Home টপ নিউজ

টপ নিউজ

রাঘববোয়ালরা অধরাঃ ঋণখেলাপির তালিকায় শুভংকরের ফাঁকি

রাঘববোয়ালরা অধরা

ঋণখেলাপির তালিকায় শুভংকরের ফাঁকি

ব্যাংকের যোগসাজশে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক প্রভাবশালী
* দায় এড়াতে পারেন না অর্থমন্ত্রী, বিশেষ করে সরকারের শক্তিশালী অংশের হস্তক্ষেপ ছাড়া এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়েনি। ফলে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া এ অবস্থার উন্নতিও হবে না -খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ * লুটপাটের অবসান চাই, বিচারহীনতার কারণে ব্যাংকে এ অরাজকতা -ড. বদিউল আলম মজুমদার
সমাজের সব ক্ষেত্রে এখন রাঘববোয়ালরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কোনোভাবেই কেউ তাদের টিকিটি পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারছে না। বুধবার সংসদে উত্থাপন করা ঋণখেলাপিদের তালিকায়ও এর প্রমাণ মিলেছে। যারা সমাজে বড় বড় ঋণ খেলাপি ও ব্যাংক জালিয়াত হিসেবে পরিচিত তাদের নাম তালিকায় নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতার বদৌলতে আইনের ফাঁক গলিয়ে তারা পার পেয়ে গেছেন। এমনটি মনে করেন ব্যাংক সেক্টরের বিশ্লেষকদের অনেকে। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানেও দেখা গেছে, খেলাপি হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যোগসাজশের মাধ্যমে ব্যাংক কৌশলে প্রভাবশালীদের খেলাপির বাইরে রেখেছে। সঙ্গত কারণে জাতীয় সংসদে প্রকাশিত ১০০ শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকা এখন বিতর্কিত। এভাবে বড় জালিয়াতদের আড়াল করার ফলে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করার মতো সরকারের ভালো উদ্যোগটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বুধবার সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু তালিকায় কোন প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ কত টাকা, তা প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে খেলাপি ঋণের পরিমাণসহ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই তালিকায়ও যারা বড় বড় খেলাপি তাদের নাম আসেনি। যে কারণে তখনও এ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়। এদিকে এবারও যেসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে ব্যাংকিং খাতের চিহ্নিত রাঘববোয়ালরা নেই। তাদেরকে বাদ রেখেই ওই তালিকা করা হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, আইনের ফাঁক গলিয়ে, আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে বা ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপিসহ সব ধরনের অপকর্মের দায় অর্থমন্ত্রীকে নিতে হবে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের অনিয়মের দায় তিনি কিছুইতে এড়াতে পারেন না। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ সদস্যরা ঋণখেলাপি হওয়া খুবই উদ্বেগজনক। এতে বোঝা যাচ্ছে, ঋণের নামে ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যারা সংসদে আইন প্রণয়ন করেন, তারাই যদি আইন লঙ্ঘন করেন তাহলে কার জন্য এ আইন? কে মানবে এসব আইন। তিনি আরও বলেন, কোনো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে পুরো গ্রুপ খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে নীরব। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের এটি খতিয়ে দেখতে হবে। তার মতে, একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে এসব অসঙ্গতি খতিয়ে দেখা উচিত। কিভাবে বড় বড় খেলাপিরা বা জালিয়াতরা খেলাপির তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে সেটিও দেখা উচিত। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যমুনা টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণের সময় অর্থমন্ত্রী কী করেছেন। তিনি তো কিছু করতে পারেননি। তার মানে খেলাপিরা তার চেয়ে শক্তিশালী। এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের মালিক তো সরকার। তাই এর দায় কোনোভাবে সরকার তথা অর্থমন্ত্রী এড়াতে পারবেন না।’ অপর দিকে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের একটি অংশ শিক্ষিত এবং আগে থেকে সম্পদশালী। আরেকটি অংশের স্বাধীনতার পর সেভাবে অর্থসম্পদ ছিল না। তারা চুরি বাটপারি করে ব্যাংকের মালিক হয়েছেন। তিনি বলেন, লক্ষ্য করে দেখুন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা থাকেন। একেবারে মালিকপক্ষের লোক। তাহলে কী হবে। মালিকরা যেভাবে চাইবেন সেভাবে হবে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও তাই। সেজন্য বলতে পারি, সরকারের শক্তিশালী অংশের হস্তক্ষেপ ছাড়া এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়েনি। ফলে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া এ অবস্থার উন্নতিও হবে না। ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, মালিকদের কথা ব্যাংকারদের শুনতে হয়। না শুনলে চাকরি চলে যায়। তাই চাকরি হারানোর ভয়ে তারা মালিকদের ছাফাই গায়। অবশ্য মালিকরা এক কোটি খেলে, ব্যাংক কর্মকর্তারা সেখানে দুই লাখ ভাগ পায়। তিনি বলেন, দুঃখের বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হল জনগণের আমানতের টাকা হেফাজত করা। অথচ তা না করে তারা নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত। কেননা, আইনের অনেক কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা দেয়া আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা অভিযুক্ত ব্যাংক মালিকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যেসব বড় খেলাপির নাম প্রকাশ করা হয়নি, তা যত না আইনি জটিলতা, তার থেকে রাজনৈতিক সমস্যা বেশি। তবুও যাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, এটা প্রাথমিক উদ্যোগ। এখন যারা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত তাদের যেন আর নতুন ঋণ দেয়া না হয়। এ ছাড়া এসব খেলাপিকে সব ধরনের নীতিসহায়তা থেকে বঞ্চিত করতে হবে। তা না হলে শুধু নাম প্রকাশ করে কোনো কাজ হবে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, শুধু নাম প্রকাশই যথেষ্ট নয়; তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপিসহ বিভিন্ন কু-কর্মে যারা জড়িত, তাদের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, বরং কখনও কখনও উল্টো সুরক্ষা দিয়েছে। অথচ তাদের অপকর্মের বোঝা টানছে সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংকগুলোকে করের টাকা থেকে বারবার পুঁজিসহায়তা করা হয়েছে। এর দায় সরকার কিছুতে এড়াতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন। তাদের কাছে অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী জানান, খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকের সংখ্যা ৮৮টি। এর মধ্যে সোনালি ব্যাংকে ১৮ হাজার ৬৬২ কোটি, জনতা ব্যাংকে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে ৯ হাজার ২৮৪ কোটি, রূপালী ব্যাংকে ৪ হাজার ৯০১ কোটি, বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৭৬ কোটি, কৃষি ব্যাংকে ২ হাজার ১৭৮ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ২ হাজার ৩৩২ কোটি, পূবালী ব্যাংকে ২ হাজার ১১৬ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ৫ হাজার ৭৬ কোটি, ইসলামী ব্যাংকে ৩ হাজার ৫২০ কোটি আর প্রাইম ব্যাংকে ৩ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা খেলাপি রয়েছে। সূত্র জানায়, এর বাইরে আরও অনেক খেলাপি ঋণ রয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা অনেক ঋণখেলাপি হলেও সেগুলোকে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে খেলাপি হিসেবে দেখান না। নিজেদের দুর্নাম এড়াতে তারা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখান। এতে বিশেষ করে প্রভাবশালী ঋণ গ্রহীতারা খেলাপি তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এরকম অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণকে খেলাপি করা হয়। প্রতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হয়। এর বাইরে আরও অনেক ঋণ থেকে যায়, যেগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য, অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক শনাক্ত করতে পারছে না। কিন্তু একটি পর্যায়ে এগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ জনতা ব্যাংক প্রথমে খেলাপি করেনি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে খেলাপি করা হয়। কিন্তু ওই তালিকায় তাদের সব প্রতিষ্ঠানের নাম আসেনি। এসেছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম। এগুলো হচ্ছে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যার। অ্যানন টেক্স গ্রুপের ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু জনতা ব্যাংক এখনও তা খেলাপি করেনি। হলমার্ক গ্রুপ এখন সবচেয়ে বড় খেলাপি। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গ্রুপের একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান খেলাপির তালিকায় এসেছে। এটি হচ্ছে হলমার্ক ফ্যাশনস। বাকিগুলো আসেনি। বেসিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে। এগুলো গেছে ছোট ছোট অংকে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ ৫টি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে। অথচ তাদের দুটি প্রতিষ্ঠান শীর্ষ তালিকায় এসেছে। এগুলো হচ্ছে সাহারিশ কম্পোজিট টাওয়েলস ও বিসমিল্লাহ টাওয়েলস। একটি সরকারি ব্যাংকের রমনা শাখা থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের নামে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে একসঙ্গে আসেনি। এর মধ্যে ফেয়ার ফ্যাশনের নামে-বেনামে রয়েছে ৭শ’ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। সোহেল গ্রুপ একটি বেসরকারি ব্যাংক ও সরকারি জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাদের নাম তালিকায় আসেনি। অলটেক্স গ্রুপের একটি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ রয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এসব ঋণ আছে। তালিকায় এসেছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের নাম। চট্টগ্রামের ইমাম গ্রুপের খেলাপি ঋণ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। তাদের নাম তালিকায় আসেনি। এ রকম অনেক বড় বড় গ্রুপের নাম তালিকায় আসেনি। এছাড়া অনেক গ্রুপ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে খেলাপি ঋণকে নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখাতে ব্যাংককে বাধ্য করে। ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের তালিকা করছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। গ্রুপভিত্তিক তালিকা করছে না। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপির নাম আসছে না। আসছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। এসব কারণে বড় খেলাপিরা তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বড় খেলাপিদের নাম শীর্ষ খেলাপির তালিকায় আসছে না। কারণ তাদের অনেকে ব্যাংকের মালিক। ফলে ব্যাংকাররা তাদের নাম খেলাপির তালিকায় তুলছেন না। তারা নানা কৌশলে তা লুকিয়ে রেখেছেন।
সুশীল সমাজ, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, শুধু চুনোপুঁটিদের নাম প্রকাশ করেই অর্থমন্ত্রী ব্যাংকিং খাতের লুটপাটকারীদের দায় এড়াতে পারেন না। এছাড়া তিনি কোনো শাস্তির ঘোষণাও দেননি। সুতরাং ব্যাংকিং খাতের খেলাপিসহ সব অপকর্মের দায় তিনি এড়াতে পারেন না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা মেরে ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ধনীর সংখ্যা বাড়ার খবর প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বের মধ্যে ধনী হওয়ার সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। মূলত বিচারহীনতার কারণে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। আমরা এ খাতে লুটপাটের অবসান চাই। তিনি আরও বলেন, বাস্তব কারণে কেউ খেলাপি হলে সেটা নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ধরতে হবে। তা না হলে এ অরাজকতা আরও বেড়ে যাবে। অর্থমন্ত্রীর দেয়া তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের ইলিয়াস ব্রাদার্স। তাদের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পুরো ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তাদের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম খেলাপির তালিকায় এসেছে। এর খেলাপি ঋণ ৩০০ কোটি টাকা। আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা কিছু ঋণ নিয়মিত রাখার সুযোগ পেয়েছে। সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর মালিকানাধীন মুন্নু ফেব্রিক্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৩০ কোটি টাকা। তাদের গ্রুপের আরও প্রতিষ্ঠান রয়েছে ঋণ খেলাপি, যেগুলোর নাম আসেনি। সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সংসদে থাকা আওয়ামী লীগের এমপি আসলামুল হকের নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি ও রাজশাহীর এমডি এনামুল হকের নর্দান পাওয়ার সল্যুশনের খেলাপির তালিকায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু আসলামুল হকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকেই ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। যার বড় অংশই খেলাপি। নারায়ণগঞ্জের ফজলুর রহমানের মালিকানাধীন রহমান গ্রুপের একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান রহমান স্পিনিং মিলসের নাম এসেছে খেলাপির তালিকায়। তাদের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও খেলাপি। কিন্তু তাদের ঋণের পরিমাণ কম তালিকায় আসেনি। মেজর (অব.) আবদুল মান্নান পরিচালক থাকার সময়ে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে ৫১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ শোধ করতে পারছে না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন খেলাপি। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির দায়ে একটি আলোচিত গ্রুপের গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ডায়িং কোম্পানিকে খেলাপির তালিকায় দেখানো হয়েছে। আরও একটি শিল্প গ্রুপের প্রতিষ্ঠান গ্লোব মেটাল কমপ্লেক্সকে খেলাপির তালিকায় রয়েছে। তালিকায় থাকা জাপান-বিডি সেক প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারসের রূপালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০৮ কোটি টাকা।

দেশে ঋণখেলাপি দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন: অর্থমন্ত্রী

দেশে ঋণখেলাপি দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন: অর্থমন্ত্রী

চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত হিসাবে দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন। তাদের কাছে অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে বুধবার সংসদের বৈঠকে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে বিকেল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয় এবং মন্ত্রীদের জন্য প্রশ্ন জিজ্ঞাসা পর্ব টেবিলে উত্থাপন করা হয়। সংরক্ষিত আসনের সদস্য পিনু খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির নাম তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বরাবরের মতো ইলিয়াস ব্রাদার্স, কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেম, রেমিক্স ফুটওয়্যার, ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, রুবিয়া ভেজিটেবল ইন্ডাস্ট্রিজ, রাইজিং স্টিল, ঢাকা ট্রেডিং হাউস, বেনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আনোয়ারা স্পিনিং, ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্ট, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী নিটওয়্যার, সিদ্দিক ট্রেডার্স, রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার, অললপা কম্পোজিট টাওয়েলস, হলমার্ক ফ্যাশন, মুন্নু ফেব্রিকস, ফেয়ার ইয়ার্ন প্রসেসিং, ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিকস, সাহারিশ কম্পোজিট টাওয়েলস, মার্ক ইন্টারন্যাশনাল, সুরুজ মিয়া জুট স্পিনিং মিলস, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম, সালেহ কার্পেট মিলস, পদ্মা পলি কটন নিট ফেব্রিকস, এস কে স্টিল, হেলপলাইন রিসোর্সেস, এইচ স্টিল রিরোলিং, অটবি, বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, তাইপে বাংলা ফেব্রিকস, ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি, টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিট, তানিয়া এন্টারপ্রাইজ ইউনিট-২, সিপ সিজন অ্যাপার্টমেন্ট, ইসলাম ট্রেডিং কনসোর্টিয়াম, রহমান স্পিনিং মিলস, জাপান-বিডি সেক প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি, সেমাটসিটি জেনারেল ট্রেডিং, এম কে শিপ বিল্ডার্স, কটন করপোরেশন, ন্যাশনাল স্টিল, এম বি এম গার্মেন্ট অ্যান্ড টেক্সটাইল, সোনালী জুট মিলস, এক্সপার টেক লিমিটেড, ওয়ালমার্ট ফ্যাশন, সাদ মুসা ফেব্রিকস, চিটাগং ইস্পাত, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, হিমালয়া পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, আমাদের বাড়ি লি., ইমদাদুল হক ভুইয়া, চৌধুরী টাওয়েল, চৌধুরী লেদার, আর্থ এগ্রো ফার্ম, নর্দার্ন পাওয়ার সল্যুশন, ম্যাক শিপ বিল্ডার্স, দি আরব কনট্রাক্টরস, ওয়ান ডেনিম মিলস, লিবার্টি ফ্যাশন ওয়্যার, বিশ্বাস গার্মেন্ট, মাস্টার্ড ট্রেডিং, হিনদুলওয়ালী ট্রেডিং, সগির অ্যান্ড ব্রাদার্স, গ্লোব মেটাল কমপ্লেক্স, অরনেট সার্ভিসেস, জালাল অ্যান্ড সন্স, করোলা করপোরেশন, সাইদ ফুড, অ্যাপেক্স নিট কম্পোজিট, এস এ অয়েল রিফাইনারি, আলী পেপার মিলস, ড্রেজ বাংলা লিমিটেড, গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ডাইং, অর্জন কার্পেট অ্যান্ড জুট, ইন্ট্রাকো সিএনজি, ফরচুন স্টিল, ফাইবার শাইন লি., দোয়েল অ্যাপারেলস, জাহিন এন্টারপ্রাইজ, মজিবর রহমান খান, কেয়ার স্পেশালাইজড হসপিটাল, জয়নাব ট্রেডিং, তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ, অ্যাপেক্স ওয়েভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস, রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, দি ওয়েল টেপ, ডেলটা সিস্টেম, টেলিবার্তা, এম আর সোয়েটার কম্পোজিট, রেপকো ফার্মসিউটিক্যালস, মাবিয়া শিপ ব্রেকিং, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, নর্দান ডিস্টিলারিজ, নিউ রাখি টেক্সটাইলস, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, শফিস স্টিল, জারিস কম্পোজিট নিট ইন্ডাস্ট্রিজ ও হিলফুল ফুজুল সমাজকল্যাণ সংস্থা। অর্থমন্ত্রী জানান, খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকের সংখ্যা ৮৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যাংকগুলো হলো- সোনালী ব্যাংক ১৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ৯ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক ৪ হাজার ৯০১ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক ৮ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংক ২ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ২ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ৩ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। নিজাম উদ্দিন হাজারীর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকূলে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার আশ্বাস ছিল ৩৬১ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণের পরিমাণ ৩৬০ মিলিয়ন এবং অনুদান ১ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার। এসব সাহায্যের মধ্যে এ পর্যন্ত ১৮৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঋণের পরিমাণ ১৮৫ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার এবং অনুদান ২ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। নুরুন্নবী চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জাব্বার বলেন, ২০১৭-১৮ সালে বৈদেশিক কল থেকে ৯০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। তবে এই আয় গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বৈদেশিক কল থেকে সর্বাধিক ১ হাজার ৭৬২ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে ২০১৩-১৪ সালে। সব মিলিয়ে গত ৯ বছরে বৈদেশিক কল থেকে ১২ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে।

বিশ্বে ‘অতি ধনী’ মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে বাংলাদেশে

বিশ্বে 'অতি ধনী' মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে বাংলাদেশে

মোয়াজ্জেম হোসেন | বিবিসি বাংলা, লন্ডন

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিশ্বে 'অতি ধনী' মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে বাংলাদেশে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে এই তথ্য দেয়া হচ্ছে।

অতি ধনী বা 'আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ' (ইউএইচএনডাব্লিউ) বলে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয় যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার বা তার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যাদের সম্পদ আড়াইশো কোটি টাকার বেশি, তারাই 'অতি ধনী' বলে গণ্য হবেন।

লন্ডন ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান 'ওয়েলথ এক্স' গত সপ্তাহে এই অতি ধনীদের ওপর সর্বশেষ রিপোর্টটি প্রকাশ করে।

এতে দেখা যাচ্ছে বিশ্বে অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। সেদেশে 'অতি ধনী' মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার।

ওয়েলথ এক্স এর রিপোর্টে বাংলাদেশ শীর্ষে

দ্বিতীয় স্থানে আছে জাপান। তাদের অতি ধনী সংখ্যার মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। আর প্রায় ১৭ হাজার অতি ধনী মানুষ নিয়ে চীন আছে তৃতীয় স্থানে।

তালিকায় প্রথম দশটি দেশের তালিকায় আরও আছে জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড এবং ইটালি।

সবার শীর্ষে বাংলাদেশ

কিন্তু অতি ধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতহারে বাড়ছে যেসব দেশে, সেই তালিকায় আছে বাংলাদেশ সবার উপরে। ওয়েলথ এক্স এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৭ দশমিক তিন শতাংশ হারে এদের সংখ্যা বাড়ছে।

দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন। সেখানে অতি ধনীর সংখ্যা বাড়ছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। এরপর আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত হংকং এবং আয়ারল্যান্ড।

ওয়েলথ এক্স তাদের রিপোর্টে বলছে, 'আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ' বা অতি ধনী মানুষের সংখ্যা গত ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চীন এবং হংকং এ। এর বিপরীতে জাপান, কানাডা, ইটালি এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ধনী তৈরি হওয়ার গতি ধীর হয়ে এসেছে।

শিল্প খাতের পর ব্যাংক-বীমার মতো সেবা খাতেও বিনিয়োগ করছেন অনেকে।

ওয়েলথ এক্স বলছে, যদি বিশ্ব পরিসরে দেখা হয়, অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, নতুন ধনী তৈরির ক্ষেত্রে চীন এখন আর শীর্ষে নয়। সেখানে বাংলাদেশ সবার চেয়ে এগিয়ে।

২০১২ সাল হতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৭ শতাংশ হারে অতি ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। ভিয়েতনাম, কেনিয়া এবং ভারতও খুব বেশি পিছিয়ে নেই।

কারা এই অতি ধনী

অতি ধনীর সংখ্যা যে বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে, এই তথ্যে অর্থনীতিবিদরা মোটেই বিস্মিত নন।

ঢাকার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড: ফাহমিদা খাতুন বলেন, "এই তথ্য থেকে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরণের সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে। এই সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো একদিনে তৈরি হয়নি। এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে। এখন এটি আরও দ্রুততর হচ্ছে।"

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গত কয়েক বছর ধরেই বেশ ভালো। তবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এমন অনেক বড় বড় দেশ বিশ্বে রয়েছে। যেমন চীন এবং ভারত।

কিন্তু এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে তাদের চেয়েও বাংলাদেশে ধনী লোক তৈরি হওয়ার হার অনেক বেশি। এটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে?

এ প্রশ্নের উত্তরে ড: ফাহমিদা খাতুন বলছেন, চীন এবং ভারতে একসময় যে রকম দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, সেখান থেকে অবস্থা একটু স্তিমিত হয়ে এসেছে। সেটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে ধনী এবং গরীবের মধ্যে যে তফাৎ, এই তফাৎ অনেক বাড়ছে।

"বাংলাদেশে সম্পদের একটা কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। অর্থাৎ উপরের দিকে যারা আছে তারা সম্পদশালী হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। নীচের দিকে যারা আছে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি যতটা না হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি উন্নতি হচ্ছে উপরের দিকে যারা তাদের। উপরের পাঁচ শতাংশের হাতে আরও বেশি করে সম্পদ পুঞ্জীভুত হচ্ছে" - বলেন তিনি।

দুর্নীতির ভূমিকা কতটা?

বাংলাদেশে যারা অতি ধনী, তারা কোন কোন খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে এই সম্পদ অর্জন করেছেন?

ড: ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূলত শিল্প খাত এবং সেবা খাত, এই দুটি খাতেই তারা বিনিয়োগ করছে। শিল্প খাতে তৈরি পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প, চামড়া শিল্পে অনেকে বিনিয়োগ করেছেন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে এখন ভৌত অবকাঠামো সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখানে অনেক বড় বড় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।

"এসব প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত আছে, তাদের সবারই কিন্তু এখানে একটা সম্পদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর তার পাশাপাশি সেবা খাতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তথ্য প্রযুক্তিও একটি বিকাশমান খাত হিসেবে এসেছে।"

বাংলাদেশ অনেকের সম্পদশালী হওয়ার পেছনেই দুর্নীতির কথা শোনা যায়। এত বেশি সংখ্যায় অতি ধনী মানুষ তৈরির পেছনে কি এই দুর্নীতির কোন ভূমিকা আছে?

এ প্রশ্নের উত্তরে ড: ফাহমিদা খাতুন বলেন, "এ সম্পর্কে তো কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রীয় আনুকুল্য যারা পায়, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সম্পদের মালিক হয়।"

"আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেহেতু সুশাসনের অভাব থাকে বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকে, তখন এই সুযোগটা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রয়ে যায়। খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী সম্পদের মালিক হয়, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগাযোগ থাকে।"

বাংলাদেশিদের ফার্মেসি ব্যবসার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ

রিফিল’ নিয়ে কারসাজি, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রিসহ নানা অভিযোগে অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা:

শাহাব উদ্দিন সাগর: নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের ফার্মেসি ব্যবসার যত ব্যাপ্তি ঘটছে তত তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ জমা হচ্ছে। অনেক ফার্মেসির প্রাপ্য লাখ লাখ ডলার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আটকে দিয়েছে। এ সব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, রোগিদের নামে বরাদ্দ ওষুধের ‘রিফিল’ তুলে নেয়া ও মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়া ওষুধ কমদামে এনে তা বিক্রি করা। আবার কোন কোন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ফার্মেসির বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত করে সেগুলোকে সিলগালা করে দিয়েছে বলেও জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সময় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলো এসব ফার্মেসির এ ধরনের কর্মকান্ডকে ‘প্রকাশ্য ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফার্মেসির এই অনিয়মে রীতিমত বিস্মিত হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ফার্মেসিগুলোর অর্থ ইন্স্যুরেন্স আটকে দেয়া এবং অনেক ফার্মেসি সিলগালা করে দেয়ার পর তারা আবার নতুন জায়গায় নতুন নামে ফার্মেসি খুলে বসছেন। এদেশের মানুষের ওষুধের ব্যবস্থা করে থাকে ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলো। মেডিকেড বা মেডিকেয়ারের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা রোগির নামে প্রেসক্রিপশন সরাসরি পাঠিয়ে দেন ফার্মেসিতে। এসময় সাধারণত সেই ওষুধের দুই বা তিনটি ‘রিফিল’ তারা দিয়ে থাকেন। ডাক্তারের কাছে বার বার না এসে রোগি যাতে সহজইে ফার্মেসী থেকে সরাসরি ওষুধ তুলে নিতে পারেন তার জন্য কোন কোন ডাক্তার একই ওষুধের আরো বেশি ‘রিফিল’ দিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক রোগীই এসব ‘রিফিল’-এর ওষুধ ফার্মেসিগুলো থেকে তোলেন না। হয়ত তাদের রোগের উপশম হয়ে গেলে এই ওষুধের আর প্রয়োজন পড়ে না। আবার ডাক্তাররাও অনেক সময় ওষুধ বদল করে অন্য ওষুধ দেন। ফলে আগের ওষুধগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং রিফিলগুলিও অব্যবহৃত থেকে যায়। কিন্তু রোগিরা রিফিলগুলো ব্যবহার না করলেও অধিকাংশ ফার্মেসি তাদের নামের এই ‘রিফিল’-এর ওষুধ সুকৌশলে তুলে নিয়ে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর কাছে অর্থ দাবী করে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাপ্তাহিক আজকালকে বলেন, বাংলাদেশি মালিকানাধীন অধিকাংশ ফার্মেসি হরহামেশাই এ ধরনের কাজ করছে। এমনকি যে রোগি মাসের পর মাস যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকেন তাদের নামেও ‘রিফিল’ নেয়া হয়। যা গর্হিত অপরাধ। আর এটি আমাদের তদন্তে ধরা পড়ার পর আমরা হাজার হাজার ডলার জরিমানা করি। তিনি বলেন, তদন্তকালে রিফিল-এর ওষুধ নেয়ার সময় ফার্মেসিগুলোর রশিদে করা রোগির সাক্ষরেও মিল পাওয়া যায় নি। এ ব্যাপারে ফার্মেসিগুলোর যুক্তি হচ্ছে রোগিরা নিজেরা নন, তাদের স্বজনরা এই ওষুধ নিয়ে গেছেন। চলতি বছরের শুরুতে জ্যাকসন হাইটস ও জ্যামাইকার কয়েকটি ফার্মেসিতে এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়ার পর বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রায় সব ফার্মেসিতে সংশ্লিষ্টরা অভিযান পরিচালনা করেন। ‘রিফিল’ তুলে নেয়ার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসে। তারা কয়েকটি ফার্মেসির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও পান যা প্রায় অবিশ্বাস্য। অভিযান পরিচালনাকারী দলের এক সদস্য সাপ্তাহিক আজকালকে জানান, এমনও কিছু ফার্মেসি পাওয়া গেছে যারা মেয়াদ প্রায় উত্তীর্ণ হয়ে আসা ওষুধ কম দামে এনে তা রোগিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সম্প্রতি সিল-গালা করে দেয়া জ্যামাইকা ও জ্যাকসন হাইটসের দুটি বাংলাদেশি ফার্মেসীর নাম উল্লেখ করে তারা জানান এদের বড় অংকের অর্থ জরিমানা করা হয়েছে। ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিনের বাংলাদেশি মালিকানাধীন কয়েকটি ফার্মেসির বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এসব এলাকায় কোন কোন ফার্মেসি সিলগালা করা না হলেও তাদের একাউন্ট স্থগিত রাখা হয়েছে। তাদের অর্থ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। জ্যামাইকার অধিবাসী আশিকুর রহমান বলেন, আমি গত বছর তিন মাসের ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম। জ্যামাইকার একটি ফার্মেসিতে আমার ওষুধের রিফিল ছিল। কিন্তু আমি এসে দেখি আমার সব রিফিল শেষ। পরে বিষয়টি ফার্মেসির মালিককে জানালে তিনি আমার কাছে ভুল স্বীকার করেন এবং বলেন ‘এটি কম্পিউটারের ত্রুটি’। পরে অবশ্য আমাকে রিফিলগুলোর ওষুধ দেয়া হয়। জ্যাকসন হাইটসের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, ডাক্তার প্রায় সময় আমার নামে রিফিল পাঠান। আমি অনেক সময় তা নিই না। কিন্তু মেট্রোপ্লাস থেকে পাঠানো বিলে দেখতে পাই আমার সব ওষুধ তুলে নেয়া হয়েছে। এ এক ধরনের ডাকাতি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

লস এঞ্জেলেসের অদূরে সান্তা ক্লারিতা ভ্যালীতেও এই ধরনের অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে।   

http://www.hometownstation.com/santa-clarita-news/politics/santa-clarita-elections/update-santa-clarita-city-council-candidate-faces-complaint-over-pharmacy-40961 Google Search link with 'Moazzem chowdhury pharmacy fraud' https://www.google.com/search?q=moazzem+chowdhury+pharmacy+fraud&oq=Moazzem+&aqs=chrome.1.69i57j35i39j0l2.4986j0j4&client=ms-android-huawei&sourceid=chrome-mobile&ie=UTF-8  

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অপেক্ষায় এস কে সিনহাঃ বইয়ের পেছনে কারা খুঁজে...

[caption id="attachment_22706" align="alignleft" width="620"] ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে নিজের লেখা বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা[/caption]

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেন সিনহা

ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে নিজের লেখা বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। শনিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে তার বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার বিষয়ে সিনহা বলেন, ‘এদেশে আমার কোনও স্ট্যাটাস নেই। আমি একজন শরনার্থী। আমি এখানে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছি কিন্তু এখনও এর কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’ [caption id="attachment_22705" align="alignleft" width="300"] ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে নিজের লেখা বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম[/caption] সিনহা দাবি করেন, ‘তিনি লন্ডনের হাউজ অব কমনস, জেনেভা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকেও দাওয়াত পেয়েছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত না হওয়ার কারণে তিনি সেখানে যেতে পারছেন না।’ অনুষ্ঠানে সাবেক বিচারপতি জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বোধ করছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি এত ভীত থাকি যে, আমি ২৪ ঘণ্টা বাসাতেই থাকি।’ তিনি দাবি করেন, ‘ডিজিএফআই’র কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে তার বাসা সব সময় মনিটর করে এবং যারা তার বাসায় যায় তাদের ছবি তোলা হয়। বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই সরকার ভারতের সমর্থন পায়। শুধু তাই না, ২০১৪-এর নির্বাচনের পরে ভারত যুক্তরাষ্ট্র এবং কয়েকটি ইউরোপিয়ান দেশকে বুঝিয়েছিল এই সরকারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য।’ [caption id="attachment_22704" align="alignleft" width="400"] ওয়াশিংটন প্রেস ক্লাবে নিজের লেখা বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম[/caption] ভারত বাংলাদেশকে নিজেদের লাভের জন্য সমর্থন দিচ্ছে জানিয়ে সিনহা বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন করে কারণ আওয়ামী লীগ সেখানে ভারত বিরোধী সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ক্যাম্প বন্ধ করে দিয়েছে।’ তবে এধরনের সমর্থন ভারতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটি শেষ পর্যন্ত ভারতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তাদের ‘দুটি পাকিস্তানের’ মুখোমুখি হতে হবে।” এ সময় তিনি দাবি করেন, বই প্রকাশের জন্য কারও কাছ থেকে কোনও আর্থিক সহায়তা তিনি নেননি। ৮০০ পৃষ্ঠার বইয়ে তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে কেবল নিজের শেষ দিনগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

সিনহার বইয়ের পেছনে কারা খুঁজে বের করুন:

[caption id="attachment_22709" align="alignleft" width="350"] প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী। ছবি-যুগান্তর[/caption] প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার আত্মজীবনীমূলক বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল’, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ প্রকাশের পেছনে কারা ইন্ধন দিয়েছে তা খুঁজে বের করতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে জানি, কিন্তু আমি আপনাদের বলব না। বরং আমি আপনাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে চাই এবং আমি চাই এই বই প্রকাশের পেছনে কারা রয়েছে তা আপনারা খুঁজে বের করবেন।’ প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে তার অংশগ্রহণ সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিচারপতি সিনহা ওই বইয়ে তার পদত্যাগের কারণ তুলে ধরেছেন। ‘এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল’, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ বইয়ের কপিরাইট হচ্ছে ললিতমোহন-ধনাবাতি মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের নামে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে এর প্রকাশনা উৎসবের কথা ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি কতবার বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে আনা হয় তা সাংবাদিকদের খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই বই প্রকাশনায় কারা অর্থ দিয়েছে এবং আপনাদের মতো কোনো সংবাদপত্রের সাংবাদিক এর সঙ্গে জড়িত কিনা এবং কি পরিমাণ অর্থ দিয়েছে তা অনুগ্রহ করে উন্মোচন করুন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো বড় আইনজীবী এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি সংশোধন করে দিয়েছেন কিনা অথবা কোনো সংবাদপত্র অথবা এর মালিক এর পৃষ্ঠপোষক কিনা তা আপনারা খুঁজে বের করুন।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এ সময় মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ-বিন-মোমেন সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে সিনহার ভাইয়ের নামে একটি বাড়ি কেনা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে বাড়ি কেনা কঠিন কিছু নয়। বিপুল দামের কারণে বাংলাদেশে কেনা কঠিন। অর্থ জমা করলে যুক্তরাষ্ট্রে যে কেউ বাড়ি কিনতে পারেন। শেখ হাসিনা বলেন, কে এবং কিভাবে এই বাড়ি কিনেছে সে ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আপনারা খুঁজে বের করুন এবং তথ্য দিন। যদি কোনো ব্যক্তি এ ব্যাপারে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বইঃ  ‘এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল’, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’

https://drive.google.com/file/d/1WknV34NNIjb8EdXkBt6DE78PCZNrLIlC

দুর্দান্ত জয়ে নতুন স্বপ্ন – এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ

মোস্তাফিজ শেষ বলটি করতেই আবুধাবির গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়লো আনন্দ। ক্রিকেট ভক্তরা লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে ততক্ষণে ‘মাশরাফি…বাংলাদেশ’ বলে চিৎকারে মত্ত। আবুধাবি স্টেডিয়ামের ডিজেও চুপ থাকবেন কেন! তিনিও ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ গানটি বাজিয়ে দিয়েছেন। সেই গানের আনন্দে গ্যালারির উচ্ছ্বাস যেন আরও বেড়ে গেল।

এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কজনই বা ভেবেছিলেন এমনটা। কিন্তু বুধবার পাকিস্তান বাধা পেরিয়ে তৃতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে মাশরাফিরা। ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে শিরেপো বঞ্চিত হয়েছিল বাংলাদেশ। মিরপুরের বদলা মাশরাফিরা আবুধাবিতের ষোলো আনায় উসুল করে নিল। টানা দুইবার ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। যদিও আগেরবার টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ছিল এই টুর্নামেন্টটি। ৩২ বছর ধরে এশিয়া কাপ খেলা টাইগারদের সেরা সাফল্য ২০১২ সালে পাকিস্তান এবং ২০১৬ সালে ভারতের বিপক্ষে হেরে রানার্স-আপ হওয়া। এশিয়া কাপেই প্রথমবার পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ। এই টুর্নামেন্টের ৩৪ বছরের ইতিহাসে ১৩ আসরের মধ্যে ১২ আসরে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে ১১বার মুখোমুখি হয়ছে দুই দল। সবকটি ম্যাচেই হারের বেদনা নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল বাংলাদেশ। তবে এবার এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের বৃত্তটা ভেঙে জয়ের সূচনা হলো আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেই মাশরাফির নেতৃত্বেই পেল এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্বাদ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানকে পেলেই বাংলাদেশ জ্বলে ওঠে আপন শক্তিতে। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে সবশেষ চার মুখোমুখির সবকটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল পাকিস্তান। হাসান আলী-সরফরাজদের বিপক্ষে পুরনো সুখস্মৃতি নিয়েই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। যদিও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা বাংলাদেশের জন্য সহজ ছিল না। তামিমকে হারিয়ে এমনিতেই ধুঁকছে বাংলাদেশের টপ অর্ডার। টসের সময় জানা গেল আঙুলের পুরনো ব্যথা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া কাপ থেকেই ছিটকে গেছেন সাকিব। তামিমের পর সাকিবকে হারিয়ে ভঙ্গুর বাংলাদেশের কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হলো। দলীয় ১২ রানে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠিয়ে শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পাকিস্তান। উদ্বোধনী ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও ত্রাতার ভূমিকাতে মুশফিক-মিঠুন। মুশফিকের ৯৯ ও মিঠুনের ৬০ মিলে ১৪৪ রানের জুটি বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেয়। ২৪০ রানের লক্ষ্য বেঁধে দিয়ে পাকিস্তানকে আরও একবার আটকে দেয় বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের জয়টা ছিনিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন ইমাম-উল–হক। মাহমুদউল্লাহর জোরের ওপর করা বলটির লাইন মিস করেন ইমাম। আর তাতেই উইকেটের পেছনে থাকা লিটন স্টাম্প ভেঙে দেন। বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে ৩৭ রানে। কিন্তু বাংলাদেশকে এই জয়টি পেতে অনেক বাধা পেরেয়ি আসতে হয়েছে। আবুধাবির গরমে প্রত্যেক ক্রিকেটারই পানিশূন্যতায় ভুগছেন। বিশেষ করে দলের সিনিয়ার ক্রিকেটারদের পরিশ্রমটা বেশি হচ্ছে বলে সমস্যাটা তাদেরই বেশি। ২১তম ওভারে মাশরাফি দুর্দান্ত এক ক্যাচে ফর্মে থাকা শোয়েব মালিককে ফেরান। যদিও সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে যেতে হয় মাশরাফিকে। রুবেল ওভার শেষ হতেই দুই আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন। ওই ওভারের আগের ওভারে মাহমুদউল্লাহ ছিলেন মাঠের বাইরে। ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা মাথায় নিয়ে ৯৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মুশফিক। এরপর কিপিংয়েও দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন। ফিল্ডিংয়ের শুরু থেকেই মুশফিকের পেশি ক্র্যাম্প করছিল। বেশ কিছুক্ষণ কিপিং করে আর মাঠে নামেননি মুশফিক। তামিম-সাকিব আগেই না থাকায় পাকিস্তানের ইনিংসের ২১তম ওভারটিতে বাংলাদেশের পঞ্চপাণ্ডব ছাড়াই খেলতে হয়েছে টিম বাংলাদেশকে। পাকিস্তান বধের ইতিহাস শুরু ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে। এরপর আরও ২৫বার মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। কিন্তু জয় তো দূরে থাক লড়াইও করতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরই নতুন বাংলাদেশের আবির্ভাব হয়। শুরু হয় একের পর এক বড় দলকে হারানো। সেই তালিকায় যোগ হয় পাকিস্তানও। ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রতিটি ম্যাচেই নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে সৌম্য-মোস্তাফিজ-তামিমদের কাছে। পাকিস্তানের পেস আক্রমণ, গরম, টপ অর্ডারের ব্যর্থতা, সাকিব-তামিমের ছিটকে যাওয়া- সবকিছু মিলিয়ে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালের আগে এমন প্রতিকূলতার মধ্যে পাওয়া জয়টা নিশ্চিতভাবেই আত্মবিশ্বাস জোগাবে বাংলাদেশকে। ২০১২ ও ২০১৬ সালের ব্যর্থতা হয়তো ২০১৮ সালে ভুলিয়ে দিতে পারবে মাশরাফির দল। সেই স্বপ্নতেই এখন বুঁদ বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা।

শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি টিউলিপ সিদ্দিকের

শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি টিউলিপ সিদ্দিকেরঃ

কারাবন্দি আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’ এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে শহিদুল আলমের আটক থাকা ‘খুবই উদ্বেগজনক এবং অবিলম্বে এ পরিস্থিতির ইতি ঘটা উচিত’ বলে মনে করেন টিউলিপ সিদ্দিক। দ্য টাইমস বলছে, শহিদুল আলমকে আটকের ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে অনেকেই নিন্দা জানিয়েছেন। এ তালিকায় যুক্ত হলেন টিউলিপ সিদ্দিকও। এর আগে শহিদুলের কারামুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন নোবেল বিজয়ী থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেত্রী, শিল্পী, লেখক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, টিউলিপ সিদ্দিক বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে তার নিজের নাগরিকদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। আশা করি আমাদের পররাষ্ট্র দফতর বন্ধুপ্রতীম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে এ ব্যাপারে দৃঢ় বার্তা পাঠাবে।’ এর আগে ড. মোহাম্মদ ইউনুস এবং অমর্ত্য সেনসহ ১১ নোবেলজয়ী গত সপ্তাহের শেষের দিকে শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন। প্রসঙ্গত ৫ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডির বাসা থেকে শহিদুল আলমকে তুলে নেয় ডিবি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ‘উসকানিমূলক মিথ্যা’ প্রচারের অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় ৬ আগস্ট শহিদুল আলমকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। সাত দিনের রিমান্ড শেষে ১২ আগস্ট শহিদুলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন নিম্নআদালত।

সব আন্দোলন কি সরকারবিরোধী?

ছাত্র বিক্ষোভ

সব আন্দোলন কি সরকারবিরোধী?

মহিউদ্দিন আহমদ [caption id="attachment_21962" align="alignleft" width="320"] দলনিরপেক্ষ ছাত্রসমাজের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ইদানীং দৃশ্যমান হচ্ছে[/caption] বাংলা সিনেমার কাহিনি অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট একটি ছকে বাঁধা। শুরুর দিকে প্রেম থাকে। তারপর হঠাৎ উদয় হয় ভিলেনের। মারামারি-কাটাকাটি, মান-অভিমান আর রাগারাগিতে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। তারপর একজন বিবেক এসে হাজির হন। তিনি সবাইকে মিলিয়ে দেন। সিনেমার শেষ দৃশ্য হলো সব আত্মীয়-কুটুম আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল একটি গ্রুপ ছবি। একটি মধুর মিলন, মধুরেণ সমাপয়েৎ। সম্প্রতি ছাত্রবিক্ষোভের শেষ দৃশ্যটি অনেকটাই এ রকম। যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের সবাই একে একে জামিনে ছাড়া পেলেন। শেষ কয়েকজনের মুক্তি হলো ঈদের আগের দিন। ২৯ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিয়া খানম মিম এবং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল করিম রাজীব বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর রাজপথে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার আপাতপরিসমাপ্তি ঘটল। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক কিছুই। রাজপথে পরিবহননৈরাজ্য আগের মতো ফিরে এলেও বদলে গেছে অনেক কিছুই। পাল্টে গেছে ছাত্রবিক্ষোভের সনাতন অনেক নিয়ম বা বৈশিষ্ট্য। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ায়ও এসেছে পরিবর্তন। মিম-রাজীবের অকালমৃত্যু আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভ ছিল অনেক দিনের জমে যাওয়া ক্ষোভের বিস্ফোরণ। আপাতত এটির সমাধান হয়েছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কারণ নেই। গণপরিবহনব্যবস্থার আমূল সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটবে। কোনো অঘটন ঘটলেই আমরা এর মধ্যে একটি ভিলেন খোঁজার চেষ্টা করি। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জাবালে নূর বাসের চালক কিংবা মালিক, মন্ত্রী শাজাহান খান, বিআরটিএ ইত্যাকার ব্যক্তি ও সংস্থার মধ্যে সমস্যা খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। আসলে সমস্যা অন্য জায়গায়। পুরো ব্যবস্থাটি পচে গেছে। সংস্কারের আর জায়গা নেই। এটা বদলাতে হবে। ঈদের আগে আটক হওয়া ছাত্ররা জামিনে মুক্ত হওয়ায় তাঁদের পরিবারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আমরা সবাই খুশি। কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে উদারতা দেখিয়েছেন, ছাত্রদের ব্যাপারে তিনি খুবই সহানুভূতিশীল। সবাই ছাড়া পেয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারছেন। এ জন্য অনেকেই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। প্রশ্ন এখানেই। আটক ছাত্ররা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন—এর অর্থ হলো তাঁদের ‘অপরাধ’ জামিনযোগ্য ছিল। এটা নিতান্তই আদালতের এখতিয়ার। সরকারের নির্দেশে বা ইঙ্গিতে তাঁরা জামিন পেয়ে থাকলে বুঝতে হবে, আদালতের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে ফেসবুকে নানা মন্তব্য দেখেছি। একটি মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘বিচার বিভাগ ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে ধন্যবাদ।’ আরেকটি মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘সরকার চাইলে কী না হয়।’ সরকারের ইচ্ছায় ছাত্রদের জামিন হয়েছে—এটা মেনে নিলে বিচার বিভাগের ওপর আস্থা কমে যায়। সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর জামিন নির্ভর করে না—এটা মনে করলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, তাঁদের কেন আগেই জামিন দেওয়া হলো না। জামিনের আবেদন থাকা সত্ত্বেও আগে জামিন না পাওয়া এবং ঈদের ঠিক আগের দিন হঠাৎ জামিন পেয়ে যাওয়ায় এ সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ‘অপরাধ’ জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জামিন না দিয়ে আদালত কি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কাজ করেছিলেন? এখানে আমরা মডেল ও অভিনেত্রী কাজী নওশাবার উদাহরণটি টেনে আনতে পারি। নওশাবার বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ ছিল। তিনি গ্রেপ্তার হন ৫ আগস্ট। ২০ আগস্ট আদালত তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন। কিন্তু নওশাবা ২১ আগস্ট জামিন পেয়ে যান। অভিযোগটি কী কারণে ২০ আগস্ট জামিন-অযোগ্য ছিল এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা জামিনযোগ্য হয়ে গেল, তার রহস্য ভেদ করা আমার কর্ম নয়। এখানে কি তৃতীয় পক্ষের কোনো ভূমিকা আছে? আদালতে সরকারি কৌঁসুলি সাধারণত জামিনের বিরোধিতা করে থাকেন। প্রথমে জামিনের বিরোধিতা করা এবং পরে জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি না জানানোয় এটা মনে করা স্বাভাবিক যে আদালত সরকারের চাওয়া বা না চাওয়ার সংকেতটি বোঝেন এবং সে অনুযায়ী রায় দেন। আমাদের বিচার বিভাগ, বিশেষ করে নিম্ন আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বেশ প্রবল—এ অভিযোগ বেশ পুরোনো। সাম্প্রতিক ছাত্রবিক্ষোভের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সম্ভবত চিত্রগ্রাহক শহিদুল আলম। আল-জাজিরায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর ৫ আগস্ট রাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরদিন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়। আটকাবস্থায় তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। এই ধারা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এখনো হচ্ছে। তাঁর পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন চলাকালে বিচারক একটি মন্তব্য করেছেন, ‘ভাগ্য ভালো, তিনি গুম হয়ে যাননি।’ মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। ৫৭ ধারায় মামলা হলেও আল-জাজিরায় তিনি যেসব কথা বলেছেন, তাতে সরকার বেশি রুষ্ট হয়েছে বলে কানাঘুষা আছে। তাঁর জামিন হয়নি। ঘুরেফিরে একটি প্রশ্নই আসে। যিনি অভিযুক্ত, তাঁর জামিন পাওয়া কি ‘অধিকার’, না সরকারের ‘দাক্ষিণ্য’। ফেসবুকে শহিদুল আলমকে নিয়ে নানা মন্তব্য দেখছি। অনেকেই তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তাঁর মুক্তি চেয়েছেন। অনেকেই তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ এবং তাঁর ‘উচিত বিচার’ চাইছেন। দেশের চলমান রাজনীতির বিভাজনটি এসব মন্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রসঙ্গটি শুরু করেছিলাম ছাত্রবিক্ষোভ নিয়ে। সব সরকারের আমলেই ছাত্রবিক্ষোভকে সুনজরে দেখার রেওয়াজ নেই। বিক্ষোভের রাজনৈতিকীকরণ হয় এবং আন্দোলনে ‘তৃতীয় পক্ষ’ ঢুকে যায়। ছাত্রদের সঙ্গে প্রশাসনের আড়াআড়ি কোনো নতুন বিষয় নয়। পাকিস্তান আমলে ছাত্রসমাজই ছিল প্রকৃত অর্থে প্রধান বিরোধী দল। এ দেশে গত কয়েক দশকে ছাত্ররাজনীতি পচে গেলেও দলনিরপেক্ষ ছাত্রসমাজের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ইদানীং দৃশ্যমান হচ্ছে। তাদের প্রতিপক্ষ বানানো হবে ভুল। তারা আইনের শাসন চায়, চায় সংস্কার। তাদের অনেক দাবিতে ন্যায্যতা আছে। তাদের গড়ে সরকারবিরোধী অথবা রাষ্ট্রবিরোধী ভাবা ঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। পাকিস্তানের গণপরিষদে ১৯৫৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে আলোচনাকালে একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন:‘ ছাত্রদের দ্বারা এমনভাবে অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করানো হচ্ছে যেন পাকিস্তানের সব ছাত্রই রাষ্ট্রবিরোধী এবং কেবলমাত্র মন্ত্রী, এমসিএ এবং সরকারি দলের পার্লামেন্ট সেক্রেটারিরাই দেশপ্রেমিক।...কারও বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, কোর্ট আছে, বিচারব্যবস্থা আছে, তাদেরকে কোর্টে হাজির করা যেতে পারে এবং বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করার অধিকার সংবিধানে দেওয়া আছে। কিন্তু এই সব কালাকানুন কেন, যাতে বলা আছে যে, রাষ্ট্রবিরোধী কাজের জন্য যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে? স্যার, এই সমস্ত কালাকানুন সাধারণত যারা দেশের জন্য কাজ করে এবং যারা পাকিস্তানের জনগণের জন্য কাজ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।’ দেশ এখন বঙ্গবন্ধুর সৈনিকে ভরে গেছে। কজন বঙ্গবন্ধু পাঠ করেন? মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক mohi2005@gmail.com

আ.লীগের ৩০০ আসনের তালিকায় সম্ভাব্য যারা আছেন

৩০০ আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত আওয়ামী লীগের: দলীয় জরিপ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পৃথক রিপোর্ট বিচার-বিশ্লষণ করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড ৩০০ আসনে একটি প্রার্থী তালিকা তৈরি করে রেখেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র। সূত্রমতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে হাইকমান্ড প্রার্থী তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে শরিক দলগুলোর বর্তমান আসনগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখেছেন। স্বল্পসংখ্যক আসনে প্রার্থী নির্বাচন বাদ রাখা হয়েছে শরিক দলগুলোর কয়েকজন সংসদ সদস্যের কথা মাথায় রেখে। নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা মনোনয়নের বিনিময়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করবেন বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড কর্তৃক তৈরীকৃত মনোনয়ন তালিকাটি এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও শিগগিরই মনোনীত প্রার্থীদের মৌখিকভাবে মাঠে নামার নির্দেশ দেয়া হবে হাইকমান্ড থেকে। প্রার্থী তালিকাটি যথাসময়ে দলের সংসদীয় বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে বলেও জানা গেছে। অনিবার্য কারণ ব্যতীত তালিকায় খুব একটা যোগ-বিয়োগের সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেছে এ সূত্রটি। সূত্রমতে, ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’ নেয়ার নীতিগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ তার গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করছে।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাম ও আসন নিম্নে দেয়া হলো :

ঢাকা-১ সালমান এফ রহমান বা আব্দুল মান্নান খান, ঢাকা-২ অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ঢাকা-৩ নসরুল হামিদ বিপু, ঢাকা-৪ ডঃ আওলাদ হোসেন, ঢাকা-৫ মশিউর রহমান সজল, ঢাকা-৬ চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলু, ঢাকা-৭ ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন, ঢাকা-৮ ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, ঢাকা-৯ সাবের হোসেন চৌধুরী, ঢাকা-১০ শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা-১১ একেএম রহমতউল্লাহ, ঢাকা-১২ আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা-১৩ জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা-১৪ সাবিনা আকতার তুহিন, ঢাকা-১৫ গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু, ঢাকা-১৬ এম এ মান্নান কচি, ঢাকা-১৭ মুহম্মদ ফারুক খান, ঢাকা-১৮ এডভোকেট সাহারা খাতুন, ঢাকা-১৯ তৌহিদ জং মুরাদ, ঢাকা-২০ বেনজীর আহমেদ। নারায়ণগঞ্জ-১ গোলাম দস্তগীর গাজী, নারায়ণগঞ্জ-২ নজরুল ইসলাম বাবু, নারায়ণগঞ্জ-৩ সাবেক এমপি কায়সার হাসনাত, নারায়ণগঞ্জ-৪ একেএম শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৫ এস এম আকরাম। গাজীপুর-১ আকম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর-৩ জামিল হাসান দুর্জয়,গাজীপুর-৪ সিমিন হোসেন রিমি, গাজীপুর-৫ আখতারুজ্জামান। মুন্সিগঞ্জ-১ ডাঃ বদিউজ্জামান ডাবলু, মুন্সিগঞ্জ-২ অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, মুন্সিগঞ্জ-৩ মৃণাল কান্তি দাস। কিশোরগঞ্জ-১ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-২ ড. জায়েদ মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, কিশোরগঞ্জ-৩ ডঃ মিজানুল হক, কিশোরগঞ্জ-৪ রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক, কিশোরগঞ্জ-৫ আফজাল হোসেন, কিশোরগঞ্জ-৬ নাজমুল হাসান পাপন। নরসিংদী-১ নজরুল ইসলাম, নরসিংদী-২ কামরুল আশরাফ খান, নরসিংদী-৩ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, নরসিংদী-৪ নুরুল মজিদ হুমাউন, নরসিংদী-৫ রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজুর পুত্র। গোপালগঞ্জ-১ শেখ রেহানা, গোপালগঞ্জ-২ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, গোপালগঞ্জ-৩ শেখ হাসিনা। মাদারীপুর-১ নূরে আলম চৌধুরী লিটন, মাদারীপুর-২ শাহজাহান খান, মাদারীপুর-৩ আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম। শরিয়তপুর-১ বি এম মোজাম্মেল হক, শরিয়তপুর-২ একেএম এনামুল হক শামীম, শরিয়তপুর-৩ নাহিম রাজ্জাক। ফরিদপুর-১ আবদুর রহমান, ফরিদপুর-২ আয়মন আকবর চৌধুরী, ফরিদপুর-৩ ইঞ্জিনয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ফরিদপুর-৪ মজিবর রহমান চৌধুরী। টাঙ্গাইল-১ ড. আব্দুর রাজ্জাক, টাঙ্গাইল-২ খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল, টাঙ্গাইল-৩ সৈয়দ আবু ইউসুফ, টাঙ্গাইল-৪ সোহেল হাজারী, টাঙ্গাইল-৫ ছানোয়ার হোসেন, টাঙ্গাইল-৬ খন্দকার এম এ বাতেন, টাঙ্গাইল-৭ একাব্বর হোসেন ও টাঙ্গাইল-৮ অনুপম শাহজাহান জয়। মানিকগঞ্জ-১ আনোয়ারুল হক, মানিকগঞ্জ-২ মমতাজ বেগম, মানিকগঞ্জ-৩ জাহিদ মালেক স্বপন। কুমিল্লা-১ সুবিদ আলী ভুঁইয়া, কুমিল্লা-২ সেলিমা আহমেদ, কুমিল্লা-৩ ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন, কুমিল্লা-৪ রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা-৫ আব্দুল মতিন খসরু, কুমিল্লা-৬ আফম বাহাউদ্দীন বাহার, কুমিল্লা-৭ ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, কুমিল্লা-৮ অধ্যাপক আলী আশরাফ, কুমিল্লা-৯ তাজুল ইসলাম, কুমিল্লা-১০ আহম মোস্তফা কামাল, কুমিল্লা-১১ মজিবুল হক মুজিব। চট্টগ্রাম-১ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, চট্টগ্রাম-২ চট্টগ্রাম-৩ মাহফুজুর রহমান মিতা, চট্টগ্রাম-৪, চট্টগ্রাম-৫, চট্টগ্রাম-৬, চট্টগ্রাম-৭ ড. হাসান মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-৯ মহিবুল হাসান নওফেল, চট্টগ্রাম-১০ মঞ্জুরুল আলম, চট্টগ্রাম-১১ আব্দুল লতিফ, চট্টগ্রাম-১২ শামসুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৩ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, চট্টগ্রাম-১৪ নজরুল ইসলাম চৌধুরী। চাঁদপুর-১ গোলাম হোসেন, চাঁদপুর-২ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, চাঁদপুর-৩ রেদওয়ান খান বোরহান, চাঁদপুর-৪ শামসুল হক ভুঁইয়া, চাঁদপুর-৫ রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। দিনাজপুর-১ মনোরঞ্জণ শীল গোপাল, দিনাজপুর-২ খালিদ মাহমুূদ চৌধুরী, দিনাজপুর-৩ ইকবালুর রহিম, দিনাজপুর-৪ আবুল হাসান মাহমুদ আলী, দিনাজপুর-৫ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, দিনাজপুর-৬ শিবলী সাদিক। ঠাকুরগাঁও-১ রমেশ চন্দ্র সেন, ঠাকুরগাঁও-২ মাজহারুল ইসলাম সুজন, ঠাকুরগাঁও-৩ অধ্যক্ষ সুজাউল করিম বাবুল। নীলফামারী-১ আফতাবউদ্দিন সরকার, নীলফামারী-২ আসাদুজ্জামান নূর, নীলফামারী-৩ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, নীলফামারী-৪ আমেনা কোহিনুর আলম। লালমনিরহাট-১ মোতাহার হোসেন, লালমনিরহাট-২ নুরুজ্জামান আহমেদ, লালমনিরহাট-৩ আবু সালেহ সাইদ দুলাল। রংপুর-১ রংপুর-২ আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক, রংপুর-৩ আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর-৪ টিপু মন্সী, রংপুর-৫ এইচ এন আশিকুর রহমান, রংপুর-৬ সজীব ওয়াজেদ জয়। কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-২ জাফর আলী, কুড়িগ্রাম-৩ শওকত আলী বীরবিক্রম, কুড়িগ্রাম-৪ জাকির হোসেন। গাইবান্ধা -১ গোলাম মোস্তফা আহমেদ, গাইবান্ধা-২ সৈয়দ শামস উল আলম হীরা, গাইবান্ধা-৩ ডাঃ ইউনুস আলী সরকার, গাইবান্ধা-৪ আবুল কালাম আজাদ, গাইবান্ধা-৫ মাহমুদ হোসেন রিপন। রাজশাহী-১ মতিউর রহমান, রাজশাহী-২ আব্দুল খালেক, রাজশাহী-৩ আয়েন উদ্দীন, রাজশাহী-৪ এনামুল হক, রাজশাহী-৫ এম এ ওয়াদুদ দারা, রাজশাহী-৬ শাহরিয়ার আলম। নাটোর-১ আবুল কালাম, নাটোর-২ শফিকুল ইসলাম শিমুল, নাটোর-৩ জুনায়েদ আহম্মেদ পলক। পাবনা-১ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, পাবনা-২ আজিজুল হক আরজু, পাবনা-৩ মকবুল হোসেন, পাবনা-৪ গোলাম ফারুক প্রিন্স। নওগাঁ-১ সাধন চন্দ্র মজুমদার, নওগাঁ-২ শহীদুজ্জামান সরকার, নওগাঁ-৩ ছলিম উদ্দিন, নওগাঁ-৪ ইমাজ উদ্দীন প্রামাণিক, নওগাঁ-৫ ব্যারিস্টার নিজামউদ্দীন জলিল জন, নওগাঁ-৬ ইসরাফিল আলম। সিরাজগঞ্জ-১ মোহাম্মদ নাসিম, সিরাজগঞ্জ-২ হাবিবে মিল্লাত, সিরাজগঞ্জ-৩, সিরাজগঞ্জ-৪ তানভীর ইমাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আব্দুল মজিদ মন্ডল ও সিরাজগঞ্জ-৬ হাসিবুর রহমান স্বপন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ গোলাম রাব্বানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ জিয়াউর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আব্দুল ওয়াদুদ বিশ্বাস। নরসিংদী-১ নজরুল ইসলাম, নরসিংদী-২ কামরুল আশরাফ খান, নরসিংদী-৩ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, নরসিংদী-৪ নুরুল মজিদ হুমায়ুন ও নরসিংদী-৫ রাজি উদ্দীন আহমেদ রাজু তনয়। বি বাড়িয়া-১ এটিএম মনিরুজ্জামান সরকার, বিবাড়িয়া-২ বি বাড়িয়া-৩ উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী, বি বাড়িয়া-৪ ব্যারিস্টার আনিসুল হক, বি বাড়িয়া-৫, বি বাড়িয়া-৬ মহিউদ্দীন আহমেদ মহি। সিলেট-১ ড. আবুল মোমেন, সিলেট-২ শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-৩ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেট-৪ ইমরান আহমেদ, সিলেট-৫ মাশুক উদ্দীন, সিলেট-৬ নুরুল ইসলাম নাহিদ, হবিগঞ্জ-১ আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়া, হবিগঞ্জ-২ আব্দুল মজিদ খান, হবিগঞ্জ-৩। সুনামগঞ্জ-১ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সুনামগঞ্জ-২ জয়া সেন গুপ্তা, সুনামগঞ্জ-৩ আজিজ উস সামাদ ডন, সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান, সুনামগঞ্জ-৫ মহিবুর রহমান মানিক। মৌলভীবাজার-১ আব্দুল মতিন, মৌলভীবাজার-২, মৌলভীবাজার-৩, মৌলভীবাজার-৪ উপাধ্য আব্দুস শহীদ। নোয়াখালী-১ এইচ এম ইব্রাহিম, নোয়াখালী-২ মোরশেদ আলম, নোয়াখালী-৩ মামুনুর রশীদ কিরণ, নোয়াখালী-একরামুল করিম চৌধুরী, নোয়াখালী-৫ ওবায়দুল কাদের, নোয়াখালী-৬ আয়েশা সিদ্দিকী। লক্ষ্মীপুর-১ আবদুল্লাহ, লক্ষ্মীপুর-২ মোহাম্মদ নোমান, লক্ষ্মীপুর-৩ শাহজাহান কামাল, লক্ষ্মীপুর-৪। ফেনী-১ আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, ফেনী-২ নিজামউদ্দীন হাজারী, ফেনী-৩ সাইফুদ্দীন নাসির। বান্দরবান- বীর বাহাদুর ও রাঙামাটিঃ দীপঙ্কর তালুকদার। জয়পুরহাট-১ শামসুল আলম দুদু জয়পুরহাট-২ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। বরিশাল-১ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, বরিশাল- ২ গোলাম ফারুক, বরিশাল-৩, বরিশাল-৪ পঙ্কজ দেবনাথ, বরিশাল-৫ জেবুন্নেছা হক, বরিশাল-৬ তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস। পটুয়াখালী-১ শাজাহান মিয়া,পটুয়াখালী-২ আসম ফিরোজ, পটুয়াখালী-৩ আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, পটুয়াখালী-৪ মাহবুবুর রহমান তালুকদার। বরগুণা-১ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, বরগুনা-২ শওকত হাছানুর রহমান। ঝালকাঠি-১ মনিরুজ্জামান মনির, ঝালকাঠি-২ আমির হোসেন আমু। ভোলা-১ তোফায়েল আহমেদ, ভোলা-২ আলী আজম মুকুল, ভোলা-৩ নুরুন্ববী চৌধুরী শাওন, ভোলা-৪ আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব। পিরোজপুর-১ অ্যাডঃ রেজাউল করিম, পিরোজপুর-২ শাহে আলম, পিরোজপুর-৩ ইসহাক আলী খান পান্না। শেরপুর-১ আতিয়ার রহমান আতিক, শেরপুর-২ বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেরপুর-৩ ফজলুল হক। ময়মনসিংহ-১ জুয়েল আরেং, ময়মনসিংহ-২ হায়াতুর রহমান খান, ময়মনসিংহ-৪ আব্দুস ছাত্তার, ময়মনসিংহ-৫ কে এম খালিদ, ময়মনসিংহ-৬ মোসলেম উদ্দীন, ময়মনসিংহ-৭ এম এ হান্নান, ময়মনসিংহ-৮, ময়মনসিংহ-৯ আনোয়ার আবেদীন তুহিন, ময়মনসিংহ-১০ ফাহমী গোলান্দাজ বাবেল। নেত্রকোনা-১ মোশতাক আহমেদ রুহী, নেত্রকোনা-৩ ইত্তেকার তালুকদার, নেত্রকোনা-৪ রেবেকা মোমিন, নেত্রকোনা-৫ ইঞ্জিনিয়ার তুহিন আহমেদ খান। খুলনা-১ পঞ্চানন বিশ্বাস, খুলনা-২ মিজানুর রহমান, খুলনা-৩ মন্নুজান সুফিয়ান, খুলনা-৪ সালাম মুরশিদী , খুলনা-৫ নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। রাজবাড়ি-১ কাজী কেরামত আলী, রাজবাড়ী-২ জিল্লুল হাকিম। সাতক্ষীরা-১ শেখ মুজিবুর রহমান, সাতক্ষীরা-২ মীর মোশতাক আহমেদ রবি, সাতক্ষীরা-৩ অধ্যাপক ডাঃ তআফম রুহুল হক, সাতক্ষীরা-৪ এসএম জগলুল হায়দার। মাগুরা-১ সাইফুজ্জামান শেখর, মাগুরা-২ বীরেন শিকদার। নড়াইল-১ কবিরুল হক মুক্তি, নড়াইল-২ শেখ হাসিনা। বাগেরহাট-১ শেখ হেলাল উদ্দীন, বাগেরহাট-২ বাগেরহাট-৩ তালুকদার আব্দুল খালেক বাগেরহাট-৪ ডাঃ মোজাম্মেল হোসেন। দিনাজপুর-১ মনোরঞ্জণ শীল গোপাল, দিনাজপুর-২ খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর-৩ ইকবালুর রহিম, দিনাজপুর-৪ আবুল হাসান মাহমুদ আলী, দিনাজপুর-৫ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, দিনাজপুর-৬ শিবলী সাদিক। নীলফামারী-১ আফতাবউদ্দিন সরকার, নীলফামারী-২ আসাদুজ্জামান নূর, নীলফামারী-৩ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, নীলফামারী-৪ আমেনা কোহিনুর আলম। লালমনিরহাট-১ মোতাহার হোসেন, লালমনিরহাট-২ নুরুজ্জামান আহমেদ, লালমনিরহাট-৩ আবু সালেহ সাইদ দুলাল। রংপুর-১ রংপুর-২ আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক, রংপুর-৩ আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর-৪ টিপু মন্সী, রংপুর-৫ এইচ এন আশিকুর রহমান, রংপুর-৬ সজীব ওয়াজেদ জয়। কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-২ জাফর আলী, কুড়িগ্রাম-৩ শওকত আলী বীরবিক্রম, কুড়িগ্রাম-৪ জাকির হোসেন। গাইবান্ধা-১ গোলাম মোস্তফা আহমেদ, গাইবান্ধা-২ সৈয়দ শামস উল আলম হীরা, গাইবান্ধা-৩ ডাঃ ইউনুস আলী সরকার, গাইবান্ধা-৪ আবুল কালাম আজাদ, গাইবান্ধা-৫ মাহমুদ হোসেন রিপন। রাজশাহী-১ মতিউর রহমান, রাজশাহী-২ আব্দুল খালেক, রাজশাহী-৩ আয়েন উদ্দীন, রাজশাহী-৪ এনামুল হক, রাজশাহী-৫ এম এ ওয়াদুদ দারা, রাজশাহী-৬ শাহরিয়ার আলম। নাটোর-১ আবুল কালাম, নাটোর-২ শফিকুল ইসলাম শিমুল, নাটোর-৩ জুনায়েদ আহম্মেদ পলক। পাবনা-১ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, পাবনা-২ আজিজুল হক আরজু, পাবনা-৩ মকবুল হোসেন, পাবনা-৪ গোলাম ফারুক প্রিন্স। নওগাঁ-১ সাধন চন্দ্র মজুমদার, নওগাঁ-২ শহীদুজ্জামান সরকার, নওগাঁ-৩ ছলিম উদ্দিন, নওগাঁ-৪ ইমাজ উদ্দীন প্রামাণিক, নওগাঁ-৫ ব্যারিস্টার নিজামউদ্দীন জলিল জন, নওগাঁ-৬ ইসরাফিল আলম। টাঙ্গাইল-১ ডঃ আব্দুর রাজ্জাক, টাঙ্গাইল-২ খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল, টাঙ্গাইল-৩ সৈয়দ আবু ইউসুফ, টাঙ্গাইল-৪ সোহেল হাজারী, টাঙ্গাইল-৫ ছানোয়ার হোসেন, টাঙ্গাইল-৬ খন্দকার এম এ বাতেন, টাঙ্গাইল-৭ একাব্বর হোসেন ও টাঙ্গাইল-৮ অনুপম শাহজাহান জয়। মানিকগঞ্জ-১ আনোয়ারুল হক, মানিকগঞ্জ-২ মমতাজ বেগম, মানিকগঞ্জ-৩ জাহিদ মালেক স্বপন। সিরাজগঞ্জ-১ মোহাম্মদ নাসিম, সিরাজগঞ্জ-২ হাবিবে মিল্লাত, সিরাজগঞ্জ-৩, সিরাজগঞ্জ-৪ তানভীর ইমাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আব্দুল মজিদ মন্ডল ও সিরাজগঞ্জ-৬ হাসিবুর রহমান স্বপন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ গোলাম রাব্বানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ জিয়াউর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আব্দুল ওয়াদুদ বিশ্বাস। নরসিংদী-১ নজরুল ইসলাম, নরসিংদী-২ কামরুল আশরাফ খান, নরসিংদী-৩ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, নরসিংদী-৪ নুরুল মজিদ হুমায়ুন ও নরসিংদী-৫ রাজি উদ্দীন আহমেদ রাজু তনয়। বি বাড়িয়া-১ এটিএম মনিরুজ্জামান সরকার, বিবাড়িয়া-২ বি বাড়িয়া-৩ উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী, বি বাড়িয়া-৪ ব্যারিস্টার আনিসুল হক, বি বাড়িয়া-৫, বি বাড়িয়া-৬ মহিউদ্দীন আহমেদ মহি। সিলেট-১ ডঃ আবুল মোমেন, সিলেট-২ শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-৩ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেট-৪ ইমরান আহমেদ, সিলেট-৫ মাশুক উদ্দীন, সিলেট-৬ নুরুল ইসলাম নাহিদ, হবিগঞ্জ-১ আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়া, হবিগঞ্জ-২ আব্দুল মজিদ খান, হবিগঞ্জ-৩ । সুনামগঞ্জ-১ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সুনামগঞ্জ-২ জয়া সেন গুপ্তা, সুনামগঞ্জ-৩ আজিজ উস সামাদ ডন, সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান, সুনামগঞ্জ-৫ মহিবুর রহমান মানিক। মৌলভীবাজার-১ আব্দুল মতিন, মৌলভীবাজার-২, মৌলভীবাজার-৩, মৌলভীবাজার-৪ উপাধ্য আব্দুস শহীদ। বরিশাল-১ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, বরিশাল- ২ গোলাম ফারুক, বরিশাল-৩ অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন , বরিশাল-৪ পঙ্কজ দেবনাথ, বরিশাল-৫ জেবুন্নেছা হিরন, বরিশাল-৬ তালুকদার মো,ইউনুস। পটুয়াখালী-১ শাজাহান মিয়া, পটুয়াখালী-২ আসম ফিরোজ,পটুয়াখালী-৩ আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন, পটুয়াখালী-৪ মাহবুবুর রহমান তালুকদার। বরগুণা-১ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, বরগুনা-২ শওকত হাছানুর রহমান। ঝালকাঠি-১ মনিরুজ্জামান মনির, ঝালকাঠি-২ আমির হোসেন আমু। ভোলা-১ তোফায়েল আহমেদ, ভোলা-২ আলী আজম মুকুল, ভোলা-৩ নুরুন্ববী চৌধুরী শাওন ও ভোলা-৪ আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব। পিরোজপুর-১ অ্যাডঃ রেজাউল করিম, ও পিরোজপুর-৩ ইসহাক আলী খান পান্না। শেরপুর-১ আতিয়ার রহমান আতিক, শেরপুর-২ বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেরপুর-৩ ফজলুল হক। যশোর-১ শেখ আফিল উদ্দীন, যশোর-২ মনিরুল ইসলাম, যশোর-৩ কাজী নাবিল আহমেদ, যশোর-৪, যশোর-৫ বীরমুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আকবর, যশোর-৬ চিত্রনায়িকা শাবানার স্বামী চিত্র প্রযোজক ওয়াহিদ সাদেক। খুলনা-১ পঞ্চানন বিশ্বাস, খুলনা-২ মিজানুর রহমান, খুলনা-৩ মন্নুজান সুফিয়ান, খুলনা-৪ মোস্তফা রশিদী সূজা, খুলনা-৫ নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। সাতক্ষীরা-১ সাতক্ষীরা-২ মীর মোশতাক আহমেদ রবি, সাতক্ষীরা-৩ অধ্যাপক ডাঃ আফম রুহুল হক, সাতক্ষীরা-৪ এসএম জগলুল হায়দার। মাগুরা-১ মাগুরা-২ বীরেন শিকদার। নড়াইল-১ কবিরুল হক মুক্তি, নড়াইল-২ শেখ হাসিনা। বাগেরহাট-১ শেখ হেলাল উদ্দীন, বাগেরহাট-২ বাগেরহাট-৩ তালুকদার আব্দুল খালেক বাগেরহাট-৪ ডা. মোজ্জামেল হোসেন। উল্লেখ্য, সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনেই প্রার্থী রাখছে আওয়ামী লীগ। সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব স্থানীয় সূত্র এই পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছে, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণী কূট-কৌশলের ওপরই নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতার বিষয়টি। এ জন্য বিএনপির প্রতি ক্ষমতাসীন দলটির সতর্ক পর্যবেক্ষণও রয়েছে। বিএনপি নির্বাচন না করলে আওয়ামী লীগকে এককভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে দেখা যেতে পারে। তবে বিএনপি অংশ নিলে সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ শরিকসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলগুলোকে বিগত নির্বাচনের মতো কিছু আসন ছেড়ে দেবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আশা প্রকাশ করে বলেছেন, বিএনপি আবারও নির্বাচনী অংকে ভুল করবে না। তারা বিগত নির্বাচন বর্জন করে যে ভুল করেছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে তাদের কথাবার্তায়। সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য সচিব ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং তা কেবল বিএনপির অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো বিকল্প পথ নেই, শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে হবে এবং তারা নেবেও। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে এরকম আশঙ্কা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক মহলে নেই। তারপরেও ‘যদি’র প্রশ্নে একটা বিকল্প চিন্তা মাথায় রাখছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জন করলে আওয়ামী লীগ বর্তমান শরীক দলগুলোকে নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শ দেবে। শরিক দল জাতীয় পার্টির ন্যায় অপর ১৪টি দলের সঙ্গে আসনভিত্তিক আঁতাত গড়ে তুলবে। বিগত নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে অজুহাত তার পুনরাবৃত্তি হতে দেয়া হবে না। জাতীয় পার্টিসহ শরীকরা স্ব স্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে না। নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা।

ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক

ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক

ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকগুলো সিএসআর বাবদ ব্যয় করেছে ৬২৭ কোটি টাকা, যা এর আগের ছয় মাসে ছিল ৪১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ছয় মাসে ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় বেড়েছে ২১০ কোটি টাকা।

৬ মাসে ৬০০ কোটি টাকার অধিক সিএসআরের নামে লুটপাট হয়েছে। নির্বাচনী বছর হওয়ায় যত্রতত্র ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় অস্বাভাবিক। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশতাধিক পরিচালক ও চেয়ারম্যান অংশ নিচ্ছেন। তাই প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ব্যাংকের সিএসআরের অর্থ নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় প্রচার কাজে খরচ করছেন তারা। 

হঠাৎ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খরচের খাত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ টাকার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে। সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, সংস্কৃতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, আয়বর্ধক কর্মসূচি ও অন্যান্য খাতে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু এবার নির্বাচনী বছর হওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে সন্দেহ-সংশয় বাড়ছে।

এব্যাপারে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের অনেক চেয়ারম্যান এবং পরিচালক সিএসআরের অর্থ নির্বাচনী প্রচারে ব্যায় করছেন। কারণ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশতাধিক পরিচালক ও চেয়ারম্যান অংশ নিচ্ছেন। তাই প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের ব্যাংকের সিএসআরের অর্থ নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় প্রচার কাজে খরচ করছেন তারা।

এব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সিএসআর খাতে ব্যয় বেশি হলে ক্ষতি নেই। তবে খতিয়ে দেখতে হবে এর কোনো অপব্যবহার হয় কি না। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পারে।

একটি ব্যাংকের সাবেক এক এমডি জানান, সিএসআরের নামে লুটপাট হয়েছে। আমার দীর্ঘ এমডি জীবনে ৬ মাসে ৬০০ কোটি টাকার অধিক সিএসআর ব্যয় দেখিনি। নির্বাচনী বছর হওয়ায় যত্রতত্র ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় অস্বাভাবিক। প্রতিটি ব্যয় নিয়ম মেনে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক অস্বাভাবিকভাবে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করেছে। ব্যাংকটি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যয় করেছে ২৭৫ কোটি টাকা। এর আগের ছয় মাসে এ ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ছিল মাত্র ৪৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির সিএসআর ব্যয় বেড়েছে ২২৮ কোটি টাকা। একইভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেও হঠাৎ সিএসআরের ব্যয় বেড়ে গেছে। গত ছয় মাসে ব্যাংকটি ১ কোটি ১১ লাখ টাকা সিএসআর বাবদ ব্যয় করেছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংক এভাবে ব্যয় করেনি। এমন কি জনতা ব্যাংকেও এর আগের ছয় মাসে সিএসআরে ব্যয় ছিল মাত্র ৫ লাখ টাকা। ব্যাংকটির সিএসআরের টাকা নির্বাচনী প্রচারণায় খরচের অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, অস্বাভাবিকভাবে সিএসআর ব্যয়ের তালিকায় ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬ কোটি ২৯ লাখ থেকে বেড়ে ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, নতুন একটি ব্যাংকে ২ কোটি ২৪ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ১১ কোটি ৪০ লাখ থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, এবি ব্যাংকে ৯ কোটি ৫ লাখ থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংকে ৮ কোটি ৯১ লাখ থেকে বেড়ে ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২ কোটি ৬৫ লাখ থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৯ কোটি ৬৭ লাখ থেকে বেড়ে ১০ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকে সিএসআর ব্যয় ২৫ কোটি ২৭ লাখ থেকে বেড়ে ৩৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হয়েছে। এছাড়া দুটি ইসলামী ব্যাংকে যথাক্রমে ৩ কোটি ৮৯ লাখ থেকে বেড়ে ১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ১২ কোটি ৩৩ লাখ থেকে ২১ কোটি ১০ লাখ টাকা সিএসআর ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ৪২ কোটি ২৭ লাখ থেকে বেড়ে ৪৯ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং এনসিসি ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ৮ কোটি ৮৭ লাখ থেকে বেড়ে ৯ কোটি ৬ লাখ টাকা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর মোট ব্যয়ের অন্তত ৩০ শতাংশ শিক্ষা ও ২০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এবার অধিকাংশ ব্যাংক তা মানেনি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে নিয়ম মেনে শিক্ষায় ব্যয় করেছে মাত্র ৮ ব্যাংক। আর স্বাস্থ্য খাতে খরচের নিয়মের মধ্যে রয়েছে ৫ ব্যাংক। যদিও ২০১৭ সালের একই সময়ের তুলনায় এবার সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলো প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় করেছে।

কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা কোম্পানীর সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা  হচ্ছে নৈতিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণের অংশ যা রাষ্ট্রের উন্নয়ন চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সমাজে বৃহত্তর মঙ্গল সাধন করে। 

ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতা

চাই সমন্বিত নীতিমালা

জামাল উদ্দীন

যে সমাজে ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করে—সে সমাজের প্রতি তথা ভোক্তা/ক্রেতার প্রতি ঐ কোম্পানিরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যদিও ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বোচ্চ মুনাফা করা। কিন্তু যে শ্রেণিকে পণ্য কিংবা সেবা দিয়ে মুনাফা করছে—সেই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি সামর্থ্যহীন হয়ে পড়ে—তবে ভবিষ্যত্ মুনাফা এমনকি ব্যবসাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। মানে ক্রেতা/ভোক্তাদের কিছু সুবিধা দিতে হবে। সেটা হতে পারে তার স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য, শিক্ষার জন্য, কিংবা কোনো অবকাঠামো উন্নয়নেও কোম্পানি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাতে কোম্পানির ব্যাপক প্রচারের সুযোগ হয়। ক্রেতা ভোক্তাদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। একটি সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। আধুনিক সিইওরা এটাকে দেখছেন ব্যবসা প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে। যেহেতু তার লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা করা। অ্যাডাম স্মিথ যেমন বলেছিলেন, ভোক্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যতীত ব্যবসায়ীরা একত্রিত হতে পারে না। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র বলতে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে বুঝিয়েছেন তিনি। বর্তমানে কোম্পানিগুলো সিএসআরকে (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) দেখছে তাদের ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে। এখাতে বিনিয়োগের চেয়ে বরং রিটার্নই বেশি। আরেকটি ধারণা রয়েছে যে, কোনো কোম্পানি আস্থা অর্জন করতে পারছে না। আস্থা এমন এক বিষয় যা অর্জিত না হলে যত ভাল পণ্য বা সেবা বাজারে ছাড়ুক না কেন, ক্রেতারা নেবে না। ক্রেতাদের এই আস্থা অর্জনের জন্যও উন্নত বিশ্বে কর্পোরেট হাউজগুলো কিছু ভাল কাজে অর্থ ব্যয় করে। এতে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে তার ইমেজ বৃদ্ধি করে। নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের জন্য পণ্য/সেবা দেয়া হচ্ছে, সেই জনগোষ্ঠী যদি সুস্থ না থাকে, কিংবা তাদের উত্পাদনশীলতা কমে যায়, তাহলে তাদের আয় কমে যাবে। তখন প্রত্যাশিত হারে পণ্য বা সেবা গ্রহণ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে কোম্পানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং ক্রেতাগোষ্ঠীর জন্য মুনাফার কিয়দংশ ব্যয় করে ভালবাসার যোগ্য হয়ে উঠার সুযোগ তৈরির কৌশল গ্রহণ করা যায়। ক্রেতা তখন সহজে ঐ পণ্যে বিমুখ হয় না। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি মঙ্গলজনক হয়েছে। যেখানে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শৈথিল্য, কিংবা সমাজের অনেক প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অর্থায়ন সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না—সেখানে সিএসআর কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়। সামাজিক অংশীদারিত্বের এই মডেল ভারসাম্য পরিবেশ গড়তেও সহায়ক হয়। ‘এটি এমন এক ব্যবসায়িক পন্থা যা সকল স্টেকহোল্ডারের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সুবিধাদি প্রদান করে টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখে’। সিএসআরের সঙ্গে হাল-আমলে নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। তা হচ্ছে সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ইনভেস্টিং বা সামাজিক দায়বদ্ধতা বিনিয়োগ। সেটা বাংলাদেশ পর্যন্ত আসতে সময় লাগতে পারে। সিএসআরের এই আলোচনা মূলত ব্যবসাকে টেকসই করার জন্যই। এখানেও সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে। মূল পার্থক্যটা হচ্ছে- সিএসআর একটি কোম্পানি সামাজিক অগ্রগতিতে কী অবদান রেখেছে তা যাচাই করা। অন্যদিকে, সাসটেইনেবিলিটি, সামনের নতুন নতুন বাজার তৈরি এবং ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই এর মূল বিষয়। যে কারণে উন্নত বিশ্বে আগে থেকেই সিএসআর প্রথা চালু রয়েছে। আমাদের এখানে অনেকেই ফিলানথ্রপি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলেন, সিএসআর বাংলাদেশে কোনো নতুন ধারণা নয়। ব্যবসা ও ব্যবসায়ীরা সবসময়ই সমাজে অনুদান, স্কুল, হাসপাতাল, সেতু নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার মাধ্যমে তাদের সুনাম সৃষ্টি করতে চায়। যদিও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে করা হয় না। সে কারণে এই ধারণার বিপক্ষ মতও রয়েছে। এই শ্রেণি আবার ফিলানথ্রপিকে সিএসআরের মধ্যে গণ্য করেন না। তবে বাংলাদেশে সিএসআর কার্যক্রম দেরিতে হলেও হচ্ছে। কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুরোপুরি সমাজভিত্তিক না করে তারা কোম্পানির দায়বদ্ধতা মেনে সংশ্লিষ্টদের শুধু সেবা দিতে চায়। অন্যদিকে, আইনি চাপে কোম্পানিগুলো সিএসআরে অর্থ খরচ করে থাকে। দেশে সিএসআরকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান দেখা যায় তৈরি পোশাক শিল্পে, যা মূলত ক্রেতাদের চাপে হয়ে থাকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ম-নীতির কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করে। একথা সত্য যে বাংলাদেশে এখন কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে। এই অংশগ্রহণ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এটারও একটা ব্যয় আছে। আবার না করারও ব্যয় আছে। এখন প্রশ্ন হলো কোম্পানির লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা করা। তাহলে সিএসআর করলে কী পরিমাণ ব্যয় করবে, তাদের মুনাফার কত অংশ হতে পারে, সেটা স্পষ্ট নয়। আগেই বলেছি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে মুনাফার জন্য। তারা সিএসআর করবে কেন? আবার অনেকেই বলছেন এটা ব্যবসার অংশ। আবার ইথিকেল বা নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে আসে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনৈতিক কাজ করবে সেটাও বাঞ্ছনীয় নয়। সেজন্য আজকের ম্যানেজাররা এ বিষয়ে সচেতন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যারা প্রতিযোগিতায় আছেন, তারাই সিএসআর কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এটা যদি পার্ট অব বিজনেস হয় তবে সবার করা উচিত। আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে চাই না। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে রেগুলেটরি চাপে সিএসআরে ব্যয় হচ্ছে। তবে এই ব্যয়র স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক সময় সময় গাইডলাইন জারি করেছে। কিন্তু যারা সরাসরি কোনো সংস্থার অধীনস্থ নয়, তাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। জেনারেলি, অনেক ক্ষেত্রে লিগ্যাল কমপ্লায়েন্স নেই, কমিউনিটির চাপও নেই। ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলো ৫২৮ কোটি টাকা সিএসআরের নামে ব্যয় করেছে। ২০১৬ সালে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫১০ কোটি টাকা। আগেই বলেছি, সিএসআরের অর্থ ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সবাই জানেন, জনতা ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রম নিয়ে অর্থমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে তত্কালীন চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রীর নানা মন্তব্য আমরা পেয়েছি। যদিও জনতা ব্যাংক একটি বই আকারে তার প্রদেয় অর্থের হিসাব প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল—একজনকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দিলাম— সেটা কি সিএসআর হবে? ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩ জুন ২০১৫ সালে এক সার্কুলারে শুদ্ধাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক প্রচার কার্যক্রমে ব্যয়কে সিএসআরের ব্যয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সিএসআরের ব্যয় নিয়ে প্রতি ছয় মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংককে রিপোর্ট করতে হয়। একটি বিভাগও এখানে খোলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আপডেট করা সিএসআর গাইডলাইনে যে বিষয়গুলো রয়েছে তা হলো— স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, সবুজায়ন উদ্যোগে অর্থ ব্যয়, জরুরি দুর্যোগকালীন ত্রাণ, পরিবেশগত খাপ খাওয়ানোর উদ্যোগ ও সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, খেলাধূলা ও বিনোদন সুবিধাও সিএসআরের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পৃথক ইউনিট গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এখন মনিটরিংয়ে জোর দেওয়া দরকার। এছাড়া, সিএসআরের জন্য কর রেয়াত সুবিধাও রয়েছে। সেখানে সত্যিকারের সিএসআর করে কর রেয়াত নেওয়া হচ্ছে, নাকি সিএসআরের ব্যয় দেখিয়ে কর রেয়াত সুবিধা নেওয়া হচ্ছে— সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। সিএসআরের জন্য সমাজের অন্য পেশার লোকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। যেমন শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। নৈতিকতা, মুনাফা ও আইনের সামঞ্জস্য রক্ষার আলোচনা তিনি শ্রেণিকক্ষে করতে পারেন। এখান থেকেই ভবিষ্যতের সিইওরা কর্মক্ষেত্রে তা প্রতিপালন করতে পারবেন। ক্লাসরুম থেকেই একটি জেনারেশন গড়ে তোলা সম্ভব— যারা কর্মজীবনে এর চর্চা করবে। অন্যদিকে, মানুষেরা যখন ভাবে, ব্যবসায়ীরা শুধু মুনাফায় ব্যস্ত, তখন এধরনের নেতিবাচক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ী নেতাদেরও করণীয় রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে এ সত্যিটা অনুধাবন করতে হবে। ব্যবসায়ীরা মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় গুরুত্ব দিতে পারেন, নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারেন, কমপ্লায়েন্স মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন ও কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারেন ইত্যাদি। মিডিয়ার ভূমিকা বরাবরই এখানে উল্লেখযোগ্য। মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। সিএসআরের অর্থ খরচে অনিয়মের যে বিষয়টি আসছে, মিডিয়া সেখানে অনুসন্ধান করতে পারে। রেগুলেটরি বডির ওপর এক ধরনের চাপ প্রয়োগ কিংবা নীতি প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকায় মিডিয়া অবতীর্ণ হতে পারে। আবার যেসব করপোরেশন ভালো করছে, তাদের নিয়ে ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা যেতে পারে। তাতে অন্যরা উত্সাহিত হবে। আর যারা সিএসআর কার্যক্রম এখনো চালু করছে না, তাদের সমস্যাদিও সামনে আনতে পারে মিডিয়া। একদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে ব্যবসার মুনাফার কিছু অংশ ব্যয় করে সমাজের উন্নয়ন ঘটানোই যখন সিএসআরের উদ্দেশ্য, তখন এর ব্যয় কাঠামোর স্বচ্ছতার জন্য নীতিমালাও জরুরি। আরো কিছু খাত চিহ্নিত করে ব্যয়ের আওতা বাড়াতে হবে। যা টেকসই উন্নয়নের জন্যও সহায়ক হয়। বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। এমডিজি অর্জনে যেমন সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ, তেমনি এসডিজি অর্জনেও সফল হতে পারবে যদি সিএসআর খাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থব্যয় করা হয়। এবং সেটি হতে হবে কার্যকর ব্যয়। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকলে উন্নয়ন কাঠামোয় সিএসআরের অর্থ ব্যয় সার্থক হবে। পরিশেষে বলতে হয়—যেহেতু ব্যবসা সমাজের জন্য, তাই সমাজকে বাদ দিয়ে কোম্পানি টিকে থাকতে পারবে না। তাই কোম্পানিগুলোকে এই বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। আইনী কাঠামো জোরালো করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। ব্যবসা পরিচালনায় ম্যানেজারদের নৈতিক হতে হবে। শ্রম অধিকার, শ্রমিকদের সুবিধা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের টিকে থাকার জন্যও সিএসআর খাতের অর্থায়ন দরকার। সর্বোপরি, শুধু অর্থ খরচ করলেই হবে না, যে খাতে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হবে তার রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা ধারাবাহিকতা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। আরো গুরুত্ব দিতে হবে সিএসআর রিপোর্টিংকে। যদি আইনী কাঠামো করা যায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে আনা যায়— তবে ঐ সংস্থার কাছে ত্রৈমাসিক কিংবা ষান্মাসিক হারে রিপোর্টিং করার ব্যবস্থা করতে হবে। যা এখন শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কিংবা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত সিএসআর বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে পঠিত মূল প্রবন্ধের সার-সংক্ষেপ)। n লেখক :সাংবাদিক

পর্দার আড়ালে জাজ মাল্টিমিডিয়া

জনতা ব্যাংকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ৫ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি

পর্দার আড়ালে জাজ মাল্টিমিডিয়া

হাছান আদনান

ভুয়া রফতানি নথি তৈরি করে জনতা ব্যাংক থেকে গত পাঁচ বছরেই ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বের করে নিয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এ কেলেঙ্কারির বড় অংশই হয়েছে রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ। আর রিমেক্সের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন আবদুল আজিজ, যিনি জাজ মাল্টিমিডিয়ারও কর্ণধার। জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর্দার আড়ালের প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাই জাজ মাল্টিমিডিয়াকে দেখছেন ব্যাংকাররা। দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে জাজ মাল্টিমিডিয়ার আবির্ভাব ২০১১ সালে। এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি। নবাব, শিকারি ও অগ্নি এর মধ্যে অন্যতম। এর বাইরে বস ২, পোড়ামন ২, বাদশা-দ্য ডনের মতো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছে তারা। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও বিনিয়োগ করেছে জাজ মাল্টিমিডিয়া। মাহি, নুসরাত ফারিয়ার মতো নায়িকার উত্থান এ প্রতিষ্ঠানের হাতেই। শাকিব খানের ব্যবসাসফল অনেক চলচ্চিত্রও জাজ মাল্টিমিডিয়ার ব্যানারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাজ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান আবদুল আজিজের বড় ভাই এমএ কাদের। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত, পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও রফতানিকারক একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে তার। এর মধ্যে রয়েছে— ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, ক্রিসেন্ট ফুটওয়্যার, রূপালী কম্পোজিট লেদার, লেক্সকো লিমিটেড ও গ্লোরী এগ্রো। সব প্রতিষ্ঠানই গড়ে তোলা হয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে রয়েছেন এমএ কাদের। আর রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমএ আজিজ। মূলত চামড়াজাত পণ্যের এ ব্যবসা পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন তারা। চামড়াজাত পণ্যের ব্যবসায় দুই ভাইকে উদার হাতে ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ২০১০ সালের পর ঋণপ্রবাহের লাগাম ছিঁড়ে যায়। ২০১৩ সাল-পরবর্তী পাঁচ বছরেই জনতা ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন এমএ কাদের ও এমএ আজিজ। এর মধ্যে পণ্য রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা তহবিল থেকে তুলে নেয়া হয়েছে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। দুই ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বর্তমানে ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে জনতা ব্যাংকের। এর বাইরে পণ্য রফতানির ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকাও আটকে গেছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারির বড় অংশই হয়েছে জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার এমএ আজিজের মালিকানাধীন রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জনতা ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। জনতা ব্যাংক সূত্রমতে, ব্যাংকটি থেকে বের করে নেয়া এ ঋণই জাজ মাল্টিমিডিয়ার অর্থের মূল উৎস। রিমেক্স ফুটওয়্যার নামে একটি অখ্যাত চামড়াজাত পণ্যের কোম্পানির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে এ অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছে ব্যাংকটির পাওয়া দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার ৬২৩ টাকা। বৈদেশিক বাণিজ্যের ঋণ হিসেবে নেয়া এ অর্থের প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আবদুল আজিজের ব্যবসায়িক পরিচিতি এমএ আজিজ নামে। জনতা ব্যাংকের নথিপত্রে রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে এমএ আজিজ নামটিই রয়েছে। যদিও ১৫ আগস্ট বণিক বার্তার কাছে রিমেক্স ফুটওয়্যারের মালিকানার কথা অস্বীকার করেন জাজ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ। তিনি বলেন, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান এমএ আজিজ তিনি নন। ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরকেও তিনি চেনেন না। প্রতিবেদক এমএ আজিজ ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার আবদুল আজিজকে ভুলবশত এক করে ফেলছেন। গতকালও একই দাবি করেন তিনি। তবে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের জানান, আবদুল আজিজ তারই ভাই। তিনি জাজ মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে চলচ্চিত্র অঙ্গনে আছেন। রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড আমাদের পৈতৃক ব্যবসা। এমএ আজিজ যে এমএ কাদেরের ভাই, সেটা জানিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান এমএ আজিজকে আমরা এমএ কাদেরের ভাই বলেই জানি। এমএ আজিজ সিনেমা তৈরি করেন বলে শুনেছি। ভুয়া রফতানি নথিপত্র তৈরি করেই মূলত জনতা ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ তুলে নিয়েছেন তারা। ব্যাংকটির পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ শাখার কয়েক কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বৃহৎ এ ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের অনুসন্ধানে এরই মধ্যে জালিয়াতির বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইমামগঞ্জ শাখার এডি লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি জনতা ব্যাংক ও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। রফতানির আড়ালে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক প্রমাণও পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ এ ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, পুরো ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ নিয়ে আমরা খারাপ সময় পার করছি। এরই মধ্যে দায়ী ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ব্যাংকের প্রতিটি পর্ষদ সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ রফতানি বিলসহ অন্য ঋণগুলো আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমরা দফায় দফায় বৈঠক করছি। একটি যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। চলতি বছরের ৩১ জুলাই রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এমএ আজিজের নামে একটি চিঠি ইস্যু করে জনতা ব্যাংক। চিঠিতে এমএ আজিজের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, হাউজ নং-৫৩৬, রোড নং-১১, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি, আদাবর-১১, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ব্যাংকটির বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের (এফটিডি) উপমহাব্যবস্থাপক মো. রূহুল আমীন খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে রিমেক্স ফুটওয়্যারের সব দায়-দেনা পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ থেকে লোকাল অফিসে স্থানান্তর করার বিষয়টি জানানো হয়। এমএ আজিজকে উদ্দেশ করে এতে লেখা হয়েছে, আপনি অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়, ঢাকার ২৪ শে জুন, ২০১৮ তারিখের পত্র (সূত্র নং-এফইপিডি(এফইএমপি/০৩/(এ)/২০১৮-৫৬৩৩) এবং জনতা ব্যাংক লিমিটেড প্রধান কার্যালয়ের ফরেন ট্রেড ডিপার্টমেন্ট-এক্সপোর্ট-এর পত্র (সূত্র নং-এফটিডি/ইমামগঞ্জ/এডি লাইসেন্স/স্থগিত/১৮, তারিখ ২৫ জুন-২০১৮) মোতাবেক জনতা ব্যাংক লিমিটেড ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় পরিচালিত আপনার প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনা জনতা ব্যাংক লিমিটেড লোকাল অফিস, ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। রিমেক্স ফুটওয়্যারের দায়-দেনার একটি হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। তাতে দেখা যায়, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছে রফতানি বিল ক্রয় (এফডিবিপি) বাবদ জনতা ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৫৩৫ কোটি ৮৫ লাখ ৭৪ হাজার ২৯০ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি প্যাকিং ক্রেডিট (পিসি) বাবদ ১৬৬ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ৪৫৭ টাকা ঋণ নিয়েছে। সাধারণত রফতানি পণ্য শিপমেন্টের জন্য এ ধরনের ঋণ দেয়া হয়। রিমেক্স ফুটওয়্যার রফতানির জন্য অগ্রিম ক্যাশ সাবসিডি হিসেবে নিয়েছে ১৪ কোটি ৮৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪২ টাকা। এছাড়া রফতানি বিল প্রত্যাবাসন না হওয়ায় প্রায় ১০৪ কোটি টাকা ফোর্সড লোন সৃষ্টি হয়েছে। রিমেক্স ফুটওয়্যারের অন্য দায়গুলো হলো— সিসি হাইপো ৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭০ টাকা, সিসি প্লেজ ১০৮ কোটি ৯০ লাখ ৭ হাজার ৮৬৪ টাকা, আইএফডিবিসি ৭১ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং এলসি বাবদ ১ কোটি ৩২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছে জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার ৬২৩ টাকা। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও জনতা ব্যাংকের কেনা রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের রফতানি বিলের অর্থ দেশে আসছে না। বিষয়টি উদ্ধৃত করে এমএ আজিজকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের দায়-দেনাগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অপ্রত্যাবাসিত এফডিবিপি দায় ও এফডিবিসি রয়েছে, যা প্রত্যাবাসন করা অতীব জরুরি। এফডিবিপি ও এফডিবিসি সংশ্লিষ্ট বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতিসত্বর এর মূল্য সংশ্লিষ্ট হিসাবে প্রত্যাবাসনের জন্য অনুরোধ করা হলো। চিঠিতে বলা হয়েছে, পিসি ঋণ অগ্রিম ক্যাশ সাবসিডি, পিএডি ক্যাশ ও লোন জেনারেল (ফোর্সড)— এ ঋণ হিসাবগুলো দ্রুত সমন্বয় করা অপরিহার্য। তাছাড়া সীমাতিরিক্ত ইসিসি হাইপো, ইসিসি প্লেজ, সিসি হাইপো, সিসি প্লেজ দায় সমন্বয় করে ওই হিসাবগুলো নিয়মিত রাখা অত্যাবশ্যক। অন্যদিকে আমদানি বিল বাবদ অপরিশোধিত আইএফডিবিসি ও এলসি (যেসব ডকুমেন্ট ব্যাংকে জমা রয়েছে) দায়গুলো দ্রুত সমন্বয় করা আবশ্যক। এমএ আজিজকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংকের সব দায় পরিশোধের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধও করা হয়েছে। জনতা ব্যাংক এমডি এ প্রসঙ্গে বলেন, রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এমএ আজিজকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি ব্যাংকের পাওনা টাকা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফেরত দেবেন বলে প্রত্যাশা করছি। সূত্র বলছে, জনতা ব্যাংক থেকে অবাধে ঋণপ্রাপ্তির সময় থেকেই জাজ মাল্টিমিডিয়ার উত্থান। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আবদুল আজিজ নিজেও বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলেছেন, দেশের চলচ্চিত্র শিল্প জাজ মাল্টিমিডিয়াই বাঁচিয়ে রেখেছে। জাজ না থাকলে বাংলা চলচ্চিত্র থাকবে না। তবে তার এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক ফারুক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের চলচ্চিত্র শিল্প শিশু নয়। এ শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষ জড়িত। তারাই এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। জাজ না থাকলে চলচ্চিত্র থাকবে না, এটা অবান্তর।

সরকারের চাপের মুখেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র...

[caption id="attachment_22450" align="alignleft" width="950"]সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইয়ের প্রচ্ছদ সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইয়ের প্রচ্ছদ[/caption]

বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র সিনহা বলেছেন, সরকারের চাপের মুখেই তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা একটি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশ করেছেন যেখানে তিনি দাবি করছেন তাকে সরকারের চাপ এবং হুমকির মুখে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। বিচারপতি সিনহার বই 'এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেমোক্রেসি" মাত্রই প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি এখন আমাজনে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। এই বইতে বিচারপতি সিনহা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন কোন পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল, এবং কিভাবে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়, এবং তারপর কেন তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের মুখে তিনি দেশে ছেড়েছেন। বিচারপতি সিনহা লিখেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি যেন সরকারের পক্ষ যায়, সেজন্যে তার ওপর 'সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে চাপ তৈরি করা হয়েছিল।'
মি. সিনহার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছিল ২০১৭ সালে সংবিধানের ১৬শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত একটি মামলার আপীলের রায়কে কেন্দ্র করে। এ রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সরকারের কাছ থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে বিচারপতি সিনহা দেশ ছেড়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখানে বইটির মুখবন্ধের কিছু অংশের অনুবাদ দেয়া হলো।

'বলা হতে লাগলো আমি অসুস্থ' মি. সিনহা লেখেন, "প্রধানমন্ত্রী এবং তার দলের অন্যান্য সদস্য ও মন্ত্রীরা পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে যাবার জন্য আমার কঠোর নিন্দা করেন। প্রধানমন্ত্রী সহ ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা আমার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে বদনাম করতে শুরু করেন।" "আমি যখন আমার সরকারি বাসভবনে আবদ্ধ, আইনজীবী এবং বিচারকদের আমার সাথে দেখা করতে দেয়া হচ্ছিল না, তখন সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় - আমি অসুস্থ. আমি চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছি।" "একাধিক মন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবো।" "অক্টোবরের ১৪ তারিখ, যখন আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই - তখন একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে আমি পরিস্থিতি স্পষ্ট করার চেষ্টায় একটি বিবৃতি দেই যে আমি অসুস্থ নই এবং আমি চিরকালের জন্য দেশ ছেড়ে যাচ্ছি না।" "আমি আশা করছিলাম যে আমার প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতি এবং আদালতের নিয়মিত ছুটি - এ দুটো মিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সহায়ক হবে, এবং শুভবুদ্ধির উদয় হবে, সরকার ওই রায়ের যে মর্মবস্তু - অর্থাৎ বিচারবিভাগের স্বাধীনতা যে জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর - তা বুঝতে পারবে।" [caption id="attachment_22453" align="alignleft" width="624"] সুরেন্দ্র কুমার সিনহা[/caption] "শেষ পর্যন্ত দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা - যার নাম ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স - তাদের ভীতি প্রদর্শন এবং আমার পরিবারের প্রতি হুমকির সম্মুখীন হয়ে আমি বিদেশ থেকে আমার পদত্যাগপত্র জমা দেই।" 'বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব' মি. সিনহা লেখেন, তার এ বইতে তার ব্যক্তিগত ও বিচার বিভাগে কর্মজীবনের কথা, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি চ্যালেঞ্জসমূহ, বিচারবিভাগ ও রাজনীতিবিদদের মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পুলিশের বাড়াবাড়ি, জরুরি অবস্থার প্রভাব, এবং "ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডিজিএফআইয়ের অর্থ আদায়ের" বিবরণ আছে। বিচারপতি সিনহার বই-এর একটি মুখবন্ধ রয়েছে - যাতে তিনি সংক্ষেপে "বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব" বর্ণনা করেছেন এবং তার ভাষায় কী পরিস্থিতিতে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ ত্যাগ করে বিদেশে গিয়েছিলেন তা লিখেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাতকারও দিয়েছেন। গত বছরের নানা নাটকীয় ঘটনাবলীর পর কোন গণমাধ্যমে এটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎকার। 'আপনাকে বলা হলো বিদেশে যাবেন, কিন্তু যাচ্ছেন না' তিনি সাক্ষাতকারে বলেন, "আমাকে যখন কমপ্লিটলি হাউজ এ্যারেস্ট করা হলো, ...তখন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন একজন করে ডাক্তার আমার কাছে পাঠানো হতো। আমি নি:শ্বাস নিতে পারছিলাম না।" "এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের চিফ এসে বললেন, হ্যাঁ আপনাকে বলা হলো আপনি বিদেশ যাবেন, আপনি যাচ্ছেন না।" "আমি বললাম: কেন যাবো আমি বিদেশে?" "আপনি চলে যান, আপনার টাকা পয়সার আমরা ব্যবস্থা করছি।" "আমি বললাম, এটা হয় না, আমি আপনাদের টাকা নেবো না। আর আপনারা বললেই আমি ইয়ে করবো না। আমি চাই সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি আলাপ করি । ব্যাপারটা কি হয়েছে আমি জানতে চাই। (তিনি) বলেন যে প্রধানমন্ত্রী আপনার সাথে কথা বলবেন না।" বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের ইমপিচ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে পার্লামেন্টের সদস্যদের দেবার পর ২০১৬ সালের ৫ই মে হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বিশেষ বেঞ্চ ওই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। সরকার এর বিরুদ্ধে আপীল করে, এবং সাত সদস্যের একটি বেঞ্চে আপীলের শুনানী হয়। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বইতে লেখেন, "জুলাইয়ের ৩ তারিখ প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ আপীল খারিজ করে হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল রাখে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের ১ তারিখ সর্বসম্মত রায়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়।" সেখানে তিনি লেখেন, "ওই সিদ্ধান্তের পর সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে - যাতে সেই রায়কে বাতিল করার জন্য আইনী পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।"

কেন আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছিঃ সম্পাদক পরিষদ

সম্পাদক পরিষদ:

জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে :

১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ২. এ আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ৩. এ আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। ৫. এ আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে। ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যাঁরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তাঁরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি, কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে এ আইনেও সাংবাদিকরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এ আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উম্মোাচন করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি, এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন-অযোগ্য। এর ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে। উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তিসংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন-অযোগ্য, পাঁচটি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে এক বছর কারাদ-, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ চার বছর থেকে সাত বছর কারাদ-। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনটি শুধু তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদ-। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তার মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।

বিশদ ব্যাখ্যা

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।

ধারা ৮

৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা। (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন। (২) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মাণ হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন। (৩) উপ-ধারা (১) ও (২)-এর অধীন কোনো অনুরোধপ্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো, ব্লক করিবে।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এখানে দুটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যে কোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যে কোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যে কোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে। প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্ল­ক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্ল­ক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

ধারা ২১

২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এ আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদন্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান। আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজম্মে র জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

ধারা ২৫

২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মসংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এ আইন ব্যবহার করতে পারেন। তারা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উম্মোাচন করে, এমন যে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এ বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে। এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না-ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে। রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণœ করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এ আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।

ধারা ২৮

২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কীভাবে জানবেন কখন ও কীভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এ পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওইসব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি ‘আঘাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

ধারা ২৯

২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-Gi section 499--এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।

ধারা ৩১

৩১। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দন্ডে। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লি­ষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ-প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসন্ন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এ আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই না-ও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।

ধারা ৩২

৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দন্ড। (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদ-, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অনধিক এক (এক) কোটি টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্লø্যাটফরমে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দফতরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া যেতে পারে, তাই তো? এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।

ধারা ৪৩

৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্ল­াশি, জব্দ ও গ্রেফতার। (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্ন বর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন : (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ; (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি; (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি। এতে পুলিশকে যে কোনো জায়গায় প্রবেশ, যে কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যে কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেফতার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এ আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪টিই জামিন-অযোগ্য, তখন গ্রেফতারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়্্গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকা- ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেফতার-আতঙ্ক তাদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তারা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তারা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যে কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লি­ষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেফতার করতে তারা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন। এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার ও সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যে কোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করেই আইনের এ ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ধারা ৫৩

৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা। এই আইনের :(ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১) এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমুহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;

সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

এ আইনের প্রায় ১৯টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

উপসংহার

১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে;
২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে;
৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বার বার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী;
৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী;
৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লে­ষণ ও ব্যাখ্যা করেছি। এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এ আইন প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে। এ আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে। পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়নসম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন: ‘আপনারা বলে থাকেন যে বাক-স্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।’ ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তারা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি।... নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে...। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।... ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তারা তাদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’  

এ রকম আন্দোলনের পরও সচেতনতা নাই

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

এ রকম আন্দোলনের পরও সচেতনতা নাই

[caption id="attachment_22250" align="alignleft" width="320"] জাতীয় সংসদে আজ বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: ফোকাস বাংলা[/caption] নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে পথচারীদের রাস্তায় চলাচলে সচেতন হতে ও আইন মানার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেকটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেছেন, এ রকম একটি আন্দোলনের পরও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়নি। আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্য নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদনেতা শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরুর পর প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে পথচারী ও যাত্রীদের দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনা থামবে। না হলে থামবে না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের একটি অদ্ভুত মানসিকতা আছে, যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হতে চায়। ছোট ছোট শিশুদের হাত ধরে রাস্তায় চলে যায়, যেখানে অনবরত গাড়ি চলছে। একটি দ্রুতগতির গাড়ি হাত দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যেতে পারে না। কাছেই ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস থাকলেও সেখানে না গিয়ে হুট করে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে চায়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা ঘটলে যারা রাস্তা পারাপার করছে, তাদের দোষ কতটুকু, সেটাও দেখা দরকার।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাস্তা পারাপারের সময় আমি মনে করি সকলকে অন্তত ট্রাফিক আইনটা মেনে চলা উচিত। এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটল, এ রকম একটা আন্দোলন হলো, তারপরও আমরা দেখি, মানুষের মধ্য সেই সচেতনতা নাই। যত্রতত্র রাস্তা পার হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা গাড়িতে ধাক্কা লাগলে গাড়ির চালক জীবন বাঁচাতে দ্রুত চলে যেতে চেষ্টা করে। ফলে যার বাঁচার সম্ভাবনা ছিল, সেও বাঁচে না। কারণ এ ধরনের ঘটনায় আহতকে বাঁচানোর চেয়ে চালককে টেনে নামিয়ে মারধর করার আগ্রহই মানুষের বেশি থাকে। আইন কারও হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। মারধর বন্ধ হলে অনেক দুর্ঘটনা কমে যায়।’ ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে এক বাবার সড়ক প্রতিবন্ধক বেড়া ডিঙিয়ে রাস্তা পারাপারের একটি ছবির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সচেতনতার যথেষ্ট অভাব আমাদের। এত বড় একটা ঘটনার পরও দেখবেন, বাচ্চার হাত ধরে দ্রুত রাস্তা পার হচ্ছে। একটা মিনিট সময় নেবে না অথবা ওভারপাস বা আন্ডারপাস দিয়ে যাবে না। এই বিষয়টা সকলের দেখা দরকার।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, হঠাৎ দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে যাওয়া বা দুটি বাস দাঁড়িয়ে আছে, যেকোনো সময় বাস ছাড়তে পারে, এমন অবস্থায় ফাঁক দিয়ে বের হতে গেলে বাসচালকের পক্ষে তা দেখা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় গাড়ি চলে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে। অথবা গাড়িতে বসার সময় জানালায় হাত ঝুলিয়ে রাখা বা মাথা বের করে রাখলে এ সময় আরেকটা গাড়ি ধাক্কা মারতেই পারে। যেকোনো সমস্যা হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, এমন অবস্থায় গাড়ির চালককে কীভাবে দোষ দেওয়া যায়? এর আগে নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কসংক্রান্ত ৯ দফা দাবির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যক্তিগতভাবে মর্মাহত ও কষ্ট পেয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই ঘটনায় বাস দুটির চালক, হেলপার ও মালিকের বিরুদ্ধে মামলাসহ তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনের আওতায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ সড়কের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। সরকারি দলের এ কে এম রহমতুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা শহরের চারপাশে এলিভেটেড রিং রোড করার পরিকল্পনা আছে। রাজধানীর যানজট নিয়ে স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর বড় বড় সব শহরে যানজটের সমস্যা আছে। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি যত হচ্ছে, তাঁরা তত বেশি গাড়ি ব্যবহার করছেন। আর যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আগে যে পরিবারের একটিও গাড়ি ছিল না, এখন তাদের মধ্যে কোনো কোনো পরিবার দুটোও গাড়ি চালাচ্ছে। যাঁর একখানা গাড়ি ছিল তাঁর এখন তিনখানা গাড়ি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যানজট যেমন সমস্যা, তেমনি যানজটে কিন্তু এটাও বুঝায় যে বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত হচ্ছে। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে এবং তারা গাড়ি ব্যবহার করতে পারছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ঢাকার যানজট নিরসনে ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। বেশ কিছু ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, আরও হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে দেরির কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো কাজ করতে গেলে নানা ধরনের সমস্যা থাকে। মানুষের বসতি থাকে, মসজিদ থাকে, হাসপাতাল থাকে, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোকে স্থানান্তর করে পুনর্বাসন করা সময়ের ব্যাপার। এ জন্যই সময়টা বেশি লেগে যায়।’ সরকারি দলের সাংসদ মো. আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে। সরকারি দলের সাংসদ মনিরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় দেশের মানুষ সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। সুষ্ঠুভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে চাহিদা অনুসারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের অর্পিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে সরকার প্রত্যাশা করে। সরকার আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

Bangladesh point finger at Myanmar for Rohingya ‘genocide’

By MATTHEW PENNINGTON | Associated Press
Bangladesh's Prime Minister Sheikh Hasina addresses the 73rd session of the United Nations General Assembly, Thursday, Sept. 27, 2018, at the United Nations headquarters. (AP Photo/Frank Franklin II) Bangladesh's Prime Minister Sheikh Hasina addresses the 73rd session of the United Nations General Assembly, Thursday, Sept. 27, 2018, at the United Nations headquarters. (AP Photo/Frank Franklin II)

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বক্তব্য:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জনাব সভাপতি, আসসালামু আলাইকুম এবং শুভ সন্ধ্যা। জাতিসংঘের ৭৩ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ নারী হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই। জাতিসংঘের প্রতি আপনার অঙ্গীকার সুরক্ষায় আপনার যেকোনো প্রচেষ্টায় আমার প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে থাকবে অকুণ্ঠ সহযোগিতা। একই সঙ্গে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য আমি জাতিসংঘের মহাসচিব জনাব অ্যান্টনিও গুটেরেসকে অভিবাদন জানাই। জনাব সভাপতি, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের জন্য আপনার নির্ধারিত প্রতিপাদ্য আমাকে অতীতের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় নিয়ে গেছে। চুয়াল্লিশ বছর আগে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যা বলেছিলেন আমি তা উদ্ধৃত করছি ‘মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি একান্ত দরকার। এই শান্তির মধ্যে সারা বিশ্বের সকল নর-নারীর গভীর আশা-আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে রয়েছে। এই দুঃখদুর্দশা-সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে জাতিসংঘ মানুষের ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষার  কেন্দ্রস্থল।’ জনাব সভাপতি, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। যেখানে ৯০ ভাগ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করতো। দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে। এই দীর্ঘ সংগ্রামে প্রায় ১৪ বছরই তিনি কারাগারে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল বার বার। স্বাধীনতা অর্জনের পর একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। দেশের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের জনগণের। মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকেরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একই সঙ্গে তারা আমার মা বেগম ফজিলাতুন নেছা, আমার তিন ভাই, যাদের মধ্যে ছোট ভাইটির বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর, নবপরিণীতা দুই ভ্রাতৃবধুসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হত্যা করে। আমি ও আমার ছোটবোন শেখ রেহানা বিদেশে ছিলাম বলে বেঁচে যাই। কিন্তু আমরা দেশে ফিরতে পারিনি। সে সময়কার ক্ষমতা দখলকারী সামরিক একনায়ক ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে খুনীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। আমরা এই নৃশংস হত্যার বিচার চাওয়ার অধিকার পর্যন্ত হারিয়েছিলাম। জনাব সভাপতি, বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত ও রোহিঙ্গাদের মত নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমার হৃদয়কে ব্যথিত করে। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।  ১৯৭১ সালে  স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের দেশের মানুষের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল মিয়ানমারের ঘটনা সে কথাই বার বার মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানীরা ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। ২ লাখ নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। এক কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমার বাবাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়।  আমার মা, ছোট দুই ভাই, বোনসহ আমিও বন্দি হই। সে সময় আমি সন্তান-সম্ভবা ছিলাম। আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয় বন্দি অবস্থায়। নোংরা ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে আমাদের থাকতে হত। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে বিবরণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে আমরা হতভম্ব। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের উপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে। জনাব সভাপতি, একজন মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা যেমন অগ্রাহ্য করতে পারি না, তেমনি পারি না নিশ্চুপ থাকতে। আমার পিতামাতাসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর আমাকেও দীর্ঘ ছয় বছর দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। আমরা দুই বোন শরণার্থী হিসেবে বিদেশে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাই আপনজন হারানো এবং শরণার্থী হিসেবে পরদেশে থাকার কষ্ট আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারি। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। আমরা আশাহত হয়েছি, কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রথম থেকেই আমরা তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার-এর মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে, মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোন কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। বাংলাদেশে অবস্থানরত এগার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা সাধ্যমত তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা করেছি। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এ জন্য আমি তাঁদের সকলের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবেন, ততদিন সাময়িকভাবে তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গারা যাতে সেখানে যেতে পারেন তার জন্যও আমি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চাচ্ছি। যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে। জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে আমরা তারও আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। জনাব সভাপতি, গত ত্রিশ বছরে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অধীনে ৫৪টি মিশনে এক লক্ষ আটান্ন হাজার ছয় শ দশ জন শান্তিরক্ষী প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রক্ষায় বিশেষ অবদান রেখেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১৪৫ জন শান্তিরক্ষী জীবনদান করেছেন। বর্তমানে ১০টি মিশনে ১৪৪ জন নারী শান্তিরক্ষীসহ বাংলাদেশের মোট সাত হাজারের অধিক শান্তিরক্ষী নিযুক্ত রয়েছেন। আমাদের শান্তিরক্ষীগণ তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও সাফল্যের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। এ ছাড়া, Peacekeeping Capability Readiness System-এ ২৩টি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য  আমরা অঙ্গীকার করেছি। নিরাপদ, নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন বিষয়ক Global Compact-এর মূল প্রবক্তা হিসেবে আমরা আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মানবাধিকার কেন্দ্রিক একটি কম্প্যাক্ট প্রত্যাশা করেছিলাম। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অভিবাসন বিষয়ক এই কম্প্যাক্টকে আমরা স্বাগত জানাই এবং অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় এটি একটি ক্রমঃপরিবর্ধনশীল দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদসহ সকল সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রম বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমরা পরিচালিত হতে দিব না। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আমাদের ‘zero tolerance’ নীতি অব্যাহত থাকবে। সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার ও মাদক প্রতিরোধে আমাদের সমাজের সকল      শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার নীতি বিশেষ সুফল বয়ে এনেছে। এ বিষয়ে  যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গৃহীত Global Call to Action on the Drug Problem-এর সঙ্গে বাংলাদেশ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। জনাব সভাপতি, ২০০৯ সাল থেকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করে চলেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে আমরা জনগণের সকল প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট রয়েছি। বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে আমাদের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের বিবেচনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আমাদের মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত অর্থবছরে ছিল শতকরা ৭.৮৬ ভাগ। মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৫.৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের শতকরা ৪১.৫ ভাগ থেকে শতকরা ২১.৮ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে হত দরিদ্রের হার ২৪ শতাংশ থেকে ১১.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারি বিনিয়োগ ২০০৯ সালে ছিল শতকরা ৪.৩ ভাগ। ২০১৮ সালে তা ৮.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০০৯ সালের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হতে ২০১৮ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা কয়লাভিত্তিক সুপারক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। সঞ্চালন লাইনবিহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঁচ দশমিক পাঁচ (৫.৫) মিলিয়ন সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের ৯০ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরুর মাধ্যমে আমরা পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ ব্যবহার যুগে প্রবেশ করেছি। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বৈশ্বিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের এই যাত্রাপথ আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পরিকল্পনার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, যা আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়নে পুরোপুরি অঙ্গীকারাবদ্ধ। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপক এবং অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর রেয়াত, দ্বৈতকর পরিহার, শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আমরা ১০০টি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি করছি যা প্রায় দশ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। জনাব সভাপতি, জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের যৌথ উদ্যেগে ১১টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে, আমি বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের কাছে পানির যথাযথ মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাই। অন্যথায় আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দায়ী থাকব। সকলের জন্য সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং এ বিষয়ক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৬ বাস্তবায়নে আমার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইতোমধ্যে, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশন এবং ৮৮ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন। জনাব সভাপতি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ছয় দশমিক পাঁচ (৬.৫) মিলিয়ন বয়স্ক    নারী-পুরুষ, বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্ত নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। ২০১০ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। চলতি বছর তেতাল্লিশ দশমিক সাত-ছয় (৪৩.৭৬) মিলিয়ন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনশ চুয়ান্ন দশমিক নয়-দুই (৩৫৪.৯২) মিলিয়ন বই বিতরণ করা হয়েছে। দৃষ্টিহীনদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতির বই এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের মাতৃভাষার বই দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক হতে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রায় কুড়ি দশমিক শূন্য-তিন (২০.০৩) মিলিয়ন শিক্ষার্থীর মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। চৌদ্দ (১৪) মিলিয়ন প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মায়েদের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পৌঁছে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে। শিক্ষার হার গত সাড়ে ৯ বছরে শতকরা ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বাহাত্তর দশমিক নয় (৭২.৯) শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের অনন্য এবং উদ্ভাবনী আর্থ-সামাজিক পদক্ষেপসমূহ বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সঞ্চয়কারীগণ যে পরিমাণ টাকা জমা করেন, সরকার সমপরিমাণ অর্থ তার হিসাবে জমা করে। আমরা গৃহহীন নাগরিকমুক্ত বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প (shelter project) গ্রহণ করেছি। আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধাসমূহ পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। জনাব সভাপতি, বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হলো নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ। নারী শিক্ষার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন আমরা নিশ্চিত করছি। সরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনাবেতনে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে ও ছেলে শিক্ষার্থীর অনুপাত ৫৩-৪৭। ২০০৯ সালের শুরুতে যা ছিল ৩৫-৬৫। বাংলাদেশের সংসদই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র সংসদ যেখানে সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেতা নারী। বর্তমান সংসদে ৭২ জন নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৩ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কৃষি, সেবা ও শিল্প খাতে প্রায় ২০ মিলিয়ন নারী কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সর্ববৃহৎ উৎস তৈরি পোশাক খাতে প্রায় চার দশিমক পাঁচ (৪.৫) মিলিয়ন কর্মীর ৮০ শতাংশই নারী। নারী উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়াই ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিলের ১০ শতাংশ এবং শিল্প প্লটের ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জনাব সভাপতি, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাত্র একশ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূখণ্ডে ১৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষের বসবাস। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা বিভিন্ন সামাজিক সূচকে প্রভূত অগ্রগতি অর্জন করেছি। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১০০ হাজারে ১৭০ এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮-এ হ্রাস পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ২০০৯ সালের ৬৪ বছর থেকে বর্তমানে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। গত অর্থবছরে আমাদের জাতীয় বাজেটের পাঁচ দশমিক তিন-নয় (৫.৩৯) শতাংশ আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছি। এ বছর স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ৩০ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অনুযায়ী আমরা যক্ষা প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম জোরদার করেছি। যার ফলে গত দুই বছরে যক্ষাজনিত মৃত্যুর হার ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জনাব সভাপতি, অটিজম ও জন্মগত স্নায়ুরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছি। এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রমকে জোরদার করতে এ সংক্রান্ত একটি সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া অটিজম বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং জাতীয় অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এ সংক্রান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়ার শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। জনাব সভাপতি, আমরা জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক High Level Panel on Digital Cooperation প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানাই। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ধারণার মূল দর্শন হলো জনগণের কল্যাণ। ইন্টারনেটভিত্তিক সেবার ব্যাপক প্রচলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবরূপ ধারণ করেছে। বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১” মহাকাশে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আমরা মহাকাশ প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করেছি। বস্তুত এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। ১৯৭৫ সালের ১৪ই জুন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ভূকেন্দ্র স্থাপন করার মাধ্যমে তিনি যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। জনাব সভাপতি, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাধিক ঝুঁকির সম্মুখীন পৃথিবীর প্রথম দশটি দেশের একটি। ভূপ্রকৃতি এবং জনসংখ্যার আধিক্য বাংলাদেশকে বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আমরা প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে আমরা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের এক শতাংশ ব্যয় করছি এবং জলবায়ু সহায়ক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করছি। আগামী পাঁচ বছরে বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ ২২ শতাংশ হতে ২৪ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য- সুন্দরবন সংরক্ষণে পঞ্চাশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সক্ষমতা সৃষ্টিতে গৃহীত পদক্ষেপসমূহকে একীভূত করে আমরা বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ শীর্ষক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ একটি জলকেন্দ্রিক, বহুমুখী এবং টেকনো-ইকনমিক দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা। স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যা কিনা দীর্ঘ ৮২ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জনাব সভাপতি, ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন আজও অব্যাহত রয়েছে যা আমাদের মর্মাহত করে। এ সমস্যার আশু নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমরা ওআইসির মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাব। জনাব সভাপতি, মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে তিনটি মৌলিক উপাদান বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, তা হলো- শান্তি, মানবতা ও উন্নয়ন। তাই মানবসমাজের কল্যাণে আমাদের মানবতার পক্ষে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। জনগণকে সেবা প্রদান এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। মানবতা ও সৌহার্দ্যই আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সমস্যা-সঙ্কুল এই পৃথিবীতে আমাদের সম্মিলিত স্বার্থ, সমন্বিত দায়িত্ব ও অংশীদারিত্বই মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে। জনাব সভাপতি, বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে আমি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি। গত সাড়ে নয় বছরে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। যে বাংলাদেশকে বলা হতো দুর্যোগ, বন্যা-খরা-হাড্ডিসার মানুষের দেশ, তা এখন বিশ্বশান্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের পথচলা এখনও শেষ হয়নি। এ পথচলা ততদিন চলবে যতদিন না আমরা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব। ধন্যবাদ জনাব সভাপতি। খোদা হাফেজ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
UNITED NATIONS – Bangladeshi President Sheikh Hasina on Thursday accused Myanmar of failing to honor a verbal commitment to take back Rohingya Muslims who have fled a crackdown she described as tantamount to genocide.
Hasina's remarks at the annual gathering of world leaders at the United Nations came as the U.N. Human Rights Council agreed to set up a team to collect evidence of alleged crimes that one day could be used to prosecute suspected perpetrators. U.N.-backed investigators have already said the reported atrocities could amount to genocide and other war crimes. Myanmar, which barred the investigators from the country, has rejected that reporting as "replete with unverified information."
"We are appalled by what we have seen in U.N. reports about atrocities against the Rohingya who have now taken shelter in Bangladesh, which are tantamount to genocide and crimes against humanity," Hasina told the General Assembly.
She appealed for more international support for the 1.1 million Rohingya refugees now sheltering in Bangladesh, and urged an "early, peaceful solution" to the crisis. Most have arrived since August 2017 when attacks by Rohingya militants on Myanmar security forces triggered a massive retaliation that prompted a massive cross-border exodus of civilians.
"Despite their verbal commitment to take back the Rohingya, in reality the Myanmar authorities are yet to accept them back," Hasina said.
International pressure is mounting on Myanmar, which is to address the General Assembly on Friday. The Organization of Islamic Cooperation on Thursday hosted a ministerial-level meeting on the sidelines of the assembly to address the plight of the Rohingya, following another hosted by Britain earlier in the week. Both were conducted behind closed doors. Also, a U.S. government investigation released Monday concluded that the Myanmar military had targeted Rohingya civilians indiscriminately and often with "extreme brutality" in a coordinated campaign to drive the minority Muslims out of the country. The report provided statistical analysis. It said most of those interviewed had witnessed a killing, and half had witnessed sexual violence, and the military was identified as the perpetrator in 84 percent of the killings or injuries they witnessed.
Human rights groups criticized the Trump administration for not describing the crackdown as "genocide." The U.S. has characterized the gross abuses as "ethnic cleansing," which is not a criminal definition.
Deputy Secretary of State John Sullivan told reporters Thursday that the investigation, based on interviews with more than 1,000 Rohingya refugees, was intended as a forensic description and not to make legal judgements. But he added that the U.S. is working toward accountability for those responsible, and on "characterizing it as a crime against humanity or a genocide."

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.