কোভিড ১৯: ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

কোভিড ১৯:  ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীর সুরক্ষা ও বার্তাকক্ষের দায়িত্ব

[caption id="attachment_23873" align="aligncenter" width="1170"] ছবি: পিক্সাবে Courtesy:medical-concept-poster-pixabay[/caption] নতুন করোনোভাইরাস যাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেই তালিকায় ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের নাম নিঃসন্দেহে সবার ওপরে। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের এই তালিকা দেখলে বোঝা যাবে, সবচেয়ে বিপদে থাকাদের দলে সাংবাদিকরাও আছেন। এখন খবরের খোঁজে প্রতিনিয়তই রিপোর্টাররা চষে বেড়াচ্ছেন সংক্রমণের শিকার হওয়া অঞ্চল; ঘুরছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে; কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক থেকে শুরু করে নানা ধরণের মানুষের সাথে। এতে মাঠের সেই রিপোর্টার শুধু নয় – তাদের পরিবারের সদস্য, বার্তাকক্ষে থাকা সহকর্মী এবং রিপোর্টের প্রয়োজনে যাদের কাছে যাচ্ছেন – সবাই কমবেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন পালসের সম্পাদক জেইমি কাফাশ একে তুলনা করেছেন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সাথে। তিনি বলেছেন, “যুদ্ধের ময়দানে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যে ধরণের নীতিমালা মানতে হয়, এখানেও ঠিক তেমনটাই প্রযোজ্য।” গত কয়েকদিনে কোভিড-১৯ নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ করেছে জিআইজেএন: দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার টিপসঅনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য প্রশ্নচীনা সাংবাদিকদের পরামর্শ, ইত্যাদি। গোটা বিশ্বে বিভিন্ন ভাষার হাজার হাজার সাংবাদিক লেখাগুলো পড়েছেন। এই গাইডটি ঝুঁকি নিয়ে যারা মাঠে কাজ করছেন, সেই সব রিপোর্টারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তৈরি। এখানে রিপোর্টার বা ক্যামেরাপার্সনের নিজস্ব সতর্কতার বিষয় যেমন আছে, তেমনি উঠে এসেছে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম কর্তাদের দায়িত্ব।

হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে কী করবেন?      

কোভিড-১৯ কাভার করা সাংবাদিকদের জন্য একটি অ্যাডভাইজরি প্রকাশ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এটি প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে। এখানে অ্যাসইনমেন্টে যাওয়ার আগে, খবর সংগ্রহের সময় এবং ফিরে আসার পরে – কী করতে হবে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। তারা হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সংক্রমণ এড়ানোর জন্য যত পরামর্শ দিচ্ছে, এখানে তার-ই সারাংশ। প্রবেশের আগে: যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণ-পরিবহণ (যেমন বাস বা ট্রেন) পরিহার করুন, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে। অন্য সময়ে যদি চড়তে বাধ্য হন, তাহলে নামার পর হাত অ্যালকোহল-সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করে নিন। হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টিন জোনে প্রবেশের আগে জেনে নিন সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা সংক্রমণরোধী ব্যবস্থা কেমন। দুর্বল হলে প্রবেশ না করাই ভালো। [caption id="attachment_23875" align="aligncenter" width="1170"] হাসপাতালে সার্জিক্যাল মাস্কের বদলে এন৯৫ রেসপিরেটর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। ছবি: গার্ডিয়ানের ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিনশট[/caption] যখন ঘটনাস্থলে: হাসপাতালে যেন হাতে অবশ্যই গ্লাভস এবং পরনে পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট থাকে। সাথে ডিজপোজেবল জুতো অথবা পানিনিরোধী ওভারশু পরে নিন; সেখান থেকে বের হওয়ার পর ফেলে দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সংক্রমিত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের মাস্ক পরার দরকার নেই। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের তারা মাস্ক পরার নির্দেশ দিয়েছে। হাসপাতাল বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় সাংবাদিকদেরও এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। এর দাম বেশি এবং এখন বেশ দুষ্প্রাপ্য। বেরুনোর পরে: সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় যাওয়ার আগে, সেখানে গিয়ে এবং ফেরার পরে যতবার সম্ভব গরম পানি ও সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। ধোয়ার আগে মুখে, নাকে বা চোখে হাত লাগাবেন না। এলাকা থেকে বেরুনোর পর আপনার প্রতিটি সরঞ্জাম (যেমন, ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন) অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল ওয়াইপ দিয়ে ভালো করে মুছে নিন। অফিসে জমা দেয়ার আগে আরেকবার জীবানুমুক্ত করুন। অনেক রিপোর্টার বলেছেন, তারা সংক্রমণ আছে এমন জায়গা থেকে ফিরে নিজেদের পোশাক গরম পানিতে ধুয়ে নিয়েছেন এবং ভালোমত গোসল করেছেন। ফেরার পরে যদি সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখেন, তাহলে অফিসকে জানান এবং সঙ্গে সঙ্গে সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে চলে যান। অন্যদের প্রতি দায়িত্ব: যখন কোনো বয়স্ক ব্যক্তির সাথে কথা বলছেন, তখন বাড়তি সতর্ক হোন। তাদের কাছ থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকুন। কারণ, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে কোভিড-১৯ রোগে প্রবীণদেরই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। আপনার শরীরে, কাপড়-চোপড়ে অথবা যন্ত্রপাতিতে থাকা ভাইরাস থাকলে যেন তাদের শরীরে না ছড়াতে পারে, সেটি নিশ্চিত করুন। শুধু প্রবীন নয়, যে কারো ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসির মতে, এই রোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে দুই ধরণের মানুষ; যাদের বয়স বেশি, এবং যাদের আগে থেকেই গুরুতর অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যসমস্যা আছে। তাই এমন কোনো রিপোর্টারকে হাসপাতাল, কোয়ান্টিন জোন অথবা সংক্রমণ আছে এমন জায়গায় পাঠাবেন না। অন্তসত্বা রিপোর্টারদেরও এমন অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন। কোনো রিপোর্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পাঠানোর আগে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। রোগের হটস্পট, অর্থ্যাৎ যেখানে বিস্তার বেশি – ঐসব জায়গায় কাউকে অ্যাসাইনমেন্ট দেবেন না। বাইরে অনেক গণমাধ্যমই এই নীতি মেনে চলছে। যদি দিতেই হয়, তাহলে দলের সদস্যদের বডিস্যুট, রেসপিরেটর এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠান। [caption id="attachment_23876" align="aligncenter" width="1050"] ছবি: আনস্প্ল্যাশ[/caption]

সাক্ষাৎকার কিভাবে নেবেন?

ভারতে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথম যে বৃদ্ধ মারা যান, তার বাড়ী কর্নাটকে। সেই বৃদ্ধের ছেলের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন চার সাংবাদিক। সেখান থেকে ফিরে, এখন চার জনই কোয়ারেন্টিনে আছেন। সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে এই সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। মার্কিন বিজ্ঞান সাংবাদিক লিসা এম ক্রিগার সম্প্রতি ২০২০ ক্যালিফোর্নিয়া ফেলোশিপ-জয়ী সাংবাদিকদের পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের কাজ সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলা নয়। যা দরকার, তা যদি ফোনে পাওয়া যায়, সেভাবেই নিয়ে নিন।” পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো করোনাভাইরাসের এই সময়ে এসে বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারই নিচ্ছে ফোন, স্কাইপ বা অন্য যে কোনো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে। একই কথা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিভি সাংবাদিক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীসহ ব্রডকাস্ট জগতের ১লাখ ৬০ হাজার পেশাজীবির প্রতিনিধিত্ব করা সংগঠন স্যাগ-আফট্রা। করোনাভাইরাসের এই সময়ে সদস্যদের জন্য তারা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে:
  • রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের মতামত সংগ্রহের মত যেসব সাক্ষাৎকার, তা বাদ দিন। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাক্ষাৎকার নেয়ার ইকুইপমেন্ট থাকলে বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
  • যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত, অথবা আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের সামনাসামনি সাক্ষাৎকার নেবেন না। তাদের বক্তব্য ফোন, ভিডিও চ্যাট, ইত্যাদির মাধ্যমে নিন।
  • রোগী বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি বাদে বাকি সবার সাক্ষাৎকার নেয়ার আগেও সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) বজায় রাখুন। সিডিসির পরামর্শ মেনে, অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে বক্তব্য ধারণের চেষ্টা করুন।
  • যদি দূরত্ব বজায় রাখতে না পারেন, তাহলে ফোন বা ভিডিও চ্যাটের সহায়তা নিন। কিভাবে রিমোট রেকর্ডিং করবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ পাবেন এই টিপশীটে। এটি তৈরি করেছে রেডিও ও মাল্টিমিডিয়া প্রযোজকদের সংগঠন এয়ার
  • যদি কোনো সংবাদ সম্মেলনে আপনার অ্যাসাইনমেন্ট থাকে, তাহলে সেখানে গিয়েও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার মত ব্যবস্থা আগেই করে নিন। যদি না পারেন, তাহলে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করুন। (যেমন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ)
  • সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় মাইক্রোফোনের ওপর ডিজপোজেবল কাভার লাগিয়ে নিন। ব্যবহারের পর ফেলে দিন। তারপর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন বা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। লিপ মাইক্রোফোন কারো সাথে শেয়ার করবেন না।
  • আপনার প্রতিটি ইক্যুইপমেন্ট সাক্ষাৎকার শেষে অ্যালকোহল ওয়াইপ দিয়ে জীবানুমুক্ত করুন। আপনার সেলফোনটিও নিয়মিত ওয়াইপ দিয়ে মুছে নিন।
মনে রাখবেন, শুধু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা নয়, আপনি যে কোন অ্যাসাইনমেন্টেই আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সব সময় ছয় ফুট দূরত্বে থাকার বিষয়টি মাথায় রাখুন।

সরঞ্জাম কি ভাইরাসমুক্ত?

মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় রুডি গোবার্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে নেহাত কৌতুক বশে সাংবাদিকদের রাখা মাইক্রোফোনে হাত দিয়েছিলেন। তারপর থেকে তিনি সংক্রমিত। এবং তার মাধ্যমে ইউটাহ জাজ দলের আরো কয়েকজন খেলোয়াড় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এভাবে সাংবাদিকরাও তাদের ইক্যুইপমেন্ট থেকে আক্রান্ত হতে পারেন যে কোনো সময়। নতুন করোনাভাইরাস প্লাস্টিক বা ধাতব যে কোনো বস্তুর ওপরে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তাই যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম পরিস্কার রাখুন। আপনার মাইক্রোফোন কিভাবে পরিস্কার করবেন, তার একটি বিস্তারিত নির্দেশনা পাবেন ট্রানসমের এই লেখা থেকে। তাদের মূল পরামর্শ: জীবানুনাশক স্প্রে না করে বরং মাইক পরিষ্কারের ফোম ব্যবহার করুন, এবং পরিস্কার কাপড় দিয়ে তা মুছে ফেলুন। আর পেটাপিক্সেলের এই লেখায় বলা হচ্ছে, আপনি কিভাবে আপনার স্মার্ট ফোন, ক্যামেরা এবং গিয়ার পরিস্কার করবেন। তারাও মূলত অ্যালকোহলভিত্তিক ওয়াইপস দিয়ে লেন্স মুছে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে। টিভি হোক, অনলাইন বা প্রিন্ট – যে কোনো মাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য এখন সংবাদ সংগ্রহের বড় উপায় হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। আপনি যেখানেই যাচ্ছেন, এটি আপনার হাতে থাকছে। তা দিয়ে আপনি কথা রেকর্ড করছেন, ভিডিও বা ছবি তুলছেন, টেবিলে বা সারফেসে রেখে কাজ সারছেন। সেটি কি জীবানুমুক্ত? করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে, আপনাকে এই দিকেও নজর দিতে হবে। এখানে বিবিসি ক্লিকের একটি ভিডিও, জেনে নিন ফোন কিভাবে নিরাপদে রাখবেন। https://youtu.be/wkmFKpAqJbM

টিভি চ্যানেলের ভেতরেও কি নিরাপদ?

টিভি চ্যানেলের ভেতরে যারা কাজ করছেন, দয়া করে নিজেদের পুরোপুরি নিরাপদ ভাববেন না। আপনার স্টুডিওতে প্রতিদিন যত অতিথি আসছেন বা যাচ্ছেন, তারা সবাই কি সংক্রমণমুক্ত? আপনি যদি নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে স্টুডিওটিকেও নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করুন। একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিস্কার হবে। গেল ৯ মার্চ, অস্ট্রেলিয়ার নাইন নেটওয়ার্ক টিভির স্টুডিওতে গিয়েছিলেন অভিনেতা টম হ্যাংকসের স্ত্রী রিটা উইলসন। তখনো কারো জানা ছিল না এই দম্পতি করোনাভাইরাস আক্রান্ত। তারা কিছুদিন পরই সেই ঘোষণা দেন। রিটা উইলসনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক রিচার্ড উইলকিন্স। কয়েকদিন পর তিনি নিজেও সংক্রমিত হন। এমন পরিস্থিতি এড়াতে স্যাগ-আফট্রার পরামর্শ হলো:
  • টিভি চ্যানেলের কমন জায়গা, যেখানে সবাই আসেন বা বসেন, তা নিয়মিত জীবানুমুক্ত করা;
  • প্রতিটি শো শেষে স্টুডিও অ্যালকোহলভিত্তিক জীবানুনাশক দিয়ে মুছে ভালো মত পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে যে মাইক্রোফোনগুলো ব্যবহার হচ্ছে তা প্রত্যেক শো শেষে জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করে নেয়া;
  • স্টুডিওতে ব্যক্তিগত মেক-আপ কিট, ব্রাশ ও ফোম নিয়ে আসা এবং শুধু সেগুলো ব্যবহার করা;
  • প্রয়োজনে ঘরকেই স্টুডিও বানিয়ে নেয়া বা ভিডিও চ্যাটে অতিথিদের সংযুক্ত করা;
  • ওয়াইপস সাথে রাখা এবং দরজার হাতল থেকে শুরু করে স্পর্শ করতে হবে এমন;জিনিস মুছে নেয়া:
  • এবং টিভি শোতেও সামাজিক দূরত্ব অর্থ্যাৎ ৬ ফুট দূরে থাকার নীতি মেনে চলা।

নিউজরুমগুলো কী করছে?

বাংলাদেশের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। গণমাধ্যম সাময়িকী মুক্তবাকের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কিছু গণমাধ্যম তাদের কর্মীদের সুরক্ষায় ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। কেউ পুরোপুরি, কেউ আংশিকভাবে বাড়ি থেকে কাজের নীতি গ্রহণ করেছেন। অফিসে প্রবেশের আগে জ্বর মাপা, মাস্কের যোগান, জীবানুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, কর্মীদের নিজস্ব গাড়ি দিয়ে পিক এবং ড্রপের ব্যবস্থা, পালা করে কাজ করা – এমন অনেক উদ্যোগই নেয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে কাজ গণমাধ্যমের জন্য বলতে গেলে নতুন বিষয়। করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বেই বার্তাকক্ষগুলোকে এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দেশের নিউজরুমগুলো কোভিড-১৯ এর সাথে যেভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যাবে ওয়ান-ইফরা ব্লগের এই লেখা থেকে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ। স্ট্রেইটস টাইমস, সিঙ্গাপুর: তারা বার্তাকক্ষের সম্পাদকীয় বিভাগকে ২৫ জনের দুটি দলে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রতিটিতে বিভিন্ন পদ মর্যাদার কর্মী আছেন। একদল ঘরে বসে কাজ করেন, আরেকদল অফিসে। দুই সপ্তা পর, তারা স্থান বদল করেন। এর উদ্দেশ্য হলো: একটি দলের কেউ আক্রান্ত হলে, তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে, বাকিদের নিয়ে কাজ চালানো। সম্পাদকীয় এই দল ছাড়া তাদের বাকি সব কর্মী ঘর থেকেই কাজ করছেন। অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে সেটি সেরে, বাড়ি থেকেই তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন গুগল হ্যাংআউটে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, হংকং: জনপ্রিয় এই পত্রিকাটি অর্ধেক কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে। যারা অফিসে কাজ করেন, তাদেরকে প্রতিটি ফ্লোরে বিভক্ত রাখা হয়েছে, যেন এক তলার কর্মী থেকে অন্য তলায় সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। তারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন গুগল হ্যাংআউটে। নিজেদের বদ্ধ সম্মেলনকক্ষে বড় মিটিং বা সভা নিষিদ্ধ করেছে এসসিএমপি। বার্তাকক্ষের কর্মীরা ছোট ছোট দলে মিটিং সেরে নেন। দ্য টাইমস, যুক্তরাজ্য: টাইমসের একজন কর্মী করোনাভাইরাসে আকান্ত হওয়ার পর থেকে লন্ডনে তাদের প্রধান কার্যালয়ের প্রতিটি লিফট, টয়লেট এবং বসার জায়গা ৩০ মিনিট পর পর জীবানুমুক্ত করা হচ্ছে। হার্স্ট, মেরিডিথ কর্প কর্পোরেশন, পেনস্ক মিডিয়া কর্পোরেশন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, বাজফিড, বিজনেস ইনসাইডার, রিফাইনারি ২৯, নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন, পলিটিকো, এক্সিয়োস, এবং ওয়ার্নার মিডিয়াসহ অনেকেই কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে উৎসাহি°÷ত করছে। রিপোর্টারদের যাতে বাইরে যেতে না হয়, সেজন্য কোয়ার্টজ এক্সপ্লেইনার ধাঁচের ভিডিও বানানোতে মন দিয়েছে। নাওদিস বলছে, তারা ভিডিওর জন্য প্রতিটি সাক্ষাৎকারই অনলাইনে নিচ্ছে, এবং দর্শকদেরও জানাচ্ছে, কেন এমন করতে হচ্ছে। https://youtu.be/8zKoQKeGbyY ওয়াশিংটন পোস্টের এই ভিডিও আপনাকে জানাবে বাড়ি থেকে কাজ করা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা।

বার্তাকক্ষের কর্তাদের জন্যে…

কোভিড-১৯ রোগের গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে, যার ভভিষ্যৎও অজানা। বাড়ি থেকে বা অফিসে বসে, কাজ যেখান থেকেই হোক – এই অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমকে কতদিন যেতে হবে, তা কেউ বলতে পারে না। এই সময়টা যেমন কর্মস্থলকে নিরাপদ রাখার, তেমনি নিজেদের একে অপরের দিকে খেয়াল রাখারও বটে। আর এখানে বড় দায় আছে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপকদের, অর্থ্যাৎ যারা বার্তাকক্ষকে নেতৃত্ব দেন। কঠিন এই সময়ে তাদের মূল দায়িত্ব দু’টি – প্রথমত, সহকর্মীদের ঝুঁকিতে না ফেলা; এবং দ্বিতীয়ত, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। কিভাবে সেটি করবেন? নিচে কয়েকটি পরামর্শ:
  • এই সময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করুন, এবং তা কিভাবে মেনে চলতে হবে বার বার সহকর্মীদের বুঝিয়ে বলুন। বার্তাকক্ষের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে এই নীতিমালার মুখপত্র হতে হবে। বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিও করতে হবে, তাকেই।
  • রিপোর্টার অ্যাসাইনমেন্টের কাজে ভ্রমণ করবেন কি করবেন না, তিনি অফিস নাকি বাড়ি থেকে কাজ করবেন – সেই সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন। তার সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখুন, কোনো ব্যাখ্যা চাইবেন না।
  • কর্মক্ষেত্রে এমন জায়গা রাখুন যেখানে সাংবাদিকরা একে অপরের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। দলগত সভা দরকার তো বটেই, এসময় ওয়ান-টু-ওয়ান সাক্ষাতও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
  • একজন রিপোর্টার কত রিপোর্ট দেবে, তা নিয়ে আপনার প্রত্যাশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সময়টি কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অভিজ্ঞ রিপোর্টারকেও অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার প্রভাব পড়ে তাদের উৎপাদনশীলতায়।
প্রতিটি পরামর্শ নেয়া হয়েছে “নিউজরুম গাইড টু কোভিড-১৯” নামের একটি সহায়িকা থেকে। এটি তৈরি তৈরি করেছেন ১১ জন  সাংবাদিক, তাদের মত অন্য সাংবাদিকদের জন্যে। হাতে যদি সময় থাকে পুরো গাইডটি পড়ে দেখুন
[caption id="attachment_23877" align="alignleft" width="140"] মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, জিআইজেএন-এর বাংলা সম্পাদক। এর পাশাপাশি তিনি জিআইজেএন-এর সদস্য সংগঠন, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা, এমআরডিআইয়ের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড কমিউনিকেশনস্ হিসেবে কাজ করছেন। সাংবাদিকতায় তাঁর রয়েছে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা, যার বড় অংশই টেলিভিশনে।[/caption]

দূষিত নগরে এ কেমন জীবন!

দূষিত নগরে এ কেমন জীবন

আমিরুল আলম খান
০৯ জানুয়ারি ২০২০
ফাইল ছবিমঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি। বেলা ১১টা। শ্যামলীতে একটা ব্যাংকে জরুরি কাজ সেরে এসওএস শিশুপল্লির ওভারব্রিজে উঠি মিরপুর রোড পার হতে। চারদিকে গাড়ির বিকট হর্ন, গাড়ি চলার শব্দ, সঙ্গে আরও নানা ধরনের আওয়াজ। খানিক পরেই শ্বাসকষ্ট অনুভূত হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, ব্রিজ পার হতে পারব না। রেলিং ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে নেমে এলাম শিশুমেলার মোড়ে। সেখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে উবার ডাকলাম। তিন মিনিট লাগবে। আমি যেন দিশেহারা। কান ঝালাপালা করছে। সহ্য হচ্ছে না গাড়ি চলা আর হর্নের আওয়াজ। মিনিট তিনেকের মধ্যেই উবার হাজির। উঠে বসলাম। গাড়ির ভেতর গাড়ির আওয়াজ কমেছে। বাইরের বাতাসে শ্বাস নিতে হচ্ছে না। মিনিট দুয়েকের মধ্যে শ্বাসকষ্ট কমে এল। নিজেকে অনেকটাই সুস্থ মনে হলো। ঢাকায় রোজ অন্তত কোটি দেড়েক মানুষ নানা কাজে ঘরের বাইরে চলাচল করে। তাদের ৮০ ভাগই নানা দূষণে আয়ু ক্ষয় করছে। কত শত শারীরিক–মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা ভিড় করে ডাক্তারের দরজায় দরজায়। দূষিত বাতাস, শব্দের বাড়াবাড়িতে তাদের এমন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। ধুলাবালু তো আছেই; আছে ধোঁয়া, জান কবজ করা ভারী ভারী নানা পদার্থ। বাস, মিনিবাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কাভার্ড ভ্যান, মোটরবাইক—সবকিছুই পাল্লা দিয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে। সেই সঙ্গে নগরে উন্নয়নের ঘোড়দৌড় তো লেগেই আছে। সরকারি–বেসরকারি হাজারো উন্নয়ন প্রকল্প। সে জন্য যেখানে–সেখানে ইট, সুরকি, পাথর, বালু, রড, সিমেন্টের পাহাড়। রাস্তা, ফুটপাত সব দখল করেই এসব উন্নয়নসামগ্রীর স্তূপ। পাল্লা দিয়ে করপোরেশনও স্তূপ করে রাখে গৃহস্থালি বর্জ্য। তার সঙ্গে হোটেল, দোকান, হাসপাতালের বর্জ্য মিশে একাকার। বর্জ্য পচে দুর্গন্ধে এলাকা নরক না হলে করপোরেশন তা সাফা করার গাড়ি, লোক কিছুই পাঠায় না। আবর্জনা ফেলার জন্য তারা উপযুক্ত জায়গা হিসেবে বেছে নেয় স্কুল–কলেজের পাশের কোনো জায়গা। শিশুরা সে আবর্জনার দুর্গন্ধে বমি-বমি-গায়ে ঢোকে ক্লাসরুমের জেলখানায়। সঙ্গী লাখো কোটি জীবাণু। ফিরতি পথে আবার দুর্গন্ধ আর জীবাণুর দঙ্গল নিয়ে বাসায় আসে। কেউ দেখার নেই, প্রতিবাদ করার জো নেই। একুশ শতকের প্রথম দুই দশক পার করেছি আমরা। তৃতীয় দশকে যে অবস্থার উন্নতি হবে, তা দুরাশা মাত্র। কারণ, বিশৃঙ্খলা বাড়ছেই দিনে দিনে। আজই সংবাদমাধ্যমের জবর খবর, ঢাকা দুনিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরে তালিকার সেরাতে আজও। গত ডিসেম্বর থেকে ঢাকা মাসের অর্ধেকজুড়েই দূষিততম নগরের তকমা নিয়ে হাজির হচ্ছে। উচ্চ আদালতের হুকুম জারি আছে রোজ পানি ছিটিয়ে শহর ধূলিমুক্ত রাখার। সে হুকুম কোথাও আমল হচ্ছে কি না, ঈশ্বর জানেন; আমরা ঢাকাবাসী তা চোখে দেখিনে, কানেও শুনিনে। একদা ঢাকা ছিল নদীঘেরা এক চমৎকার নগরী। দুনিয়ার কয়টা শহরের চারপাশ চার–চারটা নদী বহমান, তা আমার জানা নেই। কিন্তু ঢাকা ছিল সেই বিরল শহর, যেটি চারপাশ নদীবেষ্টিত। কিন্তু হলে কী হবে? ‘সরকারকা মাল, দরিয়ামে ঢাল’—আমরা এমন রপ্ত করেছি যে গোটা নদীই দখল করে করে ওদের জান কবজ করে ফেলেছি। প্রাণীর জান কবজের কাজ আজরাইল ফেরেশতার। কিন্তু খোদ দুনিয়ার জান কবজের কাজটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে আশরাফুল মখলুকাত—মানুষ। শুধু ঢাকার নদী নয়, নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখন নদী খুঁজে পাওয়াই ভার। যদিওবা নদী কিছু অবশিষ্ট আছে, পানি তার ভয়ংকর দূষিত। বেশির ভাগ নদী এখন খাল বলেও চেনা যায় না। যেটুকু আছে, তা কচুরিপানায় ভরা। নয়তো দখলবাজরা তা দখলে নিয়ে মাছের ঘের, পুকুর বানিয়েছে, বাড়ি, দোকানের ইমারত তুলেছে।
ঢাকায় এককালে খাল ছিল বহু। এখন সেগুলোও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, উত্তরা, বারিধারায় ভদ্দরলোকদের জন্য যেসব লেক তৈরি করা হয়েছিল, তারও অবস্থা কাহিল। এমনকি কয়েক শ কোটি টাকায় নান্দনিক শোভার বার্তা দিয়ে হাতিরঝিল তৈরি করা হলো দশক দেড়েক আগে, সেটা এখন পচা পুকুরেরও অধম, চরম দূষিত। ওই এলাকার বাসিন্দারা কী করে বসবাস করে, তা কেবল মাবুদ জানেন। ওদিকে দেশের একসময়ের আইকন হোটেল সোনারগাঁও এলাকা পচা সবজি আর মাছের গন্ধে কাক-শকুনেরও অরুচি। সেদিন দেখি, হাতিরঝিলে ছুটছে বিনোদনের কলের নৌকা। তা নৌবিহারের ব্যবস্থা যদি করেন নগরপিতা, তাহলে দুটি বিষয় মাথায় নিলে ভালো করতেন। এলাকাটা আগে সাফসুতরো করে দুর্গন্ধ তাড়িয়ে নিতেন। আর দ্বিতীয় নিদান, কলের জাহাজ না চালিয়ে দাঁড় আর হালের নৌকা চালালে নতুন প্রজন্ম ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিত মন’। বাতাস যখন বইত, ধীরে ধীরে উড়িয়ে দিলে নানা রঙিন পাল, খুশির পালে লাগত জবরদস্ত হাওয়া। তাতে হাতিরঝিলের মান বাড়ত, নাগরিকদের দেহ–মন চনমনিয়ে উঠত। কিন্তু সেসব দিকে নজর দেবেন, তেমন লোকের এখন বেজায় অভাব। বরং দেখি, চারদিকে কোটি কোটি লোক নগরটাকেই খাবলে–খুবলে খেতে হল্লা করে আসছে ধেয়ে ধেয়ে। তাদের সঙ্গে আছেন আবার গদির ওপর বসা অনেক মানুষ। তাঁরা সবাই দল বেঁধেছে আসছে আমাদের মতো পথের মানুষের জান খাবলে খাবলে খেতে। গরিব মানুষের কলজে খাওয়া বেশ মজার। আমিরুল আলম খান: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

ঢাকার বাতাসের মান আরো খারাপ হয়েছে

ঢাকার বাতাসের মান আরো খারাপ হয়েছে

তাওছিয়া তাজমিম

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ছয়টি বিদ্যালয়ের চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুসের কার্যকারিতা শতভাগ নেই। কারো ফুসফুসের কার্যকারিতা ৬৫, কারো ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এ শহরের শিশুরা তাদের ফুসফুসের পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। মূলত বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা ফুসফুসের কার্যকারিতা হারাচ্ছে

ইকবাল হাবিব | যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাপা

কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার উপরে রয়েছে। ক্ষতিকর বস্তুকণার এ উপস্থিতি না কমে উল্টো বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতিও। বায়ুর মান পরীক্ষায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালের আটটি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন (সিএএমএস) স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে তিনটি রয়েছে ঢাকায়। স্টেশনগুলো থেকে পাঠানো তথ্য সংরক্ষিত হয় রাজধানীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সার্ভারে। তার ভিত্তিতে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে অধিদপ্তর। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের শেষ কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দূষণের মাত্রা বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাতাসে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র এসব বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ঢাকার বাতাসে পাওয়া গেছে এর চেয়ে বেশি মাত্রায়। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে বছরের শেষদিকে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। দূষণের মাত্রা জানতে তাই পরিবেশ অধিদপ্তরের গত দুই বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ১১৭, ১১০ ও ১১৩ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের অক্টোবরে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা রেকর্ড করা হয় প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ১৫১ দশমিক ৮১ ও ১১৭ দশমিক ৬৭ মাইক্রোগ্রাম। গড় হিসাবে যার পরিমাণ যথাক্রমে ৭৫ দশমিক ৩৮ ও ৮৪ দশমিক ২৭ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ঢাকার বাতাসে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৯২ দশমিক ৮, ২১১ ও ২৬৬ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের একই সময়ে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ বস্তুকণার সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া যায় প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২০৪ ও ২২৬ মাইক্রোগ্রাম। তথ্য না থাকায় মাসটিতে সংসদ ভবন এলাকার বাতাসে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা জানা যায়নি। তবে এ দুই এলাকার বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণার যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে তো বটেই, ২০১৭ সালের চেয়েও অনেক বেশি। বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূক্ষ্ম এ বস্তুকণা স্বল্প মেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী বলে জানান চিকিৎসকরা। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা। প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি শ্বাসতন্ত্রের রোগ হয়। হাঁপানি রোগী হলে তাদের হাঁপানি বেড়ে যায়। আবার অনেকে নতুন করে হাঁপানি, শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি, হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত হয়। যক্ষ্মার মতো রোগগুলো বায়ুদূষণের কারণে বেড়ে যায়। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেড়ে যায় নবজাতক ও শিশুদেরও। ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী বায়ুদূষণ। বাতাসে ১০ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের বস্তুকণাকে বলা হয় পিএম ১০। পিএম ২.৫-এর মতো ঢাকার বাতাসে পিএম ১০-এর মাত্রাও আগের চেয়ে বেড়েছে। জাতীয়ভাবে বাতাসে পিএম ১০-এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ধরা হয় প্রতি ঘনমিটারে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় এসব বস্তুকণার সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ১৯০ ও ২১০ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে উভয় এলাকায়ই বাতাসে পিএম ১০-এর উপস্থিতি বেড়েছে। এ সময় ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় পিপিএমের সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২৫৫ দশমিক ৯০ ও ২৩৪ দশমিক ৫২ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৭ সালের অক্টোবরে সংসদ ভবন এলাকায় পিএম ১০-এর উপস্থিতিসংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের একই সময় এখানে এর সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ দশমিক ৮০ মাইক্রোগ্রাম। এ দুই বছরের নভেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় পিএম ১০-এর সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২৮৬ ও ৪৩৯ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ৩১৭ ও ৫১৩ মাইক্রোগ্রাম। এক্ষেত্রে সংসদ ভবন এলাকায় ২০১৭ সালের তথ্য না পাওয়া গেলেও ২০১৮ সালের নভেম্বরে সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে ১৭৬ মাইক্রোগ্রাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী ইটভাটা ও নির্মাণকাজ। ঢাকা মহানগরীর আশপাশে অনেক এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার কারণে বাতাসে সূক্ষ্ম নানা ধরনের ধূলিকণা মিশে যায়। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে। ফলে বাড়ছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা। এ দূষণে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়ছে শিশুরা। ঢাকা শহরের ছয়টি বিদ্যালয়ের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা নিয়ে ২০১৬ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরবান ল্যাব। ফলাফলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না। তাদের ফুসফুস ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ করছে। গবেষক দলের সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হাবিব। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ছয়টি বিদ্যালয়ের চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। ভয়ংকর বিষয় হলো, ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুসের কার্যকারিতা শতভাগ নেই। কারো ফুসফুসের কার্যকারিতা ৬৫, কারো ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এ শহরের শিশুরা তাদের ফুসফুসের পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। মূলত বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা ফুসফুসের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগরীর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক (একিউআই) ৩৬২, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। একিউআই ০-৫০ হলে তাকে ভালো ধরা হয়। ৫১-১০০ সহনীয়, ১০১-১৫০ সতর্কতামূলক, ১৫১-২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-৫০০ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। গত বছর নির্মাণকাজ বেশি হওয়ায় এর আগের বছরের তুলনায় ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ইটভাটা ও নির্মাণকাজের কারণে মূলত ধূলিকণা বেশি বাতাসে ছড়ায়। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরির বিকল্প হিসেবে অপোড়ানো পদ্ধতি ব্লকের দিকে যাওয়া। ইট প্রস্তুত আইন ২০১৩ গত নভেম্বরে সংশোধন করা হয়েছে। ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক পদ্ধতিকে যাতে প্রমোট করা হয়, আইনের বিভিন্ন ধারায় তা সংযোজন করা হয়েছে। বড় চিন্তার জায়গা হলো নির্মাণকাজ। যে যেভাবে পারছে নির্মাণকাজ করছে। এজন্য একটা নীতিমালা তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নির্মাণকাজ কীভাবে চলবে, সেজন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। নীতিমালা যাতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর : জীব-জগতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ঢাল

বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর : জীব-জগতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ঢাল

ড. মো. বাশারত আলী সরকার গ্রহ-নক্ষত্র ঘুরছে অবিরত; সূর্য যদিও শক্তি যোগায়, পৃথিবীই মোদের প্রাণকেন্দ্র। সূর্যের রশ্মি ছাড়া করতে পারি কি আমরা জীবনের কল্পনা? অথচ সেই রশ্মিতেও ‘অতিবেগুনি- রশ্মি’ নামে যে রশ্মি আছে, তা জীবের জন্য ক্ষতিকর। মজার ব্যাপার হলো, সেই ক্ষতিকর রশ্মিকে প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিহত করে আমাদের বন্ধু ‘বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর’!

অতি সংক্ষেপে মহাবিশ্ব পরিচিতি

সদা চলমান ও সম্প্রসারণরত বিস্ময়ে ভরা এই মহাবিশ্ব। সমগ্র বিশ্বমাঝে আমরা অতি ক্ষুদ্র, তথাপিও সমগ্র বিশ্ব আমাদেরই জন্য! পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সিসমূহ, তাদের অন্তর্বর্তী স্থানের মধ্যে অন্যান্য পদার্থ এবং শূন্যস্থান (মহাকাশ), দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু মিলেই মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বে রয়েছে আমাদের সৌরজগতের মতো আরো অসংখ্য সৌরজগৎ। আমাদের সৌরজগৎ বলতে সূর্য এবং এর সাথে মহাকর্ষীয়ভাবে আবদ্ধ সকল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুকে বোঝায়। এর মধ্যে আছে: আটটি গ্রহ, তাদের ১৭৩টি জানা প্রাকৃতিক উপগ্রহ, কিছু বামন গ্রহ ও তাদের কিছু প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং কোটি কোটি ক্ষুদ্র বস্তু যেমন— গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, এবং আন্তঃগ্রহীয় ধূলিমেঘ।

সূর্য

আমাদের পরিচিত সৌরজগতের কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থিত তারাটির নাম সূর্য, যাকে আমরা রবি নামেও ডাকি। গোলক আকৃতির এই তারা প্রধানত আয়নিক পদার্থ দিয়ে গঠিত যার মধ্যে জড়িয়ে আছে চৌম্বক ক্ষেত্র। সূর্যের ব্যাস প্রায় ১৩ লক্ষ ৯২ হাজার কিলোমিটার, যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ১০৯ গুণ। সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে হাইড্রোজেন (সূর্যের মোট ভরের শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ), হাইড্রোজেনের পরই আছে হিলিয়াম (মোট ভরের শতকরা প্রায় ২৩-২৪ ভাগ), এ ছাড়া আছে অক্সিজেন, কার্বণ, নিয়ন, লোহা ইত্যাদি (সূর্যের ভরের প্রায় ১.৬৯%)। পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার যাকে ১ নভো একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গড় দূরত্বে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড সময় লাগে। এই সূর্যালোকের শক্তি পৃথিবীর প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে। উদ্ভিদ সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এই আলো থেকে খাদ্য উৎপাদন করে এবং প্রাণীরা খাদ্যের জন্য এসব উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণীর উপর নির্ভর করে। এছাড়া জলবায়ু এবং আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও সূর্যালোক প্রধান ভূমিকা রাখে।

সূর্যরশ্মি

সূর্যরশ্মি বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ সূর্য থেকে মহাকাশে বিচ্ছুরিত হয় যার কিছু অংশ আমাদের এই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে। কম্পাংকের পার্থক্যের ভিত্তিতে চৌম্বকীয় বিকিরণকে নানাভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— বেতার তরঙ্গ (যার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সীমা ১ মিলিমিটার থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয় যা খালি চোখে দেখা যায় না), মাইক্রোওয়েভ (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১ মিলিমিটার হতে ১ মিটার পর্যন্ত), অবলোহিত রশ্মি (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১ মাইক্রোমিটার হতে ১ মিলিমিটার পর্যন্ত), দৃশ্যমান আলো (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৪০০ ন্যানো মিটার থেকে ৭০০ ন্যানো মিটার পর্যন্ত), অতিবেগুনী রশ্মি (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১০০ ন্যানো মিটার থেকে ৪০০ ন্যানো মিটার পর্যন্ত), রঞ্জন রশ্মি (এক্স-রে) (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১০ ন্যানো মিটার থেকে ০.০১ ন্যানো মিটার পর্যন্ত), এবং গামা রশ্মি (তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১০ পিকোমিটার থেকেও ছোট)। বিভিন্ন রশ্মির বৈশিষ্ট্য ও ভূমিকা ভিন্ন। এদের মধ্যে অতিবেগুনী রশ্মি জীব জগতের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে।

অতিবেগুনী রশ্মি পরিচিতি ও জীব-জগতের উপর তার প্রভাব

অতিবেগুনী আলোক রশ্মি (Ultra violet rays)(UV rays) হচ্ছে সূর্যের আলোক রশ্মির সেই অংশ যার তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য খুবই খাটো। অতিবেগুনী রশ্মিকে তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন— অতিবেগুনী রশ্মি- ‘সি’ (UV-C) (তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য: ১০০-২৮০ ন্যানো মিটার), অতিবেগুনী রশ্মি- ‘বি’ (UV-B) ( তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য: ২৮০-৩১৫ ন্যানো মিটার), অতিবেগুনী রশ্মি- ‘এ’ (UV-A) ( তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য: ৩১৫-৪০০ ন্যানো মিটার)। উল্লেখ্য যে, ১ ন্যানো মিটার= ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ। অন্য কথায় ১ ন্যানো মিটার= ১ মিমি-এর ১ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ। সহজেই অনুমেয়, দৈর্ঘ্যে কতো ক্ষুদ্র এই সব আলোক-রশ্মি। বাতাসে অতিবেগুনী রশ্মি- ‘বি’ (UV-B)-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে, মৃত পচনশীল জৈব পদার্থ থেকে বর্দ্ধিত পরিমাণ কার্বন মনোক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডস উৎপন্ন হয়ে থাকে। ভূপৃষ্ঠের নিকটবর্তী ওজোন গ্যাস এবং কার্বন মনোক্সাইড এসিড রেইন (এসিড বৃষ্টি) সৃষ্টি করে। এসিড রেইন জীব কোষের ক্ষতিসাধন করে। অতিবেগুনী রশ্মি (Ultra violet rays)(UV rays) গুলোর মধ্যে, অতিবেগুনী রশ্মি- ‘সি’(UV-C) ওজোন স্তরে সম্পূর্ণভাবে শোষিত হয়, অতিবেগুনী রশ্মি- ‘বি’ (UV-B) এর মাত্র ৫% ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে এবং অতিবেগুনী রশ্মি- ‘এ’ (UV-A) এর ৯৫% ভাগই বায়ুমণ্ডলের স্তরসমূহ ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছতে পারে। অতিবেগুনী আলোকরশ্মি (Ultra violet rays)(UV rays) গুলো গাছপালা, তরুলতা, প্রাণি, অনুপ্রাণি সকলের উপরই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তবে, অতিবেগুনী রশ্মি- ‘বি’ (UV-B) ভিটামিন ‘ডি’ সংশ্লেষণ করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পৃথিবী, বায়ুমণ্ডল ও জীবজগৎ

সমগ্র বিশ্বে একমাত্র আমাদের গ্রহ অর্থাৎ এই পৃথিবীই হলো মানুষসহ কোটি কোটি প্রজাতির আবাসস্থল। পৃথিবী সূর্য থেকে দূরত্ব অনুযায়ী তৃতীয়, সর্বাপেক্ষা অধিক ঘণত্বযুক্ত এবং সৌরজগতের আটটি গ্রহের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ। এটি সৌরজগতের চারটি কঠিন গ্রহের অন্যতম। পৃথিবীর পৃষ্ঠ অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের প্রায় তিন ভাগ জল এবং এক ভাগ স্থল। সমতল ভূমি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, খাল-বিল, বন-জঙ্গল নিয়ে স্থলভাগ, এবং সাগর-মহাসাগর সমন্বয়ে জলভাগ গঠিত। স্থলভাগের সমতল ভূমি মৃত্তিকা আবৃত। সমগ্র পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে আছে স্তরে স্তরে সাজানো বায়ুমণ্ডল। এসব কিছু নিয়েই পৃথিবীতে বসবাসের উপযোগী পরিবেশে আমাদের এই জীব জগৎ। পৃথিবীকে ঘিরে থাকা আকাশের সবচেয়ে নিকটবর্তী বলয়ে রয়েছে বায়ুমণ্ডল। সেই বায়ু মণ্ডল (Atmosphere)-এ চারটি স্তর রয়েছে যা তাপমাত্রার পরিবর্তন দ্বারা পৃথক। এই স্তরগুলো হচ্ছে— ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার ও থার্মোস্ফিয়ার।

ট্রোপোস্ফিয়ার:

এটি ভূপৃষ্ঠের নিকটতম স্তর। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শুরু করে ৭ থেকে ২০ কি:মি: (২৩,০০০ – ৬৫,০০০ ফুট) পর্যন্ত বিস্তৃত। আবহাওয়ার পরিবর্তন এই স্তরেই ঘটে থাকে।

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার:

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তর ৩০ কি:মি: পর্যন্ত পুরু হয়। ভূপৃষ্ঠের ১০ কি:মি: উপর থেকে শুরু করে ৫০ কি:মি: পর্যন্ত বিস্তৃত। বায়ুমণ্ডলের এই স্তরেই ওজোন গ্যাসের স্তর বিরাজমান।

মেসোস্ফিয়ার

অধিকাংশ উল্কা (Meteors) এখানে ভস্ম হয়। ৩৫ কি:মি: পুরু। ভূপৃষ্ঠের ৫০ কি:মি: উপর থেকে ৮৫ কি:মি: পর্যন্ত বিস্তৃত। খুবই ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা -৯৩ (মাইনাস ৯৩) ডিগ্রি সেলসিয়াস।

থার্মোস্ফিয়ার:

ভূপৃষ্ঠের ৯০ কি:মি: উপর থেকে শুরু করে কম বেশি ৫০০ থেকে ১০০০ কি:মি: পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত) কিন্তু উষ্ণতা অনুভূত হয় না কারণ বায়ুর চাপ কম।

ওজোন গ্যাসের বৈশিষ্ট্য

ওজোন একটি তীব্র গন্ধযুক্ত হালকা নীল বর্ণের বিষাক্ত গ্যাস। ওজোন গ্যাস তৈরি ও ধ্বংস হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। অম্লজান বা অক্সিজেন গ্যাসের তিনটি পরমাণু (O) একত্রিত হয়ে ওজোন গ্যাস (O3) তৈরি হয়। বায়ুমণ্ডলীয় ওজোন গ্যাসের ঘণত্ব খুবই কম (প্রতি এক কোটি বায়ু অণুতে মাত্র তিনটি ওজোন অণু থাকে)। ওজোন গ্যাস প্রধানত স্ট্রাটোস্ফিয়ারে থাকে। আর ট্রোপোস্ফিয়ারে মাত্র ১০% ওজোন পাওয়া যায়।

ওজোন স্তরের গুরুত্ব

ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একটি স্তর যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি মাত্রায় ওজোন গ্যাস থাকে। এই স্তর থাকে স্ট্রাটোস্ফিয়ারের নিচের অংশে, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে কমবেশি ২০-৩০ কিমি উপরে অবস্থিত। অতিবেগুনী রশ্মি প্রাণী ও উদ্ভিদের মারাত্মক ক্ষতি করে। স্ট্রাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তর অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে ভূপৃষ্ঠের জীব-জগতকে রক্ষা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে., ওজোন স্তর ক্ষয়ের ফলে সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি পৃথিবীতে এসে পৃথিবীকে মাত্রাতিরিক্ত উত্তপ্ত করবে। ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, নিম্নভূমি প্লাবিত হবে, পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে, আকস্মিক বন্যা, নদী ভাঙন, খরা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রকট হবে। মানুষের ত্বকের ক্যান্সার ও অন্ধত্ব বৃদ্ধি পাবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। উদ্ভিদের জীবকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সমুদ্রে প্রাণীর সংখ্যা কমে যাবে, ফাইটোপ্লাংকটন উৎপাদন কমে যাবে। বিশেষজ্ঞগণ লক্ষ্য করেছেন যে, ওজোন নিঃশেষকরণ (Ozone depletion) প্রক্রিয়ার ফলে গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওজোন স্তর ধ্বংস প্রক্রিয়া

১৯৭০-এর দশক থেকে দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের আকাশে ওজোন নিঃশেষকরণ (Ozone depletion) প্রক্রিয়া দৃষ্টিগোচর হয়। ওজোন নিঃশেষকারী পদার্থ যেমন— প্রোপেলান্ট (নমনীয় ও শক্ত ফেনা তৈরীকরণে ব্যবহৃত হয়), হিমায়ন বা রেফ্রিজারেশন, এয়ার কন্ডিশনার, এবং পরিষ্করণের দ্রাবকের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর প্রায় ০.৫% হারে ওজোন নিঃশেষকরণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে বায়ুমণ্ডলে মুক্তিপ্রাপ্ত ওজোন নি:শেষকারী হ্যালোকার্বন যেমন- ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFCs), হাইড্রো ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (HCFCs), হাইড্রো ফ্লুরোকার্বন (HFCs), এবং ব্রোমো ফ্লুরোকার্বন (BFCs) ওজোন স্তর নিঃশেষকরণ (Ozone layer depletion) প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হ্যালোকার্বন থেকে বায়ুমণ্ডলে ক্লোরিন, ব্রোমিন ইত্যাদির ঘনত্ব বাড়ে। মেরু অঞ্চলে ৭৮ ডিগ্রি সে: তাপমাত্রায় একটি ক্লোরিন বা CFC অনু এক লক্ষ ওজোন অনু ধ্বংস করতে পারে। CFC অনু UV রশ্মি দ্বারা ভেঙে ক্লোরিন ফ্রি-র‍্যাডিকেল গঠন করে। উক্ত ফ্রি-র‍্যাডিকেল খুবই সক্রিয় হওয়ায় ওজোনের সাথে বিক্রিয়া করে ওজোন স্তরকে ক্ষয় করে। এ ছাড়াও বায়বীয় নাইট্রোজেন যৌগ (যেমন- NO, NO2 এবং N2O) বায়ুমণ্ডলে অতি সামান্য পরিমাণ থাকলেও বৃহত্তম ওজোন নিঃশেষকারী পদার্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ওজোন স্তর সংরক্ষণে করণীয়

মানবজাতি তথা সমগ্র জীব-জগতের প্রতিরক্ষায় ওজোন স্তরের ভূমিকা বিবেচনা করে, ওজোন স্তরের ক্ষয়রোধকল্পে কানাডার মন্ট্রিলে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির তৎপরতায় ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ স্বাক্ষরিত হয়। অতঃপর ১৯৯৪ সালে ১৬ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সংরক্ষণ দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য ঘোষণা করা হয়। ভবিষ্যতে হাইড্রোক্লোরোফ্লোরো কার্বণ (HCFC) ব্যবহার বন্ধ করার মাধ্যমে মন্ট্রিল প্রটোকলের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে মর্মে আশা করা যায়। সিএফসি বা কার্বণ নিঃসরণকারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমানোর জন্য জাতিসংঘের ১৯৮৫ সালে ভিয়েনা কনভেনশনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তবে, সকল দেশকেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উপসংহার

মহাবিশ্ব মাঝে আমাদের পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে সুন্দর পরিবেশ গড়েছেন মহান আল্লাহ মানুয়ের বসবাসের জন্য। ঝুলন্ত মহাবিশ্ব সদা চলমান! মহাজাগতিক বস্তুসমূহের মাঝে রয়েছে পারস্পরিক আকর্ষণ। স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে নেই তাদের অবহেলা। অসতর্কতা-অবহেলা দেখি শুধু মানুষের বেলা। শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের পক্ষে এটা একদম মানায় না! সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে ঝেড়ে ফেলতে হবে অলসতা। আসুন, আমরা সতর্ক হই: যানবাহনের ধোঁয়া কমাই; রেফ্রিজারেটর, এয়ারকুলারসহ সকল যন্ত্রপাতি স্বাস্থ্যসম্মত যথাযথভাবে ব্যবহার করি। সিএফসি গ্যাস উৎপাদন সহ্য সীমার মাঝে রাখি। সার্বিকভাবে দূষণমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখি। সকলেই সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকি। ড. মো. বাশারত আলী সরকার লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যেভাবে বাংলাদেশের অংশ হলো

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যেভাবে বাংলাদেশের অংশ হলো:

বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গার মাঝে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ অন্যতম। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় এ দ্বীপটি অবস্থিত। সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার তাদের একটি জনসংখ্যা বিষয়ক মানচিত্রে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে সে দেশের অংশ দেখিয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের তরফ থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।

কিভাবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ হলো?

সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্য মুগ্ধ করার মতো। সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি নারকেল জিঞ্জিরা হিসেবে পরিচিত। প্রচুর নারকেল পাওয়া যায় বলে এ নামটি অনেক আগে থেকেই পরিচিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এবং অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। মি: পাশা বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। অধ্যাপক বখতিয়ার বলেন, প্রায় ৫০০০ বছর আগে টেকনাফের মূল ভূমির অংশ ছিল জায়গাটি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রের নিচে চলে যায়। এরপর প্রায় ৪৫০ বছর আগে বর্তমান সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া জেগে উঠে। এর ১০০ বছর উত্তর পাড়া এবং পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে বাকি অংশ জেগে উঠে। গবেষক মোস্তফা কামাল পাশা জানালেন, ২৫০ বছর আগে আরব বণিকদের নজরে আসে এ দ্বীপটি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যের সময় আরব বণিকরা এ দ্বীপটিতে আরব বণিকরা বিশ্রাম নিতো। তখন তারা এ দ্বীপের নামকরণ করেছিল 'জাজিরা'। পরবর্তীতে যেটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত হয়। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপ সেন্ট মার্টিন অধ্যাপক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, প্রায় ৩৩ হাজার বছর আগে সে এলাকায় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। বিভিন্ন কার্বন ডেটিং-এ এর প্রমাণ মিলেছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক বখতিয়ার। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ সালে ভূমি জরিপের সময় এ দ্বীপটিকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়। যদিও সে সময়টিতে বার্মা ব্রিটিশ শাসনের আওতায় ছিল। কিন্তু তারপরেও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত না করে ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, খ্রিস্টান সাধু মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। তবে অধ্যাপক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ১৮৯০ সালে কিছু মৎস্যজীবী এ দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। এদের মধ্যে কিছু বাঙালি এবং কিছু রাখাইন সম্প্রদায়ের লোক ছিল। ধীরে-ধীরে এটি বাঙালী অধ্যুষিত এলাকা হয়ে উঠে। কালক্রমে এ দ্বীপটি হয়ে উঠে বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় দেড় লাখ নারকেল গাছ আছে।

সম্রাট আওরঙ্গজেব, দুবলার চর এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ

সম্রাট আওরঙ্গজেব, দুবলার চর এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ
১৬৮০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের অধীনে। ইংরেজরা বাণিজ্য করতে এসে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলির চাইতে বেশি সুবিধা চাইলে আওরঙ্গজেব সেটা মেনে নেননি। এ সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ছিলেন জোসাইয়া চাইল্ড, যার ঔদ্ধত্যের কারণে ব্রিটিশরা আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘চাইল্ড’স ওয়ার’ বলে পরিচিত। তারা ভারত থেকে হজযাত্রায় যাওয়া এক জাহাজ লুট করে এবং যাত্রীদের খুন-ধর্ষণ করে।
ব্রিটিশরা বাংলাকে তথা পুরো ভারতবর্ষকে নৌ অবরোধে ফেলার চেষ্টা করে। তারা হুগলী নদীর ওপরে একটা দ্বীপ দখল করে সেই নদী নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। কিন্তু ইংরেজদের এই অবরোধ সফল হয়নি, কারণ ভারতের প্রধান প্রদেশ বাংলা বহিঃবাণিজ্যের ওপরে নির্ভরশীল ছিল না। অবরোধ দেবার কারণে বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কেউই না খেয়ে মরার উপক্রম হয়নি। এই ঘটনার মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর অবরোধ দেয়ার একটা কৌশল ব্রিটিশরা জানিয়ে দিয়েছিল। আর সেই অবরোধ তারা দিয়েছিল সমুদ্রবন্দরের বাইরে দ্বীপে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ঘাঁটির দরকার হয়েছিল, কারণ সমুদ্রে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয়। রসদ নেবার জন্য সব চাইতে কাছের গন্তব্যটিও যদি অনেক দূরে হয়ে থাকে, তাহলে অবরোধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেকারণেই হুগলীর সেই দ্বীপ দখল দরকার হয়েছিল। তিন শতক পরে… তিন শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশদের দেখানো কৌশলের একটা অন্য ভার্সন আমরা দেখতে পাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে, যেখানে মার্কিনরা ভিয়েতনামের মেকং নদীর বদ্বীপ এলাকাসহ ভিয়েতনামের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের তাঁবেদার সরকারের জাহাজগুলিকে গেরিলাদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়াও গেরিলাদের সাপ্লাই লাইনে অবরোধ দিয়েছিল। এই অবরোধ দিতে গিয়ে আমেরিকানরা মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে কিছু ভাসমান ঘাঁটি তৈরি করা ছাড়াও ভূমিতেও বদ্বীপের কৌশলগত এলাকাগুলিতে ঘাঁটি বানিয়েছিল, যেগুলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গেরিলারা স্থলপথ এবং নদীপথে নিয়মিত এসব ঘাঁটি আক্রমণ করতো ঠিকই, কিন্তু ঘাঁটিগুলি বন্ধ করে দেবার মতো শক্তি তারা কখনোই যোগাড় করতে পারেনি। ঘাঁটিগুলির অনেকগুলিই খুব দুর্গম জংলা এলাকায় ছিল, যেখানে ঘাঁটি রক্ষা করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের ঘাঁটি রক্ষা করার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুয়াদালক্যানাল-এর যুদ্ধ থেকে। এই দ্বীপখানার নামও কেউ জানতো না এক সময়। কিন্তু যে মুহূর্তে মার্কিন ম্যারিন সেনারা এই দ্বীপে নেমে জাপানিদের নির্মিতব্য ঘাঁটিটি দখল করে নেয়, তখন থেকেই এটা ইতিহাসের অংশ। জংলা এই দ্বীপের ঘাঁটিটি মার্কিনরা ব্যবহার করে বিমান এবং নৌঘাঁটি হিসেবে, যা কিনা প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাপানিরা বহুবার চেষ্টা করেছিল দ্বীপে অবতরণ করে ঘাঁটিটি দখল করে নিতে; কিন্তু জঙ্গলের বাস্তবতা এবং মার্কিনিদের প্রতিরোধের কারণে জাপানিরা অবশেষে ঘাঁটি দখল করার এই চিন্তাটি বাদ দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমেরিকানরা এই ঘাঁটিকে ব্যবহার করে সোলোমন দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ দ্বীপ দখল করেছিল। গুয়াদালক্যানাল প্রমাণ করে যে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপরে যদি এমন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা যায়, যেটা দুর্গমতার কারণে রক্ষা করা সহজ, তাহলে সেই ঘাঁটিটি কৌশলগত দিক থেকে যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সক্ষম। দ্বীপ পুনর্দখল কি এতটাই কঠিন? একটা দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেটা দখল করতে হলে নদী বা সমুদ্রপথে আক্রমণ ছাড়া গতি নেই। আর যদি দ্বীপটি জঙ্গল বা পাহাড়-বেষ্টিত হয়, তবে সেটা দখল করাটা আরও বেশি কঠিন। ব্রিটিশরা এই একই কারণে জিব্রালটার দখলে রাখতে পেরেছে এতকাল। স্থলভাগের দিকে পাহাড়-বেষ্টিত থাকায় এর নৌঘাঁটিটি সমুদ্রপথে আক্রমণ করে দখল করা ছাড়া গতি নেই। আমেরিকানরাও কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে একটা ঘাঁটি রেখে দিয়েছে একইভাবে। উঁচু পাহাড়-বেষ্টিত এই ছোট্ট ঘাঁটিটি কিউবানরা দখল করে নিতে চেষ্টাও করেনি তেমন একটা। সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশরা যখন হুগলীর দ্বীপে বাণিজ্য জাহাজ দখল করার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে ছিল, তখন সুন্দরবনের রোগ-বালাই আর সুপেয় পানির অভাব তাদের পেয়ে বসে। বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খান মৃতপ্রায় ব্রিটিশদের ওই দ্বীপ থেকে উদ্ধার না করলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। পরবর্তীতে যুদ্ধ বন্ধ করতে গিয়ে ব্রিটিশ অফিশিয়ালরা (কর্মকর্তা) আওরঙ্গজেবের দরবারে গিয়ে নাকে খত দিয়েছিল! কিন্তু মনে রাখতে হবে যে হুগলী নদীর সমুদ্র বাণিজ্য তখন বাংলার জন্য বাঁচা-মরার ব্যাপার ছিল না। তাই ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই দ্বীপ পুনর্দখল করাটাও বাঁচা-মরার লড়াই ছিল না। যদি উল্টোটা হতো, তাহলে কিন্তু শায়েস্তা খানের জন্য সুন্দরবনের ভিতরে অভিযান চালিয়ে ওই দ্বীপ পুনর্দখল করাটা বেশ কঠিন হতো। এবার এই দ্বীপের ব্যাপারটা আমরা বাংলাদেশের বদ্বীপের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে কী দেখি? দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পসুর নদীর ভেতরে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দর। আর এই নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে, সেখানে রয়েছে কিছু জংলা দ্বীপ, যা কিনা এই নদীর মুখ, তথা এই সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট এই চ্যানেলের নিয়ন্ত্রক। কোনো বহিঃশত্রু যদি কখনো মংলা বন্দরকে অবরোধ দেবার চিন্তা করে, তবে তারা এই দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করবে। একটা অবরোধের প্রধান দিক হলো Sustainability (টিকে থাকা)। আর সেটা সম্ভব করতেই নদীমুখে একটি দ্বীপ অপরিহার্য। শুধু সমুদ্রের ওপরে নির্ভর করে অবরোধ চালিয়ে নেয়াটা যে কারো জন্যই কঠিন। আর কেউ যদি ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে এই দীপগুলি বা আশপাশের কোনো একটি জবরদখল করে নেয়, তাহলে সেটা পুনর্দখল করাটাও প্রচণ্ড কঠিন হবে। তবে সঠিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে সেটা আবার বহিঃশত্রুর পক্ষে দখল করে নেয়াটা বেশ কঠিন হবে। একই রকমের উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এই দ্বীপ চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ রুটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আবার মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে একবার বেদখল হয়ে গেলে পুনর্দখল করাটা ভীষণ কঠিন হবে। কেউ এই দ্বীপ দখলে নিলে একই সাথে টেকনাফের দক্ষিণ প্রান্তে শাহপরীর দ্বীপের কিছু পাহাড়ী এলাকাও দখলে নিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ এই উঁচু এলাকা থেকে এখানকার সমুদ্রপথ এবং টেকনাফের রাস্তাগুলি অবলোকন করাটা সহজ। দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিতে স্পেশাল ফোর্স, আর্টিলারি, দ্রুতগামী শক্তিশালী প্যাট্রোল বোট এবং আর্মড হেলিকপ্টার মোতায়েন করে কোনো বহিঃশত্রু বাংলাদেশের প্রধান দুই বন্দরকে অবরোধ দিতে সক্ষম হতে পারে। এ কারণেই এই দ্বীপগুলিকে কালক্ষেপণ না করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সপ্তদশ শতকের মতো পরিস্থিতি এখন নেই যে সমুদ্র অবরোধে এদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। সমুদ্রপথে আমদানির ওপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল এই দেশকে অবরোধ দেবার পদ্ধতিটাই কোনো আগ্রাসী শক্তির জন্য ইকোনমিক্যাল হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশি কোনো শক্তি এই দেশে কোনোভাবেই তাদের আগ্রাসী তৎপরতা চালাবে না – এ রকম পদলেহনকারী চিন্তা এখন ধোপে টেকে না। দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিকে সুরক্ষা দিতে গেলে অনেক ধরনের বাধা আসবে। কিন্তু যারা বাধা দেবেন, তারা কখনোই এই দ্বীপগুলির কৌশলগত দিক চিন্তা করবেন না, অথবা চিন্তা করার পরও বলবেন যে, বিদেশি শক্তিদের তোষণ করে চলার মাঝেই এই দেশের ‘নিরাপত্তা’ নিহিত। নিজেদেরকে দুর্বল ভেবে অন্যের স্বার্থের কাছে সঁপে দিতেই তারা স্বাছন্দ্য বোধ করেন। এই দ্বীপগুলির সুরক্ষা দিতে চাইলেই এরা বিদেশি Subversion-এর অংশ হয়ে নানা প্রকারে বাধার সৃষ্টি করবেন। ওপরে কৌশলগত যতগুলি দ্বীপের উদাহরণ দিয়েছি, তার কোনোটিতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে কোনো কিছুকে প্রাধান্য দেয়নি; আমাদেরও দেওয়া উচিত হবে না। আহমেদ শরীফ লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঈদে সাড়ে ২৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য জমেছিল ঢাকায়

ঈদে সাড়ে ২৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য জমেছিল ঢাকায়ঃঃ

ফয়সাল আতিক ও তাবারুল হক রাজধানীতে এবার কোরবানির ঈদের দিন দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সাড়ে ২৩ হাজার মোট্রক টনের বেশি বর্জ্য জমেছিল জানিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার বেশিরভাগটাই সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ঈদের পরদিন বৃহস্পতিবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়ে আলাদা সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে এই তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এবং উত্তরের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা। মেয়র খোকন গতবছরের মত এবারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার এলাকার কোরবানির পশু বর্জ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিষ্কার করে ফেলা হবে। নগর ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, “এরই মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ অপসারিত হয়েছে।... ১৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারিত হয়েছে। বাকিটাও অপসারণের কাজ চলছে।” আর উত্তরের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা ঢাকা উত্তরের নগর ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছি।” অনেকে বৃহস্পতিবারও পশু কোরবানি দিচ্ছেন জানিয়ে মেয়র খোকন বলেন, “আজকে এবং আগামীকাল আরও কিছু বর্জ্য উৎপন্ন হবে। সেটা অপসারণ করে কম বেশি ২০ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করব। এই শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আমাদের প্রিয় নগরবাসীর কাছে তুলে দেব।” ঢাকা সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মাঠে থাকবেন বলে আশ্বাস দেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র। দক্ষিণের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ হারুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ১৫ হাজার টনের মতো বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। আমাদের ধারণা, আরও তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করার প্রয়োজন হতে পারে।” এ সিটি করপোরেশনে গতবছর ১৯ হাজার দুইশ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছিল জানিয়ে হারুন বলেন, “গতবছর বৃষ্টি ছিল, এবার পরিবেশ ছিল শুষ্ক। এবার দেড়-দুই হাজার মেট্রিক টন কম হবে বলে আমরা ধারণা করছি “ উত্তর সিটি করপোরেশনের জোন-২ এর সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাসুদুর সরকার বলেন, “বৃহস্পতিবার যেসব এলাকায় কোরবানি হচ্ছে, সেসব এলাকায় সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পলিথিন ও ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করছেন। কোরবানির পর সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাকে করে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।” রাজধানীর মহাখালীর বিভিন্ন এলাকায় এখনও সড়কে কোরবানি পশুর রক্ত আর শুকনো বর্জ্য থাকার অভিযোগের কথা জানালে মহাখালীতে স্থাপিত উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, “কিছু কিছু ওয়ার্ডে আজকেও কোরবানি হয়েছে। রক্ত, বর্জ্য জমে থাকার অভিযোগ আমরাও শুনেছি। সড়কে ময়লা জমে থাকলে সাথে সাথেই কর্মীরা ময়লা সরিয়ে ফেলছেন।” পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি এড়াতে গত কয়েক বছরের মত এবারও রাজধানীতে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াকরণের নির্দিষ্ট কিছু স্থান ঠিক করে দিয়েছিল সরকার। ঢাকা দক্ষিণে এরকম ৬২৫টি এবং উত্তরে ৫৪৯টি স্থান ঠিক করে সেখানে কোরবানির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।  উত্তরের প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা বলেন, “বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানিতে জনগণের সাড়া ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।” তবে কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তাতে ‘আশাব্যঞ্জক’ সাড়া পাননি বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন দক্ষিণের মেয়র। ঈদুল আযহার দ্বিতীয় দিনে নগরীর উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, বাড্ডা, মহাখালী, সেগুনবাগিচা, সায়েন্স ল্যাব ও কারওয়ান বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদুল আজহার রাতে যেসব গলিতে বর্জ্য জমে ছিল, তা সরিয়ে নিয়েছেন কর্মীরা। নগরীর বেশকিছু এলাকায় এদিন যারা পশু কোরবানি দিয়েছেন তারা নিজ উদ্যোগেই পশুর বর্জ্য নিকটবর্তী ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলছেন; জীবাণুনাশক দিয়ে কোরবানির স্থানটিও পরিষ্কার করে ফেলছেন দ্রুত। কুড়িলের কাজিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা গোলাম মুস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আত্মীয় স্বজনরা সবাই এসেছে কাল (বুধবার) রাতে। তাই দ্বিতীয় দিনে কোরবানি দিয়েছি। কোরবানির পর পশুর বর্জ্য আমরা নিজেরাই ডাস্টবিনে ফেলে এসেছি। রক্ত, বর্জ্য যা আছে, সব ডেটল দিয়ে ধুয়ে দিয়েছি।” রামপুরা বাজার এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশীদ বলেন, “কোথাও কোনো বর্জ্য জমিয়ে রাখছি না আমরা। কোথাও বর্জ্য দেখলেই আমরা সিটি করপোরেশনের হটলাইনে কল দিচ্ছি। তারা দ্রুত এসে ময়লা নিয়ে যাচ্ছে। অন্যবারের তুলনায় এবার সিটি করপোরেশন ভালো কাজ করছে।” কোথাও বর্জ্য জমে থাকলে সেই তথ্য জানাতে এবার হটলাইন চালু করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হটলাইন নম্বর হল ০৯৬১১০০০৯৯৯। আর ঢাকা উত্তরের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০২৯৮৩০৯৩৬। অধিকাংশ নগরবাসী কোরবানির নির্দিষ্ট স্থানে না গিয়ে বাড়ির আঙ্গিনা, পাড়া-মহল্লায় পশু কোরবানি দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করলেও তারা নিজ উদ্যোগে ময়লা সিটি করপোরেশনের কন্টেইনার, ডাস্টবিনে ফেলায় তাদের ধন্যবাদ জানান মেয়র খোকন। আর বর্জ্য অপসারণে ‘শতভাগ কৃতিত্ব’ ঢাকা উত্তরের নাগরিকদের দিয়ে প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা বলেন, “এবার জনগণ দারুণভাবে এগিয়ে এসেছেন, যে কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে আমরা বর্জ্য অপসারণ করতে পেরেছি।” সিটি করপোরশনের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এবার কাজ করছে বেসরকারি প্রাইমারি ওয়েস্ট কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিডব্লিউসিএসপি) কর্মীরা। সংগঠনটি সভাপতি নাহিদ আকতার লাকি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সাড়ে চার হাজার কর্মী বাসা-বাড়ি থেকে ময়লা নিয়ে সিটি করপোরেশনের ছোট ছোট ভ্যানে তুলে দিচ্ছে। এখন আর কোনো বাড়িতে কোনো ধরনের কোরবানির বর্জ্য নেই। নতুন করে যেগুলো জমবে সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মীরা সরিয়ে নেবে।”

বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয়

বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয়: ইউএনবি, ঢাকা বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক একমাত্র শহর যা ঢাকার নিচে স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে উঠে এসেছে। গত বছর এই স্থানে ছিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের একটি তালিকা তৈরি করেছে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধের মাত্রা, শিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার মানের মতো বেশ কিছু সূচক বিবেচনায় নিয়ে সারা বিশ্বের ১৪০টি শহরের ভালো-মন্দ দিক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে এবারই প্রথম ইউরোপের কোনো শহর বাসযোগ্যতার দিক থেকে শীর্ষ স্থান পেলো। বাসযোগ্যতার দিক থেকে ভিয়েনার পরই রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন (২), জাপানের ওসাকা (৩), কানাডার ক্যালগেরি (৪), অস্ট্রেলিয়ার সিডনি (৫), কানাডার ভ্যাঙ্কুভার (৬), জাপানের টোকিও (৭), কানাডার টরন্টো (৮), ডেনমার্কের কোপেনহেগেন (৯) ও অস্ট্রেলিয়ার এডিলেড (১০)। তালিকার তলার দিক থেকে বিবেচনা করলে সিরিয়ার দামেস্কের ওপর রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা (২), নাইজেরিয়ার লাগোস (৩), পাকিস্তানের করাচি (৪) ও পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরেসবাই (৫)।

ইটের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা ইটের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ image প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অাসা অতিথিদের একাংশ। ছবি: প্রথম অালো কৃষিজমি নষ্ট ও পরিবেশের ক্ষতি করে ইট তৈরি বন্ধ করতে হবে। মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে যেসব নতুন উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে, তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের যেসব বিভাগ অবকাঠামো নির্মাণ ও তা তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিয়ে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর সংশোধন করতে হবে। আজ শনিবার প্রথম আলো ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সহযোগিতা দেয় বিশ্ব পরিবেশ তহবিল (জিইএফ) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। গোলটেবিলের শুরুতেই ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, সরকারিভাবে দেশে বর্তমানে ইটভাটার সংখ্যা ৬ হাজার ৯৩০টি আর বছরে দেশে ইটের চাহিদা দেড় হাজার কোটি পিস। এই ইট প্রস্তুত করতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়, যার বেশির ভাগই কৃষিজমির উপরিভাগ (টপ সয়েল) থেকে সংগ্রহ করা হয়। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে ইটের চাহিদা বাড়ছে। রিজওয়ানা বলেন, ইট প্রস্তুত খাত দেশের গ্রিনহাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস; এ খাতে বছরে ২২ লাখ টন কয়লা ও ১৯ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়, যা বছরে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টন গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করে। তিনি বলেন, ভারতে ইটভাটা একটি মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বা লাল ক্যাটাগরির শিল্প এবং ইটভাটার জন্য মাটি তুলতে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করতে হয়। বাংলাদেশে এখনো তা কম দূষণকারী বা কমলা-খ হিসেবে চিহ্নিত এবং মাটি কাটতে কোনো ইআইএ করতে হয় না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মন্ডল বলেন, বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। ফলে কৃষি জমি থেকে মাটি নিয়ে, পরিবেশ ধ্বংস করে ও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি করে যেভাবে ইটভাটাগুলো চলছে তা চলতে পারে কি না, তা আমাদের ভাবতে হবে। সরকারি বিভিন্ন কাজে ইটের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত হওয়া উপকরণ ব্যবহারের ব্যাপারে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক তাঁর উপস্থাপনায় ইটের বিকল্প হিসেবে বেশ কিছু নির্মাণ উপকরণের ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরেন। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদী খনন থেকে উঠে আসা বালু দিয়ে ইটের বিকল্প উপকরণ প্রস্তুত করার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উপকরণ দিয়ে অনেক উঁচু ভবনও নির্মাণ করা যাবে। যেখানে দেয়াল, ছাদসহ বিভিন্ন অংশে কোনো লাল ইটের ব্যবহার লাগবে না। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অসিত কুমার বাউল বলেন, সরকারের কোনো একটি মধ্যম মানের প্রকল্প ইটের বিকল্প উপাদান দিয়ে নির্মাণ শুরু করলে তা অন্যদেরও উৎসাহিত করবে। যারা ইটের বিকল্প উপাদান প্রস্তুত করছে তাদের পণ্য বিক্রি বাড়বে। ফলে বিকল্প উপকরণ খাতে বিনিয়োগে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ অটো ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নওশেরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা লাল পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে বালু দিয়ে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে ইট প্রস্তুত করেছি। ওই কারখানা স্থাপনে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছি। কিন্তু পরিবেশবান্ধব ওই সাদা ইট কেউ কিনছে না। সরকারের কথা মানতে গিয়ে আমি যেন অপরাধী হয়ে গেলাম।’ বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে ইট তৈরিতে প্রস্তুত। কিন্তু সরকারকে আগে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, পরে এসে তারা আবার যাতে না বলে এই পদ্ধতি বাতিল, এভাবে ইট প্রস্তুত করা যাবে না। ভবিষ্যতে মাটি দিয়ে আমরা ইট বানাতে পারব কি পারব না? যদি না পারি তাহলে এখনকার আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েই অন্য উপকরণের কাঁচামাল ব্যবহার করে ইট প্রস্তুত করা যাবে কি না, এসব ব্যাপারে আইনে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।’ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও নির্মল বায়ু প্রকল্পের পরিচালক এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান ইটভাটার কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নানা ক্ষতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রতিবছর সাড়ে তিন হাজার মানুষ বায়ুদূষণজনিত অসুখে মারা যায়। এই বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোলায়মান হায়দার বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ইটভাটা-সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ইটভাটাগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সোহেল আহমেদ বলেন, ইটভাটা আইনে বলা হয়েছে এ-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো পরিবেশ আদালতে মীমাংসা হবে। কিন্তু শুধু চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পরিবেশ আদালত এবং ঢাকায় আপিল আদালত আছে। তাই সব জেলায় পরিবশে আদালত স্থাপনের বিষয়টিকে আইনে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ আইনে ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইটভাটাগুলোর শ্রমিকদের অবস্থা নিয়মিত তদারকি করা উচিত। ইউএনডিপির কর্মসূচি এনালিস্ট আলমগীর হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ইটভাটা আইন দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হলেও তা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইটের বিকল্প তৈরির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে একত্রে কাজ করার সুপারিশ করেন তিনি। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মাছুমুর রহমান ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ইটভাটাগুলোতে পরিদর্শন করতে গিয়ে অনেক সময় ইটের ঢিল খেতে হয়েছে। ফলে আইন এমনভাবে করতে হবে যাতে তা প্রয়োগের সুযোগ ও জনবল কাঠামো থাকে। ইটভাটা এলাকার ভুক্তভোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জের অধিবাসী আলতাফ হোসেন বলেন, ইটভাটার কারণে তাদের এলাকায় রোগ-বালাই বেড়ে গেছে। আমের ওজন ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সঞ্চালনার সময় বলেন, আমাদের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ—প্রথমত, ইটভাটায় বায়ুদূষণমুক্ত ইট তৈরির প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, মাটির ইটের পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে বালিসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে ইট তৈরি; তৃতীয়ত, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারকে গুণ, মান ও দাম সবদিক থেকে যে ভালো, তা ব্যাপক প্রচার করা। এগুলো করতে পারলে ইটভাটার মালিক থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউএনডিপির গ্রিন ব্রিক প্রকল্পের ব্যবস্থাপক আমান উল্লাহ বিন মাহমুদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান খান, বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির মহাসচিব আবু বকর। সূত্র: প্রথম আলো

আসছে মহাভূমিকম্প, মারা পড়বে ৪ কোটি মানুষ!

আসছে মহাভূমিকম্প, মারা পড়বে ৪ কোটি মানুষ!আসছে মহাভূমিকম্প, মারা পড়বে ৪ কোটি মানুষ!

অপেক্ষা করছে এক মহাভূমিকম্প, যার কারণে মারা পড়তে পারেন বিশ্বের চার কোটি মানুষ! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তো? এতবড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে এ অবধি দেখেনি বিশ্ব। বৃটিশ দৈনিক সানডে এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ওই ভূমিকম্পে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা- দু'টো মহাদেশই 'ভেঙে' আলাদা হয়ে যেতে পারে, ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামির কারণে আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে এবং ভূমিকম্পটি আসন্ন। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করা ইরানী বংশোদ্ভূত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মেহরান কেশের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। গত মাসে ধারণকৃত এক ইউটিউব ভিডিওতে তিনি বলছেন, ওই ভূমিকম্পে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলেই দুই কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। মেহরান কেশের এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা আনুষ্ঠানিক সত্যতা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী ৩০ বছরে অঞ্চলটিতে একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে ৯৯ শতাংশ, যার সম্ভাব্য মাত্রা সাড়ে ছয়। আর ড. কেশের গবেষণা বলছে, আসন্ন মহাভূমিকম্প আগামী এক বছরের মধ্যে ঘটতে পারে। গত মাসে আমেরিকা মহাদেশীয় অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ছয় থেকে ৮.৩-এর মধ্যে যে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, সেগুলোর আসন্ন মহাভূমিকম্পেরই লক্ষণ- এমনটাও দাবি করেছেন তিনি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে উত্তর চীনে বড় ধরনের কয়েকটি ভূমিকম্প হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। তার ধারণা, বিশালাকার সুনামির ফলে মহাদুর্যোগে ধ্বংস হয়ে যাবে মেক্সিকো ও মেক্সিকান উপসাগরীয় অঞ্চল। আরেক বৃটিশ দৈনিক ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলত দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে আঘাত হানবে ভূমিকম্পটি এবং এর সম্ভাব্য মাত্রা হতে পারে ২০ থেকে ২৪। এছাড়াও ওই ভূমিকম্পে মধ্য আমেরিকার মানুষজন বাঁচার কোনো সুযোগই পাবে না, এমনটাও ধারণা কেশের। সবশেষে ভেবে দেখার মতো আরো একটি কথা যোগ করেছেন কেশে, আর তা হলো এই যে- ভূমিকম্পটি বিশ্বে শান্তি এনে দেবে! তার দাবি- 'ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ভয়াবহ হবে যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি। গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে, ভেঙে পড়বে ব্যাংকিং ব্যবস্থা।'
 

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় আরও যা করতে হবে

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় আরও যা করতে হবে

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 5‘ছোট্ট এই দেশে ১৬ কোটি মানুষের বাস। তাদের জীবন পরিবর্তন করতে হলে উন্নয়ন করতে হবে। আর উন্নয়ন করতে গেলে পরিবেশের ওপর এর একটা প্রভাব পড়ে। তবে নগরায়ণও করতে হবে। দেশকে সবুজ রাখতে হবে। জলাধার ও জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হবে’, পরিবেশ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এ মন্তব্যটি করেছেন। প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশ রক্ষায় কোনো সাধারণ নাগরিকেরই দ্বিমত থাকার কথা না। কিন্তু উন্নয়ন করতে হলে নদী দুষন, খাল বিল দখল কিংবা নির্বিচারে বনভূমি নিধন বা মানুষের জীবন এবং সম্পদ রক্ষাকারী সুন্দরবনকে ধ্বংস করে হলেও কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসাতেই হবে এ ব্যাপারে সচেতন নাগরিক বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞদেও দ্বিমত রয়েছে। ২০১৪ এ নতুন জলবায়ু অর্থনীতি (এনসিই)’র প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে স্থায়িত্বশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাস (কার্বন নিঃসরণ কমানো) এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি একসাথে সম্ভব’। তাই, সম্পদের সুষম বন্টন এবং পরিবেশ-বান্ধব শিল্পায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন এবং দারিদ্র বিমোচন দুটিই সম্ভব।

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মে পানি একটি মূল উপাদান। গঙ্গা-ব্রক্ষপুত্র-মেঘনা অববাহিকা এবং ২৩০ টি নদী বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য, যোগাযোগ ও জীবিকার চালিকা হিসাবে কাজ করে। মিষ্টি পানির সংকট ও অপব্যবহার টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাধ্যমেী সাগরের লবণাক্ত পানি মূল ভূখন্ডে প্রবেশের ফলে উপকুল অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ও জলাশয়ের পানি ত্রমেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকার একটি বিরাট অংশে মিঠা পানির অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৩ প্রতিবেদন মতে, এশিয়ার ৪৯টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে অবস্থানকারী ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

এ অবস্থা এমনিতে সৃষ্টি হয়নি। ২০০০ সালের ৩৬ নং পরিবেশ আইন অনুসারে প্রাকৃতিক জলাধার বা মিষ্টি পানির প্রধান উৎস সংরক্ষনে আইনী বাধ্যতা থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পেশীশক্তিধারী ভূমিদস্যু কর্তৃক নির্বিচারে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড় এবং অন্যান্য জলাশয় দখলের ফলে ছোট বড় ২৩০টি নদীর ১৭৫টি জলাশয় মৃত প্রায় এবং প্রতি বছরই দু’ একটি করে নদী মরে অথবা শুকিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা দখলের কারণে নাব্যতা হারিয়ে সংঙ্কুচিত হয়ে এখন সাধারণ খালে পরিণত হচ্ছে। উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামেও অনেক সময় খাল, নদ-নদী জবরদখল করা হয়। যদি কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প উন্নয়ন এবং বাস্তুসংস্থানসহ সবই হুমকির সম্মুখীন হবে। পানি খাতে শাসনের ঘাটতির প্রভাব গোটা সমাজ বিশেষকরে নারী, শিশু, গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ে।

ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নির্বিচারে বাংলাদেশের অসংখ্য নদ-নদী, খাল ও জলাশয় দখল করার ফলে ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন। আইন অমান্য করে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি)ব্যবহার না করে নির্বিচারে বুড়িগঙ্গা এবং শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন জলাশয় দূষণ করছে ডায়িং কারখানা ও ট্যানারিগুলো। শুধু তাই নয়, শিল্পায়নের নামে কলকারখানার সব ধরনের বর্জ্য এসব জলাশয়ে নিস্কাশনের ফলে দূষণের মাধ্যমে ভূ-উপরিভাগের পানি দূষিত হয়ে গেছে। ফলে, খাবার বা অন্যান্য কাজে পানির সরবরাহে ঘাটতি মেটাতে ক্রমেই ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলনের উপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় টেকসই উন্নয়নে তথা পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। ঢাকা শহরে উৎপাদিত বর্জ্যরে প্রায় ৮৫ শতাংশ বর্জ্য পুনঃচক্রায়নযোগ্য হলেও তা সঠিকভাবে ব্যাবস্থাপনা বা পুনঃচক্রায়ন করা হচ্ছেনা।

সরকার ধলেশ্বরীর বন্যা অঞ্চলে (গাবতলীর পার্শে¦) মাটি ভরাট প্রকল্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও একই জায়গায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করে জলাশয় ভরাট করে, এটা সুস্পষ্টভাবে কর্তৃপক্ষের দ্বিমুখী অবস্থান। এমনকি ঢাকা,খুলনা, চট্রগ্রামের মত বড় বড় শহর ও অন্যান্য পৌরসভাগুলোতে সেপটিক ট্যাঙ্কও খুজে পাওয়া যায় না। ফলে, বর্জ্য পানি প্রবাহের লাইন এবং স্যানিটেশন লাইন, ওয়াসার বৃষ্টির পানি বহনকারী লাইনের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে দূষিত পানি সরবরাহ হচ্ছে। এগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট কোন গাইডলাইন নাই। শুধু তাই নয়, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভার মত অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের পানি সরবরাহ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, পানি সম্পদ সংরক্ষণের এখতিয়ারও নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়, যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক প্রভাবিত। অনেক সংসদ সদস্য ‘সরকারি জমি ও জলাশয় এর অবৈধ ভোগদখল’ সহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ড ও দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয় (পজিটিভ এ্যান্ড নিগেটিভ রোলস অব দি মেম্বারস অব দি নাইন্থ পার্লামেন্ট: এ রিভিউ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারনেশনাল বাংলাদেশ, ২০১২)।

উপরন্তু পানি ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্ক ফোর্স এসকল দূর্নীতির ঘটনার পর্যালোচনা করেছে যার কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যমেও এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ যে,এ প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধাচার চর্চার সুযোগ এবং উপায়সমূহ দুর্বল ও অকার্যকর। সর্বোপরি এসবের প্রধান কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক দুর্বল আইনের প্রয়োগ বা কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দোষীরা বিচারের আওতার বাইরে থাকছে। খাতটি অধিক দূর্নীতি প্রবণ এবং কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দার্য়িত্বে অবহেলা, জবাবদিহিতার অভাব, সম্পদের বিচ্যুতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ তসরূফ, চাদাঁবাজি, অনৈতিক প্রভাব ও ঘুষ ইত্যাদি পানি সম্পদ খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার সাথে কমপক্ষে ১৩ টি মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকলেও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যাপক ঘাটতি থাকায় সংশ্লিষ্টরা জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি নয়।

অর্থনৈতিক উন্নতির নামে একের পর এক প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজার করে দেওয়া হচ্ছে। ক্রমেই তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনে কৃষির রোপন প্রক্রিয়াতেও ঘটছে পরিবর্তন। এ প্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম বনভূমি পরিবেষ্টিত দেশগুলোর মধ্যে একটি যেখানে বনভূমির হার মাত্র ৬.৭%। আইনের প্রয়োগ না থাকায় নির্বিচার বন নিধনের ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ২,০০০ হেক্টর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শালবন যা প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছে, শুধুমাত্র শিল্প স্থাপনের নামে শালবন ধ্বংসে বাধা না দেওয়ার ফলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুূর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন নির্বিচারে গাছ নিধন ও অন্যান্য কারণে ইতিমধ্যে হুমকির সম্মুখীন। সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। যার ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজন ব্যয় আরো বেড়ে যাতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য কখনোই কাম্য হতে পারেনা।

২০১৪ এ প্রকাশিত আইপিসিসি’র ৫ম এ্যসেসমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সমুদ্রস্ফীতিজনিত লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রার উর্দ্ধগতির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান এবং গমের উৎপাদন যথাক্রমে ৮ শতাংশ এবং ৩২ শতাংশ হ্রাসসহ ২০৩০ এর মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্রের হার আরো ১৫% বেড়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে আশংকাজনক হারে কৃষি জমি এবং বনাঞ্চল নষ্ট করে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নগরগুলোও ক্রমেই বসবাস অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ এবং আর্থ-সামাজিক বিষয়সহ জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় ঢাকা সহ এশিয়ার আরো ৭টি শহরে (কলকাতা, মুম্বাই, গুয়াংজু, হো চিন মিন,সাংহাই, রেঙ্গুন এবং হাই ফং) আগামী ২০৭০ সাল নাগাদ ঘন ঘন উপকূলীয় ঝড় ও বন্যার আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরীর কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে অবস্থান করছে এবং এর ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও সম্পদের হানি সহ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশংকা মোকাবেলায় বাংলাদেশের কতখানি প্রস্তুতি রয়েছে?

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতি মুক্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা করে পানির পুনঃব্যবহার এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়া, বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন,নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ভবন নির্মাণে টেকসই উপকরণ ব্যবহার করে ৩০-৮০ শতাংশ জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয় সম্ভব। পরিবেশ-বান্ধব নগরীর যাতায়াত ব্যবস্থা হবে পরিস্কার, সহজলভ্য এবং যানজটমুক্ত থাকার কথা থাকলেও শুধুমাত্র ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামের কারণে নাগরিকরা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা)ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ঢাকার রাস্তায় কি নিরাপদে পায়ে চলা পথ এবং বাই-সাইকেল চালানোর কোন সুযোগ রয়েছে?

টেকসই জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ফসিল জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করার পাশাপাশি জিএইচজি নির্গমন কমানোর লক্ষে পরিবেশ বান্ধব সবুজ জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রিড লাইন তৈরি করে পুনঃ নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করছে টেসকই এবং পরিবেশ বান্ধব নগরীর ভবিষ্যৎ। অথচ সে ধরনের সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ না করে একের পর এক কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে স্থায়ীভাবে পরিবেশ বিধ্বংসী পদক্ষেপ নিয়ে কতখানি পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব তা নিশ্চিত নয়। নাগরিকদের সকল উদ্বেগ এবং বাঁধাকে উপেক্ষা করে সুন্দরবনের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানোর মাধ্যমে আসলেই কি আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করছি তা খতিয়ে দেখা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এবং বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য তহবিল বরাদ্দ করে বিশ্বে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু কোপেনহেগেন চুক্তির মাধ্যমে শিল্পোন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায় স্বীকার করে নিয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নয়। এ ক্ষতিপূরণের একটা অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে অবস্থানকারী বিশ্বেও প্রধান দেশগুলোর একটি বাংলাদেশও প্রাপ্য। তাই, এ দাবি থেকে পিছিয়ে এসে শুধুমাত্র নিজেদের সম্পদের মাধ্যমে এ ঝুঁকি মোকাবেলার চিন্তা করা হলে অধিক তহবিল প্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে এবং জাতীয় বাজেটের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা হবে। বরং সরকারের উচিৎ কপ-২১ সম্মেলনে কিভাবে এ দাবিকে জোরালো করে আরো বেশি তহবিল সংগ্রহ করা যায়। একইসাথে সীমিত সীমিত জলবায়ু তববিলের দক্ষ এবং সুষম ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য দ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়ন এবং এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নিপতিত জনগোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সকল অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে ভবিষ্যৎ অভিযোজন চাহিদা সঠিকভাবে যাচাই করে সে অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ, জলবায়ু প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জোর তদারকি করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ সকল মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন এবং সকল প্রকার ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়ন এবং সম্পদের সুষম বন্টনের বিকল্প নেই। পরিবেশ রক্ষা, জলাধার সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আইনের শাসন, যথার্থতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।।

প্রকাশক: আমাদের বুধবার

বিরল দৃশ্য দেখল পৃথিবীবাসী

সুপার মুন:
বিরল দৃশ্য দেখল পৃথিবীবাসী
আকাশের চাঁদ তো সবাই দেখে। কিন্তু অন্যান্য দিনের চেয়ে রোববারের আকাশে চাঁদের আকার, সৌন্দর্য ছিল চোখে পড়ার মতো। চাঁদকে জড়িয়ে থাকা লাল আভায় যেন ঢাকা পড়েছিল চাঁদের কলঙ্ক। ৩৩ বছর পর চাঁদের অপার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ বিশ্ববাসী, সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়েছিল পৃথিবীতে। সে এক বিরল দৃশ্য দেখল পৃথিবীবাসী। বিভিন্ন স্থান থেকে পৃথিবীর মানুষ দেখল পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। কিন্তু এ গ্রহণ সাধারণ কোন চন্দ্রগ্রহণ নয়। এ গ্রহণ হলো সুপারমুনের গ্রহণ। ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম একই সঙ্গে সুপারমুন এবং চন্দ্রগ্রহণ হওয়ার বিরল মহাজাগতিক ঘটনাটি ঘটল। পৃথিবীর মানুষ আবার বিরল এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে ২০৩৩ সালে।চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে সবচেয়ে কাছে যখন চলে আসে তখন পৃথিবী থেকে একে দেখতে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বড় দেখা যায়। এই পূর্ণিমাকে 'সুপারমুন' বলা হয়। কিন্তু এই সংজ্ঞা নিয়ে জ্যোতির্বিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। আর যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় তখন চন্দ্রগ্রহণ হয়। ফলে চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া পড়ে; সেই ছায়ায় চাঁদকে রক্তাভ লাল দেখায়। আর তা দেখার জন্য সাড়া পড়েছে বিশ্বজুড়ে সৌখিন আকাশ পর্যবেক্ষণকারীদের মধ্যে। এবারের বিশেষ পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ নর্থ আমেরিকা, সাউথ আমেরিকা এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চল থেকে দেখা গেছে। নর্থ আমেরিকার পশ্চিমাংশ, ইউরোপ ও আফ্রিকার বাকি অংশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে দেখা গেছে আংশিক গ্রহণ। যুক্তরাজ্যে সোমবার ভোরবেলায় পৃথিবীর ছায়ার নিচে হালকা ঢাকা পড়েছিল চাঁদ। আর নর্থ ও সাউথ আমেরিকায় গ্রহণ দেখা গেছে রোববার সন্ধ্যায়। বাংলাদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ দেখা না গেলেও সুপারমুন দেখা গেছে রোববার। গতকালও সেই বিশাল চাঁদের সৌন্দর্য উপভোগ করছে দেশবাসী। ১৯৮২ সালের পর এক বিরল দৃশ্যের দেখা মিলল রোববার রাতের আকাশে। বাংলাদেশের আকাশে বড় চাঁদ দেখা গেছে। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও এই চাঁদ দেখতে পেয়েছে বিশ্ববাসী। মহাজাগতিক ঘটনার একপূর্ণিমার রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় চাঁদ লালচে আভায় ধরা দেয় বিশ্ববাসীর কাছে, যাকে বলা হয় ‘সুপার মুন’। এমন দৃশ্য দেখতে আবার ২০৩৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর গত ১শ’ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র পাঁচবার। যখন চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে নিকট কক্ষপথে চলে আসে ও স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪ শতাংশ বড় দেখায় তখন তাকে ‘সুপার মুন’ বলা হয়। সুপার মুন সম্পর্কে আইরিশ অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, এটি খুবই বিরল ঘটনা। কিছুসংখ্যক মানুষ যারা এ দৃশ্য দেখতে পাবেন তারা ভাগ্যবান। রাতে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় ধরে চাঁদ কমলা থেকে গাঢ় লাল রংয়ে রূপ নেবে। পৃথিবীর সব স্থান থেকে সুপার মুন অবলোকন করা নাও যেতে পারে। এটা নির্ভর করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর। জানা গেছে, চাঁদ সম্পূর্ণ গোলাকার নয় বলে পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪৯ হাজার ৯০০ কিলোমিটারের কম-বেশি হয়। আর একমাত্র এ উপগ্রহটি প্রতি ২৭ দিন অন্তর পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের যে বিন্দুতে (পেরিজি) চাঁদ আসে, তার দূরত্ব ৩ লাখ ৬৩ হাজার ১০৪ কিলোমিটার। আর সবচেয়ে দূরে (অ্যাপোজি) যে বিন্দুতে চাঁদ অবস্থান করতে পারে তার দূরত্ব ৪ লাখ ৬ হাজার ৬৯৬ কিলোমিটার। পেরিজির সময় চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব যখন সবচেয়ে কম হয়, তখনই ঘটনাচক্রে পূর্ণিমা হলে চাঁদকে স্বাভাবিকের থেকে বড় ও উজ্জ্বল দেখায়। এটিই ‘সুপার মুন’ বা ‘পূর্ণচন্দ্র গ্রহণ’। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানায়, একই সঙ্গে সুপার মুন ও পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের ঘটনা এবার ৩০ বছরের বেশি সময় পর ঘটছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আর কোনো পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হবে না। আর একই সঙ্গে সুপার মুন-চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে ২০৩৩ সালে।
 

বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই

বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই
বায়ুদূষণে বাড়ছে বজ্রপাত : প্রতিকারে গবেষণা নেই
অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও বাতাসে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের গ্যাসের প্রভাবে সৃষ্টি হয় কালো মেঘের। আর এই কালো মেঘই বজ্রপাত সৃষ্টির প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টির সময় বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন মৌলিক ও যৌগিক গ্যাসের পরিমাণ বেশী থাকার কারণে অতিরিক্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটত। ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলে এ সব গ্যাসের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে পৃথিবী ও এর বায়ুমণ্ডল জীবের বসবাসের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। সম্প্রতি অর্থাৎ ঝড় ও বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে প্রচুর বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। আর এতে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণ। সম্প্রতি কয়েক বছরে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আতংকিত অনেকেই।শুধু এ বছরের মে ও জুন মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত দ্য রিপোর্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সারাদেশে বজ্রপাতে ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতকে সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনা না করে বজ্রপাতের কারণ নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে। আর বজ্রপাতের ক্ষতি রোধেও প্রতিকার খুঁজতে হবে। তবে এখনো পর্যন্ত বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কোনো দফতরের কাছে। আর সম্পূর্ণই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করায় বজ্রপাত প্রতিরোধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে সালফার ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষ মৃত্যুর সংখ্যা। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশী। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামান্য বৃষ্টিপাত বা ঝড়ো বাতাসেও ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। আর বজ্রপাতজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন। ঝড়-বৃষ্টির দিনে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা স্বাভাবিক হলেও সম্প্রতি এর পরিমাণ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। আর এই অস্বাভাবিকতার কারণ হিসেবে কালো মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারও বজ্রপাতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, স্বাভাবিক বায়ুতে ৭৮ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ নাইট্রোজেন, ২০ দশমিক ৯৫ ভাগ অক্সিজেন, দশমিক ৯৩ ভাগ আর্গন ও দশমিক শূন্য ৩৯ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড ও সালফারসহ সামান্য পরিমাণ অন্যান্য গ্যাস থাকে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে ৬৪-১৪৩ মাইক্রোগ্রাম সালফার ডাই অক্সাইড বিদ্যমান। আর প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড রয়েছে ২৫-৩২ মাইক্রোগ্রাম। যা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। এদিকে, মে-জুন মাস কালবৈশাখী ঝড়ের মৌসুম হলেও বড় কোনো ঝড় বা বৃষ্টিপাত ছাড়াই সামান্য ঝড়ো বাতাসের সঙ্গেই ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। আর এতে করে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। ঝড়ো বাতাসের প্রভাবে দ্রুতগতির কালো মেঘের মধ্যে ঘর্ষণ ও সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হওয়া ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। ইলেকট্রনের প্রবাহকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বিদ্যুৎ বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদা মেঘের উপাদানের অধিকাংশই জলীয়বাষ্প বা পানির কণা হয়। ফলে সাদা মেঘে ঘর্ষণের বা সংঘর্ষের ফলে যথেষ্ট ইলেকট্রন সৃষ্টি হয় না। কিন্তু কালো মেঘে নাইট্রোজেন ও সালফার গোত্রের গ্যাসের পরিমাণ বেশী থাকায় দ্রুত গতির কারণে এ সব যৌগিক গ্যাসের মধ্যে সংঘর্ষে প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয়। আর এ সব ইলেকট্রন বাতাসের জলীয়বাষ্পের মাধ্যমে ভূমিতে চলে আসে এবং সৃষ্টি হয় বজ্রপাতের। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে অতিমাত্রায় নাইট্রোজেন, সালফার ও কার্বন গ্যাসের নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ সব গ্যাস মেঘের জলীয় কণার সঙ্গে মিশে যায়। মে-জুন মাসে ঋতু পরিবর্তনের কারণে বাতাসে প্রচুর জলীয়বাষ্প সৃষ্টি হয়। ফলে স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহের কারণে এ সব জলীয়বাষ্প উপরের দিকে উঠতে থাকে। এতে কালো মেঘের মধ্যকার ঘর্ষণে তৈরী হওয়া ইলেকট্রন বা বিদ্যুৎ এ সব জলীয় কণাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ভূমিতে চলে আসে। কালো মেঘে থাকা যৌগিক গ্যাসগুলো রোদের তাপে এবং বাতাসের দ্রুতগতির কারণে প্লাজমা (বিক্রিয়ার অনুকূল) অবস্থায় থাকে। এতে সামান্য ঘর্ষণ বা সংঘর্ষে এ সব যৌগ গ্যাস পরস্পরের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটায়। ফলে সৃষ্টি হয় প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রনের। মেঘের জলীয় কণায় এ সব গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে ইলেকট্রন বা বিদ্যুৎ সৃষ্টির পরিমাণও ততটা বাড়বে। বজ্রপাতের কারণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান ও বর্তমান সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. আব্দুল মতিন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ছয় হাজার বার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। তবে এ সব বজ্রপাতের বেশীরভাগই ঘটে থাকে সমুদ্র, পর্বতমালায় কিংবা বনাঞ্চলে বিশেষ করে রেইন ফরেস্ট অঞ্চলগুলোতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি মহাবিশ্ব ও পৃথিবী সৃষ্টির সর্বজন গ্রহণযোগ্য যে মতবাদটি আছে অর্থাৎ বিগ ব্যাং তত্ত্বটি দেখি তাহলে দেখা যাবে, মহাবিশ্বে প্রথমে এক পরমাণুক (এটমিক) হাইড্রোজেন গ্যাস ছিল। যা ছিল আয়নিত (বিক্রিয়ার অনুকূল) অবস্থায়। প্রথম হাইড্রোজেনের দু’টো প্রোটন মিলিত হয়ে হিলিয়াম গ্যাসে পরিণত হয়। এরপর এই দু’টো গ্যাসের মধ্যে বিক্রিয়ায় বিশাল একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি। এরপর বিস্ফোরণে ছিটকে পড়া এ সব গ্যাস পুনঃবিক্রিয়ার মাধ্যমে আরও বেশ কিছু মৌলিক ও যৌগিক গ্যাসের সৃষ্টি হতে থাকে। এভাবে এক প্রকার চেইন বা শিকল বিক্রিয়ার মাধ্যমে এ সব উত্তপ্ত গ্যাস ঘনীভূত হতে থাকে। পরে তা কঠিন মৌলিক ধাতু, ধাতু যৌগে পরিণত হয়ে পৃথিবী সৃষ্টি হয়। শুরুতে পৃথিবীর চার পাশের যে বায়ুমণ্ডল ছিল তা জীবের বসবাসের অনুকূল ছিল না। এ সময় বায়ুতে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেনের মতো মৌলিক গ্যাসের পাশাপাশি সালফার, কার্বন ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের পরিমাণও বেশী ছিল। এ সব গ্যাস ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয় কালো মেঘের, যা বৃষ্টিপাত ঘটায়। বায়ু প্রবাহের সঙ্গে এ সব কালো মেঘ কখনো বিপরীত মুখ থেকে কখনো একটি স্তরের উপর আরেকটি স্তর চলে যাওয়ায় পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ বা ঘর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে করে সালফার ও নাইট্রোজেনের যৌগিক গ্যাসের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে। বিস্ফোরণাকারে জলকণাসহ এ সব বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় সালফার ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন এসিড, যা বৃষ্টির পানির মাধ্যমে ভূমিতে পড়ে। আমরা যাকে এসিড বৃষ্টি বলে থাকি। একই সঙ্গে এ সব বিক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণ ইলেকট্রন সৃষ্টি হয়। আর ইলেকট্রনই হল তড়িৎ বা বিদ্যুৎ। ইলেকট্রন সব সময় সুপরিবাহী পদার্থ যেমন— ধাতু ও পানির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া ইলেকট্রন বৃষ্টির জলীয় কণার মাধ্যমে ভূমি চলে আছে। এবং অনুকূল একটি মাধ্যমের সাহায্যে এই বিদ্যুৎ মাটিতে চলে যায় (যাকে আমরা আর্থিন বলে থাকি)। আসলে বজ্রপাতের ইলেকট্রনগুলো যখন কোনো মাধ্যম না পায় তখন সেগুলো সব উঁচু স্থান বা ধাতব বস্তুতে আকর্ষিত হয়। তাই ঝড় বৃষ্টির সময় ফাঁকা জায়গায় মানুষ বা পশু থাকলে বজ্রপাতের ঘটনা তাদের উপরই ঘটে থাকে। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ শাসন আমলে যখন বাংলাদেশের মৌজা পরিমাপ করা হয়েছিল তখন ধাতব পিলার বিভিন্ন সীমানায় স্থাপন করা হয়েছিল। উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন শংকর ধাতুর এ সব পিলার বজ্রপাত ঘটলে সেগুলো টেনে নিত। পরবতী সময়ে পিলারগুলো চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে বজ্রপাত সচরাচর মানুষসহ অন্যান্য পশুপাখির উপরে ঘটছে। সরকারিভাবে এই ধরনের পিলার বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হলেও আমরা চাইলেও না দেওয়ার কারণে— তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়নি।’ মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বজ্রপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়বে বজ্রপাতের পরিমাণও ততটা বাড়তে থাকবে। আর ভূমিতে বজ্রপাত ঘটার পেছনে অপরিকল্পিত মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ারও দায়ী।’ এই প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘মোবাইল টাওয়ারগুলো উচ্চতার কারণে বজ্রপাতের প্রথম শিকার হওয়ার কথা। কিন্তু আর্থ কানেকশন (ভূ-সংযোগ) ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং বজ্রপাতের বিদ্যুতের প্রবাহকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বা প্রযুক্তি এ সব টাওয়ারে রয়েছে। একই সঙ্গে এ সব টাওয়ার অত্যধিক ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড (তড়িৎ চৌম্বকক্ষেত্র) সৃষ্টি করায় বজ্রপাতে তৈরী হওয়া ইলেকট্রনও টাওয়ারগুলোর দিকে আকৃষ্ট হয়। আর উচ্চপ্রযুক্তির কারণে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ এ সব টাওয়ার কিছুটা ভূ-সংযোগের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলে বাকীটা অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। ফলে যত্রতত্র বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। বাসাবাড়িতে আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি তার ক্ষমতা মাত্র ২২০ ভোল্ট। শিল্পকারখানায় ১২০০ ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। আর জাতীয় গ্রিডে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১১০ ভোল্ট বিদ্যুতই যথেষ্ট।’ (উল্লেখ্য, ১ মেগা ভোল্ট = ১০ লাখ ভোল্ট, এই হিসেবে একেকটি বজ্রপাতের সময় প্রায় ৬০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।) বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশে যে মেঘ তৈরী হয় তার ২৫ থেকে ৭৫ হাজার ফুটের মধ্যে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে বেশী। এ এলাকায় তড়িৎ প্রবাহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংঘর্ষ ঘটে। এখানে খাড়াভাবে যে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয় তার তাপমাত্রা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট। বজ্রপাতের গতিও প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার বেগে নিচে বা উপরের দিকে চলে যায়। ফলে এ পরিমাণ তাপসহ বজ্রপাত মানুষের দেহের উপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক। সাধারণত আকাশের ৪ মাইল সীমার মধ্যে মেঘের সৃষ্টি হয়। এ সীমার উপরে পানি, বাতাস থাকলেও তা ঠাণ্ডা এবং হালকা পরিমাণে থাকে। আকাশের এ সীমার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মেঘের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে কালো বা ঘন কালো মেঘ থেকে বেশী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বিকেলের দিকেই এ ধরনের মেঘ বেশী সৃষ্টি হতে দেখা যায়। অন্য সময়ে সংঘটিত মেঘে বজ্র আওয়াজ থাকলেও বজ্রপাতের ঘটনা কম থাকে। সূর্যতাপ না থাকায় এবং ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে রাতের বেলায় বজ্রপাতের ঘটনা খুব কম হয়ে থাকে। বজ্রপাতের অন্যতম কারণ কালো মেঘের উপাদান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ কিউ এম মাহবুব দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বজ্রপাতের কারণ নিয়ে আমাদের তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে সৃষ্টির শুরু থেকেই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। এখনও পর্যন্ত আমরা জানি বজ্রপাত ঘটে কালো মেঘের সংঘর্ষের ফলে। সাদা মেঘে বজ্রপাত ঘটানোর মতো উপাদান থাকে না। বাংলাদেশে জুন-জুলাই মাসে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাতাসে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। আর এই জলীয়বাষ্প বাতাসের প্রভাবে উপরে উঠে কালো মেঘের সৃষ্টি করে। আর কালো মেঘ বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টি করে।’ অধ্যাপক মাহবুব আরও বলেন, ‘কালো মেঘে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইডসহ সালফার ও নাইট্রোজেনের বেশ কিছু যৌগ গ্যাস বিদ্যমান থাকে। বায়ুমণ্ডলের অন্যতম উপাদানগুলো হল, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ও কার্বন মনো-অক্সাইড। কিন্তু বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে সালফার ও নাইট্রোজেনের অন্যান্য যৌগিক গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেছে। শিল্প-কারখানার নির্গত টক্সিক গ্যাসগুলো জলীয়বাষ্পের সঙ্গে একত্রিত হয়ে কালো মেঘের সঙ্গে মিশে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসলে আমাদের এ বিষয়ে কোনো গবেষণা না থাকায় আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এ সব টক্সিক গ্যাস বজ্রপাতের জন্য দায়ী কিনা। তবে এ সব গ্যাসের পরিমাণ বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতের পরিমাণটাও এখন বেড়েছে। যেহেতু কালো মেঘের সংঘর্ষে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে, তাই এ সব টক্সিক গ্যাস বজ্রপাতের জন্য দায়ী হতে পারে। এই মুহূর্তে বজ্রপাতের ঘটনাকে নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে না দেখে এর কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রযুক্তিগত হোক বা প্রতিরোধের মাধ্যমে হোক এর প্রতিকারে উপায় বের করতে হবে।’ বজ্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সম্পর্কে সরকারি কোনো কার্যক্রম আছে কিনা জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহ কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করে। তা ছাড়া এ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ও প্রতিকারের জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কিন্তু বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এখনও বিবেচনা করা হয়নি। সাধারণত বৃষ্টিপাতের সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তা ছাড়া কালবৈশাখী ঝড় কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এখন বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করলে সাধারণ বৃষ্টিপাতকে একইভাবে বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বজ্রপাত কেন ঘটে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো গবেষণা হয়নি। কারণ এটা আমরা সবাই জানি বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের সময় মেঘের ঘর্ষণে বজ্রপাত হয়ে থাকে। বায়ুমণ্ডলের দূষণের কারণে বজ্রপাত হচ্ছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে ‍এই বিষয় নিয়ে গবেষণার সময় এসেছে বলে মনে হচ্ছে।’ (দ্য রিপোর্ট/জুন ২6, ২০১৫)  

চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

সুমন আফসার |  চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিটি করিডোরে রাখা কালো রঙের ডাস্টবিন। হলুদ বা অন্য রঙেরও রাখা আছে কোথাও কোথাও। বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী তা নির্দিষ্ট রঙের ডাস্টবিনে ফেলার কথা। কিন্তু ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ কিংবা রক্তমাখা তুলা— সবই ফেলা হচ্ছে একই বিনে। আলাদা করার ব্যবস্থা নেই গজ, ব্যান্ডেজ, ওষুধের শিশি, ব্যবহূত স্যালাইন কিংবা রক্তের ব্যাগও। জীবাণুমুক্ত না করেই কঠিন এসব চিকিৎসা বর্জ্য চলে যাচ্ছে সাধারণ বর্জ্যের ভাগাড়ে। আর পরিশোধন ছাড়াই নালা-নর্দমা হয়ে তরল বর্জ্য মিশছে নদীতে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ করুণ চিত্র শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নয়, হাতেগোনা কয়েকটি বাদে রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একই অবস্থা। তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার তো নেই-ই, নেই কঠিন বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও। পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার বালাই নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে এসব চিকিৎসা বর্জ্য বিষিয়ে তুলছে পরিবেশ। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করছে; জনস্বাস্থ্যের জন্য যা মারাত্মক ঝুঁকি। কঠিন ও তরল দুই ভাগে ভাগ করা হয় চিকিৎসা বর্জ্যকে। কঠিন বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে— ব্যবহূত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিউমার, ওষুধের শিশি, ব্যবহূত স্যালাইন ও রক্তের ব্যাগ। তরল বর্জ্যের তালিকায় রয়েছে রোগীর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা করে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সাধারণ বর্জ্যের মতো হাসপাতালের বর্জ্যও ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পন্ন ৯২ শতাংশ বর্জ্যই এভাবে রাস্তার পাশের খোলা ডাস্টবিন, নর্দমা কিংবা সংলগ্ন নদীতে ফেলা হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন কঠিন বর্জ্য উত্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৫০ টন আসছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে। আর এ বর্জ্যের মাত্র ৮ শতাংশ রয়েছে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েস্ট কনসার্নের গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০০৭ সালে সারা দেশে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পন্ন বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার টনের বেশি। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১৯ হাজার টন। ২০১৭ সাল নাগাদ উত্পন্ন বর্জ্যের পরিমাণ সাড়ে ২১ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে। এখনই এসব বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে আগামীতে রোগ প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকির বিষয়টি সারা বিশ্বেই রয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তরল চিকিৎসা বর্জ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব বর্জ্যের মধ্যে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক পানিবাহিত হয়ে মিশছে মাটি ও সংলগ্ন জলাধারে। এ অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের শস্য ও মাছে। এটি দুভাবে ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, প্রকৃতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এসব অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি অনেকগুলোকে আবার বেশি সহনশীল করে তুলছে। খাদ্যের মাধ্যমে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে মাছ ও শাক-সবজির মাধ্যমেও সরাসরি বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছে মানুষ। এসব অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার সহনশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর উত্পন্ন চিকিৎসা বর্জ্যে ৩০ থেকে এক হাজার গুণ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় যা অস্বাভাবিক। চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ) বিধিমালায় চিকিৎসা বর্জ্য সংরক্ষণ ও অপসারণের জন্য পাত্র ও তার রঙ নির্দিষ্ট করে দেয়া রয়েছে। সাধারণ বর্জ্যের জন্য কালো, ক্ষতিকারক বর্জ্যের জন্য হলুদ, ধারাল বর্জ্যের জন্য লাল, তরল বর্জ্যের জন্য নীল, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের জন্য সিলভার ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ বর্জ্যের জন্য সবুজ রঙের পাত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের সব হাসপাতালে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক। তবে দেশের মাত্র চারটি বেসরকারি হাসপাতালে ইটিপি রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো— বারডেম, অ্যাপোলো, স্কয়ার ও ইউনাইটেড। এছাড়া পাত্রের গায়ে নির্দিষ্ট চিহ্ন ব্যবহারেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ প্রচার, নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগের অভাব ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হচ্ছে না। জীবাণুমুক্ত ও পরিশোধন না করেই যেখানে-সেখানে চিকিৎসা বর্জ্য ফেলছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। পরে তা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। বিস্তার ঘটাচ্ছে হেপাটাইটিস বি, সি, ডিপথেরিয়ার মতো বিভিন্ন রোগের। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের পাশাপাশি রোগীদের মধ্যেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পরিবেশ অধিদফতরকে এগিয়ে আসতে হবে। এদিকে চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ অধিদফতর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। এর মধ্যে স্কয়ারের কাছ থেকে ৩ লাখ, সেন্ট্রাল হসপিটালের ২ লাখ, পপুলার হাসপাতালের ৪ লাখ ও ড. সালাহউদ্দিন হাসপাতালের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে অধিদফতর। বাংলাদেশ মেডিকেলকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও পরবর্তী সময়ে আপিলের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা মওকুফ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর গ্রিন লাইফ হাসপাতালকে ২ লাখ ও জেডএইচ শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে অধিদফতর। তবে প্রতিষ্ঠান দুটি এ বিষয়ে আপিল করেছে, যা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ২৩৫টির বেশি। এছাড়া চালু রয়েছে আরো প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। এ ধরনের মোট ১৮ হাজার ক্লিনিক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি খাতে নিবন্ধিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে ৩ হাজার ৫১৬টি। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা প্যাথলজিক্যাল সেন্টার রয়েছে ছয় হাজারের বেশি। শুধু রাজধানীতে ১ হাজার ২০০টি নিবন্ধিত ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর বাইরে রাজধানীতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিবন্ধনহীন আরো পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

৪ দশকের তিস্তা-সংকটঃ সমাধান কতদূর

৪ দশকের তিস্তা-সংকট
সমাধান কতদূর
মেসবাহ উল্লাহ শিমুল । দৈনিক আমাদের সময় ডট কম
সমাধান কতদূরভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিবদমান তিস্তা নদীর পানি চুক্তির বিষয়টি এখন ইতিহাসের অংশ। প্রবহমান পথের মতোই দীর্ঘ এ নদীর ভাগ্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া। ১৯৫২ সালে সে সময়ের একীভূত পাকিস্তান প্রথম এ নদীর পানির হিস্যা নিয়ে দেনদরবার শুরু করে ভারতের সঙ্গে। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে এ দেনদরবারের ভার পায় অ্যাপিল অব ডিসকর্ড হিসেবে। শুরু হয় ভারতের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক এ নদীর পানির হিস্যা আদায়ে বহুমুখী তৎপরতা। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও সমাধান হয়নি এ সংকটের। এদিকে আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে ঘিরে তিস্তাজট নিরসনে ফের তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরেও তিস্তা নিয়ে কোনো সুখবর থাকছে না বলে জানিয়েছে দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তা চুক্তি আটকে আছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে। আগামী ৬ জুন তিনি মোদির সঙ্গে ঢাকা আসবেন শুধু একটি শর্তে, তা হলো, তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদী আছে। তিস্তা এগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতের সিকিমের সোহামো লেক থেকে এ নদীর উৎপত্তি। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৭ সালে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার রেনলি এ নদীর ম্যাপ তৈরি করেন। নদীটি উত্তরাঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। ১৯৭২ সালে প্রথম বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবহমান নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে গঠিত হয় যৌথ নদী কমিশন। তবে বছরের পর বছর এ কমিশন কেবল ঢাকা-নয়াদিল্লির মাঝে নিষ্ফল লোক দেখানো বৈঠকই করেছে, তাও অনিয়মিত। এরপর ১৯৯০ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবায় ভারত বাঁধ দিলে তিস্তার পানিপ্রবাহ আটকে যায়। অকার্যকর হয়ে পড়ে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা সেচ প্রকল্প। শুকিয়ে যেতে থাকে নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা। এরই মধ্যে মরে গেছে তিস্তার শাখা-প্রশাখাগুলো। ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৩০ বছরমেয়াদি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। যদিও ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ফারাক্কার বাঁধের কারণে পানি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। সর্বশেষ ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ব্যাপক তৎপরতা চালান। মনমোহনের ঢাকা সফরকে ঘিরে পরিবর্তন আনা হয় অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে গঠিত যৌথ নদী কমিশনের কিছু নীতিমালায়। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁকে বসায় সে চুক্তির সব আয়োজনই ভেস্তে যায়। বহুল আকাক্সিক্ষত এ চুক্তি সই হবেÑ জনগণকে দেওয়া এমন প্রতিশ্রুতি রাখতে না পেরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার। ঢাকার সূত্রগুলো বলছে, ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়টি কেবল দুদেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িত। নয়াদিল্লির সঙ্গে কলকাতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ঢাকার পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে এ চুক্তি হওয়া না হওয়া একটি বড় ফ্যাক্টর। যে কারণে ২০১১ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়নি। ওই চুক্তি বাতিল হওয়ার পরও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে মমতার দল তৃণমূল সমর্থন প্রত্যাহার করে। এদিকে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের কারণে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের বেশ কিছু জেলাতেও বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। সে কারণে সেখানকার স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১১ সাল নাগাদ এর বিরুদ্ধে ১৫০টি মামলা করে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দুই দেশের ফর্মুলা ভিন্ন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সে সময় নদীর মোট প্রবাহের ২০ শতাংশ প্রবহমান রেখে উভয় দেশে ৮০ শতাংশ পানি সমান হারে ভাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশকে মাত্র ৫ শতাংশ পানি দিতে রাজি হন। এদিকে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় কোন অঙ্ক নির্ধারণ করেছেন, সে বিষয়টি ঢাকার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ন্যায্যতার ১৬ আনা পূরণ না হলেও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে বলে তারা জানান। সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে দুদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ পানি ভাগাভাগি করে নিতে সম্মত হয়েছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে উভয় দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের চুক্তিতে তিস্তা নদীর পানির ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ ভারতের অধিকারে রেখে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ মূল প্রবাহের জন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে ওই চুক্তিও আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নিয়মাবলি অনুযায়ী ইচ্ছা করলেই উজানের দেশ এ ধরনের নদীর ওপর ভাটির দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছু নির্মাণ করতে পারে না। ভারতের সংবিধানও আন্তর্জাতিক নদীকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। সংবিধানে নদী বলতে ‘আন্তঃরাজ্য নদী’কেই (ওহঃবৎ-ঝঃধঃব জরাবৎং) বুঝিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিস্তাসহ বাংলাদেশের ভেতরে আসা নদীগুলো আন্তর্জাতিক, না আন্তঃরাজ্যকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ নদী, সেই ব্যাপারে ভারতের সংবিধান কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। ভারতের সংবিধানের ক্ষমতা তালিকার ৫৬নং সন্নিবেশকে নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তাই রাজ্যের দোহাই দিয়ে দশকের পর দশক তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিমত তাদের। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, রাজ্য সরকার কেবল পানি সরবরাহ, সেচ, খাল খনন, হ্রদ, নালা ও বাঁধ নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং জলশক্তি ব্যবহার-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবে। আইনজ্ঞরা বলেন, ভারতের সংবিধান পর্যালোচনায় এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তি স্বাক্ষরের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরই বর্তায়। সেই কারণে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তিস্তার পানিবণ্টনের মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-১৩ মেয়াদের শেষ দিকে এসে তিস্তা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর সরকার সে সময় আইন অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের শরণাপন্ন হওয়ার চিন্তা করে। মিয়ানমারসহ দেশটির সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে সুফল পাওয়ায় সরকার এ নিয়ে যোগাযোগও শুরু করেছিল বলে সূত্রের দাবি। কিন্তু পরে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় সরকার ঝামেলা বাড়াতে চায়নি। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তিস্তা নিয়ে এতদিন আশ্বাসের রাজনীতি চললেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে এ বিষয়ে আন্তরিক। এ জন্য তিনি এ চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়কেও রাজি করিয়েছেন। তাই এখনই সুযোগ এ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মরুপ্রবণ উত্তরাঞ্চলকে রক্ষা করা। এছাড়া কৃষি-জীববৈচিত্র্য থেকে শুরু করে অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে এবং ভারত-সৃষ্ট বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজনৈতিক ঐক্য হওয়া জরুরি। এদিকে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা গতকাল এক প্রতিবেদনে জানায়, মোদির সঙ্গে মমতা বাংলাদেশ সফরে রাজি হয়েছেন ঠিকই, তবে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা এ সফরে হবে নাÑ এমন শর্তে। এ সফর নিয়ে মোদি-মমতা এরই মধ্যে দুবার একান্ত বৈঠকও হয়েছে। একবার সংসদে আর একবার রাজভবনে। দুবারই বাংলাদেশ নিয়ে মমতার সঙ্গে কথা বলেন মোদি। সর্বশেষ রাজভবনের বৈঠকে মমতাকে বিশেষভাবে তার সফরসঙ্গী হওয়ার অনুরোধ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মমতা জানিয়ে দেন, নীতিগতভাবে তিনি বাংলাদেশ যেতে সম্মত। কিন্তু এর কদিন পরই প্রধানমন্ত্রীকে মমতা জানিয়ে দেন, তিনি যেতে পারবেন না। কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সাম্প্রতিক কলকাতা সফর। সেখানে রাজনাথ খুব শিগগির তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এরপরই ক্ষুব্ধ মমতা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এই কথা বলছেন, তার মানে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় তিস্তা চুক্তি সই করে ফেলতে পারেন। সুতরাং তার ঢাকা না যাওয়াই শ্রেয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মমতাকে আশ্বাস দেওয়া হয়, ঢাকা সফরে তিস্তা নিয়ে কোনো কথা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর মতামত ছাড়া শুধু বাংলাদেশের কথায় তিনি চুক্তি করবেন না। এদিকে রাজনাথ গতকাল বলেন, এই সফরেই তিস্তা চুক্তি হয়ে যাবেÑ এমন কথা তিনি বলতে চাননি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে এই চুক্তি হতে পারে। সার্বিক অবস্থা বিচারে এটাই প্রতীয়মান যে, নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সফরে অন্যান্য বিষয়ে সুখবর থাকলেও তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো সুখবর পাওয়ার আশা নেই বাংলাদেশের।
 

আগ্রাসনের শিকার সুন্দরবন

আগ্রাসনের শিকার সুন্দরবন

ঘষিয়াখালী রুট চালু করতে হবে

ম. ইনামুল হক

last 3প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪-এর ১৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে রক্ষা করার জন্য ঘষিয়াখালী নৌরুটের দুপাশে গড়ে ওঠা চিংড়ি ঘেরগুলিকে তুলে দিয়ে ড্রেজিং করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর এই আদেশ ৯ ডিসেম্বর ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর সবার কাছেই অনেক প্রতীক্ষীত ছিলো। উল্লেখ্য যে, তেলবাহী জাহাজ ‘সাউদার্ণ স্টার ৭’ অন্য একটি খালি জাহাজ ‘টোটাল’ এর ধাক্কায় ফুটো হয়ে শ্যালা নদীতে ডুবে গেলে ৩৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্ণেস অয়েল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে এক মহা দুর্যোগ সৃষ্টি করে। এই সুন্দরবন উত্তর থেকে আসা গঙ্গা ও তার শাখা প্রশাখার মিঠা পানি ও দক্ষিণ থেকে আসা সমুদ্রের লোনা পানির মিলনস্থল যা’ Pleistoceneযুগ (২০ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ বছর আগে) ও তৎপরবর্তী Holoceneযুগে (১ লক্ষ বছর থেকে অদ্যাবধি)উজান থেকে আসা পলির পতন এবং তার উপর মোহনার গাছপালার পরিবৃদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। এর ভূমির উচ্চতা গড় সমুদ্র তল থেকে ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার। অজস্র নদী নালায় পরিপূর্ণ এখানকার জলাভূমি, কাদার তাল, ভাটায় জেগে ওঠা সাগরের ভেতরের জমি ইত্যাদি এখানে জলজ ও ভূমিজ প্রাণীর এক বিচিত্র সমাহার সৃষ্টি করেছে।

সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং এর ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার জন্যে একে ১৮৭৫ সালে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গকিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৯ সালে একে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটস-এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে ২০০৯ সালে সুন্দরবন ও কক্সবাজারকে বিশ্বের সাতটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্র হিসেবে ভোট দেবার যজ্ঞ শুরু হলে একই সাথে এই যজ্ঞের উদ্যোক্তারা সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকাকে দখল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এরই এক পর্যায়ে ২০১১ সালে বিআইডাব্লি#উটিএ মংলা ঘষিয়াখালী নৌপথটি বন্ধ করে দিলে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল ও যশোর জেলার বিভিন্ন নদী বন্দরে যাতায়াতকারী মালবাহী কার্গো জাহাজগুলিও সুন্দরবনের ভেতরে দিয়ে শ্যালা নদীপথে যাতায়াত শুরু করে। পুশুর নদের তীরে মংলা সমুদ্রবন্দর অবস্থিত বিধায় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজ আসা যাওয়া করে। এইসব জাহাজগুলি তাদের ব্যবহৃত কঠিন বর্জ্য এবং ব্যবহৃত জ্বালানী বর্জ্য ফেলে সুন্দরবনকে দূষিত করতে থাকে।

পরিবেশবাদীরা তাই সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য এর ভেতর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ বন্ধ করা এবং রামপাল এলাকায় দুটি কয়লাচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ করার দাবী জানিয়ে আসছে। কেবল রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে রক্ষা করতে বাগেরহাট-খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় যেসকল শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির এবং জাহাজ নিক্ষিপ্ত বর্জ্য দূষণ বন্ধের লক্ষ্যেও আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে সরকারের তরফ থেকে এব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প কলকারখানা বাড়ছে, শহরের জনবসতি বাড়ছে, বিদেশী শিল্প উদ্যোক্তারা আসতে চাইছে, ফলে মংলা সমুদ্র বন্দর ও সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলিতে জাহাজ চলাচল বাড়ছে। এইসব জাহাজ থেকে ফেলা বর্জ্য, বিশেষ করে ব্যবহৃত জ্বালানীর বর্জ্য এর অভ্যন্তরীণ নদীগুলিকে যে কি পরিমাণ দূষিত করছে তা’ কোন ব্যক্তি এলাকায় গেলেই তা’ দেখতে পাবেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৮০ সালের দশক থেকেই সুন্দরবন নগ্ন আগ্রাসনের শিকার হতে থাকে। বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী ভারত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তার সুন্দরবন এলাকায় আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুললে বাংলাদেশের সুন্দরবনেও পর্যটন শিল্প প্রসারের কথা ওঠে। কিন্তু সুন্দরবনের দায়িত্বে থাকা বন অধিদপ্তরের দুর্নীতি এবং বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যর্থতার সুযোগে এই শিল্পটি ক্রমশঃ ব্যক্তি উদ্যোগের বিষয় হয়ে যায়। ২০০০ সাল নাগাদ সুন্দরবনের চারপাশে অনেক এনজিও সুন্দরবনের মানুষ ও প্রাণী রক্ষার নামে ঘাঁটি গাড়তে থাকে। এরপর থেকেই শুরু হয় সুন্দরবন দখলের আগ্রাসী প্রচারণা। আমরা বিশ্বের সেরা প্রাকৃতিক সাইট হিসেবে সুন্দরবন এবং কক্সবাজারকে ভোট দেবার জন্যে দেশব্যাপী প্রচারণা দেখেছি। সারা দেশের মানুষ পাগলের মতো এই যজ্ঞে যোগ দিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলো। কিন্তু আসলে ঐ যজ্ঞটি ছিলো সুন্দরবন ও কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ভূমিকে দখল করার পাঁয়তারা এবং নামে বেনামে দখলীকৃত ভূমির দাম বৃদ্ধি করা। আমরা তখনই প্রতিবাদ করে বলেছিলাম,ঐ যজ্ঞ ঐ এলাকা দু’টির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমিকে ধ্বংস করে মনুষ্য পদচারণা ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে পূর্ণ দূষিত ভূমিতে পরিণত করবে।

সুন্দরবনের তেল বিপর্যয়ের পর সম্ভবত

নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের আপত্তির কারণেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া পেতে ৬ দিন দেরী হয়। এই বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় নৌমন্ত্রী বলেন, জংলার চেয়ে মংলা বেশী গুরুত্বপূর্ণ। উলে#খ্য যে, চলতি গুগুল স্যাটেলাইট চিত্রে ঘষিয়াখালী নদীর দুটি রূপ পাশাপাশি পাওয়া যায়, এর একটি পূর্ব অংশের যা’ ২০১০ সালের ও অন্যটি ঘষিয়াখালী নদীর পশ্চিম অংশের। এতে দেখা ২০১০ সালে এই নদীর উপর দিয়ে কার্গোবাহী জাহাজ চলাচল করছে, আর ২০১৩ সালে নদীটি পলি পড়ে বুজে গেছে। স্পষ্টতঃই বোঝা যায়, সুন্দরবনকে ভোট দিয়ে জয় অর্জনের পরপরই এর উদ্যোক্তারা এলাকাটিকে দখল করার মহোৎসবে লেগে যায়। জানা যায়, রাজনৈতিক দলের অনেক বড় বড় নেতা এই এলাকায় জমিগুলির মালিক হয়েছেন, এবং বলাই বাহুল্য যে,রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও অনুগ্রহপ্রাপ্তরাই ঘষিয়াখালী ও অন্যান্য জলাভূমিগুলি দখল করেছেন। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান। দুর্বৃত্তদের দখল প্রক্রিয়ার চরম বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক ফল সুন্দরবেনের ভেতরে এই তেল দূর্ঘটনা। এর ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা তত সহজ নয় তবে পরিবেশ মাপকাঠি এবং এর দীর্ঘ সময়ের ক্ষতি হিসাব করলে তা’ ১ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা হবে।

 last-3-1

উল্লেখ্য যে, সুন্দরবনের উত্তর দিয়ে মংলা বন্দর থেকে ঘাসিয়াখালী হয়ে ২২ কিলোমিটারের ঐতিহ্যবাহী নৌ রুটটি যথাযথ সংরক্ষণের অভাবেই ভরাট হয়ে গেছে। এই কারণে অন্যান্য জাহাজের মতই এই জাহাজটিকেও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। মংলা ঘাসিয়াখালী রুট যাত্রাপথের মাধ্যমে ১৫০ কিলোমিটার পথ কম পাড়ি দিতে হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুট পুনরায় চালু করা তত সহজ ব্যাপার নয়। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে চালু করা এই রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এটি বন্ধ করায় যে ভরাট হয়েছে তা’ পুনঃখনন করতে ২০০ কোটি টাকার ড্রেজিং লাগবে। জানা যায় যে, বিগত জুন মাসে একটি চীনা কোম্পানীকে ৮৮ কোটি টাকা খরচে এই খাল পুনঃখননের আদেশ দেয়া হয়, এবং জুলাই মাসে তার কাজও শুরু হয়। আমরা বাংলাদেশে চীনা কোম্পানীগুলির প্রতারণা সম্পর্কে জানি, তাই প্রশ্ন আসে তারা কি নিয়ম পালন করে ঠিকমত কাজ করেছে? নাকি তারা কিছু কাজ করে বহু টাকার বিল তুলে নিয়ে সরে পড়েছে? বিআইডাব্লি#উটি-এর কাছে প্রশ্ন, ঘষিয়াখালী নৌ রুট ভরাট হওয়ার মুখে তা’ বন্ধ না করে ২০১১ সালে ড্রেজিং করা শুরু হয়নি কেন? কেন ঐসময় সমীক্ষার নামে সিইজিআইএস-কে কাজ দিয়ে ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হতে দেয়া হলো?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘষিয়াখালী নৌ রুট চালু করার জন্যে চিংড়ি ঘের তুলে দেবার আদেশ দিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক পোল্ডারও এর জন্যে বাধা হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো পোল্ডারের বাঁধ কেটে দেয়ার প্রয়োজন হবে। তাই জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ মংলা ঘষিয়াখালী রুটটি চালু করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ প্রয়োজন।।

minamul@gmail.com প্রকাশক: আমাদের বুধবার, তারিখ:

MOST POPULAR

HOT NEWS

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.