আরএমজি খাতে কর্মরত হাজারো শ্রমিকের মধ্যে পরিবর্তনঃ এ্যালায়েন্সের কার্যক্রম বন্ধ

কার্যালয় বন্ধ, কার্যক্রম গুটিয়েছে অ্যালায়েন্স

পোশাক কারখানা মূল্যায়নে উত্তর আমেরিকাভিত্তিক পোশাকপণ্যের ক্রেতা ও শ্রম অধিকার সংস্থার জোট অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি (অ্যালায়েন্স) বাংলাদেশে তাদের কার্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে পূর্বঘোষিত সময়ের মধ্যে জোটটি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিল। জোটের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বার্তায় জোটের পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অ্যালায়েন্স ৩১ ডিসেম্বর থেকে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এখন থেকে অ্যালায়েন্সের কাছে পাঠানো কোনো ই-মেইল আর গ্রহণ করা হবে না। পাঁচ বছর ধরে চলমান অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তায় আরো বলা হয়েছে, আমরা আরএমজি খাতে কর্মরত হাজারো শ্রমিকের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পেরেছি। আশা করছি, আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা সংশ্লিষ্ট কারখানা, কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতার বোধ তৈরি করতে পেরেছি। এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর অ্যালায়েন্স বাংলাদেশে তাদের মূল্যায়ন কার্যক্রমের চূড়ান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার পর অ্যালায়েন্স স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে আওতাভুক্ত কারখানাগুলোয় নিরাপত্তা মানদণ্ড পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ নির্বাহ ও হেল্পলাইন উন্নয়নের কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ওই বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে অ্যালায়েন্স তাদের পঞ্চম ও চূড়ান্ত বর্ষের কার্যক্রমের ফলাফল প্রকাশ করে। প্রতিবেদন প্রসঙ্গে অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টির বরাত দিয়ে অ্যালায়েন্স বলে, গত পাঁচ বছরে অ্যালায়েন্স, সদস্য ব্র্যান্ডগুলো ও অ্যালায়েন্স অধিভুক্ত কারখানার মালিকরা বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা উন্নয়নে অভাবিত অগ্রগতি অর্জন করেছে। এছাড়া তারা পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করতে সহায়তা করেছে। এ অগ্রগতি বজায় রাখতে অবশ্যই একটি চলমান প্রচেষ্টার প্রয়োজন। আমাদের সদস্য ব্র্যান্ডগুলোর কাছে অ্যালায়েন্স চলে যাওয়ার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। নিজেদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে অ্যালায়েন্স জানায়, পর্যবেক্ষণের আওতাধীন কারখানাগুলোর ৯৩ শতাংশ সংস্কারকাজ সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। অ্যালায়েন্স অধিভুক্ত ৪২৮টি কারখানা তাদের সংশোধনী কর্মপরিকল্পনায় উল্লিখিত সব সংস্কার সম্পন্ন করেছে। প্রায় ১৬ লাখ শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডের জরুরি মুহূর্তে নিজেদের রক্ষা করার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অ্যালায়েন্স অধিভুক্ত কারখানাগুলোর বাইরে অন্যান্য কারখানাতেও এ প্রশিক্ষণের বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে অ্যালায়েন্স একটি স্থানীয় অংশীদার গঠন করেছে। ২৮ হাজার নিরাপত্তাকর্মী অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি ভিত্তিতে ভবন ত্যাগের প্রক্রিয়া বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, ১৫ লাখের বেশি শ্রমিক হেল্পলাইন ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। এ হেল্পলাইন স্থানীয় সংস্থা ফুলকির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিগগিরই এ সেবা দেশজুড়ে সব তৈরি পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়বে। এছাড়া ১৮১টি শ্রমিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হয়েছে, এর ফলে শ্রমিকরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাদের কারখানায় বিদ্যমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে।

করছাড় ও প্রণোদনায় সুসময়ে পোশাকশিল্পঃপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫.৬৫ শতাংশ

দেশের রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাত তৈরি পোশাকে সরকারের উল্লেখযোগ্য নীতিসহায়তার ফলে ২০১৮ সালে বেশ সুসময়ই পার করেছে এ খাত। সদ্য প্রকাশিত রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যান এমন চিত্রই স্পষ্ট করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৮-১৯) দেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ সময় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫.৬৫ শতাংশ। আগের বছর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পুরো সময়ে এই খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৮৬ শতাংশ। এ ছাড়া গত বুধবার অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) এক প্রজ্ঞাপনে রপ্তানিকারকদের জন্য উৎসে কর অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দিয়েছে। আগে উৎসে কর দশমিক ৬০ শতাংশ দিতে হলেও এখন দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন এর ফলে সরকার ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচনের আগে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে। ওই মজুরি ডিসেম্বর মাস থেকে কার্যকর করার কথা। শ্রমিকরা চলতি মাসেই সেই মজুরি পাবে। কিন্তু মজুরিবৈষম্য অভিযোগের কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ করে দেন মালিকরা। এত কিছুর পরও কোনো রকম নেতিবাচক প্রভাব ছাড়া ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে মোট রপ্তানির ৮৩ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। আলোচ্য সময়ে ৭৫৯ কোটি ডলারের নিট পোশাক এবং ৭১৭ কোটি ডলারের ওভেন পোশাকের রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে নিট পোশাকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৯২ শতাংশ। ওভেন পোশাকে ১৭.৪৮ শতাংশ। বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, চার থেকে ছয় বছর ধরে দেশের পোশাক খাতে অনেক সংস্কারকাজ হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বমানের সবুজবান্ধব কারখানা হয়েছে। পোশাক খাতে তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না বললেই চলে। এর ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি এবং এরই ধারাবাহিকতায় আজকের অগ্রগতি। এসব অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে সামনের দিনগুলোতে। এটা করা গেলেই ২০২১ সালে দেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে না পারলেও কাছাকাছি সম্ভাবনা আছে। জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, আগের বছরে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমে গিয়েছিল, সেই হিসেবে বর্তমান রপ্তানি আয় আশাব্যঞ্জক। তবে অন্য খাতগুলোতে রপ্তানি আয় বেশ কমে গেছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত বলা হলেও এসব খাতে রপ্তানি আয় উদ্বেগজনক। ফলে পোশাকনির্ভরতা আরো বাড়ছে। তিনি বলেন, রপ্তানি বাড়ানোর অন্য বাধাগুলো দূর না করে উৎসে কর কমানো মোটেও ঠিক হয়নি। চামড়া ও অন্য খাতগুলোর যেসব সমস্যা আছে সেগুলোকে আমলে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সাভারের ট্যানারি পল্লী পুরোপুরি কার্যকর করা, কাঁচামাল আমদানিতে ট্যারিফ বাধা, অবকাঠামো এবং ঋণ নিয়ে সমস্যার প্রতি নজর দেওয়া উচিত। উৎসে কর কমানোর ফলে পোশাক খাতই সুবিধা পাচ্ছে। অন্য খাতগুলো এগিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া আমাদের টেক্স জিডিপি রেশিও (কর এবং ডিজিডিপির অনুপাত হার) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের ১০ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ, নেপালের ১৬ শতাংশ, ভারতের ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। এর ফলে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।’

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের দাবি

ব্যাংক একীভূতকরণ

ভারতের পথে হাঁটবে কি বাংলাদেশ?

হাছান আদনান

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের (এনপিএ) হার সবচেয়ে বেশি দেনা ব্যাংকে। মন্দঋণের ভারে ন্যুব্জ এ ব্যাংকটিসহ বিজয়া ব্যাংক একীভূত হচ্ছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অব বরোদার সঙ্গে। পরিচালন ব্যয় কমানো, আর্থিক ভিত শক্তিশালীকরণ ও নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের ধাক্কা সামলাতেই একীভূতকরণের পথে হেঁটেছে ব্যাংক তিনটি। এর মধ্য দিয়ে বরোদা হচ্ছে দেশটির তৃতীয় বৃহৎ ব্যাংক। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একীভূতকরণের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ২১টি ব্যাংকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ১১টি ব্যাংক রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশোধন প্রক্রিয়ার আওতায়। শুধু ভারতে নয়, প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সময়ে সময়ে একীভূত হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক। এক দশক ধরে দেশের আর্থিক খাতে আলোচিত হচ্ছে সিংহভাগ ব্যাংকের দৈন্যতার বিষয়টি। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের চাপে পড়ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের কারণে পড়তে হচ্ছে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে। ভালো পরিচালন মুনাফা করেও শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশিত মুনাফা দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের চেয়েও নাজুক অবস্থা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ক্ষেত্রে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময় একীভূতকরণের কথা বলেছেন। ২০০৯ সালে শিল্প ঋণ সংস্থা ও শিল্প ব্যাংক একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) গঠিত হয়। এরপর দেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ পথে হাঁটেনি। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মালিক সরকার। এ ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারে। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদকে। ব্যাংকগুলো নিজ থেকে এগিয়ে না এলে জোর করে একীভূত করে দেয়ার ফল ভালো না-ও হতে পারে। সবল ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে চাইবে না। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যাংকের এক্সিট পলিসি না থাকা। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংককে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া দরকার। লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। বর্তমানে দেশে ৫৯টি তফসিলি ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। নতুন নতুন ব্যাংকও এ খাতে যুক্ত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ সংখ্যাকে বেশি বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সিংহভাগ ব্যাংকের সম্পদ ১৫ হাজার কোটি টাকার নিচে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ হাজার কোটি টাকারও কম। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয় নির্বাহেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের ভারও বইতে হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ খাতে একীভূতকরণের পথেই হাঁটতে হবে। পরিস্থিতি দাবি করলেও সদিচ্ছার অভাবেই দেশের ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অনেক আগেই দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ কিংবা অবসায়নের দরকার ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। আইন বা নীতিমালায় যা-ই থাক না কেন, ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্তটি আসতে হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। একদিকে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সুপারিশ, অন্যদিকে একীভূতকরণের উদ্যোগ পরস্পরবিরোধী। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং খাতে একীভূতকরণের কথা বলা আছে ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১তেও। আইনের ৪৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের অনুরোধক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রস্তাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩-এর বিধান অনুযায়ীও বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণে সহায়তা করার ক্ষমতা রাখে। উভয় আইনের বিধান বাস্তবায়নে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণের জন্য ২০০৭ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের আর্থিক খাতের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে নীতিমালটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। গাইডলাইনস ফর মার্জার/অ্যামালগামেশন অব ব্যাংকস/ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস শীর্ষক এ নীতিমালায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হতে পারবে। যেকোনো ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসাপেক্ষে অধিগ্রহণ করতে পারবে। তবে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ থেকে। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনও থাকতে হবে। একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি ‘ডিউ-ডিলিজেন্স’ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে। ডিউ-ডিলিজেন্সের প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে একীভূত হতে যাওয়া নতুন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনাও। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনগুলোর যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের মূল্যমান নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে উচ্চ আদালতে পিটিশন দায়ের করতে হবে। আদালতের নির্দেশেই চূড়ান্ত বিচারে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। একীভূত হওয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়দেনার মূল্যমান নির্ধারণ, শেয়ারমূল্য, মূলধন, লভ্যাংশসহ সব বিষয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ-বিষয়ক নীতিমালাটি প্রণয়ন করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ স্বল্পোন্নত ও উন্নত দেশগুলোর ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিমালা পর্যালোচনা করেই আমরা বাংলাদেশের জন্য নীতিমালাটি তৈরি করেছিলাম। সময়ের চাহিদার ভিত্তিতে ওই সময় নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও এখনো তার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই ব্যাংক একীভূত হচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই দুর্বল হয়ে ধুঁকছে। অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আমানত পরিশোধ করতে পারছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে জনগণের পকেটের অর্থ দিয়ে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। এ তালিকায় নতুন করে বেসরকারি ব্যাংকও যুক্ত হয়েছে। তবে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য সম্ভাব্য সব বিকল্পই ভাবা হচ্ছে বলে জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতসহ পুরো আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সতর্ক আছি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য যত বিকল্প আছে সবই ভাবা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীও এর আগে ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে কথা বলেছেন। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা উন্নত করতে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

বছরে জিডিপি ক্ষয় ৪০ হাজার কোটি টাকা

ব্যক্তির অদক্ষতায় ক্ষতি রাষ্ট্রের

বছরে জিডিপি ক্ষয় ৪০ হাজার কোটি টাকা * বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা * অদক্ষতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না

কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিতে বড় বাধা অদক্ষতা অসতর্কতায় গতি হারাবে অর্থনীতি * গতানুগতিক শিক্ষায় কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই * কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে * জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ ২৬টি খাতে দক্ষ লোকের অভাব * সংকট উত্তরণের কার্যক্রম চলছে খুব ঢিমেতালে

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেঃ দক্ষ শ্রম পাঁচ ভাগ বাড়লে উৎপাদন বাড়ে চার ভাগ * দরকার মানবসম্পদের বিকাশে অগ্রাধিকার

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট।’ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় যোগ্যরাই টিকে থাকে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর যোগসূত্র টেনে বলছেন, কোনো দেশে দক্ষ উদ্যোক্তা, দক্ষ শ্রমিক ও মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং সুদক্ষ দেশপ্রেমিক সরকারের সমন্বয় থাকলে বৈশ্বিক উত্থান-পতনের মধ্যেও সেদেশে ঊর্ধ্বগতির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। যেখানে বেসরকারি খাত ও অন্য সংস্থাগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য সর্বস্তরে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এ প্রসঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যুগান্তরকে বলেন, দিনবদল হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নে দেশে প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আইটিতে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে আসছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলছে। বর্তমান সরকার তরুণদের জন্য এ প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সারা দেশে ৬৪টি আইটি পার্ক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে সেদিন বেশি দূরে নয়। যেদিন প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত এ দেশের তরুণরা একদিন বিশ্ব জয় করবে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, দক্ষতা এমন অমূল্য সম্পদ যা মূল্যায়নের বিচারে প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান সর্বদাই এগিয়ে থাকে। এর সুবিধাও ভোগ করে দক্ষতা অর্জনকারী। তবে এ দক্ষতার মানদণ্ড ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণ অর্থে শ্রমিকের কাজ করার ক্ষমতা বা উৎপাদন ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। অর্থাৎ দ্রব্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিকের অধিক উৎপাদন করার ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। আবার ব্যবস্থাপনাগত কৌশল দিয়ে অপচয় রোধ করাকেও কৌশলগত দক্ষতা বলা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, শ্রমের দক্ষতা বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদন শক্তি বাড়ে। এতে সময় ও সম্পদের অপচয় রোধ হয় এবং দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিভিন্ন পেশায় শ্রম সরবরাহ নিশ্চিত হয়। মজুরির হারেও সমতা আসে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়, দামস্তরে সমতা আসে, শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা লাভ করে। কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। কারণ এখানে প্রবৃদ্ধি সহায়ক কোনো ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে সরকারের যে ভিশনারি চিন্তা ও পরিকল্পনা করছে- তা আমলা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় সেটি আর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে মননশীল উদ্যোক্তারও যথেষ্ট অভাব আছে। তারা শ্রমিককে দিয়ে যেনতেন উপায়ে কাজ আদায় করে নিতে চায়। কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন ঘটালে যে তার প্রতিষ্ঠানেরই লাভ সেদিকটি বিবেচনায় আনে না অধিকাংশ উদ্যোক্তা। ফলে শ্রমের অদক্ষতার কারণে অপচয়ও বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। এ বিষয়ে ইউকে কমিশন ফর এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড স্কিলস (ইউকেসিইএস-২০১০) বিষয়ক গবেষণায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, উচ্চ দক্ষতা উৎপাদনশীলতার ওপর ধনাত্মক প্রভাব ফেলে। অপরদিকে নিু দক্ষতার প্রভাব ঋণাত্মক হয়। এজন্য দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বারোপ করে প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতাপূর্ণ শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে চার শতাংশ পর্যন্ত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে মজুরিও এক দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। কারণ উৎপাদন বাড়লে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিট মুনাফা বেড়ে যায়। ইউকেসিইএস ২০১০-এর অপর এক গবেষণায় বলা হয়, প্রশিক্ষণের পর উৎপাদনশীলতার ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটে। যেখানে মজুরি বৃদ্ধি পায় তিন দশমিক তিন শতাংশ। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকের সঙ্গে অদক্ষ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার পার্থক্য আট শতাংশ পর্যন্ত ঘটে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিবিদ ব্যালট গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রশিক্ষণের কারণে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়েছে। ২০১৭ সালে ব্র্যাকের উদ্যোগে ‘দি পাওয়ার অব অ্যাপ্রেন্টিসশিপস’ শীর্ষক এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কর্মসংস্থানে প্রবেশ করলে কিশোর-কিশোরীদের মাসিক গড় আয় বাড়ে প্রায় ছয়গুণ। এর ফলে তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে সাড়ে সাতগুণ। ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের খাদ্য খাতে ব্যয় ৯ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়। তবে দক্ষতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় অন্য দেশের তুলনায় কম। সেটি দেশে কিংবা প্রবাসে একই চিত্র। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন বিষয়ক প্রতিবেদন মতে, ২০১৫ সালে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মাথাপিছু আয় ছিল দুই হাজার ৭৮ দশমিক ৯৫ ডলার। অন্যদিকে একজন ভারতীয় অভিবাসীর মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ১৯৪ দশমিক ২৪ ডলার, ফিলিপাইনের চার হাজার ৯৫০ ডলার, নেপালের তিন হাজার ৩০০ ডলার ও পাকিস্তানের একজন অভিবাসীর মাথাপিছু আয় হচ্ছে তিন হাজার ২৪১ দশমিক ৯৪ ডলার। অথচ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অন্তত এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে কাজ করছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ পেশাজীবী হওয়ায় রেমিটেন্স কম আসছে। বাকিরা স্বল্প দক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধাদক্ষ। অন্যদিকে অদক্ষতার কারণে অপচয়ের বিভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে ভূরি ভূরি। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ : শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নয়নে সুযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক জরিপ তথ্যে এর একটি বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো ১৬ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে, পাশাপাশি জ্বালানির খরচ ২১ শতাংশ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। দেখানো হয়, এ প্রকল্পে অংশ নেয়া ৩৬টি কারখানার মাধ্যমে বার্ষিক গড়ে এক লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার করে ৫২ লাখ ডলারের জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো যায়। এছাড়া দক্ষতা উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিজিএমইএ ‘ট্রিস’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৭ কিলোওয়াট আওয়ার পাওয়ার সঞ্চয় হচ্ছে। বাজার মূল্যে এর আর্থিক পরিমাণ হবে এক কোটি ৯ লাখ ৭২ হাজার ১৬৮ টাকা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এর অনুপস্থিতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার অনেক কম। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০১৭ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার সবচেয়ে বেশি ছিল ভিয়েতনামে (৭৮ দশমিক ২২ শতাংশ)। অথচ তিন দশক ধরে বাংলাদেশে এটা ৫৬ থেকে ৫৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উদ্যোক্তা আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, সস্তা শ্রমের ওপর এক সময় বাংলাদেশে শিল্পের বিকাশ হলেও এখন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হবে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার দক্ষতা অর্জন। সেটা শ্রমশক্তি এবং ব্যবস্থাপনা উভয় জায়গাতেই দরকার আছে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে শিল্পের অগ্রগতি একটা সময়ে গিয়ে আর বেশিদূর এগিয়ে নেয়া যাবে না। কাজেই এ অবস্থায় শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে তোলার জন্য সরকার ও মালিকদের উদ্যোগ নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, বাংলাদেশের বেকার সমস্যা সমাধান ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হলেও অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়। কারণ এর অর্থনৈতিক কাঠামোয় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল দক্ষ শ্রমিকের অভাব। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতিও ব্যাপক। এক কথায় দেশের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও সেবা খাতসংশ্লিষ্ট সার্বিক ব্যবস্থাপনার কোনোটিতেই প্রত্যাশিত দক্ষ কর্মী নেই। আশঙ্কার কারণ হল কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৮৬ শতাংশ অদক্ষ। আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। অর্থাৎ অদক্ষতার ভারে দিন দিন দুর্বল হচ্ছে অগ্রসরমান অর্থনীতি। ২০১৫ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালে এসেও সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও, আইএমএফ, এডিবি ও আইডিবিসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে তা সুনির্দিষ্ট করেছে। সেখানে অগ্রসরমান অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণের মধ্যে প্রথমে রেখেছেন দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি। কর্মক্ষম শ্রমশক্তির এ বেহাল দশা নিয়েই বাংলাদেশ এখন মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক. ২০২৪ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি আদায়। দুই. ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং তিন. ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পৌঁছানো। এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবার আগে দরকার মানবসম্পদের উন্নয়ন। মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাই পারে এর নিশ্চয়তা দিতে। এটাই দক্ষতা উন্নয়নের কার্যকর উপায়। দক্ষতা থাকলে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্থায়ী আয়-উপার্জন এবং শ্রমের বিনিময়ে ভালো অর্থপ্রাপ্তিরও নিশ্চয়তা মেলে। এর প্রভাবে পরিবারের সমৃদ্ধি ঘটে। এর সার্বিক প্রভাবে অর্থনীতি কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির দিকে চালিত হয়। অর্থনীতিতে দক্ষ লোকের সংখ্যা যত বেশি হবে সার্বিক প্রবৃদ্ধিও তত দ্রুত হবে। পাশাপাশি সেটি টেকসইও হবে। এ প্রসঙ্গে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে বিশেষ করে কর্মক্ষম যুবশক্তিকে অদক্ষ রেখে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। তাই সরকার দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মোট ৭৫টি ট্রেডে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৯ বছরে ২২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬ জনকে এসব ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ যুবক ও যুব মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু দক্ষতা উন্নয়ন নয়, পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও তাদের গড়ে তোলার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যুগোপযোগী ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং, হাউজকিপিং, ট্যুরিস্ট গাইড, ফ্রন্ট ডেস্ক, ম্যানেজমেন্ট, সেলসম্যানশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ই-লার্নিং, কোয়েল পালন কোর্সে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতসহ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ ২৬টি খাতে দক্ষ লোকের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। অথচ সংকট উত্তরণের কার্যক্রম চলছে খুব ঢিমেতালে। সরকার, আমলা, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং রাজনীতিকদের কাছে এটি গুরুত্বহীন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রমে গতি না পেলে ডাবল ডিজিটে প্রবৃদ্ধি অর্জন তো দূরের কথা, কাঙ্ক্ষিত তিনটি লক্ষ্যের কোনোটির দ্বারপ্রান্তেই পৌঁছানো যাবে না। এ প্রসঙ্গে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক আবদুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম ও দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। সবার আগে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন ডিসিসিআই সূত্রমতে, ২০১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৬ শতাংশ হারে হয়েছে। এ সময় মাত্র ২৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ তখন দেশে চাকরিরত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি সাত লাখে। এ হিসাবে কর্মসংস্থানের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১.১২ শতাংশ, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির এক-ষষ্ঠাংশেরও কম। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) ‘লেবার মার্কেট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দাবি করা হয়, দক্ষ জনশক্তির অভাব বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় বাধা। কেননা উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং দক্ষ শ্রমশক্তির মধ্যে পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি। আবার শ্রমশক্তির চাহিদা বাড়ার জন্য দরকার উচ্চ প্রবৃদ্ধি। তবে চাহিদা হবে দক্ষ শ্রমিকেরই। এতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, শিগগিরই দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে প্রবৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে আটকে থাকবে। একপর্যায়ে সেটিও আর ধরে রাখা যাবে না। এমনটি হলে উন্নয়নশীলের ধাপ পেরিয়ে উন্নত দেশে পৌঁছানোর স্বপ্ন একটা সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। অর্থনীতিবিদ ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ যুগান্তরকে বলেন, কর্মক্ষম (কাজ করার উপযোগী) জনসংখ্যা দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনার বড় জায়গা। দক্ষ ও সুপ্রশিক্ষিত শ্রমশক্তিই পারে দেশকে বদলে দিতে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা এ শ্রমশক্তি তৈরি করতে পারছে না। আবার কারিগরি শিক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। পরিবর্তিত কর্মক্ষেত্র এবং প্রযুক্তির সঙ্গেও সেটা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাদের যে গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়া দরকার, তাতেও ঘাটতি আছে। যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে না এবং বাজারের চাহিদাও মেটায় না। ফলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে। সর্বশেষ শ্রমশক্তির জরিপ (২০১৬-১৭) : বিভিন্ন বয়সী কর্মক্ষম মোট জনগোষ্ঠী দেখানো হয় ১০ কোটি ৯০ লাখ। যার সংখ্যাগরিষ্ঠই অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারছে না। জরিপের তথ্যমতে, মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৪ লাখ মানুষের মধ্যে কর্মক্ষম (৬৫-তদূর্ধ্ব) বয়সী লোক আছে ৭৯ লাখ। আবার ১৫-৬৪ বয়সীর এ সংখ্যাটি ১০ কোটি ১১ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় শতকরা ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ। অপরদিকে ১৫-২৯ বয়সীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। যা মোট জনসংখ্যার ৭৯ ভাগ। বিভিন্ন পর্যালোচনায় মূলত এই তরুণ জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব মোচন এবং দক্ষতা উন্নয়নের ভাবনাটিই এই সময়ের বড় দাবি হয়ে উঠছে। কিন্তু তার অগ্রগতি সেভাবে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দক্ষতাপূর্ণ শ্রমজরিপ তথ্য পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তথ্যানুযায়ী, কারিগরি শিক্ষার হার উন্নত দেশে ৬০ শতাংশের বেশি। ভারতে এটি ২৭ শতাংশ, নেপালে ২৩ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৪০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে গ্র্যাজুয়েট লেভেলে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর থেকেই বোঝা যায়, এ দেশগুলোর উন্নতির সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সম্পর্ক কী? আমাদেরও বুঝতে হবে এর গলদটা কোথায়? অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত যুগান্তরকে বলেন, কারিগরি শিক্ষার অপর্যাপ্ততার প্রভাব পড়ছে সার্বিক কর্মসংস্থানে। উৎপাদন তথা উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বাধা আসছে। সরকারি খাতে চাকরির সুযোগ কম। বেসরকারি খাতে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এর অভাবে অনেক মেধাবী ও উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাও থাকছে বেকার অথবা চাহিদা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, জনগোষ্ঠীর ৭৯ শতাংশ হচ্ছে যুবশক্তি। তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক হলেও এটা উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে না। এ পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ে যেতে হলে কর্মমুখী দক্ষতা, প্রশিক্ষণের মান ও উৎপাদনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। আইএলও’র ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক ডিকেড : এশিয়া, প্যাসিফিক অ্যান্ড দ্য আরব স্টেট’ শীর্ষক ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চ্যাপ্টার সম্পর্কে আশঙ্কাজনক তথ্য দেয়া হয়েছে। এ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এ দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪০ শতাংশ তরুণ শিক্ষায় নেই, চাকরি করছেন না, আবার চাকরিতে যোগ দেয়ার জন্য কোনো প্রশিক্ষণও গ্রহণ করছেন না। যদিও তারা শ্রমবাজারেরই অংশ কিন্তু পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। মধ্যপ্রাচ্যের ২১টি দেশের মধ্যে খারাপের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সাধারণ শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া তরুণদের অনেকে শ্রমবাজারে খাপ খাওয়াতে পারেন না। নিজের সামাজিক জীবনমানের পাশাপাশি দেশের উন্নতির জন্য দরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসার। এজন্য বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে এ তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার সময় এসেছে। এর জন্য শিক্ষা পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। উৎপাদন ও সেবা খাতে দেশের উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত দক্ষ কর্মীর খোঁজে থাকেন। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী একজন দক্ষ কর্মীকে নানাভাবে অভিহিত করা যায়। যেমন- জটিল সমস্যা সমাধানে সক্ষম, বিশ্লেষণধর্মী ভাবনা, সৃজনশীলতা, মানব ব্যবস্থাপনা, অন্যদের সঙ্গে সমন্বয়, আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সঠিক বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সেবামূলক মনোভাব এবং সমঝোতার অধিকারী ব্যক্তি। কিন্তু দেশে গতানুগতিক শিক্ষার সনদধারীদের মধ্য থেকে চাহিদা অনুযায়ী এ মানের দক্ষ কর্মী পাওয়া যায় না। এ কারণে বিভিন্ন খাতে কর্মরতদের অদক্ষতার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। তবে এ অদক্ষতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। বিআইডিএস ‘লেবার মার্কেট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখানো হয়, হালকা প্রকৌশল খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ নির্মাণ খাতে ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং কৃষিতে ৬০ শতাংশ অদক্ষ। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ৯৫ শতাংশ অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ। এর বাইরে তৈরি পোশাক খাতে ৯২ শতাংশ, আইসিটিতে ৪০ শতাংশের বেশি, চামড়া শিল্পে ৮৬ শতাংশ, পর্যটন খাতে ৭২ শতাংশ প্রবেশ করে অদক্ষ লোক। স্বাস্থ্য খাতের প্রযুক্তিনির্ভর পদগুলোতে আরও বেহাল। বিভিন্ন খাতে কর্মরতদের অদক্ষতায় চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের তাদের ব্যবসার গুণগত মান ও বিপণন আধিপত্য ধরে রাখার জন্য জনবল আমদানি করতে হচ্ছে। আবার এর উল্টোটিও হচ্ছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বা খাত স্থানীয় দক্ষ কর্মী থাকার পরও তাদের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। তবে বাস্তবতা হল- দেশে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। উচ্চশিক্ষা থেকে নানাবিধ শিক্ষার বাণিজ্যিক প্রসার ঘটলেও মেধাবী কর্মী মিলছে না। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন কারখানায় উচ্চপদস্থ মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখানোর মতো কর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে কর্মীর অদক্ষতা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ প্রসঙ্গে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অদক্ষতার কারণে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই লাখ দক্ষ বিদেশি কর্মীর মজুরি হিসেবে বিপুল পরিমাণ টাকা গুনতে হচ্ছে। বিদেশি কর্মীরা এ বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতি বছর ব্যাংকিং চ্যানেলে বা অন্য কোনো পথে নিয়ে যাচ্ছেন। অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে দেশীয় অর্থনীতির চালকের আসনে এখন বিদেশিরা। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন শিল্প মালিকরাও। উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে তারা প্রকৃত মজুরির চেয়েও দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি মজুরিতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপক ও দক্ষ শ্রমিক আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বিদেশি কর্মীর পেছনে উদ্যোক্তাদের প্রতি বছর গড়ে মজুরি দিতে হচ্ছে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলারের মূল্যমান ৮০ টাকা ধরলেও এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবে বর্তমানে চলতি বাজার মূল্যে জিডিপি পরিমাপ করা হচ্ছে ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি বছর দেশীয় জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ প্রতি বছর বিদেশিরা নিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পৌঁছাতে হলে সামনের দিনগুলোতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর নির্ভর করতে হবে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন জরুরি। এজন্য সরকার এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন ইনপুট ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা হল- বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দেশে দক্ষতা উন্নয়নে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আবার কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আসায় বিদেশি প্রযুক্তি ও দক্ষতার সঙ্গেও দেশের সংযোগ ঘটছে না। আঙ্কটাডের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট-২০১৮ অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যেখানে প্রতিবেশী ভারতে ৪০ বিলিয়ন, চীনে ১৩৬ বিলিয়ন এবং ভিয়েতনামে ১৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি ও ভোকেশনাল এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রসারের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি। জানা গেছে, জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সরকার একটি শিক্ষানীতি হাতে নেয়। এ নীতি খুবই প্রগতিশীল এবং সময়োপযোগী। যেখানে শ্রমসংশ্লিষ্ট কাজের কথা বলা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও নৈতিকতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এখানে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে কারিগরি শিক্ষার কথাও বলা হয়েছে। যেখানে অষ্টম শ্রেণীর পর যদি কেউ আর লেখাপড়া না করে সে যেন দক্ষতা অনুযায়ী একটি কর্ম বেছে নিতে পারে সে লক্ষ্যে নির্দেশনা রয়েছে। আর যদি লেখাপড়া করে তাহলে কারিগরি শিক্ষা নিতে হবে। এরপর ২০১১ সালে দক্ষতা উন্নয়ন নীতি নামে আরেকটা নীতি প্রণয়ন করা হয়। এর জন্য একটা কাউন্সিলও গঠিত হয়েছে। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো আইন বা প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। নীতিগুলো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত শিক্ষা আইন হয়নি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এটি দূরীকরণে শিল্প-শিক্ষায়তন সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন। কারণ দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। আবার ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অনুযায়ী মানবসম্পদ পাচ্ছে না। তাই শিল্প-কলকারখানার চাহিদামাফিক দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ সরবরাহের উদ্দেশ্যে এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সিলেবাস প্রণয়ন করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতেও সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি আরও বেশি বাস্তবানুগ ও আধুনিকীকরণ করে শিল্পের দক্ষতা চাহিদা মেটাতে এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রবৃদ্ধিকরণ, জনগণের ক্ষমতায়ন এ স্লোগান নিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে আর্থ-সামাজিক সূচকের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নেই বেশি জোর দেয়া হয়েছে। এজন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বিনিয়োগ, কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে। যেখানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদাকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ‘গ্লোবাল হেলথ ওয়ার্কফোর্স লেবার মার্কেট প্রজেকশন ফর-২০৩০’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে আট কোটি দক্ষ ও স্বল্পদক্ষ নার্স, মেডিকেল পেশাজীবীসহ স্বাস্থ্যসেবীর চাহিদা তৈরি হবে। কিন্তু চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ছয় কোটি ৫০ লাখ দক্ষ কর্মী তৈরি হবে। দেড় কোটি স্বাস্থ্যসেবীর ঘাটতি দেখা দেবে। তথ্যানুযায়ী উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ চাহিদা তৈরি হবে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বের শ্রমবাজার হল মেধাভিত্তিক বাজার। কিন্তু আমাদের প্রবাসীদের বেশির ভাগই শ্রমভিত্তিক পেশায় জড়িত। বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এ মুহূর্তে ২০ লাখ প্রোগ্রামার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করা গেলে বিপিও খাতে তাদের ব্যাপক কর্মসংস্থান হতে পারে। বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ প্রবাসী আয়। বৈদেশিক বিনিয়োগের চেয়ে প্রবাসী আয় বহুগুণ বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দশ লাখ বাংলাদেশির। কিন্তু এই প্রবাসী শ্রমিকদের বেশির ভাগই অদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ। তাদের পরিপূর্ণভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে বিদেশে পাঠানো গেলে প্রবাসী আয় বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ বাড়ত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা জিডিপির...

১০ বছরে রাজস্ব আদায় সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

রমজান আলী : নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গত ১০ বছরে গতিশীল হয়েছে অর্থনীতির চাকা। ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের সময়কালে বাংলাদেশে এনবিআর রাজস্ব আদায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ সময়ে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর আদায়ের হারও ছিল বেশি, যা দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্রের মোট কর রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ এবং জাতীয় বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দিচ্ছে এ বিভাগ। ২০০৮-২০০৯ সময়ে রাজস্ব ৫২,৫২৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২,০৬,৪০৭.২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১,৭১,৬৫৬.৪৪ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আহরণ হয় দুই লাখ ছয় হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। গত দশ বছরের মধ্যে রাজস্ব আদয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে ৬ বার। এক্ষেত্রে বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা আগের সরকারের সময়কার অর্জিত প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম এবং ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৭ হাজার ৪১১ কোটি ডলার। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৯ টাকা। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩২০০ মেগাওয়াট তা এখন প্রায় চার গুণ বেড়ে বৃদ্ধি পেয়ে ১৮ হাজার ৩৫৩ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। তৈরি পোশাক রফতানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং মাছ উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে বাংলাদেশ। ২০০৯ শিক্ষার হার ছিলো ৪৭ শতাংশ আর এখন শিক্ষার হার ৭৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল ডাবল ডিজিটে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৫.০৩ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ১০.৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.২৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন ডলার যা বর্তমানে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও উপর । প্রায় দশ বছরে দেশ-বিদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। দারিদ্র্যতার হার হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যতার হার ২৪.২৩% থেকে হ্রাস পেয়ে নেমেছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে। সম্পাদনা: সোহেল রহমান, ইকবাল খান।

শিক্ষক প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

শিক্ষক প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

| সাইফ সুজন | শ্রেণীকক্ষে গুণগত পাঠের বিষয়টি নির্ভর করে শিক্ষকের দক্ষতার ওপর। বেশির ভাগ দেশেই শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পর পরই তাই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হয় শিক্ষকদের। কোনো কোনো দেশে শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের শর্তই থাকে প্রশিক্ষণ। যদিও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের অর্ধেকেরই প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বড় অংশ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতি বছর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (জিইএম) প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ইউনেস্কো। সংস্থাটির প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫০ শতাংশ। যদিও প্রতিবেশী নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরে এ হার ৯০ শতাংশের বেশি। এছাড়া শ্রীলংকায় প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানরত শিক্ষকদের ৮৫ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮২ ও ভারতের ৭০ শতাংশেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে। এর বাইরে ভুটান, জর্ডান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের শতভাগই প্রশিক্ষিত। শিক্ষক সংখ্যার তুলনায় প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততাকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবের কারণ বলে জানান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক নিয়োগ পাওয়ার পর পরই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তবে ডিপিইডি ও সি-ইন এড প্রশিক্ষণের আওতায় না আনতে পারলেও নিয়োগ দেয়ার পর পরই সপ্তাহব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়। তবে গুণগত পাঠদানের ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রাখে না, তা সত্য। গুণগত পাঠদানের লক্ষ্যে শতভাগ শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার। লক্ষ্মীপুরের পুরনো বিদ্যালয়গুলোর একটি সদর উপজেলার বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানে বিদ্যালয়টিতে সহকারী শিক্ষক রয়েছেন চারজন। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ রয়েছে মাত্র দুজন শিক্ষকের। বাকি দুজন পাঠদান করছেন প্রশিক্ষণ ছাড়াই। প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়ছেন শিক্ষকরা। শাম্মী আখতার নামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছি এক বছর হলো। যোগদানের পরদিন থেকে আমাকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ক্লাস নিতে বলা হয়। ক্লাস নিতে গিয়ে আমি বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে শুরু করি। এরপর প্রধান শিক্ষক ও সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে (ক্লাস্টার) প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহের বিষয়টি জানাই। তারা আমাকে বলেন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। আপনার সিনিয়ররাই এখনো প্রশিক্ষণ পাননি। তাদের পর প্রশিক্ষণের তালিকায় আপনার নাম আসবে। যদিও শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে এ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের সনদ নিতে হয়। শুধু প্রাথমিক নয়, শিক্ষার প্রতিটি ধাপেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। নিয়োগের শর্ত হিসেবে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কেননা আমাদের দেশে বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়েছেন। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের জন্য এসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। এছাড়া প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি-বেসরকারি মিলে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ৮৫ লাখ ৮ হাজার ৩৮ ও ছাত্রী সংখ্যা ৮৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩১২। এ শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিয়োজিত ৬ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৪ জন শিক্ষক। মোট শিক্ষকের ৬২ শতাংশই নারী। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিকেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের পেছনের সারিতে বাংলাদেশ। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষকদের ৬৬ শতাংশই অপ্রশিক্ষিত। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকই প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে এ হার ৯৩ শতাংশ, ব্রুনাইয়ে ৯০ ও নেপালে ৮৯ শতাংশ। আর ভুটান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও জর্ডানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানরত শতভাগ শিক্ষকই প্রশিক্ষিত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এক দশক আগেও মাধ্যমিক পর্যায়ে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের চিত্র আরো ভয়াবহ ছিল। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একসময় শিক্ষক প্রশিক্ষণে সরকারের বরাদ্দও কম ছিল। এখন শিক্ষার গুণগত মানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের অবস্থান ভালোর দিকে যাচ্ছে। বেশির ভাগ শিক্ষকই প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন, এমন একটি বিদ্যালয় পিরোজপুর সদরের আটঘর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নয়জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজনই অপ্রশিক্ষিত। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, আমাদের সব শিক্ষকই স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পাঁচ শিক্ষক। পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা আর অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এজন্য আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মাধ্যমে ক্লাসও বেশি নিয়ে থাকি। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে প্রায় ৪৩ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছেন না। সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝে প্রশ্নপত্র তৈরিতে সক্ষম ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। চলতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪ হাজার ৮০১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এমন চিত্র পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একাডেমিক সুপারভিশন দল। সূত্রঃ বণিক বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

মালিকানা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা: কিভাবে এই কোম্পানীরা লাইসেন্স পেলো??

ঠিকানাহীন ছয় আইজিডব্লিউ : বিটিআরসির পাওনা ৭৫০ কোটি টাকা

|সুমন আফসার|
মালিকানা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। নেই পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা। এ ধরনের ছয় ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পাওনা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় পাওনা আদায়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বার্ষিক লাইসেন্স ফি ও আয় ভাগাভাগির অংশসহ অন্যান্য পাওনা নিয়মিত পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বড় অংকের এ বকেয়া পড়েছে। বকেয়া পরিশোধ না করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বেসটেক টেলিকম, রাতুল টেলিকম, কেএওয়াই টেলিকমিউনিকেশনস, টেলেক্স, ভিশন টেল ও অ্যাপল গ্লোবাল টেল কমিউনিকেশন। ছয় প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সই বাতিল করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। জানা গেছে, ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা রয়েছে ভিশন টেল লিমিটেডের কাছে ১৯১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পাওনা আদায়ে ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) অ্যাক্ট, ১৯১৩ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। একই বছর নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) ও টেলিযোগাযোগ আইনেও আলাদা মামলা করা হয় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। আইসিএক্স লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ক্লাউড টেল লিমিটেডের সহযোগী কোম্পানি ভিশন টেল। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের এক মেয়ে। তবে বিটিআরসির দায়ের করা মামলার বিবাদীরা হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর ছেলে ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এসএম আসিফ শামস, পরিচালক রাসেল মির্জা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইরিন ইসলাম, মো. শরিফুল ইসলাম ও শেয়ারহোল্ডার জিয়াউর রহমান। এর মধ্যে আইরিন ইসলাম ও পরিচালক শরিফুল ইসলামকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে গ্রেফতারও করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন তারা। আরেক আইজিডব্লিউ প্রতিষ্ঠান বেসটেক টেলিকমের বকেয়ার পরিমাণ ১৩০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পিডিআর আইনের আওতায় সার্টিফিকেট মামলা করে বিটিআরসি। এ মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদেশের দিন ধার্য করা হয়েছে। একই বছরের জুনে গুলশান থানায় টেলিযোগাযোগ আইনেও মামলা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েত করিম ও পরিচালক মামুন-উর-রশিদ রয়েছেন মামলার বিবাদী হিসেবে। অ্যাপল গ্লোবাল টেল কমিউনিকেশনসের কাছে পাওনার পরিমাণ ১২০ কোটি ১ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পিডিআর আইনে মামলা করে বিটিআরসি। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ আইনেও মামলা করা হয়েছে। অস্পষ্টতা রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়েও। শুরুর দিকে অ্যাপল গ্লোবাল টেলের মালিকানায় ছিলেন সোহেল আহমেদ, মনির আহমেদ, ইকবাল বাহার জাহিদ ও ইমদাদুল হক মোল্লা। আইজিডব্লিউ প্রতিষ্ঠান টেলেক্স লিমিটেডের কাছে সরকারের পাওনা রয়েছে ১০৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি পিডিআর আইনে মামলা দায়ের করা হয় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। মামলা করা হয়েছে এনআই ও টেলিযোগাযোগ আইনেও। তিনটি মামলায়ই বিবাদীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। সঠিক নাম-ঠিকানাও পুনরায় দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স পেতে সুপারিশ করেন ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা। টেলেক্স লিমিটেডের বর্তমান মালিক আবদুর রহমান ও মুজিবুর রহমান। বিটিআরসির মামলায় এ দুজনকে বিবাদী করা হয়েছে। রাতুল টেলিকমের কাছে পাওনার পরিমাণ ১০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বর পিডিআর আইনে মামলা করে বিটিআরসি। এর আগেই টেলিযোগাযোগ আইনে বনানী থানায় মামলা করা হয়। আবাসন খাতে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান রূপায়ণের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রাতুলের নামে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে সৈয়দা আমরিন রাখী প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেন। এছাড়া রাতুল টেলিকমের আরো ২০ শতাংশের মালিক নানকের স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু। এ দুজনের পাশাপাশি মামলায় বিবাদী করা হয়েছে শেয়ারহোল্ডার মাসুদুর রহমান বিপ্লব, সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, সাবেক পরিচালক আলী আকবর খান রতন, সাবেক পরিচালক মাহির আলী খান রতন, সাবেক শেয়ারহোল্ডার নওরিন জাহান মিতুল ও সাবেক শেয়ারহোল্ডার সাইফ আলী খান অতুলকে। সরকারের পাওনা ১০৩ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি কেএওয়াই টেলিকমিউনিকেশনস। এজন্য ২০১৪ সালের জুলাইয়ে পিডিআর আইনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়। একই বছর বনানী থানায় মামলা করা হয়েছে টেলিযোগাযোগ আইনেও। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের স্ত্রী সালমা ওসমান, ছেলে ইমতিয়ান ওসমান, শ্যালক তানভির আহমেদ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা। পরবর্তী সময়ে মো. শাখাওয়াত হোসেন, দেবব্রত চৌধুরী ও মো. রাকিবুল ইসলাম এটির মালিকানায় রয়েছেন বলে দেখানো হয়। যদিও মামলা করার পর তাদের কারো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা দাখিল করতে বলেছেন আদালত। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাওনা এ অর্থ আটকে থাকায় রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আমার কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। সচিব ও বিটিআরসিকে এ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি সম্পর্কে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে উদ্যোগ নেয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিআরসির কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পাওনা আদায়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পর্যালোচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের নাম-ঠিকানাসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এ বকেয়া অনেকদিনের উল্লেখ করে বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, পাওনা আদায়ে এরই মধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সরকারের পাওনা এ অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। উল্লেখ্য, আইজিডব্লিউগুলো আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান করছে। আইজিডব্লিউর মাধ্যমে আসা কল গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছে অপারেটররা। দেশে আইজিডব্লিউ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৯টি। ২০০৮ সালে নিলামের মাধ্যমে চার প্রতিষ্ঠানকে এ লাইসেন্স দেয়া হয়। আর ২০১২ সালের এপ্রিলে নতুন ২৫টি প্রতিষ্ঠান আইজিডব্লিউ লাইসেন্স পায়। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় বর্তমানে কার্যক্রমে রয়েছে ২৩টি। সম্প্রতি আরো একটি প্রতিষ্ঠানকে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিল : মাত্র তিন কোম্পানি দিয়েছে ৫৫% অর্থ

বদরুল আলম
দেশে প্রচলিত শ্রম আইনে গঠিত শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অর্থ জমা শুরু হয় ২০১৩ সালে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ৩১১ কোটি টাকা। এ অর্থ জমা দিয়েছে দেশী-বিদেশী ১২১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ও ইউনিলিভার বাংলাদেশই দিয়েছে মোট তহবিলের ৫৫ শতাংশ। শ্রমিকদের কল্যাণে গঠিত ফাউন্ডেশনে জমা দেয়া এ তিন প্রতিষ্ঠানের অর্থের পরিমাণ ১৭০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই বহুজাতিক। শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠানেরও সবগুলোই বহুজাতিক। এর মধ্যে তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। সর্বোচ্চ অর্থ প্রদানকারী পরের দুই কোম্পানি হলো তামাক খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ও এফএমসিজিখাতের পণ্যের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড। শ্রমিকদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠানের মুনাফার অংশ জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে ২০০৬ সালের শ্রম আইনে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির মূলধন ২ কোটি টাকার বেশি অথবা মোট সম্পদ ৩ কোটি টাকার উপরে হলে বছর শেষে তারা যে মুনাফা ঘোষণা করে, তার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করতে হয়। এ ৫ শতাংশের এক-দশমাংশ প্রদান করতে হয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন গঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে। আইন মেনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে এখন পর্যন্ত ৯৪ কোটি ২ লাখ ৫৮ হাজার ২৮ টাকা জমা দিয়েছে গ্রামীণফোন। এটাই একক কোম্পানি হিসেবে তহবিলে জমা দেয়া সর্বোচ্চ অর্থ। গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটারনাল কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, আইন মেনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে সরকারের প্রাপ্য অর্থ নিয়মিত পরিশোধ করে আসছে গ্রামীণফোন। গ্রামীণফোনের পরই এ তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে তামাকজাত পণ্যের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ। এ প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৪০ কোটি ৭১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ টাকা। তহবিল সংগ্রহ শুরুর সময় থেকেই তারা শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে অর্থ জমা দিয়ে আসছেন বলে জানান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব আজিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অন্য সব আইনের মতোই শ্রম আইনও যথাযথভাবে পরিপালন করছে আমাদের প্রতিষ্ঠান। দেশী বা বিদেশী যে প্রতিষ্ঠানই হোক আইন সবার জন্যই সমান। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা আইনটি পরিপালনের তদারকি বাড়ালে তহবিলে আরো সাড়া পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা দিয়েছে আরেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, যার পরিমাণ ৩৫ কোটি ৯৫ লাখ ৬৭ হাজার ১৩২ দশমিক ২৮ টাকা। তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানটির জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৩ টাকা। ওয়ালটন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (পলিসি, এইচআরএম অ্যান্ড অ্যাডমিন) এসএম জাহিদ হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটি অংশ সরকারের তহবিলে জমা দেয়ার বিধান আছে। নিয়মিতই আমরা এ তহবিলে অর্থ জমা দিচ্ছি। এটি ব্যবহারের দায়ভার আমাদের নয়। তবে প্রত্যাশা থাকবে, তহবিলটি যেন যথাযথভাবে শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হয়। টেলিকম খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রবি আজিয়াটা লিমিটেড রয়েছে তালিকার পঞ্চম স্থানে। প্রতিষ্ঠানটির জমা দেয়া অর্থের পরিমাণ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ কোটি ১০ লাখ ৪৫ হাজার ২৬৩ টাকা। রবির পরই সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যার পরিমাণ ৯ কোটি ৯০৪ টাকা। জমা দেয়া অর্থের পরিমাণে দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওয়ালটনের পরই আছে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। তহবিলে প্রতিষ্ঠানটি জমা দিয়েছে মোট ৬ কোটি ৪৬ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৯ টাকা। এছাড়া মেঘনা পেট্রোলিয়াম জমা দিয়েছে ৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৬ হাজার ১২৫ ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ২৮ টাকা। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে উল্লেখযোগ্য অর্থ জমা দিয়েছে বহুজাতিক ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ৫ কোটি ১৫ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪ ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ৪ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৪ টাকা। দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেয়া এ তহবিল পরিচালনার জন্য তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন ২০০৬। শ্রমিক কল্যাণে কীভাবে এ তহবিল ব্যবহার হবে, তা-ও বলে দেয়া আছে এ আইনে। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিক ও তার পরিবারের কল্যাণ সাধন, অসুস্থ বা অক্ষম কিংবা অসমর্থ শ্রমিকদের আর্থিক সাহায্য প্রদান, দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারকে সাহায্য দেয়া হবে এ তহবিল থেকে। পাশাপাশি তহবিলটি থেকে শ্রমিকদের জন্য যৌথ বীমা ব্যবস্থার প্রবর্তন করাসহ শ্রমিকের পরিবারের মেধাবী সদস্যের শিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. এএমএম আনিসুল আউয়াল বণিক বার্তাকে বলেন, তহবিলে জমা হওয়া অর্থের এক-তৃতীয়াংশই দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। আর ৭০ শতাংশই দিয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর কারণ হয়তো তাদের কমপ্লায়েন্স মেনে চলার মানসিকতা। দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বর্তমানে খুব ধীরগতিতে হলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইন অনুসরণে সচেতন হচ্ছে। আমরাও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। ক্রমেই এ তহবিলের আকার ও এ থেকে সহায়তা প্রদান অনেক বাড়বে বলে আশা করছি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে এ পর্যন্ত শ্রমিকদের ২৫ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল থেকে সহায়তা প্রাপ্তির আবেদন প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দ্রুত করার জন্য সহায়তার আবেদন প্রেরণ ও গ্রহণ অনলাইনে করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সহায়তার অর্থ মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। এজন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।

আয়করের ৭ শতাংশ আসে রিটার্ন থেকে : কর আদায়ে সক্রিয় হোক...

রাজস্ব আয়ে আয়করের অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও কেন যেন তা স্থবির হয়ে আছে। নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও আয়করের মাত্র ৭ শতাংশ আসছে রিটার্ন থেকে, ৬৭ শতাংশ আসছে উেস কর থেকে। বিশ্বব্যাপী আয়করের বড় অংশই আসে রিটার্নের মাধ্যমে। বছর শেষে রিটার্ন জমা দেয়ার মাধ্যমে আয়কর পরিশোধ করেন বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। করযোগ্য নাগরিকদের কাছ থেকে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমেই সম্পদের হিসাব ও কর আহরণ করা হয়। আমাদের এখানে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়করের পরিমাণ কম হওয়ায় করদাতা বাড়লেও এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণ খুব একটা বাড়েনি। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়ের উৎস থেকে কেটে নেয়া করই আয়করে মূল অবদান রাখে।

আয়কর ফাঁকির মহোৎসবে পেশাজীবীদের এক বড় অংশ জড়িত বলে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সবাই যেন একাট্টা। এনবিআরের তদন্তে পেশাজীবীদের কর ফাঁকির বিষয়টি ধরা পড়েছে। কর ফাঁকিবাজের তালিকায় রয়েছেন রাজনীতিবিদরাও।

আয়ের উৎস পেশাজীবীরা প্রকাশ করতে চান না। সরকার চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দিলেও নির্ধারিত ফির চেয়ে তারা বেশি নেন। একইভাবে আইনজীবীরা তাদের মক্কেলের কাছ থেকে কত টাকা নেন, এরও হিসাব অন্য কেউ রাখে না। শিক্ষকরা স্কুল-কলেজের বাইরে প্রাইভেট পড়ালেও সে আয়ের তথ্য প্রকাশ করেন না। দেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআরের যে সাফল্য, তা ব্যবসায়ীনির্ভর। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আয়কর আদায়ে তারা যতটা সক্রিয়, ততটাই নিষ্ক্রিয় পেশাজীবীদের কাছ থেকে আদায়ে। ফলে দেশের লাখ লাখ পেশাজীবী এখনো আয়করের আওতায় আসেননি। তাদের নেই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন। এমনকি দেশে কতজন পেশাজীবী করদাতা আছেন, কোন পেশার করদাতা কী পরিমাণ আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন, এরও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। পেশাজীবীদের আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকায় সরকার প্রতি বছর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে এমন অসংখ্য কোটিপতি রয়েছেন, যাদের নাম আয়করদাতার তালিকায় নেই। যাদের নাম তালিকায় আছে তারা প্রকৃত আয় অনুযায়ী আয়কর দেন কিনা, সেটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে আয়কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অন্তত এক কোটি ব্যক্তিকে করজালের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া ২০২০-২১ সালের মধ্যে এ খাত থেকে মোট রাজস্বের ৫০ শতাংশ (বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ দশমিক ৪১ শতাংশ) আহরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন হওয়া উচিত এবং সম্ভবও। কারণ দেশের আর্থিক অবয়ব অনুযায়ী মোট রাজস্ব আয় খাতে আয়করের (২৭ শতাংশ) অবস্থান মূল্য সংযোজন কর বা মূসক (৩৮ শতাংশ) ও শুল্ক (৩৩ শতাংশ) খাতের নিচে থাকার কথা নয়। কারণ যে সমাজে ভোগ্যপণ্য ও বিলাসবহুল সামগ্রী আমদানি বাবদ ব্যয় বেশি, সে সমাজে আয়কর দেয়ার মানুষের সংখ্যা সামান্য, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যানের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামের ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৯০ লাখ কর দেয়। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের দেশে এক কোটি মানুষকে কেন আয়করের আওতায় আনতে পারবে না এনবিআর, তা এক বড় প্রশ্ন। জাতীয় কর দিবসের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্বেচ্ছায় করদাতাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর দেয়ার উপযুক্ত অনিচ্ছুক নাগরিকদের আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি জরুরি সিদ্ধান্ত, যা রাষ্ট্রের কল্যাণকামী সব নাগরিকের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই করজাল সম্প্রসারণ নীতির সুফল পেতে হলে সরকারকে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে আয়কর দেয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিরা একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির ভেতর দিয়ে আয়কর দিতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, আয়করদানের যোগ্য ব্যক্তিদের সর্বাধিক ২৫ শতাংশ আয়করদাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। পদ্ধতিগত জটিলতা ও আয়কর বিভাগের হয়রানির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই করদাতাদের পকেট থেকে আয়কর খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা ভোগ করেন আয়কর আইনজীবী ও কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বর্তমান সরকারের আমলে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েই গেছে।

৫০ শতাংশ মানুষের মতে কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল: সিপিডির জরিপ

সিপিডির গবেষণা : আয়কর দেন না ৬৮% সামর্থ্যবান ব্যক্তি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে, এনবিআরের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। বৃহস্পতিবার(৮ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে সিপিডির সংলাপে এই তথ্য জানানো হয়। সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, ‘কর ব্যবস্থা নিয়ে এক হাজার দুইশ’ মানুষের মধ্যে জরিপ চালিয়েছে সিপিডি। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এনবিআরের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। আর ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করে, এনবিআরের কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি রয়েছে। সিপিডির জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশ মানুষের এক তৃতীয়াংশ গত বছর আয়কর দেয়নি। যারা দিয়েছেন, তারাও পুরোপুরি দেননি। কর ফাঁকি দিয়েছেন। ’ দেশের কর ব্যবস্থায় অনুবর্তী অংশগ্রহণের মূল নির্ণায়কগুলো যাচাইয়ের জন্য সিপিডি ২০১৮ সালে বাংলাদেশের ২১টি জেলায় কর প্রদানে সমর্থ ১২০০ ব্যক্তির ভেতরে একটি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বমূলক ধারণা জরীপ চালিয়েছে। জরীপে অংশগ্রহণকারী ৮৫% অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি মনে করেন সরকারি সেবার সরবরাহ এবং তার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জনগন কর প্রদানে উৎসাহী হবেন। ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন কর ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের মধ্যে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা হয়। ৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এনবিআরের সেবা ও তার গুণগতমান বাড়ালে জনগণ কর দিতে উৎসাহিত হবে। সিপিডির সুপারিশে বলা হয়, কর অফিসকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ধনী অথচ কর ফাঁকি দেন এমন ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সমতাভিক্তিক কর ব্যবস্থা বিকশিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য এবং আধুনিক সম্পত্তি ও সম্পদ কর চালু করতে হবে। সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কর আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছে এনবিআর। এর অংশ হিসাবে ঢাকার ফ্ল্যাট বাসায় খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে এখন ই-টিনের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ রিটার্ন দিচ্ছে না। অন্যতম কারণ কর নিয়ে এক ধরনের ভয় আছে। তাই করদাতাবান্ধব এনবিআর গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।’ সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশে সুশাসন জরুরি। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।’ তিনি বলেন, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে করছাড় দেওয়া হয়। এছাড়া কেউ অপরাধ করেও শাস্তি পায় না। বাংলাদেশে নিযুক্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আবাসিক প্রতিনিধি রাগনার গুডমান্ডসন বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে বাংলাদেশে কর আদায় একেবারে কম। জিডিপির অনুপাতে মাত্র ৯ শতাংশ কর আদায় হয়। দক্ষিণ এশিয়াতে এটি সর্বনিম্ন। প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বাড়ছে মানুষের আয়। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়ছে না আয়কর প্রদানের হার। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপ বলছে, দেশে মাত্র ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান ব্যক্তি আয়কর দেন। সে হিসাবে সামর্থ্যবানদের ৬৮ শতাংশই কর দেন না। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ক্যাটালাইজিং ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স ফর বাংলাদেশ: মবিলাইজেশন অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করে সিপিডি। অনুষ্ঠানে দুটি নিবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ‘পটেনশিয়াল অব ইনকাম ট্যাক্স ইন বাংলাদেশ: অ্যান এক্সামিনেশন অব সার্ভে ডাটা’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। ২০১৮ সালের ধারণা জরিপের ফল উপস্থাপন করে বলা হয়, জরিপের তথ্য অনুযায়ী কেবল ৩২ শতাংশ সামর্থ্যবান ব্যক্তি আয়কর প্রদান করেছেন, বাকিরা করেননি। এমনকি সবচেয়ে উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই আগের বছর আয়কর দেননি, তার মানে এই নয় যে, যারা কর প্রদান করেছেন তারা কোনোরূপ কর ফাঁকি দেননি। সিপিডির এ জরিপে কর ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৫ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, কর ব্যবস্থা ধনীদের পক্ষপাতদুষ্ট। আর ৫০ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, বর্তমান কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। গত বছর কর দিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের ৫৪ শতাংশই এ ধারণা পোষণ করেন। এছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৫ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন, সরকারি সেবার সরবরাহ ও তার গুণগত মান বৃদ্ধি পেলে জনগণ কর প্রদানে উৎসাহী হবে। কর দিচ্ছেন এমন ৬৫ শতাংশের মত হলো, কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি বিদ্যমান। অপেক্ষাকৃত ধনীদের ৬৯ শতাংশের মনে এমন ধারণা কাজ করছে। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের প্রতি বেশকিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তুলনামূলক নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা সহজতর করা, কর অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও কর ফাঁকি দেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। এছাড়া স্কুল পর্যায় থেকেই কর ব্যবস্থায় অংশ নেয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়ার সুপারিশও করেছে সিপিডি। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এনবিআর চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন ভূঁইয়া। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, আইএমএফের বাংলাদেশ কার্যালয়ের আবাসিক প্রতিনিধি রেগন্যার গুডমুন্ডসন ও এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাদ কবির। অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, করদাতারা এখনো কর প্রদানের ক্ষেত্রে ভয় পান। তাদের এ ভয় দূরীকরণে কর কর্মকর্তাদের জনকল্যাণমুখী হওয়ার নির্দেশনা দেয়া আছে। সেটি বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। বর্তমানে ৩৫ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। কিন্তু কর দিচ্ছেন ২০ লাখের কম। এ অবস্থায় করজাল বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। জনবলসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তবে সেটি কাটিয়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, অগ্রিম আয়করের মাধ্যমে করজাল বাড়ানো হচ্ছে। আমদানি করছেন এমন ব্যবসায়ী কিংবা ব্যাংকে যাদের সঞ্চয়পত্র আছে, তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না। কিন্তু অগ্রিম করের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। আবার বাড়ির মালিকরা রিটার্ন দাখিল করছেন কিনা তা তদারকিতে ছয় মাসের মধ্যে তথ্যভাণ্ডার করা হবে। আমাদের কাস্টমস ও আয়কর বিভাগে জনবল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সেটি বৃদ্ধি পেলে কার্যক্রমে আরো গতি আসবে। সামনের দিনে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১০ থেকে ১৩ শতাংশে উন্নীত হবে। বৈদেশিক সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্প করলে অনেক বেশি সুশাসন ও গুণগত মান রক্ষা করা যায়। তবে আমরা এখন নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করছি। অনুষ্ঠানে ‘ক্যান বাংলাদেশ ডু উইদাউট ফরেন এইড?’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। উপস্থাপনায় তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ আকারে বৃদ্ধি পেলেও তা জিডিপির অনুপাতে কমেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার খুব বেশি প্রভাব নেই। মাইক্রো লেভেলে শুধু স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে এর প্রভাব রয়েছে। তবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার খুব বেশি প্রভাব নেই— এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের দেশে যেতে, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক সাহায্য দরকার রয়েছে। তবে এটি সতর্কতার সঙ্গে দক্ষভাবে ব্যবহার জরুরি। সমাজে এখনো নানা ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আয়-বৈষম্যের তুলনায় সম্পদ-বৈষম্য এখন বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আয়করের পাশাপাশি সম্পদ করের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দেশের কর ব্যবস্থাপনা ধনীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট কিনা সেটি দেখতে হবে। আর কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন সঙ্গতিপূর্ণ করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে সুশাসনে ঘাটতি রেখে কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনা সম্ভব নয়। এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিডিপি অনুপাতে দেশে রাজস্ব সংগ্রহ ও কর আহরণ কোনো ক্ষেত্রেই তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। নেপালের মানুষের জনপ্রতি আয় আমাদের চেয়ে অর্ধেক হলেও তারা আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ রাজস্ব প্রদান করে। দেশে এখন শ্রম ও মূলধনবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। আর বাংলাদেশ এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছে যায়নি যে, এখনই বলতে হবে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন নেই। কেননা এখনো আমাদের দেশে রাজস্ব জিডিপি অনুপাত অনেক কম। তবে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর প্রকল্প আমাদের দেশে কতটুকু প্রভাব ফেলছে সেটি গবেষণার দাবি রাখে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢালাওভাবে ট্যাক্স হলিডে দেয়া হচ্ছে। এর প্রভাবও দেখতে হবে। এটিতে পরিবর্তন আনা দরকার। একেবারে মুক্ত না করে প্রথম বছর অব্যাহতি দিয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় তা ধারাবাহিকভাবে আরোপ করা যেতে পারে। [সূত্রঃ বণিক বার্তা]

দেশের নিট রিজার্ভ ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার

দেশের নিট রিজার্ভ ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশিত তথ্যে চলতি বছরের অক্টোবর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রক্ষিত স্বর্ণ ও নিউইয়র্ক ফেডে ডলারসহ বিভিন্ন মুদ্রায় এ পরিমাণ সম্পদ সংরক্ষণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পরিসংখ্যানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। কারণ রিজার্ভের এ হিসাব করা হয়েছে দায়-দেনাসহ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং’ বিভাগের তৈরি পরিসংখ্যান বলছে, গত অক্টোবর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত (নিট) রিজার্ভ ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। দেশের রিজার্ভ সম্পর্কে একই তথ্য দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ)। সংস্থাটির উপাত্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিসংখ্যান দিয়েছে আর্থিক খাতের তথ্য সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সিইআইসি। তাতে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কখনই দেশের প্রকৃত রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরোয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস ও নিট দুই ধরনের পরিসংখ্যান তৈরি করে। সম্পদ থেকে দায় বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভ হিসাব করা হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময়ই গ্রস রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। অন্যদিকে আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো রিজার্ভের নিট হিসাবকে প্রকৃত রিজার্ভ হিসেবে গণ্য করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। এ রিজার্ভের মধ্য থেকে চলতি সপ্তাহেই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে ১ দশমিক ১১২ বিলিয়ন ডলারের (১১১ কোটি) আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা হবে। রিজার্ভের হিসাবায়নের মধ্যেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টের (এফসিএ) প্রায় ৮০ কোটি ও আইএমএফ থেকে নেয়া ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণও সম্পদ হিসেবে ধরা হয়েছে। নিট রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এসব দায় বাদ দেয়া হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা যোগ হয়ে আগামীকাল তা আমদানি ব্যয় কিংবা অন্য কোনো দায় পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। আমরা রিজার্ভের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করি, তাতে কোনো ভুল নেই। সাধারণত স্বর্ণ ও সাতটি বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভের অর্থ জমা রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে স্বর্ণ জমা রাখা আছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। মার্কিন ডলার, পাউন্ড, ইউরো, জাপানি ইয়েন, অস্ট্রেলিয়ান ডলার, কানাডিয়ান ডলার ও চাইনিজ ইউয়ান সংরক্ষণ করা হয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দেশের রিজার্ভের প্রায় ৮০ শতাংশই রাখা হয় নিউইয়র্ক ফেডে। সিংহভাগ রিজার্ভ নিউইয়র্ক ফেডে রাখা হয়েছে মূলত নিউইয়র্কের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ, আমদানি বিল পরিশোধ ও দাতা সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য। সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় এসব পেমেন্ট দেয়া হয়। নিউইয়র্ক ফেড ছাড়াও ইউরোপে রয়েছে রিজার্ভের ১৭ শতাংশ এবং কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান ডলারের প্রত্যেকটিতে ২ শতাংশের নিচে। স্বর্ণ আছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে গ্রস ও নিট দুটিই সঠিক বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, রিজার্ভের সম্পদের বিপরীতে কিছু দায়ও থাকে। দায়গুলো বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভের হিসাব করা হয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ কত আছে, এ প্রশ্নে নিট রিজার্ভের পরিসংখ্যানই প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের দায়গুলো পরিশোধ করতে হবে। গ্রস রিজার্ভের ক্ষেত্রে যে সম্পদ হাতে আছে, তার সবটুকুই আমাদের সম্পদ নয়। রিজার্ভের মধ্যে আমি কতটুকুর মালিক, এ হিসাব বের করতে হলে অবশ্যই দায়গুলো বাদ দিতে হবে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমদানি দায় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিয়ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। এখনো আমাদের হাতে পর্যাপ্ত রিজার্ভ আছে। এ মুহূর্তে খাদ্য আমদানি ব্যয় কিছুটা কমেছে। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। শুধু রিজার্ভের ওপর ভর করে বেশি দিন চলা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় হয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আমদানিতে ৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি মাসেই দেশের আমদানি ব্যয় হচ্ছে গড়ে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার। দেশের বিদ্যমান ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অনেক সময় পণ্য রফতানি হলেও সে অর্থ দেশে ফেরত আসে না। যেসব নস্ট্রো হিসাবের বিপরীতে রফতানি হয়, সেসব হিসাবের অর্থও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অংশ ধরে হিসাবায়ন করা হয়। তবে এ ধরনের অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সাধারণত সারা বছর রিজার্ভের গ্রস হিসাব করা হলেও বছর শেষে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের দিয়ে অডিট করে সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। অনেক সময় স্বর্ণের দাম বাড়া-কমা কিংবা ডলারসহ অন্য মুদ্রাগুলোর দর হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে বছর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক মুনাফা বা লোকসান করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়গুলো ধরে গ্রস রিজার্ভ হিসাবায়ন করা হয়। অনেক সময় নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের টাকা বছরের পর বছর ধরে দেশে আসে না। এসব অর্থকেও রিজার্ভের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। তবে এ ধরনের অর্থের পরিমাণ অনেক কম। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় রাষ্ট্রের অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে আমদানিতে। অনেক দিন ধরে ঘাটতি নিয়েই চলছে সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স)। চলতি হিসাবের দীর্ঘদিনের ঘাটতি নেতিবাচক ধারায় নিয়ে গিয়েছিল ব্যালান্স অব পেমেন্টকেও। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ দুই নির্দেশকের নিম্নমুখিতায় কমতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অক্টোবরে রিজার্ভ আবার ৩২ বিলিয়নে উন্নীত হলেও চলতি সপ্তাহে আকুর বিল পরিশোধ করা হলে রিজার্ভ কমে যাবে। জ্বালানি তেলসহ বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের নিম্নমুখী দর কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কমিয়ে রেখেছিল। ফলে বাড়তে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সাল শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে তা ৩২ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এর পর থেকে হ্রাস-বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওড়সহ দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় চালসহ খাদ্যশস্যের উৎপাদন। ফলে আমদানি করতে হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য। একই সঙ্গে চলছে পদ্মা সেতু, রূপপুর ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো বৃহৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি। আমদানি ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় সেভাবে বাড়েনি। এতে দুই বছর ধরেই নেতিবাচক চলতি হিসাবের ভারসাম্য। এর ধাক্কা লেগেছে ব্যালান্স অব পেমেন্টে। ফলে ক্রমবর্ধমান রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে।

বিদ্যুৎচালিত হাইব্রিড বিএমডব্লিউ এখন বাংলাদেশে

বিশ্বের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড বিএমডব্লিউর বিদ্যুতচালিত গাড়ি এখন বাংলাদেশে। প্রথমবারের মত এই ব্রান্ডের তিনটি হাইব্রিড মডেলের গাড়ি বাজারে এনেছে বাংলাদেশে ব্র্যান্ডটির একমাত্র পরিবেশক এক্সিকিউটিভ মোটরস লিমিটেড। বিএমডব্লিউর জেনারেশন সিক্সের ৫৩০ই, ৭৪০এলই এক্সড্রাইভি এবং এক্স৫ এক্সড্রাইভ ৪০ই মডেলের এই গাড়িগুলো ব্যাটারির পাশপাশি পেট্রোল ইঞ্জিনেও চলবে। শনিবার রাজধানীর তেজগাঁয়ে এক্সিকিউটিভ মোটরসের শো-রুমে গাড়িগুলোর বাজারজাত উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গাড়িগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এম বি করিম। তেলে চালিত গাড়ি সাথে বিদ্যুৎ চালিত হাইব্রিড গাড়ির পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গাড়িগুলোকে হাইব্রিড বলা হয় কারণ এগুলো ব্যাটারির পাশাপাশি তেলেও চলে। হাইব্রিড গাড়ি খুব কম কার্বন নির্গমন করে। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গাড়িগুলোতে থাকা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় নেয় তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা। একবার চার্জে ৩০ থেকে ৪১ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে। ব্যাটারির সঙ্গে ইঞ্জিন থাকায় চার্জ ফুরিয়ে গেলে সয়ংক্রিয়ভাবে ইঞ্জিন গাড়ি চালানোর ভার নেবে এবং সেই সাথে চার্জ হতে থাকবে ব্যাটারি। শুধুমাত্র ব্যাটারি অথবা ইঞ্জিন কিংবা ব্যাটারি-ইঞ্জিন একসঙ্গে তিন উপায়েই গাড়ি চালানোর সুযোগ পাবেন ব্যবহারকারীরা। প্রতিটি গাড়িতে ৫ বছর ওয়ারেন্টিসহ ক্রেতারা পার্টস, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামত সুবিধা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাবেন। বিএমডাব্লিউর ৭৪০এলই এক্সড্রাইভের দাম ২ কোটি ১৮ লাখ এবং ৫৩০ইর দাম শুরু হচ্ছে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা থেকে। আর এক্স৫ এক্সড্রাইভ ৪০ই মডেলের গাড়ির দাম এখনও ঠিক হয়নি বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। এক্সিকিউটিভ মোটরসের অপারেশনস বিভাগের ডিরেক্টর দেওয়ান মুহাম্মদ সাজিদ আফজাল এবং আফটার সেলস বিভাগের ডিরেক্টর বজলুল করিমসহ অন্য কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

৪ সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি পাচ্ছেন পোশাক মালিকরা

আরও ৪ সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি পেতে যাচ্ছেন পোশাক মালিকরা। এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরই মধ্যে এর সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। বিজিএমইএ’র আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৬ ধরনের সেবায় তৈরি পোশাক মালিকদের ভ্যাট দিতে হয় না। জানা যায়, ২০০৫ সালে পণ্য উৎপাদন, রফতানি কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট ১৬ ধরনের সেবার ওপর রফতানিকারকদের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলে ৮০ শতাংশ, ওয়াসার পানিতে ৬০ শতাংশ এবং জোগানদার, সিকিউরিটি সার্ভিস, পরিবহন ঠিকাদার ও বিদেশি সেবা গ্রহণের বিপরীতে শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া আছে। পণ্যের কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বন্দর সেবায় শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া আছে। বন্দর সেবা, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং সংস্থা, বীমা কোম্পানি ও শিপিং এজেন্ট বিলের ওপর শতভাগ অব্যাহতি সুবিধা পান রফতানিকারকরা। এর বাইরে দুটি টেলিফোন, একটি টেলেক্স ও একটি ফ্যাক্স বিলের ওপর শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া আছে ২০০৫ সাল থেকে। রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের অগ্নিবীমার প্রিমিয়ামে শতভাগ, বিদেশে নমুনা পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কুরিয়ার সার্ভিস সেবায় শতভাগ অব্যাহতি আছে। এছাড়া রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত কমিশন, ফি ও চার্জের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। তবে এসব সুবিধা স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারীরা পান না। সূত্র জানায়, বিজিএমইএ দীর্ঘদিন ধরে রফতানি-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবা থেকে ভ্যাট অব্যাহতি দাবি করে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় ১১ ধরনের সেবার মধ্য থেকে নতুন আরও ৪ সেবার ভ্যাট অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হল- তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ল্যাবরেটরি চার্জ, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিকদের বিনোদন ব্যয়। এসব সেবায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হতো। তৈরি পোশাক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব সেবার বিপরীতে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পকে শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া উচিত। বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলে ৮০ শতাংশ ও পানির বিলে ৬০ শতাংশ হারে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ অব্যাহতির সুবিধা উদ্যোক্তারা নিতে পারছে না। কারণ অব্যাহতি অর্থ পেতে সব প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদফতরের (ডেডো) যেতে হয়। সেখান থেকে অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতকে শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া দরকার। তাদের মতে, ভ্যাটের সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ইদানীং ভ্যাট গোয়েন্দারা তৈরি পোশাক শিল্পে অডিটের নামে হয়রানি করছেন। শ্রমিকদের ওভারটাইমের সময় দেয়া রুটি-কলার ব্যয়ের বিপরীতে তারা ভ্যাট দাবি করছেন। এ ধরনের খরচের হিসাব কোনো মালিকের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পকে সম্পূর্ণরূপে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছি। এজন্য ১১টি সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি দিতে এনবিআরকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভ্যাট অব্যাহতির যৌক্তিকতা প্রশ্নে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করে। কিন্তু ভ্যাটের জন্য ওই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে না ধরে পোশাক শিল্পকে ধরা হচ্ছে। তাদের হিসাব পোশাক মালিকরা রাখবে কেন? এনবিআর যদি ভ্যাট আদায় করতে চায়, তাহলে সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে আদায় করুক। এতে বিজিএমইএ’র আপত্তি নেই। রফতানিকারক সমিতির প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানির বিলে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দেয়া থাকলে মালিকরা সে সুবিধা নেন না। এ অব্যাহতির অর্থ ফেরত পেতে হয়রানি হতে হয়। ২-৩ বছরেও আবেদন নিষ্পত্তি হয় না। আবার আবেদন নিষ্পত্তিতেও খরচ লাগে। সব মিলিয়ে এ সুবিধা ব্যবসায়ীদের কাজে আসছে না। তার মতে, ৬০ শতাংশ, ৮০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিয়ে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। যদিও এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, তৈরি পোশাক খাত বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহন করে। তাই সব সেবায় তাদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া সম্ভব না। কিছু ক্ষেত্রে শতভাগ অব্যাহতি না দিয়ে স্ল্যাবভিত্তিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে রেয়াত গ্রহণের পদ্ধতি রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ৪টি সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

চালু হলো ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র

চালু হলো ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র কল সেন্টার ও ভোক্তাকণ্ঠ ডটকম

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উদ্যোগে ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য চালু হলো ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র কল সেন্টার ও ভোক্তাকণ্ঠ ডটকম। ভোক্তা কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয় করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই কল সেন্টারে ফোন করে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। ভোক্তাকে তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা দেবেন কল সেন্টারের অপারেটরগণ। একজন ভোক্তা অভিযোগ দায়ের করলে ১৫ দিনের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা করবে কল সেন্টার। এটি খোলা থাকবে শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। ০১৯৭৭০০৮০৭১ ও ০১৯৭৭০০৮০৭২ নম্বরে ফোন করে কল সেন্টারে যোগাযোগ করা যাবে। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তার সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসে চালু হলো অনলাইন পত্রিকা ‘ভোক্তাকণ্ঠ ডটকম’। ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত সংবাদ, বিশ্লেষণ, ভোক্তা অভিযোগের বৈশ্বিক চিত্র, বিশ্ব ভোক্তা আন্দোলন, বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের খবর মিলবে এই পত্রিকায়। www.voktakantho.com ওয়েব ঠিকানায় গেলে পত্রিকাটি দেখা যাবে। বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডির ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৭১ অডিটরিয়ামে এর উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর। ভোক্তাকণ্ঠ ডটকমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ, সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, প্রকাশক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও ট্রেজারার হামিদুল হক খান, প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম ও ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া।

গার্মেন্টসের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের আওতায় ৩৭ লাখ শ্রমিক

বিভিন্ন এলাকায় গার্মেন্টস কারখানায় শ্রম অসন্তোষ হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, এই তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা, শ্রম আইন বিরোধ কর্মকাণ্ড কিংবা শ্রম অসন্তোষে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে মালিকপক্ষ এর মাধ্যমে সহজে তথ্য জানতে পারবে। ফলে অন্য কারখানায় গিয়েও ওইসব শ্রমিকের কাজ পাওয়া কঠিন হবে।

গত তিন বছরে ২ হাজার গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পেরেছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তাতে দেখা গেছে, এসব কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা ৩০ লাখের কিছু বেশি। সেই হিসেবে প্রতিটি কারখানায় গড়ে দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করে। বিজিএমইএ’র সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। পোশাক শিল্প মালিকদের আরেকটি সংগঠন বিকেএমইএ সূত্র জানিয়েছে, তাদের তথ্যভাণ্ডারে এসেছে আরো সাত লাখ শ্রমিক। একই কারখানা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ— উভয় সংগঠনের সদস্য হলেও আলোচ্য সাত লাখ শ্রমিক বিজিএমইএ’র তালিকায় আসেনি। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে ৩৭ লাখ শ্রমিকের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত চলমান আরো প্রায় ৭শ’ কারখানা এখনো তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসেনি। এ কারখানাগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। অন্যদিকে বিকেএমইএ’র আরো প্রায় ১ লাখ শ্রমিক তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আসবে। সব কারখানা হিসাবভুক্ত হলে এ খাতে শ্রমিক সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি বলে মনে করেন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, সদস্যভুক্ত কারখানার মধ্যে ৮১০টি’র শ্রমিকের তথ্য নেওয়া হবে। এর মধ্যে ৭ লাখ শ্রমিক তথ্যভাণ্ডারের আওতায় এসেছে। এই সংখ্যা বিজিএমইএ’র তথ্যের বাইরে। আরো এক লাখ শ্রমিক যুক্ত হবে। অন্যদিকে এ দুটি সংগঠনের সদস্য নয়— এমন কারখানার শ্রমিক সংখ্যা যুক্ত হলে এ সংখ্যা ৪৫ লাখ পার হওয়ার কথা । এটি মূলত শ্রমিকের আঙ্গুলের ছাপসহ (বায়োমেট্রিক) তথ্যভাণ্ডার। এতে শ্রমিকের মৌলিক তথ্য, ঠিকানা, চার আঙ্গুলের বায়োমেট্রিক ছাপ, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, কোন প্রতিষ্ঠানে এবং কোন গ্রেডে চাকরি করে— এসব তথ্য পাওয়া যাবে। বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এ তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে সহযোগিতা করেছে। এ জন্য প্রতিটি কারখানাকে আকারভেদে ৬০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজা ধসের পর এ খাতের শ্রমিকদের তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজনটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে। কেননা নিখোঁজ শ্রমিক, শ্রমিকের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এ খাতের শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য সরকারকে চাপ দেয়। এরপর ২০১৪ সাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু করে বিজিএমইএ। তবে শুরুতে কারখানাগুলোর আগ্রহ না থাকায় এ কার্যক্রম গতি পায়নি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ফের উদ্যোগ নেয় বিজিএমইএ। এরপর গত তিন বছরে এ পর্যন্ত ৩ হাজার কারখানার শ্রমিককে তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, শ্রম আইনে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে কারখানা মালিকরা রপ্তানি মূল্যের উপর শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ (০.০৩%) হারে অর্থ জমা দিচ্ছেন। এসব অর্থে শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বীমাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে। এ জন্য কারখানাভিত্তিক শ্রমিকের প্রকৃত তথ্য জানা জরুরি। অবশ্য সূত্র জানিয়েছে, এই তথ্যভাণ্ডার তৈরির পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন এলাকায় গার্মেন্টস কারখানায় শ্রম অসন্তোষ হয়। এর সঙ্গে কারা জড়িত, এই তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা, শ্রম আইন বিরোধ কর্মকাণ্ড কিংবা শ্রম অসন্তোষে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে মালিকপক্ষ এর মাধ্যমে সহজে তথ্য জানতে পারবে। ফলে অন্য কারখানায় গিয়েও ওইসব শ্রমিকের কাজ পাওয়া কঠিন হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন তাদের গবেষণায়ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গার্মেন্টসে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে বলে ইঙ্গিত রয়েছে। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এই তথ্য যাতে নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন কারখানা চালু হলে সেই তথ্য যুক্ত করার পাশাপাশি বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। সেই সঙ্গে এই তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থাপনা এককভাবে কোন পক্ষের হাতে না রেখে ত্রিপক্ষীয় কমিটির মাধ্যমে করা যেতে পারে।

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.