতে পারছেন না। তাই সন্দেহের আদি অন্ত নাড়াচাড়া করে যদি মনে একটু শান্তি আসে তাই এ অনুরোধ। শুধু আমার বন্ধু কেন শতকরা নব্বই ভাগ বিবাহিত পুরুষই নিজ নিজ পত্নীর সন্দেহের তালিকায় থাকেন। পরিসংখ্যান নিয়ে আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে? আপনার সন্দেহ যুক্তিসংগত। ঠিক ধরেছেন, এটা কোন জরিপের ফলাফল নয় নিতান্তই আমার অনুমান মাত্র। এ ধরনের কোন জরিপ আছে কিনা সেটাও আমার জানা নেই। জানার দরকারও নেই। আপনি কি বিবাহিত। তাহলে বুক হাত দিয়ে ভাবুন তো একবার, না, বলার দরকার নেই। আপনি কি সন্দেহের বাইরে? যদি হন তাহলে আপনি ভাগ্যবান। না হলে ঐ নব্বই জনের একজন আপনি। দাঁড়ান দাঁড়ান কিসের সন্দেহের আওতায় আছেন তা কিন্তু এখনও বলিনি। উল্টাপাল্টা কিছু ভেবে বসবেন না যেন। একটু ধৈর্য ধরুন সব খোলাসা হবে। বাংলা ভাষায় সন্দেহকে সংশয়, অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা, দ্বিধা, অপ্রতীতি, খটকা বা অভিশংকা ইত্যাদি নানাভাবে বর্ণনা করা যায়। সন্দেহের ইংরেজি পরিভাষা সাসপিশন শব্দটি ল্যাটিন Suspere শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ To suspect। ইংরেজি ভাষায় সাসপিশন শব্দটি চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে ভাষায় এর যেদিনই ব্যবহার শুরু হোক না কেন সন্দেহ অবিশ্বাস যে আদি মানব সন্তানের সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু হয়েছে সে বিষয়ে কিন্তু কোন সন্দেহ নেই। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না, সন্দেহ হচ্ছে তাহলে আদি পিতার বেহেশতের সেই নিষিদ্ধ ফল খাবার ঘটনাটি নতুন করে মনে করুন তাহলেই আপনার সন্দেহভঞ্জন হবে। আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের সন্দেহের আওতায় পড়ছি। আবার আমরাও মাঝে মধ্যে অন্যকে সন্দেহের আওতায় আনছি। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য আছে যারা অন্যকে সহজে সন্দেহ করতে চায় না। এজন্য অবশ্য তাদের বিপদে পড়ার সম্ভবনাও থাকে। যাক সে বিষয় পরে বলা যাবে আগের বিষয় আগে। দু'টো শ্রেনির সন্দেহের আওতায় আসলে আমরা সব থেকে বেশি নাস্তানাবুদ হই। এক নিজ স্ত্রী আর দ্বিতীয় পুলিশ। একটিতে আপনি বেইজ্জত হতে পারেন পরিবারের মধ্যে আর দ্বিতীয়টিতে জনসম্মুখে। প্রথমটি নিয়ে হয়ত অনেকের সংশয় বা সন্দেহ হচ্ছে। উদাহরন দিচ্ছি মিলিয়ে নিন। প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামী সম্পর্কে অতিশয় উচ্চ ধারনা পোষন করে। যেমন স্বামী বেচারা হয়ত সরকারী বা বেসরকারী নির্ধারিত বেতনে চাকুরী করে বা ছোট খাট ব্যবসা করে সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। স্ত্রী নিজেও হয়ত চাকুরী করে। সেও জানে তার স্বামীর আয় কত। তবুও সে সব সময় সন্দেহ করবে নিশ্চয় তার স্বামী গোপনে আত্মীয় স্বজনকে টাকা পাচার করে দিচ্ছে। ভাববে স্বামী তার ভাইকে জমি বা বাড়ি কিনে দিচ্ছে বা ভাগ্নে বা ভাস্তেকে পড়ার খরচ দিচ্ছে নিজ সংসারের দিকে না তাকিয়ে। সব স্ত্রীরই ধারনা তার স্বামীর নিশ্চয়ই এক্সট্রা ইনকাম আছে অথবা আছে অফুরান্ত অর্থের ভান্ডার। সে স্ত্রী সন্তানকে বঞ্চিত করে শুধু বাবা মার সংসারে বা আত্মীয়দের অকাতরে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে। এতো গেল টাকা পয়সা নিয়ে। অন্য বিষয়! বেচারা স্বামীর হয়ত কোন কারনে বাসায় ফিরতে দেরি হচ্ছে। তো শুরু হয়ে গেল মুহূর্মুহু টেলিফোন। যদি কোন কারনে মোবাইল অফ থাকে বা ব্যাটারী শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্বামী বেচারার কপালে দুঃখ আছে। প্রায় প্রত্যেক স্ত্রীই ভাবে তার স্বামীর প্রেমে তাবত সুন্দরীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। তাই দেরি হলে তাদের ধারনা স্বামী প্রবর এতক্ষন নিশ্চয় স্ফূর্তি করে আসলেন। ওই যে বলছিলাম স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের সামর্থ্য সম্পর্কে অতি উচ্চাশা পোষন করে। তবে কোন কোন বুদ্ধিমান জ্ঞানী ব্যক্তি স্বামী নামের এ আসামীদের এ অবস্থা থেকে উদ্ধারে কিছু কিছু পথ বাৎলে দিয়েছেন। তার দু'একটা টিপস আপনাদের দেই। কাজে লাগাতে পারেন। এতে কাজও হতে পারে। কাজে না লাগলে আমাকে দোষ দেবেন না যেন। এগুলো আমার আবিষ্কারও নয় বা আমার দ্বারা পরীক্ষিতও নয়। যেমন ধরুন, আপনি হয়ত ট্যুরে আছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে টেলিফোন করবেন কোথায় কি করছেন তার রানিং কমেন্ট্রি দিয়ে। একে বলা যায় হাজিরা কল। আপনি হয়ত সন্ধ্যার পর বন্ধু বা বান্ধবীদের নিয়ে আসলেই স্ফুর্তি করছেন। এ সময় স্ত্রীর কল। কি করবেন? ঘাবড়াবেন না। খুব পরিশ্রান্তের সুরে জবাব দিন সারাদিন একঘেয়ে মিটিং করে এই মাত্র হোটেলে ফিরলেন। কাজে লাগতে পারে এমনকি সহানুভূতিও পেতে পারেন। অথবা ধরুন, আপনার স্ত্রীও হয়ত জানে আপনি স্ফূর্তির জায়গায় আছেন। তখন প্রেমঘন স্বরে বলুন আই মিস ইউ। তুমি থাকলে ভাল লাগতো। দেখবেন আপনার সাত খুন মাপ হতেও পারে। তবে অতিশয় বুদ্ধিমান স্বামীরা কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে দিব্যি স্ত্রীর নাকের ডগায় স্ফূর্তি করে বেড়াচ্ছে। একটা গল্প বলি শুনুন। একদিন কুদরত সাহেব ভুলে মোবাইল বাসায় ফেলে অফিসে গেছেন। অফিস থেকে ফোন করে স্ত্রীকে দুপুরে লাঞ্চের সাথে ড্রাইভারের কাছে ফোন পাঠিয়ে দিতে বললেন। স্ত্রী এ সুযোগে স্বামীর ফোনটি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন। ফোনবুকে ঢুকে দেখলেন সন্দেহজনক তিনটি নম্বর গর্জিয়াস ওম্যান, প্রেটি লেডি ও মাই লাভ নামে সেভ করা। স্ত্রীর তো মাথায় খারাপ হবার যোগাড়। কুদরত সাহেবকে নিতান্তই গোবেচারা মনে হয় যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। অথচ তলে তলে এত। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে। আজকেই ধরতে হবে। একেবারে জন্মের শিক্ষা দিতে হবে। ছোক ছোকানির সাধ মিটিয়ে দিতে হবে। আসুক আজ বাড়িতে। তবে তার আগে ধরতে হবে এ তিন শাঁকচুন্নি কারা। কুদরত সাহেবের ফোন থেকে ফোন করলে নিশ্চয় ধরবে। তখনই বুঝা যাবে তারা কারা। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই গর্জিয়াস ওম্যানকে ফোন করলেন। ওপাশের ফোন কল রিসিভ করলো। হ্যালো বাবাজী, কেমন আছ? আমার মেয়ে কেমন আছে। অসময়ে ফোন করলে? কোন অসুবিধা? মা আমি তোমার মেয়ে বলছি। তোমার জামাই ভুলে ফোন রেখে গেছে। সে ফাঁকে তোমাকে ফোন করলাম। আরও দু'চার কথা বলে ফোন রেখে দিলেন। স্ত্রী ধাক্কা খেলেন। আজকাল মানুষ নিজের মাকেই পাত্তা দেয় না আর সে কিনা শাশুড়ির নাম সেভ করেছে। আসলেই লোকটা নরম মনের মানুষ। তা বলে তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তিনি এবারে ফোন করলেন প্রেটি লেডির নম্বরে। হ্যালো দুলাভাই। আচ্ছালামু আলাইকুম। এতদিনে আপনার একমাত্র শালীর কথা মনে পড়লো। ঋতু, আমি তোর আপা বলছি রে। তোর দুলাভাই ভুলে ফোন বাসায় রেখে গেছে। তুই কেমন আছিস। আরও অল্পকিছু কথা বলে ফোন রেখে দিল। না! তার স্বামীটা তো আসলেই ভাল মানুষ। নিজের বোন নেই তাই শালীকে বোনের মত দেখে। কিন্তু মাই লাভটা কে? খটকা এখনও দূর হয়নি। এবারে রিং দিল মাই লাভের নম্বরে। রিং হচ্ছে। ওমা তার নিজের নম্বরও বাজছে। নিজের ফোন হাতে নিয়ে দেখে তার স্বামীর নম্বর। সে পুরো থ হয়ে গেল। তার ভীষণ কান্না পেল। ফেরেস্তার মত স্বামীকে সে সন্দেহ করলো। তার খুব অনুশোচনা হল। সে সারাদিন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলো। বিকেলে কুদরত সাহেব ফিরলে পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললো। মাফ চাইলো। আর কুদরত সাহেবের হাতে তুলে দিল দশ হাজার টাকা ইচ্ছেমত খরচ করতে। এ টাকাটা সে অনেক কষ্টে জমিয়েছিল। অথচ একদিন আগে হলে জান থাকতে সে এ টাকা কাউকে দিত না। কিন্তু সে আজ এতটাই অনুতপ্ত আর তার পতিভক্তি ও পতিপ্রেম এতটাই উথলে উঠেছে যে এ টাকা তার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। কুদরত সাহেব টাকাটা নিলেন। এ টাকায় একটি সুন্দর শাড়ি কিনে গিফট দিলেন বান্ধবী সিনথিয়াকে। ভাবছেন, কুদরত সাহেবের স্ত্রী ফোনে সিনথিয়ার নম্বর পেল না কেন? পাবে কি করে ওটা তো সেভ ছিল গফুর চাচা মোটর মেকানিক নামে।

সন্দেহবাদিতা ২

স্ত্রীর সন্দেহের আসামী হলে কি কি হতে পারে তার ধারনা ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন। এবারে তাদের সন্দেহ যে কখনও কখনও উপকারী হতে পারে তার একটা উদাহরন দেই। ধরুন, আপনি সকালের ঘুমটা খুব পছন্দ করেন তাই সকালে দেরি করে উঠেন। কিন্ত আপনার স্ত্রী চান আপনি সকালে উঠে হাটতে যাবেন যাতে আপনি স্লীম থাকেন। কি আর করা, আপনার কষ্ট হলেও স্ত্রী আজ্ঞা পালনে নিতান্ত অনিচ্ছায় হাটতে বের হন। কিন্তু আপনি সকালের ঘুমটা খুব মিস করেন। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে শুধু স্ত্রীর মনে একটু সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবেন। কিভাবে? দিন কয়েক পর হেঁটে বাসায় ফিরে উৎফুল্লভাব দেখান বা চাইলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জনপ্রিয় কোন গানের কলিও ভাজতে পারেন। ভাব দেখান আপনার হেঁটে খুব ভাল লাগছে। নিশ্চিত আপনার স্ত্রী আপনার উৎফুল্লতার কারন জানতে চাইবে। বলবেন, " আর বলো না হেঁটে খুব মজা পাচ্ছি। সকালবেলা আমরা যে রাস্তায় হাঁটি সে রাস্তার পাশে বাচ্চাদের স্কুলে সুন্দর সুন্দর মায়েরা বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে আসে। বাচ্চাদের স্কুলে ঢুকিয়ে তারা রাস্তার ধারে আড্ডা দেয়।" ব্যস আর কিছু বলার দরকার নেই। আপনার কথা শুনে স্ত্রীর কথা বন্ধ হয়ে যাবে, মুখ ভার হবে। আপনি সারাদিন চুপটি থাকুন। শুধু ঘুমুতে যাওয়ার আগে সকালে হাঁটতে যাওয়ার কোন প্রসংগ তুলতে পারেন বা নাও তুলতে পারেন। কিন্তু নির্দেশ পাবেন, "কাল থেকে আর তোমাকে হাঁটতে যেতে হবে না।" আঃ! কি শান্তি! নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন। পুলিশের সন্দেহের আসামী হলে কি সমস্যা হতে পারে তার একটু ধারনা দেওয়া যাক এবার। আপনি কপালদোষে পুলিশের সন্দেহের আওতায় যদি এসেই পড়েন তাহলে পুলিশের সন্দেহভঞ্জনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৫৪ ধারায় আপনি লাল দালানে ঢুকে যেতে পারেন। কপাল ভাল হলে উকিল মোক্তার ধরে বাড়ি ফিরে বাড়ির ভাত খেতে পারবেন। আর যদি কপাল খারাপ হয় তাহলে লাল দালানে ভাত খেতে হতে পারে। কতদিন? তা জানতে জনপ্রিয় জোকটি শুনুন। এক বনের ধারে এক শেয়াল দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ সে দেখলো একটা মহিষ ব্যস্ত সমস্ত হয়ে দৌড়ে গভীর বনের মধ্যে ঢুকছে। শিয়াল তাকে জিজ্ঞেস করলো, "এই মহিষ, তুমি এত ব্যস্ত হয়ে কই যাও।" উত্তরে মহিষ বললো, "ও, তুমি জানো না বুঝি। হাতি ধরতে বনে পুলিশ এসেছে।" "আরে বোকা মহিষ তাতে তোমার কি তুমি তো আর হাতি না?" শিয়াল মহিষকে টিটকারি মারলো। মহিষ হেসে জানালো, "এটা এমন দেশ ২০ বছর জেলে থেকেও আমি প্রমান করতে পারবো না আমি হাতি না, মহিষ।" শুনে শেয়াল নিজেও আর দাঁড়ালো না, দৌড় লাগালো। পুলিশ উকিল মোক্তার কোর্ট কাচারীর কথা যখন এসেই গেল তখন সেখানকার কাজ কারবার সম্পর্কে একটু বিদ্যার্জন করা যাক। আদালতে বাদী পক্ষের সব সময় চেষ্টা থাকে মামলার ঘটনা কিভাবে বিচারক বা জুরিবোর্ডকে বিশ্বাস করানো যায়। অন্যদিকে আসামি পক্ষের কাজ কারবার সন্দেহ নিয়ে। অর্থাৎ বিচারক বা জুরিবোর্ডের মনে ঘটনার বিষয়ে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া। যে যত ভালভাবে এ কাজ করতে পারবে সে তত ভাল উকিল। কখনও কখনও সন্দেহ সংশয়ের জয় হয় কখনওবা নির্ঘাত পরাজয়। এ নিয়ে একটি গল্প হয়ে যাক। এক উকিল এক হত্যা মামলার আসামীর পক্ষে আইনি লড়াই করছে। এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারলো যদিও ভিকটিকের লাশ পাওয়া যায়নি কিন্তু আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ এমন যে তার মক্কেলের শাস্তি এড়ানো খুবই কঠিন হবে। তখন সে মামলার জুরি বোর্ডকে বললো, "সম্মানিত জুরিবোর্ড আপনারা আজ যার হত্যাকান্ডের জন্য আমার মক্কেলকে আসামীর কাঠ গড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সে কিছুক্ষনের মধ্যেই হেটে আমাদের এখানে চলে আসবে।" বলেই সে কোর্টরুমের দরজার দিকে তাঁকালো। জুরিবোর্ডও দরজার দিকে তাঁকালো। কিন্তু কিছুই ঘটলো না। কেউ এলো না। তখন উকিল বললো, "এই মাত্র যে কথাটি বলেছিলাম তা ছিল একটা বিবৃতি মাত্র। কিন্তু আপনারা সবাই আমার কথায় দরজার দিকে তাঁকিয়ে ভিকটিমের কোর্টরুমে ঢোকার অপেক্ষা করছিলেন। এর একটাই অর্থ আপনারা হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সন্দিহান। সুতরাং আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনীত হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়েও আপনাদের সন্দেহ আছে। অতএব আমার মক্কেল হত্যার দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।" এরপর দ্রুত জুরিবোর্ড সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন ও রায় দিয়ে দিলেন। কি আশা করছেন আপনারা, জুরিবোর্ড আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়ে দিলেন। যদি বলি আপনারা ঠিক ধরতে পেরেছেন। কোন সন্দেহ হচ্ছে আপনাদের? সন্দেহ হলে কোন কথা নেই। না হলে একটি কথা আছে। এবারে কিন্তু সন্দেহবাতিকগন জিতে গেছেন। উকিলের যথার্থ সন্দেহ উদ্রেক সত্ত্বেও আসামিকে জুরিবোর্ড সাজা দিয়ে দিয়েছিলেন। কারন জুরিবোর্ড উকিল সাহেবের সন্দেহ উদ্রেকের বিবৃতির উপরই সন্দেহ করেছিলেন। কেন? উকিলের বিবৃতি শুনে বেচারা আসামি যে দরজার দিকে ভ্রক্ষেপই করেনি। কারন তার হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে নিজের কোনই সন্দেহ ছিল না। জন উইলসন বলেছেন, যে যাকে সন্দেহ করে সে তার ভাল কাজকেও স্বীকৃতি দিতে পারে না। তার মানে সন্দেহবাতিকেরা ভালকাজকেও সন্দেহের চোখে দেখে।আমাদের ধর্মপত্নীগণ ও পুলিশের কাজই হল সন্দেহ করা। সুতরাং এরা ছাড়া জন উইলসন সাহেবের কথামত সাধারন মানুষের সব কাজে সন্দেহ করা মানায় না। তাহলে সে সন্দেহবাতিক নামের ব্যাধিক্রান্ত হতে পারে। আবার একেবারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে সকল কথায় সকলকে বিশ্বাস করলেও অনেক সময় কপাল চাপড়াতে হয়। তাই মাঝে মাঝে কিন্তু সন্দেহবাতিক হওয়ারও প্রয়োজন আছে। এসব পরিস্থিতিতে সন্দেহ না করলে বরং আপনি ঠকে যেতে পারেন । একটা গল্প শুনুন তাহলে বুঝতে পারবেন সন্দেহ না করলে কি বিপদ হতে পারে। নগেন ও যতীন দু'বন্ধু। একদিন যতীন নগেনকে বললো, "জানিস দোস্ত আমাদের পুরোহিতের বৌটা না হেব্বি দেখতে।" নগেন বললো, "বলিস কিরে যতীন?" নগেন : "হা রে! আজ রাতে আমি পুরোহিতের বাড়ি যাব। তুই পুরোহিতকে পাহারা দিবি।" যতীন: "কিভাবে?" যতীন নগেনকে বললো, "আরে পুরোহিত যখন মন্দিরে থাকবে তুই পুরোহিতের সংগে কথা বলে তাঁকে মন্দিরে দু'ঘন্টা আটকে রাখবি।" নগেন আর পুরোহিত মন্দিরে কথা বলছে। নগেন: "পুরোহিত মশাই, আপনি গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন ও ভাল পুরোহিত। আপনি অনেকদিন ধরে এ মন্দিরে পুজা করে আসছেন।" এরকম নানা কথা বলতে বলতে দু'ঘন্টা কেটে গেল। পুরোহিতের নগেনের এ গাল গল্পে সন্দেহ হল। সে বললো, " আচ্ছা নগেন, আজ তুমি হঠাৎ আমার সাথে এত কথা বলছো কেন? আগে তো কখনই বলোনি।" নগেন আমতা আমতা করে বললো, "না মানে এমনি পুরোহিত মশাই?" পুরোহিত : "মানে মানে না করে আসল কথা বলো তো।" নগেন তখন জানালো যে যতীন তাঁকে দু'ঘন্টা মন্দিরে আটকে রাখতে বলেছিল। কারন তাঁর বউ নাকি হেব্বি সুন্দরী। যতীন আজ তাঁর বাড়িতে যাবে। পুরোহিত নগেনকে জিজ্ঞেস করলো, "নগেন, তুমি বিয়ে করেছো। নগেন: "হ্যাঁ। পুরোহিত মশাই।" পুরোহিত: "আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। আমার বউ পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।" এবার আপনি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন কখন কাকে সন্দেহ করবেন বা কখন কাকে ক্লিন চিট দিবেন। অথবা কিভাবে নিজ পত্নীর সন্দেহ সংশয়কে সামাল দেবেন। পুলিশের সন্দেহ দূর করার চেষ্টা না করাই ভাল। বেশি চেষ্টা করলে পুলিশের সন্দেহকে বরং আরও উসকে দিবেন। (সমাপ্ত)

কেন আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছিঃ সম্পাদক পরিষদ

সম্পাদক পরিষদ:

জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে :

১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ২. এ আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ৩. এ আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। ৫. এ আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যাঁরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তাঁরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি, কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে এ আইনেও সাংবাদিকরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এ আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উম্মোাচন করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি, এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন-অযোগ্য। এর ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে। উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তিসংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন-অযোগ্য, পাঁচটি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে এক বছর কারাদ-, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ চার বছর থেকে সাত বছর কারাদ-। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনটি শুধু তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদ-। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তার মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।

বিশদ ব্যাখ্যা

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।

ধারা ৮

৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা। (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন। (২) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মাণ হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন। (৩) উপ-ধারা (১) ও (২)-এর অধীন কোনো অনুরোধপ্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো, ব্লক করিবে।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এখানে দুটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যে কোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যে কোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যে কোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে। প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্ল­ক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্ল­ক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

ধারা ২১

২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এ আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদন্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান। আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজম্মে র জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

ধারা ২৫

২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মসংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এ আইন ব্যবহার করতে পারেন। তারা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উম্মোাচন করে, এমন যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এ বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে। এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না-ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে। রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণœ করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এ আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।

ধারা ২৮

২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কীভাবে জানবেন কখন ও কীভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এ পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওইসব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ‘আঘাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

ধারা ২৯

২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-Gi section 499--এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।

ধারা ৩১

৩১। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দন্ডে। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লি­ষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ-প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসন্ন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এ আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই না-ও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।

ধারা ৩২

৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদ-, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অনধিক এক (এক) কোটি টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্লø্যাটফরমে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দফতরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া যেতে পারে, তাই তো? এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।

ধারা ৪৩

৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্ল­াশি, জব্দ ও গ্রেফতার। (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্ন বর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন : (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ; (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি; (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি। এতে পুলিশকে যে কোনো জায়গায় প্রবেশ, যে কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যে কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেফতার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এ আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪টিই জামিন-অযোগ্য, তখন গ্রেফতারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়্্গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকা- ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেফতার-আতঙ্ক তাদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তারা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তারা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যে কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেফতার করতে তারা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন। এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার ও সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যে কোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করেই আইনের এ ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ধারা ৫৩

৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা। এই আইনের :(ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১) এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এ আইনের প্রায় ১৯টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

উপসংহার

১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে;
২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে;
৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বার বার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী;
৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী;
৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লে­ষণ ও ব্যাখ্যা করেছি। এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এ আইন প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে। এ আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে। পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়নসম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন: ‘আপনারা বলে থাকেন যে বাক-স্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।’ ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তারা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি।... নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে...। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।... ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তারা তাদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’  

পরকীয়া!!

পরকীয়া

মোঃ রফিকুল ইসলাম

সাধারনভাবে বিবাহিত কোন পুরুষ বা মহিলা নিজ স্ত্রী বা স্বামী ব্যতীত অন্যকোন মহিলা বা পুরুষের সংগে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত হলে তাকে পরকীয়া বলা হয়। তবে আইনের ভাষায় অবশ্য শুধু প্রেমের সম্পর্ক নয় শারিরীক সম্পর্ক হতে হবে। পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার অনেক কারন সমাজ বিজ্ঞানীগণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি কারনকে অগ্রগণ্য বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।

১. একাকীত্ব: জীবন জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারনে।

২. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: মানসিক দূরত্ব বা ঝগড়াঝাটি ইত্যাদি কারনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা।

৩. প্রেম ভালবাসার ঘাটতি: নানা কারনে প্রেম ভালবাসার ঘাটতি দেখা দিলে।

৪. যৌন সম্পর্কে বিরক্তি: কোন এক পক্ষের বিরক্তি বা অক্ষমতা দেখা দিলে।

৫.অন্তরঙ্গতার ঘাটতি নানাবিধ কারনে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অন্তরঙ্গতার অভাব হলে।

তবে সমাজবিজ্ঞানীরা যাই বলুক বা ব্যাখ্যা দিক না কেন মানুষ স্বভাবগতভাবে নিজেরটা নিয়ে কমই সন্তুষ্ট থাকে। হোক সেটা নিজের স্ত্রী বা স্বামী বা খাবার দাবার বা অন্যকোন জিনিস। রবি ঠাকুরের নরেশ পরেশ দু'চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের গল্পে যেমন আছে। নরেশ নিজের পছন্দের পাত্রী ছেড়ে পরেশের পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করার পর যখন নরেশের ছেড়ে দেয়া পাত্রীকে পরেশ বিয়ে করে তখন নরেশ দ্বন্দ্বে পড়ে যায় এই ভাল কি সেই ভাল নিয়ে এবং নিজের স্ত্রীর খুত আবিষ্কার করে। তেমনি খাবার দাবার নিয়েও গ্রামে একটা শ্লোক প্রচলিত আছে, নিজের বাড়ির পিঠা খাইতে লাগে তিতা, "পরের বাড়ির পিঠা খাইতে লাগে মিঠা।" খাবার নিয়ে বরং একটা গল্পই বলি। বিপত্নীক সরকার সাহেবের অনেক বয়স হয়েছে। মুখের স্বাদ কমে গেছে। প্রতিদিনই খাবার নিয়ে জ্বালাতন করেন। নিজের বৌমার রান্না ভাল লাগে না। শুধু পাশের বাড়ির চাচাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে ডাল বা তরকারী আনতে বলেন। একদিন সন্ধ্যায় খেতে বসেছেন। ডাল ভাল লাগছে না। পাশের বাড়ি থেকে ডাল আনতে বললেন। কাঁহাতক আর মানুষকে বিরক্ত করা যায়। তাই বৌমা চালাকি করে নিজেদের ডাল কাজের মেয়েকে দিয়ে শাড়ির আঁচলের তলায় বাইরে পাঠিয়ে আবার কয়েক মিনিট পর নিয়ে এসে বলে এই যে আপনার ঘটুর বৌয়ের ডাল। সরকার সাহেব এবার ডাল খেয়ে সন্তুষ্ট হন। আর বলেন, "দেখ তো আমার ঘটুর বৌয়ের ডাল। তোরা কি রান্না করিস মুখেই দেওয়া যায় না।" অথচ কয়েক মিনিট আগে এ ডালই তার ভাল লাগছিল না। মানুষ নিজের স্ত্রী বা স্বামী নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকাটা বোধহয় একটা চিরন্তন বিষয়। এজন্য অনেকেই সুযোগ খুঁজে কিভাবে তার সঙ্গীকে পরিবর্তন করা যায়। কি কথাটা আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে আমি একটা ঘটনা বলি। এরপর আপনারাই না হয় বিচার করুন। বইয়ের নামে শুধুমাত্র একটি বর্ণের ভুলের কারনে একটি বইয়ের বিক্রি মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বেড়ে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ পর্যন্ত হয়েছিল। নিশ্চয়ই আপনাদের জানতে ইচ্ছে হচ্ছে বইটির কি নাম ছিল। বইটির নাম ছিল How to change your life. কিন্তু ভুলক্রমে l এর পরিবর্তে w হওয়াতে এ বিপত্তি ঘটেছিল। এতে বইয়ের নাম হয়েছিল How to change your wife. তাহলে বুঝুন ওয়াইফ পরিবর্তনের কলাকৌশল জানতে স্বামীরা কেমন উদগ্রীব ছিলো। পুরুষ লোকদের স্ত্রীদের সংগে কথা বললে নাকি বড় বড় রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি কমে যায়। তবে সেটা নিজ স্ত্রী নাকি পরস্ত্রী সেটা একটা প্রশ্ন। আসুন দেখি সমীক্ষা কি বলে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে স্ত্রীর সংগে কথা বলা পুরুষের জন্য খুবই চিত্তবিনোদন ও জীবনী শক্তি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এটা পুরুষের শতকরা ৯০ ভাগ উদ্বেগ ও ৮০ ভাগ হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এছাড়া এটা শতকরা একশ ভাগ চিত্তবিনোদনকারী। তবে এ গবেষনা সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হল এটা কার স্ত্রীর সাথে কথা বলার কথা বলা হয়েছে সেটা বলতেই ভুলে গেছে। তার মানে এ সমীক্ষা পরকীয়ার মাহাত্ম্যকে তুলে ধরছে। পরকীয়ার মাহাত্ম্য যেমন আছে তার ঝক্কিও কিন্তু কম নয়। পরকীয়া করে ধরা পড়লে বা ধরা পড়ার আশঙ্কা হলে স্বামী বা স্ত্রীর হাতে নাস্তানাবুদ বা কখনও জীবনের উপরও আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। একটা গল্প বলি তাহলে হয়ত বিষয়টা একটু পরিষ্কার হতে পারে। দুই ভূতের আলাপ পরিচয় হয়েছ। তারা কে কিভাবে মারা গিয়ে ভূত হয়েছে তাই নিয়ে কথা বলছে। ১ম ভূত: ভাই, আপনি কিভাবে মারা গেলেন? ২য় ভূত: আমি ঠান্ডায় মারা গেছি। ১ম ভূত: তা ঠান্ডায় মারা যাবার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিল। ২য় ভূত: আসলে আমি দূর্ঘটনাক্রমে একটা রিফ্রেজারেটরে আটকা পরেছিলাম। প্রথমে আমি ঠান্ডায় কাঁপছিলাম। পরে আমার শরীর জমে যায়। চারদিকে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে এবং এক পর্যায়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যাই। ১ম ভূত: আহা! কি করুন মৃত্যূ। ২য় ভূত: আপনি কিভাবে মারা গেলেন? ১ম ভূত: আমার হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল। ২য় ভূতঃ ও তাই, তা কিজন্য আপনার হার্ট এ্যাটাক হল। ১ম ভূত: আসলে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার স্ত্রীর অন্য এক পুরুষের সাথে সম্পর্ক আছে। একদিন যখন কাজ থেকে ফিরছিলাম তখন একজোড়া জুতা আমার বাসার দরজার বাইরে দেখতে পেলাম। তখন বুঝলাম যে ব্যাটা আমার স্ত্রীর সাথে আছে। কিন্তু শোবার ঘরে গিয়ে দেখি স্ত্রী একা। তখন আমার জেদ শয়তানটা কোথায় পালিয়ে আছে তা খুঁজে বের করা। আমি টয়লেট, নীচতলার ঘর, স্টোর রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজেও শয়তানটাকে পেলাম না। আমি দৌড়ে উপরের তলায় গেলাম। ওয়ারডোর্ব খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। কিন্তু এই দৌড়াদৌড়ি ও উত্তেজনা সহ্য করতে পারলাম না। হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেল। ২য় ভূত: ইস্! আপনি কেন শয়তানটাকে খুঁজতে ফ্রিজটা খুঁজলেন না। শয়তানটা সেখানেই লুকিয়ে ছিলো। সেখানে খুঁজলে আজ আমরা দু'জনই বেঁচে থাকতাম। কখনও কখনও বুদ্ধিমান ও চালাক লোকেরা নির্বিঘ্নে পরকীয়া চালিয়ে যান তার স্ত্রী বা স্বামীর নাকের ডগায়। আবার কেউ কেউ ধরা খেয়ে নাজেহালও হন। আবার কেউ কেউ কখনও কখনও পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে সন্তানের বাবা মা হয়ে সমাজের চোখেও নাজেহাল হন। এগুলোর দু'একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা খোলাসা হবে। প্রথমেই বুদ্ধিমান লোকেরা কিভাবে কি করে দেখা যাক। এক বিবাহিত লোকের তার অফিস সেক্রেটারির সংগে সম্পর্ক ছিল। একদিন সে অফিস শেষে তার সেক্রেটারির বাসায় গেল এবং সারা বিকেল তার সাথে প্রেম করল। এক পর্যায় সে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ জেগে উঠে পোষাক পড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। বের হবার আগে সে তার প্রেমিকাকে তার জুতোজোড়া বাইরে নিয়ে ঘাস ও কাদা ময়লার সাথে ঘষতে বললো। এবারে ঘাস ময়লা লাগা জুতো পায়ে সে বাসায় ফিরে গেলো। "তুমি সারা বিকেল কোথায় ছিলে?" স্ত্রী জানতে চাইলো। "আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলবো না। আমার সেক্রেটারির সাথে প্রেম করছিলাম।" "আমার কাছে মিথ্যা বলো হারামীলোক। তুমি গলফ খেলছিলে।" এবারে একটু কম বুদ্ধিমান লোকেরা এ কাজ করতে গিয়ে কিভাবে ধরা পড়ে আসুন দেখি। এক মহিলার স্বামী সকালবেলা যখন চা পান করছিল তখন সে তার স্বামীর পিছনে এসে দাঁড়ালো। "আমি তোমার প্যান্টের পকেটে এক টুকরো কাগজ পেয়েছি তাতে মেরিলো নাম লেখা, "ক্ষিপ্ত স্ত্রী জানতে চাইলো, "নিশ্চয়ই তোমার কাছে এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আছে।" "জান। তুমি শান্ত হও।" লোকটি জবাব দিল, "মনে করতে পার গত সপ্তাহে আমি ঘৌড়দৌড় মাঠে গিয়েছিলাম। এটা ছিল আমি যে ঘোড়ার উপর বাজি ধরেছিলাম তার নাম।" স্ত্রী কিছু বললো না। পরদিন সকালে গোপনে স্বামীর পিছনে এসে দাঁড়ালো এবং স্বামীর মাথায় সজোড়ে চাটি মারলো। স্বামী ক্ষেপে গিয়ে জানতে চাইলো কেন তাকে চাটি মারা হল। স্ত্রী জানালো, "তোমার ঘোড়া কাল রাতে ফোন করেছিল।" পরকীয়ার ফলে জন্ম নেয়া বাচ্চার পিতৃত্ব নিয়ে ঝামেলার গল্প বলি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন এমন ঝামেলায় অনেকেই জড়িয়েছে। হাতের কাছের উদাহরন ইতালীতে খেলার সময়ে ম্যারাডোনার ছেলের বাবা হওয়া। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে ম্যারাডোনা জুনিয়ারকে সে মেনে নিয়েছে। এবারে গল্পে আসি। এক লোক রাস্তার ধারে বসে চা খাচ্ছেন। হঠাৎ একটা বাচ্চা দৌড়ে এসে বললো, "প্লিজ সাহায্য করুন। আমার বাবা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছে।" ভদ্রলোক বাচ্চার পিছে পিছে গেলেন এবং দেখতে পেলেন দু'জন লোক মারামারি করছে। তিনি বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তোমার বাবা?" সে জবাব দিল, "আমি জানি না, কে আমার বাবা তা নিয়েই তো তারা মারামারি করছে।" এবারে পরকীয়ার ভয়াবহতা নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। ২০১৬ সালে স্ট্যাটিক ব্রেইন রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরকীয়ার উপর এক গবেষনা পরিচালিত হয়। এতে দেখা গেছে আধূনিক কালের মানুষের তার সংগীর সাথে অবিশ্বস্ততার এক করুন চিত্র। তার কিছু আপনাদের জন্যে তুলে ধরছি। যথা-- এক তৃতীয়াংশ বিয়ের স্বামী বা স্ত্রী বা উভয়ই শারিরীক বা মানসিকভাবে তার সংগীর সাথে অবিশ্বস্ত থাকে। শতকরা ২২ ভাগ পুরুষ এবং শতকরা ১৪ ভাগ নারী স্বীকার করেছে যে তারা তাদের সংগীর সাথে অবিশ্বস্ত ছিল। শতকরা ৩৬ ভাগ নারী পুরুষ তাদের সহকর্মীদের সংগে সম্পর্কিত ছিল। শতকরা ১৭ ভাগ নারী বা পুরুষ তাদের দেবর বা শ্যালিকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। যারা একবার পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তাদের পরবর্তীতে পরকীয়ায় লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৩৫০ ভাগ। ভুল নয় ঠিক পড়ছেন ৩৫০ ভাগ। বিযের দু'বছরের মধ্যেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। শতকরা ৩৫ ভাগ নারী পুরুষ সফরকালে পরকীয়ায় জড়িত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। শতকরা ১০ ভাগ পরকীয়া হয় অনলাইনে। অন লাইনের সম্পর্কের শতকরা ৪০ ভাগ বাস্তব জীবনের সম্পর্কে রূপ নেয়। এসব কারনে বুদ্ধিমান কেউ কেউ আগে থেকেই উত্তর পুরুষদের পরিবারের পরকীয়া ঠেকানোর জন্য অন্যরকম কিছু পদ্ধতিও ভেবে রাখেন। এবারে এমনই এক গল্প বলি। এক ইটালীয় মাফিয়া ডন মৃত্যু শয্যায় মুমূর্ষু অবস্থায় তার নাতিকে ডাকলো, "শোন। আমি চাই তুমি আমার ক্রমিয়ামের আস্তর দেওয়া . ৩৮ ওয়ালথার পিপিকে রিভলবারটি নাও যাতে মৃত্যুর পরও তুমি আমাকে মনে রাখো।" নাতি বললো, "কিন্তু দাদু, আমি তো এসব পিস্তল রিভলবার পছন্দ করি না। তারচেয়ে আমাকে তোমার রোলেক্স ঘড়িটা দিতে পার না?" "শোন সনি, ঘড়ি আমি দিতে পারি। কিন্তু তুমি জান, একদিন তোমাকে আমার এ ব্যবসায় চালাতে হবে। তোমার অনেক টাকা হবে। বিশাল বাড়ি হবে, সুন্দরী স্ত্রী হবে। হয়ত বাচ্চা কাচ্চাও হবে। একদিন হয়ত তুমি অসময়ে বাসায় ফিরবে। হয়ত বিছানায় তোমার স্ত্রীর সংগে অন্য কোন পুরুষকে পাবে। তখন তুমি করবে? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলবে, টাইমস আপ, সময় শেষ?" সবশেষে যারা পরকীয়ায় অভ্যস্থ তাদের জন্য একটা হুশিয়ারী গল্প বলে এ আখ্যান শেষ করতে চাই। ব্যবসায়ী জামশেদ সাহেব পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত আছেন। প্রায়ই তিনি ব্যবসায়ের কাজে বিদেশে যান। তো একবার তিনি ব্যবসায়ের কাজে নেপাল যাবার কথা বলে স্ফূর্তি করতে বান্ধবীর বাসায় উঠেছেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে বিমান দূর্ঘটনায় বিমানের সবাই মারা গেছে। ফলে তিনি আর বাসায় ফিরতে পারছেন না। সুতরাং যারা বিদেশে যাবার কথা বলে এরকম স্ফূর্তি টূর্তি করেন বা করবেন বলে মনস্থির করেছেন তাদের একটু সমঝে চলাই বোধহয় ভাল। নাহলে কখন কি হয়ে যায় আল্লাহ মালুম।

নোবেলজয়ী ডিলান: বাংলাদেশের মুক্তির মিছিলে হেঁটেছিলেন তিনিও

নোবেলজয়ী ডিলান: বাংলাদেশের মুক্তির মিছিলে হেঁটেছিলেন তিনিও

বাধন অধিকারী ০৮:৪৫ , অক্টোবর ১৩ , ২০১৬

বব ডিলান।বব ডিলান। বাংলাদেশের মহান ৭১’এর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী সংগীত কিংবদন্তি বব ডিলান। যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় পাকিস্তানের নারকীয় গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিলেও ব্যক্তি ডিলান রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে। ডিলান তাই বাংলাদেশের বন্ধু কিংবা স্বজন।
এই দেশের জন্ম আর বব ডিলানের আত্মা বাঁধা পড়েছে ঐতিহাসিকতার সুতোয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন ডিলান।
১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া বব ডিলান জীবন্ত কিংবদন্তি। তার সংগীত ক‌্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে মিনেসোটার এক কফি হাউজ থেকে। ষাটের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন যুদ্ধ বিরোধিতার অনন্য প্রতীক অথবা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
মার্কিন সমাজের অভ্যন্তরে জারি থাকা অন্যায্যতাগুলো উঠে আসে তার কথা-সুর-কণ্ঠে। চলমান ইতিহাসে নিজের সংগীতের দর্শনকে থিতু করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির মিছিলেও একদিন হেঁটেছিলেন তিনি। নোবেল জয়ের পর বাংলাদেশের দৃশ্যপটে ডিলান সেই একাত্তরের স্মৃতিকেই সামনে নিয়ে আসেন। মনে করিয়ে দেন ম্যাডিসন স্কয়ারের ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষে নিউ ইয়র্কে আয়োজিত হয় ওই কনসার্ট। যাতে জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে ছিলেন ডিলানও।  গেয়েছিলেন ‘আ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক আ ওমেন’সহ কয়েকটি গান।
‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মঞ্চে ডিলানের কণ্ঠে ‘জাস্ট লাইক আ ওমেন’:


মানবাত্মার বিজয়ধ্বনিই যেন সংগীত হয়ে উঠেছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামের ওই আয়োজনে। পরবর্তীতে এমন আরও অনেক মানবিক আয়োজনের প্রেরণা হয়েছিল ওই কনসার্ট।
পাকিস্তানি বর্বরতা থেকে মুক্তিপ্রত্যাশী এই ভূখন্ডের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে কনসার্টটির প্রভাব ছিলো অপরিসীম। বাংলাদেশের অস্তিত্ব আর পাকিস্তানি গণহত্যার প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক দুনিয়ার নজরে আনতে সমর্থ হয়েছিল কনসার্টটি। এর আয়োজক হিসেবে  রবি শঙ্কর পরে বলেছিলেন,  ‘এক অসাধারণ আয়োজন ছিল ওই কনসার্টটি। এক দিনের মধ্যেই, গোটা বিশ্ব বাংলাদেশের নাম জেনেছিলো।’
২০০৫ সালে দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ- এর ডিভিডি-সংক্রান্ত এক প্রকাশনায় ইউএসএ ফান্ড ফর ইউনিসেফের সভাপতি চার্লস জে. লিওনস জানান, কনসার্টের টিকিট থেকে প্রায় আড়াই লাখ ডলার সংগ্রহ হয়েছিল তখন।

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মঞ্চে বামে জর্জ হ্যারিসন ডানে বব ডিলান।‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মঞ্চে বামে জর্জ হ্যারিসন ডানে বব ডিলান। মানুষের জন্য গান করেছেন ডিলান। লোকসম্পদে খুঁজেছেন সংগীতের মুক্তির বারতা। আর নাগরিক অধিকার এবং যুদ্ধবিরোধিতায় তিনি গড়তে চেয়েছেন ন্যায় আর শান্তির এক বিশ্ব।
সুরের কোনও সীমানা থাকে না। ডিলানের সুর জাতিরাষ্ট্রের কাঁটাতারকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে থাকে মানুষের মুক্তির বারতা হয়ে। তার গান মুক্তিরই আরেক নাম। তাই তো দেশ পেরিয়ে বাংলাদেশের মুক্তির মিছিলেও সঙ্গী করতে পারে ডিলানের সুরধারাকে।
ষাটের দশকে ঝড় তোলা ডিলান গেয়েছিলেন, ‘How many roads must a man walk down, Before you call him a man?’ সত্যিকারের মানবীয় পৃথিবীর কল্পনা থেকে আমাদের বাস্তব পৃথিবীর দূরত্ব সেই প্রশ্নটি বারবার সামনে নিয়ে আসে।

ডিলান ও তার গান মানুষ হওয়ার অমসৃণ যাত্রাপথে আমাদের জীবনের প্রেরণা হয়ে থাকে।

বব ডিলানের সাম্প্রতিক ছবি।বব ডিলানের সাম্প্রতিক ছবি। সূত্র: দ্য ডন অব ইন্ডিয়ান মিউজিক ইন দ্য ওয়েস্ট নামের বইতে লেখা রবি শঙ্করের প্রবন্ধ ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, দ্য বাংলাদেশ রিডার: হিস্টরি কালচার অ্যান্ড পলিটিক্স, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

যেভাবে এলো বাঙালির বংশ পদবী!

যেভাবে এলো বাঙালির বংশ পদবী! খুব বেশি প্রাচীন নয়। মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমান্তরালে বাঙালির পদবীর বিকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ ব্যক্তি নামের শেষে একটি পদবী নামক পুচ্ছ যুক্ত হয়ে আছে। যেমন উপাধি, উপনাম কিংবা বংশসূচক নামকে সাধারণ ভাবে পদবী বলা হয়। বাঙালির জমি- জমা বিষয় সংক্রান্ত কিছু পদবী যেমন- হালদার, মজুমদার, তালুকদার, পোদ্দার, সরদার, প্রামাণিক, হাজরা, হাজারী, মন্ডল, মোড়ল, মল্লিক, সরকার, বিশ্বাস ইত্যাদি বংশ পদবীর রয়েছে হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের একান্ত রূপ। বাঙালি মুসলমানের শিক্ষক পেশার পদবী হলো-খন্দকার, আকন্দ, নিয়াজী ইত্যাদি। আর বাঙালি হিন্দুর শিক্ষক পদবী হচ্ছে দ্বিবেদী, ত্রিবেদী, চর্তুবেদী ইত্যাদি। এবার আপনাদের জানাবো বাঙালির কিছু বিখ্যাত বংশ পদবীর ইতিহাস। যেমন-শিকদার, সৈয়দ, শেখ, মীর, মিঞা, মোল্লা, দাস, খন্দকার, আকন্দ, চৌধুরী, ভুইয়া, মজুমদার, তরফদার, তালুকদার, সরকার, মল্লিক, মন্ডল, পন্নী, ফকির, আনসারী, দত্ত ইত্যাদি। শিকদারঃ সুলতানি আমলে কয়েকটি মহাল নিয়ে গঠিত ছিল এক একটি শিক। আরবি শিক হলো একটি খন্ড এলাকা বা বিভাগ। এর সাথে ফারসি দার যুক্ত হয়ে শিকদার বা সিকদার শব্দের উদ্ভব হয়েছে। এরা ছিলেন রাজস্ব আদায়কারী রাজকর্মচারী। শব্দকোষে যাকে বলা হয়েছে শান্তিরক্ষক কর্মচারী। এরা শিক বন্দুক বা ছড়ি বন্দুক ব্যবহার করতো বলে শিকদার উপাধী পেয়েছিল; সেই থেকে বংশ পরমপরায় শিকদার পদবীর বিকাশ ঘটে। anসৈয়দঃ সৈয়দ পদবী মূলত এসেছে নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা ও হযরত আলীর বংশ ধর থেকে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই বংশের সাথে কোনা যোগসূত্র না থাকলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান পরিবার সৈয়দ বংশ পদবী ব্যবহার করে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ও কুলীন মুসলমান বলে দাবি করে থাকেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে সৈয়দ পদবীর অপব্যবহার ও পক্ষেপণ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। প্রকৃত পক্ষে সৈয়দ নন এবং পারিবারিক কোন কুলীন পদবীও নেই, অথবা পূর্ব পদবী ঐতিহ্য পরিত্যাগ করতে ইচ্ছুক এমন অনেক বংশ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষে বাংলাদেশে সৈয়দ পদবী আরোপিতভাবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন। শেখঃ শেখ আরবি থেকে আগত পদবী। সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্মানসূচক বংশ পদবী শেখ। যিনি সম্মানিত বৃদ্ধ অথবা যিনি গোত্র প্রধান, তাকেই বলা হতো শেখ। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) সরাসরি যাকে বা যাঁদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তিনি বা তার বংশ ধরও শেখ নামে অভিষিক্ত হতেন অথবা শেখ পদবী লাভ করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে যারা শেখ পদবী ধারণ করেন, তারা এ রকম ধারণা পোষণ করেন না যে, তারা বা তাদের পূর্ব পুরুষরা এসেছিলেন সৌদী আরব থেকে। বাঙালি সৈয়দ পদবী ধারীদের থেকে শেখ পদবীধারীদের এখানে একটা মৌলিক তাৎপর্যগত পার্থক্য রয়েছে। শেখ পদবী গ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে ঐ পূর্বোক্ত চেতনা। নবীর হাতে মুসলমান না হলেও বাংলায় ইসলাম ধর্ম আর্বিভাবের সাথে সাথে যারা নতুন ধর্মকে গ্রহণ করে নেন; নও মুসলমান’ হিসেবে প্রাচীন ও মধ্যযুগে তারাই শেখ পদবী ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের বংশের উত্তর সূরীরাই শেখ পদবী ব্যবহার করে এসেছেন। এমনিতে অন্য ধর্মের লোকের কাছে মুসলমান মানেই শেখ বা সেক। কেউ কেই শেখ কেউ সেক কিংবা কেউ বা শেখ এর রূপান্তর শাইখও ব্যবহার করে থাকেন। মীরঃ মির বা মীর শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবি শব্দ আমীর’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে মীর। সেই অর্থে মীর অর্থ দলপতি বা নেতা, প্রধান ব্যক্তি, সরদার ইত্যাদি। জিতে নেয়া বা জয়ী হওয়া অর্থে মীর শব্দের ব্যবহার হতো। তবে মীর বংশীয় লোককে সম্ভ্রান্ত এবং সৈয়দ বংশীয় পদবীধারীর একটি শাখা বলে গাবেষকরা মনে করেন। মিঞাঃ মিঞা মুসলিম উচ্চ পদস্থ সামাজিক ব্যক্তিকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত সম্ভ্রম সূচক শব্দ। এক অর্থে সকল মুসলমানের পদবীই হচ্ছে মিঞা। বাঙালি হিন্দুর মহাশয়’ এর পরিবর্তে বাঙালি মুসলমান মিয়া শব্দ ব্যবহার করে থাকে। মিঞা’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। প্রভু বা প্রধান ব্যক্তি বুঝাতেও মিয়া শব্দের প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। তবে গ্রামীন প্রধান বা সর্দার অর্থের মিঞা পদবী হিসেবে বাঙালি মুসলমান সমাজে ঠাঁই পেয়েছে। মোল্লাঃ মোল্লা এবং মুন্সী বাঙালির দুটো জনপ্রিয় পদবী। তাদের প্রসার প্রায় দেশব্যাপী। বঙ্গীয় শব্দকোষ এ মোল্লা শব্দের অর্থ করা হয়েছে মুসলমান পুরোহিত। বস্তুত এভাবে মসজিদে নামাজ পরিচালনার কারনেও অনেকে মোল্লা উপাধি পেয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে, মোল্লা হচ্ছে তুর্কি ও আরবি ভাষার মোল্লা থেকে আগত একটি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ জ্ঞান বিশিষ্ট মহাপন্ডিত ব্যক্তি। অন্য অর্থে মুসলিম পন্ডিত বা ব্যবস্থাপক বা অধ্যাপক হলেন মোল্লা। পরবর্তী কালে মসজিদে নামাজ পরিচারলনাকারী মাত্রই মোল্লা নামে অভিহিত হতে থাকে। এখান থেকেই সাধারণত বংশ পদবী হিসেবে তা ব্যবস্থার হওয়া শুরু হয়। তাঁরা সকল জ্ঞানের জ্ঞানী না হওয়া সত্ত্বেও মোল্লা পদবী ধারণ করে। যার ফলে মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ প্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে। দাসঃ বাঙালি হিন্দু সমাজে দাস বা দাশ বংশ পদবীর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যে সমস্ত হিন্দু সম্পদায়ের মানুষ পদবীতে দাশ লিখেন তাদের পেশা ধীবর থেকে এসেছে বলে গবেষকরা মনে করেন। আর যারা দাস লেখেন তাদের পদবী স্রষ্টার ভূত্য চেতনা থেকে এসেছেন। খন্দকারঃ মুসলিম সমাজের ফারসি শিক্ষক হিসেবে খোন্দকার বা খন্দকারের পরিচয় পাওয়া যায় । অন্য দিকে খোন্দকারের ‘ পদবী এসেছে সামন্ত সমাজ থেকে পেশাজীবী হিসেবে। সাধারণ ভাবে খোন্দকার বা খন্দকার অর্থ হচ্ছে কৃষক বা চাষাবাদকারী । মনে করা হয় ফারসি কনদহ ‘ এর যার অর্থ কৃষি’সাথেকার যুক্ত হয়ে কনদহকার> খনদহকার>খন্দকার হয়েছে। ভিন্ন মতে, খন্দকারের মূল উৎপত্তি সংস্কৃত কন্দ> খন্দ যার অর্থ ফসল বলা হয়েছে। এই খন্দ এর সাথে কার যুক্ত হয়েও খন্দকার> খোন্দকার হতে পারে। এবং এতেও পূর্বের খন্দকার’ শব্দের উৎসের অর্থের তারতম্য ঘটছে না। আবার ফারসি ভাষায়, খোন্দকার বলে একটি শব্দ আছে যার অর্থ শিক্ষক। সেখান থেকেও খোন্দকার পদবী আসা বিচিত্র কিছু নয়। অথবা খোন্দকার শব্দের যে ভিন্নভিন্ন অর্থ তার সবগুলো মিলিত তাৎপর্য থেকেই বিভিন্নভাবে খন্দকার পদবীর উৎপত্তি হয়েছে। আখন্দঃ খন্দকার ও আখন্দ বা আকন সমার্থক। আখন্দ ও আকন নামে যে সব পদবী তাও সম্ভবত খন্দকার পদবীরই রূপভেদ। খন্দকার>আখন্দ> আকন হয়ে থাকতে পারে। আবার ফারসি আখুন্দ থেকেও আখন্দ এসে থাকতে পারে। যার অর্থ শিক্ষক। তবে আকন্দ এসেছে আখন্দ থেকেই। চৌধুরীঃ সংস্কৃত চতুধারী শব্দ থেকে এসেছে বাংলা চৌধুরী শব্দ। এর অর্থ চর্তুসীমানার অন্তগর্ত অঞ্চলের শাসক। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জমিদারদের পদবী হচ্ছে চৌধুরী। আবার অনেকে মনে করেন চৌথহারী’ যার অর্থ এক চতুথাংশ রাজস্ব আদায়কারী, সেখান থেকে উচ্চারণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে চৌধুরী’। সেদিক থেকে চৌথ আদায়কারী বা রাজস্ব আদায়কারী পদ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বঙ্গীয় শব্দকোষ বলছে, চতুর’ যার অর্থ তাকিয়া বা মসনদ, তার সাথে যুক্ত হয়েছে ধর’ (অর্থ ধারক) এবং এই দুয়ে মিলে হয়েছে চৌধরী’ আর তার থেকেই চৌধুরী’। তবে তা মূলত হিন্দী ও মারাঠি শব্দ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে চৌধুরী বংশ পদবী ব্যবহার করা হয় এদেশে। বৃটিশ-ভারতের প্রায় সর্বত্র এ পদবীর অস্তিত্ব ছিল। কারণ চৌধুরী ছিল সামন্ত রাজার পদবী। ভূঁইয়াঃ এই বংশ পদবীটি এসেছে খোদ ভূমির মালিকানা অর্থ থেকে। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় এর মধ্যে এ পদবীর প্রচলন আছে। বাঙালি হিন্দু সমাজে যাঁরাই ভৌমিক’ বাঙালি মুসলমান সমাজে তারা ভূঁইয়া’ হিসেবে পদবী ধারণ করেছেন। মূল সংস্কৃত শব্দ ভৌমিক > (প্রাকৃত) ভূমিকা > (বাংলা) ভূঁইয়া > থেকে ভূঁইয়া বা ভূঁঞা এসেছে। প্রাচীন বড় জমিদার বা সামন্ত রাজার উপাধিও ছিল ভূঁইয়া। প্রকৃত পক্ষে কুলীন বংশ পদবীই ছিল তা। আবার যে সব মানুষ আগে স্থান বিশেষে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি ও চাষাবাদের পত্তন করেছে তারা স্থানীয় জমিদার রাজার কাছ থেকে ভূঁইয়া নামে অভিহিত হয়ে ঐসব জমি জমার স্বত্ব লাভ করেছে। মজুমদারঃ মজুমদার’ পদবী মূল আসলে মজুনদার’। এর মূল ফারসি শব্দ হচ্ছে মজমু আনদার’। রাষ্ট্রের ও জমিদারির দলিল পত্রাদির রক্ষক রাজকর্মচারীর জন্যে এই পদবী সংরক্ষিত ছিল। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশে মজুমদার’ পদবীর ব্যবহার লক্ষনীয়। তরফদারঃ আরবি তরফ’ এবং ফারসি দার’ মিলে তরফদার শব্দের সৃষ্টি। রাজ্যের খাজনা আদায়ের মহালে তদারককারী বা খাজনা আদায়কারীর উপাধী ছিল তরফদার। এই পদবী ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর পূর্ব পুরুষরা রাজকার্য পরিচালনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, সেখান থেকেই এই বংশ পদবী উৎপত্তি ও প্রচলন। অন্যমতে তরফদার তরফের রাজস্ব আদায়কারী লোক; তরফের মালিক; পদবী বিশেষ। তালুকদারঃ আমাদের দেশে পরিচিত একটি বংশ পদবী। বাংলাদেশে জমিদারির পরই তালুক ভূ-সম্পত্তির একটি বিভাগ। মোগল ও বৃটিশ আমলে রাজস্ব ও ভুমি সংক্রান্ত বিষয়াদি থেকে যে সমস্ত পদবীর উৎপত্তি ও বিস্তার তার মধ্যে তালুকদার’ হচ্ছে অন্যতম পদবী। তালুক’ শব্দ থেকেও এই পদবীর মর্মাথ উপলব্ধি করা সম্ভব। আরবি শব্দ তা’ আল্লুক’ যার অর্থ ভূ-সম্পত্তি এবং এর সাথে ফারসি দার’ যুক্ত হয়ে (তা’আল্লুক+দার) তালুকদার’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে, যিনি তালুকদার, তিনি জমি ও ক্ষুদ্র ভূ-সম্পত্তি বন্দোবস্ত নিতেন সরকারের কাছ থেকেও যেমন, তেমনি জমিদারের কাছে থেকেও। ফলে তিনি হতেন উপজমিদার সেই অর্থেই এসেছে তালুকদার’। সরকারঃ সরকার’ শব্দটি ফারসি থেকে আগত। এর অর্থ প্রভূ, মালিক, ভূস্বামী, শাসনকর্তা, রাজা। অর্থ আদায় ও ব্যয় সংক্রান্ত কর্মচারি ও সরকার। মোগল আমলে এদেশের স্থানীয় রাজকর্মচারিদের এ পদবী দেয়া হতো। মোট কথা প্রধান কর্মচারি এবং সম্পত্তি দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে সরকার বলা হতো। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই এ পদবীর ব্যবহার আছে। মল্লিকঃ আরবি মালিক’ বা মলিক’ শব্দ থেকে এসেছে মল্লিক’ বংশ পদবী। ফারসি মালিক শব্দজাত মল্লিক ভূম্যাধিকারী বা জোতদারের উপাধি। গ্রাম প্রধান বা সমাজের প্রধান ব্যক্তি মালিক। আবার লিপিকুশল রাজকর্মচারিকে মোগল আমলে মল্লিক বা সুলেখক আখ্যা দেয়া হত বলেও আমরা জানতে পারি। হয়তোবা সেই থেকে মল্লিক বংশ পদবী এসেছে। মন্ডলঃ বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সমাজে সমান ভাবে ব্যবহৃত হয় মন্ডল পদবী। বাংলাদেশে অতীত কাল থেকে গ্রামের অনানুষ্ঠানিক এবং সাধারণ ভাবে গ্রাম- প্রধানকে বলা হয় মন্ডল। বাংলা মন্ডলরা আগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। মন্ডলীয় কাজ করে তারা অনেক অধিকার ভোগ করতেন। খাজনা আদায়কারী ও রায়তদের মধ্যস্থতা করা কিংবা গ্রামীন বিবাদ আপোস মীমাংসা করতে মন্ডলরা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন। কোন কোন সময় তাদের অধীনে পাটোয়ারি, তহসিলদার, চৌকিদার ইত্যাদি কর্মচারী কাজ করতেন। সরকার ও রায়তদের মধ্যবর্তী মানুুষ হিসেবে মন্ডলরা অধিক পরিচিত ছিল। ফকিরঃ মুসলমানদের মধ্যে সন্ন্যাসবৃত্তি’ থেকেই এসেছে ফকির’ পদবী। মরমী সাধকরা গ্রহণ করতেন ফকির’ পদবী। এটি আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ নি:স্ব। আবার আরবি ফকর শব্দের অর্থ দারিদ্র। এ থেকে ফকির শব্দের উৎপত্তি। ফকির এবং পার্শি দরবেশ ব্যক্তিগণ সাধারণত এদেশে ফকির নামে পরিচিত। বিশেষ কোন ধর্ম মতের একান্ত অনুসারী না হয়ে যারা সকল ধর্মের মূলনীতি নিয়ে আত্মতত্ত্বের সন্ধান করেন তাদেরকেও ফকির বলা হয়। আবার সুফি বা বাউল তত্বের ধারকরাও ফকির। ঠাকুরঃ বাংলা শব্দের বিশেষজ্ঞ হরিচরণ বন্দ্যোপধ্যায়ের মতে- ঠাকুর শব্দের মূল হচ্ছে (সংস্কৃত) ঠাক্কুর’ তার থেকে > (প্রকৃত) ঠকুর > (বাংলা) ঠাকুর এসেছে। পদবীগত দিক থেকে তা ব্রাক্ষণের পদবী বিশেষ, এমনকি ক্ষত্রিয়েরও উপাধি এটি। মধ্য যুগের কাব্য চৈতন্য ভাগবত’ উদ্ধৃত করে লেখক বলেছেন, তা বৈঞ্চবেরও উপাধি। যেমন, হরিদাস ঠাকুর। পাচক ব্রাক্ষণও এক প্রকার ঠাকুর বলে পরিচিত। তবে আহমদ শরীফ সম্পাদিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান’ বলছে, সংস্কৃত ঠক্কুর থেকে ঠাকুর আসলেও এর মূলে ছিল তুর্কী শব্দ। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এই পদবী ব্যবহার করে। এরকম শতাধিক বংশ পদবী রয়েছে আমাদের দেশে। বাঙালির পদবীর ইতিহাস বৈচিত্র পথ ও মতের এক অসাধারণ স্মারক হিসেবে চিহিৃত। (তথ্য সুত্র somewhereinblog)

চির রহস্যময় এক কিংবদন্তী-খনা!

চির রহস্যময় এক কিংবদন্তী-খনা! image জাভিদ হাসান: অবাক হওয়া আর মুগ্ধ হওয়ার সেই ছেলেবেলা থেকেই আমি এই দুই বিশেষ রোগে আক্রান্ত। আমার বাসার মানুষজন, আতœীয়-স্বজনেরা আমার সেই রোগের লক্ষণ সম্পর্কে এতই ওয়াকিবহাল যে আমি যদি আমার কোনো পরম বিস্ময়কর ঘটনা নিয়ে চরম বিস্মিত হয়ে কাউকে কিছু বলতে যাই বা অসম্ভব মুগ্ধ হয়ে কাউকে তা জানাতে যাই, শোনার আগেই সবাই দূর দূর করে ওঠে, “যা যা হইছে! এইটা কোনো অবাক হবার মত ব্যাপার হলো?” যাইহোক, তারপরও আমি নিশ্চিৎভাবে বলতে পারি ছোটবেলায় যে কেউই আমার মতই বিস্মিত হয়েছিলেন তার কথা শুনে। আমার অসংখ্য চিরবিস্ময়, চির ভালোলাগার, ভালোবাসার অদেখা অজানা সেই মানুষটি একজন নারী। পৃথিবীর অসংখ্য রহস্যময়ী নারীকুলের মাঝেও তিনি আমার চোখে অনন্যা একজন। আমার চোখে তার শ্রেষ্ঠত্বের দিকটি তার বুদ্ধিমত্তা। তার সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে তাকে আমার ‘অলৌকিক’ কোনো রহস্যময়ী নারী বলেই মনে হত। আমার ছোট্ট মাথায় কিছুতেই ঢুকতোনা কি করে এমন অবলীলায় ভবিষ্যৎ গণে বলে দেয়া যায়। তাও আবার শুধু আগামীর কথা বলে দেয়াই নয়। রীতিমত তা ছড়া ও ছন্দে! তার মানে একাধারে তিনি ছড়াকার, জ্যোতিষী, অতীব বুদ্ধিমতী, রহস্যময়ী একজন রমণী। এতক্ষণে নিশ্চয় সবাই বুঝে গেছেন কার কথা বলতে আমিও এত রহস্য করলাম। তিনি বিরল প্রতিভার অধিকারী, রহস্যের আঁধার, নিখুঁত ভবিষ্যৎ বক্তা, ছড়াকার খনা বা ক্ষণা। তার আবহাওয়া , জ্যোতিষ ও ভূ-তত্ব ভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে বলা বচনগুলো সবই অদ্ভুত রকমের নির্ভুল এক বিস্ময়। খনা এক কিংবদন্তীর নাম। তাকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানারকম কাহিনী। তার আবির্ভাব সম্পর্কে সঠিকভাবে তেমন তথ্য জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয় ৮শ’ থেকে ১২শ’ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তার আবির্ভাব ঘটেছিল। কিংবদন্তী অনুযায়ী তাঁর বসবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে। শোনা যায় তাঁর পিতার নাম ছিল অনাচার্য । সে সময় চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরে বাস করতেন খনা। এক শুভক্ষণে জন্ম হওয়ায় তার নাম দেওয়া হয় ক্ষণা বা খনা। কথিত আছে তার আসল নাম লীলাবতী আর তার ভবিষ্যত বাণীগুলোই খনার বচন নামে বহুল পরিচিত। আবার আরও এক কিংবদন্তী বলে খনা ছিলেন সিংহলরাজের কন্যা। তখন বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহ (উপমহাদেশের প্রাচীন রাজ্য অবন্তী তথা উজ্জয়নীর রাজা হর্ষ-বিক্রমাদিত্যের রাজপ্রাসাদে প্রধান জ্যোতির্বিদ ছিলেন বিখ্যাত পন্ডিত বরাহ) তার শিশুপুত্র মিহিরের জন্ম লাভের পর গণনা করে দেখেন যে তাঁর আয়ু মাত্র এক বছর। তাই শিশুটিকে তিনি একটি পাত্রে করে সাগরের জলে ভাসিয়ে দেন। পাত্রটি ভাসতে ভাসতে সিংহল দ্বীপে পৌঁছায় এবং সিংহল রাজ তাকে লালন-পালন করেন। বড় হবার পর সিংহল রাজা যুবক মিহিরকে খনার সাথে বিয়ে দেন। সেখানে ধীরে ধীরে মিহির ও খনা জ্যোতিষ শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করতে থাকেন। আবার আরেক কাহিনীতে শোনা যায়, সাগরে ভাসতে ভাসতে শিশু পুত্রটি চলে যায় অনেক দূরের এক রাজ্যে, সাগর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে রাক্ষস সম্প্রদায়। বড় হতে থাকে রাক্ষসদের মধ্যে। ষোল বছর বয়সে ক্ষুরধার বুদ্ধির এক রাক্ষস মেয়ের প্রেমে পড়ে ও বিয়ে করে তাকে। মেয়েটি তার জ্যোতির্জ্ঞান প্রয়োগে জানতে পারে তার স্বামী মিহির উজ্জয়নীর বিখ্যাত পন্ডিত বরাহের পুত্র। একদিন দুজন মিলে রওয়ানা দেয় উজ্জয়নীর পথে। পুত্র-পুত্রবধূর পরিচয় পেয়েও রাজপ্রাসাদে তাদের গ্রহণ করতে চাইলেন না বরাহ। কারণ তিনি তার গণনায় অনেক আগেই জানতে পেরেছিলেন যে, এক বছর বয়সেই তাঁর পুত্র মিহিরের মৃত্যু ঘটবে। খনা তখন তাঁর একটি বচন দিয়ে শ্বশুরের গণনা ভুল প্রতিপন্ন করেন- ‘কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন।’ তার মানে এ গণনায় মিহিরের আয়ু ১শ’ বছর। পন্ডিত বরাহ তখন উৎফুল্ল চিত্তে খনা ও মিহিরকে গ্রহণ করেন। কৃষিকাজে খনার ছিল অগাধ জ্ঞান আর গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে আবহাওয়ার চমৎকার পূর্বাভাস দিতে পারত সে। উজ্জয়ীনির কৃষকরা ব্যাপক উপকার লাভ করে তার কাছ থেকে, আর তা দেখে রাজা বিক্রমাদিত্য মেয়েটিকে তার রাজ্যের দশম রতœ হিসেবে আখ্যা দেন। মেয়েটির জ্ঞানে সারা রাজ্য, রাজপ্রাসাদের অমাত্যবর্গ মুগ্ধ হয়ে পড়ে, পন্ডিত বরাহের মূল্য কমে যায়। একদিন বরাহ জনসমক্ষে এক বিতর্কে পুত্রবধূর হাতে পরাস্ত হন। ঈর্ষাপরায়ণ বরাহ চতুর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পুত্রকে আদেশ দেন মেয়েটির জিহ্বা কেটে ফেলতে যাতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় তার কন্ঠ। পরম পিতৃভক্ত পুত্র সে আদেশ পালন করেন। শোনা যায় খনার সেই কর্তিত জীহ্বা টিকটিকি খেয়ে ফেলায় টিকটিকির মাঝেও খনার সেই অপরিসীম গুণাবলীর কিছু ছায়া আমরা আজও দেখতে পাই। যে কোন কথার মাঝে টিকটিকি যখন বলে ‘টিকটিক, তার মানে ঠিকঠিক ’। বিজ্ঞজনের মত, সে সায় দিয়ে যায় সে কথাটির সত্যতায়।এছাড়াও এমনটিও কথিত আছে যে, বৌ- শাশুড়ির দ্বন্ধও খনার জীহ্বা কেটে নেয়ার জন্য আরও একটি কারণ হতে পারে। সে যাই হোক, পরবর্তীতে নাকি খনা আর বেশি দিন বাঁচেনি। এমন একজন বুদ্ধিমতী রমণীর এমন মর্মান্তিক অকাল প্রয়াণ কিছুতেই মেনে নেবার মত নয় ও রীতিমত দুঃখজনক ঘটনা। তারপরও তার মৃত্যু কেড়ে নিতে পারেনি তার যথার্থ সম্মানকে । গ্রাম বাংলা ও শহুরে পরিবেশে প্রায়ই আমরা খনা ও তার বচনকে আজও স্মরণ করি। কলকাতা শহরের ৪০ কিলোমিটার উত্তরপূর্বে বারাসাত নগরীর কাছে বীরচম্পা নামক স্থানে দেখা যায় প্রাচীন এক ভগ্নাবশেষ! ধারণা করা হয়, এখানেই ছিল রাজা চন্দ্রকেতুর প্রাসাদ। কৃষিকাজ বা অন্যান্য খননকাজে মাটির নীচ থেকে প্রায়ই বেরিয়ে আসে নানা প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন মুদ্রা, পুঁতি, পাথর ও পোড়ামাটির ভাস্কর্য। এখানেই, মহাসড়কের উত্তর পাশে শায়িত সমাধিফলকের মত শুয়ে রয়েছে এক ইটের স্থাপনা। বহুভুজাকৃতির উঁচু এই স্থাপনাটি কৌতূহল জাগানোর মত উত্তর-দক্ষিণে সুবিন্যস্ত , এছাড়া পাশে রয়েছে আরো কিছু স্থাপনা। এটিই খনা-মিহিরের থান নামে পরিচিত। খনা সম্পর্কে যত রকম গল্পই প্রচলিত থাকুক না কেনো সব গল্পের শেষেই তার করুণ মৃত্যুর কারণ তার অসাধারণ প্রজ্ঞা। যার কারণে ঈর্ষার শিকার হতে হয়েছিলো এই অসাধারণ মানুষটিকে। খনার কিছু বচন…. ১)মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা ২)কলা রুয়ে না কাটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত ৩)ব্যাঙ ডাকে ঘন ঘন, শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান ৪)আকাশে কোদালীর বাউ। ওগো শ্বশুর মাঠে যাও।। মাঠে গিয়া বাঁধো আলি। বৃষ্টি হবে আজি কালি।। ৫)যদি হয় সুজন এক পিঁড়িতে নয় জন। যদি হয় কুজন নয় পিঁড়িতে নয় জন ৬) শোল বোয়ালের পোনা যার যারটা তার তার কাছে সোনা। ৭))পরের বাড়ির পিঠা খাইতে বড়ই মিঠা ৮)কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস! ৯)চোরের মার বড় গলা লাফ দিয়ে খায় গাছের কলা ১০)নদীর জল ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো ১১) দক্ষিণ দুয়ারি ঘরের রাজা উত্তর দুয়ারি তাহার প্রজা। পূর্ব দুয়ারির খাজনা নাই পশ্চিম দুয়ারির মুখে ছাই।। ১২)ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী, শোন পতির পিতা, ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা। রাজ্য নাশে, গো নাশে, হয় অগাধ বান, হাতে কাটা গৃহী ফেরে কিনতে না পান ধান। ১৩)কি করো শ্বশুর লেখা জোখা, মেঘেই বুঝবে জলের রেখা। কোঁদাল কুড়–লে মেঘের গাঁ, মধ্যে মধ্যে দিচ্ছে বা। কৃষককে বলোগে বাঁধতে আল, আজ না হয় হবে কাল। ১৪)সাত পুরুষে কুমারের ঝি, সরা দেইখা কয়, এইটা কি? ১৫) ফল খেয়ে জল খায় যম বলে আয় আয়। (ক) ‘খনা বলে শুন কৃষকগণ/ হাল লয়ে মাঠে বেরুবে যখন/ শুভ দেখে করবে যাত্রা/ না শুনে কানে অশুভ বার্তা।/ ক্ষেতে গিয়ে কর দিক নিরূপণ/ পূর্ব দিক হতে হাল চালন/ নাহিক সংশয় হবে ফলন।’ (খ) ‘খনা বলে শুনে যাও,/ নারিকেল মূলে চিটা দাও।/ গাছ হয় তাজা মোটা,/ তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।’ (গ) ‘পূর্ণিমা অমাবস্যায় যে ধরে হাল,/ তার দুঃখ হয় চিরকাল।/ তার বলদের হয় বাত,/ তার ঘরে না থাকে ভাত।/ খনা বলে আমার বাণী,/ যে চষে তার হবে জানি।’ (ঘ) ‘খনা বলে চাষার পো,/ শরতের শেষে সরিষা রো।’ (ঙ) ‘বৎসরের প্রথম ঈষাণে বয়,/ সে বৎসর বর্ষা হবে খনা কয়।’ (চ) ‘উঠান ভরা লাউ শসা,/ খনা বলে লক্ষ্মীর দশা।’ (ছ) ‘খনা ডাকিয়া কন,/ রোদে ধান ছায়ায় পান।’ (জ) ‘ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী, শোন পতির পিতা,/ ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা।/ রাজ্য নাশে, গো নাশে, হয় অগাধ বান,/ হাটে কাটা গৃহী ফেরে কিনতে না পান ধান।’ (ঝ) ‘ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা,/ তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।/ খনার বচন, মিথ্যা হয় না কদাচন।’ (ঞ) ‘মাঘ মাসে বর্ষে দেবা,/ রাজায় ছাড়ে প্রজার সেবা।/ খনার বাণী,/ মিথ্যা না হয় জানি।’ (ট) ‘ধানের গাছে শামুক পা,/ বন বিড়ালী করে রা।/ গাছে গাছে আগুন জ্বলে,/ বৃষ্টি হবে খনায় বলে।’ (ঠ) ‘কচু বনে ছড়ালে ছাই,/ খনা বলে তার সংখ্যা নাই।’ (ড) ‘যে গুটিকাপাত হয় সাগরের তীরেতে,/ সর্বদা মঙ্গল হয় কহে জ্যোতিষেতে।/ নানা শস্যে পরিপূর্ণ বসুন্ধরা হয়,/ খনা কহে মিহিরকে, নাহিক সংশয়।’ দিনে জল রাতে তারা, এই দেখবে খরার ধারা। অর্থঃ বর্ষার শুরুতে যদি দিনে বৃষ্টিপাত হয় আর রাতের আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে সে বছর খরা হবে। আষাঢ় নবমী শুক্ল পক্ষা, কি কর শ্বশুর লেখা জোখা যদি বর্ষে মুষল ধারে, মাঝ সমুদ্রে বগা চড়ে যদি বর্ষে ছিটে ফোটা, পর্বতে হয় মীনের ঘটা যদি বর্ষে রিমঝিমি, শস্যের ভার না সহে মেদেনী হেসে সূর্য বসেন পাটে, চাষার বলদ বিকোয় হাটে। অর্থঃ আষাঢ় মাসের প্রথম চাঁদের শুক্ল পক্ষের নবমীর দিন অর্থাৎ চন্দ্র মাসের নয় তারিখে যদি মুষল ধারে বৃষ্টি হয় তাহলে বর্ষা কম হবে। যদি সামান্য ছিটে ফোটা বৃষ্টি হয় তাহলে বর্ষা বেশী হবে। সেদিন মাঝারী বৃষ্টিপাত হলে ফসলের উৎপাদন ভালো হবে আর যদি আদৌ বৃষ্টি না হয় তাহলে সেবছর ভালো ফসল হবেনা। স্বর্গে দেখি কোদাল কোদাল মধ্যে মধ্যে আইল ভাত খাইয়া লও শ্বশুর মশাই বৃষ্টি হইবে কাইল। অর্থঃ যদি ছোট ছোট খন্ড খন্ড মেঘে আকাশ ভর্তি থাকে তাহলে পরদিন বৃষ্টি হবে। চৈতে কুয়া ভাদ্রে বান, নরের মুন্ড গড়াগড়ি যান। অর্থঃ চৈত্র মাসে কুয়াশা অথবা ভাদ্রমাসে বন্যা দেখাদিলে মহামারী হয়। যদি ঝরে কাত্তি, সোনা রাত্তি রাত্তি যদি ঝরে আগন, হাতে কুলায় মাগন। অর্থঃ কার্তিক মাসে বৃষ্টি হলে ধানের উৎপাদন ভালো হয়। আর অগ্রহায়ণে বৃষ্টি হলে ধান নষ্ট হবে। জৈষ্ঠ্যে শুখা আষাঢ়ে ধারা, শস্যের ভার সহে ধরা। অর্থঃ জৈষ্ঠ্যমাসে প্রচন্ড খরা হলে আষাঢ় মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর প্রচুর ফসল ফলবে। পশ্চিমে ধনু নিত্য খরা, পূর্বে ধনু বর্ষে ধারা। অর্থঃ পশ্চিমে রংধনু দেখা গেলে সেটা খরার লক্ষণ আর পুবে রংধনু দেখা গেলে বৃষ্টিপাতের লক্ষণ। দূর সভা নিকট জল, নিকট সভা রসাতল। অর্থঃ চন্দ্রসভা বা চাঁদের চারিদিকে মেঘের বৃত্ত বড় হলে তাড়াতাড়ি প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে আর চন্দ্রসভা ছোট আকৃতির হলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম। ধানের গাছে শামুকের পা, বন বিড়ালী করে রা গাছে গাছে আগুল জ্বলে, বৃষ্টি হবে খনায় বলে। অর্থঃ শামুক ধান গাছ বেয়ে উপরে উঠতে থাকলে শিঘ্রই প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। আমে ধান, তেতুলে বান। অর্থঃ যে বছর আম বেশী ফলে সেবছর ধানও বেশী হয়। যেবছর তেতুল বেশী ফলে সে বছর ঝড় বন্যা বেশী হয়। বিয়ানে আউলি বাউলি, দুপুরে বাউ, দিনে বলে খরানের ঘর যাও। অর্থঃ সকালে মেঘলা আকাশ দুপুরে প্রবল বাতাস খরার লক্ষণ। চাঁদের সভায় বসে তারা, জল পড়ে মুষল ধারা। অর্থঃ চন্দ্রসভার ভেতরে তারা দেখা গেলে মুষল ধারায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগে পাছে ধনু চলে মীন অবধি তুলা মকর মুম্ভ বিছা দিয়া কাল কাটায়ে গেলা। অর্থঃ পৌষ মাসের ৩০ দিন কে ১২ ভাগে ভাগ করলে প্রতি ভাগে আড়াই দিন করে পরে। এর প্রথম ও শেষ সোয়া দিন পৌষের জন্য রেখে প্রথম সোয়া দিনের থেকে প্রতি আড়াই দিন ক্রমে মীন অর্থ্যাত চৈত্র মাস থেকে প্রতি মাসের জন্য গণনা করতে হবে। পৌষের এই ভাগ সমুহের ক্রমে যে আড়াই দিনে যেরুপ আবহাওয়া থাকবে সেই মাসেও তদ্রপ আবহাওয়া হবে। সবশেষে বলি, মূলত এই বচনটি থেকেই খনাকে চেনার সূচনা আমার। মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় এই বচনটি দিয়েই দাদীর মুখে শুনেছিলাম প্রথম তার কথা। আর এটাও জানি তার এত শত অমর বচন ছড়িয়ে রয়েছে আজও গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে মুখে, যার শেষ কখনও হবেনা যতদিন পৃথিবী জেগে রইবে। প্রখর বুদ্ধিমতী, জ্যোতিষবিদ, কিংবদন্তীর এই জ্ঞানী-গুণী মানুষটির প্রতি তাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। সূত্র: পত্রদূত

নোবেল পুরস্কার কে ঘিরে চলমান বিতর্কঃ আলোচনায় রেজা সাত্তারের ‘সিজ নোবেল...

Reza Satter Ekush News Media 1নোবেল পুরস্কার কে ঘিরে চলমান সকল বিতর্ককে আরেক ধাপ এগিয়ে নিলেন বাংলাদেশি কানাডিয়ান রেজা সাত্তার। সম্প্রতি তিনি আলোচনায় এসেছেন একটি ভিন্নধর্মী বই লিখে। বইটির নাম ‘সিজ নোবেল ফাউন্ডেশন’ । নোবেল পুরস্কার কে ঘিরে চলমান সকল বিতর্ককে এই বই যেনো আরেকদফা উস্কে দিলো। প্রকাশের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেবলমাত্র আমাজন ডটকম থেকে বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কপি www.amazon.com/rezasattar। এটি অবশ্যই একটি বিরল অর্জন। বাংলা ভাষা সহ আরো ১২টি ভাষায় এই বইটি অনুদিত হবার অপেক্ষায় আছে।  তার এই বইটি নিয়ে গত ২২ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় টরন্টোর সিজলিং রেষ্টুরেন্টে আয়োজন করা হয় প্রকাশনা উৎসবের।

প্রকাশনা উৎসবের শুরুতে লেখক রেজা সাত্তার এই বই প্রকাশের পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এই বইটি লেখার আগে আমি প্রচুর পরিমাণে গবেষণা করেছি। প্রচুর তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। নোবেল ফাউন্ডেশনের ইতিহাস ও সকল কার্যক্রম নানাভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছি। মানবজাতির কল্যাণ কিংবা বৃহত্তর স্বার্থে কখনোই নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় না। নানামুখি রাজনৈতিক ও পাশ্চাত্যের হীনস্বার্থ হাসিলের জন্যেই এই পুরস্কারকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রেজা সাত্তার আরো বলেন, নর্থ আমেরিকার প্রচুর পাঠক এই বইটি কিনছেন এবং নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।  কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। Reza Satter Ekush News Media 2‘সিজ নোবেল ফাউন্ডেশন’ বইটির ওপর আলোচনায় অংশ নেন বাংলামেইল প্রকাশক ও গ্রেটার ফরিদপুর এসোসিয়েশনের সভাপতি রেজাউল কবির, দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ও বাংলামেইল সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু, বাংলামেইল ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও গ্রেটার ফরিদপুর এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোহাম্মদ, নিকাসের কয়েস আহমেদ, মো: জহিরুল ইসলাম, প্রকৌশলী ও ফরিদপুর এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক নওশের আলী, সংগঠক রাসেল রহমান, কম্পিউটারবিদ কাঞ্চন সুতার, বুয়েটের সাবেক শিক্ষক আবেদা শামীমা এবং তরুণ ক্রিটিক রেনাশ সাত্তার। বক্তারা বলেন, রেজা সাত্তারের এই বই নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে। আমরা তাকে স্বাগত জানাই। আশা করি আগামীতে তিনি আরো সমৃদ্ধ বই আমাদেরকে উপহার দেবেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন ডা: শম্পা। অনুষ্ঠান শেষে ছিলো নৈশভোজ ও সঙ্গীত পরিবেশনা। কানাডা প্রবাসী রেজা সাত্তার পেশায় একজন প্রকৌশলী। Reza Sattar একুশ নিউজ মিডিয়া Reza Sattar একুশ নিউজ মিডিয়া লস এঞ্জেলেস
LINK ;-
Member of Canadian Author Association.
সূত্রঃ বেঙ্গলি টাইমস ডটকম #সিজ নোবেল ফাউন্ডেশন

ভয়: শিশুদের মগজ ধোলাই

ভয় কাজী রহমান অবিশ্বাস্য! শিশুর খুব কাছের মানুষ যারা তারাই করে এই অন্যায়। জন্ম থেকে যারা সব’চে আপন তারাই শিশুর মাথায় ঢোকায় ভয়। ভুত, পেত্নী জ্বীন, রাক্ষসের ভয়। ঈশ্বর, আল্লা, গড, দেবতা ইত্যাদির ভয়। পরকালে আত্মাকে শাস্তি দেবার ভয়। দোজখের ভয়। নিঃসঙ্কোচে এবং দ্বিদ্ধাহীন চিত্তে এসব করে চলেছে তারা বংশ পরম্পরায়, যুগ যুগান্ত ধরে। কেই কেউ বলেন মা বাবারাই শিশু নির্যাতন করে। যে মা বাবারা শিশুকে ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস করায় রূপকথার মত গায়েবী নানান ধর্ম, যুক্তি প্রমানের তোয়াক্কা না করে, সেই মা বাবারাই আবার তাদের শিশুকে দেয় কঠিন শাস্তি যদি সন্তান দুই আর দুই যোগফল এর উত্তর ভুল করে ফেলে। অথচ ধর্মের বেলায় যোগফলের উত্তর অগ্রাহ্য করে শিশুকালেই শেখানো হয় ধর্মের অদেখা, অজানা অদ্ভুতকে প্রশ্ন করা ক্ষমাহীন ভয়ঙ্কর পাপ। লক্ষ লক্ষ বছর পুড়তে হবে নরকের আগুনে। কে শেখায়? সেই একই মা বাবারা। ভয় দেখিয়ে ধর্ম মানতে বাধ্য হবার এমন মগজ ধোলাই করেই চলেছে মা বাবা কাছের মানুষরা। ধর্ম ছাড়া অন্য সব কিছুতে কিন্তু যুক্তির ছাড় নেই। অথচ ধর্মের ব্যপারে যুক্তি মানা যাবে না, প্রশ্ন করা যাবে না একেবারেই। শুধু ভয় করতে হবে। সত্য মিথ্যা যাঁচাই করার চেষ্টাও করা যাবে না। মগজ ধোলাই করে শিশুমনে ধর্মভয় ঢোকায় মা বাবারাই, কাছের মানুষ, মগজধোপা’রাই। মা, বাবা কাছের মানুষ বলতে বোঝাচ্ছি বেশির ভাগ মা বাবা কাছের মানুষদের। ব্যতিক্রমী অনেক সচেতন, উদারমনা এবং মুক্ত মনের সোনার মানুষ রয়েছেন; যারা খুব ভালো ভাবেই বড় করে চলেছেন তাদের শিশুদের। এরা দায়িত্বশীল সুন্দর মানুষ। প্রানপনে চেষ্টা করে চলেছেন গতানুগতিক না হবার। এসব মানুষই নিয়ে যাচ্ছে অন্যদের সত্যের কাছাকাছি; নিরন্তর। মগজধোপাদের দিকে আবার একটু চোখ ফেরানো যাক। মগজধোপারা তাদের শিশুদের নিয়ে কি খেলা খেলে তা নিয়েও একটু কথাবার্তা বলা যাক। চমৎকার একটি শিশু ভয় দেখাবার পরে কিভাবে বদলে যায় এ নিয়ে ১৯২০ সালে আমেরিকার জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পরীক্ষা চালানো হয়, এটি লিটল এলবার্ট এক্সপেরিমেন্ট নামে পরিচিত। যৌথ ভাবে পরীক্ষাটি চালান জন বি ওয়াটসন এবং রসেলী রাইনার নামের দুজন বিজ্ঞানী। পরীক্ষাটিতে আলবার্ট নামের ন’মাসের একটি শিশুর সামনে কয়েকবার একটা সাদা ইঁদুর ছেড়ে দেয়া হয়, প্রথম পর্বে। ইঁদুরখানা শিশুর চোখের সামনে ঘোরাফেরা করে চলে যায়। ন মাসের এলবার্ট মোটেও ভয় পায় না। সে ইঁদুরটিকে ছুঁয়েও দেখে। দ্বিতীয় পর্বে সেই একই শিশুর সামনে একই ইঁদুর ছেড়ে দেয়া হয়; কিন্তু এবার শিশুটি প্রতিবার ইঁদুর ছোঁয়ার সাথে সাথে পরীক্ষকরা শিশুর চোখের আড়াল থেকে একটি ইস্পাতের পাতে হাতুড়ি পিটিয়ে জোর শব্দ তোলে। চমকে ওঠে শিশু। পরবর্তী পর্বগুলোতে ইঁদুর দেখলেই ভয় পেতে শুরু করে শিশু এলবার্ট, শব্দ করবারও দরকার হয় না ভয় দেখাতে। ইচ্ছে করলে এই ক্লিপটি দেখতে পারেন। https://www.youtube.com/watch?v=9hBfnXACsOI লিটল এলবার্ট এক্সপেরিমেন্টের পরীক্ষাপদ্ধতি আজকের মাপকাঠিতে নিষ্ঠুর। শিশুটি যা দেখে, স্পর্শ আর অনুভব করে ভয় পেত না; ভয় দেখানোর ব্যপার ঘটবার পর এখন ইঁদুর দেখলেই ভয় পাচ্ছে সে। প্রায় একই ভাবে, একটু খেয়াল করলেই দেখবেন; আজকের বেশিরভাগ মা বাবা কাছের মানুষ যারা, তারা তাদের প্রিয় শিশুদের গায়েবী ভয় দেখিয়ে বড় করছে। নিঃসঙ্কোচে, দ্বিদ্ধাহীন চিত্তে, অন্ধ বিশ্বাসে, মনের আনন্দে, ধর্মীয় আনন্দে। শিশুকে দেয়া হচ্ছে রুপকথা ভিত্তিক অনেক নিষেধ। তার মনে নির্দয় ভাবে দেয়া হচ্ছে বেড়া, মুক্ত চিন্তায় দেয়া হচ্ছে ভয়, বাধা এবং নিষেধের কাঁটাতার। শিশুটি বড় হয়ে গেলেও ভয়ের চোটে কি, কে, কেন, কখন, কোথায় অথবা কিভাবে এসবের মত অতি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারছে না ধর্ম নিয়ে। বিখ্যাত মহাকাশ বিজ্ঞানী নিল দেগ্রাস টাইসন বলেন শিশুদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও। প্রাসঙ্গিক একটি ক্লিপ এখানে। http://www.youtube.com/watch?v=AIEJjpVlZu0&list=PL5124334AB003B0FB&index=63 আর প্রখ্যাত প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স বলেন, বড় হয়ে আপন জীবন দর্শন বেছে নেবার সুযোগ দেবার বদলে মা বাবারা যখন শিশুকালেই শিশুর ওপর ধর্মের বোঝা চাপিয়ে দেয় সেটা শিশু নির্যাতনই বটে। তবে ধর্ম বিষয়ে জানা, এতে কোন সমস্যা নেই। প্রাসঙ্গিক একটি লিঙ্ক এখানে। ধনী, ক্ষমতাশালী, পেশীশক্তি আর চালাকদের সাথে আঁতাত করে ধর্মবাদীরা সহজ সরল মানুষদের ভেতর ঢুকিয়েছে পরকালের ভয়। এটা না হলে আজকের গরীব মানুষেরা তাদের পাওনা ছেড়ে দিত না কক্ষনো। ছিনিয়ে নিতো তাদের অধিকার। সরল মানুষেরা সংখ্যায় অনেক অনেক বেশি হওয়া সত্বেও চাপানো ধর্মীয় ভয়ের চোটে ধনী, ক্ষমতাশালী, পেশীশক্তি আর চালাকদের বারোটা বাজায়নি। বরঞ্চ সহজে নিজেদের হতে দিয়েছে প্রতারণা প্রবঞ্চনার শিকার। একসময় যুক্তিবাদী মানুষেরা সুযোগ সন্ধানী ধর্মবাদীদের কোনঠাসা করতো যুক্তি দিয়ে। প্রশ্ন তুলে। বলতো মানুষ মরে গেলে তো দেখা যাচ্ছে তার দেহ গলে পচে মিশে যায় মাটির সাথে। কল্পনার চাপানো স্রষ্টা কি করে আবার এই মিশে যাওয়া দেহকে শাস্তি দেবে? যুক্তির কথা। এইবার ধর্মবাদীরা আত্মা নামের এক গায়েবী জিনিস পয়দা করলো। বলতে শুরু করলো, ওই আত্মাকেই দেওয়া হবে কঠিন শাস্তি। সরল মানুষ ক্রমে ক্রমে মেনে নিলো এই প্রবঞ্চনা। ধর্মবিশ্বাস নামের এই গায়েবী প্রতারণাকে সত্য মানা শুরু করে দিল। অথচ কেউ কোনদিন বৈজ্ঞানিক ভাবে আত্মাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না, পাবেও না। আর সহজ সরল মানুষেরা, তাদের মা বাবাদের কাছ থেকে পাওয়া বিশ্বাস আর ভয় বংশ পরম্পরায় তাদের শিশুদের ওপর চাপাতে থাকলো। যা আজও চলছে। ‘আত্মা নিয়ে ইতং বিতং’ এই নিয়ে অভিজিৎ রায় এর সহজ করে চমৎকার কিছু লেখা পড়ে নিতে পারেন এখানে , এখানে , এখানে , এখানে , এবং এখানে । এসব নিয়ে যে কোন ভালো লেখা পড়লেই বোঝা যাবে এই পরকাল আত্মা এইসব কতখানি অপরীক্ষিত, ফালতু আর কল্পিত। এ মুহুর্তে আরেকজন মুক্তমনা ব্লগারের লেখার কথা মনে পড়ছে। অনিক। তার প্রাসঙ্গিক লেখাটি সময় পেলে পড়ে নিন চট করে এখানে । এখনকার প্রজন্ম আজকের এই মুক্ত তথ্যযুগে যে কোন বিষয়েই তথ্য যাঁচাই করে নিতে পারে নিমিষেই। আজকের মানুষ চাইলেই দ্রুত জেনে নিতে পারে আসল ব্যপার। তারা যখন জানতে পারছে ধর্মের গল্প আর রূপকথায় কোন পার্থক্য নেই তখন তারা কি ভাবছে? ঠাকুমার ঝুলি বা থলের ভেতর দেখছে অদ্ভুত সব কল্পজগতের অবাস্তব কাহিনী। মুক্ত তথ্যযুগে জ্ঞানের আলোয় নতুনরা উদ্ভাসিত যেমন হচ্ছে তেমনি বিব্রতও হচ্ছে তারা তাদের অভিভাবকের দায়িত্বহীনতার কথা ভেবে। কষ্ট হচ্ছে মেনে নিতে তাদের প্রিয় মানুষদের এই অন্যায়। দেশের প্রায় সকল শিশুই মানসিক ভাবে নির্যাতিত। ধর্মভয় দেখিয়ে অভিভাবক নিয়ন্ত্রন করেছে শিশুর ধর্মাচরণ। বিনা প্রশ্নে আর নি:সংশয়ে ধর্ম মানতে বাধ্য করা হচ্ছে শিশুদের। অভিভাবকদের চাপানো আপোষহীন ধর্মীয় শাসন, শিশুকালে ঢোকানো ভয়, নিষেধ, শাস্তি ও গায়েবী পুরস্কার আজকের শিশুকে অস্বভাবিক করে বড় করছে। জ্ঞানার্জনের অপার অসীম সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে ধর্মীয় নিষেধের সীমানা টেনে। সাধারণ জ্ঞান অর্জনে শিশুকালে রোপিত ভয় হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর এক বাধা। এইসব শিশুরা, যারা বিদ্যান হচ্ছে তাদের মধ্যেও অনেকের রয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় অন্ধত্ব, মৌলবাদী ভাবনা আর যুক্তিহীন গোঁড়ামী। এই দৃষ্টিতে আজকের মানুষদের ধর্মীয় গোঁড়ামীর জন্য অভিভাবকরাই দায়ী। নতুন মা বাবারা, কাছের মানুষেরা শিশুমনে আর ভয় যেন না ঢোকায়। এখনকার অভিভাবকরা হোক মুক্ত মনের, হোক সত্যিকার স্নেহপরায়ন আর দ্বায়িত্বশীল। শিশু বড় হলে তারপর তাকে তার জীবন দর্শন বেছে নেবার অধিকার দিক এ প্রজন্মের নতুন মা বাবারা। আজকের শিশুদের মগজ ধোলাই বন্ধ হোক।

কামড়ে খামচে মেয়েদের ‘আদর’ করছে পুরুষেরা: তসলিমা নাসরিন

যে সমাজে পুরুষ নারীর কর্তা, নারীর প্রভু, নারীর নিয়ন্ত্রক, নারীর নিয়ন্তা, সেই সমাজে নারীর সঙ্গে পুরুষের যা-ই হোক, প্রেম হতে পারে না। ননীটা ছানাটা খেয়ে বড় হওয়া পুরুষ এঁটোটা কাঁটাটা খেয়ে বড় হওয়া নারীর সঙ্গে বড়জোর খুনসুটি করতে পারে, প্রেম নয়। নারীর প্রতি পুরুষের করুণা এবং পুরুষের প্রতি নারীর শ্রদ্ধাকে এ সমাজে প্রেম বলে বিবেচনা করা হয়। এই প্রেম হৃদয় এবং শরীর দু'টোকেই ঢেলে দেয় তথাকথিত যোগ্য বা অযোগ্য পাত্রে। নারীর হৃদয় নিয়ে পুরুষ যা করে, তা অনেকেরই জানা। কিন্তু শরীর নিয়ে কী করে? নারীর প্রতি যেহেতু পুরুষের কোনও শ্রদ্ধা নেই, নারীর শরীরের প্রতিও নেই। নারীর শরীর পাওয়া পুরুষের জন্য বাঘের হরিণ পাওয়ার মতো। হরিণের জন্য কোনও শ্রদ্ধাবোধ বাঘের নেই। ছিঁড়ে খেতে বাঘের কোনও গ্লানি নেই। খিদে পেয়েছে, শিকার করেছে, খেয়েছে। খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নিজের টেরিটরিতে ফিরে যাবে, ফের খিদে পেলে ঝাঁপিয়ে পড়বে নতুন কোনও হরিণ পেতে, না পেলে মোষ বা মানুষ। পুরুষেরা কটকটি কামড়ানোর মতো নারীর ঠোঁট কামড়ালো, এর নাম দিয়ে দিল চুম্বন। যে নারী এভাবেই চুম্বনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, সে তো চুম্বন বলতে তা-ই বোঝে, ধারালো দাঁতের কামড়, ঠোঁট ফুলে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া, রক্তাক্ত হওয়া। ঠোঁট কামড়ানোর পর পুরুষেরা নারীর বুক নিয়ে পড়ে। দলে পিষে সর্বনাশ করে। ক্ষণে ক্ষণে খামচে ধরে। নখে ছেঁড়ে, দাঁতে কাটে। নারীকে ভালোবাসলে, নারীর শরীরকেও ভালোবাসতে পারতো পুরুষ, ভালোবাসলে আঙুল নরম হত, দাঁত নখ লুকিয়ে থাকতো। পুরুষ নিজের আনন্দ ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। নারীর কিসে ভালো লাগবে, কিসে লাগবে না, তা জানার চেষ্টা তারা কোনওদিন করেনি। জানলেও গুরুত্ব দেয়নি, নারীর সুখ অসুখের তোয়াক্কা পুরুষ করেনি কখনও। নারীও অনেক সময় জানে না, কী করলে তাদের ভালো লাগবে, কী করলে শরীরে সুখ হবে। নারীকে যেভাবে যা বোঝায় পুরুষ, নারী সেভাবেই বোঝে। তার কি আর আলাদা করে নিজের মাথা এবং হৃদয় খাটিয়ে কিছু বোঝার ক্ষমতা আছে? নেই। শরীরের সম্পর্কে পুরুষ হল 'দ্য মাস্টার, মেগালোম্যানিয়াক ম্যাচো', আর নারী তার ক্রীড়নক। পুরুষ সুপিরিয়র, নারী ইনফিরিয়র। পুরুষ অ্যাকটিভ। নারী প্যাসিভ। নারী প্যাসিভ না হলে পুরুষের মুশকিল হয়। হরিণ নড়েচড়ে উঠলে বাঘের ভক্ষণে যেমন মুশকিল হয়, তেমন। জগতে পুরুষই রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, ধর্মে, অধর্মে, সমাজে, সংসারে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতিতে মহান মস্তান হয়ে বসে আছে। এই নীতি রীতিগুলো পুরুষময় করে রাখার জন্য পুরুষেরা ভয়ংকর রকম অ্যাকটিভ। এই অ্যাকটিভ পুরুষ বিছানায় গিয়ে নারী নামক ভোগের বস্তুটিকে কী করে অ্যালাউ করবে অ্যাকটিভ হওয়ার? অসম্ভব। ইগোর ঘরে আগুন জ্বলবে। পুরুষ ততটুকুই নড়তে দেবে নারীকে, যতটা নড়ন হলে পুরুষের গায়ে পুলক লাগে। বাৎসায়নমশাই চোষট্টি কলার কথা জোর গলায় বলে গেলেও এক মিশনারি কলাতেই তৃপ্ত বাঙালিবাবুরা, বাকি তেষট্টি কলার পেছনে সময় খরচ না করে নারীকে প্যাসিভ বা পুঁইশাক বানিয়ে রাখার কলা কৌশল ভালো রপ্ত করেছেন। পুরুষের রসবোধ কম। কম বলেই নারীর রসবোধ নিয়ে আতংকিত তারা। রসক্ষরণ না হলে যাত্রা মসৃণ হয় না, জানার পরও রসক্ষরণের রাস্তায় পুরুষের যেতে বড় আপত্তি বা আলসেমি। পুরুষ প্রস্তুত সুতরাং সব্বাইকে প্রস্তুত হতে হবে। ঘোড়া প্রস্তুত, লাগাম প্রস্তুত। অর্ডার অর্ডার। এক তুড়িতে পুরুষ গ্রহণে প্রস্তুত হও নারী। তানাহলে তুমি আর নারী কীসের? তুমি আর সেবিকা কীসের? আনন্দদায়িনী, মনোরঞ্জনী কীসের? পুরুষের সুখশান্তিস্বস্তির জন্য আত্দাহুতি দিতে নারী সর্বত্র এক পায়ে খাড়া। শীর্ষসুখ জানে নারী? ক'জন নারী জানে? নারী জানে জগতের যত সুখ, সবই পুরুষের জন্য। নারীর যে একেবারে সুখ নেই তা নয়, নারীর সুখ পুরুষকে সুখ দিয়ে। নারীর অন্য সুখ থাকতে নেই। আনন্দ বলতে কিছু অনুভব করতে নেই। পুরুষ এভাবেই যুগ যুগ ধরে নারীর মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছে ত্যাগী হওয়ার মন্ত্র। নারীর ত্যাগই পুরুষের সবচেয়ে বেশি প্রার্থনীয়। নারী তার নিজস্বতা, তার পৃথক অস্তিত্ব, তার সাধ, তার সুখ সবই সানন্দে ত্যাগ করবে আর এই ত্যাগকেই পুরুষ তাড়িয়ে তাড়িয়ে ভোগ করবে। নারীর ত্যাগএর মতো এত সুস্বাদু আর উপাদেয় জগতে আর কোনও খাদ্য নেই। নারীরা যদি সমকামী হত, বেঁচে যেত। অসমকামী হওয়ার অসুবিধে হল, অনাদর, অবহেলা, অপমান, অসন্তোষকে একরকম সঙ্গী করেই জীবন কাটাতে বাধ্য হতে হয়। পুরুষ পালকের মতো করে স্পর্শ করবে নারীর সারা শরীরে, নারী একটু একটু করে কুঁড়ি যেমন ফুল হয়ে ফোটে, তেমন ফুটবে। বাঘিনীর মতো কামার্ত চোখে তাকাবে, হরিণের মতো কাতর চোখে নয়। পুরুষের নিঃশ্বাসে স্পর্শে, ঘামে গন্ধে, কামে, কাঙ্ক্ষায় উপচে উঠবে তীব্র প্রেম। ওঠে কি? না। দৈত্যের মতো উঠে আসে ধর্ষণেচ্ছা। মেগালোমেনিয়া। মাচিসমো। নারীকে পিষে নিংড়ে ছোবড়া করে দেওয়ার পুরুষিক সুখ। এ জগত পুরুষের। ভারতবর্ষ তো আরও বেশি পুরুষের। পুরুষ কামনা করবে নারীকে, পুরুষের যখন খুশি, তখন। নারীর কামনা বাসনা থাকতে নেই। থাকলেও প্রকাশ করতে নেই। নারীর শরীর জাগতে নেই, জাগলে ঘুম পাড়িয়ে রাখাই মঙ্গল। নারীর এগিয়ে আসতে নেই। চুমু খেতে নেই। যৌনতায় নারী প্রধান ভূমিকা নিতে পারে না। নারী যৌনপ্রভু নয়, 'যৌনদাসী'। এই চরিত্রটি সযতনে নারীকে উপহার দিয়েছে পুরুষ। যৌনতায় নারী যদি সঙ্গীর ভূমিকাও নেয়, তবুও পুরুষের পিলে চমকে ওঠে, শিশ্ন শিথিল হয়। যতক্ষণ না নারী যৌনদাসীর ভূমিকায় নামছে, ততক্ষণ অবধি পুরুষের উত্থান অনিশ্চিত। নারী যৌনতৃষ্ণায় কাতরালে সে নারী মন্দ, পুরুষ যৌনতৃষ্ণায় কাতরালে পুরুষ বীর্যবান, শৌর্যবান। এই বৈষম্য নিয়ে সত্যিকার সুস্থ কোনও যৌনসম্পর্ক কি হতে পারে নারী পুরুষে? না। পারে না। ঘরে ঘরে নারী-পুরুষ দুজন মিলে যে যৌনসম্পর্ক করছে, তাকে কথ্য বাংলায় বলা হয় 'পুরুষ নারীকে করছে'। মুখের ভাষা থেকেই কিন্তু বেরিয়ে আসে বৈষম্যের বীভৎস চিত্র। 'ওরা করছে' বদলে 'ও করছে'। একজন কাজ করছে, আরেকজন বসে আছে, ব্যাপারটা এরকম। যৌনতায় নারীর কোনও ভূমিকা নেই, থাকতে নেই- তা সর্বজনমান্য রায়। উত্থানরহিতে জগত ভর্তি। অথচ দেখলে বোঝার জো নেই। কারও লজ্জা নেই, মাথা হেঁট নেই, দুশ্চিন্তা নেই। উত্থানরহিতদের মস্তক কিন্তু উত্থিত থাকে। আর যে নারীরা উত্থানরহিতদের শিকার, তারাই বরং মাথা নত করে দিন কাটায়। দুঃসহ রাত্তির কাটায়। নারী যৌনতৃপ্তি পাক, এটা আন্তরিকভাবে খুব বেশি উত্থানরহিত কি চায়? চাইলে চেষ্টা থাকতো নিজেকে সংশোধনের। যৌনতার নামে দিনের পর দিন নারীর ওপর অত্যাচার চালাতো না। পুরুষ যেদিন বিশ্বাস করবে নারীর সমঅধিকারে, পুরুষ যেদিন নারীর স্বাধীনতাকে শর্তহীন সম্মান জানিয়ে ধন্য হবে, পুরুষ যেদিন তাদের কুৎসিত পৌরুষ বিসর্জন দিয়ে, তাবৎ পুরুষিক নৃশংসতা-কদর্যতা ত্যাগ করে মানুষ হবে, মানবিক হবে, নারীকে স্পর্শ করবে প্রেমে, যে প্রেমে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধা; সেদিনই হবে সত্যিকার নারী পুরুষের যৌনসম্পর্ক। তার আগ অবধি ঘটনা ওই একই, একজন ভোগ করে, আরেকজন ভোগে। 'নারী স্বাধীনতা'র অর্থ 'যৌন স্বাধীনতা'- এরকম মন্তব্য অনেকে করে। বিদ্রূপ করে বলা কথা। কথা কিন্তু সত্য। যৌন স্বাধীনতা ছাড়া নারী কখনও সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না, পারেনি। যে নারীর শরীর তার নিজের অধিকারের বাইরে চলে যায়, সেই নারী কোনও অর্থেই 'স্বাধীন নারী' নয়। শিক্ষা পেলেও, স্বনির্ভর হলেও, এই নারীবিদ্বেষী সমাজে নারীরা 'যৌনদাসিত্ব' থেকে মুক্তি পেতে পারে না। এই দাসিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে, এই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে নারী যদি যৌন স্বাধীনতা পুরোপুরি ভোগ করতে পারে, তবেই সে নারীকে 'স্বাধীন' বলে মানবো আমি। যৌন স্বাধীনতা মানে পুরুষ পেলেই শুয়ে পড়া নয়, পুরুষের সঙ্গে না শোয়ার নামও যৌন স্বাধীনতা। চারদিকে ধর্ষকের ভিড়, এ সময় ধর্ষক-ধ্বজভঙ্গদের আহ্বানে আদেশে সাড়া না দেওয়ার জন্য যে যৌন স্বাধীনতা, তা থাকা প্রতিটি নারীর প্রয়োজন। ঠোঁট কামড়ে, স্তন খামচে যে পুরুষেরা পৌরুষ ফলাতে চায়, তারা যত যা-ই হোক না কেন, তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার যৌন স্বাধীনতা না পেলে মুক্তি নেই নারীর। যে পুরুষেরা কেবল নিজের যৌনসুখ নিয়ে মগ্ন, নারীর যৌনসুখ নিয়ে ভাবা যাদের কম্ম নয়, সেই পুরুষদের সবলে অস্বীকার করার যৌন-স্বাধীনতা যে করেই হোক অর্জন করুক নারী। নির্বাসিত লেখিকা।

বাংলার ঈদ

বাংলার ঈদ image লাইফস্টাইল ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ঢাকা, মোগল রাজধানী হওয়ার আগে এখানে ‘ঈদ’ উৎসবে পরিণত হয়নি। কেননা উৎসব উদযাপনকারী তথা মুসলমানদের সংখ্যা তেমন একটা ছিল না। ফলে ঈদকে নিয়ে থাকত না আলাদা কোনো উৎসাহ কিংবা আয়োজন। ১৬১০ সালে ঢাকায় মোগলরা এল। বাংলার প্রশাসক সুবাদার ইসলাম খান যখন নিজে পা রাখলেন ঢাকায় তখন তাঁর সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনী মিলিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার লোকজন। শুধু যে মোগলরাই এসেছিলেন তা নয়; তাদের খেদমতের জন্য এসেছিল বিশাল সংখ্যক বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী এবং তাদের পরিবার পরিজন। ফলে সহজেই অনুমান করে নেয়া যায়; হঠাৎ করে কীভাবে ঢাকা কোলাহলমুখর এক ব্যস্ত ‘রাজধানী’ হয়ে উঠেছিল। মোগল ঢাকার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ‘ঢাকা কেল্লা’র (বর্তমানে কেন্দ্রীয় কারাগার) চারপাশে গড়ে উঠেছিল ঢাকায় আগত পেশাজীবীদের আবাসস্থল। সে সময়কার ঢাকা বলতে বোঝানো হত আজকের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাঝামাঝি থেকে পাটুয়াটুলী বা সদরঘাটের আশপাশের অংশটুকু। image মোগলরা ঢাকায় আসায় উৎসব হিসেবে ‘ঈদ’ পালন করা হতে থাকে। শাসক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে ‘ঈদ’ উৎসবে রূপ নেয়। মোগলদের ঈদ উদযাপন হত দু-তিন দিন ধরে। চলতো সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন। আত্মীয়স্বজন পরিবার পরিজন নিয়ে একরকম মেলাই বসে যেত। অনুমান করে নেওয়া যায় এই মেলা আয়োজিত বাদশাহী বাজারে (বর্তমান চকবাজার), বিশেষ করে বললে তখনকার প্রশাসনিক সদর দপ্তর ঢাকা কেল্লার (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার) আশপাশের এলাকা ঈদের সময়টায় থাকত জমজমাট। শুধু ঢাকাতেই নয়, সেই সময়ে বাংলার যে অঞ্চলেই মোগলরা থাকতেন (বিশেষ করে সামরিক এবং প্রশাসনিক কারণে) সেখানকার ঈদ উদযাপনের সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা থেকে চিত্র পাওয়া যায়। image তখন তাঁর দায়িত্ব পড়েছিল বোকাইনগরে। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, "সন্ধ্যায় যখন মোমবাতির আলোয় আলোকিত হত মোঘল আমলের ঢাকা শহর তখনও শেষ রোজার সন্ধ্যাকাশে উঠতো ঈদের চাঁদ। তখন শিবিরে বেজে উঠতো শাহী তূর্য (রণ শিঙ্গা) এবং গোলন্দাজ বাহিনী গুলির মতো একের পর এক ছুঁড়তে থাকতো আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো এই আতশবাজির খেলা। শেষ রাতের দিকে বড় কামান দাগা হত।" সেই সময় ঢাকাবাসীরা বাদশাহী বাজার (বর্তমানে চকবাজার) থেকে ঈদের কেনাকাটা সারতেন। ইসলাম খাঁর (ঢাকায় তার অবস্থানকাল ১৬১০-১৬১৩ খ্রিস্টাব্দ) পর প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে ঢাকার প্রসার ও বিকাশ ঘটে অতি দ্রুততার সঙ্গে। মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ সুজাকে সুবে বাংলার শাসক করে পাঠান ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে। শাহ সুজা শিয়া মতাবলম্বী হওয়ায় তিনি ঢাকায় আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ৩শ' শিয়া পরিবার। এদের আগমনে ঢাকার অভিজাত শ্রেণির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। image প্রায় একই সময়ে ঢাকায় বসবাসকারী (১৬২৯-১৬৫০খ্রিস্টাব্দ) মোগল কর্মচারী কবি সাদিক ইসফানি তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, "সে সময়ে ঢাকায় অভিজাতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ অভিজাতদের পূর্ব পুরুষ এসেছিলেন শিরাজ, তেহরান, ইসফাহান, মাশহাদ, তাবরিজ এবং বোখারা থেকে। এতে বোঝা যায় সে সময়ে মোগলদের ঢাকা কতটা জমজমাট হয়ে উঠেছিল।" ঢাকা এলেও শাহজাদা সুজা বিভিন্ন কারণে শহরটিকে পছন্দ করলেন না। তিনি কিছুদিনের (১৬৩৯-১৬৫৯) জন্য রাজধানী পরিবর্তন করে ঢাকা থেকে নিয়ে যান রাজমহলে। এ সময়ের ঢাকার মোগলদের ঈদের নামাজ পড়ার জন্য তৈরি করা হয় একটি ঈদগাহ। এটি হল ধানমণ্ডির সাত মসজিদ রোডের ঈদগাহ। পোড়ামাটির ইটে তৈরি এ ঈদগাহটি তৈরি হয়েছিল ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে। তখন থেকে ঢাকার অভিজাত শ্রেণির মুসলমানরা এই ঈদগাহে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে। তবে সাধারণ নগরবাসীর এতে প্রবেশ করার তেমন একটা সুযোগ ছিল না। কখনও শাসকরা নতুন কোনো রাজ্য জয় করলে ঈদ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হত বাড়তি আনন্দ। দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁর সময় (১৭২৮ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে) জয় করা হয়েছিল ত্রিপুরা। নবাব সুজা উদ্দিনের নির্দেশে ঢাকা কেল্লা থেকে ঈদগাহ যাওয়ার রাস্তায় ১ হাজার টাকা মুদ্রা দিয়ে দুই মাইল জুড়ে সাজানো হয়েছিল। image ঢাকার দেখাদেখি সিলেটেও মোগলরা তৈরি করে আরেকটি ঈদগাহ। শহরের এক প্রান্তে ‘শাহী ঈদগাহ’ এলাকার এক ছোট্ট টিলার উপর এই ঈদগাহর অবস্থান। মনোমুগ্ধকর এই ঈদগাহটি তৈরি করেছিলেন সিলেটের মোগল ফৌজদার ফরহাদ খান। সপ্তদশ শতাব্দীর সত্তর দশকে তিনি সিলেটের ফৌজদারের দায়িত্ব পান। তখন দিল্লীর সিংহাসনে সম্রাট আওরঙ্গজেব (শাসনামল ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল)। এই দায়িত্বপালনের সময়টুকুতে ফৌজদার ফরহাদ খান সিলেটের ‘ফরহাদ খান পুল’সহ অনেকগুলো মসজিদ, রাস্তাঘাট ও সুরম্য দালান গড়ে তুলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর আশির দশকে তিনি এই ঈদগাহ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং সম্পূর্ণ নিজ তত্ত্বাবধানে তা নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। অত্যন্ত ২২টি বড় সিড়ি মাড়িয়ে ঈদগাহতে যেতে হয়। ১৫টি গম্বুজ সজ্জিত শাহী ঈদগাহ। সীমানার চারপাশে রয়েছে ছোট-বড় ১০টি প্রবেশপথ। ঈদগাহের সামনেই বিশাল পুকুর মুসল্লিদের ওযুর জন্য। এখানে প্রায় দেড় লাখ মুসল্লি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এত লোক হয়ত সেই সময়ে হত না। এটা ঠিক ঈদে নামাজ পড়ার মতো একটা ভালো সংখ্যার মুসলমান গোষ্ঠী হয়ে গিয়েছিল তখনই। আর এটাই প্রমাণ করে ঢাকার বাইরেও ঈদ মোটামুটিভাবে একটি উৎসব হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মোগল আমলে মেলাগুলো কেমন হত? সমসাময়িক মোগল লেখকদের স্মৃতিকথায় মোটা দাগে ঈদ উৎসবের কথাই লেখা আছে। সেখানে মেলা নিয়ে বিস্তারিত কিছু নেই। তারপরেও ধরে নেওয়া যায়- পারস্যের সংস্কৃতি চর্চা করা সেসব মোগলরা ঈদে মেলার আয়োজন করত। ‘নওরোজ’ (পারস্যের নববর্ষ) পালনের সময় যে মেলার আয়োজন করতো সে সূত্র ধরেই সম্ভবত ঈদের মেলারও আয়োজন করা হত। মোগলদের আমলে এটা চর্চার ফলে ঢাকায় ঈদের মেলার বোধহয় একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে যায়। আর দীর্ঘদিন ধরে সেটা চর্চা হতে থাকে। হয়ত ঢাকাকে অনুসরণ করে বাইরে এলাকাগুলোতেও ঈদ উৎসব উপলক্ষে শুরু হয় গ্রামীণমেলা। যা বাংলার অন্যন্যা পূজা-পার্বণ উপলক্ষে আগেও আয়োজিত হত। এভাবে চলতে থাকলেও বাংলার শাসনযন্ত্রের উপর মূল ধাক্কা এসে লাগে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে। মোগল সম্রাটের কাছ থেকে ইংরেজরা বাংলার-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের ভার পায়। ঢাকার নায়েব-নাযিমরা পরিণত হন ক্ষমতাহীন শাসকে। পড়তি ঢাকার জৌলুস ধরার চেষ্টা করা হত ঈদ ও মহরমের মিছিলের মাধ্যমে। এই মিছিলগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নায়েব-নাযিমরা। শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে নায়েব-নাযিমরা ঈদের পাশাপাশি মহরমেরও মিছিল বের করতেন। নিজেদের শৌর্য দেখানোর জন্য এ মিছিলগুলোর ছবি এঁকে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী ঢাকার ঈদের মিছিলের ছবি এঁকেছিলেন। ঢাকার ঈদ ও মহরমের মিছিলের মোট ৩৯টি ছবি এঁকেছিলেন তিনি। চিত্রগুলোতে দেখা যায় ঈদের মিছিলগুলো নায়েব-নাযিমদের নিমতলী প্রাসাদ (বর্তমানে নিমতলী এলাকা), চকবাজার, হোসেনি দালান প্রভৃতি স্থাপনার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। মিছিলে থাকত সজ্জিত হাতি, ঘোড়া, পালকি, অস্ত্র হাতে সৈন্যদল। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কারও কারও হাতে থাকতো রং-বেরঙের ছাতা অথবা বাদ্যযন্ত্র। মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে নায়েব-নাযিমরা থাকতেন একেবারে সামনের দিকে। দর্শক হিসেবে থাকতেন অভিজাত শ্রেণির লোকজন। এ দেশীয়রাতো থাকতেনই সেই সঙ্গে থাকতেন ঢাকায় অবস্থানকারী ইউরোপিয়ানরা। সেসময়ের এই আয়োজনগুলো মোগল ঢাকার উজ্জ্বল সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে পারতো। হাকিম হাবিবুর রহমান, প্রখ্যাত নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, আশরাফ-উজ-জামানদের স্মৃতিকথায় গত শতকের বিশ-ত্রিশ দশকেও ঢাকায় যে ঈদের মিছিল বের হত তার বিবরণ পাওয়া যায়। সে শতাব্দীতেই চল্লিশ দশকের দাঙ্গায় এবং অন্যান্য কারণে ঈদের মিছিল বন্ধ হয়ে যায়। এত গেল ঢাকার কথা। তবে ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতে ঈদকে উৎসব হিসেবে পালনের অবস্থা কী ছিল? কেননা শাসক স্থান থেকে মুসলমানদের অবস্থানটা সরে গেলে সেই প্রভাব নিশ্চয় গ্রাম বাংলাতেও পড়েছিল, এটা নিশ্চিত। তবে এই অবস্থাতেও আমরা দেখতে পাই কিশোরগঞ্জে ১৮২৮ সাল থেকে শুরু হয় আজকের বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ পড়ার চল। এই ঈদগাহের ইতিহাসের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ইসলামের প্রচারের জন্য ইয়েমেন থেকে আসা শোলাকিয়া ‘সাহেব বাড়ির’ পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ তাঁর নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। এই জামাতে ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসল্লিদের আধিক্যতা প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করেন। আবার অনেকের মতে সেদিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার (অর্থাৎ সোয়া লাখ) লোক জমায়েত হয়েছিল। ফলে ‘সোয়া লাখ’ থেকে শোলাকিয়া নামটি চালু হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল ‘সোয়া লাখ টাকা’। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে ‘সোয়ালাখিয়া’ সেখান থেকে ‘শোলাকিয়া’। পরে ১৯৫০ সালে স্থানীয় এক ধন্য ব্যক্তি দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন। বর্তমান শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আয়তন ৭ একর। নরসুন্দা নদীর তীরে শোলাকিয়ার অবস্থান। উনিশ শতকের শেষের দিকে মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করলে মুসলমানদের অভিজাত শ্রেণির (যারা মোগল সম্রাজ্যের অংশীদার এক আদি রইস পরিবারের ছিলেন) পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণির উত্থান দেখা যায়। তারা ঢাকার আদিবাসী ছিলেন না। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরির অন্বেষণে এদের ঢাকায় আগমন এবং ঢাকাতেই স্থায়ী হয়ে যাওয়া এই সব নতুন ঢাকাবাসীরা বেশিরভাগই পল্লী অঞ্চলের ছিলেন। এসব মুসলমানদের ঢাকায় আসার ফলে রাজধানীর ঈদ উৎসবে নতুন কিছু সংযোজন হয়েছিল। যেমন বিভিন্ন ধরনের পিঠা, সেমাই ও ঈদের দিনে মেলার আয়োজন। এরা শুধু যে ঢাকাতেই হাজির হলেন তা নয় চাকুরির সুবাদে বাংলাদেশের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়লেন তাদের সংস্কৃতি নিয়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঈদ উদযাপনে ভিন্নতা আসা শুরু করল। তাদের উপস্থিতি ঢাকার ঈদের মেলায় সংযোজন করে গ্রামীণ সংস্কৃতি। ফলে মেলা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র চকবাজারেই সীমাবদ্ধ রইল না; ছড়িয়ে পড়ল শহরের আশপাশেও। সেটার সত্যতা পাওয়া যায় মুন্সী রহমান আলী তায়েশের স্মৃতিকথা থেকে। তিনি তাঁর ‘তাওরারিখে ঢাকা’ বইয়ে লিখেছেন— উনিশ শতকের শেষের দিকে ঢাকার মুসলমানরা (তখন সম্ভবত প্রায় সব শ্রেণির মুসলমানরা একসঙ্গেই যোগ দিতেন) ধানমণ্ডির মোগল ঈদগাহে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে। যদিও সেই ঈদগাহ তখন অযত্ন অবহেলায় ‘জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ’। তারপরেও তায়েশের বর্ণনার উল্লেখযোগ্য অংশটি হচ্ছে— ‘ঈদ উপলক্ষে এখানে মেলা হত, সেখানে যোগ দিতেন ঢাকা ও আশপাশের এলাকার লোকজন।’ পান্ডুনদীর কাছেই মেলা হওয়ায় নানান রকম ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে আশপাশের গ্রামের বিক্রেতার হাজির হতেন এই মেলায়। বলা যায় একধরনের গ্রামীন ও নাগরিক জীবনের মেলবন্ধনেরও সৃষ্টি হত। ধারণা করে নেওয়া যায়, এই মেলার ধারাবাহিকতায় ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে ঈদ উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হতে থাকে। image এত গেল ঢাকাবাসীর ঈদ উদযাপনের খন্ডিত চিত্র। অপরদিকে ঢাকার আদি অভিজাত শ্রেণি যারা নিজেদের মধ্যে মোগল ঐতিহ্য বেশ করে চর্চা করতেন তাদের ঈদ উদযাপনটা ছিল খানিকটা ভিন্ন। উনিশ শতকের আশির দশকের শেষ দিকে সেলাই মেশিনের ব্যবহার শুরু হলেও তাঁরা (যারা মোগল ঐতিহ্য বহন করতেন) হাতে সেলাইয়ের কাপড় পরতেন। ঈদ উৎসবে তাদের ঘরে পরিবেশিত হত তোরাবন্দি খাবার। সর্বমোট চল্লিশ রকমের খাবার থাকত এই তোরা বিন্দতে। অর্থনৈতিক কারণে এ তোরা বন্দি খাবার কালক্রমে ‘নিম তোরাবন্দি’ বা অর্ধেক তোরাবন্দিতে পরিণত হয়ে গত শতাব্দীর বিশ দশকের দিকে এসে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ঢাকার নবাব বাড়িতেও ঈদে বিভিন্ন ধারায় আনন্দের ব্যবস্থা ছিল। খানা-পিনা হত জাঁকজমকের সঙ্গে। সন্ধ্যাবেলায় অন্দরমহলে নাচ-গানের আসর জমাত হিজড়ার দল। আলো দিয়ে সাজানো হত আহসান মঞ্জিল। গত শতকের ত্রিশ দশক থেকে ধীরে ধীরে ঈদ উদযাপনে ভিন্নতা আসতে শুরু করে। ততদিনে ঢাকায় জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে, টকি সিনেমা এসেছে, এসেছে রেডিও, ধানমণ্ডির ময়দানে হয়েছে অ্যারোপ্লেন নামার জন্য অ্যারোফিল্ড। ঈদ উপলক্ষ্যে গ্রাম থেকে বেড়াতে এসে দর্শনার্থীরা যেতেন ঢাকার কয়েকটি দর্শনীয় স্থানে। এসবের মধ্যে ছিল সদরঘাটের কালু খাঁ কামান, হুসেনি দালান, ফরাশগঞ্জের লোহার পুল, হাতির পুল, রমনার রেসকোর্স, লালবাগের কেল্লা, বড় কাটরা ছোট কাটরা। ঈদের দিন সিনেমা হলগুলোতে ঈদের বিশেষ ছবি প্রদর্শন করা হত। এই দশক থেকে বাংলার মানুষ ঈদ এলেই একটি গান শুনতে পায় অথবা বলা যেতে পারে এই গান শুনে সবাই বুঝতে পারে ঈদ এসেছে। আর সেই গানটি হলো- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।' শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ-এর অনুরোধে ১৯৩১ সালে কবি নজরুল ইসলাম এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন। লেখার চারদিন পর শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের গলায় গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দুই মাস পরে ঈদের ঠিক আগে আগে যা প্রকাশ করা হয়। বুঝাই যাচ্ছে ব্যবসায়িক একটা ভাবনা এতে কাজ করেছে। গ্রামোফোন কোম্পানি এটির রেকর্ড প্রকাশ করে। রের্কডের অপর গান ছিল কবির ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর, বদনসীন আয়, আয় গুনাহগার নতুন করে সওদা কর। ‘হিজ মাস্টার্স কোম্পানির রেকর্ড নম্বর এন- ৪১১১। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সাল। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এখন ঢাকাবাসীর ঈদের উদযাপনের মাত্রা বিভিন্ন রকম। ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ চাঁদ দেখা যাক বা না যাক সরকারী ঘোষণাতেই এখন ঠিক হয় কবে ঈদ হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশ বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর হচ্ছে সবচেয়ে বড় উৎসব। সাধারণভাবে যানজট পীড়িত ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষ ঈদের উৎসব পালনের জন্য নিজ নিজ দেশের বাড়িতে চলে যাওয়ায় রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। আর এই উৎসবের শুরুটাই যেন হয় টিকেট কাটার লড়াই দিয়ে। বাস, ট্রেন আর লঞ্চে থাকে ব্যাপক ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে নিজের প্রিয়জনের কাছে ফিরতে পারাই যেন বিশাল আনন্দ।   লেখক: তরুণ ঢাকা গবেষক রিদওয়ান আক্রাম।  প্রকাশিত বই: ১. ঢাকার ঐতিহাসিক নিদর্শন (২০০৬), বাঙালায়ন, ঢাকা। ২. ঢাকার কোচোয়ানরা কোথায় (২০০৭) রিদম প্রকাশন, ঢাকা। ৩. ড’য়লির ঢাকা (২০০৯) আকাশ প্রকাশন, ঢাকা। ৪. ঘটনা সত্য (২০১২) ইছামতি, ঢাকা। ৫. ঢাকাই খাবার (যৌথ), (২০১৩), বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা। ৬. ঢাকা কোষ (যৌথ), (২০১৩), বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা।

দেশ-প্রবাসের জীবনধারা, প্রাবন্ধিক ডালিয়া নিলুফার-এর ধারাবাহিক – ‘ভগমানের পিত্থীমি’

[caption id="attachment_11027" align="alignleft" width="639"]‘The Spellbinders’ photography project: PHOTOS  BY MOHAMMAD MONIRUZZAMAN ‘The Spellbinders’ photography project: PHOTOS BY MOHAMMAD MONIRUZZAMAN[/caption] ডালিয়া নিলুফার । ভগমানের পিত্থীমি ------পর্ব ১ ছোটবেলায় দেখেছি দু’একজন মানুষ, তারা রাস্তার উপর সার্কাস দেখাত। শরীরের নানারকম ভঙ্গী করত। এক কোনায় থাকত তাদের খেলা দেখানোর সরঞ্জামাদি। আর “আসেন, আসেন খেলা দেখেন। তাজ্জব খেলা -----” এই বলে সার্কাসওয়ালা অদ্ভুত ভঙ্গীতে পথের মানুষজন ডেকে নিত। বেশী ডাকতে হোতনা। মুহূর্তের মধ্যেই হৈ হৈ করে ভীড় লেগে যেত। দেখতাম, উঁচূ করে এমাথা ওমাথা লম্বা টানা তার। নয়ত দড়ি। তার উপর দিয়ে হাটছে একজন মানুষ। মানুষটার খালি পা। দুই হাত পাখীর ডানার মত দু’পাশে ছড়ানো। স্থির চোখে যন্ত্রচালিতের মত হেটে যাচ্ছে সে। একটু একটু করে। জলজ্যান্ত একটা মানুষ আর তার অতি সতর্ক পায়ের তলায় সরু এক তার, অথচ দু’এর মধ্যে কি অদ্ভুত ভারসাম্য! কোন মানুষের পক্ষে যে এই কাজ করা সম্ভব, ভাবতেই পারতামনা। এমনতর সাহসের শেষ পরিনতি কি হয়, না দেখে ঘরে ফেরা যায়না। ইচ্ছেও করতনা। ঐ এক সর্বনাশা মুহূর্তে কি ঘটবে সেই রোমহর্ষতা দেখতাম কাতর চোখে। এই ভয়াবহ কাজ সে পারবে কি পারবেনা, ভেবে ভয়ে বুক কাঁপত। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। তবু হা মুখ করে নিশ্চল দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতাম সেই অদ্ভুত কান্ড কারখানা। এবং আশ্চর্য এই যে, কাজটা শেষ পর্যন্ত সে পারত। সমস্ত মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সে ঠিক ঠিক পৌছে যেত তারের ঐপারে। কেমন করে যে! মানুষের কিছু কিছু কাজ জাদুর মত। হয়ত এও তাই। খেলা শেষে উপস্থিত মানুষেরা সবাই চিৎকার করত। হাসত। বাহবা দিত। চারপাশ থেকে ঝরঝর ঝরঝর করে পড়ত হাততালি। সেই শব্দে কানে ঝিম ধরে যেত। কিন্তু কি এক অদ্ভুত কারনে সার্কাসওয়ালাদের এই সাহস আমার কোনদিনই ভালো লাগতনা। কখনও সেরকম খুশীও হইনি। কোন দরকারে যে তারা এমন কাজ করে, ভেবে পেতামনা। শুধু মনে হোত পৃথিবীতে আর কি কোন কাজ নেই, যা দিয়ে মানুষকে খুশী করা যায়? চমকে দেয়া যায়? এমন কাজ না জানলেইবা কি হয়? তার এই ভয়াবহ খেলা দেখে দু’একবার আমিও হাততালি দিয়েছি। তবে সেটা তার বাহাদুরীর জন্যে না। সে যে প্রানে বেঁচেছে, পড়ে যেয়ে মরে যায়নি, সেই খুশীতে। পড়ে গেলে তার কোন দূর্গতি হবে, সেকথা ভাবার মত মনের জোর তখন ছিলনা। জীবন বাজী রাখা কি জিনিষ তাও বুঝতামনা। আর তাদের রুজী রোজগার কেমন ছিল সেটাও পরিষ্কার করে জানা ছিলনা।। শুধু মনে হোত, এগুলি বোধহয় গরীব মানুষেরই কাজ। খেলা দেখাবে। লোকজন খুশী করবে। পিঠ কূঁজো করে , মাথা নুইয়ে খুটে খুটে পয়সা তুলবে। এরপর বাঁধাছাদা করে চলে যাবে অন্য কোথাও। জীবন মরন সঁেপ দিয়ে আবার দাঁড়াবে দড়ির উপর। আর যদি কখনও পড়ে যায়, তাহলে মরে যাবে। ব্যস। বোঝার মধ্যে এটুকুই বুঝতাম। পথচলতি মানুষের কাছে এ ছিল নেহাতই এক তামাশা। সিকি, আধুলী অথবা গোটা টাকায় তারা কিনে নিত গা শিউরে ওঠার মত সেইসব মরন খেলা। এরমধ্যে জীবনের বেদনার্ত এবং কোন অদ্ভুত ইঙ্গিত আছে কিনা তা দেখার মত সময় থাকতনা তাদের কারোরই। আজ বহু বছর পর তারের উপর দিয়ে হেটে যাওয়া সেই মানুষটার সাথে, তার নিদারুন প্রানান্তকর সেই খেলার সাথে, এই জীবনের কোন পার্থক্য খুঁজে পাইনা। তারের এপার ওপার, এর মাঝখানে যে পথ তাইতো জীবন। সেই তার, সতর্ক পায়ে মানুষটার সেই হেটে যাওয়া এখনও চোখে চোখে ভাসে। আর বারবার মনে করিয়ে দেয় এই জীবনের অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির কথা। ভয় এবং বেদনার কথা। প্রতি মুহূর্তে যে জীবনে থাকে স্খলনের আশঙ্কা। অসাবধানতার মধ্যেই থাকে যার পতনের ইঙ্গিত। তবু থামা যাবেনা। যায়না। চলাই যে জীবনের ধর্ম তারে থামাবে কে? অদৃষ্টের এই যে দীর্ঘ টানা পথ, যেন বুঝেশুনে চললে তবেই এর সবদিক ঠিক থাকবে। যেন লক্ষ্যে পৌছানোর জন্যে সুশৃঙ্খল হয়ে থাকাই এর একমাত্র শর্ত। নয়ত পতন অবধারিত। অকালের ছুটি। মানুষ বুঝি এমনই। জীবন বুঝি এমনই। জীবনভর পরীক্ষিত হওয়ার এই যে কঠিন দায়বদ্ধতা,অনুমানের বাইরে যেয়ে তাকে কোনমতে বিচার করার সাহস হয়না। অথচ জীবন বলতেই থাকে ভয়, আনন্দ। শোক-তাপ। ক্ষোভ, লজ্জা। বেদনা, বিতৃষ্ণা। সাফল্য, ব্যর্থতা। সব নিয়েই হাটে মানুষ। সব নিয়ে চলে। বাকীদের সাধ্যমত খেলাও দেখিয়ে যায় তারা। মরন-বাঁচন নিয়ে এ এক অদ্ভুত ভারসাম্যের খেলা মানুষের। এ খেলায় যত চমক, তত অর্জন , তত হাততালি। জীবন কি আসলেই তবে কেবল খেলা দেখিয়ে যাওয়া? [caption id="attachment_11026" align="alignleft" width="640"]‘The Spellbinders’ photography project: PHOTOS  BY MOHAMMAD MONIRUZZAMAN ‘The Spellbinders’ photography project: PHOTOS BY MOHAMMAD MONIRUZZAMAN[/caption] চলবে--------------একুশের জন্য দেশ-প্রবাসের জীবনধারা, প্রাবন্ধিক ডালিয়া নিলুফার-এর ধারাবাহিক - 'ভগমানের পিত্থীমি' Picture courtesy: THE SPELLBINDERS Series from thedailystar.net | PHOTO BY MOHAMMAD MONIRUZZAMAN [caption id="attachment_11021" align="alignnone" width="250"]ডালিয়া নিলুফার ডালিয়া নিলুফার । ভগমানের পিত্থীমি[/caption]

পুরাণ পিগম্যালিয়ন

পুরাণ পিগম্যালিয়ন

শান্তা মারিয়া : নিজের ভালোবাসা দিয়ে যিনি জয় করেছিলেন সম্ভব অসম্ভবের সীমানা—তার নাম পিগম্যালিয়ন (Pygmalion)। পিগম্যালিয়নের কাহিনী পাওয়া যায় ওভিদের মেটামরফোসিসে। পিগম্যালিয়নের কাহিনী গ্রিক পুরাণেও ছিল। সেখানে তিনি ছিলেন একজন রাজা এবং দেবী আফ্রোদিতির বিশেষ ভক্ত। তবে গ্রিক পুরাণে এই কাহিনী তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। ওভিদ এই কাহিনীর যে বর্ণনা দেন তা জনপ্রিয়তা পায়। এই কাহিনীতে মূলত চিত্রিত হয়েছে প্রেমের দেবী ভেনাসের অপার মহিমা। ভেনাসের বা আফ্রোদিতির জন্মস্থান ছিল সাইপ্রাস দ্বীপের নিকটবর্তী সমুদ্রে। এই দ্বীপে ভেনাসের পূজা হতো বিশেষ আড়ম্বরের সঙ্গে। সাইপ্রাসের এক যুবক ছিলেন পিগম্যালিয়ন। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা ভাস্কর। তার বিশেষ খ্যাতি ছিল নারীমূর্তি তৈরির জন্য। নারীমূর্তি নির্মাণে খ্যাতি লাভ করলেও তিনি বাস্তব জীবনে নারীদের পছন্দ করতেন না। কারণ তার চোখে পড়ত নারীর হাজারো দোষত্রুটি। কোনো নারীকেই তার চোখে নিখুঁত সুন্দরী বলে মনে হতো না। অবশেষে তিনি স্থির করলেন এমন এক নারীমূর্তি নির্মাণ করবেন যা শুধু নিখুঁতই হবে না, হবে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। জীবন্ত নারীর যেসব দোষত্রুটি থাকে তা থেকে মুক্ত হবে এই মূর্তি। নারী কত সুন্দর হতে পারে তা তিনি দেখাবেন এই মূর্তির মাধ্যমে। তিনি গজদন্ত দিয়ে নির্মাণ করতে শুরু করলেন সেই মূর্তি। দিনের পর দিন রাতের পর রাত পরিশ্রমের পর সম্পন্ন হলো সেই নারীমূর্তি। দেখতে তা এতই সুন্দর যে, পিগম্যালিয়ন মুগ্ধ হলেন নিজের সৃষ্টিতে। আর শেষ পর্যন্ত নিজের সৃষ্টির প্রেমে পড়লেন তিনি। দিনের পর দিন কাটতে লাগল আর সেই মূর্তিকে বেশি করে ভালোবাসতে লাগলেন পিগম্যালিয়ন। তিনি সেই মূর্তিকে আলিঙ্গন করতেন, চুম্বন করতেন। তার সঙ্গে কথা বলতেন। তার জন্য উপহার নিয়ে আসতেন। তাকে বিভিন্ন পোশাকে সজ্জিত করতেন। তাকে রাতে তিনি নিয়ে আসতেন নিজের শয্যায়। তার কাছে সে ছিল যে কোনো জীবন্ত মানবীর মতো। সে ছিল তার প্রেমিকা। কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ মূর্তি তো তার কোনো ভালোবাসারই প্রতিদান দিতে পারত না। পিগম্যালিয়ন গভীর বিষাদে ডুবে যেতে লাগলেন। কারণ তার প্রেমিকা কোনো সাড়াই দিতে পারত না প্রেমিকের শত সোহাগের। তিনি অন্তরের গভীর থেকে জানতেন তার প্রেমিকা এক নিষ্প্রাণ পুতুল মাত্র। সে কোনো দিনই তার ভালোবাসায় সাড়া দেবে না। তবু তিনি তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারলেন না। তার পরিবর্তে কোনো জীবন্ত নারীকে ভালোবাসার কথা ভাবতে পারলেন না। তিনি একান্তভাবে বিশ্বস্ত রইলেন এক পুতুলের প্রতি। পিগম্যালিয়নের এই ব্যর্থ প্রেম চোখে পড়ল প্রেমের দেবী ভেনাসের। তিনি বুঝতে পারলেন পিগম্যালিয়ন প্রকৃত প্রেমিক। কারণ একমাত্র প্রকৃত প্রেমিকই কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশা না করে নিঃশেষে নিজের ভালোবাসা সমর্পণ করতে পারে। এদিকে সাইপ্রাসে শুরু হলো ভেনাসের পূজার উত্সব। দেবীর জন্মের পর এই দ্বীপই তাকে প্রথম সাদরে গ্রহণ করেছিল। দেবীকে সাইথিয়াও বলা হতো। সাইপ্রাসে ভেনাসের পূজা হতো সাড়ম্বরে। ভেনাসের মন্দির প্রাঙ্গণে পূজা দিতে আসত অসংখ্য মানুষ। প্রেমিক-প্রেমিকারা আসত দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজেদের প্রেমকে আরও দৃঢ় করতে। যারা এখনও কারো প্রেম লাভের সৌভাগ্য পায়নি তারা আসত দেবীর সুনজর প্রত্যাশা করে। আবার অনেক হতাশ প্রেমিক-প্রেমিকা আসত তাদের প্রেমাস্পদের ভালোবাসা লাভে দেবীর সাহায্য প্রার্থনা করতে। পিগম্যালিয়ন দেবীর মন্দিরে পূজা দিতে গেলেন। দেবীকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, তার সৃষ্ট নারীমূর্তির অনুরূপ কোনো নারীকে তিনি পাবেন কি না। তবে মনে মনে তিনি চাচ্ছিলেন যেন তার প্রেমিকা-মূর্তিই জীবন লাভ করে। তবে সেটি এতই অসম্ভব প্রার্থনা যে, তিনি সাহস করে তা জানাতে পারলেন না। তবে দেবী তার মনের কথা বুঝে নিতে দেরি করলেন না। দেবী তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। আর তার প্রতীক হিসেবে দেবীর বেদীতে যে অগ্নিশিখা ছিল তা তিনবার উজ্জ্বলভাবে জ্বলে উঠল। পিগম্যালিয়ন ঘরে ফিরলেন। বরাবরের মতোই তিনি স্পর্শ করলেন মূর্তিটিকে। মনে হলো যেন তার স্পর্শে শীতলতার পরিবর্তে পাওয়া গেল উষ্ণতা। তিনি চুম্বন করলেন তাকে। আবার মনে হলো যেন তা মানবীর ঠোঁটের মতো কোমল। পিগম্যালিয়ন মনে করলেন এসবই তার মনের ভুল। কিন্তু তিনি যেন অনুভব করলেন মূর্তির ভিতরে প্রাণের স্পন্দন। পিগম্যালিয়ন এবার জড়িয়ে ধরলেন তার প্রিয়তমাকে। আর তার আলিঙ্গনের ভিতরেই ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল সেই মূর্তি। সে পরিণত হলো রক্তমাংসের এক জীবন্ত নারীতে। এই অসম্ভব ঘটনায় দারুণ বিস্মিত হলেন পিগম্যালিয়ন। তবে তিনি বুঝলেন, এ সবই দেবী ভেনাসের কৃপা। দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল তার মন। পিগম্যালিয়ন তার প্রেমিকার নাম রাখলেন গ্যালাতিয়া। পিগম্যালিয়ন ও গ্যালাতিয়ার বিয়েতে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং ভেনাস। তার বরদানে আমৃত্যু সুখে বসবাস করলেন এই প্রেমিক জুটি। প্যাফোস নামে তাদের একটি সন্তান হয়। তার নামে একটি নগরীর নামকরণ করা হয় যেখানে দেবী ভেনাস পূজিত হতেন বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে। রোমানরা গ্রিকদের মতো কল্পনাবিলাসী ও কাব্যপ্রেমী ছিল না। তাদের মতো তাদের পুরাণও ছিল বাস্তব-ঘনিষ্ঠ। কিন্তু পিগম্যালিয়নের কাহিনীতে প্রমাণিত হয় বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি বিশিষ্ট রোমানরাও ভালোবাসার অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করতে কুণ্ঠিত ছিল না মোটেই।
সূত্রঃ বর্তমান

মান্না দে’র কিছু সেরা গান – প্রায় আটঘন্টা বিরতিহীন মান্না দে...

মান্না দে’র কিছু সেরা গান - প্রায় আটঘন্টা বিরতিহীন মান্না দে ... দীর্ঘ সাত দশক ধরে স্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন মান্না দে। তাঁর গাওয়া কিছু গান নিয়ে এই শ্রদ্ধার্ঘ। http://www.youtube.com/playlist?list=PLz1px4Skoxsu9jvO_Pp3qeFhjyk_1UfqN

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.