মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান

মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান

১৪ মে ২০২০
[caption id="" align="alignnone" width="320"]ড. আনিসুজ্জামান জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।[/caption] ১৪ মে,২০২০ বৃহস্পতিবার প্রয়াত হয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। সেটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘আলাপে ঝালাতে’ বইটিতে। সেখান থেকে সাক্ষাত্কারটি পাঠকদের জন্য পরিবেশন করা হলো।
  সাজ্জাদ শরিফ: আপনার দাদা, বাবা, আপনি-বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবর্তনের ধারার একটি উদাহরণ হিসেবে সম্ভবত আপনাদের দেখা যেতে পারে। মুসলিম স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আপনার দাদা আবদুর রহিমের গর্ব ছিল। তিনি লেখালেখি করেছেন ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সমাজের গৌরবময় মুহূর্তগুলো নিয়ে। পাকিস্তান আন্দোলনে আপনার আগের প্রজন্মের উত্সাহ ও সমর্থন ছিল। পরবর্তী প্রজন্মে-আপনাদের সময়ে-আপনারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে গেলেন। এই পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যাক। আনিসুজ্জামান: আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা যদি বলি, আমার দাদা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ নিয়ে কথা বলেছেন, বঙ্গভঙ্গের পক্ষে থেকেছেন। আমার আব্বা ছিলেন অরাজনৈতিক মানুষ, তবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছেন। আমরা স্কুলে পড়ার সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে স্লোগান দিয়েছি এবং পাকিস্তান চেয়েছি। আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে-যাকে বলা হয় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। আমরা তখন কলকাতায়। আমি মানুষ খুন হতে দেখলাম। আমাদের পাড়া থেকে মানুষ চলে গেল। আমাদের বাড়িতেও অন্য পাড়া থেকে এসে আত্মীয়স্বজন আশ্রয় নিল। মানুষের সে কী দুর্দশা! একগাদা দুস্থ ছেলেমেয়ে-প্রায় সবাই বাবা-মা হারানো-তারা জায়গা নিল আশ্রয়-শিবিরে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু-এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। আমরা কলকাতা থেকে খুলনায় চলে এলাম। ১৯৪৮ সালে ভাষা নিয়ে আন্দোলন শুরু হলো। এস এম আমজাদ হোসেন, যিনি মোনায়েম খাঁর সময়ে শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন খুলনা মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা। তিনি আমাদের বোঝালেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলে পাকিস্তান শেষ হয়ে যাবে। কথাটি আমার বিশ্বাস হলো। স্কুলে ধর্মঘট হলো। ধর্মঘট পালন করলাম, কিন্তু মিছিলে গেলাম না। আমি দোলাচলে পড়ে গেলাম। একদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় চলে এলাম। ১৯৪৯ সালে ভর্তি হলাম স্কুলে। ১৯৫০ সালে আবার সীমান্তের দুপারে দাঙ্গা। তখন আমি প্রবল দাঙ্গাবিরোধী। আমাদের স্কুলে উদ্বাস্তু শিবির হলো। আমাদের এক শিক্ষক ছুরিকাঘাতে আহত হলেন। এসব আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করল। তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে। ততদিনে আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। বুঝে গেছি, বাংলা কেন রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। এভাবে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে পরিবর্তন হতে থাকে। যখন কলেজে উঠেছি, তখন আমার মনোভাব মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছি। মনে হয়েছে, এই আন্দোলনের জন্য আমি প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারি। ১৯৫২ সালের শেষদিকে আমার ধর্মবিশ্বাস চলে যায়। এর একটা কারণ ছিল। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আমি বেশ নামাজ পড়তাম। একদিন মসজিদে খুতবার সময়ে ইমাম সাহেব মুসলমানের উন্নতি আর হিন্দু ও ইহুদিদের বিনাশ চাইলেন। এই শুনে আমি মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। এই যে মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা, তা আমার মনে প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের পর আমি বামপন্থী রাজনীতির সংস্পর্শে আসি। বলা যায়, ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২-এই ছয় বছরে ধীরে ধীরে আমার মনোভাবে একটা বড়রকম পরিবর্তন আসে। সাজ্জাদ: আমরা দেখেছি, যাঁরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গে বা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন, তাঁদের মনোভাব গঠনে ধর্ম অনেক সময়ে তীব্র ভূমিকা রেখেছে। ধর্ম অনেকের ভাবনার প্রধান এক ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ আবার ধর্ম থেকে দূরে সরে গেছেন। আপনাকে আমরা এই দ্বিতীয় দলে দেখতে পাই। আপনারা এই মন গড়ে উঠল কীভাবে? আনিসুজ্জামান: এটা ব্যাখ্যা করা খুব মুশকিল। সাহিত্য পড়ে অনেকটা প্রেরণা পেয়েছি। পারিবারিকভাবে আমাকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হয়েছে। আমার আব্বার সেই উদারতাটি ছিল। আমার স্কুলজীবনের শেষে ও কলেজজীবনের শুরুতে একটা বড় প্রভাব ছিল আমার মামাতো ভাই সৈয়দ কামরুজ্জামানের। তাঁর মাধ্যমে ইংরেজি সাহিত্যের সংস্পর্শে আসি। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সাহিত্য নিয়ে তাঁর বেশ আগ্রহ ছিল। এটা একটা বড় কাজ করেছিল। তারপর কলেজে-শিক্ষক-বিশেষ করে অজিতকুমার গুহ, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আবদুল মতিন-তাঁদের প্রত্যেকের পড়ানোর মধ্যে এমন একটি রুচি ছিল, যা আমাদের উদার হতে ও অসাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিতে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে কাজ করেছিল। সাজ্জাদ: পরবর্তী সময়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট মানুষ বা ঘটনার কথা কি মনে পড়ে, যা আপনার পরিবর্তনে বড় কোনো ভূমিকা রেখেছে? আনিসুজ্জামান: ভাষা আন্দোলন একটি বড় প্রভাব ফেলে। এটি একটি আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন গুলি চলল, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি অবসন্ন হয়ে রেললাইন ধরে, তখন মনে হয়েছিল, আমরা হেরে গেছি। কিন্তু পরের দিনই মনে হলো-না, এটি তো শেষ হয়ে যায়নি, এখনো রয়ে গেছে। এটি মনের মধ্যে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এল। আমার বয়স তখন ১৫ বছর। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছি। যুবলীগ থেকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে আমি পুস্তিকা লিখেছি। এসবই একটা প্রেরণার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফল। সাজ্জাদ: হাসান হাফিজুর রহমানের ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনের সঙ্গেও আপনি যুক্ত হয়েছিলেন। তখনকার লেখক-শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপনার সখ্য গড়ে উঠল কীভাবে? আনিসুজ্জামান: পাকিস্তান সাহিত্য সংসদে যাওয়াটা আমার আকস্মিকভাবে হয়েছে। শিল্পী আমিনুল ইসলাম আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই হাসান হাফিজুর রহমান, মুর্তজা বশীর, বিজন চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর-এঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তারপর সাহিত্য সংসদ হলো, সেখানে আমি যাচ্ছি। সেখানে সাহিত্যসভা করতে করতে একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে, সেটা উপলব্ধি করছি। সাজ্জাদ: আপনার পরিবারে লেখালিখির পরিবেশ ছিল। আপনার দাদা লিখতেন, মা লিখতেন, বড় বোন লিখতেন। আপনার মা ও বড় বোনের সৃজনশীল সাহিত্যের দিকে ঝোঁক ছিল। সূচনায় আপনারও ছিল তা-ই। আপনি ছোটগল্প লিখতেন। পরে মননশীল রচনার দিকে চলে এলেন কী করে? আনিসুজ্জামান: এমএ পড়া পর্যন্ত আমি গল্প লিখেছি। সেটার ব্যাপ্তি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৭ সাল। সময়টা কম নয়। কিন্তু নিজের গল্প নিয়ে মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি থেকে গেল। ততদিনে সাহিত্য সংসদের জন্য আমি প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেছি। পরে প্রবন্ধের দিকেই ঝুঁকলাম। সাজ্জাদ: আপনি লেখালিখি শুরু করেছেন কিশোর বয়স থেকে। সেখানে কি এই পারিবারিক আবহ কোনো প্রভাব রেখেছে? আনিসুজ্জামান: কিছুটা। কলকাতায় আমরা হাতে লেখা পত্রিকা বের করব সংকল্প করেছিলাম। তার জন্য বড়দের কাছে লেখা চাইতে গেলাম। তাঁরা বললেন, তোমরা কী পত্রিকা সম্পাদনা করবে? আমরা পত্রিকা বের করি, তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকো। নতুন দিন নামে একটি পত্রিকা বের হলো। আমরা লেখা জোগাড় করলাম। আমাদের লিখতে বলা হলো। আমরাও লিখলাম। সেটাই লেখালিখির সূচনা। তারপর ১৯৪৮ সালে আমরা খুলনা চলে এলাম। সেখানে শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প অবলম্বনে একটি গল্প লিখলাম। খুলনায় হাতে লেখা কাগজে সেটা প্রকাশিত হলো। পরে ঢাকায় এসে সে গল্পটাই আবার নতুন করে লিখলাম। সেটি নওবাহার-এ ছাপা হলো ১৯৫০-এ। সেটাই আমার প্রথম মুদ্রিত রচনা। পরে ১৯৫৩-৫৪ সাল থেকে প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করলাম। এরপর ক্রমশ সেদিকেই ঝুঁকে পড়লাম। সাজ্জাদ: আপনার কিশোরবেলায় কি আপনাদের বাসায় কোনো পত্রপত্রিকা যেত? সেই বয়সে মূলত কী পড়েছেন আপনি? [caption id="" align="alignnone" width="320"]ড. আনিসুজ্জামান ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: ঘরে পত্রপত্রিকা কেনা হতো, যেমন সওগাত ও মোহাম্মদী। দৈনিক আজাদ-এর ‘মুকুলের মহফিল’ ছিল আমার প্রিয় পাতা। বাড়িতে বইপত্র কেনা হতো। আমার দাদার বই যাঁরা প্রকাশ করতেন, তাঁরা সব সময়ে টাকাপয়সা দিতে পারতেন না। তাই আব্বা তাঁদের প্রকাশনা থেকে বই নিয়ে আসতেন। আবার বড় বোন কবিতা লিখতেন বলে দুলাভাই তাঁকে নানা রকম বই কিনে দিতেন-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-নজরুল ইসলামের বই থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের লেখকদের বই পর্যন্ত। আবার জসীমউদ্দীন ছিলেন আব্বার বন্ধু। তিনি তাঁর বই উপহার দিয়ে যেতেন। বেনজীর আহমদ, আহসান হাবীবও বই উপহার দিতেন। আবার যখন ঢাকায় এলাম, তখন-পরে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ-আবদার রশীদের বাড়িতে বড় একটি লাইব্রেরি ছিল। আশেপাশে আরও অনেক বইপড়ুয়া ছিলেন, তাঁদের সাহচর্যে অনেক বই পড়া হতো। সাজ্জাদ: সৈয়দ শামসুল হক আমাকে বলেছেন, তাঁদের যখন কোনো বক্তৃতা-বিবৃতির প্রয়োজন পড়ত, তখন তা লেখার ভার দেওয়ার হতো আপনাকে। এসব লেখার ব্যাপারে নাকি আপনার অনায়াস-পটুত্ব ছিল। আপনার এই সহজ ও স্বাদু গদ্যের উত্স কোথায়? আনিসুজ্জামান: স্কুলের কথা তো মনে নেই। তবে কলেজ পড়ার সময়ে শিক্ষকেরা বলতেন, সরল করে লেখো, নিজের মতো করে লেখো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমাদের কেজো ইংরেজি পড়াতেন জে এস টার্নার, তিনি জোর দিতেন ছোট ছোট বাক্যে লিখতে। এসব মিলিয়ে একটা প্রভাব পড়ে। ততদিনে আমি প্রমথ চৌধুরী পড়ে ফেলেছি। ম্যাট্রিক পাশ করার আগে পড়েছি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ক্লাস এইটের আগে অবশ্য নাটক-উপন্যাস পড়া হয়নি। নাইন-টেন-এই দুই বছরে অনেক বই পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়েছি, শরত্চন্দ্র পড়েছি। কারও না কারও প্রভাব নিশ্চয় রয়েছে। সাজ্জাদ: সে-সময়ে বাঙালি মুসলমান যাঁরা লেখালিখি করেছেন, তাঁদের মধ্যে ঝংকারবহুল গদ্যের চল লক্ষ করা যায়। কিন্তু আপনার গদ্য প্রায় প্রথম থেকেই যেন তা সযত্নে এড়িয়ে চলেছে। আনিসুজ্জামান: আমার লেখা বিষয়ের দিক থেকে তথ্যভিত্তিক, রীতির দিক থেকে সরল। আমার গদ্য এভাবে অনেকটা আপনাআপনিই বিকশিত হয়েছে। সব সময়ই আমি বাহুল্য বর্জন করতে চেষ্টা করেছি। বাহুল্যবর্জিত লেখার কারণে একটি সুবিধা হয়েছে। আমি অল্প পরিসরে আমার কথা বলতে পেরেছি। সাজ্জাদ: আমরা ১৯৫২ নিয়ে কথা বলছিলাম। পাকিস্তান জন্ম নেওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক যাত্রাটি পাল্টে গেল। যে-বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবার এখানে দানা বাঁধতে শুরু করবে, তাঁর অন্যতম ভরকেন্দ্র হয়ে উঠবেন রবীন্দ্রনাথ। আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কোন নতুন মাত্রায় আবিষ্কার করেছি? আনিসুজ্জামান: রবীন্দ্রনাথের প্রতি কৌতূহলটা নতুন করে জেগেছে ভাষা আন্দোলনের পর। এর আগে বেতারে রবীন্দ্রনাথের গান-নাটক হচ্ছে, কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে, গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ হচ্ছে। বাধা কিন্তু ছিল না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতিসত্তার সঙ্গে সহজেই জড়িয়ে ছিলেন। বাঙালি পরিচয়ের কথা যখনই ভাবা হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ চলে এলেন। আমি যে প্রথম দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লিখেছি, সেটি অনেকটা অস্বাভাবিক। অত পেছনে কেন চলে গেলাম? আমি ভেবেছিলাম, বাংলা সাহিত্যের সবটুকু যদি আমার হয়, তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র আমার নয় কেন? বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যাপারে সমাজের বিদ্যমান যে-আপত্তি, সেটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও আমার প্রশ্ন ছিল। ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও আনন্দমঠ’ নামে ১৯৫৩ সালে আমি প্রবন্ধ লিখি। আমাদের পাঠ্যবই সাহিত্য পরিচিতিতে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অংশটি পরিবেশিত হয়েছিল কিন্তু অখণ্ডিতভাবে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার। বঙ্কিমচন্দ্র যদি সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন, তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি, কেন তিনি সাম্প্রদায়িক হলেন? আবার বঙ্কিমচন্দ্রের প্রেরণায় যে এত মানুষ উপনিবেশ-বিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলেন, সেটাও তো লিখতে হবে। এভাবে আমার মনটা অন্যরকমভাবে গড়ে উঠেছিল। বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখার পরই আমার মনে হলো, মুসলমানদের মধ্যে যারা স্বাতন্ত্র্যবাদী, তাঁদের চেতনার বিকাশের ধরন নিয়ে লিখতে হবে। সাজ্জাদ: কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে-প্রকল্প গড়ে তুলেছিলেন, তার মধ্যে কি বাঙালি মুসলমানের প্রবেশাধিকার ছিল? আনিসুজ্জামান: বঙ্কিমচন্দ্রের সময়টাতে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ হয়েছে। কাজেই তাঁদের মধ্যে যে-হিন্দু জাতীয়তাবাদ স্ফূরিত হলো, তার চেয়ে মুক্তদৃষ্টি অবলম্বন করার মতো বাস্তবতা সেখানে ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র একদিকে স্বাধীনতা চাইছেন, আবার ইংরেজ শাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। ওই কৃতজ্ঞতাবোধও হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশের আকাঙ্ক্ষা থেকে। তাঁর সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পেছনেও সেই একই কারণ। কিন্তু তাঁকে যতটা সাম্প্রদায়িক বলা হয়, ততটা তিনি নন। কেননা তাঁর লেখায় অনেক উদার মুসলমান চরিত্রও আছে। সাজ্জাদ: আমরা আবার রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আগের প্রশ্নটিতে ফিরে যাই... আনিসুজ্জামান: বাংলা সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে পেতে গেলে তো রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া হবে না। রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হবে দুভাবে। একটি নন্দনতাত্ত্বিক, অন্যটি সমাজবিষয়ক। তাঁর সমাজবিষয়ক লেখার মধ্যে ঢুকতে আমার দেরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে সেটা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পরে সেগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ যে-বিষয়টাকে এভাবে দেখেছেন, আমরা তো তা সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নতুনরূপে আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেন। পশ্চিমবঙ্গের জন্য এটি জরুরি ছিল না। সামাজিক কোনো সংকট নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কী বলছেন, সেই সমস্যার হেতু কী-এসব বিষয় থেকেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেন। সাজ্জাদ: মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য বইটির সর্বশেষ ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, এটি এখন লিখলে আপনি আরও অনেক প্রশ্ন তুলতেন। সে-সময়ে খেলাফত আন্দোলনকে আপনি ইতিবাচক বলে ভেবেছেন। এ আন্দোলনের প্রতি কংগ্রেসের সমর্থন আপনাকে বেশ উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু ধর্মকেন্দ্রিক এসব আন্দোলনের ক্ষতিকর প্রভাব তো পরবর্তী ইতিহাসে পড়েছে। উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের কারণে ওয়াহাবি বা ফারায়েজি আন্দোলনকে আমরা প্রগতিশীল বলে মহিমা দিয়েছি। সেগুলোর প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলিনি। সেসব আন্দোলনের মহিমা আমরা প্রশ্নহীনভাবে আত্মস্থ করেছি। পরবর্তীকালে আমাদের এখানে ধর্মীয় কট্টরপন্থার জমি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে কি তা কোনো ভূমিকা রেখেছে? [caption id="" align="alignnone" width="318"]ড. আনিসুজ্জামান ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: আমরা যাকে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বলি, এর ইতিবাচক দিকগুলো আমাকে বেশি আকর্ষণ করেছে। ওয়াহাবি আন্দোলনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে এর ইংরেজ-বিরোধী চেতনা। অন্যদিকে আবার এর সংকীর্ণতার দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ফারায়েজি আন্দোলনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলনে কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা। এর প্রভাবে আবার হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য খুব বেড়ে গেল। এমনকি এঁরা মুসলমান সমাজকেও বিভক্ত করে ফেললেন। এর চেয়ে বেশি কিছু আমি বলিনি। তবে বলা উচিত ছিল। সাজ্জাদ: বাঙালি মুসলমানদের বুঝতে হলে আপনার গবেষণাগ্রন্থটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কিন্তু একটি ব্যাপার আমি বুঝতে চাই, কোনো প্রসঙ্গে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বা ভাবনার জোরালো কর্তৃত্ব কি গবেষকের কল্পনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়? আপনার মনে কি সে রকম কোনো বাধা তখন অনুভব করেছেন? আনিসুজ্জামান: সমাজ থেকে সেরকম কোনো মানসিক বাধা পেয়েছি বলে আমার মনে হয় না। যা পেয়েছি, সেটা নিজের ভেতর থেকে। যেমন কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর বইয়ে ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতিবাচক দিকটিও দেখিয়েছেন। আমি সেই দিকটি অগ্রাহ্য করেছি। আমি বেশি গুরুত্ব দিয়েছি ইতিবাচক দিকটির ওপর। যেমন পিরবাদের বিরোধিতা আমাকে আকৃষ্ট করেছে, কিন্তু এঁদের গোঁড়ামি যে বিরক্তিকর, সেদিকে গুরুত্ব দিইনি। সাজ্জাদ: আপনার লেখায় পড়েছি, আপনার কোনো একজন শিক্ষক আপনাকে বলেছিলেন, গবেষণা করতে গিয়ে কাউকেই কেবল ভালো বা মন্দ হিসেবে না দেখতে। একই মানুষ নানা প্রসঙ্গে নানাভাবে সাড়া দিতে পারে। আনিসুজ্জামান: শিকাগোতে আমার প্রবন্ধের আলোচনায় অধ্যাপক লয়েড রুডল্ফ্ কথাটা বলেছিলেন। আমি মন্তব্য করেছিলাম, রাধাকান্ত দেব রক্ষণশীল। তিনি বলেছিলেন, রাধাকান্ত দেবকে তুমি রক্ষণশীল লেবেল এঁটে দিচ্ছ কেন? মেয়েদের শিক্ষার জন্য তো তিনি বহু কিছু করতেন। তাঁর দুটো দিকই কি দেখা উচিত নয়? আমি সেটা স্বীকার করে নিয়েছিলাম। আমি লক্ষ করেছিলাম, প্রগতিশীল বা রক্ষণশীল—এর কোনো ভাগেই তাঁকে ফেলা যায় না। তাঁর মধ্যে দুটো দিকই আছে। সাজ্জাদ: আপনার গবেষণায় আপনি মুসলিম বাঙালি সাহিত্যের মধ্যে সময়টা শেষ করেছেন ১৯১৮ সালে এসে। এই বিশেষ বছরটি বেছে নেওয়ার কারণ কী? প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি, নাকি বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যের দিক থেকে বিশেষ কোনো ঘটনা? আনিসুজ্জামান: এই বছরটি দিয়ে আমি প্রথম মহাযুদ্ধের অবসান এবং সাহিত্যক্ষেত্রে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব—দুটোই বুঝিয়েছি। আমার ইচ্ছা ছিল ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আসার। কিন্তু এমন একটি জায়গাও তো আমার চাই যেখানে সাহিত্য ও সমাজের ছেদ একসঙ্গে মিলবে। নজরুলের আবির্ভাব ১৯১৯ সালে। তাঁর আবির্ভাবে তো একটা বড় পরিবর্তন হয়ে গেল। সেখানে ছেদ টানাই আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হলো। সাজ্জাদ: আপনার গবেষণার ক্ষেত্র বিচিত্র। আর তা শুধু সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আপনি বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়েছিলেন কেন? আনিসুজ্জামান: অল্প বয়সে সিনেমা দেখে মনে হয়েছিল, আমি উকিল হব। পরে উকিল হওয়ার বাসনা হারিয়ে গেল। তখন থেকেই ভাবতাম, আমি সাহিত্য নিয়ে পড়ব, গবেষণা করব, সাহিত্যের শিক্ষক হব। সেভাবেই বাংলা সাহিত্য পড়া। বাংলা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, সাহিত্যকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়া যাবে না। এই পটভূমিতেই ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পরবর্তীকালে আমার সম্পাদিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের বিষয়ে অনেকে বলেন আমি নির্ধারিত ক্ষেত্রের বাইরে চলে গেছি। আমি তা মনে করি না। যে-সমাজ থেকে সাহিত্য তৈরি হচ্ছে, সেই একই সমাজে তো ধর্মান্দোলন হচ্ছে, অর্থনৈতিক জীবনও চালিত হচ্ছে। এগুলো অবিচ্ছেদ্যভাবে দেখার ঝোঁক আমার মধ্যে সবসময়ে কাজ করেছে। সাজ্জাদ: আপনি আমাদের সাহিত্যের পর্বভাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলা সাহিত্যের পর্বভাগের পেছনে একটি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচ্ছায়া টের পাওয়া যায়। ইংরেজ উপনিবেশের আগে বাংলা সাহিত্য স্থির ছিল, এমন ধারণা কি আপনার কাছে যথার্থ বলে মনে হয়? আনিসুজ্জামান: বাংলা সাহিত্যের পর্বভাগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনের উত্সটি হলো ১৯৭৩ সালে আমার প্যারিস ভ্রমণ। আমি গিয়েছিলাম কংগ্রেস অব ওরিয়েন্টালিস্টের দুশো বছর পূর্তি উপলক্ষে। যাঁরা আয়োজক ছিলেন, যে কারণেই হোক, তাঁরা আমাকে একটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব দিলেন। ওখানে গিয়ে লক্ষ করলাম, তাঁরা আধুনিকতার সূচনা ধরছেন ষোড়শ শতক থেকে, আর আমরা ধরছি ঊনবিংশ শতক থেকে। পার্থক্য হচ্ছে সময়ের, কিন্তু পর্বের নামগুলো রয়ে যাচ্ছে একই রকম। আমার তখন মনে হলো, ওরা যে-পর্বগুলো করেছে, সেটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আমাদের এখানে সাহিত্য ইতিহাসের ভাগগুলো ঘটেছে। সাজ্জাদ: আপনার পুরোনো বাংলা গদ্য বইয়ে তো আপনি বাংলা গদ্যের উদ্ভব নিয়ে একাডেমিতে প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া একটি ধারণাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন। অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলার মধ্যে এ ধরনের গবেষণা করার অভিজ্ঞতা কেমন? আনিসুজ্জামান: এ-গবেষণার চিন্তাটা আস্তে আস্তে মনের মধ্যে দানা বেঁধেছে। গবেষণার বিষয়টা যেহেতু অ্যাকাডেমিক, সে কারণে অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলার মধ্যে না করলে আমার পক্ষে এটা উপস্থাপন করা সম্ভব হতো না। সাজ্জাদ: আমরা এমন একটি ধারণা পেয়ে এসেছি যে, বাংলা গদ্যের জন্ম হয়েছে উপনিবেশের গর্ভে। আপনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, উপনিবেশের বহু আগে থেকেই বাংলা গদ্য ছিল এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সেটি ক্রমশ একটি স্পষ্ট আকার পাচ্ছিল। আপনার কি মনে হয় আমাদের গদ্য যেভাবে বিকশিত হচ্ছিল, উপনিবেশের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত? [caption id="" align="alignnone" width="319"]ড. আনিসুজ্জামান ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: দাঁড়াত, অবশ্যই দাঁড়াত। কেননা, ঝোঁকটা ওই দিকেই ছিল। নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তো বাংলা গদ্য ক্রমাগত বিকশিত হয়ে উঠছিল। নানা ক্ষেত্রে গদ্যের ব্যবহার বাড়ছিল। শুধু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নয়, ভাবের বাহন হিসেবেও। কাজেই এটি বিকাশ লাভ করতই। কিন্তু বাঙালির জীবনে পদ্যের অসাধারণ প্রভাব গদ্যকে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। গদ্যে লেখা উচিত এমন বহু জিনিসও পদ্যেই লেখা হতো। সাজ্জাদ: গ্রিসে, ইতালিতে বা ইংল্যান্ডে আমরা দেখেছি, মধ্যযুগে তাদের কবিরা যেসব ধর্মগাথা রচনা করেছেন এবং যেগুলো যুগ যুগ ধরে তাদের মনকে প্রভাবিত করেছে—যেমন হোমার, ভার্জিল বা দান্তের মহাকাব্য—তারা সেগুলোকে উচ্চ সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যেও কি এমন কিছু আছে যা তেমন মর্যাদা পেতে পারত, কিন্তু আধুনিকতার গর্বে আমরা তা দিতে পারিনি? আনিসুজ্জামান: আমার তা মনে হয় না। হয়তো বৈষ্ণব জীবনী-সাহিত্য যে-গুরুত্ব পেতে পারত, আমরা তা দিইনি। তাছাড়া অন্য বিষয়ে আমরা কার্পণ্য করিনি। ইংরেজের সংস্পর্শে আসার আগে আমাদের সাহিত্যে অনুকরণ আর পুনরাবৃত্তিই ছিল প্রধান। তার মধ্যেও যে পালাবদল হয়নি, তা নয়। তবে তা হাতে গোনা। একেক শতাব্দীতে আমরা মাত্র একজন-দুজন করে বড় কবির নাম পাচ্ছি—চণ্ডীদাস, আলাওল, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র। এই বদল অবশ্যই বাঙালি সমাজের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির পরিচয়। শক্ত একটি কাঠামো বজায় থাকছে যুগের পর যুগ। আবার সে কাঠামো ভেঙে হঠাত্ করে কেউ কেউ বেরিয়েও যাচ্ছেন। এটা অনিবার্যভাবে আমাদের সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার এসব পরিবর্তনের মধ্যে কিছু কিছু বিষয় স্থিরও থেকে গেছে। যেমন নায়িকার কিন্তু ওই একই চেহারা। সব নায়িকার একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এটা অবশ্য গ্রিক সাহিত্যেও আছে। সাজ্জাদ: ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটি নিয়ে পরবর্তীকালে বহু কথা ও রাজনীতি হয়েছে। আবার ১৯৭২-এর সংবিধানে আমরা রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হিসেবে চারটি ভাবাদর্শ পেয়েছিলাম। অনেকে বলেন, এই ভাবাদর্শগুলো আকস্মিকভাবে এসেছে। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তাঁদের মনে এগুলো প্রত্যক্ষভাবে ছিল না। আনিসুজ্জামান: আমার তো মনে হয়, আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এগুলো ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। ১৯৪৮-৪৯ থেকে একেবারে ধাপে ধাপে জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্রের দিকে আমাদের ঝোঁক বেড়েছে। ১৯৫০ সালে ঢাকায় শাসনতান্ত্রিক সম্মেলনে বলা হয়, দেশের নাম হবে ইউনাইটেড স্টেটস অব পাকিস্তান। এটা ইসলামিক নয়, সেক্যুলার রাষ্ট্র হবে। এতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন থাকবে, কেন্দ্রের হাতে থাকবে অল্প বিষয়। তাই বলা যায়, এই চার স্তম্ভের ধারণা কেবল একাত্তরে নয়, তার আগেই নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে বিকশিত হয়েছে। সাজ্জাদ: কোনো ঘটনা যখন ঘটে, তখন তার এক ধরনের তাত্পর্য থাকে। আবার পরবর্তী ইতিহাসের পরিবর্তিত পটভূমিতে সে তাত্পর্য অনেক পাল্টেও যায়। ১৯৫২ সালে বাঙালি বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করেছে। এখন সেটি হয়ে উঠেছে সব বিপন্ন ভাষাভাষীর অধিকারের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধকে এ সময়ে আপনি কোন তাত্পর্যে গ্রহণ করবেন? আনিসুজ্জামান: একাত্তর থেকে আমরা মূলনীতিগুলো তো অবশ্যই নেব। এগুলো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এর যেকোনো একটি বদলে গেলে বাংলাদেশেরও চেহারা বদলে যাবে। আমি চতুর্থ সংশোধনী মেনে নিতে পারি না, কারণ সেটি চার নীতির সঙ্গে যায় না। জিয়াউর রহমানের সংশোধন, এরশাদের সংশোধন—এগুলোর কোনোটাই মেনে নেওয়ার মতো নয়। বাংলাদেশ রাখতে হলে ওই চারটা স্তম্ভ আমাদের ধরে রাখতে হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, গত ৪০ বছরে নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে মনে হয় মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। ধর্ম নিয়ে যে-সম্প্রীতির বোধ আমাদের মধ্যে ১৯৭০-৭১ সালে ছিল, এখন সেটা অনেক ক্ষয় হয়ে গেছে। এখন আর কেউ দাঙ্গা হচ্ছে শুনে বাড়ি থেকে দৌড়ে আক্রান্তের পাশে ছুটে যায় না। অনেক আপত্তিকর ওয়াজ, নসিহত বা ফতোয়া মানুষ বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। নেতাদের অনেকে বলেন, ধর্মের কথা না বললে সমর্থন চলে যাবে। ১৯৭০ সালে এটা মনে করার কোনো কারণ ছিল না। এমনকি ১৯৫০ সালেও না। ১৯৪৮-৪৯ সালে মওলানা ভাসানী অসাম্প্রদায়িক একটি দেশের কথা বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ১৯৫৪-৫৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন। এঁরা পাকিস্তানের তুঙ্গ মুহূর্তে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজকে দেখতে পেয়েছিলেন। ধর্ম এখন একটি দেখানোরও বিষয় হয়ে উঠেছে। আমরা সবাই এখন শুধু আলহাজ হয়েই তৃপ্ত নই। আমরা নিজের নামের পাশে আলহাজ লিখতে চাই। জানাতে চাই যে, আমি হজ করে এসেছি। আমরা বিসমিল্লাহ বলে বক্তৃতা শুরু করি। আগে সেটা কখনো ছিল না। মওলানা ভাসানী কখনো বিসমিল্লাহ বলে বক্তৃতা শুরু করেননি। নামাজ পড়ার সময় হলে নামাজ পড়েছেন। নিজেদের মুসলমান প্রমাণ করার কোনো চেষ্টা তখন ছিল না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা যে-রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলো পেয়েছিলাম, সেগুলোর পক্ষে নেতারা আমাদের টেনেছিলেন, এখন কেন আমাদের নেতারা জনগণকে তৈরি করছেন না? সাজ্জাদ: একাত্তরের পর গত চার দশকে তাহলে এ দেশে এমন কী ঘটল যে, আমাদের সমাজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এভাবে ক্ষয়ে যাওয়ার তীব্র শঙ্কা দেখা দিল? আনিসুজ্জামান: যে-পরাজিত শক্তি বলেছিল, বাংলাদেশ হলে ইসলাম থাকবে না; বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তারা কিন্তু নিষ্ক্রিয় থাকেনি। তারা পাকিস্তানের আদর্শ প্রচার করে গেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছে যে, মুসলমান স্বতন্ত্র, মুসলমানের পরিচয় আলাদা। এসব প্রচার অনেক কাজে দিয়েছে। আমাদের মায়েরা তো শাড়ি পরে নামাজ পড়ে মুসলমানের জীবন পার করে দিলেন। তারা বোঝাতে পেরেছে, শাড়ি পোশাক নয়। এ জন্য গ্রামের মা-বোনেরা তাদের চিরন্তন পোশাক শাড়ি ছেড়ে সালোয়ার-কামিজ পরতে শুরু করেছে। মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামে অনেকেই মাদ্রাসায় ছেলেমেয়ে পাঠাতে আগ্রহ বোধ করে, কারণ শিক্ষার পাশাপাশি সেখানে খাদ্য সরবরাহ করা হয়। আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানকার কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম সাহেব জামায়াত করতেন। মসজিদকে কেন্দ্র করে তিনি নানা রাজনৈতিক কাজ করতেন। পরে তাঁকে সরানো হয়। আমরা হয়তো দু-চারটা ঘটনা জানতে পারি। এ রকম অসংখ্য ঘটনা আছে। সাজ্জাদ: আপনার কি মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বুদ্ধিজীবীদের গণনিধনও স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে? জাতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চার করা যদি বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম দায়িত্ব হয়, তাঁদের অনুপস্থিতির কারণে আমরা একটি শূন্যতার মধ্যে পড়েছি। আমাদের প্রত্যক্ষ অস্থির রাজনীতি তো ছিলই। বাকশাল, বঙ্গবন্ধু-হত্যা, মুহুর্মুহু অভ্যুত্থান, দীর্ঘ সামরিক শাসন। কিন্তু ওই শূন্যতা পরবর্তীকালে জাতি হিসেবে তো আমাদের কোনো সামষ্টিক মূল্যবোধ বা ইতিহাসগত জমির ওপর দাঁড়ানোরও সুযোগ দেয়নি। এ ব্যাপারে আপনার নিজের কী ধারণা? আনিসুজ্জামান: একাত্তরে আমরা যে বুদ্ধিজীবীদের হারিয়েছি, নিশ্চয় তাঁরা দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন। আমরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কাজেই বড় একটা ক্ষতি তো হয়েছেই। তবে সেটাও পূরণ হতে পারত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনলেন। এটা বড় একটা ক্ষতিকর পরিবর্তনের কারণ। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধগুলো গৌণ হয়ে গেছে। অন্যদিকে নানারকম সুবিধাবাদের বিকাশ ঘটেছে। এই প্রক্রিয়া এরশাদ আমলেও চলল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠতে পারল না। গড়ে উঠবে উঠবে করে আওয়ামী লীগ আমলেও তা গড়ে উঠল না। ফলে পুরোনো মূল্যবোধগুলো থাকল না, আবার নতুন কোনো মূল্যবোধও প্রতিষ্ঠিত হলো না। সার্বিকভাবে একধরনের সুবিধাবাদ জায়গা করে নিল। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা চিরন্তন মূল্যবোধের কথা বলেছেন, শুভ-অশুভর কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা তাকে আপেক্ষিক বলে, চরম সত্য নয় বলে সরিয়ে দিচ্ছি। আজকের যে সামাজিক অবক্ষয়, তার পেছনে এই কারণগুলো কাজ করেছে। এখনকার বুদ্ধিজীবীরা মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অনেক ক্ষতি হয়েছে। সাজ্জাদ: আপনি নিজে যে লেখালিখি করেছেন, অধ্যাপনা করেছেন, গবেষণা করেছেন। আবার একই সঙ্গে পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকেই জাতীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আপনি বিদ্যায়তনে ছিলেন। আবার আপনার জীবন সেটা ছাপিয়ে বেরিয়েও গিয়েছে। আপনার মধ্যে এ নিয়ে কোনো বিরোধ হয়নি? [caption id="" align="alignnone" width="319"]ড. আনিসুজ্জামান ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: না, বিরোধ হয়নি। কারণ, মনে হয়েছিল, নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব আমাকে পালন করতেই হবে। তবে অত্যন্ত সচেতনভাবে আমি একটার সঙ্গে আরেকটাকে জড়াইনি। শিক্ষক হিসেবে যখন আমি ক্লাসে গিয়েছি, তখন আমার কোন ছাত্রের কী রাজনৈতিক মত সেটা জানতে চাইনি, সেটা আমাকে কখনো পীড়িতও করেনি। ক্লাসে কখনো রাজনীতির কথা বলিনি। তবে ক্লাসের বাইরে নানা সভা-সমিতিতে বলেছি, এখনো বলছি। কাজেই শিক্ষক হিসেবে একটা নৈর্ব্যক্তিকতা আমার ছিল। নিশ্চয় এর একটা গুরুত্ব আছে। ছাত্ররা আমাকে ভালোবেসেছে, কিছুটা শ্রদ্ধা করেছে। কারণ তারা জেনেছে, আমার রাজনৈতিক মত থাকা সত্ত্বেও সেটাকে আমি কখনো শিক্ষকতায় প্রশ্রয় দিইনি। সাজ্জাদ: আপনার কোনো কোনো লেখা পড়লে মনে হয় আরও বহু ক্ষেত্র আপনার মনোযোগ পেলে আমাদের অ্যাকাডেমি তার সুফল পেত। আপনার কি মনে হয় না অ্যাকাডেমিকে বা লেখালিখিকে আরেকটু বেশি সময় দিলে আপনার সময় একটু বাড়তি মূল্য পেত? আনিসুজ্জামান: সেটা আমার প্রায়ই মনে হয়েছে। বন্ধুবান্ধব বা শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকে বলেছেন, তুমি এত কিছু না করে লেখাপড়ার জগতে থাকলে পারতে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, আপনি তো লেখাপড়া করলেন না। এটা আমার ঠিকই মনে হয়েছে। কিন্তু তখন আমার এও মনে হয়েছে যে, এক জীবনে আমার পক্ষে একটা জায়গায় স্থির থাকা সম্ভব ছিল না। কাজেই নিশ্চয় ক্ষতি অনেকটা হয়েছে। আমার জীবন যে তিনটা ভাগে বিভক্ত, তার সবগুলোরই কিছু পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে। তবে এটা অবশ্যই মানব, বেশি ক্ষতি হয়েছে লেখালিখির। সাজ্জাদ: কিন্তু আবার এটাও তো মনে হয় সত্য যে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে আপনি অন্য কাজের চেয়ে বেশি আনন্দ পান? আনিসুজ্জামান: আনন্দের চেয়ে বড় ব্যাপার হলো তৃপ্তি। আনন্দ তো আমি লেখালিখিতেই বেশি পাই। কিন্তু ওসব আন্দোলনে গেলে আমার মধ্যে এই তৃপ্তি কাজ করে যে, আমি আমার কর্তব্য পালন করছি। তখন আমার মনে হয়, এতে যদি আমার লেখালিখির ক্ষতিও হয়ে থাকে, তাতে দুঃখ করার কিছু নেই। সাজ্জাদ: শিক্ষকতা, লেখালিখি, আন্দোলন—এই তিনটির মধ্যে কোনটিতে তাহলে আপনি বেশি আনন্দ পেয়েছেন? আনিসুজ্জামান: আমার মনে হয়, শিক্ষকতাতেই বেশি আনন্দ পেয়েছি। আবার অন্যদিক থেকে ভাবলে সামাজিক কাজকর্মের জন্য তো মানুষের ভালোবাসাও যথেষ্ট পেয়েছি। সাজ্জাদ: যে ধরনের ঘটনায় আপনার নৈতিক সমর্থন নেই, কিন্তু আপনার চোখের সামনেই তা ঘটছে—যেমন আমার একাত্তর বইটিতে যে আপনি চট্টগ্রামে অবাঙালি-হত্যাকাণ্ডের কথা বলেছেন—এ রকম ঘটনায় আপনার কেমন নৈতিক পীড়ন হয়? পেছন দিকে ফিরে এসব ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আনিসুজ্জামান: এ ধরনের ঘটনার ওপর তো আমার বা কোনো একক ব্যক্তির কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমি তো তখন সত্যিই কিছু করতে পারতাম না। ঘটনাটি ঘটেছে আমি সেখান থেকে চলে আসার পর। কিন্তু সেখানে থাকলেই বা আমি কী করতে পেতাম? কিছুই করতে পারতাম না। ঘটনাপ্রবাহ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। সাজ্জাদ: আপনি জাহানারা ইমামের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। সে-সময়ে নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল, এটি একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী আন্দোলন। এ জন্য আপনার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল। কিন্তু এত দিন পরে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। সে-সময়ে আপনি আপনাদের সে-আন্দোলনের ভবিষ্যত্ কী হবে বলে কল্পনা করেছিলেন? আনিসুজ্জামান: আমরা তখন ভেবেছিলাম, বড় রকমের একটি আন্দোলন করা গেলে সরকারের ওপর চাপ তৈরি হবে। তাতে সরকার হয়তো কিছু করবে। গোলাম আযম তখনো বাংলাদেশি নাগরিক হননি। পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির হয়ে আছেন। এটা তো আমাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক একটি ব্যাপার। আমরা চেয়েছিলাম, এমন চাপ সৃষ্টি করা যায় কিনা, যাতে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। সরকার যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বসবে, সেটা আমরা ভাবিনি। ২৬ মার্চ সকালে যখন জানা গেল, সরকার সমাবেশের অনুমতি দেয়নি, তখনই আমরা প্রথম বুঝতে পারলাম যে, সরকার আমাদের বিরুদ্ধে। তার আগে পর্যন্ত আমাদের মনে হচ্ছিল, সরকার জনমতের প্রতি সাড়া দেবে। সরকারের আচরণের ব্যাপারটি যেমন আমরা ভাবতে পারিনি, তেমনই আমরা এটাও ভাবিনি মানুষের মধ্যে সে-আন্দোলনের এত অভাবিত সাড়া পড়বে। সাজ্জাদ: সেই আন্দোলনের এতদিন পরে এখন যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে, তখন আপনার কেমন লাগছে? আনিসুজ্জামান: এখন আমি নিজেও বিচারের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। সাক্ষ্য দিলাম একাধিক মামলায়। এখন দেখা যাক কী হয়। রায় কার্যকরের সময় হয়তো পাওয়া যাবে না, কিন্তু আমি আশা করি, অন্তত কতগুলো মামলার রায় হয়ে যাবে। রায় হলে তাকেও আমি একটি বড় ব্যাপার বলে মনে করব। যাদের বিরুদ্ধে রায় চূড়ান্ত হবে, তারা তো সে রায়ের গ্লানি কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। সারাজীবন তাদের সেটা বহন করতে হবে। বিচার যে হলো, এটা তার একটা সার্থকতা। সাজ্জাদ: আপনি দুবার আনন্দ পুরস্কার পেলেন। আনিসুজ্জামান: দুবার আরও অনেকেই পেয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে বলতে পারো দেড়বার। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার পেয়েছিলাম দুজন মিলে: আমি আর আমার ছাত্র ও সহকর্মী-এখন লোকান্তরিত নরেন বিশ্বাস। সেবার পেয়েছিলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য। আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত নির্বাচিত রচনার কিছু অডিও রেকর্ড করে বের করেছিলাম। সেটিকে তারা পুরস্কারযোগ্য বলে বিবেচনা করেছিল। এবার আমার স্মৃতিকথার সর্বশেষ খণ্ড বিপুলা পৃথিবীকে তারা সাহিত্য হিসেবে পুরস্কারযোগ্য বিবেচনা করেছে। এটিই তফাত। সাজ্জাদ: এত দিন আপনি ছিলেন এ পুরস্কারের অন্যতম বিচারক। এবার হয়ে গেলেন বিচারের পাত্র। কেমন লাগল? আনিসুজ্জামান: প্রথমবার আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার এক বছর পর থেকে একটানা কুড়ি বছর এই বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারপর ওই কাজ ছাড়ার পরপরই পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। একেবারে অপ্রত্যাশিত, তবে আনন্দদায়ক। সাজ্জাদ: পুরস্কার হিসেবে কি আনন্দের কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে? [caption id="" align="alignnone" width="320"]ড. আনিসুজ্জামান। ফাইল ছবি ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: আনন্দ পুরস্কারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বসে যিনিই বাংলা সাহিত্যের চর্চা করুন না কেন, এ পুরস্কার তাঁর জন্য উন্মুক্ত। এটা বিশেষ করে কোনো ভারতীয় বা বাঙালির জন্য নয়। এ পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এডওয়ার্ড ডিমক ও ক্লিন্টন সিলি, ব্রিটেনের উইলিয়াম রাদিচে, বাংলাদেশেরও বেশ কয়েকজন। আর কোনো পুরস্কারের এ বৈশিষ্ট্য নেই। সাজ্জাদ: লজ্জা উপন্যাসের জন্য তসলিমা নাসরিনের আগে বাংলাদেশের আর কেউ এ পুরস্কার পাননি। এমন একটা সমালোচনা আছে যে তসলিমাকে এ পুরস্কার দেওয়ার পরপর যে তীব্র বিতর্ক উঠল, সেটা থেকে বেরোনোর উপায় হিসেবে দ্রুতই তারা ভাবল যে বাংলাদেশের আর কাউকে এ পুরস্কার না দিলে নিন্দা ঘুচবে না... আনিসুজ্জামান: সম্ভবত ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমিকে এ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার যখন বাংলা একাডেমি নিতে চাইল না, তখন তারা তসলিমাকে দিল। তসলিমাই বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে প্রথম আনন্দ পুরস্কার পেয়েছে। এরপর শামসুর রাহমান, নরেন আর আমি পেলাম। তারপর তো অনেকেই পেয়েছেন-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, বিচারপতি কামালউদ্দীন হোসেন। সাজ্জাদ: যে বইটির জন্য আপনি পুরস্কার পেলেন, সেটি আপনার আত্মস্মৃতি। গত দুই দশকে বাংলাদেশে অনেকে আত্মস্মৃতি লিখেছেন। বাঙালি মুসলমান হঠাত্ এত আত্মসচেতন হয়ে উঠল কেন? ইতিহাসের একটা প্রেক্ষাপটে নিজেকে রেখে কেন আপনি এমন একটা লেখা লিখতে চেয়েছিলেন? আনিসুজ্জামান: এর একটা কারণ, আমরা যে সময়টা পার করে এসেছি, সেটা যে গুরুত্বপূর্ণ-এ উপলব্ধি আমাদের মধ্যে ঘটেছে। ফলে সেই সময়টার কথা আমরা লিখে রাখতে চাই। আবুল মনসুর আহমদ বা আবুল কালাম শামসুদ্দীন যে প্রজন্মের কথা লিখেছেন, আমরা তার পরের প্রজন্মের কথা লিখেছি। এই দুই প্রজন্মই একটা পরিবর্তনের ধারার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশের দশক, তিরিশের দশক, চল্লি¬শের দশক, পঞ্চাশের দশক এবং তারপর অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সময়ের কিছু আত্মসচেতন মানুষ হয়তো মনে করেছেন, এই পরিবতর্নগুলো লিখে রাখা উচিত। ব্যক্তি হিসেবে আমি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ নই। কিন্তু আমার কালটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে বলেই আমি লিখেছি। এই বিবেচনা থেকেই আমার আত্মকথা সবাই গ্রহণ করেছেন। সাজ্জাদ: কাল নিরবধি, আমার একাত্তর ও বিপুলা পৃথিবী-পরপর এই তিনটি আপনার ধারাবাহিক আত্মস্মৃতি। নিছক আত্মস্মৃতি নয়, অনেকের সঙ্গে জড়িয়ে চলা একটা সময়ের আখ্যান। বাঙালি জাতির হয়ে ওঠার একটা সামাজিক রেখাচিত্র বইটিতে পাওয়া যায়। কেমন দেখলেন বাঙালির এই দীর্ঘ যাত্রাপথ? আনিসুজ্জামান: উত্থান-পতন হিসেবেই দেখি। আমরা যদি ১৯৭১ সালকে একটি বিশেষ সময় বলে ধরি-যখন মুক্তিযুদ্ধ হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো-তখন আমরা যে আদর্শ নিয়ে দেশ প্রতিষ্ঠা করলাম, সেটি উত্থানেরই ব্যাপার। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর যা হলো, সেটি পতন। কেননা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে জায়গাটিতে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম, সেখানে আর পৌঁছাতে পারলাম না। আজও পারিনি। মৌলিক পরিবতর্নগুলো পঁচাত্তরের পরেই হলো-সংবিধানে হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে হলো। আজ আমরা যে সামপ্রদায়িকতা দেখছি, ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি যে এখনো রাষ্ট্রধর্ম রয়ে গেছে-এগুলো তো সেই পতনেরই চিহ্ন। একটা প্রশ্ন স্বভাবতই জাগে যে এত কিছুর পর আমরা কি সামনের দিকে এগোচ্ছি, নাকি পিছিয়ে যাচ্ছি? যেমন ধরো, মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার চেয়েছিলাম, এত দিন পর সেটি পেয়েছি। এটা একটা ইতিবাচক দিক। তেমনি আবার রাষ্ট্র যে অনেক বিষয়ে ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে বা তাদের সঙ্গে একধরনের আপস করছে-এটা একটা দুঃখজনক দিক। ধর্মের নাম করে একদিকে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতার চর্চা চলছে, অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে যে এ প্রজন্মের তরুণদের আমরা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে যেমনটা উদাসীন ভেবেছিলাম, আসলে তারা তা নয়। তাদের মধ্যে সেই মূল্যবোধ আছে। পরস্পরবিরোধী কিছু লক্ষণ আমাদের মধ্যে আছে। এই ভাঙাগড়া আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই আমরা যাচ্ছি। এসব মেনে নিয়েই আমরা কীভাবে সামনে এগোতে পারব, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে কীভাবে তুলে ধরছি, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার করেছে, তারা যেভাবে মানুষের কাছে যাচ্ছে, আমরা সেভাবে পারছি না। এই যে আহমদিয়াদের ওপর আক্রমণ হলো, বাংলাদেশে এটা হবে, তা আমরা কখনো কল্পনা করিনি। বাংলাদেশে যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান হবে, তা-ই বা কে ভেবেছিল! সহজ বুদ্ধিতে অনেকে বুঝতে পারছেন, এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। সাজ্জাদ: ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দশকের সংস্কৃতির চর্চা ও আন্দোলনের সুফল রাজনীতির মধ্যে পাওয়া গেল। একদিক থেকে দেখলে তো সাংস্কৃতিক চর্চার ধারা এখন আরও ব্যাপক হয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনীতি তাহলে পশ্চাত্মুখী হয়ে উঠল কেন? ছেদ ঘটল কোথায়, কী কারণে? আনিসুজ্জামান: পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমাদের নেতারা বললেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই। পাকিস্তানি আদর্শ তখন আরও জোরালো ছিল। কিন্তু অবাক করা বিষয়, তা থেকে মানুষ সহজে বেরিয়ে এল। আমরা বাংলাদেশের আদর্শ নিয়ে অগ্রসর হলাম। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর আমাদের রাজনৈতিক নেতারা একটা ধর্মীয় চেহারা দেখাতে তত্পর হলেন। সাংস্কৃতিক মহল থেকেও আমরা একটু পিছু হটলাম। সেই সুযোগে ধর্মকে কেন্দ্র করে আদর্শটা মহিরুহের আকার ধারণ করল। ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা আশা করেছিলাম, এমন পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা আমাদের ১৯৭২-৭৩ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা সেটা আজও পারিনি। দেখা গেছে, দেশকে যারা ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে ফেলতে চায়, তারা অনেক বেশি সক্রিয়। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কোন লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল-আমাদের নেতাদের তা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে। সাজ্জাদ: এ কথা কি বলা যায় যে আমাদের সংস্কৃতিচর্চার আনুভূমিক বিস্তার ঘটলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এর যোগসূত্র গড়ে ওঠেনি? আনিসুজ্জামান: এমন সমালোচনা করা হলে সেটা অসংগত হবে না। আমাদের যে সংস্কৃতিচর্চা, সেটা মূলত নগর ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক। বৃহত্তর সাধারণ মানুষের কাছে আমরা একে নিয়ে যেতে পারিনি। আমরা যে গান গাইছি, তার কথা বা আমরা যে নাটক করছি তার ব্যঞ্জনার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো মুশকিল। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে, তারা সেটা পেরেছে নানা রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সংস্কৃতির এই জনবিচ্ছিন্নতা কীভাবে দূর করা যাবে, সেটা বলা মুশকিল। সে অর্থে বলা যায়, লোকসংস্কৃতির সঙ্গে নগরসংস্কৃতির যে ব্যবধান, আমরা তার ফাঁদে পড়ে গেছি। সাজ্জাদ: কিন্তু শিল্প, সাহিত্য বা সংস্কৃতির কাছেই তো এই যোগ আমরা প্রত্যাশা করি। আপনার কি মনে হয়, আমাদের সাহিত্য বা সংস্কৃতির পক্ষে এখনো সেই যোগসূত্র গড়ে তোলা সম্ভব? [caption id="" align="alignnone" width="320"]ড. আনিসুজ্জামান। ফাইল ছবি ড. আনিসুজ্জামান[/caption] আনিসুজ্জামান: নিশ্চয়ই। আমার তো মনে হয়, সেটা কিছুটা হচ্ছেও। আমি আবার সেই নাগরিক মধ্যবিত্তের কথা বলি। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে তাদের কাছে যে বাণী পৌঁছাচ্ছে, সেটা মূলত প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক মূল্যবোধসম্প¬ন্ন। কিন্তু পৌঁছানোর একটা সীমা রয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে সেটা পৌঁছাতে পারছে না। এই সাহিত্যের পক্ষে সেটা কঠিন। এটা এক জটিল সমস্যা। শুধু বাংলাদেশের আদর্শের ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণভাবে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যই এটা একটা বড় সমস্যা। তবে নগরের মানুষ এখন হয়তো আগের চেয়ে বেশি লোকসংগীত শুনছে, আবার টেলিভিশনের মাধ্যমে পল্লি¬র মানুষও নাগরিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। এটা ব্যবধান মেটাতে একধরনের কাজ করছে। ইদানীং মাদ্রাসার ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ ডিগ্রি পেতে চাইছে। কারণ, তারা মনে করছে, যে ডিগ্রি তারা পাচ্ছে, সেটি দিয়ে বতর্মান দুনিয়ায় কিছু অজর্ন করা সহজ নয়। সুতরাং একটা সেতুবন্ধন তো হচ্ছে। সাজ্জাদ: বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে টানাপোড়েনের সম্প¬র্ক, সাহিত্য বা সংস্কৃতি সেখানে কী ভূমিকা রাখতে পারে? আনিসুজ্জামান: মানুষের মধ্যে যে ভয় ও সন্দেহ, তা অচেনা ও অজানাকে নিয়ে। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে আমরা যখন সেই অজানা-অচেনাকে চিনতে পারি, তখন সন্দেহ ও ভয় অনেকটাই কেটে যায়। এ জন্য আমি মনে করি, ভারতের যে অংশে বাংলাভাষী মানুষ বাস করে, সেই অংশের মানুষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের সাহিত্যই ভূমিকা রাখতে পারে। তা খানিকটা রাখছে বলেও আমি মনে করি। সাজ্জাদ: এত দিনের আদান-প্রদানে জানা-বোঝার দূরত্ব যতটা কমা দরকার ছিল, ততটা কমেছে বলে কি আপনার মনে হয়? আনিসুজ্জামান: আমার মনে হয় না, জানা-বোঝা ততটা কমছে। কিছু বদ্ধমূল সংস্কার এই জানা-বোঝার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে আছে। তবে ধীরে ধীরে এটা দূর হবে বলে মনে করি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্প¬র্ক একটা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি, যে সমস্যাগুলোর সমাধান হওয়া উচিত ছিল, সেগুলো তো ঝুলে আছেই; বরং নতুন কিছু সমস্যার উদ্ভব হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমরা যত বেশি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধগুলো মেটাতে পারব, তত ভালো। সাজ্জাদ: সাহিত্য-সংস্কৃতি যে কাজটা করে-মানে মানুষে মানুষে যোগ-সেটা কি এখানে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে? আনিসুজ্জামান: নিঃসন্দেহে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব রেখেই তো চলতে হবে। এই সদ্ভাবের জন্য দুই পক্ষকেই বলব, পরস্পরকে জানুন এবং যত দ্রুত সম্ভব সমস্যাগুলোর সমাধানে চেষ্টা করুন। সাজ্জাদ: বাঙালি এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার অন্তর্জালের কল্যাণে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই পরিস্থিতি কি বাংলা সাহিত্যে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে এল? বিশ্ববাঙালির সাহিত্যচর্চার এই নতুন পটভূমিতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন? [caption id="" align="alignnone" width="320"]জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ফাইল ছবি জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ফাইল ছবি[/caption] আনিসুজ্জামান: একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার ফলেই কিন্তু বাংলাভাষী মানুষের পক্ষে সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়েছে। আগে এটা ছিল না। এর একটা ভালো দিক আছে। অন্য দেশ সম্পর্কে আমরা জানছি। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের ফলে আমাদের প্রগতির কিছু অন্তরায়ও দেখা দিয়েছে। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বড়সংখ্যক নাগরিক চাকরিবাকরি করছে। দেশে ফেরার সময় তারা ওই দেশের সংস্কৃতিটা সঙ্গে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশে যে এখন হিজাব ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে। সৌদি আরবে বা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে তারা ওখানকার সংস্কৃতিকে ইসলামি সংস্কৃতি বলে মনে করছে। তারপর দেশে ফিরে এসে ওই সংস্কৃতির চর্চা করছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের তাঁতিরা বলেছেন, বাঙালি মেয়েরা শাড়ি কম পরছে। এটা যে ঘটছে, তার কারণ ওই যোগাযোগ। আবার দেশের মানুষ বিদেশমুখী হওয়ায় আমরা অনেক মেধা হারাচ্ছি। অনেক মেধাবী দেশের সঙ্গে সব চুকিয়ে দিয়ে বিদেশে গিয়ে বসবাস করছেন। এটা হয়তো তাঁরা বাধ্য হয়েই করছেন। আবার ওখানে যারা জন্মাচ্ছে, দেশের প্রতি তাদের পূর্বপুরুষের মতো টান না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত প্রবাসী বাঙালিরা দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা নানাভাবে তার প্রমাণ পাই। সাহিত্যের ব্যাপারে বলতে হয়, বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদেও বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে। এখন আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালির জীবনযাপন প্রণালি জানতে পারছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে যাঁরা পড়তে গিয়েছিলেন, সাহিত্যে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা লিখছেন। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বাড়ছে। এসব তো আগে ছিল না। এভাবে পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের লেনদেনের একটা প্রক্রিয়া চলছে। এটা ইতিবাচক। সাজ্জাদ: আপনি তো বাঙালির ভালো-মন্দ মেশানো রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা উত্থান-পতন দীর্ঘ সময় ধরে দেখে এলেন। বাঙালির ভবিষ্যৎ কী? আনিসুজ্জামান: আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ শতকে যেসব উন্নয়ন ঘটেছে-এই শতক তো সবেমাত্র শুরু হলো-তার ফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এটা করা খুব সহজ নয়, কিন্তু এটা আমাদের করতে হবে। পশ্চাত্পদ যেসব ভাবনাচিন্তা সমাজে আছে, তার সঙ্গে আরও কিছুদিন আমাদের যুদ্ধ করতে হবে।

সেমিস্টার ফাইনাল ছাড়াই গ্রেড পাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা

সেমিস্টার ফাইনাল ছাড়াই গ্রেড পাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা

শিহাব উদ্দিন | দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা না নিয়েই শিক্ষার্থীদের চলতি সেমিস্টারের গ্রেডিং করতে পারবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিগত সেমিস্টারের প্রাপ্ত গ্রেড পর্যালোচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক ড. মো. ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কার্যালয় স্মারকের মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক ড. মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, করোনা পরিস্থিতির এই সময় আরো দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ারও সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের যেন সময় নষ্ট না হয়— সেজন্য আমরা এমন বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করার কথা বলেছি। তবে এটি শুধুমাত্র চলতি সেমিস্টারর জন্য প্রযোজ্য হবে। বিশ্বের অনেক দেশ এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল দিয়ে থাকে। আমরা সার্বিক দিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ড. মো. ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, ফলাফল প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় করোনা পরিস্থিতির আগে ন্যূনতম ৭০ শতাংশ ক্লাস সম্পন্ন করেছে তারা এখন কোনো ক্লাস-পরীক্ষা না নিলেও চলবে। শিক্ষার্থীদের মিডটার্ম, কুইজ, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন যথাযথ মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা যাবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পূর্বের সেমিস্টারের ফলাফল পর্যালোচনা করা যাবে। এই ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে কার্যালয় স্মারকে চলমান সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিকল্প প্রস্তাবনা-২ এর দুই নাম্বারে বলা হয়েছে, চলমান সেমিস্টারে তত্ত্বীয় কোর্সের বিভিন্ন বিষয়ে রেজিস্ট্রিকৃত শিক্ষার্থীদের অনলাইনের মাধ্যমে ওই সকল বিষয়ের অসমাপ্ত পাঠ্যসূচি ( যা ৩০% মত) সন্তোষজনক ভাবে সম্পন্ন হয়ে গেলে এবং অনলাইনের কার্যক্রম শুরুর আগে চলমান সেমিস্টারের বিভিন্ন বিষয়ে ইতোপূর্বে ক্লাসে উপস্থিতি পারফরম্যান্স, ক্লাস টেস্ট, মিড টার্ম পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়েছে তার নম্বর এবং অনলাইনে অংশের উপর অ্যাসাইনমেন্ট, ভার্চুয়াল প্রেজেন্টেশন নিয়ে যথাযথ স্বচ্ছতা ও মান নিশ্চিত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ফলাফল প্রকাশ করা যাবে। মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন হলে পূর্বের সেমিস্টারের ফলাফল বিবেচনায় আনা যেতে পারে। সকল বিষয়ের ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে। জানা গেছে, করোনা মহামারীর আগে ও পরে অনলাইন ক্লাস করে ইউজিসি’র এই শর্ত অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই পূরণ করেছে। সে হিসেবে চাইলে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই চলতি সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা ছাড়া ফল প্রকাশ করতে পারবে। করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ২৩ টি নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)। নির্দেশনায় বলা হয়, আগামী জুন মাস থেকে নতুন সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আর নতুন সেমিস্টারের শিক্ষা কার্যক্রম আগামী পহেলা জুলাইয়ে শুরু করা যাবে। এছাড়া করোনা সংকটের কারণে আর্থিক সংকটে পরা শিক্ষার্থীদেব ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় রেখে টিউশন ও অন্যান্য ফি মওকুফ, হ্রাস ও ইনস্টলমেন্ট প্রদানের সুযোগ রাখার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল অনলাইনে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণে একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চলমান অচলাবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নির্দেশনা তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয় ইউজিসিকে। সে আলোকে একটি নির্দেশনা তৈরি করে আজ দুপুরে তা ই-মেইলের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ইউজিসির হিসাবে বর্তমানে দেশের ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে ৫৬টি বেসরকারি ও বাকি ৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।

টিউশন ফি ও ক্লাস-পরীক্ষার জন্য চাপ নয়: ইউজিসি

করোনা সংকটের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়ে নির্দেশনা জারি করেছে ইউজিসি। নির্দেশনায় সেশন, টিউশন ফি আদায়ে মানবিক হওয়া এবং বিনামূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করতে জোর দেয়া হয়। করোনাকালীন ক্লাসের লেকচারশিটসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে ই-মেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। আর কোন শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহনে বাধ্য করতে পারবে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চলমান করোনা সঙ্কটে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৩ নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জু্রি কমিশন (ইউজিসি)। সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সেমিস্টার সম্পন্ন করার বিকল্প দুটি প্রস্তাব, অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা চালানো, নতুন সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি এবং ১৪টি সাধারণ নির্দেশনাসহ মোট ২৩ নির্দেশনা জারি করেছে ইউজিসি। করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যে আজ বৃহস্পাতিবার দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য এই নির্দেশনা জারি করা হলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুযোগ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে নির্দেশানায় বলা হয়, ক্লাস লেকচার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট বা অনলাইন পোর্টালে নিয়মিতভাবে আপলোড করতে হবে। এছাড়া প্রয়ােজনে শিক্ষার্থীদের ই-মেইল বা সােশ্যাল মিডিয়া (হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ ইত্যাদি) মাধ্যমে ক্লাস লেকচারসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ অডিও-ভিডিও শিক্ষার্থীদের পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। শিক্ষকদেরকে নিবিড়ভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে যােগাযােগ রাখতে হবে এবং নিয়মিতভাবে কোর্স ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে আলােচনা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সেশন ও টিউশন ফি আদায়ে মানবিক হওয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। বলা হয়, করোনা সংকটের কারণে আর্থিক সংকটে পতিত শিক্ষার্থীদেব ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় রেখে সেশন, টিউশন, অন্যান্য ফি মওকুফ, হ্রাস ও ইনস্টলমেন্ট প্রদানের সুযোগ রাখতে হবে। এসময়ে ফি আদায়ে মানসিক চাপ প্রদান সমীচীন নয় উল্লেখ করে তা পরিহার করে শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে বলা হয়। এছাড়াও বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগও অবারিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া কোনো শিক্ষার্থী করোনা সংকটে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ায়, চরম আর্থিক অস্বচ্ছতা বা অন্য কোনাে যৌক্তিক কারণে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে না পারলে/সক্ষম না হলে তাকে পরবর্তীতে অসমাপ্ত কোর্স সম্পন্ন করে পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দিতে হবে। আর কোনাে শিক্ষার্থী তার গ্রেড (করোনাকালীন প্রাপ্ত) উন্নয়ন করতে চাইলে পরবর্তী সেমিস্টারে তাকে বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে সেই সুযোগ দিতে হবে। উভয় ক্ষেত্রে কোনাে প্রকার অতিরিক্ত ফি নেয়া যাবে না। তবে শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যাতে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করতে না পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আর যেকোন পরীক্ষা গ্রহণের অন্তত পাঁচ থেকে সাত দিন পূর্বে শিক্ষার্থীদের যথানিয়মে অবহিত করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইনে ক্লাস নেয়ার সক্ষমতা নেই সেসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়ােজনে ইউজিসির বিডিরেন, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এবং এটুআইয়ের সহোযোগিতায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার যথেষ্ট সক্ষমতা সৃষ্টি করবে। এছাড়া করোনা পরিস্থিতি চলাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক/কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি পূর্বের ন্যায় নিয়মিভাবে পরিশােধ করতে নির্দেশ দেয় ইউজিসি।  

স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর

স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোর

স্বপদেই থাকছেন বিদ্যানন্দ প্রতিষ্ঠাতা কিশোরতিনি কোভিড-১৯ ক্যাম্পেইন শেষ না হওয়া অবধি চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকছেন বলে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা বিভাগের সমন্বয়ক সালমান খান ইয়াসিন জানিয়েছেন।  আজ মঙ্গলবার বিকেলে তিনি বলেন, উগ্রবাদী কিছু সংগঠন আর ফেসবুক ইউজার কারও কারও নেগেটিভ কমেন্টে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন আমাদের চেয়ারম্যান। তাছাড়া কাজের এত চাপও তিনি সামলাতে পারছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থেকে কাজ করবেন। তারপর তিনি হঠাৎ চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও আমরা তার রিজাইন লেটার অ্যাকসেপ্ট করি নাই। কভিড-১৯ ক্যাম্পেইন শেষ হলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত তিনি চেয়ারম্যানের পদে বহাল থাকছেন। সালমান আরো বলেন, কিশোর কুমার দাস প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে গেলে যোগ্য কাউকে না পেলে পদটি শূন্য থাকবে। সূত্রঃ কালের কন্ঠ [caption id="attachment_23977" align="aligncenter" width="414"] বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের স্ট্যাটাস[/caption]

“আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন”

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাস প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে ছাড়লেন কেন? কিশোর কুমারের উত্তর, ‘আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কি- আমি বলবো বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। কিন্তু কখনো কখনো মানুষের স্বার্থে, ভালোবাসার স্বার্থে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। আমিও তাই চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যাচ্ছি। তবে আমি বিদ্যানন্দে আছি। থাকবো।’ গতকাল মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন কিশোর কুমার দাস। বিদ্যানন্দের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল তার সরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরেই কিশোর কুমার দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট্ট দেশ পেরুতে বাস করছেন। সেখান থেকেই মুঠোফোনে গতকাল দুপরে এই সাক্ষাতকার দেন। সেই আলাপে উঠে আসে এই সংগঠনের শুরু থেকে নানা উদ্যোগের কথা। পাশাপাশি চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার কারণও বলেন। [caption id="attachment_23984" align="alignnone" width="300"] কিশোর কুমার দাস[/caption] চট্টগ্রামের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে স্নাতক শেষ করা কিশোর বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। তিনি একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ পদে চাকুরী করতেন। যেটি থার্ড পার্টি হিসেবে গুগলের কাজ করতো। তবে ওই চাকুরী ছেড়ে বর্তমানে তিনি উদ্যোক্তা। বিদেশে থেকেই সংগঠনটির কাজে যুক্ত আছেন। কিশোরের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা সহায়তা দিতে ২০১৩ সালে গড়ে তুলেছিলেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এখন সারাদেশে বিদ্যানন্দের ১২টি শাখার মাধ্যমে প্রতিদিন দুই হাজারেরও বেশি পথশিশু মৌলিক শিক্ষা ও খাবার পায়। এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে পোশাক, শিক্ষা উপকরণ, মাসিক বৃত্তি প্রদান করে থাকে এবং সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে। বিদ্যানন্দের এক টাকায় আহার, এক টাকায় চিকিৎসা, এক টাকায় আইন সেবা কার্যক্রমগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। গরীব ও অসহায় কিন্তু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা আছে। আছে বাংলাদেশের রামু ও রাজবাড়ীতে নিজস্ব জমিতে দুইটি আলাদা এতিমখানা। বিদ্যানন্দ অনাথালয়ে এতিমদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন শাখায় বিনামূল্যে গ্রন্থাগার সুবিধা রয়েছে। এসব গ্রন্থাগারে আট হাজারের অধিক বইয়ের সংগ্রহ আছে। এই গ্রন্থাগার গুলো সকাল-সন্ধ্যা খোলা থাকে এবং যে কেউ সেখানে গিয়ে বিনামূল্যে বই পড়তে পারেন। ৭১ টাকায় নারীদের জন্য আবাসিক হোটেলও করেছে বিদ্যানন্দ। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ঢাকার অলিগলিতে ছেয়ে যাওয়া পোস্টারগুলোকে সংগ্রহ করে শিক্ষা উপাদান বানানোর অভিনব কৌশল নেয় বিদ্যানন্দ। এতো কাজ করেও হঠাৎ করে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন কেন? কিশোর কুমার বললেন, ‘আমি কখনোই সংগঠনে নিজের পদটা আঁকড়ে ধরে রাখেতে চাইনি। আমি চেয়েছি সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আসুক। আমি বলেছিলাম বয়স ৪০ হয়ে গেলে আমি আর সংগঠনের চেয়ারম্যান থাকবো না। যদিও আমার এখনো ৪০ বছর বয়স হয়নি কিন্তু তরুণ নেতৃত্ব আসুক সেটাই চাইছি। তারা নতুন মেধা দিয়ে সংগঠন এগিয়ে নিক।’ শুধুই তরুণ নেতৃত্ব নাকি আর কোনো কারণ আছে? কিশোর কুমার বললেন, ‘কোনো সিদ্ধান্ত মানুষ একটি কারণে নেয় না। অনেকগুলো কারণ থাকে। আমারও আরও বেশ কিছু কারণ আছে।’ অভিযোগ উঠেছে, কিশোর কুমারের ধর্মীয় পরিচয় তুলে প্রায়শই বিদ্যানন্দের ফেসবুক পেজে তাকে গালিগালাজ করা হতো। বিদ্যানন্দের ফেসবুক পেজের ঘোষণায় বলা হয়, প্রবাসী উদ্যোক্তা সশরীরে খুব অল্পই সময় দিতে পারেন। ৯০ ভাগ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরাই চালিয়ে যান বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবুও উদ্যোক্তার ধর্ম পরিচয়ে অনেকেই অপপ্রচার চালায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে। আমরা বিষয়টি প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম চলমান ক্যাম্পেইনের পরে। কিন্তু কিছুদিন ধরে চলা মাত্রাতিরিক্ত সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারে জল ঢালতে খবরটি আজকে শেয়ার করলাম। সে সমস্যাও আশা করি সমাধান হয়ে যাবে।’ এই বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কিশোর কুমার বলেন, ‘আমি সারাজীবন মানুষ পরিচয়ে বড় হয়ে উঠতে চেয়েছি। বিদ্যানন্দ নামটি দিয়েছেন এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট। “আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন” স্লোগানে তিনি এই নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকেই ভাবে কারো নাম থেকে বিদ্যানন্দ নামটি এসেছে। এজন্য আমরা নাম পরিবর্তন করতে চাইলেও স্বেচ্ছাসেবকরা রাজি হননি। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে নানাভাবে আমাকে হিন্দু পরিচয় দিয়ে গালিগালাজ করা হয়েছে। এর কোনো শেষ নেই। করোনা সংকট মোকাবিলায় আমরা যখন মার্চে কাজ শুরু করলাম, তখন এর মাত্রা আরও বাড়লো। কোনো কারণ ছাড়া কিছু মানুষ পেজে ধর্ম তুলে গালি দিচ্ছে, এটা আমাকে আহত করতো। এর ফলে মূল কাজটাও বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছিল। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, কিছু মানুষ দান করার সময়ও হিন্দু পরিচয়টাকে প্রতিবন্ধকতা মনে করতো। এসব দেখে মনে হলো, আচ্ছা তাহলে আমি চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে যাই। মানুষের গালিগালাজ বন্ধ হোক। সংগঠনটা এগিয়ে যাক। তবে একটা কথা বলতে চাই। সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতায় এতদূর আসা। কিছু মন্দ মানুষ অপপ্রচার করে, সেটা খুবই নগণ্য।’ বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে কিশোর বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে কিশোর তৃতীয়। নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম বলে অবহেলা, বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের সংগ্রামে নিজেদের টিকিয়ে রাখাটাই তাদের কাছে দুঃসাধ্য ছিল। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে কিশোর বলেন, ‘২০১৩ সালে ছোট পরিসরে গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। আমাদের বিদ্যানন্দের প্রথম কর্মসূচি ছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রদান করা। নারায়ণগঞ্জের এক রেলস্টেশনকে বেছে নেওয়া হয়। প্রথম দিকে বিদ্যানন্দের সব আর্থিক জোগান পেরু থেকে আমিই দিতাম। আর সব কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবকরা পরিচালনা করত। পরে সবার আর্থিক সহায়তায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কক্সবাজারসহ আরও ১২টি এলাকায় যাই।’ ২০১৬ সালে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, প্রতিবন্ধী ও ষাটোর্ধ কর্মহীন মানুষদের জন্য ‘এক টাকায় আহার’ নামে প্রকল্প চালু করে বিদ্যানন্দ। কিশোর জানালেন, এর আওতায় গত চার বছরে ৪২ লাখ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করেছেন তিনি। এক টাকায় খাবার বিক্রি করার কারণ হিসেবে বললেন, ‘যারা এই খাবার গ্রহণ করছেন তারা যেন খাবারটিকে দান ভেবে নিজেদের ছোট মনে না করেন, সেজন্যই এক টাকা।’ একই ভাবে ‘এক টাকায় চিকিৎসা’ নামে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছে এ সংগঠন। কোভিড-১৯ যখন সারাদেশে আতঙ্ক নিয়ে এলো তখন যেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে উঠে বিদ্যানন্দ। গনপ‌রিবহ‌ন জীবাণুমুক্ত করল, সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য আহার, চল‌তি প‌থে প‌থি‌কের ক্ষুধা নিবারণ, শহ‌রের রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটা‌নো কিংবা রাস্তার অসহায় প্রাণীকে খাও‌য়ানো থেকে শুরু করে নানা কাজে যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটির স্বেচ্ছাসেবকরা। করোনা সংকট মোকাবিলায় এত বিপুল কাজে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি মাথায় কীভাবে এলো? কিশোর কুমার বলেন, ‘দেশের বাইরে থাকায় করোনায় কি হতে পারে সেটা বুঝতে পারছিলাম। তাই মার্চেই প্রস্তুতি নেই। শুরুতে বিদ্যানন্দের বাসন্তী গার্মেন্টসে বানানো মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হয়। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জীবাণুনাশক ছিটানো শুরু করি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় নয় হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিচ্ছি। এটি বাংলাদেশে জীবাণুনাশক ছিটানোর সবচেয়ে বড় কার্যক্রমগুলোর একটি। এরপর দেখলাম দরিদ্র মানুষের খাবার কষ্ট। আমরা এক লাখ ৮৬ হাজার পরিবারকে এখন পর্যন্ত সাত থেকে দশ দিনের খাবার দিয়েছি। এছাড়া প্রতিদিন বিভিন্নস্থানে ২০ হাজার মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে। আরও অনেক কাজ আছে। আমরা চেষ্টা করেছি যেকোনো ভাবে মানুষের পাশে থাকতে। আমরা মনে করেছি করোনা সংকট মোকাবিলা করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিকে মিলেই কাজটি করতে হবে।’ স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীরা কি আপনার এই পদত্যাগ মেনে নেবে? কিশোর বলেন, ‘আমি জানি না স্বেচ্ছাসেবকরা কেনো আমাকে এতো ভালোবাসে। বিদ্যানন্দকে আজ এই জায়গায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব পুরোটাই তাদের। আমাদের সকল স্বেচ্ছাসেবকরাই কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত; কেউ চাকরিজীবী কিংবা কেউ শিক্ষার্থী। সকলেই নিজ নিজ জায়গা থেকে পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন। আমাদের কাজে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছে। যেটা দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ সম্মিলিতভাবে বহন করছেন। মানুষ আমাদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। আর বারবার বলতে চাই, আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরাই আমাদের শক্তি। তবে আমি কিন্তু মার্চ মাসেই তাদের বলেছি, আমি চেয়ারম্যান থাকবো না। তবে আমি তো আছি। সবার সঙ্গেই আছি।’ বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে রাখা হয় জানতে চাইলে কিশোর কুমার দাস বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের সব টাকার স্বচ্ছ হিসাব রাখা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে এমন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়েও আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হয়।’ সবাই অনুরোধ করলে চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করবেন কি না জানতে চাইলে কিশোর কুমার বলেন, ‘পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতার এই সমাজে উল্টো পথে হাঁটতে পারার জন্য গর্ব হচ্ছে। আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা পরিচয়ে কখনোই গড়ে তুলতে চাইনি। অনেকেই আমার গল্প নানাভাবে তুলে ধরে। বিষয়গুলো আমি এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি। আর পদে কি যায় আসে? আগে চেয়ারম্যান ছিলাম। এখন নিচের দিকের পদে থাকবো। সাংগঠনিক সম্পাদক। কারণ আমি আসলে গোছানোর কাজটা করতে পারি। কাজেই সবাইকে নিয়ে সেই কাজটা করবো। আর পদে কিছু যায় আসে না। চেয়ারম্যান না থাকলেও কিছু যায় আসে না। সমালোচকরা বলবে, বড় বড় কথা বলছে। কিন্তু আমি আসলেই মন থেকে বিশ্বাস করে কথাগুলো বলছি। বিদ্যানন্দ কারো একার নয়, এটা আমাদের সবার। এটা ধর্ম-বর্ণ সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের। এই সংগঠনের জন্য আমি যে কোনো ত্যাগ করতে রাজি আছি। আবারও বলছি আমি বিদ্যানন্দ ছাড়ছি না, পরিচালনা পর্ষদেই থাকছি। শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি।’ সূত্রঃ দি ডেইলি ষ্টার কিশোর কুমার দাশ চুয়েট থেকে ২০০১ ব্যাচে পাস করা কম্পিউটার প্রকৌশলী। তিনি বাংলাদেশে প্রথম গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং এর ব্যবস্থা করেন।  তিনিই প্রথম এক টাকায় আহার প্রজেক্টের মাধ্যমে পথশিশু ও বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মাঝে খাবার বিতরণের ব্যবস্থা করেন। লাখ লাখ মানুষ এই কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয়েছে। এক টাকা চিকিৎসা প্রজেক্টের আওতা এই পর্যন্ত ২৫,০০০ এর বেশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষ প্রেস্ক্রিপশনের পাশাপাশি তিন দিনের ওষুধ পেয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় শিশু এবং বৃদ্ধদের। এক গ্লাস দুধ প্রজেক্টের আওতায় বস্তির গর্ভবতী ও নবজাতকের মায়েদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনাথালয় গুলোর যাত্রা শুরু। প্রায় তিন শতাধিক এতিম এবং হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য ইতিমধ্যে চারটি অনাথালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আরো দুটো অনাথালয়ের কাজ চলছে। আনন্দের সাথে শিক্ষালাভের মন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের বর্তমানে স্কুল আছে ৬ টি। বাসন্তী নামে একটি গার্মেন্টসে তৈরি হচ্ছে শীতের পোষাক। এছাড়া এক বছরে অনাথালয়ের ছেলেমেয়েদের জন্য বিভিন্ন উৎসবে বানানো হয়েছে নতুন কাপড়। পাঁচ টাকায় স্যানিটারি প্যাড চালু করা হয়েছে বস্তির দরিদ্র এবং ছিন্নমূল শিশু কিশোরীদের জন্য। করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীর ২৬ হাজার মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পুষ্টিকর খাবার। এই খাবার স্বেচ্ছাসেবিদের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যা মানুষের কাছে পৌছে দেন। সবকিছু সম্ভব হয়েছে উদ্যোক্ত কিশোর কুমার দাসের উদ্ভাবনী চিন্তার ফলেই। সততা ও স্বচ্ছতা রেখে এ সব কাজ করার কারণেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে ‘বিদ্যানন্দ’কে। ২০১৩ সালের আগস্টে বিদ্যানন্দ নিয়ে বোন শিপ্রা দাশের সঙ্গে কথা হয়। এরপর নভেম্বর–ডিসেম্বরের দিকে বোন শিপ্রা দাশ এই ভাবনায় গতি আনেন। আর ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর বিদ্যানন্দের নারায়ণগঞ্জ শাখার যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিদ্যানন্দের চট্টগ্রাম শাখা কাজ শুরু করে ২০১৪ সালের মার্চ। সবশেষে ২০১৪ সালের জুলাইতে বিদ্যানন্দের মিরপুর শাখা খোলা হয়। বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার আর নারায়ণগঞ্জ শাখার পরিচালক শিপ্রা দুই ভাইবোন ব্যক্তিগত সঞ্চয় ঢেলে দেন এই স্কুলের জন্য। https://www.bidyanondo.org/

একনজরে বিদ্যানন্দঃ

পিছিয়ে পড়াদের আনন্দ ‘বিদ্যানন্দ’

হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’ চালিয়ে যাচ্ছে নানামুখী কর্মসূচি। বাজারভিত্তিক অর্থনীতির রূঢ় থাবায় মানবিক বন্ধন যখন শুকিয়ে যায়, এই অন্তর্গত চেতনা তখন মানুষকে ভালোবাসায় আপ্লুত করে। এরই মধ্যে এই কর্মসূচি দেশের সীমানা পেরিয়ে পেরোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই মানবপ্রেমের সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কালের কন্ঠ

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
পিছিয়ে পড়াদের আনন্দ ‘বিদ্যানন্দ’
দারিদ্র্যজয়ী কিশোর দরিদ্রদের পাশে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’-এর স্বপ্নদ্রষ্টা কিশোর কুমার দাস একটা সময় নিজেই ছিলেন মন্দিরের সামনে ক্ষুধার্তের লাইনে। চুয়েট থেকে পাস করে প্রথমে বিডিকম ও পরে এয়ারটেলে। এর পর ২০১১ সালে পেরুতে। প্রথমে ওএলও এবং পরে গুগলে। সর্বশেষ পেরুস্থ জিগজাগ হোস্টেলের উদ্যোক্তা। বেঁচে থাকার আত্মিক আনন্দের উৎস হিসেবে ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ২২ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে শুরু করেন বিদ্যানন্দ। সেখানে শিশুদের পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও জানা গেল, ক্ষুধার কারণে তারা ঠিকমতো পড়তে আসে না। ফলে ১৫ মে ২০১৬ থেকে শুরু হয় ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি। এর পর শুধু এগিয়ে যাওয়া। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, রাজবাড়ী, রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে বিদ্যানন্দের নানামুখী কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যানন্দের আদলে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতেও গড়ে তুলেছেন ‘এটুজেড’ নামের প্রতিষ্ঠান। খাবার হাতে পথশিশুদের উল্লাস এক টাকায় আহার কর্মসূচিগ্রহীতাদের ভেতর ‘ভিক্ষা’ ও বণ্টনকারীদের মধ্যে ‘দান’ শব্দটি মুছে ফেলার চিন্তা থেকেই ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় খাবার পেয়ে থাকে ১২ বছরের নিচের সুবিধাবঞ্চিত শিশু আর ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের হতদরিদ্র বৃদ্ধ। রুটিনমাফিক ঢাকাসহ আটটি জেলায় খাবার বিতরণ করা হয়। খাবারের মেন্যুতে অধিকাংশ সময় ডিম-ভাত বা সবজি-ভাত থাকলেও মাঝেমধ্যে মাংস-পোলাওয়ের মতো ভালো খাবারও জোটে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভাগ্যে। গত রমজানে এক লাখ ৩০ হাজার দুঃস্থজনের মধ্যে সাহরি ও ইফতারের আয়োজন করেছিল বিদ্যানন্দ। শুরুর পর কখনোই বন্ধ হয়নি এই কর্মসূচি। অনন্য শিক্ষা কার্যক্রম ‘পড়ব, খেলব, শিখব’ এই স্লোগানে সুবিধাবঞ্চিতদের পড়ানো হয় এখানে। শুধু সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য নয়, সর্বস্তরের পাঠকের জন্য রয়েছে পাঠাগার, যা বিনা মূল্যে ব্যবহার করা যায় সদস্য না হয়েও। বিনা মূল্যে পড়ানোর পাশাপাশি দেওয়া হয় শিক্ষা উপকরণ। মাসে একদিন বড় পর্দায় বিভিন্ন শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র দেখানো হয়। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং। এরই মধ্যে এখানকার অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। চিকিৎসা কার্যক্রম চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে বিদ্যানন্দ ‘এক টাকায় চিকিৎসা’ কার্যক্রম চালু করেছে। এর আওতায় বেদেপল্লী, হরিজনপল্লী, বিহারিপল্লীসহ বেশ কিছু সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিনা মূল্যে কিছু ওষুধও দেওয়া হয়। এতিম শিশুর রাজ্য সম্প্রীতি অনাথালয় কক্সবাজার জেলার রামুতে আদিবাসী অনাথদের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল সম্প্রীতি অনাথালয়। এক স্বেচ্ছাসেবক পরিবারের দান করা ১৫০ শতক জমির ওপর এটি গড়ে উঠেছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নয়, তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। নিজের রুটি নিজেকেই বানাতে হয়, নিজেদের সবজি চাষ করতে হয়, এমনকি চুলও কাটতে হয় একে অপরের। এভাবেই এখানকার শিশুদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অনাথালয় না বলে একে আবাসন বললেই বোধ করি অধিকতর যৌক্তিক হবে। শুকনো খাবার হাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনাথ শিশু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন আট হাজার মানুষকে শুকনো খাবার ও তিন হাজার মানুষের মধ্যে রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাঁচ শতাধিক শিশুকে দেওয়া হচ্ছে তরল দুধ এবং শতাধিক মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা। স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ এসেছেন কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে, আবার কেউ পড়াশোনার অবসরে। কেউ রাত জেগে সবজি কাটেন, কেউ রাঁধেন, আবার কেউ সহকারী। কিশোরের মুখোমুখি ‘এক টাকায় আহার’ মূলত একটি অনুপ্রেরণার নাম। অনুপ্রাণিত হয়ে কিশোর এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আবার কিশোরের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো বড় পরিসরে হয়তো শুরু করবেন অন্য কোনো মহত্প্রাণ। কিশোরের ভাষায়, ‘বিদ্যানন্দ’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি লাইফস্টাইল। সমাজের ভেতর বসবাসকারী সন্ন্যাসীদের জীবনকেই বলে ‘বিদ্যানন্দ’। একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন কিশোর। যেখানে সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্য থেকে তুলনামূলক মেধাবীদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। অনুদানের উৎস ও স্বেচ্ছাসেবকদের কথা কিশোরের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কর্মসূচিটি শুরু হলেও বর্তমানে অনুদান আসে বিদ্যানন্দের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে। কেউ নিজের জন্মদিন উদ্‌যাপন বাজেটের টাকা দেন। কেউ হয়তো ঈদ বোনাসের টাকা। কেউ টিউশনির জমানো টাকা নিয়ে অভুক্ত শিশুদের পাশে এসে দাঁড়ান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোলট্রি ফার্মের মালিক ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিদ্যানন্দের আহার কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় ডিমের সংস্থান করছেন। শুধু ব্যক্তিগত অর্থায়নেই নয়, স্বনামধন্য বহু প্রতিষ্ঠান অনুদান দিয়েছে, দিচ্ছে। পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন শিপ্রা দাস, নাফিজ চৌধুরী ও ফারুক আহমেদ। এ ছাড়া রয়েছে ৭৫ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবক। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না, বিতরণ, তদারকি সবই ধৈর্য সহকারে তাঁরা দেখভাল করেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলনীতি অনুসরণ শুধু হৃদয়াবেগ দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বিদ্যানন্দের কর্মকাণ্ডগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলনীতি অনুসরণ করতে শুরু করেছে। বহুজাতিক কম্পানিতে কর্মরত প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার পরামর্শে পরিচালিত হচ্ছে হিসাবায়নের কাজ, যা সুখ্যাত অডিট ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হচ্ছে। আইনি সহায়তায় এগিয়ে এসেছে স্বনামধন্য ল ফার্ম। স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধানে খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং তাঁদের নিজেদের খাবার উপযোগী করেই মান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। বিদ্যানন্দের কর্মকাণ্ড বিদ্যানন্দের লড়াইয়ের গল্প অফুরান। রয়েছে বৃত্তি প্রদান, কখনো বা গোবিন্দগঞ্জের অসহায় সাঁওতালদের পাশে, রাঙামাটিতে পাহাড়ধস বিপর্যয়ে, ফ্রেমে বাঁধা শৈশব কর্মসূচিতে, হাওরাঞ্চলে ঈদ উৎসব আয়োজনে, আবার কখনো বা ছিন্নমূল শিশুদের জন্মদিন পালনে। নিয়মিত ভিত্তিতে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এক টাকায় আইনি সহায়তা, এক টাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম। এ ছাড়া রয়েছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর কার্যক্রম, বিনা মূল্যে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য অভিবাসন সহায়িকা বিতরণ ও পথশিশুদের গোসল করানো। যেখানেই মনে হয় ভালোবাসা দেওয়া দরকার, সেখানেই বিদ্যানন্দের স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটে যান আহার, শিক্ষা ও আনন্দ নিয়ে। এই ভালোবাসা শতধারায় প্রবাহিত হোক সেটাই কিশোরের ইচ্ছা।

কোভিড ১৯: ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

কোভিড ১৯:  ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

[caption id="attachment_23873" align="aligncenter" width="1170"] ছবি: পিক্সাবে Courtesy:medical-concept-poster-pixabay[/caption] নতুন করোনোভাইরাস যাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেই তালিকায় ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম নিঃসন্দেহে সবার ওপরে। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের এই তালিকা দেখলে বোঝা যাবে, সবচেয়ে বিপদে থাকাদের দলে সাংবাদিকরাও আছেন। এখন খবরের খোঁজে প্রতিনিয়তই রিপোর্টাররা চষে বেড়াচ্ছেন সংক্রমণের শিকার হওয়া অঞ্চল; ঘুরছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে; কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক থেকে শুরু করে নানা ধরণের মানুষের সাথে। এতে মাঠের সেই রিপোর্টার শুধু নয় – তাদের পরিবারের সদস্য, বার্তাকক্ষে থাকা সহকর্মী এবং রিপোর্টের প্রয়োজনে যাদের কাছে যাচ্ছেন – সবাই কমবেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন পালসের সম্পাদক জেইমি কাফাশ একে তুলনা করেছেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সাথে। তিনি বলেছেন, “যুদ্ধের ময়দানে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যে ধরণের নীতিমালা মানতে হয়, এখানেও ঠিক তেমনটাই প্রযোজ্য।” গত কয়েকদিনে কোভিড-১৯ নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ করেছে জিআইজেএন: দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার টিপসঅনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য প্রশ্নচীনা সাংবাদিকদের পরামর্শ, ইত্যাদি। গোটা বিশ্বে বিভিন্ন ভাষার হাজার হাজার সাংবাদিক লেখাগুলো পড়েছেন। এই গাইডটি ঝুঁকি নিয়ে যারা মাঠে কাজ করছেন, সেই সব রিপোর্টারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তৈরি। এখানে রিপোর্টার বা ক্যামেরাপার্সনের নিজস্ব সতর্কতার বিষয় যেমন আছে, তেমনি উঠে এসেছে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম কর্তাদের দায়িত্ব।

হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে কী করবেন?      

কোভিড-১৯ কাভার করা সাংবাদিকদের জন্য একটি অ্যাডভাইজরি প্রকাশ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এটি প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে। এখানে অ্যাসইনমেন্টে যাওয়ার আগে, খবর সংগ্রহের সময় এবং ফিরে আসার পরে – কী করতে হবে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। তারা হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য যত পরামর্শ দিচ্ছে, এখানে তার-ই সারাংশ। প্রবেশের আগে: যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণ-পরিবহণ (যেমন বাস বা ট্রেন) পরিহার করুন, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে। অন্য সময়ে যদি চড়তে বাধ্য হন, তাহলে নামার পর হাত অ্যালকোহল-সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করে নিন। হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে প্রবেশের আগে জেনে নিন সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা সংক্রমণরোধী ব্যবস্থা কেমন। দুর্বল হলে প্রবেশ না করাই ভালো। [caption id="attachment_23875" align="aligncenter" width="1170"] হাসপাতালে সার্জিক্যাল মাস্কের বদলে এন৯৫ রেসপিরেটর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। ছবি: গার্ডিয়ানের ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিনশট[/caption] যখন ঘটনাস্থলে: হাসপাতালে যেন হাতে অবশ্যই গ্লাভস এবং পরনে পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট থাকে। সাথে ডিজপোজেবল জুতো অথবা পানিনিরোধী ওভারশু পরে নিন; সেখান থেকে বের হওয়ার পর ফেলে দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সংক্রমিত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের মাস্ক পরার দরকার নেই। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের তারা মাস্ক পরার নির্দেশ দিয়েছে। হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সাংবাদিকদেরও এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। এর দাম বেশি এবং এখন বেশ দুষ্প্রাপ্য। বেরুনোর পরে: সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় যাওয়ার আগে, সেখানে গিয়ে এবং ফেরার পরে যতবার সম্ভব গরম পানি ও সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। ধোয়ার আগে মুখে, নাকে বা চোখে হাত লাগাবেন না। এলাকা থেকে বেরুনোর পর আপনার প্রতিটি সরঞ্জাম (যেমন, ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন) অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ওয়াইপ দিয়ে ভালো করে মুছে নিন। অফিসে জমা দেয়ার আগে আরেকবার জীবানুমুক্ত করুন। অনেক রিপোর্টার বলেছেন, তারা সংক্রমণ আছে এমন জায়গা থেকে ফিরে নিজেদের পোশাক গরম পানিতে ধুয়ে নিয়েছেন এবং ভালোমত গোসল করেছেন। ফেরার পরে যদি সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখেন, তাহলে অফিসকে জানান এবং সঙ্গে সঙ্গে সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে চলে যান। অন্যদের প্রতি দায়িত্ব: যখন কোনো বয়স্ক ব্যক্তির সাথে কথা বলছেন, তখন বাড়তি সতর্ক হোন। তাদের কাছ থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকুন। কারণ, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে কোভিড-১৯ রোগে প্রবীণদেরই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। আপনার শরীরে, কাপড়-চোপড়ে অথবা যন্ত্রপাতিতে থাকা ভাইরাস থাকলে যেন তাদের শরীরে না ছড়াতে পারে, সেটি নিশ্চিত করুন। শুধু প্রবীন নয়, যে কারো ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসির মতে, এই রোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে দুই ধরণের মানুষ; যাদের বয়স বেশি, এবং যাদের আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যসমস্যা আছে। তাই এমন কোনো রিপোর্টারকে হাসপাতাল, কোয়ান্টিন জোন অথবা সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় পাঠাবেন না। অন্তসত্বা রিপোর্টারদেরও এমন অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন। কোনো রিপোর্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পাঠানোর আগে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। রোগের হটস্পট, অর্থ্যাৎ যেখানে বিস্তার বেশি – ঐসব জায়গায় কাউকে অ্যাসাইনমেন্ট দেবেন না। বাইরে অনেক গণমাধ্যমই এই নীতি মেনে চলছে। যদি দিতেই হয়, তাহলে দলের সদস্যদের বডিস্যুট, রেসপিরেটর এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠান। [caption id="attachment_23876" align="aligncenter" width="1050"] ছবি: আনস্প্ল্যাশ[/caption]

সাক্ষাৎকার কিভাবে নেবেন?

ভারতে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথম যে বৃদ্ধ মারা যান, তার বাড়ী কর্নাটকে। সেই বৃদ্ধের ছেলের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন চার সাংবাদিক। সেখান থেকে ফিরে, এখন চার জনই কোয়ারেন্টিনে আছেন। সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। মার্কিন বিজ্ঞান সাংবাদিক লিসা এম ক্রিগার সম্প্রতি ২০২০ ক্যালিফোর্নিয়া ফেলোশিপ-জয়ী সাংবাদিকদের পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের কাজ সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলা নয়। যা দরকার, তা যদি ফোনে পাওয়া যায়, সেভাবেই নিয়ে নিন।” পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো করোনাভাইরাসের এই সময়ে এসে বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারই নিচ্ছে ফোন, স্কাইপ বা অন্য যে কোনো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে। একই কথা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিভি সাংবাদিক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীসহ ব্রডকাস্ট জগতের ১লাখ ৬০ হাজার পেশাজীবির প্রতিনিধিত্ব করা সংগঠন স্যাগ-আফট্রা। করোনাভাইরাসের এই সময়ে সদস্যদের জন্য তারা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে:
  • রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের মতামত সংগ্রহের মত যেসব সাক্ষাৎকার, তা বাদ দিন। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাক্ষাৎকার নেয়ার ইকুইপমেন্ট থাকলে বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
  • যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত, অথবা আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের সামনাসামনি সাক্ষাৎকার নেবেন না। তাদের বক্তব্য ফোন, ভিডিও চ্যাট, ইত্যাদির মাধ্যমে নিন।
  • রোগী বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি বাদে বাকি সবার সাক্ষাৎকার নেয়ার আগেও সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) বজায় রাখুন। সিডিসির পরামর্শ মেনে, অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে বক্তব্য ধারণের চেষ্টা করুন।
  • যদি দূরত্ব বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে ফোন বা ভিডিও চ্যাটের সহায়তা নিন। কিভাবে রিমোট রেকর্ডিং করবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ পাবেন এই টিপশীটে। এটি তৈরি করেছে রেডিও ও মাল্টিমিডিয়া প্রযোজকদের সংগঠন এয়ার
  • যদি কোনো সংবাদ সম্মেলনে আপনার অ্যাসাইনমেন্ট থাকে, তাহলে সেখানে গিয়েও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার মত ব্যবস্থা আগেই করে নিন। যদি না পারেন, তাহলে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করুন। (যেমন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ)
  • সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় মাইক্রোফোনের ওপর ডিজপোজেবল কাভার লাগিয়ে নিন। ব্যবহারের পর ফেলে দিন। তারপর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন বা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। লিপ মাইক্রোফোন কারো সাথে শেয়ার করবেন না।
  • আপনার প্রতিটি ইক্যুইপমেন্ট সাক্ষাৎকার শেষে অ্যালকোহল ওয়াইপ দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। আপনার সেলফোনটিও নিয়মিত ওয়াইপ দিয়ে মুছে নিন।
মনে রাখবেন, শুধু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা নয়, আপনি যে কোন অ্যাসাইনমেন্টেই আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সব সময় ছয় ফুট দূরত্বে থাকার বিষয়টি মাথায় রাখুন।

সরঞ্জাম কি ভাইরাসমুক্ত?

মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় রুডি গোবার্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে নেহাত কৌতুক বশে সাংবাদিকদের রাখা মাইক্রোফোনে হাত দিয়েছিলেন। তারপর থেকে তিনি সংক্রমিত। এবং তার মাধ্যমে ইউটাহ জাজ দলের আরো কয়েকজন খেলোয়াড় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এভাবে সাংবাদিকরাও তাদের ইক্যুইপমেন্ট থেকে আক্রান্ত হতে পারেন যে কোনো সময়। নতুন করোনাভাইরাস প্লাস্টিক বা ধাতব যে কোনো বস্তুর ওপরে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তাই যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম পরিস্কার রাখুন। আপনার মাইক্রোফোন কিভাবে পরিস্কার করবেন, তার একটি বিস্তারিত নির্দেশনা পাবেন ট্রানসমের এই লেখা থেকে। তাদের মূল পরামর্শ: জীবানুনাশক স্প্রে না করে বরং মাইক পরিষ্কারের ফোম ব্যবহার করুন, এবং পরিস্কার কাপড় দিয়ে তা মুছে ফেলুন। আর পেটাপিক্সেলের এই লেখায় বলা হচ্ছে, আপনি কিভাবে আপনার স্মার্ট ফোন, ক্যামেরা এবং গিয়ার পরিস্কার করবেন। তারাও মূলত অ্যালকোহলভিত্তিক ওয়াইপস দিয়ে লেন্স মুছে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে। টিভি হোক, অনলাইন বা প্রিন্ট – যে কোনো মাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য এখন সংবাদ সংগ্রহের বড় উপায় হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। আপনি যেখানেই যাচ্ছেন, এটি আপনার হাতে থাকছে। তা দিয়ে আপনি কথা রেকর্ড করছেন, ভিডিও বা ছবি তুলছেন, টেবিলে বা সারফেসে রেখে কাজ সারছেন। সেটি কি জীবানুমুক্ত? করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে, আপনাকে এই দিকেও নজর দিতে হবে। এখানে বিবিসি ক্লিকের একটি ভিডিও, জেনে নিন ফোন কিভাবে নিরাপদে রাখবেন। https://youtu.be/wkmFKpAqJbM

টিভি চ্যানেলের ভেতরেও কি নিরাপদ?

টিভি চ্যানেলের ভেতরে যারা কাজ করছেন, দয়া করে নিজেদের পুরোপুরি নিরাপদ ভাববেন না। আপনার স্টুডিওতে প্রতিদিন যত অতিথি আসছেন বা যাচ্ছেন, তারা সবাই কি সংক্রমণমুক্ত? আপনি যদি নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে স্টুডিওটিকেও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করুন। একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিস্কার হবে। গেল ৯ মার্চ, অস্ট্রেলিয়ার নাইন নেটওয়ার্ক টিভির স্টুডিওতে গিয়েছিলেন অভিনেতা টম হ্যাংকসের স্ত্রী রিটা উইলসন। তখনো কারো জানা ছিল না এই দম্পতি করোনাভাইরাস আক্রান্ত। তারা কিছুদিন পরই সেই ঘোষণা দেন। রিটা উইলসনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক রিচার্ড উইলকিন্স। কয়েকদিন পর তিনি নিজেও সংক্রমিত হন। এমন পরিস্থিতি এড়াতে স্যাগ-আফট্রার পরামর্শ হলো:
  • টিভি চ্যানেলের কমন জায়গা, যেখানে সবাই আসেন বা বসেন, তা নিয়মিত জীবানুমুক্ত করা;
  • প্রতিটি শো শেষে স্টুডিও অ্যালকোহলভিত্তিক জীবানুনাশক দিয়ে মুছে ভালো মত পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে যে মাইক্রোফোনগুলো ব্যবহার হচ্ছে তা প্রত্যেক শো শেষে জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে ব্যক্তিগত মেক-আপ কিট, ব্রাশ ও ফোম নিয়ে আসা এবং শুধু সেগুলো ব্যবহার করা;
  • প্রয়োজনে ঘরকেই স্টুডিও বানিয়ে নেয়া বা ভিডিও চ্যাটে অতিথিদের সংযুক্ত করা;
  • ওয়াইপস সাথে রাখা এবং দরজার হাতল থেকে শুরু করে স্পর্শ করতে হবে এমন;জিনিস মুছে নেয়া:
  • এবং টিভি শোতেও সামাজিক দূরত্ব অর্থ্যাৎ ৬ ফুট দূরে থাকার নীতি মেনে চলা।

নিউজরুমগুলো কী করছে?

বাংলাদেশের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। গণমাধ্যম সাময়িকী মুক্তবাকের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। কেউ পুরোপুরি, কেউ আংশিকভাবে বাড়ি থেকে কাজের নীতি গ্রহণ করেছেন। অফিসে প্রবেশের আগে জ্বর মাপা, মাস্কের যোগান, জীবানুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, কর্মীদের নিজস্ব গাড়ি দিয়ে পিক এবং ড্রপের ব্যবস্থা, পালা করে কাজ করা – এমন অনেক উদ্যোগই নেয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে কাজ গণমাধ্যমের জন্য বলতে গেলে নতুন বিষয়। করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বেই বার্তাকক্ষগুলোকে এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দেশের নিউজরুমগুলো কোভিড-১৯ এর সাথে যেভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যাবে ওয়ান-ইফরা ব্লগের এই লেখা থেকে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ। স্ট্রেইটস টাইমস, সিঙ্গাপুর: তারা বার্তাকক্ষের সম্পাদকীয় বিভাগকে ২৫ জনের দুটি দলে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রতিটিতে বিভিন্ন পদ মর্যাদার কর্মী আছেন। একদল ঘরে বসে কাজ করেন, আরেকদল অফিসে। দুই সপ্তা পর, তারা স্থান বদল করেন। এর উদ্দেশ্য হলো: একটি দলের কেউ আক্রান্ত হলে, তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে, বাকিদের নিয়ে কাজ চালানো। সম্পাদকীয় এই দল ছাড়া তাদের বাকি সব কর্মী ঘর থেকেই কাজ করছেন। অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সেটি সেরে, বাড়ি থেকেই তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন গুগল হ্যাংআউটে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, হংকং: জনপ্রিয় এই পত্রিকাটি অর্ধেক কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে। যারা অফিসে কাজ করেন, তাদেরকে প্রতিটি ফ্লোরে বিভক্ত রাখা হয়েছে, যেন এক তলার কর্মী থেকে অন্য তলায় সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। তারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন গুগল হ্যাংআউটে। নিজেদের বদ্ধ সম্মেলনকক্ষে বড় মিটিং বা সভা নিষিদ্ধ করেছে এসসিএমপি। বার্তাকক্ষের কর্মীরা ছোট ছোট দলে মিটিং সেরে নেন। দ্য টাইমস, যুক্তরাজ্য: টাইমসের একজন কর্মী করোনাভাইরাসে আকান্ত হওয়ার পর থেকে লন্ডনে তাদের প্রধান কার্যালয়ের প্রতিটি লিফট, টয়লেট এবং বসার জায়গা ৩০ মিনিট পর পর জীবানুমুক্ত করা হচ্ছে। হার্স্ট, মেরিডিথ কর্প কর্পোরেশন, পেনস্ক মিডিয়া কর্পোরেশন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, বাজফিড, বিজনেস ইনসাইডার, রিফাইনারি ২৯, নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন, পলিটিকো, এক্সিয়োস, এবং ওয়ার্নার মিডিয়াসহ অনেকেই কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহি°÷ত করছে। রিপোর্টারদের যাতে বাইরে যেতে না হয়, সেজন্য কোয়ার্টজ এক্সপ্লেইনার ধাঁচের ভিডিও বানানোতে মন দিয়েছে। নাওদিস বলছে, তারা ভিডিওর জন্য প্রতিটি সাক্ষাৎকারই অনলাইনে নিচ্ছে, এবং দর্শকদেরও জানাচ্ছে, কেন এমন করতে হচ্ছে। https://youtu.be/8zKoQKeGbyY ওয়াশিংটন পোস্টের এই ভিডিও আপনাকে জানাবে বাড়ি থেকে কাজ করা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা।

বার্তাকক্ষের কর্তাদের জন্যে…

কোভিড-১৯ রোগের গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে, যার ভভিষ্যৎও অজানা। বাড়ি থেকে বা অফিসে বসে, কাজ যেখান থেকেই হোক – এই অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমকে কতদিন যেতে হবে, তা কেউ বলতে পারে না। এই সময়টা যেমন কর্মস্থলকে নিরাপদ রাখার, তেমনি নিজেদের একে অপরের দিকে খেয়াল রাখারও বটে। আর এখানে বড় দায় আছে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকদের, অর্থ্যাৎ যারা বার্তাকক্ষকে নেতৃত্ব দেন। কঠিন এই সময়ে তাদের মূল দায়িত্ব দু’টি – প্রথমত, সহকর্মীদের ঝুঁকিতে না ফেলা; এবং দ্বিতীয়ত, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। কিভাবে সেটি করবেন? নিচে কয়েকটি পরামর্শ:
  • এই সময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করুন, এবং তা কিভাবে মেনে চলতে হবে বার বার সহকর্মীদের বুঝিয়ে বলুন। বার্তাকক্ষের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে এই নীতিমালার মুখপত্র হতে হবে। বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিও করতে হবে, তাকেই।
  • রিপোর্টার অ্যাসাইনমেন্টের কাজে ভ্রমণ করবেন কি করবেন না, তিনি অফিস নাকি বাড়ি থেকে কাজ করবেন – সেই সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন। তার সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখুন, কোনো ব্যাখ্যা চাইবেন না।
  • কর্মক্ষেত্রে এমন জায়গা রাখুন যেখানে সাংবাদিকরা একে অপরের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। দলগত সভা দরকার তো বটেই, এসময় ওয়ান-টু-ওয়ান সাক্ষাতও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
  • একজন রিপোর্টার কত রিপোর্ট দেবে, তা নিয়ে আপনার প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সময়টি কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অভিজ্ঞ রিপোর্টারকেও অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার প্রভাব পড়ে তাদের উৎপাদনশীলতায়।
প্রতিটি পরামর্শ নেয়া হয়েছে “নিউজরুম গাইড টু কোভিড-১৯” নামের একটি সহায়িকা থেকে। এটি তৈরি তৈরি করেছেন ১১ জন  সাংবাদিক, তাদের মত অন্য সাংবাদিকদের জন্যে। হাতে যদি সময় থাকে পুরো গাইডটি পড়ে দেখুন
[caption id="attachment_23877" align="alignleft" width="140"] মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, জিআইজেএন-এর বাংলা সম্পাদক। এর পাশাপাশি তিনি জিআইজেএন-এর সদস্য সংগঠন, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা, এমআরডিআইয়ের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড কমিউনিকেশনস্ হিসেবে কাজ করছেন। সাংবাদিকতায় তাঁর রয়েছে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা, যার বড় অংশই টেলিভিশনে।[/caption]

নুরি বিলগ ছেইলান, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালদের একজন—

নুরি বিলগ ছেইলান, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচালদের একজন—যিনি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত একটিও খারাপ সিনেমা তৈরি করেন নি। বরং বলা যায়, তিনি সেই সব বিরলপ্রজ পরিচালকদের একজন, যারা নিজেরাই নিজের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করে এবং নিজের পূর্ববর্তী কাজগুলোকে এমনভাবে ছাপিয়ে যায় যে, আমরা ভাবতে বাধ্য হই, কেবলমাত্র উৎকৃষ্টমানের সিনেমা তৈরির জন্যই বুঝি তাদের জন্ম হয়েছে।

১৯৯৭ সালে নির্মিত তার প্রথম সিনেমা ‘দ্য টাউন’ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার সর্বশেষ সিনেমা ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’, এই দুই দশকের অধিক সময়ে আমরা তাকেও পাই সেভাবেই। পরিচালক হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এবং বলা যায়, সমসাময়িক বিশ্ব-সিনেমার পাঠ তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।

১৯৫৯ সালে তুর্কির ইস্তানবুলে জন্ম নেয়া এই পরিচালক ইতিমধ্যেই আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘দ্য টাউন’ [১৯৯৭], ‘ক্লাউডস অব মে’ [১৯৯৯], ‘ডিসট্যান্ট’ [২০০২], ‘ক্লাইমেটস’ [২০০৬], ‘থ্রি মাংকিস’ [২০০৮], ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন এনাটোলিয়া’ [২০১১], ‘উইন্টার স্লিপ’ [২০১৪], ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’ [২০১৮] ইত্যাদি অনবদ্য সব সিনেমা, আর পুরস্কার হিসেবে জিতেছেন ৮৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যার মধ্যে শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডস ও কানস ফিল্ম ফেস্টিভাল উল্লেখযোগ্য এবং ‘ডিসট্যান্ট’-এর পর থেকে তিনি প্রায় নিয়মিতভাবেই কানস-এ পুরস্কার জিতে চলেছেন।

বিএফআই সাউথ ব্যাংক [যা পূর্বে ‘ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার’ হিসেবে পরিচিত ছিল আর এটা ‘ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ দ্বারা পরিচালিত] এর এক অনুষ্ঠানে ছেইলানের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জিওফ এনড্রিও। যেখানে তিনি কিভাবে ফটোগ্রাফি থেকে ফিল্ম মেকিং এ এলেন, কেন সাম্প্রতিক সময়ে আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি থেকে সরে এসেছেন এবং কেন তিনি সে বিষয়ে আর সিনেমা তৈরি করতে চান না ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর তুলে ধরা হলো।

—অরণ্য

সা ক্ষা ৎ কা র ❑❑ জিওফ এনড্রিও আপনারা যদি সিনেমাটি না দেখে থাকেন, তবে বুঝবেন না, যে বয়স্ক লোকটিকে এখানে দেখানো হয়েছে, তিনি নুরির বাবা এবং বয়স্ক মহিলাটি তার মা। এছাড়া আরও একটি চরিত্রে রয়েছেন তার চাচাত ভাই। আর কোনো আত্মীয় কি রয়েছে এই দৃশ্যে? নুরি বিলগ ছেইলান না [শ্রোতাদের হাসি]। জিওফ এনড্রিও আমার মনে হয়, নুরির সিনেমায় কোনো ঘনিষ্ঠ বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা তার সিনেমা তৈরির এক ধরনের কৌশল। এই সিনেমাটি তুর্কির ছোট্ট একটি গ্রামে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এটা আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে কতটা সম্পৃক্ত? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত, অনেকটাই সম্পৃক্ত। কিন্তু, এই ক্লিপটি দেখা আমার জন্য চমকের মতো। আমি গত ১০ বছর হবে এটা দেখি নি। আমি কখনোই আমার সিনেমা দেখি না। সিনেমাটির এডিআর [অটোমেটেড ডায়লগ রিপ্লেসমেন্ট], ডাবিং ছিল যথেষ্ট খারাপ আর এটা তৈরির সময় আমাদের কাছে ভালো ক্যামেরা ছিল না। সিনেমাটির জন্য আমি নিজেই অর্থায়ন করি। এডিআর করার জন্য আমাদের কাছে পেশাদারি লোক ছিল, কিন্তু, তা ঠিকঠাক কাজ করে নি, বিশেষত শিশু ও মহিলাদের অংশটির ক্ষেত্রে। সুতরাং এটা ছিল আমার জন্য বাজে অভিজ্ঞতা। তারপর থেকে আমি লোকেশনের শব্দসহই শুট করার সিদ্ধান্ত নিই। হ্যাঁ, এটা খুবই আত্মজীবনীমূলক সিনেমা। আমি অনেক কিছুই মনে রেখেছিলাম যেগুলো একসাথে এই সিনেমায় এসেছিল, কিন্তু, আমি ভুলে গিয়েছিলাম কোন অংশটি বাস্তব আর কোনটি কল্পনা। আমি মনে করি, চিত্রনাট্য লেখা ও সিনেমা তৈরি এক ধরনের কোলাজ এবং খুবই গোলমেলে ব্যাপার—এটা সংগীত লেখার মতো বিষয়, যেখানে আপনি সব কিছুই ছন্দের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছেন, আর সেই ছন্দ আনার জন্য আপনি কখনও কিছু চিনি, কিছু লবণ এখানে সেখানে যোগ করছেন। বিভিন্ন রকমের বিষয় এখানে একসাথে ওঠে আসে। সিনেমাটির অধিকংশ বিষয়ই ছিল আমার বোনোর স্মৃতি থেকে নেওয়া, বিশেষত সংলাপগুলো। কিন্তু প্রথম অংশটি একটি ক্লাসরুমে করা হয়েছিল আর সেটি আমি লিখেছিলাম। জিওফ এনড্রিও এবং যথারীতি সেখানেও চেখভের উপাদান ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ ছিল। প্রকৃতপক্ষে আমি বিশ্বাস করি যে, আমার সব সিনেমাতেই কিছু না কিছু চেখভের উপাদান রয়েছে, কারণ চেখভ অসংখ্য গল্প লিখেছেন। তিনি প্রায় সকল বিষয়ের উপরেই গল্প লিখেছেন আর আমি সেগুলো ভীষণ ভালোবাসি। সম্ভবত, জীবনকে আমি যেভাবে দেখি, সে বিষয়ে তিনিই আমাকে প্রভাবিত করেছেন। এক অর্থে আমার জন্য জীবন চেখভকে অনুসরণ করে। চেখভ পড়ার পর আপনি একই ধরনের ঘটনা নিজের জীবনেও দেখতে পাবেন। চিত্রনাট্য লেখার সময়, আমি চেখভের গল্পগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করি। সুতরাং বলা যায়, হ্যাঁ, চেখভ এখানে আছে। জিওফ এনড্রিও আপনি উল্লেখ করেছেন যে, এগুলোর কিছু আপনি নিজে লিখেছেন এবং কিছু আপনার বোনের সাথে মিলে। আপনি ছবি তোলেন এবং সিনেমা তৈরি করেন, আর আপনার বোন [এমিন ছেইলান] নিজেও একজন দক্ষ ও যথেষ্ট পারঙ্গম চিত্রগ্রাহক। আপনি কি শিল্পবোধ সম্পন্ন পরিবার থেকে এসেছেন? এবং আপনি কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত, যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার চারপাশে কোনো শিল্প ছিল না। আমি একটি ছোট্ট শহরে বাস করতাম এবং আমার চারপাশে শিল্প বলতে যা পেয়েছি, তা লোকগীতি এবং সম্ভবত সিনেমা। কিন্তু, সেখানে কোনো প্রদর্শনী বা তেমন কিছু ছিল না। আমি নিজেই বিস্মিত হই কিভাবে আমি শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হলাম। আমার মনে হয়, এটা শুরু হয়েছিল যখন আমি হাই স্কুলে ছিলাম এবং ইস্তানবুলে বাস করতাম। আমি সত্যিই জানতাম না কিভাবে, কিন্তু আমি, আমার বোন ও চাচাত ভাই সবাই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমার মনে আছে, কেউ আমাকে ফটোগ্রাফির উপর লেখা একটি বই উপহার দিয়েছিল। সম্ভবত, তখন থেকেই শুরু। অতএব, আপনি অবশ্যই সাবধান থাকবেন যখন ছোটদের জন্য উপহার সামগ্রী কিনবেন [শ্রোতাদের হাসি]। আমার মনে হয়, সেই বইটিই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল—যা চিত্রগ্রহণকে আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য একটি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিল। আমি একটি ডার্করুম তৈরি করেছিলাম এবং সেখানে ছবিগুলোর প্রিন্ট নিতাম। ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করলাম, এটা একটা শিল্প এবং আমার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েই চলল। আমার বোন আমার পরে চিত্রগ্রহণ শুরু করেছিল। আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না। জিওফ এনড্রিও আপনি ফটোগ্রাফি থেকে কিভাবে সিনেমা তৈরিতে এলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমার ভালোভাবে মনে নেই, কিন্তু, সে সময় কোনো ভিডিও ক্যামেরা ছিল না, সুতরাং, সিনেমা তৈরির কথা চিন্তা করাও ছিল কঠিন। সে সময়ে এটা হাতে গোনা কিছু মানুষের কাছে ছিল। এমনকি ইউনিভার্সিটি পাস করার অনেক পর, মিলিটারি সার্ভিস করার সময়ও আমি সিনেমা তৈরির কথা ভাবি নি। অন্যান্যদের মতো আমিও সিনেমা দেখতে পছন্দ করতাম, কিন্তু, আমার মনে হয় সিনেমা তৈরি সম্পর্কিত একটি বই আমার জীবন বদলে দেয়। সেটা ছিল রোমান পোলানস্কির জীবনী, যা মিলিটারি সার্ভিসে থাকাকালীন পড়ার সময় আমাকে দারুণ উদ্বুদ্ধ করে। বইটিতে নাজি ক্যাম্পে একদম শূন্য থেকে শুরু করে হলিডউ পর্যন্ত তার জীবনী ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর এবং সে বইটিতে সিনেমা তৈরি আমার কাছে খুব সহজ মনে হয়ছিল। সুতরাং, আমি সিনেমা নিয়ে অনেক বই পড়া শুরু করলাম, যার মধ্যে টেকনিক্যাল বইও ছিল। একদিন আমি একটি শর্ট ফিল্মে অভিনয় করলাম, যেটা ৩৫ মি.মি. এ শুট করা হয়েছিল এবং আমি সিনেমা তৈরির সকল ধাপ পর্যবেক্ষণ করলাম, আর সেটির কাজ শেষ হবার পর ক্যামেরাটি কিনে আনলাম। সেটা ছিল এরিফ্লেক্স ২সি আর সেটি কাজ করার সময় মেশিনগান এর মতো শব্দ তৈরি করত। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শুরু করা, এমনকি ক্যামেরা কিনে আনার ১০ বছর পরও আমি কোনো সিনেমা তৈরি করতে পারি নি। তারপর সেই ক্যামেরাটি দিয়ে আমি একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করলাম। প্রথমে নিজেই শুরু করেছিলাম, যেন-বা ছবি তুলছি এমন মনে করে। কিন্তু, পরে আর মনঃসংযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে সিনেমার মাঝামাঝি একজন সহকারীকে যুক্ত করি এবং দু জন মিলে শর্ট ফিল্মটি তৈরি করি। আমার পরিবারের সদস্যরা তাতে অভিনয় করেছিল এবং আমার মনে হয় সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ। তারপর আবারও মাত্র দু জন নিয়েই আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করলাম। তবে বলতেই হয় যে, সিনেমার কলা-কুশলীরা সবকিছু বহনে আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিল এবং তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি যে, সিনেমা তৈরি করা সম্ভব। তারপর থেকে আমার কাছে বিষয়টি হয়ে উঠেছিল সহজতর। জিওফ এনড্রিও এটা আমাদেরকে খুব ভালোভাবেই পরবর্তী ক্লিপে নিয়ে যায়, যেটা ক্লাউডস অব মে-এর। স্পষ্টতই, ক্লাউডস অব মে আংশিকভাবে তার পূর্বসূরি থেকে সরে এসেছে এবং এই ক্লিপে আমরা প্রায় আগের দৃশ্যটিরই শুটিং দেখলাম। আপনি কি মনে করেন যে, আপনার কাজগুলো একে অপরকে ছাপিয়ে যায়? যদিও আপনি কোনো সিক্যুয়াল তৈরি করেন না, তারপরও আপনার একটি কাজের সাথে অপর একটি কাজের সূত্র রয়েই যায়। নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, আমি নিজেও তাই মনে করি। যখন আমি এই সিনেমাগুলো মধ্যে একটির কাজ শেষ করি, তখন কোনোভাবে অনুভব করলাম যে, এই বিষয়গুলি সম্পর্কে আরও কিছু বলার আছে, যা উজাক [ডিসট্যান্ট] শেষ হবার আগ পর্যন্ত চালু ছিল। সম্ভবত এ জন্য যে, আমি জানতাম তারপর কী ঘটবে, কারণ সেগুলো ছিল আমার জীবনের বেশ ঘনিষ্ঠ। কিন্তু, এই সিদ্ধান্তগুলি ছিল বেশ সহজাত এবং কখনোই তা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। তাছাড়া সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী সিনেমার কাজ শেষ হবার অনেক পরে। জিওফ এনড্রিও উল্লেখিত ক্লিপে পরিচালক স্পষ্টতই তার পিতা-মাতাকে ব্যবহার করছেন সিনেমা তৈরির জন্য। সে শহর থেকে মফস্বলে ফিরে আসে এবং মানুষজনের অলক্ষে তার ক্যামেরাটি চালু করে। এক অর্থে বলা যায় যে, সে তার পরিবারকেই সবসময় ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এই সিনেমায় আত্ম-সমালোচনার কোনো উপাদান ছিল কি? নুরি বিলগ ছেইলান আমিও তাই মনে করি। এই সিনেমাটি তৈরির আগেই ভিডিও ক্যামেরার জন্ম হয়েছিল, সুতরাং, আমি পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের জন্য ক্যামেরাটি কিনেছিলাম। আমি এই অঞ্চলেরই একজন এবং অনেক কিছুই শুট করছিলাম, যেখানে মা-বাবার সাক্ষাৎকার, দাদিকে করা নানাবিধ প্রশ্ন ছিল। এমনকি আমি একটি স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টাও করেছিলাম। পরে ইস্তানবুলে ফিরে এসে যখন আমি আমার ক্যামেরায় যা শুট করেছিলাম তা দেখলাম, লক্ষ করলাম যে, আমি খুব স্বার্থপর ছিলাম। আমার দাদি হয়তো আমাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু আমি তা শুনছি না। সম্ভবত এমন হতে পারে যে, আমি সিনেমাটি নিয়ে কী করব তা ভাবছিলাম। এই বিষয়গুলো আমার মধ্যে অপরাধ বোধের জন্ম দিয়েছিল, ফলে আমি নিজেকে পছন্দ করি নি এবং আমার মনে হয়েছিল, অধিকাংশ পরিচালক কিংবা শিল্পীরা, বিশেষত যারা শহরের, তাদের মধ্যে এই ধরনের আত্মপ্রিয়তা বর্তমান। কিন্তু, গ্রামের মানুষগুলো নিজেদের যা আছে সব উজাড় করে দেয় আর আমরা তা অকাতর গ্রহণ করি। কিন্তু যখন তারা শহরে আসে, তখন তাদের প্রতিদান দিই না। সুতরাং উজাক ছিল সেই বাস্তবতার একটি ধারাবাহিকতা। জিওফ এনড্রিও আপনার কর্মজীবনের এই পর্যায়ে আকর্ষণীয় বিষয় কি, বিশেষত উজাক-এ, যেখানে আপনি নিজেই চিত্রনাট্য লিখছেন, পরিচালনা করছেন, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, অর্থায়ন, এমনকি বিক্রি অব্দি করছেন—এক অর্থে আপনি নিজেই সবকিছু করছেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। এসব কি আপনার জন্য অনেক বেশি ছিল, নাকি বিষয়টি এমন যা করতে আপনি মজা পেতেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি কখনোই অন্যের সিনেমায় সহকারী পরিচালক বা অন্য কোনোভাবে কাজ করি নি, সুতরাং, অন্য পরিচালকরা কিভাবে কাজ করে তা জানার সুযোগ হয় নি। আমি সবকিছুই বই থেকে নিজে নিজে শিখেছি এবং সিনেমার বিক্রি, বাজার সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে তৈরির সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিজে শিখেছি। এমনকি কানস-এ আমি নিজেই সিনেমাটি বিক্রি করছিলাম এবং তারা আমাকে বলেছিল, আর একজন মাত্র পরিচালক ছিলেন যিনি নিজেই নিজের সিনেমা বিক্রি করতেন, তিনি আফ্রিকান পরিচালক আব্দেররেহমান সিসাকো। ঘটনাটি ছিল অস্বাভাবিক এবং ডিস্ট্রিবিউটররা বেশ বিস্মিত হয়েছিল। আমি কিভাবে বিক্রি করতে হয় তা শিখেছিলাম, কিন্তু, এখন আর নিজে করি না। এখন আমার সিনেমার জন্য প্রোডিউসার, চিত্রগ্রাহক সব রয়েছে। যদিও বিষয়টি ছিল অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু সে সময়ে আমি জানতে চেয়েছিলাম। আমি মনে করি, একজন পরিচালকের অনেক কিছুই জানা প্রয়োজন, বিশেষত টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি, অন্যথায় আপনি টেকনিক্যাল লোকজনদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বেন। যদি আপনি টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানেন, তবে তাদের ভালোভাবে বোঝাতে ও পরিচালনা করতে পারবেন। জিওফ এনড্রিও এই সিনেমায়, যে দৃশ্যটি আমরা এইমাত্র দেখলাম, সেখানে আপনি আপনার পিতাকে উৎসাহ দিচ্ছেন যে তাকে কী বলতে হবে। বিষয়টি কি এভাবে বাস্তবেও কাজ করেছিল? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ। এটা আমার প্রথম সিনেমার চিত্রায়ণকে খুব বাস্তবিকভাবে প্রতিফলিত করে। আমার মনে হয়, সেটা ছিল সত্যিকার অথেই বিশৃঙ্খল অবস্থা, যখন আমরা দুজন মাত্র মানুষ বাকি সবাইকেই পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। সেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই তালগোল পাকানো এক পরিস্থিতি। জিওফ এনড্রিও অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে আপনি একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং সেটা উভয় ক্লিপেই উঠে এসেছে যে, গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ শহরের দিকে সরে আসার ফলে তুর্কিস জন-জীবনে কী ঘটছে? যেমন আপনার প্রথম সিনেমা ‘উজাক’-এর কথাই ধরা যাক, যেখানে আপনি সিনেমাটি ইস্তাম্বুল শহরের পটভূমিতেতে একজন ফটোগ্রাফারের জীবন-যাপন তুরে ধরেছেন, যার কাছে তার চাচাত ভাই বেড়াতে আসে মফস্বল থেকে। অনকেগুলো কারণের একটি, যার জন্য আমি ক্লিপটি বেছে নিয়েছি, এখানে আমরা নুরির পরিবারে আগত নতুন সদস্যকে দেখতে পাই—রাস্তায় দাঁড়ানো নারীটি নুরির স্ত্রী, ইব্রু। কিন্তু, অন্য যে কারণে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছি তা হলো, এটি একটি দারুণ দৃশ্য, যেখানে একটি যুবক যুবতীটির দিকে তাকিয়ে আছে এবং সানগ্লাস দিয়ে নিজেকে আকর্ষক করে তোলার চেষ্টা করছে, আর ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই গাড়ির এলার্ম বন্ধ হয়ে যায়। দৃশ্যটি খুবই হাস্যকর এবং এমন অনেক হালকা রসাত্মক উপদান রয়েছে আপনার সিনেমায়। বিষয়টি আমাকে বাস্টার কিটন-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার কাজ খুব কমই পরিচিত। মূলত, আপনার নিজের সিনেমায় কৌতুক অথবা রসবোধ থাকাটা আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? নুরি বিলগ ছেইলান আমার মনে হয়, জীবনকে আমি এভাবেই দেখি। আমি গল্পে রসবোধ আনার জন্য কোনো পরিকল্পনা করি না। আমি যথাসম্ভব বাস্তবতার কাছাকাছি থাকতে চাই এবং মনে করি যে, বাস্তব জীবন হাস্যরসে পূর্ণ। আমি যখন ঘরে একা থাকি, নিজেকে অনেক মজার মুহূর্তে খুঁজে পাই। যদি কখনও আমি নিজেকে আয়নায় দেখি, তবে দেখা যাবে আমার অভিব্যক্তি যথার্থই অসংলগ্ন। ফলে, সেগুলোর জন্য আমি কোনো পরিকল্পনা করি না। কিন্তু, এই সিনেমায় অমন অবস্থায় লোকজনদের হাসতে দেখে আমি একটু বিস্মিতই হয়েছি! জিওফ এনড্রিও এই সিনেমায় পরের দিকে তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং ফটোগ্রাফার এই আগন্তুক ভাইকে অহেতুক উৎপাত মনে করতে থাকে। সুতরাং এক সন্ধ্যায় সে পর্ণছবি দেখতে শুরু করে, কিন্তু, যখন চাচাত ভাই আসে, সে দ্রুত তা বন্ধ করে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে। মূলত, যে সিনেমাটি তারা একসাথে দেখছিল, তা ছিল চাচাত ভাইকে ঘুমাতে পাঠানোর একটি কৌশল এবং সেটা বিদ্রূপাত্মক, বিশেষত যখন আপনি তারকোভস্কির একজন অনুরাগী, নয় কি? নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, তিনি সে সকল পরিচালকদের অন্যতম যাদের আমি পছন্দ করি। কিন্তু, সেই দৃশ্যে আমি তারকোভস্কির সিনেমা বেছে নিয়েছিলাম এ জন্য না যে আমি তার কাজ পছন্দ করি, বরং সেই দৃশ্যে সিনেমাটি ছিল যথোপযুক্ত এবং আমি চেয়েছিলাম, যে ধরনের সিনেমা গ্রামের লোকেরা দেখে অভ্যস্ত তার সাথে এই ধরনের সিনেমার একটি তুলনা করতে। আমি চেয়েছিলাম ফটোগ্রাফারের [সিনেমার নায়ক] জন্য একটি আদর্শ সিনেমা বিছে নিতে, আর তারকোভস্তি ছিল সে ক্ষেত্রে যথার্থ। সাধারণত সমোলোচনাকারীরা ভেবেছে যে, চাচাত ভাইয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে, কিন্তু, সেটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। জিওফ এনড্রিও সমালোচকরা সব সময়ই ভুল [হাসিসহ]। নুরি বিলগ ছেইলান সম্ভবত আমি কিছু ভুল করেছিলাম [হাসিসহ]। কিন্তু, একটু আগের দৃশ্যে ফটোগ্রাফার তার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করছিল এবং এক বন্ধু তার সমালোচনা করে আদর্শ হারানোর জন্য, আর তারা সে জন্য তাকে দোষারোপ করে। সুতরাং যখন সে বাসায় ফেরে, তখন সে তার আদর্শ পুনরায় ফিরে পাবার জন্য এক ধরনের জিদ অনুভব করে। মূলত সে কারণেই সে তারকোভস্কির সিনেমা দেখা শুরু করে এবং সে মনে করেছিল যে সে তার হারানো উৎসাহ ও উদ্দীপনা ফিরে পাবে। এজন্য সে অপর ব্যক্তিকে আমলেই নেয় না, ফলস্বরূপ তার চাচাত ভাই অবশ্যই বিরক্ত হয়ে ওঠে। অতঃপর, চাচাত ভাই যখন ঘুমাতে যায়, তখন তার মধ্যে কিছু একটা কাজ করে এবং সে পুনরায় তার উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে ও পর্ণ দেখা শুরু করে, কারণ সেটা দেখা ছিল সহজতর। সে তার ভেতরের ক্রোধান্বিত ভাব থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল, আর সে জন্যই পর্ণ দেখা শুরু করেছিল। আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি। জিওফ এনড্রিও এই সিনেমার একটি বিষয় আমাকে আলোড়িত করেছে, তা হলো, অনেক দৃশ্যই খুব অল্প সংলাপসহ শুট করা এবং আমার কাছে মনে হয়েছে, বিষয়টি আপনার সিনেমায় সবসময়ই ঘটে। আপনি কি মনে করেন যে, চরিত্রেরা শব্দ ছাড়াই নিজেদের ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারে? নুরি বিলগ ছেইলান আমি ঠিক জানি না। চরিত্রগুলোকে নিরব রাখার চেষ্টা আমি করি না। চিত্রনাট্যে সেই দৃশ্যে অনেকগুলো সংলাপ ছিল। কিন্তু দৃশ্যায়ন, এই একটিমাত্র ক্ষেত্র, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনি যা লিখেছেন তা সেখানে কাজ করবে কি না। চিত্রগ্রহণের বেলায় আমি সবসময় চেষ্টা করি পরিস্থিতির সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে। ফলে আমি দৃশ্য থেকে সংলাপ বাদ দিই, যার দরুন সেখানে কোনো সংলাপ ছিল না। আমি সেই পরিস্থিতিতে যথার্থ সামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম, আর আমি জানি না এই বিষয়ে আমার কী করা উচিত। মূলত, পরিস্থিতি আমাকে সেভাবেই বুঝিয়েছিল। আর হ্যাঁ, সংলাপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। আমি এই বিষয়ে অনেক অনুসন্ধান করেছি, আর বিষয়টির প্রকৃতি বোঝার জন্য অনেক কথোপকথন রেকর্ড করেছি। এটা কোনো যৌক্তিক অগ্রগতির নিয়ম মানে না। কেউ হয়তো কিছু বলল, কিন্তু দেখা গেল অপর ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু বলে বসেছে। যদি আপনি বিশ্লেষণ করেন, তবে সেভাবেই বিষয়টি আপনার কাছে ধরা দেবে। সুতরাং, সংলাপ, যদি আপনি তা ব্যবহার করেন, তবে দেখবেন যে সেটা যৌক্তিক নয় আর তা সিনেমার নিগূঢ়তা বা অর্থ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। আমার কাছে সংলাপ তখনই কাজ করে যখন চরিত্রেরা অনর্থক কথা-বার্তা বলছে, যা সিনেমাটি সম্পৃক্ত নয়। আর আমি যথাসম্ভব সেটাই করার চেষ্টা করি। আমি সংলাপ ছাড়াই সিনেমার অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করি—পরিস্থিতি, অভিব্যক্তি বা এমন অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে। এটাই আমার ইচ্ছা, আর সম্ভবত তাতে আমি সফল নই। জিওফ এনড্রিও যা হোক, আপনি যে সফল হচ্ছেন সেটা প্রতীয়মান—কারণ ‘উজাক’ কানস-এ একটি বড় পুরস্কার জিতেছে এবং তারপর থেকে আপনি নিয়মিতভাবেই তা জিতে চলেছেন। আমরা উল্লেখিত ক্লিপ-এ আপনার স্ত্রীকে দেখেছি, এখন চলুন আমরা ‘ক্লাইমেটস’-এর একটি ক্লিপ দেখি। আপনি হয়তো দৃশ্যটির অভিনেতাকে চিনতে পেরেছেন। সিনেমাটির কাহিনি আপনি আপনার বোন ইব্রুর সাথে লিখেছেন এবং নিজেই দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, আর সিনেমাটি ছিল একটি সম্পর্কের ভেঙে যাবার বিষয়ে। এই বিষয়ে নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে সৎ ও পুরুষোচিত বিষয়ে নির্মিত অসম্ভব বিষাদময় একটি সিনেমা। সত্যিকার অর্থেই এটা অনবদ্য আর তা এমন অনেক দিকই ছুঁয়ে গেছে, যা অপরাপর সিনেমাগুলি স্পর্শ অব্দি করে না। এটা তৈরি করা কি আপনার জন্য যথেষ্ট বেদনাদায়ক ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান না, মোটেও নয়। বস্তুত, আমরা তেমন দম্পতি নই যারা জীবনের অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে কথা বলতে ভয় পায়। আমার বরং সে বিষয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। সুতরাং, আপনি যদি জীবনের অন্ধকার দিকগুলোর সাথে পরিচিত থাকেন, তাহলে আপনি নিরাপদ—এটা থেরাপির মতো—ফলে অন্ধকার বিষয়গুলো একত্রিত হতে বা বাড়তে পারে না। বলা যায়, ছোট থাকতেই সাপের মাথা কেটে ফেলার মতো বিষয়। সুতরাং এটা ছিল কৌশলগত দিক, যা আমাদের জন্য মোটেও কঠিন ছিল না। জিওফ এনড্রিও কেন আপনি নিজেই দুটি চরিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি এই সিনেমাটির মাধ্যমে সেই বিষয়ে বলতে চেয়েছি, যা অন্যকে ব্যাখ্যা করা বা বোঝানো কঠিন। আমি চাই নি যে, কিভাবে অভিনয় করবে তা বোঝেনোর জন্য অভিনেতাদের সাথে লড়াই করতে। আমি চেয়েছিলাম যে, কাজটি তারা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই করুক। তাছাড়া যখন আমি চিত্রনাট্য লিখছিলাম, এক ছুটির দিনে আমি ও আমার স্ত্রী সিনেমাটি নিয়ে কথা বললাম। আমরা একটি পরীক্ষামূলক দৃশ্যায়ন করেছিলাম, যেখানে আমরা অভিনয় করেছিলাম আর ফলাফল আমাদের পছন্দ হয়েছিল। সুতরাং সেটা আরেকটি কারণ যার জন্য আমরা সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলাম। সার্বিকভাবে, তুর্কিতে আমার অভিনয় দর্শকরা পছন্দ করে নি [শ্রোতাদের হাসি], কিন্তু আমার ধারণা পশ্চিমারা পছন্দ করেছিল, অপরপক্ষে আমার স্ত্রীর অভিনয় সৌভাগ্যবশত সকলেই পছন্দ করেছিল। জিওফ এনড্রিও এটা আপনার প্রথম সিনেমা যেখানে প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করেছেন। আমার মনে আছে সমুদ্র সৈকতে আপনাদের দুজনের সেই দৃশ্যটির কথা, যেখানে নৌকা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যেতে থাকে এবং সবকিছুই নিখুঁতভাবে রাখা হয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে। যতদূর মনে আছে, যখন এটা আমি কানস-এ দেখছিলাম, দৃশ্যটি দেখে বেশ চমকে উঠেছিলাম। তাছাড়া পুরো সিনেমাটিই ডিজিটাল ক্যামেরার কাজ দ্বারা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকেই এভাবে আগে করে নি। আপনার কি মনে হয় ডিজিটাল টেকনোলজি অভিব্যক্তি প্রকাশের নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত করছে? নুরি বিলগ ছেইলান অবশ্যই। আমি মনে করি, এটার আরও অজানা ক্ষমতা রয়েছে যা অনেক গভীর ও লুকায়িত বিষয় তুলে ধরতে পারে। সুতরাং ফিল্ম এ শুট করা অর্থহীন—তাহলে কেন আর ফিল্মে শুট করব? এই সিনেমাটি পুরোনো ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে শুট করা হয়েছে, আর ইতিমধ্যে তা অনেক উন্নতিও লাভ করেছে। ফিল্ম এ শুট করা খুব ব্যয়বহুল আর অনেক অসুবিধাও রয়েছে। আমার জন্য এটাই যথার্থ। আমি আর কখনোই ছবি তোলা বা সিনেমা তৈরির জন্য ফিল্মে ফিরে যাব না। আমি মনে করি, আমাদের উদার হওয়া দরকার এবং আমাদের গভীরতম আবেগসমূহ তুলে ধরার বিষয়ে নতুন এই টেকনোলজির সুবিধা গ্রহণ করা প্রয়োজন। জিওফ এনড্রিও চলুন এবার ‘থ্রি মাংকিস’ নিয়ে কথা বলা যাক—এটাকে বরং একটি এক্সপ্রেশনিস্ট সিনেমা বলা যায়, এই অর্থে যে, মাঝে মাঝে লাল রং-এর ছটা ছাড়া আপনি রং-এর বিকৃতি ঘটিয়েছেন, যেটা নিতান্তই একমাত্রিক। এর অধিকাংশই সবুজ ও হলুদ, আর দৃশ্যগুলো খুবই অস্বস্তিদায়ক। এটা অনেকটাই এক্সপ্রেশনিস্ট পেইন্টিং-এর মতো। নুরি বিলগ ছেইলান আমি তা জানি না। বস্তুত, আমি ভাববাদিতা পছন্দ করি না—বরং আমি ইঙ্গিতময়তা পছন্দ করি, কেন না আবেগ ও অনুভব ভাববাদিতায় অনেক বেশি দমিত। অথচ অনেক সমালোচকই বলেছেন যে, সিনেমাটি ভাববাদী—হয়তো তারাই ঠিক। আমি আরও বেশি সূক্ষ্ম ও গোপনীয় হতে পছন্দ করি, যাতে দর্শকরা আরও বেশি সক্রিয় হতে পারে। আর রং-এর বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, এটাই স্বাভাবিক যে, একজন কোনো কিছু যেভাবে দেখে, বাকিরা তা সেভাবে দেখে না। আমি যখন পৃথিবীর দিকে তাকাই, সেটাই সেই প্রকরণ যা আমি দেখি। আমার ফটোগ্রাফির হয়তো বিষয়টিতে প্রভাব রয়েছে—আর রং আমি এভাবেই দেখি। আমি যখন রং-এর প্রকরণে সম্পৃক্ত হই, মোটেও বুঝতে পারি না যে আমি এসব রং থেকে খুব দূরে সরে এসেছি। আর অবশ্যই এই সিনেমার ক্ষেত্রে আমি চেয়েছিলাম চরিত্রগুলোকে একটু বিচ্ছিন্ন রাখতে। এই বিচ্ছিন্নতা আমি অন্যভাবে করেছিলাম, উদহারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, সিনেমায় আমি তিনটি চরিত্রের মুখ ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রের মুখ দেখাই নি। আর রংগুলোর ব্যবহার এই বিচ্ছিন্নতা তৈরিতে আমাকে সহায়তা করেছিল। বস্তুত, আমি বেশি কিছু করি নি, শুধুমাত্র কনস্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিয়েছিলাম আর রংগুলোকে আলাদা করেছিলাম। তারপর একটি রং নির্বাচন করেছিলাম, যেটা ছিল লাল, আর তাকে আর একটু সামনে এনেছিলাম। জিওফ এনড্রিও অন্যান্য বিষয়, যেমন আপনি কোনো বিষয়কে জোরালোভাবে প্রকাশের জন্য সুচারুভাবে শব্দ ব্যবহার করেন, আর কাজটি আপনি একদম শুরু থেকেই করে আসছেন। নুরি বিলগ ছেইলান আমি শব্দের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে পছন্দ করি না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা সিনেমায় এমন একটি শব্দ শুনলাম যা পূর্বে শুনি নি। আমাদের কান খুবই নির্দিষ্টভাবে কাজ করে আর আমরা কেবল তাই শুনি, যা আমরা শুনতে চাই। সুতরাং, শ্রোতাদের জন্য আমি কিছু শব্দ নির্বাচন করি এবং তাদের তা শোনাই। শব্দের মাধ্যমে আমি তাদের সেদিকে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে আমি তাদের নিয়ে যেতে চাই, আর বিষয়টি দৃশ্যপটের বাতাবরণকে তেমন হেয়ে উঠতে সাহায্য করে, যেমনটা আমি চাই। তাছাড়া, আপনি যদি শব্দের মাধ্যমে কোনো কিছু বলতে পারেন, তবে আপনার তা দেখানোর প্রয়োজন নেই। জিওফ এনড্রিও সিনেমাটিকে অবশ্যই অন্যান্য সিনেমা থেকে ভিন্ন মনে হয়—কারণ আংশিক হলেও এটাকে একটি ক্রাইম সিনেমা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। যতদূর আমার মনে হয়, এটা মোটেও আত্মজীবনীমূলক নয়, যদিও অনেক কিছুই উহ্য, তারপরও বর্ণনাবহুল। এক অর্থে, এটা বেশ নাটকীয়। আপনি কি মনে করেন, আপনি এখানে এক ধরনের পথ তৈরি করেছেন এবং সে পথ ধরেই এগুবেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমারও তাই মনে হয়, কেন না আপনি সারা জীবন ধরে তো আর আত্মজীবনীমূলক সিনেমা তৈরি করতে পারবেন না [শ্রোতাদের হাসি]। ক্লাইমেটস তৈরির পর আমি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলাম যে, আমার একটি পরিবর্তন দরকার। কিন্তু, তার অর্থ এই নয় যে, আমি এ পথেই যাব। আমি এখনও জানি না। সে সময় মনে হয়েছিল, আমার পরিবর্তন দরকার আর আমিও তা করেছি। ফলাফল হয়তো আবারও আমাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে, কিন্তু, এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত নই। জিওফ এনড্রিও ঠিক আছে, চলুন তবে তা শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করা যাক। প্রশ্ন- ০১ : আপনার প্রতিটি সিনেমাতেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রঙের সমাবেশ রয়েছে, যা আপনার সিনেমার উল্লেখযোগ্য একটি দিক—সেগুলো কি ইমপ্রেশনিস্টিক নাকি এক্সপ্রেশনিস্টিক? আপনি কি আপনার রং-এর ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন এবং সেগুলো দিয়ে আপনি কি করতে চেয়েছেন? নুরি বিলগ ছেইলান সেগুলো ছিল সিনেমায় ব্যবহৃত রং। আমার পক্ষে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল সহজাত প্রবণতা থেকে। এই সিনেমার কথাই ধরা যাক, আমি সিনেমার শুটিং শুরুর পূর্বে রং নির্ধারণ করেছিলাম। আমি লোকেশনগুলোর কিছু ছবি তুলেছিলাম এবং সিনেমায় কোন ধরনের আবহ কাজ করবে তা নির্ধারণ করার জন্য সেগুলো নিয়ে কম্পিউটারে কাজ করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি যা চাই তার কাছাকাছি কিছু পেয়েছিলাম। কিন্তু, সাধারণত আমি সত্যিই আগে থেকে জানি না—নিতান্তই সহজাত প্রবণতা থেকে বিষয়টি ঘটে যায়। আমি চাইলে হয়তো এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব, কিন্তু সেটা হবে মিথ্যা [শ্রোতাদের হাসি)] আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০২ : আপনার বয়স কত ছিল যখন আপনি প্রথম স্বল্প দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি [কোজা, ১৯৯৫] তৈরি করেন? সিনেমাটি কানস-এ পুরস্কৃত হয়েছে—আপনি কি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন যে, সেটি একটি ভালো সিনেমা ছিল? নুরি বিলগ ছেইলান আমি যথেষ্ট বয়স্ক ছিলাম, বস্তুত ৩৬ বছর। তবে আপনি যদি আগে শুরু করতে পারেন সেটাই মঙ্গলজনক। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে বের হবার পর কমপক্ষে ১০ বছর কিছুই করি নি শুধু এই চিন্তা ছাড়া যে, জীবন ধারণের জন্য কী করা যেতে পারে। যখন আপনি তরুণ, তখন আপনি সাহসী আর যৌবনে ভুল করাই শ্রেয়। আমি যখন সিনেমাটি তৈরি করলাম, তখন সবসময় ভেবেছি যে, এটা কোনো সিনেমা নয়। আমি কিছু বিষয় নিয়ে শুট করছিলাম, কিন্তু আমি কখনোই ভাব নি যে, কানস সেটাকে গ্রহণ করবে, কিংবা আমি সেটা অন্যদের দেখাব। আমি ভেবেছিলাম, আমি অর্থহীন কিছু করছি। এডিটিং রুমে আমি সেগুলো দিয়ে একটা ধারণা অথবা গল্প তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। আমার মাথায় কিছু একটা চিন্তা-ভাবনা ছিল, কিন্তু আমি সবসময় ভেবেছিলাম যে তা কাজ করবে না। এমনকি সিনেমাটি শেষ করার পর আমার মনে হয়েছিল, এটা একটি বাজে কাজ এবং কেউই সেটা পছন্দ করবে না। আমি আমার বন্ধুদের জিগ্যেস করেছিলাম, ‘সেটা সিনেমার মতো হয়েছে কি না?’ একই প্রশ্ন পুনরায় করেছি, যখন আমি আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য সম্মল টাউন’, ১৯৯৭ তৈরি করেছিলাম। আমার মনে আছে, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে, যেখানে সিনেমাটি প্রিমিয়ার করা হয়েছিল, সেখানে এটি আমার বোনের সাথে দেখার সময়, আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ‘এটাকে সিনেমার মতো মনে হচ্ছে না!’ নিজের পুরোনো সিনেমাগুলো দেখা সত্যিই কঠিন, কারণ আপনি কিছুই বুঝবেন না। একটা সিনেমা শেষ করার পর আপনি সম্পূর্ণরূপে অন্ধ। নিরপেক্ষভাবে নিজের সিনেমাটি দেখার কোনো সুযোগই আপনার থাকবে না। কিন্তু, আমি তেমন একজন মানুষ, যে সবসময় নেতিবাচক অবস্থান থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে—আমি সবসময় ভুলগুলো খুঁজতে থাকি, যার দরুণ বিষয়টি যন্ত্রণাদায়ক, আর সেজন্য আমি আমার সিনেমা কখনোই দেখি না। জিওফ এনড্রিও একটি বিষয়ে আমি আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই—উজাক-সহ এখন পর্যন্ত আপনি খুব কম সংখ্যক লোক নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছেন। আপনি যদি ‘উজাক’ সিনেমার শুটিং-এর ভিডিও দেখেন, তবে দেখতে পাবেন একটি ছাতার নিচে মাত্র তিনজন লোক একটি দৃশ্য শুট করছে। এখন আপনি অনেক বেশি লোকজন নিয়ে কাজ করেন, যা আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য, আপনার ক্যারিয়ার বিভিন্ন দিক থেকে অনন্য—বিষয়টা কি আপনার জন্য সহজ ছিল নাকি অনেক কঠিন? নুরি বিলগ ছেইলান বস্তুত দুটোই, সহজ এবং যথেষ্ট কঠিন। এটা নির্ভর করে বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন। আমি পুরোনো দিনের মতো কাজ করতে পছন্দ করি না—আমি এখন বৃদ্ধ এবং সামর্থ্য কম। মানুষ এমন এক জীব যে সহজেই বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘উজাক’ পর্যন্ত আমি নিজেই নিজের সিনেমা শুট করেছি। কিন্তু এখন, তা করার কথা কল্পনাও করতে পারি না আর সেটা আমার কাছে কঠিন মনে হয়। আমি অলস আর আমার একটি মনিটরের মাধ্যমে কলা-কুশলী, সম্পাদনা, উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ মনে হয়। আমার মনে হয়, বিষয়টি এমনই হওয়া উচিত আর সে জন্যই আমি এখন এভাবে কাজ করি। কিন্তু, অন্যভাবে ভাবলে বিষয়টি খুব কঠিন। যেমন এই সিনেমায় ২০-২৫ জন মানুষ ছিল ক্যামেরার পেছনে আর সবকিছু করতে যথেষ্ট সময় লাগছিল। লোকজন ও জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের ট্রাকের প্রয়োজন পড়েছিল । যদি আপনার মনে থাকে, ‘উজাক’-এ একটি বরফের দৃশ্য ছিল। এটা ইস্তানবুলে খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল, মাত্র দুদিন। কিন্তু, আমরা দুদিনের মধ্যেই শুটিং-এর সব কিছু শেষ করেছিলাম, কারণ আমরা সংখ্যায় ছিলাম অল্প। একটি মাত্র জিপ দিয়েই আমরা সব কলা-কুশলী, মাল-পত্র বহন করতে পারতাম এবং এক স্থান হতে অন্য স্থানে জলদি যেতে পারতাম। আমাদের কাজ হয়ে যেত অনেক দ্রুত। সুতরাং, এই অর্থে সেটা ছিল আমার জন্য সহজতর। কিন্তু, তারপর আমি অনেক কিছুই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। যদি আমি কোনো কিছুর সমাধান করতে না পারতাম, তখন আমি চিত্রনাট্য বদলে দিতাম এবং আরও অনেক কিছুর সাথেই নিজেকে অভ্যস্ত করাতে রাজি ছিলাম। কিন্তু, এখন আমি বেশি ছাড় দিই না, কারণ আমার একজন প্রোডিউসার আছেন এবং তিনি অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এখন আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট অর্থ ও জনবল আছে। সুতরাং, যখন আপনি নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন, তখন সেগুলো এড়িয়ে যেতে চাইবেন না। অতএব, আমার মনে হয়, বিষয়টি একইসাথে অনেক কঠিন ও সহজতর। জিওফ এনড্রিও অলসতা সম্পর্কে তিনি যা বলছেন সেটা বিশ্বাস করবেন না—আমি তার নোটগুলো পড়েছি, তিনি ‘থ্রি মাংকিস’ সম্পাদনা করার সময় রাতে মাত্র দুঘণ্টা ঘুমাতেন। প্রশ্ন-০৩ : ‘থ্রি মাংকিস’-এর একটি চরিত্র একজন রাজনীতিবিদ আর আপনি সিনেমায় এ.কে. পার্টির নির্বাচনে জয়লাভের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েছেন। আমি ভাবছি, যদি আপনি এই সিনেমার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলেন? তাছাড়া, সিনেমাটি কি তুরস্কের রাজনীতির উপর একটি মন্তব্য হিসেবে গৃহীত হয়েছিল? নুরি বিলগ ছেইলান তুরস্কে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে মনোযোগ টানার জন্য সিনেমাটির যথেষ্ট সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি এটাকে এমনভাবে এডিট করি, যাতে সে বিষয়ে সমালোচনা করার কোনো সুযোগ না থাকে। আমি চাই নি সিনেমাটি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। ফলে অনেকগুলো রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল শুট করার পরও আমি সেগুলো সিনেমায় যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিই, কারণ বিষয়টিকে আমি সিনেমায় একটি পার্শ্ববর্তী উপাদান হিসেবে রেখে দিতে চেয়েছিলাম। দর্শক ও সমালোচনাকারীরা সিনেমার এই দিকটিকে সামনে তুলে আনতে বেশ আনন্দ বোধ করে, কিন্তু সেটাকে আমি পেছনে রাখতেই চেষ্টা করেছি। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৪ : এটা পূর্বেও অনেকবার বলা হয়েছে যে, আপনার কম্পোজিশনের ধরন ‘ইয়াসুজিরো ওজু’ [বিখ্যাত জাপানিজ পরিচালক] এর মতো, বিশেষত খুব নিচু অবস্থানে ক্যামেরার পজিশন রাখা, সম্ভবত হাঁটুর উচ্চতায়, বিশেষত ঘরের ভেতরের দৃশ্যটিতে। আপনি কি ইচ্ছা করেই ওজুকে অনুকরণ করেছেন, নাকি সেটা অনিচ্ছাকৃত ঘটেছে? তাছাড়া, এই বিষয়ে কি আপনি আমাদের বলবেন যে, শুটিং এই বিশেষ ধরন কি ক্যামেরার নড়া-চড়া বা ট্র্যাক-এ শুট করা এড়িয়ে যাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা সিঙ্গেল শট-এর বিপরীত। নুরি বিলগ ছেইলান হ্যাঁ, সে [জিওফ এনড্রিও] রাতে খাবারের সময়ও একই কথা জিগ্যেস করেছিল। বস্তুত, ওজু আমার প্রিয় একজন পরিচালক আর আমি ক্যামেরা বেশি নড়াচড়া করি না—কিন্তু, আমি জানি না সেটা ওজুর কারণে নাকি একজন ফটোগ্রাফার বলে। আমি ক্যামেরার অধিক নড়া-চড়া মোটেও পছন্দ করি না, কারণ এটা সবাইকে ক্যামেরা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আর ক্যামেরার উচ্চতা অধিকাংশ সময় আমিই নির্ধারণ করি, আর আমি মনে করি, ওজুর বেলায় সেটা ঘটে ফাঁকা জায়াগায় উল্লম্ব রেখার অবস্থানের কারণে। বইতে তারা লিখেছে যে, ওজু তার ক্যামেরা ভূমি থেকে ৯০ সে.মি. উপরে রাখত, কিন্তু, আমি তা বিশ্বাস করি নি। এটা নির্ভর করে উল্লম্ব রেখার উপর—আর জাপানিজ বাড়িগুলোতে আপনি তেমন অনেক পাবেন। এসব ছাড়াও চরিত্রের মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ—যদি একটি লোককে আপনি উপর থেকে শুট করেন, তবে নিচ থেকে তাকে শুট করা আলাদা কিছু। আমি সাধারণত প্রতিকৃতির বেলায় মুখের উচ্চতায় শুট করতে পছন্দ করি। বিশেষত ক্লোজ শটগুলোর বেলায় ১ সেমি ও খুব গুরুত্পূর্ণ। সে জন্য বিষয়টি আপনি সিনেমাটোগ্রাফারের উপর ছেড়ে দিতে পারবেন না, কারণ সিনোমাটোগ্রাফার কখনোই জানে না কিভাবে পরবর্তী শট-এর সাথে যুক্ত হতে হবে, কেবল পরিচালকই জানেন পূববর্তী শট-এর সাথে পরবর্তী শট-এর সম্পর্ক। সেজন্য পরিচালক খুব সাবধানতার সাথে ক্যামেরার অবস্থান নির্ধারণ করেন, যাতে ব্যাঘাত ছাড়াই মানসিকতা সচল থাকে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৫ : কেন আপনি সিনেমায় প্রচলিত সংগীত ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি সিনেমায় সংগীত পছন্দ করি না, এটা আমার কাছে নির্ভরতার মতো মনে হয়। যদি আপনি সিনেমাটিক ভাবে কোনো কিছু প্রকাশ করতে না পারেন, তখন সেটাকে ছাপিয়ে যাবার জন্য আপনি সংগীত-এর সহায়তা নিতে পারেন। আমি বিষয়টির বিপক্ষে নই, কিন্ত যদি সম্ভব হয় তবে তা ব্যবহার না করারই চেষ্টা করি। এডিটিং-এর সময় আমি অনেক সংগীতাংশ ব্যবহারের চেষ্টা করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাই ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিই। তাছাড়া আমার কাছে সিনেমায় বাতাবরণের শব্দই সবচেয়ে সুন্দর। সুতরাং আমি সংগীত-এর চেয়ে বাতাবরণের শব্দই ব্যবহার করতে পছন্দ করি, কারণ সংগীত বিষয়গুলোকে দমিত করে। জিওফ এনড্রিও প্রশ্ন- ০৬ : কেন আপনি সিনেমাটির নাম ‘থ্রি মাংকিস’ দিয়েছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান এটি মূলত কনফুসিয়াস থেকে আগত, যেখানে তার একটি ইতিবাচক অর্থ রয়েছে, কিন্তু পরে সেটি নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। এটা বাস্তবতা থেকে আমাদের পলায়নপরতার মনোভাব প্রতিফলিত করে। জিওফ এনড্রিও এটা কোনো মন্দ দেখে না, শোনে না বা বলে না। নুরি বিলগ ছেইলান সেটাই ছিল মূল বিষয়। জিওফ এনড্রিও এবং অবশ্যই সিনেমাটি সে সব মানুষ সম্পর্কে যারা ভাব করে যে কিছুই ঘটবে না; এটা বস্তুত মিথ্যা সম্পর্কিত। প্রশ্ন- ০৭ : আমি মৃত বালকটি সম্পর্কে আগ্রহী, যাকে দু বার দেখা যায়—কেন আপনি তাকে সে দুটি দৃশ্যে রেখেছিলেন? নুরি বিলগ ছেইলান আমি চেয়েছিলাম বালকটিকে সে-সব দৃশ্যে রাখতে যেখানে একটি চরিত্রের সহনীয়তা প্রয়োজন, বিশেষত সেই চরিত্রটির ক্ষেত্রে যে কিনা বালকটির মৃত্যুর জন্য এক ধরনের অপরাধ বোধ করে।
জিওফ এনড্রিও
প্রশ্ন- ০৮ : আমরা ‘থ্রি মাংকিস’-্এর লোকেশনগুলো সর্ম্পকে জানতে কৌতূহল বোধ করছিলাম, বিশেষত সেই বাড়িটি এবং যেখানে মহিলাটি রাজনীতিবিদের সাথে দেখা করে। এটি কি ‘কোকা মোস্তাফা পাশা’র নিকটবর্তী কোথাও?
নুরি বিলগ ছেইলান
আপনি ঠিক ধরেছেন। জায়গাটি ছিল ইয়েদিকুল ট্রেন স্টেশনের কাছে, একদম বিপরীতে। তাছাড়াও আমরা ব্ল্যাক সি’র কাছে, এনাটোলিয়ান অংশেও শ্যুট করেছিলাম।
জিওফ এনড্রিও
তাছাড়া বাড়িটি সর্ম্পকে এই বিষয়টিও তো ছিল, যে সেটি ভেঙে ফেলা হবে। কিন্তু আপনি যেভাবে এর চিত্রায়ণ করেছেন, তাতে সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়।
নুরি বিলগ ছেইলান
তারাও আমাকে সেটাই বলেছিল, কিন্তু পরে আর করে নি [শ্রোতাদের হাসি]।
জিওফ এনড্রিও
প্রশ্ন- ০৯ : একটি দৃশ্যে, বালকটি যখন দরজার চাবির ফুটোর মধ্যে দিয়ে দেখছিল, তখন আমরা তার মুখে ঘাম ও তা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তে দেখি। বিষয়টি কি নিতান্তই অকস্মাৎ ছিল?
নুরি বিলগ ছেইলান
সিনেমার কিছু দৃশ্য নিতান্তই অকস্মাৎ, কিছু নয়। কিছু সময় আপনাকে একটি দৃশ্য ২০-৩০ বার শুট করতে হয় আর তারপর আপনি সেটাই বেছে নেবেন, যেটাতে আপনি মনে করেন যথার্থ বর্ণনা ওঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, রান্না ঘরে কম্পনরত ছুরির কথা বলা যেতে, সেটা অকস্মাৎ ছিল না। কিছু কিছু সময় আমি সত্যিই গুলিয়ে ফেলি, কোনো অকস্মাৎ আর কোনটি নয়।
জিওফ এনড্রিও
দুঃখজনকভাবে, এই সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি টানতে হবে। আসুন আমরা সবাই করতালির মাধ্যমে নুরি বিলগ ছেইলানকে ধন্যবাদ জানাই।

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.। প্রকাশিত বই : যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা] কাক সিরিজ [কবিতা] এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প] ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com

ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে

ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে

ডা. শাহজাদা সেলিম

পরম করুণাময় স্রষ্টার কী আজব লীলা যে, তাঁর সৃষ্টি জগতে কোনো দু’জন মানুষের ব্যক্তিত্বের(Personality) গঠন এক রকম নয়। এমনকি চেহারা, মেজাজ, আচরণে তেমন কোনো মিল নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব একটি মাত্র বৈশিষ্ট্য বা গুণের ফসল নয়। এটা ব্যক্তির সার্বিক বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ব্যক্তিত্ব বলতে আমরা বুঝি সামাজিক পরিবেশে সুসামঞ্জস্য স্থাপনকারী আচরণগুলোর সমন্বয়সাধন। ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে রবার্ট জেন্ড একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন, ‘জনসাধারণের মাঝে একটি বিষয়ই হলো সাধারণ তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র’ (people have one thing is common, they are all different_Robert Zend)। ওয়ারেন (Warren-1934) ব্যক্তিত্বের একটি সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো, কোন ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যসমূহের সমন্বিত সংগঠন, যা এক ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তি থেকে পৃথক করে তাকে ব্যক্তিত্ব বলে। আবার এলপর্ট (Allport-1936) বলেন, “ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির মনোদৈহিক প্রক্রিয়াগুলোর এক গতিময় সংগঠন যা পরিবেশের তার উপযোগ স্থাপনের স্বকীয় ধরন নির্ধারিত করে।” ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে আরো অনেক মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক সংজ্ঞা দিয়েছেন তাদের মধ্যে স্টেনজার (Stanger-1948), উডয়ার্থ ও মারকুইস (Woodwarth & Marquis, 1957) এবং হুইটটেকার অন্যতম। প্রকৃতপক্ষে “Personality” শব্দটি ল্যাটিন শব্দ “Persona” থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো Mask অর্থাৎ মুখোশ।

[caption id="attachment_24438" align="aligncenter" width="800"] Photo credit: roberthuffstutter on Visualhunt / CC BY[/caption] ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপাদান একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়। সংক্ষেপে ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপাদান নিম্নরূপ- দৈহিক গঠন : দৈহিক আকৃতি, চেহারা, শক্তি, সামর্থ্য প্রভৃতি ব্যক্তিত্ব বিকাশে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যেমন : একজন শীর্ণ-ক্ষীণ দেহের লোক সাধারণত চঞ্চল ও অন্তর্মুখী এবং স্থূলদেহের মানুষ আরামপ্রিয় ও উল্লসিত প্রকৃতির হয়। অপেক্ষাকৃত একজন সুন্দর চেহারার লোক সহজেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তাছাড়া ব্যক্তির দৈহিক শক্তি ও সামর্থ্য ব্যক্তিত্ব গঠনেও সাহায্য করে থাকে। অন্তক্ষরাগ্রন্থি : যেসব অন্তক্ষরাগ্রন্থি ব্যক্তিত্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেগুলো হলো- থাইরয়েড গ্রন্থি, যৌনগ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থি। থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনে দু’পাশে দু’টি থাকে এবং এ থেকে নিঃসৃত হরমোন বা রসকে থাইরোক্রিন বলে। এই হরমোন কমে গেলে মানুষ ক্রমেই স্থূল ও অলস স্বভাবের হয়, আবার বেড়ে গেলে তীব্রভাবে কর্মচঞ্চল হয়ে পড়ে। শিশুদের এই গ্রন্থি বিনষ্ট হলে ক্রেটিনিজম নামক এক প্রকার শারীরিক রোগ হয়। এ্যাডরেনাল বা সুপ্রারেনাল গ্রন্থিদ্বয় উভয় কিডনির ওপর অবস্থিত। এখান থেকে এপিনেফ্রিন(এ্যাডরেনালিন) নামক হরমোন বেশি নিঃসৃত হলে শ্বাস-প্রশ্বাস বৃদ্ধি পায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, হৃৎপিণ্ড উত্তেজিত হয় এবং যকৃত থেকে সংরক্ষিত শর্করা বেশি পরিমাণে রক্তে ক্ষরিত করে প্রতিক্রিয়ার জন্য শক্তি জোগায়। যৌনগ্রন্থি পুরুষের অণ্ডকোষ ও মহিলাদের ডিম্বাশয় থাকে। এ থেকে পুরুষের বেলায় এনড্রোজেন এবং মহিলাদের বেলায় এসট্রোজেন নামক প্রধান হরমোন নিঃসৃত হয়ে থাকে। পিটুইটারি গ্রন্থি মগজের ভেতরে ও নিম্নে প্রায় মধ্যখানে থাকে। এ থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। বুদ্ধি : বুদ্ধি হলো ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম উপাদান। একজন মানসিক প্রতিবন্ধী বা অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির চেয়ে একজন স্বাভাবিক বুদ্ধি বা অতি বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের ব্যক্তিত্ব অধিক আকর্ষণীয়। কৃষ্টি বা সংস্কৃতি : পরিবার, সমাজ, ধর্ম, মূল্যবোধ, ন্যায়, অন্যায়, মনোভাব সবই কৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। সেজন্য প্রত্যেক কৃষ্টি বা সংস্কৃতির মধ্যে ব্যক্তিত্বের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। শিশু ও কিশোরদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে মাতা-পিতা, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, খেলার সাথী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এদের কাছ থেকে শিশু ও কিশোররা ন্যায়, অন্যায়, মূল্যবোধ, মনোভাব, ধর্মীয় রীতিনীতি, সামাজিক নিয়মকানুন প্রভৃতি শেখে এবং চর্চাও করে থাকে। বংশগত : ব্যক্তির বংশগতি তার আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তার স্বকীয় বংশগতি ও পরিবেশের যৌথ ক্রিয়ার ফলাফল। image ব্যক্তিত্বের প্রকারভেদ : আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্ব অন্যজনের ব্যক্তিত্ব থেকে আলাদা। সেজন্য ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বা স্বাতন্ত্র্যের মাঝে সাধারণ মিল বা সূত্র খুঁজে বের করাই ব্যক্তিত্বের তত্ত্বের লক্ষ্য। ব্যক্তিত্বের নানারূপ বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকরা ব্যক্তিত্বকে বিভিন্ন প্রকারভেদে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে শারীরিক গঠনতত্ত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রকারভেদতত্ত্ব উল্লেখযোগ্য। শারীরিক গঠনতত্ত্ব : সর্বপ্রথম মানুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন গ্রিক বৈজ্ঞানিক হিপোক্রেটাস, যাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক বলা হয় এবং এটা নবী ঈসা (আ:) এর জন্মের প্রায় সাড়ে তিনশত বছর আগের কথা। হিপোক্রিটাস মনে করতেন মানুষের শরীর চার প্রকার তরল পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন-রক্ত, হলুদ পিত্ত, কৃষ্ণ পিত্ত ও শ্লেষ্মা। একেকটি তরল পদার্থের প্রাধান্যের জন্য মানুষের ব্যক্তিত্বে একেক রকম গুণাবলী সৃষ্টি হয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, যেমন- রক্তপ্রধান ব্যক্তিত্ব, পিত্তপ্রধান ব্যক্তিত্ব ও শ্লেষ্মাপ্রধান ব্যক্তিত্ব। অবৈজ্ঞানিক বলে এসব শ্রেণী বিভাগ আজকাল পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু তবুও আয়ুর্বেদশাস্ত্রে এটাকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে প্রাচীন আয়ুর্বেদে উল্লেখ আছে। জার্মান মনোচিকিৎসক ক্রেসমার মনে করেন, মানুষের মেজাজের সাথে শারীরিক গঠনের একটি সম্পর্ক আছে। তিনি শরীরের গঠনকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করেন। খাটো, গোলগাল, মেদবহুল ও মোটাসোটা দেহকে বলেছেন পিকনিক। পিকনিক শ্রেণীর ব্যক্তিরা সাইক্লায়েড মেজাজের হয় অর্থাৎ তারা কখনও বিষন্নতা এবং কখনো অতি উল্লসিতভাবে থাকে। শেলডন নামে আরেকজন খ্যাতনামা গবেষক ১৯৪০ সালের দিকে শরীরের গড়নের সাথে ব্যক্তিত্বের গুণাবলির সম্পর্ক আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। তিনি শারীরিক গঠনকে তিন ভাগে ভাগ করেন- গোলগাল, মেদবহুল ও নরম শরীরকে তিনি এনডোমরফি; অতঃপর শেলডন ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন গুণাবলিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন আরামপ্রিয়, ভোজনবিলাসী, পরনির্ভরশীল ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রত্যাশাকে তিনি ভিসেরোটনীয় নামে আখ্যায়িত করেন। পরিশেষে শেলডন বহুসংখ্যক মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর পর্যবেক্ষণ করে উল্লিখিত তিনটি গুণাবলির সাথে তিন ধরনের শারীরিক গঠনের সম্পর্ক খুঁজে পান। যেমন- এনডোমরফির সাথে ভিসেরোনিয়া, মেসোমরফীর সাথে সোমাটোনিয়া এবং এনটোমরফির সাথে সেরেব্রোটনিয়ার সম্পর্ক। মনস্তাত্ত্বিক প্রকারভেদতত্ত্ব ক. কার্ল ইয়ুংয়ের তত্ত্ব : সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং মানসিক গুণাবলির ভিত্তিতে ব্যক্তিত্বকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন; অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব (Introvert) : এরা একা ও আলাদা থাকতে পছন্দ করে, কিন্তু চিন্তাশীল ও সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী হয়। এ ধরনের ব্যক্তিরা তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে বদ্ধপরিকর। তারা সাহিত্য, শিল্পকর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব (Extrovert): এ ধরনের লোকেরা বাইরের জগতের নানাবিধ কাজকর্মের সাথে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। তারা অন্যের কাজকর্ম করে দিতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে। এরা ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, সমাজসেবা, রাজনীতি, বিদেশ সফর প্রভৃতি কাজে উৎসাহ বোধ করে থাকে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা ইয়ুংয়ের মতামতকে সমালোচনা করেছেন। তারা বলেন, মাত্র দু’টি শ্রেণীতে ব্যক্তিত্বকে ভাগ করা ঠিক হবে না। কেননা অনেক লোক অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের মধ্যবর্তী পর্যায়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ লোক মাঝামাঝি পর্যায়ে পড়ে; তারা সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী নয়, আবার বহির্মুখীও নয় এবং তাদের ব্যক্তিত্বকে উভয়মুখী (Ambivert personality) বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী আইজেঙ্ক (Eysenk-1947) তার গবেষণায় ইয়ুংয়ের ব্যক্তিত্বতত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখেছেন। তিনি বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিত্বের তিনটি মৌলিক সংরক্ষণের (Trait) সন্ধান পান। সেগুলো হলো- অন্তর্মুখিতা বহির্মুখিতা (Introvert Extrovert) সাইকসিস প্রবণতা (Psychoticism) ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে মনোচিকিৎসক সিগমান্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) বিলেতে হাজার হাজার মনোবিকৃত রোগীর জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করে ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্বন্ধে কতগুলো ধারণা তৈরি করে যে মতবাদ প্রবর্তন করেছেন সেটাই হলো মনোসমীক্ষণতত্ত্ব (Psychoanalytic theory)। ফ্রয়েডের তত্ত্বটি হলো- ব্যক্তিত্বের গড়ন (Personality structure) : ফ্রয়েড মনে করেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব তিনটি সত্তায় বিভক্ত এবং এগুলোর তিনি নাম দিয়েছেন আদিম সত্তা বা পশুত্ব (Id), বাস্তবতা বা আমিত্ব (Ego) ও মানবতা বা নৈতিকতা (Super-ego) এভাবে। তার মতে, এ তিন সত্তার মাধ্যমেই মানুষের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এগুলো আগের অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে, তবুও নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো- পশুত্ব বা আদিম সত্তা (Id) : এটা হলো সম্পূর্ণভাবে অবচেতন মনে এবং মানুষের জন্মগত জৈবিক সত্তা, সমস্ত আদিম কামনা ও বাসনার আধার। তাৎক্ষণিক সুখ ভোগ তার কাম্য (Immediate gratification) এবং কোনো প্রকার যুক্তি, বিচার, বুদ্ধি বা নৈতিকতার ধার সে ধারে না। সে সুখভোগের নীতি (Pleasure principle) মেনে চলে। আদিম সত্তা (Id) বা পশুত্ব হলো ব্যক্তিত্বের একটি প্রাথমিক সত্তা। এই সত্তাটি মানসিক শক্তির (Psychic energy) আধার। শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে শুধু একটি আদিম সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং তখন তার জৈবিক প্রেষণাগুলো (Biological motives) চরিতার্থ হলেই সে খুশি হয়। আমিত্ব বা বাস্তবতা (Ego) : শিশু বড় হতে থাকলে তার আদিম সত্তার সাথে যোগ দেয় আমিত্ব (Ego) ও নৈতিকতা (Super-ego)। সন্ত্রাসী, মাস্তান এ প্রকৃতির লোকদের বেলায় পশুত্ব বা আদিম সত্তা (ওফ) অন্য দু’টির চেয়ে বেশি থাকে। আমিত্ব (Ego) হলো ব্যক্তির একটি বাস্তব সত্তা। সে বাস্তবের সাথে আদিম সত্তার (Id) যোগাযোগ রক্ষা করে। তাই আমিত্ব কিছুটা চেতন এবং কিছুটা অবচেতন। প্রকৃতপক্ষে এই সত্তাটি বাস্তবের নীতি (Reality principle) অনুসরণ করে। আমিত্ব মানুষকে সামাজিক উপায়ে, বাস্তবসম্মত উপায়ে তার প্রেষণাগুলোকে (Motives) পূরণ করার জন্য প্রেরণা দেয়। স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে ব্যক্তির আমিত্বের সীমানা (Ego boundary) নষ্ট হয়ে যায়। নৈতিকতা (Super-ego) : নৈতিকতা বা মানবতা (Super-ego) হলো ব্যক্তিত্বের নৈতিক হাতিয়ার। এই সত্তা বাস্তব অপেক্ষা আদর্শের প্রতি জোর দিয়ে থাকে। এর প্রধান কাজ ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিধান মেনে চলার প্রেরণা দেয়া। সামাজিক ন্যায়নীতির ভিত্তিতে এটি ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে নৈতিকতা সৃষ্টি হয় সমাজের নিয়মকানুনের আত্তীকরণ থেকে। সমাজের শাস্তি এড়ানোর জন্য শিশু যখন সমাজের বিধিনিষেধকে নিজের বলে গ্রহণ করতে শেখে তখনই জন্ম হয় তার নৈতিকতা বা মানবতা। নবজাতক শিশুর সবটুকুই পশুত্ব বা আদিম সত্তা (Id), তারপর যতই বয়স বাড়তে থাকে তার আমিত্ব (Ego) বোধ জাগ্রত হতে থাকে। তার বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হতে থাকে এবং আদিম কামনা-বাসনা বাস্তবসম্মত উপায়ে চরিতার্থ করার উপায় সে অনুসন্ধান করতে থাকে। অতঃপর নৈতিকতা বা মানবতা (Super-ego) জন্ম নেয়। মাতাপিতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, স্কুলের শিক্ষক সবাই তাকে সমাজের ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায়, ধর্মীয় বিধিনিষেধ প্রভৃতি সম্বন্ধে যেমনটি শেখান, ঠিক তেমনিভাবে গড়ে উঠে শিশুর নৈতিকতা। উল্লেখিত তিনটি সত্তার পৃথকীকরণের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিত্বের বিকাশের ধারা চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আমিত্ব বা বাস্তবতার (Ego) দায়িত্বই বেশি। এক দিকে সে আদিম প্রবৃত্তি ও বাস্তবতার মধ্যে আপস ঘটায়, আবার অপর দিকে নৈতিকতা বা মানবতার (Super-ego) শাসনও তাকে মেনে চলতে হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাই আমিত্ব বা বাস্তবতাকে নানাবিধ মানসিক প্রতিরক্ষামূলক পদ্ধতির (Ego defence mechanism) আশ্রয় নিতে হয়। এগুলো পরবর্তী অনুচ্ছেদে দুশ্চিন্তা প্রতিরোধে মনের প্রভাব শিরোনামে আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তিত্বের গতিশীলতা (Personality dynamics) ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণের আরেকটি ধারণা হলো, আমাদের বেশির ভাগ প্রেষণা ও চিন্তা আমাদের মনে অবচেতন স্তরে লুকায়িত থাকে, যাদের সম্পর্কে আমরা সজাগ থাকি না এবং ওইগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি এখানে তিনটি অবস্থার কথা বলেছেন- চেতনা (Concious),প্রাক-চেতনা (Pre-concious), মনের চেতন অংশটির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা অবহিত। সাধারণ অবস্থায় মনের প্রাক-চেতন অংশটির প্রক্রিয়া আমাদের অজানা, তবে চেষ্টা করলে তাকে চেতন অবস্থায় আনা সম্ভব। অবচেতন মনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। আমাদের সচেতন মনের আচরণ ও চিন্তাধারার উপর অবচেতন মনের অংশের প্রভাব সীমাহীন। ফ্রয়েড বলেন, যখন আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের জন্য বেদনাদায়ক বা উদ্বিগ্নকারক হয় তখন সেগুলোকে আমরা আমাদের মনের অবচেতন স্তরে ঠেলে দিই বা অবদমন করি। তিনি মনে করেন চেতন, প্রাক-চেতন ও অবচেতন মনের মধ্যে রূপায়িত হয় আমাদের সত্তা, চিন্তা, কামনা, বাসনা, উদ্বেগ, দ্বন্দ্ব প্রভৃতি অনুভূতি। এক কথায় ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্ব বিকাশে মনোযৌন স্তর (Psycho sexual stage of development) ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন, একজন শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় বা ধাপকে তিনি নিম্নে বর্ণিত স্তরে ব্যাখ্যা করেছেন (মানব মন ও আচরণে লিবিডোর ক্রমবিকাশ অধ্যায়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হয়েছে)। এটাকে শৈশব যৌনতা মতবাদও ভুলে থাকে। স্তরগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো- মৌখিক বা মুখকাম স্তর (Oral stage) শিশুর জন্মের পর থেকে এক বছর বয়স পর্যন্ত এই ধাপটি সীমিত। ফ্রয়েডের মতে, এই সময়ে শিশুর কামপ্রেষণা তার ঠোঁটে ও মুখে সীমাবদ্ধ থাকে। এই পর্যায়ে সে তার মায়ের বুকের দুধ চুষতে আনন্দ পায়। তারপর যখন তার দাঁত ওঠে তখন কামড়াতে বা চিবাতে সে আনন্দ পায়। ফ্রয়েড মনে করেন যে স্তন্যপান ও চর্বনক্রিয়ায় শিশুরা যে আনন্দ পায় সেটাই কামতৃপ্তির নামান্তর। তার মতে, প্রথম বছরে যদি শিশুর স্তন্যপানস্পৃহা পরিতৃপ্ত লাভ করে, তাহলে শিশু ভবিষ্যৎ জীবনে আশাবাদী হয়। কিন্তু শিশুর মুখকামিতা ব্যাহত হলে পরবর্তী কালে বক্রোক্তি, ব্যঙ্গোক্তি, অন্যকে আঘাত দিয়ে কথা বলা, আক্রমণাত্মক কথা বলা, তর্ক করা, বাঁশি বাজানো, সিগারেট ও মাদকাসক্তি প্রভৃতির প্রবণতা জেগে উঠতে পারে। আঙুল চোষা ও দাঁত দিয়ে নখকাটা অভ্যাসের ব্যাখ্যাও এভাবে দিয়ে থাকে অর্থাৎ মৌখিক স্থায়ীকরণের ফলে এগুলো হতে পারে বলে ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন। পায়ু বা পায়ুকাম স্তর (Anal stage): এক থেকে তিন বছর বয়সে শিশুর পায়ু অঞ্চল খুব সংবেদনশীল থাকে এবং সে মলত্যাগ করে কামতৃপ্তি লাভ করে। মাতা-পিতা এ সময়ে শিশুকে যথাস্থানে পায়খানা প্রস্রাব করার প্রশিক্ষণ দেয়। ফ্রয়েডের মতে, মলত্যাগের প্রশিক্ষণের উপর ভিত্তি করে শিশুর পরবর্তী জীবনের মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। মা যদি প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অনমনীয় হয় তবে শিশু মলত্যাগ না করে একে ধরে রেখে কোষ্ঠবদ্ধ করে কামতৃপ্তির বিকল্প পথ বেছে নেয়। পরবর্তী জীবনে সে কৃপণতা, একগুঁয়েমি, শুচিবাই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রভৃতি স্বভাব অর্জন করে বলে ফ্রয়েড মনে করেন। লৈঙ্গিক বা লিঙ্গকাম পর্যায় (Phallic stage) : তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে এই স্তর সীমাবদ্ধ। এটাকে আত্মরতি স্তরও বলা হয়। কেননা শিশু তার নিজের যৌনাঙ্গের মধ্যে কাম তৃপ্তির উৎস আবিষ্কার করে। এই পর্যায়ে ফ্রয়েড গ্রিক পুরাণে উল্লিখিত দু’টি ঘটনাকে এখানে সংযোজন করেছেন, তা হলো ইডিপাস কমপ্লেক্র ও ইলেকট্রা কমপ্লেক্র। প্রথমটি ছেলেদের বেলায় এবং দ্বিতীয়টি মেয়েদের হয়ে থাকে বলে ফ্রয়েড মনে করেন। তাছাড়াও ফ্রয়েড বলেছেন- আরও দু’টি ঘটনা, যেমন- লিঙ্গচ্ছেদন আশঙ্কা ও পুরুষাঙ্গ হিংসা, প্রথমটি ছেলেদের বেলায় এবং দ্বিতীয়টি মেয়েদের বেলায় হয়ে থাকে। এই তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের স্তরে সাধারণত ছেলেরা মায়ের প্রতি এবং মেয়েরা বাবার প্রতি স্বাভাবিক মনো আকৃষ্ট থাকে। কোনো কারণে যদি মাতাপিতাকে যথাক্রমে ছেলেমেয়েরা কাছে পেল না অথবা তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক থেকে ব্যর্থ হলো তাহলে পরবর্তীকালে ছেলেমেয়েদের নানাবিধ মনোযৌন সমস্যা হতে পারে বলে ফ্রয়েড মনে করেন। সুপ্তকাল (Latency period) : ছয় বছর থেকে যৌবনপ্রাপ্তির বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে কাম প্রবৃত্তির কোনোরকম লক্ষণ দেখা যায় না। তাই এই সময়কে সুপ্তিকাল বলা হয়। এ সময় সে শুধু পরিবেশকে জানতে চায়। যৌবনাগমন (Genital stage) : তেরো বছর থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত এই পর্যায়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কামানুভূতি সৃষ্টি হয়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয় বলে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা জাগে। এই কনসেপ্ট থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফ্রয়েডের ধারণার মূল্যায়ন ফ্রয়েডকে অনেকেই এই বলে সমালোচনা করেছেন, তিনি ব্যক্তিত্বের বিকাশে ও সমগ্রভাবে ব্যক্তির আচরণে কামশক্তির প্রভাব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন। বিশেষ করে নবজাতক শিশুর কামশক্তির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক পন্ডিত ফ্রয়েডকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এই বলে যে, তিনি ব্যক্তিত্বের বিকাশে আদিম কামনার প্রভাব বা জৈবিক তাগিদগুলোর প্রভাবকেই সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছেন। কিন্তু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাবকে একেবারেই উপেক্ষা করেছেন। ফ্রয়েডের তত্ত্বে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মনোবিজ্ঞানে ও চিকিৎসাশাস্ত্রে এই তত্ত্বের প্রভাব অপরিসীম। তার তত্ত্বের কোনো কোনো ধারণা সমকালীন, মনোবিজ্ঞানীরা ও মনোচিকিৎসাবিদেরা সাদরে গ্রহণ করেছেন। ডা. শাহজাদা সেলিম এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম) এমএসিই (ইউএসএ) হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার ১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা সূত্র : দি রিপোর্ট.  কম

মিশেল ওবামার দুই সন্তানের জন্ম হয়েছে আইভিএফ বা টেস্ট টিউব...

Michelle Obama reveals daughters were conceived by IVF

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিকামিং’প্রকাশ পেলো। মিশেল ওবামার দুই সন্তানের জন্ম হয়েছে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) বা টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে। Former First Lady Michelle Obama has released a memoir in which she reveals difficulties about her marriage and pregnancy with her two daughters. https://twitter.com/twitter/statuses/1060875880363307009 এটি মিশেলের দ্বিতীয় বই। এর আগে ২০১২ সালে তাঁর প্রথম বই ‘আমেরিকান গ্রোন’ প্রকাশিত হয়। এতে হোয়াইট হাউসে তাঁর করা সবজির বাগান সম্পর্ক লিখেছেন এবং স্বাস্থ্যকর জীবন সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে উৎসাহ জোগাতে প্রচার চালান। প্রকাশনী সংস্থা পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বইটি বিভিন্ন দেশে প্রচারে অংশ নেবেন। বইটি ২৪টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। বইটির মাধ্যমে পাঠককে তাঁর ভুবনে স্বাগত জানানো হয়েছে। জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা তাঁকে পূর্ণতা দিয়েছে, এর বিবরণ আছে বইয়ে। শৈশব থেকে শিকাগোর সাউথ সাইডে তাঁর কর্মজীবন, মাতৃত্ব ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা, বিশ্বের বিখ্যাত সব স্থানে তাঁর সময় কাটানোর বিষয়গুলো বইয়ে উঠে এসেছে। বইটি প্রকাশের সময় বারাক ওবামা বইটির ১০ লাখ কপি ওবামার পরিবারের নামে তৈরি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে দান করার পরিকল্পনা করেছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শিশুদের জন্য শিক্ষায় সমসুযোগ নিশ্চিত করতে নতুন বই, শিক্ষা উপকরণ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সরবরাহ করে থাকে। একই প্রকাশনা থেকে বারাক ওবামাও একটি আত্মজীবনীমূলক বই লিখছেন। এ বছরেই বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা।

রেড বার্ডস: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের এক জ্বলন্ত চিত্র

রেড বার্ডস: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসনের এক জ্বলন্ত চিত্র

 রিফাত মুনিম
dhaka lit fest logo
মোহাম্মাদ হানিফের তৃতীয় উপন্যাস, “রেড বার্ডস” এর পটভূমি হল চারিদিকে বিশাল মরুভূমি ঘেরা এক শরনার্থী শিবির। জায়গা ও মরুভূমির কোনো নাম উপন্যাসে উল্লেখ করা হয় নি। তবে পাঠকের বুঝতে কষ্ট হয় না যে এটি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ। হয়তো বালির এই সমুদ্রটি আফগানিস্তান বা ইরাক। তবে একটি বিষয় পুরোপুরি নিশ্চিত যে জায়গাটি মার্কিন বিমানের বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত, চারিদিক বাড়িঘরের ভাঙা টুকরোয় লণ্ডভণ্ড; আর শিশু থেকে বৃদ্ধ- কেউই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। খালেদ হুসাইনির “এ থাউজ্যান্ড স্প্লেনডিড সান্স” এর পটভূমি ছিল আফগানিস্তানে, বিশেষত কাবুলে। হানিফের উপন্যাসটি পড়ে এরকম নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, তবে এটা ছাড়াও আরো গভীর পার্থক্য রয়েছে। হুসাইনির গল্পতে বিভিন্নরূপেই প্রমাণিত হয় যে এটা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের এক অফিসিয়াল বর্ণনা। গীতিময় অলঙ্কারে এক গদ্য তিনি গেঁথেছেন যেখানে দেখা যায় মরিয়ম ও লায়লা চরিত্র দু’টি তাদের নির্যাতনকারী স্বামীর হাত থেকে পালানোর পরিকল্পনা করে যা তালেবানদের উত্থানের কারণে বাঁধাগ্রস্ত হয়। “দ্য কাইট রানার” উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত পাঠকরা সহজেই এর পরের ঘটনাবলি আঁচ করতে পারবেন: নারীদের প্রহার করা, নির্যাতন করা এবং অবস্থা সবচেয়ে করুণ হয় যখন তালেবানদের দ্বারা ওই নারীদেরকে জনসম্মুখে হত্যা করা হয়। হ্যাঁ, তারা অবশেষে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বারা নিরাপত্তা পেয়েছে এবং আফগানরাও তাদের শহরে ফিরে এসেছে যেখানে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে রিচার্ড অ্যাটেনবরো’র সিনেমা ‘গান্ধী’ (১৯৮২) সম্পর্কে সালমান রুশদীর তীব্র সমালোচনার প্রসঙ্গ এনে বলা যায়, এটা সত্য আর রাজনৈতিক গভীরতার ফাঁদে পড়া ভুলের মাশুল। অন্য দিকে, হানিফ আমাদেরকে এমন এক গল্প উপহার দেন যা মার্কিন আগ্রাসনের কাহিনীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখে। শৈলীর আমেজ বাদ দিয়ে তিনি দিয়েছেন এক তীব্র বর্ণনা, যা পুড়িয়ে দেয়, যা দহন করে; ঠিক যেন মরুভূমির খরতাপ আর মার্কিন ফাইটার জেটের বোমার ভয়ঙ্কর আগুনের মতো। তবে প্রজ্ঞা, আয়রনি, অ্যাবাসার্ডিটির অসাধারণ মিশেল তিনি ঘটিয়েছেন যা দার্শনিক প্রশ্ন উদ্রেক করে, মার্কিন অর্থ দেওয়া যুদ্ধ ও এই সম্পর্কিত যুদ্ধ-অর্থনীতিকে অনবদ্যভাবে বিদ্রুপ করে। মূল উত্তেজনা তৈরি হয় যখন মোমোর বড় ভাই আলি উধাও হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের সঙ্গে আলি কাজ করতো, কয়েকমাস পরে  রহস্যজনকভাবে তার বয়সী অনেকের মতো সেও উধাও হয়ে যায়। না খেতে পেয়ে এল্লি যখন প্রায় মৃত অবস্থায় তখন তাকে পাওয়া যায়। যে ক্যাম্পে এল্লির বোমা মারার কথা ছিল সেখান থেকে মোমো তাকে ড্রাইভ করে নিয়ে আসে। গল্পে ইউএসএইড এর একজন পরামর্শকও থাকে যাকে “মঙ্গলকারী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী অথবা যুদ্ধের সময়কার মুসলিম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি একটি বই লিখছেন। এই ধরণের বিচিত্র আয়রনি ছাড়াও, উপন্যাস জুড়ে রয়েছে চিন্তা, আবেগ, অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ যা পড়ে আমি বারবার শব্দ করে হেসে উঠছিলাম যেমনটা হাসি পেয়েছিল হানিফ কুরেইশির “দ্য বুদ্ধ অফ সাবার্বিয়া” অথবা ফিলিপ রথের “পোর্টনইয়’স কমপ্লেইন্ট” পড়ার সময়। একই সাথে, মার্কিন মদদপুষ্ট যুদ্ধে একজন আরব অথবা আফগান মা অথবা ভাইয়ের হারানোর বেদনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার হাস্যকর কাজকর্ম এবং মার্কিন সৈনিক ও সাহায্য সংস্থার কর্মীদের মানবিক দিকগুলোও সম্পর্কেও আমাকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। দার্শনিক অনুসন্ধান ও অনবদ্য সাহিত্যিক দক্ষতার সঙ্গে বইটি দিতে পেরেছে অসাধারণ বিদ্রুপও।

ভারত থেকে সরকারী বই আমদানি প্রথম চালান বাংলাদেশে

ভারত থেকে দেশে আসলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫ লাখ বই

যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫ লাখ বই আমদানি করলো ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেকস বুক। নিদিষ্ট চুক্তিতে ভারতে ছাপানো বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বইয়ের মধ্যে প্রথম একটি চালানে প্রায় ২৫ লাখ বই বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে। [caption id="attachment_23404" align="alignleft" width="1000"] ছবিঃ বকুল মাহমুদ[/caption] বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে ২৫টি ট্রাকে এসব বই বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। বন্দরের ০২ নাম্বার পণ্যগারে আমদানিকৃত বই ভারতীয় ট্রাক থেকে আনলোড করে রাখা হয়েছে। বেনাপোল বন্দরের ২ নাম্বার পণ্যগারের ইনচার্জ (ওয়ার হাউজ সুপারেন্ডেন্ট) মোঃ রুহুল আমিন জানান, বইয়ের আমদানি কারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেকস বুক। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারতের কৃষ্ণা ট্রেডার্স। বাইয়ের আমদানি মুল্য ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৫শ ইউএস ডলার। বেইয়ের ওজন ৫০৮ মেঃটন ৩০২ কেজি। মেনিফেষ্ট নাম্বার৩৯৩৬১,তাং-৩১/১০/১৮। ১৩ হাজার ২৫০ বান্ডেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আনুমানিক ২৫ লাখ বই আমদানি করা হয়েছে। বই সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত বেনাপোলের ভৈরব ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির সত্ত্বাধিকারী আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, ভারত থেকে এখনও বই আমদানি হবে। যে সব বই ইতিমধ্যে আমদানি হয়েছে শনিবার (০৩ নভেম্বর) থেকে তা বন্দর থেকে খালাস করা শুরু হবে । খালাসের পর বই নিয়ে ট্রাক যাতে দ্রুত গন্তব্যে পৌছাতে পারে তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে বলে ও জানান তিনি। এদিকে বই খালাসের কাজে নিয়েজিত বন্দরের হ্যান্ডলিংক শ্রমিকরা বলেন, প্রতিবছর এসময় ভারত থেকে সরকারী বই আমদানি হয়ে থাকে। তাদের ছেলে মেয়েরা এসব বই পড়বেন এজন্য তারা আনন্দের সাথে খালাস করে থাকেন। ১ জানুয়ারিতে বই উৎসবে মাতবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী। এদিন সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হবে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ বর্তমান সরকারের একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। । পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে নোটবই কিনতেও তাদের বাধ্য করা হতো। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ সেই অবস্থার অবসান ঘটিয়েছে। প্রাথমিকের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সরকার শিক্ষাকে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। পরিণতিতে শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দারিদ্র্যমুক্তিও ঘটছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণসহ শিক্ষা খাতে বাজেটের এক উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ যে জাতির জন্য সত্যিকার অর্থেই লাভজনক তা বাস্তবতার নিরিখেই প্রমাণিত হয়েছে। সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সাড়ে চার কোটি ছাত্রছাত্রীকে গত বছর বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ কপি বই বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিনেই যাতে বই হাতে পায় তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি স্কুলে বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সুশিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিনামূল্যে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই বিতরণ ও নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার যে পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে তা বিশ্ব সমাজেরও প্রশংসা অর্জন করেছে। তবে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় সরকার কতটা সফল তা সংশয়ের ঊর্ধ্বে নয়। শিক্ষক নিয়োগে নিয়োগ বাণিজ্যের অবসান এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার পরিবেশ নিষ্কণ্টক করতে সরকারকে যত্নবান হতে হবে। সে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে নানামুখী কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নিয়েও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা আশা করব নিজেদের সুনামের স্বার্থেই শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া হবে। প্রেরক: এম ওসমান, বেনাপোল প্রতিনিধি

যুক্তরা‌জ্যে বাংলা‌দেশি বিজ্ঞানীর ব্যাক‌টে‌রিয়া নির্ণায়ক আবিস্কার

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. প্রদীপ সরকারসহ ৬ জনের একটি গবেষণা দল এক ধরণের এক‌টিভ প‌লিমার হাই‌ড্রে‌জেল তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে অল্প খরচে সঠিকভাবে ব্যাকটেরিয়া ইনফেকশন পরীক্ষা করা সম্ভব। ফলে চিকিৎসকরা দ্রুততম সময়ে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে পারবেন। তাদের এই আবিস্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রফেসর ষ্টিভ রিমারের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩ বছরের বেশী সময় ধরে নিরলস প্রচেষ্টায় এই আবিস্কার সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি ১০ হাজার পাউন্ড অনুদান দিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে এই প্রযুক্তি প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করা হবে। পরে এটি ক্লিনিক্যাল টেস্টের জন্য পাঠানো হবে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. প্রদীপ সরকার এই গবেষক দলের লিড সাইন্টিটিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। বিশ্বখ্যাত ৫টিরও বেশী জার্নালে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। ড. প্রদীপ সরকার বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার বারইহুদা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ড. প্রদীপ সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়নে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভের পর পরমাণু শক্তি কমিশনে বিজ্ঞানী হিসাবে তার প্রথম কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের সেফিলড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭ বছর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে ড. প্রদীপ সরকার যুক্তরাজ্যে একটি বা‌য়ো‌টেক কোম্পানীর সহ প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সাংবা‌দিক‌দের সা‌থে আলাপকা‌লে প্রদীপ সরকার ব‌লে‌ছেন, ‘সু‌যোগ পে‌লে তি‌নি বাংলা‌দে‌শের জন্য কাজ কর‌তে চান। দে‌শের জন্য কা‌জে লাগা‌তে চান তার গ‌বেষনালব্ধ অর্জন’।

লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

লস এঞ্জেলেসে জেসমিন খান ফাউন্ডেশনের শুভ সূচনাঃ

ভিডিও রিপোর্ট

  Posted by Kheiruz Zaman on Friday, October 12, 2018
On the inauguration event of ‘Jasmin Khan Foundation’ on 10-12-2018 in its office at Clover Road, Pacoima, CA. Posted by Majib Siddiquee on Friday, October 12, 2018

সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি

দেশের স্বনামধন্য একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন আলাউদ্দিন মিয়া (ছদ্মনাম)। হেলপার হিসেবে যোগদানের পর তিনি টানা ১২ বছর কাজ করেছেন একটি কারখানায়। এ সময় তিনি কোনো ছুটি ভোগ করেননি। প্রতিদান হিসেবে কোম্পানি তাকে প্রতি বছর পুরস্কৃত করেছে।
আইনত প্রাপ্য ছুটি ভোগ না করার এমন উদাহরণ পোশাক শিল্পে অনেক। কারখানায় নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করাই এ খাতে স্বাভাবিক বিষয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পোশাক খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই দৈনিক নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার বেশি সময় কারখানায় কাজ করেন। বিনিময়ে তারা পান বেতনের অতিরিক্ত অর্থ। ছুটি না নেয়া ও অতিরিক্ত কাজ করা পোশাক কারখানায় স্বাভাবিক হলেও খাতসংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় কমপ্লায়েন্স চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। পণ্য জাহাজীকরণের জন্য স্বল্প সময় পাওয়া ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে তারা জানান। দেশের পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্স নিয়ে এক সমীক্ষায় খাতটির এসব চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতার দিক উঠে এসেছে। ‘রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ: এ স্টাডি অন সোস্যাল কমপ্লায়েন্স’ শীর্ষক সমীক্ষাটি করেছেন এ খাতেরই অন্যতম প্রতিষ্ঠান ব্যাবিলন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান। পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকের পরিচালিত সমীক্ষায় খাতটির অন্দরমহলের কর্মী-ব্যবস্থাপকদের তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞ মতামত ও বিশ্লেষণ। বই আকারে প্রকাশিত সমীক্ষাটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে গতকাল। ২০১৫ সালে পরিচালিত মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, কর্মঘণ্টার বিষয়টি পোশাক শিল্পের বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এ খাতের ৯৬ শতাংশ কর্মীই নির্ধারিত সময়ের পরও কারখানায় কাজ করেন। ৬২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। ২৩ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন ১০ ঘণ্টা। ১২ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করেন। যদিও শ্রম আইনের ১০২ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কোনো অবস্থাতেই সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকের কাজের সন্তুষ্টি ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধিই সামাজিক কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে কারখানায় প্রতিফলিত হয়। জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত বিষয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা অনেক বেশি। ব্যবসা ও রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটলেও শ্রম ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে অসন্তোষ রয়ে গেছে। জরিপে উত্তরদাতাদের সবাই বলেছেন, ৮ ঘণ্টা কাজের মজুরি জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট নয়। মজুরি কম হওয়ায় তারা অতিরিক্ত কাজ করতে আগ্রহী থাকেন। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো নির্ধারিত মজুরিতে মেটানো সম্ভব নয় বলে তারা উল্লেখ করেন। তবে অতিরিক্ত সময়ের কাজ বা ওভারটাইমের জন্য আইনত প্রাপ্য পারিশ্রমিক পোশাক শ্রমিকরা পান না। দেখা গেছে, ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। বড় কারখানাগুলো অতিরিক্ত সময়ের কাজের জন্য আইনত নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী ভাতা দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে উত্তরদাতা শ্রমিকদের ২২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ওভারটাইমের জন্য আইন অনুযায়ী দ্বিগুণ পরিমাণ ভাতা পান না। কারখানাপ্রধানদের কাছে অতিরিক্ত সময় কাজের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেছেন, মূলত দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা ও রফতানির জন্য প্রাপ্ত সময়স্বল্পতার অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হয় শ্রমিকদের। শ্রমিকের অতিরিক্ত কাজের কারণ সম্পর্কে পোশাক কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপক ও কারখানাপ্রধানরা সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও পণ্য জাহাজীকরণের জন্য লিড টাইমের স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন। তাদের ২১ শতাংশ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের মূল কারণ দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা। ২০ শতাংশ বলেছেন, শর্ট লিড টাইম বা রফতানির জন্য বেঁধে দেয়া নির্ধারিত স্বল্প সময় অতিরিক্ত কাজের কারণ। ১৯ শতাংশ ব্যবস্থাপক শ্রমিকের অদক্ষতাকেই নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজের কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। ১৭ শতাংশ বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এছাড়া পণ্যের নকশা পরিবর্তন ও বিভিন্ন উপকরণ অনুমোদন-সংক্রান্ত কারণে শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় বলে জানিয়েছেন যথাক্রমে ১০ ও ১৫ শতাংশ উত্তরদাতা। সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার বিষয়ে ব্যবস্থাপকরা জানান, বিভিন্ন ক্রেতার নিজস্ব শর্ত ও চাহিদা থাকে। যেমন একেকটি শার্ট তৈরিতে ছোট-বড় প্রায় ২০টি উপকরণ প্রয়োজন হয়। এসব উপকরণের জন্য কমপক্ষে ২০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এভাবে পাঁচটি অর্ডার থাকলে একটি কারখানাকে একই সময়ে ১০০ সরবরাহকারকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে সমীক্ষা পরিচালনাকারী মোহাম্মদ হাসান বলেন, পোশাক শিল্পের কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। যেমন— যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর সিকিউরিটি কমপ্লায়েন্স যুক্ত হয়, রানা প্লাজার পর যুক্ত হয়েছে ভবন ও অগ্নিসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কারখানায় সামাজিক কমপ্লায়েন্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শ্রমঘণ্টা। আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী একজন কর্মী বছরে ৩৫ দিন বিভিন্ন ছুটি ভোগ করার অধিকার রাখেন। তবে ৯৫ শতাংশ কর্মী আমাদের বলেছেন, তারা এ ছুটিগুলো পান না। কারণ উৎপাদনের চাপ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা থাকে। মোহাম্মদ হাসান বলেন, আইনেই এমন ধারা আছে, যার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের ছুটি না নিতে প্রণোদিত করা হচ্ছে। ছুটির পরিবর্তে শ্রমিককে টাকা নিতে আগ্রহী করা হচ্ছে। এছাড়া নানা রকমের বাধা-বিপত্তির কারণেও শ্রমিকরা ছুটি নিতে পারেন না। আমি দেখেছি, যিনি ছুটি নেন না তাকে পুরস্কৃত করা হয়। পোশাক কারখানায় প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা কম বলে সমীক্ষার সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য বিকল্প হিসেবে অংশগ্রহণমূলক কমিটির কার্যকারিতা বৃদ্ধির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিও পোশাক শিল্পের সামাজিক কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্থা, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপানো হয়েছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং নিপসমের মতো সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে প্রকাশনায়। শ্রমিকদের ঘন ঘন কারখানা বদল ঠেকাতে সার্ভিস বুক কার্যকর করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি রেডিওর ব্যবহার করতে সুপারিশ করা হয়েছে শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে। বিদেশী কর্মীর আধিক্য কমাতে স্থানীয়দের দক্ষতা উন্নয়নের পরামর্শ উঠে এসেছে সমীক্ষার ফলাফলে। সামাজিক কমপ্লায়েন্স রক্ষণাবেক্ষণে একটি সমন্বিত মানদণ্ড তৈরির তাগিদও দেয়া হয়েছে এতে। ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কারখানাগুলোতে যেসব অঞ্চলের শ্রমিক বেশি, সে জেলাগুলোয় কারখানা স্থাপনের পরামর্শও দেয়া হয়েছে প্রকাশিত সমীক্ষায়।

বর্ণবাদ

বর্ণবাদ

মোঃ রফিকুল ইসলাম
বর্ণবাদ হচ্ছে এমন একটি বিশ্বাস যাতে এক বর্ণের লোকজন নিজেদেরকে অন্য বর্ণের লোকজনদের থেকে উচ্চতর বা অভিজাত মনে করে। ফলে তারা অন্য বর্ণের লোকজনদের উপর বৈষম্য বা শত্রুতামূলক আচরণ করে। তবে জাতিসংঘ বর্ণবাদ শব্দটির পরিবর্তে বর্ণ বৈষম্যকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হিসেবে সজ্ঞায়িত করেছে। জাতিসংঘের বর্ণ বৈষ্যমেরে সংজ্ঞার মোদ্দা কথা হচ্ছে বর্ণ, গোত্র, জাতি, ভাষা বা ধর্মের কারনে এক জনগোষ্ঠী কর্তৃক অন্য জনগোষ্ঠীর উপর বৈষম্য বা নিপীড়নমূলক আচরন করা। আফ্রিকার কালোদের প্রতি আমেরিকা বা ইউরোপের বৈষম্য বা কালোদের দাস হিসেবে ব্যবহার ও ব্যবসা, জার্মানীর হিটলার কর্তৃক ইহুদি নিধন যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ যা এ্যাপার্থেড নামে অভিহিত বা হালের রোহিঙ্গা নিধন ইত্যাদি অসংখ্য বর্ণ বৈষম্যের ঘটনার কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। বর্ণবাদের আরও গোটা কয়েক হালফিল উদাহরণ দেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সেদিন পর্যন্ত কালোদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরন করা হত। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ বিরোধী নাগরিক অধিকার আন্দোলন নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারকে সেন্ট অগাস্টিন, ফ্লোরিডার সাদাদের জন্য নির্ধারিত এক রেস্তোরাঁয় খাবার চেষ্টার জন্য আটক করা হয় এবং তাঁকে এজন্য এক রাত জেলবাসও করতে হয়। ১৯৬৩ সালেই প্রথম ইউনিভার্সিটি অব এ্যালাবামায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। ভিভিয়ান ম্যালোনি ছিলেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কালো গ্রাজুয়েট। অর্থাৎ তখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে কালোদের জন্য আলাদা রেস্তোরাঁ, উপাসনালয় ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় এ্যাপার্থেইড নামের রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদ এইতো সেদিন ১৯৯৩ পর্যন্তও বলবত ছিল। আর আমাদের দেশে বৃটিশ আমলের বর্ণবাদী আচরণের একটা উদাহরণ দিলেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে। সে সময়ে বৃটিশদের ক্লাবের তোরণে নাকি লেখা থাকতো "ডগস এ্যান্ড নেটিভস আর নট এ্যালাউড।" অর্থাৎ দেশীয়রা কুকুরের সমগোত্রীয়।
বর্ণবাদ নির্মূল করতে সারা দুনিয়ার বড় বড় নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু আজতক পৃথিবী থেকে বর্ণবাদ নির্মূল হয়নি। তাই আজও দেখি ফুটবল খেলায় কালো খেলোয়াড়দেরকে ব্যঙ্গ করে কলা দেখানো হয় বানরের উত্তর পুরুষ হিসেবে। সাদা বাবারা তাদের সন্তানদের উপদেশ দেয়, "বর্ণবাদী হইও না, বর্ণবাদ একটি অপরাধ এবং অপরাধ শুধু কালোদের জন্য।" অর্থাৎ সাদারা সব ধোয়া তুলসীপাতা। কখনও কখনও বর্ণবাদকে উসকে দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত বর্ণবাদী নেতারা। এসব বর্ণবাদী নেতাদের জন তুষ্টিমূলক কথা-বার্তা ও কার্যকলাপের জন্য অনুপ্রাণিত হয় সাধারণ মানুষ। তাই তো ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা দুনিয়ায় দেশে দেশে মুসলিম নারী পুরুষ নানারকম নাজেহালের শিকার হয়। মেক্সিকানদের যুৃক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ট্রাম্প সরকার সীমান্তে দেওয়াল তুলে দিচ্ছে। তাতেও ক্ষান্ত নয় ট্রাম্প সরকার। তারা দেওয়ালের খরচও মেক্সিকান সরকারের নিকট থেকে আদায় করতে বদ্ধপরিকর। মেক্সিকানদের উপর মার্কিনীদের ক্ষোভের মাত্রা বুঝাতে এবারে একটা গল্প বলা যাক। এক কালো আফ্রিকান, এক সাদা আমেরিকান ও এক মেক্সিকান বেলুনে আকাশে ভ্রমণ করছে। হঠাৎ করে ফুটো হয়ে যাওয়াতে বেলুনটি দ্রুত নীচে নেমে আসতে লাগলো। সবাই বুঝতে পারলো বেলুনের ওজন কমাতে না পারলে দূর্ঘটনা অনিবার্য। তাই তারা তাদের জিনিসপত্র নীচে ফেলতে লাগলো। কালো আফ্রিকান তার পায়ের জুতা ফেলে দিয়ে বললো, "আমার দেশে এরকম জুতা অনেক আছে।" মেক্সিকান তার ল্যাপটপটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো, "এ আমার দেশে অনেক আছে।" আমেরিকান তার জিনিসপত্র সরিয়ে রেখে মেক্সিকানকে দু'হাতে ধরে বেলুন থেকে ছুঁড়ে নীচে ফেলে দিয়ে বললো, "আমাদের দেশে এ জিনিস অনেক আছে।"বলে হাত ঝেড়ে শান্ত হয়ে বসলো। বর্ণবাদের বিষবাষ্পে নিপীড়িত নিষ্পেষিত নির্যাতিত কালো মানুষেরা কতটুকু ক্ষুব্ধ তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমেরিকার নিউিইয়র্ক শহরের এক উঁচু দালানে এক ভারতীয়, এক সাদা আমেরিকান, এক কালো আফ্রিকান ও এক মেক্সিকান আলাপ করছে। আলোচনার বিষয় কে তার স্বজাতির জন্য কতটুকু আত্মত্যাগ করতে পারে তা করে দেখাতে হবে। ভারতীয় দালানের কানায় গিয়ে আমার জনগনের জন্য বলেই সে দালান থেকে লাফিয়ে পড়লো। পরবর্তীতে মেক্সিকান আমার স্বজাতির উদ্দেশ্য বলে দালান থেকে লাফিয়ে পড়লো। এবারে কালো আফ্রিকানের পালা। সেও দালানের কানায় গেল। এটা আমার প্রিয় জনগনের জন্য বলেই সে সাদা আমেরিকানকে ছাদ থেকে ফেলে দিল। কালো ও ইহুদিদের উপর বর্ণবাদী আচরণ করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সাদারা কালদের অপরাধী ও ইহুদিদের কৃপণ তকমা এটে দিয়েছে। তাইতো কালো ইহুদি শিশু আত্মপরিচয়ের দ্বিধায় পড়ে। যেমনটা পরের ঘটনায় দেখা যায়। এক কালো ইহুদী ছেলে একদিন স্কুল থেকে এসে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে, "বাবা, আমার পরিচয় কালো হিসেব গুরুত্বপূর্ণ নাকি ইহুদী হিসেবে।" বাবা জানতে চাইলেন, "কেন বাছা। তুমি কেন এসব জানতে চাইছো।" ছেলে বললো, "আমাদের স্কুলে একটা ছেলে একটা সাইকেল ৫০ ডলারে বিক্রি করতে চাচ্ছে। এখন আমি ৪০ ডলারে কিনতে তার সাথে দরাদরি করবো নাকি চুরি করবো।" একটা সময় ইহুদিরা বর্ণবাদের শিকার হত। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্ণবাদী হিটলারের জার্মান বাহিনীর নির্দয় ইহুদি নির্মূল ও ব্রিটিশ ও মার্কিনীদের ইহুদি তোষণের ফলে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিদের অবস্থা কেমন ছিল তার একটা আভাস পাওয়া যাবে পরের ঘটনায়। ১৯২৬ সালের শীতকাল। শিকাগোর থেলমা গোল্ডস্টেইন আনন্দ ভ্রমণে ফ্লোরিডা গেছেন। এলাকা সম্পর্কে ধারনা না থাকায় তিনি উত্তর মায়ামির একটি সংরক্ষিত হোটেলে ঢুকে পড়লেন। সে ম্যানেজারকে বললো, "আমার নাম মিস গোল্ডস্টেইন এবং আমার দু'সপ্তাহের জন্য ছোট্ট একটা রুম প্রয়োজন।" "আমি অত্যন্ত দূঃখিত।" ম্যানেজার জবাব দিল, "আমাদের কোন রুমই খালি নেই।" ম্যানেজার কথা বলতে বলতেই একজন লোক নেমে এসে চেক আউট করলো। "কি সৌভাগ্য", মিস গোল্ডস্টেইন বললেন, "যাক এখন রুম ফাঁকা হল।" "মিস এখনই এত খুশী হবেন না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, এটা একটা সংরক্ষিত হোটেল। ইহুদীরা এখানে থাকার অনুমতিপ্রাপ্ত নয়।" 'ইহুদী? কে ইহুদী? আমি একজন ক্যাথোলিক।" মিস গোল্ডস্টেইন জানালেন। "আমার এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। বলুন তো খোদার পুত্র কে?" "যীশু, মাতা মেরীর ছেলে।" "তিনি কোথায় জন্মেছিলেন।" "একটা আস্তাবলে।" "কেন তিনি আস্তাবলে জন্মেছিলেন?" "আপনার মত একজন মাথা মোটা বলদ একজন ইহুদীকে তার হোটেলে রুম ভাড়া দেয়নি।" ইহুদিরা যেমন এক সময় বর্ণবাদের শিকার হত তেমনি নিজেরাও কিন্তু কম বর্ণবাদী নয়। আজ তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে ফিলিস্তিনি ভাইয়েরা। না, আপনাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যায় টেনে নিচ্ছি না। তারচেয়ে চলুন আমেরিকার এক বারে। না আপনাকে সেখানে পান করতে হবে না। বরঞ্চ দেখি ইহুদি সেখানে কি কান্ড ঘটায়। এক ইহুদি বারে গিয়ে কয়েক পেগ মদ গিললো। সে লক্ষ্য করলো একজন চাইনিজ এক কোনায় বসে চুপচাপ মদ খাচ্ছে। সে সেখানে গিয়ে হঠাৎ চাইনিজের মুখে এক ঘুষি মেরে বসলো। হতভম্ব চাইনিজ জিজ্ঞেস করলো কেন সে তাকে ঘুষি মারলো? ইহুদি উত্তর দিলো, "পার্ল হারবার ধ্বংসের জন্য।" চাইনিজ উত্তর দিলো, "কিন্তু আমি তো চাইনিজ।" "চাইনিজ জাপানিজ কোন পার্থক্য আছে?" বলে ইহুদি তার সীটে ফিরে গেল। কিন্তু চাইনিজেরতো আর মার্কিনীদের মত ইহুদি তোষণ করতে হয় না। সে কেন চুপচাপ ঘুষি হজম করবে। তাই কয়েক মিনিট পর চাইনিজ উঠে গিয়ে ইহুদির মুখে মারলো এক রাম ঘুষি। হতবাক ইহুদি জানতে চাইলো কেন তাকে ঘুষি মারা হল। চাইনিজ বললো, "এটা টাইটানিকের জন্য।" "কিন্তু টাইটানিক তো ডুবেছে আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগে।" জানায় ইহুদি। চায়নাম্যান বললো, "আইসবার্গ, স্পিলবার্গ, গোল্ডবার্গ জাকারবার্গ কোঁই ফারাক নেহি।" বলে সে গট গট করে বেরিয়ে গেল। সকল বার্গেরা যে ইহুদি তা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান পাঠক বুঝতে পেরেছেন। বর্ণবাদ কি আদৌ কোনদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে? দেখা যাক কি বলেন বাঘা বাঘা বর্ণবাদ বিরোধী নেতারা। বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামী নেতা, জিম্বাবুয়ের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে বর্ণবাদ নিয়ে জটিল এক বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ততদিন পর্যন্ত বর্ণবাদ পৃথিবী থেকে বিদায় হবে না যতদিন সাদা গাড়ি কালো টায়ার ব্যবহার করবে, যতদিন লোক মন্দভাগ্যের প্রতীক হিসেবে কালো রং এবং শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা রং ব্যবহার করবে। বর্ণবাদ শেষ হবে না ততদিন যতদিন বিয়েতে সাদা গাউন পরা হবে এবং শবযাত্রায় কালো পোষাক পরা হবে। ততদিন বর্ণবাদ শেষ হবে না যতদিন বিল শোধ না করায় সাদা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না করে কালো তালিকাভূক্ত করা হবে। এমনকি স্নুকার খেলায় জিততে সাদা বল টেবিলে রেখে কালো বলকে গর্তে ফেলা হবে। অবশেষ তিনি শান্তনা খুজেছেন এভাবে, "আমি এসব থোড়াই কেয়ার করি। ততদিন পর্যন্ত আমি সুখী যতদিন আমার কালো নিতম্ব সাদা টিস্যু পেপার দিয়ে পরিস্কার করবো।" রবার্ট মুগাবে যত শান্তনাই খুজুন পৃথিবী থেকে কোনদিনই হয়ত বর্ণবাদ নির্মূল হবে না। বর্ণবাদের দেখা মিলবে হয়তোবা ভিন্ন নামে ভিন্নরূপে।

‘এই আমার সমাবর্তন’

আগামী ৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন। গতকাল বুধবার (০৩ অক্টোবর) এবং আজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণপত্র এবং সমাবর্তনের পোশাক সংগ্রহ করেছেন গ্রাজুয়েটরা। সমাবর্তনের পোশাক পরে জীবনের বিশেষ এ মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দী করে রাখছেন শিক্ষার্থীরা। বন্ধু, সহপাঠী কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। এরমধ্যে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। নিজের মা এবং রিকশাচালক বাবাকে সমাবর্তনের পোশাক পরিয়ে সেই ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন ওয়ালি উল্লাহ নামের গ্রাজুয়েট। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সাবেক এ শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টটি এরিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। [FBW] বাবা-মাকে রিকশায় বসিয়ে চালকের আসনে বসে তোলা ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, 'মা' আমার জীবনের মুকুট, তাই সমাবর্তন হ্যাট টা মায়ের। 'আব্বা' সারাজীবনই আগলে রেখেছেন সব আঘাত থেকে, তাই গাউনটা আব্বার ঘামে ভেজা শরীরটাতেই বেশি মানায়। আর 'আমি' বাকি জীবনটা এভাবে যেন মধুর এ ভার নিতে পারি। 'ভাই'টাকে প্রচণ্ড মিস করছি। এই আমার সমাবর্তন।'

‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

‘সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই’

ফাহমিদা তাপসী
[caption id="attachment_22484" align="alignleft" width="483"]মাশরুনা এ. চৌধুরী মাশরুনা এ. চৌধুরী[/caption] কথা ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু মাশরুনা এ. চৌধুরী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই ‘বড় হয়ে ডাক্তার হব’ এমন ভাবনাই গেঁথেছিল ছোট্ট মেয়েটির মনে। আর হবেইবা না কেন, ডাক্তার বাবাকে দেখে সে পেশার প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সে প্রভাবও ছিল ছোটবেলার চাওয়ায়। মুখে প্রকাশ না করলেও বোনদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষক খেলাটাই তার বেশি প্রিয় ছিল। মোদ্দাকথা মা-বাবা দুজনের পেশা বেশ গাঢ় প্রভাব ফেলেছিল পরিবারের সবার ছোট মেয়েটির মনে। তবে বিধি বাম। ডাক্তার হিসেবে নয়, বরং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) চিফ ফিন্যান্স অফিসার (সিএফও) হিসেবে। বলছিলাম মাশরুনা এ. চৌধুরীর কথা। আজকের আয়োজনে থাকছে চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্ট এবং বিআইএফএফএলের সিএফও এ নারীর সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশ—

ছোটবেলায় যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছেন, সেখানে কি পৌঁছতে পেরেছেন?

সে সময় কিছুই বুঝতাম না, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলতাম বড় হয়ে ডাক্তার হব। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে, ডাক্তার বাবার স্টেথোস্কোপ নিয়ে যতটা না খেলেছি, তার চেয়ে বেশি খেলেছি টিচার টিচার খেলা। তাই বলা যায় শিক্ষিকাও হয়তো হতে চাইতাম। এ দুই পেশার কোনোটাই বেছে নিতে পারিনি পরবর্তীতে, তবে দুটো পেশার সঙ্গেই বর্তমান অবস্থানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম মানুষের সেবা করব বলে। বর্তমানে যে পেশায় যুক্ত রয়েছি, সে পেশায় থেকে কিন্তু সাধারণের সেবাই করছি। অন্যদিকে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি আইসিএবিতে। সব মিলে বলা যায় ছোটবেলায় দেখা স্বপ্ন সরাসরি ছুঁতে না পারলেও একেবারেই পারিনি, বিষয়টি তা নয়।
বিআইএফএফএলে আপনার কাজের ক্ষেত্র নিয়ে যদি বলেন—
২০১৬ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেডে যোগদান করি। এখানে নারী চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে আমিই প্রথম। অ্যাকাউন্টস এবং ফিন্যান্স পুরো বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছি। এ প্রতিষ্ঠানে এর আগে একজনই সিএফও ছিলেন। তিনি বেশিদিন কাজ করেননি বিধায় নতুনভাবেই সব কিছু শুরু করতে হয়েছে।
আপনার মতে বাজেটের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ কী?
আগে থেকে অনুমান করা বা ফোকাস টার্গেট করা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে। কেননা এটা আগে থেকে কিন্তু বোঝা মুশকিল কারা আমাদের গ্রাহক হবেন।
কর্মক্ষেত্রে কীভাবে অন্যদের সহযোগিতা এবং স্বাধীন চিন্তার ভারসাম্য রক্ষা করে থাকেন?
আমাদের কাজটিই হচ্ছে দলবদ্ধ হয়ে করার। আমি সে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছি শুধু। সেদিক থেকে পুরো দলের সহযোগিতা না থাকলে আমার কাজ সম্পন্ন করা কঠিন। সহকর্মীদের সহযোগিতা রয়েছে বলেই হয়তো কাজ করা সহজ হচ্ছে। অন্যদিকে আমি কীভাবে চাচ্ছি, সে বিষয়টি আমার নিম্নপদস্থদের বুঝিয়ে দেয়া কিন্তু আমার দায়িত্ব। একজন সিএফও হিসেবে আমি সে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।

প্রাপ্তির খাতায় যা আছে—

প্রতি বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয় আইসিএবিতে। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সেসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে একটি ক্রম তৈরি করে। বিআইএফএফএলে যোগদানের পর প্রথমবারের মতো আর্থিক প্রতিবেদন আইসিএবিতে জমা দিই এবং আইসিবিতে পাবলিক সেক্টরে তৃতীয় স্থান অর্জন করি আমরা। এটা বিআইএফএফএলের ইতিহাসে প্রথম। এখানেই শেষ নয়, আমাদের সে বার্ষিক প্রতিবেদনটি কিন্তু আইসিএবি সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস সংক্ষেপে সাফাতেও পাঠিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা বার্ষিক প্রতিবেদন জমা হয় সেখানে। সেখান থেকে বাছাইকৃতদের অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। তবে আইসিএবি থেকে সাফা অ্যাওয়ার্ডে পাঠানোর আগে আরো একটি বাছাই প্রক্রিয়া চলে। সেখানে পুনরায় আমাদের প্রতিবেদনটি বাছাই করা হয়। এবং আমরা সাফা বিপিএ অ্যাওয়ার্ডে ২০১৬ সার্টিফিকেট অব মেরিট তকমা জিতে নিই।
প্রতিষ্ঠানের চিফ ফিন্যান্স অফিসার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহীদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
আমার জানা মতে, পুরো বাংলাদেশে নারী চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হিসেবে রয়েছেন দুজন। যারা সিএফও হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাদেরকে বলব প্রচণ্ড পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি নিয়ে যারা পড়েন, তাদের প্রচুর পড়াশোনা করে উত্তীর্ণ হতে হয়। সেদিক থেকে বলা যায়, সফল হতে হলে মানসিকভাবে শক্ত হওয়া চাই, ধৈর্য থাকা চাই।

অবসর কাটে কীভাবে?

যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ততার পাল্লাই ভারী। অবসর নেই বললেই চলে। পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। এছাড়া প্রাকৃতিক বিষয়গুলো আমাকে খুব টানে। তাই বাসার বারান্দায় বাগান করা আমার শখ। সময় পেলেই সেখানেই ঢেলে দেই পুরোটা সময়। এছাড়া গান গাই কখনো কখনো। আমার মা বাংলাদেশ বেতারে টানা ২০ বছর সেতার বাজিয়েছেন। ফলে আমাদের চার বোনের সবাই মোটামুটি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অবসর পেলে গানের চর্চা চালিয়ে যেতে ভালো লাগে।

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.